Saturday, 21 June 2014

লোকসভায় ধ্বনি উঠল, জয় হরিচাঁদ

লোকসভায় ধ্বনি উঠল, জয় হরিচাঁদ

, Ei Samay

গৌতম হোড় 

নয়াদিল্লি: পাঠশালার বার্ষিক অনুষ্ঠানে যেমন সম্প্রীতির নাচ-গান হয়, সাংসদদের শপথেও হুবহু সেই ছবি৷ একের পর এক সাংসদ শপথ নিচ্ছেন৷ মন্দ্রস্বরে নানা ভাষায় শপথ বাক্য লোকসভার কোণে কোণে আছড়ে পড়ছে৷ বনগাঁর সাংসদ কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর তো শপথের পর 'হরিচাঁদের জয়, গৌরচাঁদের জয়' বলে ধ্বনি দিয়ে উঠলেন৷ এক মহিলা সাংসদ 'ঈশ্বরের নামে' নামে শপথ নিয়ে কী জানি কেন, স্বামী এবং শ্বশুরের নামও বিনম্র শ্রদ্ধায় আওড়ে ফেললেন৷ পতিব্রতা হওয়ার সুবর্ণ মওকা হাতছাড়া করেননি তিনি৷ গুজরাটের এক সাংসদ ঘরে ঢোকার মুখে গভীর অনুরাগে দু'পাক নেচে নিলেন৷ ভোজপুরি সুপারস্টার মনোজ তিওয়ারি গাইলেন দু'কলি গান৷ নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের বিচিত্র মিলন৷ অখণ্ড কীর্তন বা কাওয়ালি হল না এই যা ! 

সাংসদদের গায়ে বিশুদ্ধ নিজ বেশ৷ ঝাড়গ্রামের তৃণমূল সাংসদ উমা সোরেন সাঁওতালি ভাষায় শপথ নিলেন৷ সাঁওতালি রীতিতে শাড়ি পরেছিলেন উমা৷ তাতে আঁকা ঘাসফুল৷ লেখা মা মাটি মানুষ৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ নিয়ে 'জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম' তো বললেনই, সঙ্গে যোগ করলেন 'বাংলার জয় হোক'৷ বোলপুরের অনুপম হাজরা আরও দু'কদম এগিয়ে৷ বললেন, 'আমি বাঙালি, আমি গর্বিত'৷ শুধু এঁরাই নন, ছত্রপতি শিবাজি ও বালাসাহেব ঠাকরের নামে জয়ধ্বনি দিয়েছেন চন্দ্রকান্ত খেড়ে, আনন্দরাও আরসুল, বিনায়ক রাউত, অরবিন্দ সাওন্তের মতো মহারাষ্ট্রের সাংসদরা৷ 

শপথ অনুষ্ঠানে প্রথম চমক সুষমা স্বরাজের৷ হিন্দি বা ইংরাজি নয়, শপথ নিলেন সংস্কৃতে৷ উমা ভারতী, হর্ষবর্ধনও যেন সংস্কৃতেই সাবলীল৷ প্রোটেম স্পিকার কমল নাথ বৃহস্পতিবার প্রথম শপথবাক্য পাঠ করান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে৷ দ্বিতীয় সাংসদ হিসাবে শপথবাক্য পাঠ করেন লালকৃষ্ণ আদবানি৷ তৃতীয় সনিয়া গান্ধী৷ সনিয়া যখন শপথ নিচ্ছেন, তখন সে দিকে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী৷ শপথ নিয়েই সনিয়া মোদীর দিকে দু-পা এগিয়ে নমস্কার করলেন৷ মোদীও জানালেন প্রতিনমস্কার৷ বুধবার যখন মোদী ও সনিয়া শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন, তখন সেটা ছিল লোকসভার অধিবেশন বসার আগে৷ তাই সেটা লোকসভা টিভির ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি হয়নি৷ কিন্ত্ত এ দিন শুভেচ্ছা বিনিময় ফ্রেমবন্দি হল৷ সনিয়া-মোদী নমস্কার বিনিময় যখন হচ্ছে, তখন মানেকা গান্ধী গম্ভীর ভাবে ফাইল দেখছেন৷ পরে মানেকা শপথ নিয়ে যখন সই করতে যাচ্ছেন, তখন নমস্কার বিনিময় দূরের কথা, সনিয়ার দিকে ফিরেও তাকালেন না৷ নেহরু গান্ধী পরিবারের দুই বউয়ের আকচাআকচি যথারীতি স্বমহিমায়৷ 

সুরেন্দ্রনগরের বিজেপি সাংসদ দেবজিভাই ফতেপুরা মাথায় গেরুয়া পাগড়ি পরে একেবারে গুজরাতের বিশেষ পোশাক ঝাব্বায় সংসদে এসেছিলেন৷ সংসদে ঢোকার আগে টিভি ক্যামেরার অনুরোধে তিনি বেশ কয়েকপাক গুজরাটি নাচ নাচলেন৷ ভোজপুরি সুপারস্টার মনোজ তিওয়ারি সম্ভবত একমাত্র সাংসদ, যিনি কাগজ না-দেখে পুরো শপথবাক্য নিখুঁত ভাবে বললেন৷ স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করার অভ্যেস তিনি ছাড়েননি৷ আন্দামান নিকোবরের বঙ্গসন্তান সাংসদ বিষ্ণুপদ রায় হিন্দিতে শপথ নিলেও এসেছিলেন একেবারে ধুতি-পাঞ্জাবির খাঁটি বাঙালি পোশাকে৷ ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছিলেন আদবানি এবং কীর্তি আজাদও৷ 

বস্ত্তত রাজস্থানি, গুজরাটি, বাঙালি, সাঁওতালি, হিমাচলি, পাঞ্জাবি পোশাকের রঙে লোকসভা ছিল রীতিমতো রঙিন৷ বিজেপির প্রচুর সাংসদ গেরুয়া রঙের পোশাক পরে এসেছিলেন৷ প্রথমে মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শপথ নেন৷ তার পর রাজ্য ধরে ধরে সাংসদদের ডাকা হয়৷ তাই ওয়েস্ট বেঙ্গল বা পশ্চিমবঙ্গের নাম সব শেষে আসে৷ অবশ্য তার অনেক আগে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শপথ হয়ে গিয়েছে৷ তিনি শপথবাক্য পাঠ করেন হিন্দিতে৷ তাঁর নির্বাচনকেন্দ্রে প্রচুর হিন্দিভাষী৷ হয়তো তাঁদেরই জন্য সুদীপের হিন্দিপ্রেম৷ ইংরাজিতে শপথ নিলেন মুনমুন সেন, সৌগত রায়, সুগত বসু, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা৷ আর বাংলাকে বেছে নিয়েছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস পাল, শতাব্দী রায়, ইদ্রিশ আলি, সুব্রত বক্সি, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, রত্না দে নাগ, সন্ধ্যা রায়, শুভেন্দু অধিকারী, শিশির অধিকারীরা৷ 

বিজেপিতেও প্রচুর তারকা সাংসদ৷ তাঁরা অবশ্য হিন্দিতেই শপথ নিয়েছেন৷ কিরণ খের বলছিলেন, 'আমি পাঞ্জাবিতেও শপথ নিতে পারতাম৷ কিন্ত্ত হিন্দিতেই নিলাম৷ ঠিক করে নিয়েছিলাম, ইংরাজিতে নেব না৷' মোদী এবং সনিয়াও হিন্দিতেই শপথ নিয়েছেন৷ মোদী তো এখন বিদেশি অতিথিদের সঙ্গেও হিন্দিতেই কথা বলছেন৷ সঙ্গে থাকছেন ইন্টারপ্রেটার বা অনুবাদক৷ এর সঙ্গে একটা রেকর্ডও তৈরি হয়ে গেল৷ ৫৩৯ জন সাংসদের মধ্যে ৫১০ জনই বৃহস্পতিবার শপথ নিয়ে নিয়েছেন৷ এত জন সাংসদ একসঙ্গে এর আগে কখনও শপথ নেননি৷ বেশ একটা স্বদেশি ভাব উঠেছে লোকসভায়৷ কতদিন থাকবে কে জানে!

পাতোদের জন্য শোকগাথা নেই ব্রাজিলে

পাতোদের জন্য শোকগাথা নেই ব্রাজিলে

, Ei Samay

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

রিও দে জেনেইরো: গাড়ির জানলা দিয়ে যতদূর চোখ যায়, আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম একটা মুখ দেখার জন্য৷

কোপাকাবানার রাত জাগা সৈকতের সাজানো স্টলগুলোর গায়ে৷ মারাকানা স্টেডিয়াম লাগোয়া রাস্তাগুলোর হোর্ডিংয়ে৷ ক্রাইস্ত দে রিদিমারের ঠিক নীচের পাহাড়ের দীর্ঘ দুটি টানেলের ধারেকাছে৷নেই সেই মুখ৷ মধুবনী চিত্রকলাকে মনে করিয়ে দেওয়া, রিওর রাস্তার সেই বিশ্বখ্যাত দেওয়াল লিখনগুলোতেও নেই তো!

হাসবে আর বড় দাঁত, উচ্চকিত মাড়ির আলোয় কুত্‍সিততম মুখ হয়ে উঠবে সুন্দর৷ নাহ, সেই মুখ সারা দিন খুঁজেও পেলাম না ব্রাজিল ফুটবলের সেরা নগরে৷

ঝুপ করে যেন কোথায় হাওয়াই হয়ে গিয়েছেন রোনাল্দিনহো৷ এসি মিলান স্পনসরদের সৌজন্যে একবারের জন্য দেখা দিয়েছেন কাকা৷ কথা বলেছেন৷ কিন্ত্ত রোনাল্দিনহো... মাঝে মাঝে দু'একটা টুইট, বেশ৷ সেই কবে তাঁর বাড়ি বিশ্বকাপের সময় ভাড়া দেওয়ার টুইট করে খবর হয়েছিলেন৷ সেই শেষ৷

বিশ্বকাপের আগে, কী বলব, ও ভাবে লেখাটা ঠিক হবেও কিনা বুঝতে পারছি না, মৃত্যু মিছিল যেন শুরু হয়েছে ব্রাজিলে৷

মৃত্যুমিছিলই৷ গত এক বছরে মারা গিয়েছেন ১৯৫৮র বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দলের চার স্তম্ভ৷ জুলাইয়ে দালমা সান্তোস৷ অগস্টে জিলমার ও দে সর্দি৷ নভেম্বরে গ্যারিঞ্চার একমাত্র বন্ধু ফুটবলার নিলতন সান্তোস৷ ক'দিন আগে রক্তবমি হয়ে মারা গেলেন গ্যারিঞ্চার মতো পানাসক্ত, চুয়াত্তর বিশ্বকাপের তারকা মারিনহো চাগাস৷ রিওতে পা দিয়েই শুনলাম, হেলিকপ্টার ভেঙে মারা গিয়েছেন রোনাল্ডিনহোর শহরের ক্লাব ইন্তারনাশিওনালের ফুটবলার ফের্নান্দাও৷ বিশ্ব ক্লাব কাপ জেতা ফের্নান্দাওকে অনেকে বলত, ইন্তারনাশিওনালের সর্বকালের ফুটবলার৷

কত বয়স হয়েছিল আর! ছত্রিশ মাত্র৷

আর বিশ্বকাপের দেশে পা রাখার পরে মনে হচ্ছে, এই অনন্ত মৃত্যুমিছিলে নাম লিখে ফেলেছেন আরও কমবয়সী মুখ৷ বিশ্বকাপের টিম থেকে বাদ পড়ার পরে৷

রোনাল্দিনহো, কাকা, রোবিনহো, আলেসান্দ্রো পাতো... এই নামগুলো কমবেশি সবাই জানে৷ কিন্ত্ত বাকিরা? পাওলো এনরিকে গান্সো, লুকাস মোরা, লুকাস লেভা, লিয়ান্দ্রো দামিয়াও, ফেলিপে লুইস, জাদসন৷

বিশ্বকাপের তীব্র হাওয়ায়, বিক্ষোভ ও সমর্থনের ভাগাভাগির আলোচনায় কারও জন্যই শোকগাথা নেই৷ তবু এঁদের মধ্যে গান্সো ও পাতোর হারিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেদনার৷ চার বছর আগের বিশ্বকাপে কোচ দুঙ্গাকে সবচেয়ে কথা শুনতে হয়েছিল গান্সোকে বাদ দেওয়ার জন্য৷ গান্সো তখন কাকার বিকল্প৷ কাকার মতো তাঁর খেলার স্টাইল৷ নেইমারের চেয়ে দু'বছরের বড়৷ এখানে সাংবাদিকদের কাছে শুনলাম, ২০১৪ বিশ্বকাপের ড্রয়ের সময় দেশের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ ছবি তুলেছিলেন তিন জনের সঙ্গে৷ নেইমার, গান্সো ও লুকাস মোরা৷ এখন কোথায় নেইমার, কোথায় বাকিরা?

লুকাস তবু প্যারিস সাঁ জাঁর হয়ে গোটা বিশ্বকে দেখাতে পারবেন নিজেকে৷ আতলেতিকো মাদ্রিদে খেলেই ইউরোপে জনপ্রিয় হবেন মিরান্দা বা ফেলিপে লুই৷ কিন্ত্ত নেইমারের পর সান্তোসের সেরা ফসল, 'নতুন কাকা' গান্সো পরের পর চোটে বিপর্যস্ত৷ এখন খেলেন সাও পাওলোতে৷ পাতোর মতোই খবর থেকে হারিয়ে গিয়েছেন৷ বিশ্বাসই হয় না, শেষ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের দশ নম্বরের জার্সির মালিক ছিলেন গান্সো৷

পাতোও সেই সাও পাওলোতে৷ খেলার সুযোগ পান না৷ সাত বছর এ সি মিলানে খেলার সময় এমন স্টারডম পেয়েছিলেন যে সিলভিও বার্লুসকোনির মেয়ে তাঁর সঙ্গে ডেট করেছিলেন৷ গান্সোর হারিয়ে যাওয়ার কারণ চোট হলে, পাতোর অধঃপতনের কারণ নৈশজীবন৷ কখনও ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রী স্তেফানি ব্রিতোকে কোপাকাবানায় হইহই করে বিয়ে করেছেন৷ কোনওদিন মিস ব্রাজিল দেবোরার সঙ্গে ডেট করেছেন৷ মাত্র চব্বিশেই হারিয়ে যাওয়ার মুখে৷

এখানে এসে শুনলাম, বিশ্বকাপ নিয়ে নানা মার্কেটিংয়ের মধ্যে হুন্ডাই আর ফক্সওয়াগন গাড়ির কর্তাদের যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে৷ ১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে যাঁরা গাড়ি কিনবেন, ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতলে তাঁদের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড ৫ থেকে ৬ বছর হয়ে যাবে! ফক্সওয়াগন কর্তারা যা দেখে ক্ষিপ্ত৷ তাঁদের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, আমাদের কার পার্টনার ফক্সওয়াগন থাকতে আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টিতে হাত দেয় কী করে হুন্ডাই?

এত এত বিজ্ঞাপন-তাতে নেইমারেরই দখল৷ সাও পাওলোর এই দুই প্রতিভাবান ফুটবলারের কোনও দাম নেই৷ বিশ্বকাপের হাওয়ায় আড়ালে চলে গিয়েছেন এ দেশের দুই প্রবীণতম ফুটবল ব্যক্তিত্ব৷ ব্রাজিল ফুটবলকে বিশ্বের আলোয় আনার অন্যতম কারিগরের দেশের মাঠের বিশ্বকাপেই অন্ধকারে৷ জনসমক্ষে নেই বহুদিন৷ ২৪ বছর ফিফার একচ্ছত্র সম্রাট, ৯৮ বছরের খোয়াও হাবেলাঞ্জ এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন হাসপাতালে৷ ব্লাটারের আগে ফিফার চাবিকাঠি ছিল তাঁরই৷ আর আজই দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটিয়ে বাড়ি ফিরলেন দু'বারের বিশ্বজয়ী কোচ ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফুটবলার মারিও জাগালো৷ ছেলে বলছেন, বাবার অন্য কোথাও না হোক, অন্তত মারাকানায় সব খেলা দেখতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে৷

জাগালোর ইচ্ছেপূরণ হোক৷ ফুটবলার ও কোচ মিলিয়ে তাঁর মতো বিশ্বকাপে সাফল্য ব্রাজিলে কার আছে? কিন্ত্ত ফুটবলের বিস্তীর্ণ রাজপথের পাশে বিশ্বকাপের দেশে ফাবেলার মতো বিষণ্ণতা জাগিয়ে যাচ্ছে বছর চব্বিশের গান্সো ও পাতোর হারিয়ে যাওয়া৷

কোপাকাবানা, ইপানেমা-রিওর দুই বিশ্বখ্যাত সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ হারিয়ে গিয়েও ফিরে আসছে৷ যা হয়৷ যা হয়ে থাকে৷ গান্সো ও পাতোর কী হবে? ঢেউ হয়ে ফিরে আসবেন?

‘ব্রাজিলের দুঃখ’-র কলঙ্ক মোছাতে মরিয়া সেসার


‘ব্রাজিলের দুঃখ’-র কলঙ্ক মোছাতে মরিয়া সেসার


, Ei Samay


রিও দে জেনিইরো: সারা ব্রাজিল যাঁকে সারা জীবনে ঘৃণার চোখেই দেখে এসেছে, সেই প্রয়াত বারবোসা নাসিমেন্তোর 'কলঙ্ক' মোছাতে এ বার বদ্ধপরিকর জুলিউ সেসার৷ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলকিপার৷

১৯৫০ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে ১-২ গোলে হেরে খেতাব জিততে পারেনি ব্রাজিল৷ মারাকানা স্টেডিয়ামে সে দিন প্রায় দু'লক্ষ স্টেডিয়ামের সামনে ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে গিয়েও তা ধরে রাখতে পারেনি ব্রাজিল৷ দ্বিতীয়ার্ধে দুটি গোল হজম করতে হয়েছিল৷ যার মধ্যে দ্বিতীয় গোল খাওয়ার ক্ষেত্রে বারবোসার দোষ ছিল৷ উরুগুয়ের উইঙ্গার আলসাদেস যখন বক্সের সামনে চলে আসেন, তখন নিজের জায়গায় ছিলেন না বারবোসা৷ ফলে গোল খেতে হয়, এবং ব্রাজিল হারে৷ লক্ষ-লক্ষ ব্রাজিলীয়র স্বপ্ন মুছে যায়৷

এই গোল খাওয়ার পর থেকেই ব্রাজিলে কার্যত একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন এই গোলকিপার৷ তাঁকে চিহ্নিত করে ফেলা হয়েছিল 'ব্রাজিলের দুঃখ' হিসেবে৷ এমনকি কুসংস্কারবশত ফুটবলের কোনও অনুষ্ঠানেও তাঁকে ডাকা হত না৷ এমন অবস্থায় ভাস্কো দা গামা দলে তিনি আরও বেশ কয়েক বছর খেললেও প্রতিপদে তাঁকে অপমান সইতে হত৷ এমনকী বর্ণবিদ্বেষের শিকারও হয়েছিলেন তিনি৷ এখানেই শেষ নয়, ১৯৯৩ সালে ব্রাজিল যখন উরুগুয়েকে হারিয়ে ১৯৯৪-এর বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, তখন সেই টিমের গোলকিপার তাফারেলকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন বারবোসা৷ কিন্ত্ত তত্‍কালীন ম্যানেজার তাঁকে শিবিরে ঢুকতে দেননি কুসংস্কারের জন্য৷ দেশের প্রেসিডেন্ট রিকার্দো তেক্সেইরার আপত্তিতে ব্রাজিল টিমের ম্যাচের রেডিও কমেন্ট্রি করতে দেওয়া হয়নি এই গোলকিপারকে৷ ২০০০ সালের এপ্রিলে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আক্ষেপ করে ৭৯ বছর বয়সী এই গোলকিপার বলেছিলেন, 'ব্রাজিলের আইনে আছে, আজীবন নির্বাসন ৫০ বছরের জন্য৷ এটাই সর্বোচ্চ শাস্তি৷ কিন্ত্ত আমি তো ৬০ বছর ধরে শাস্তি ভোগ করলাম৷ জানি না আমার এই কলঙ্ক কোনও দিন মুক্ত হবে কি না৷'

১৯৫০ সালের পর ২০১৪৷ ৬৪ বছর পর ব্রাজিলের মাঠে ফের বিশ্বকাপ৷ আর বারবোসার সেই কলঙ্কমোচনের দায়িত্ব এ বার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন ব্রজিলের ৩৪ বছর বয়সী গোলকিপার জুলিউ সেসার৷ কয়েক এক সাক্ষাত্‍কারে তিনি বলেছেন, 'কোনও ফুটবলারই ইচ্ছা করে ম্যাচ হারায় না৷ কেন যে বারবোসাকে আমার দেশের মানুষ সারা জীবন ভিলেন করে রেখেছিল, তা অন্তত আমি বুঝতে পারিনি৷' বারবোসার কষ্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, '১৯৯৮য়ে আমি তখন সবে ফ্ল্যামিঙ্গো ক্লাবে যোগ দিয়েছি, তখন একদিন মারাকানাতে আমাদের প্র্যাক্টিসের পর কেউ এসে বলেন, তোমাকে একজন খুঁজছেন৷ গিয়ে দেখি বারবোসা৷ উনি আমায় বলেছিলেন, তুমিও গোলকিপার৷ বোধহয় আমার মনের কষ্টটা বুঝতে পারবে৷ আমি ওঁর কান্নাভেজা মুখটা দেখে বলেছিলাম, যদি কোনও দিন সুযোগ পাই আপনার কলঙ্ক মোছার চেষ্টা করব৷' তখনও ঠিক হয়নি, ব্রাজিলে বিশ্বকাপ হবে৷ সেসারও দেশে মাঠের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবেন৷ সেসার বলেছেন, 'গত বছর কনফেডারেশন কাপের খেলায় উরুগুয়েকে হারিয়েই আমরা ফাইনালে উঠেছিলাম৷ আমি ফোরলানের পেনাল্টি বাঁচিয়ে ছিলাম৷ টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারও হয়েছিলাম৷ তখনই মনে হয়েছিল প্রয়াত বারবোসার আশীর্বাদ আমার সঙ্গে রয়েছে৷ আর এটা নিয়েই ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলতে নামছি৷ এ বার আমরা কাপ জিতব৷ ৬৪ বছর আগের দুঃখ-কলঙ্ক মুছবই৷'

সেসার ২০১০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলে প্রচন্ড সমালোচিত হয়েছিলেন৷ কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল হারে নেদারল্যান্ডসের কাছে৷ স্নেইডারের করা দ্বিতীয় গোলটি খাওয়ার জন্য দায়ী করা হয় সেসারকেই৷ সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে গত বছর তিনি দেশকে কনফেডারেশন্স কাপ জেতান৷ আর এ বার জেতাতে চান বিশ্বকাপ৷ দলের কোচ স্কোলারির ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সেসার বলেছেন, 'উনি গত বছর থেকে আমাকে যে ভাবে উত্‍সাহ দিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন, কাপ জিতে আমি তার মূল্য দিতে চাই৷'

সব মিলিয়ে এ বার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এক কলঙ্কিত নায়কের কলঙ্ক মুছে দিতে মরিয়া আর এক গোলকিপার৷

স্টেডিয়ামে নয় ভুভুজেলার বিকল্প কাক্সিরোলা


স্টেডিয়ামে নয় ভুভুজেলার বিকল্প কাক্সিরোলা


, Ei Samay

সাও পাওলো: ভুভুজেলার বিকল্প হিসেবে যে কাক্সিরোলা নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন ব্রাজিলের সমর্থক, সেটা ভেঙে গেল ফিফার নিয়মে৷ শুধু কাক্সিরোলা নয়, এমনকি বেশি পরিমাণে কাগজ নিয়েও ঢোকা যাবে না স্টেডিয়ামে৷ এ রকমই ২৪টি পদার্থের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল ব্রাজিল বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামে ঢোকার ক্ষেত্রে৷

২০১০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভুভুজেলা নতুন একটা আমেজ তৈরি করেছিল৷ অনেকের কাছেই সারাক্ষণ ভুভুজেলার শব্দ ছিল কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো৷ সারাক্ষণ ভোঁ ভোঁ শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন দর্শকরা৷ এমনকি হোটেলে বা বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরও কানে সেই শব্দটা লেগে থাকত৷ তা ছাড়া রেফারির সঙ্গে সহকারী রেফারিদের কথাবার্তায় অসুবিধা তৈরি করত প্রচণ্ড আওয়াজ৷ সে সব ভেবেই ফিফা এ বার শব্দবাদ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসছে৷

পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনও রকম ড্রাম, বাঁশি, বিউগল নিয়ে ঢোকা যাবে না স্টেডিয়ামে৷ তাই ভক্তদের ভরসা এ বার নিজের গলাই৷ অনেকে মনে করছেন, এতে নতুন কিছু গান শোনার সম্ভাবনা বাড়ল৷

ব্রাজিলে কার্লিনহোস ব্রাউন তৈরি করে ফেলেছিলেন কাক্সিরোলা নামের একটি শব্দ যন্ত্র৷ উদ্দেশ্য ছিল, ভুভুজেলার মতো বিরক্তিকর শব্দ তৈরি না করলেও, ফুটবল স্টেডিয়ামে অন্য একটি মাত্র এনে দেবে কাক্সিরোলার শব্দ৷ সেলেকাও সমর্থকদের ধারণা ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার ভুভুজেলার মতো, কাক্সিরোলা ব্রাজিল বিশ্বকাপের একটি ট্রেডমার্কে পরিণত হবে৷ ফিফাই জল ঢেলে দিল সেই ভাবনায়৷

শব্দবাদ্য ছাড়াও নিষেধাজ্ঞা থাকছে আরও অনেক জিনিসেই৷ যার মধ্যে আছে লেজার থেকে বড় পোস্টার, বেশি পরিমাণ কাগজ থেকে ছাতা, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট৷

রামোস যেন জানতেন


রামোস যেন জানতেন


, Ei Samay


অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

চার বছর আগের কথা৷ জোহানেসবার্গের রাস্তায় বেরোনো দায়৷ কনকনে ঠান্ডা৷ কখনও এক ডিগ্রি, কখনও দু' ডিগ্রি৷ কান ঢাকা টুপি, গ্লাভস পরেও মনে হচ্ছে ঠান্ডা যেন হাড়ে গিয়ে ঠেকছে৷

বিশ্বকাপ ফাইনালের একদিন আগে স্পেন টিমের সাংবাদিক বৈঠক৷ জোহানেসবার্গ থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে, পচেস্ট্রূমে৷ সেখানকার সাউথ-ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পেন শিবির করেছিল৷ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে রাগবি মাঠ৷ মাঠের পাশেই স্পেনের মিডিয়া সেন্টার৷ সেখানে কোন ফুটবলার আসবেন? নাকি কোচ বিসেন্তে দেল বোস্কে নিজে আসবেন? তা নিয়ে জল্পনার শেষ ছিল না সাংবাদিক মহলে৷

ঠিক ছিল সকাল দশটায় ছিল সাংবাদিক বৈঠক শুরু হবে৷ কিন্ত্ত সাড়ে দশটা, এগারোটা বেজে গেলেও কারও দেখা ছিল না৷ কিছু পরে জানা গেল, আসবেন স্পেনের দুই ফুটবলার কার্লোস মার্চেনা ও সের্খিও বুসকেতস৷ শুনে বিশ্বের অধিকাংশ সাংবাদিকের মুখ শুকনো৷ আরও বড় তারকাকে পাওয়া যাবে না? সেই দুই ফুটবলার এলেন৷ মামুলি কিছু কথাবার্তা৷ তা দিয়ে কলকাতার কাগজে এক লাইনও লেখা যায় না৷ ঘড়ির কাঁটা অনুয়ায়ী ভারতে তখন রীতিমতো সন্ধ্যা৷

কী করি? ছেলেবেলায় প্রশ্নের উত্তর না পারলে যেমন পেন্সিল চিবোতাম৷ এই সাংবাদিক বৈঠক সেরে বেরিয়েও যেন সেই দশা৷ সামনের ল্যাপটপের ফাঁকা স্ক্রিন যেন গিলে খেতে আসছে৷ হঠাত্‍ দেখি ক্যামেরাম্যানরা কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ছুটে বাইরে যাচ্ছেন৷ কলকাতার সাংবাদিকরাও ছুটলাম৷ বাইরে গিয়ে দেখি পনিটেল করা সের্খিও রামোস৷

যুবভারতীতে বড় ম্যাচ খেলার পর আমরা যেভাবে রহিম নবি-মেহতাবদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলি, সে ভাবেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন রামোস৷ একটু ভয় হচ্ছিল, ইংরেজি বলতে পারেন তো! কপাল ঠুকে ইংরাজিতে প্রশ্ন করলাম৷ স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা কতটা? আমাকে অবাক করে দিয়ে রামোসের ইংরেজিতে জবাব, 'হান্ড্রেড পারসেন্ট৷' তারপর স্প্যানিশ সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরলেন৷ আমি আর পাত্তা পাচ্ছি না৷ তাও ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম৷ ধৈর্য্য ধরতে না পেরে প্রশ্ন করলাম, জেতার পর আপনাদের বিজয়োত্‍সব কী ভাবে পালন করবেন? উত্তর এল স্প্যানিশে৷ পাশের এক স্পেনীয় সাংবাদিক কানে কানে ইংরেজিতে বললেন, 'উত্তর দিয়েছে৷ একটু অপেক্ষা করুন৷ আমিই বলে দেব৷' নিশ্চিন্ত হলাম৷

রামোস চলে যেতেই স্পেনের সেই সাংবাদিক উত্তরটা শুনিয়ে দিলেন৷ আশ্বস্ত হয়ে ফিরে আসছি৷ একটু দূরে আবার ভিড়৷ সেখানেও গিয়ে দেখি কার্লোস পুজোল৷ আসলে রামোসের মতো পুজোলও এসেছিলেন পাশের স্পেনীয় টিভিতে ইন্টারভিউ দিতে৷ কথাবার্তা চলছিল স্প্যানিশে৷ দাঁড়িয়ে শুধু দেখলাম ঝাঁকড়া চুলের পুজোলকে৷ দেখছিলাম বার্সেলোনা তারকার 'সিক্স প্যাক'৷

দুই ফুটবলারই চলে যাওয়ার পর, সে দেশের সাংবাদিকরা আমাদের সব কিছু তর্জমা করে দিলেন৷ সেখানে স্পেনের ফুটবলের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের ফুটবলের সম্পর্ক উঠে এল৷ উঠে এল রাইনাস মিশেলসের টোটাল ফুটবল৷ যোহান ক্রুয়েফের পাসিং ফুটবলের থেকে জন্ম আজকের 'তিতিতাকা৷' রামোস ও পুজোলের কথায় উঠে এসেছিল সেই ফুটবলেরই আলোচনা৷ তাঁদের কথা শুনে বোঝা গিয়েছিল, জয়ের ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই তাঁদের৷ সেই রিপোর্ট লিখে কলকাতায় পাঠানোর পর মনে পড়ল, সকালে এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়েছি৷ বিকেল চারটে বাজে, চারদিকে শুনশান৷ এক জন বিদেশি সাংবাদিকও নেই৷ বসে শুধু আমরা কয়েক জন কলকাতার সাংবাদিক৷

বিশ্বকাপের গল্প বলতে গেলে শেষ হওয়ার নয়৷ ২০০৬ জার্মানির বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালি- ফ্রান্স ম্যাচ দেখতে বসেছি বার্লিনে৷ হঠাত্‍ই দেখলাম, রেফারি চতুর্থ রেফারির কাছে দৌড়ে গেলেন৷ তারপর জিদানকে লাল কার্ড দেখালেন৷ কিন্ত্ত কেন? আশপাশে বসে কলকাতার সাংবাদিকরা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন৷ কেউ বলতে পারছেন না৷ মাঠের জায়ান্ট স্ত্রিনের দিকে তাকিয়ে সকলেই৷ সেখানে তখন জিদানের মাঠ ছেড়ে বেরোনোর দৃশ্য দেখাতে ব্যস্ত৷ আসলে মাঠের টিভিতে কোনও দিন ফাউলের রিপ্লে দেখায় না৷ এতে মাঠে উত্তেজনা ছড়াতে পারে বলে৷ বিশ্বকাপের প্রেস বক্সে কিছু কিছু ডেস্কে টিভি থাকে৷ কিন্ত্ত ভারতীয় সাংবাদিকরা সব সময় টিভিওয়ালা ডেস্ক পান না৷ সেদিন ফাইনালেও পাননি৷ বসতে হয়েছিল সাধারণ চেয়ারে, দর্শকদের ভিড়ে৷ বুঝতে পারছিলাম, বড় কিছু একটা হয়েছে৷ কিন্ত্ত কী হয়েছে? সত্যি বলছি, মাঠে বসে তখনও বুঝতে পারিনি৷ পরে মিডিয়া সেন্টারে এসে টিভিতে দেখলাম সেই জিদানের ঢুঁসো৷
কেন খেয়াল করতে পারলাম না? এই প্রশ্নটা আজও আমায় তাড়া করে ফেরে৷


বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলার ছবি ‘হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগ’

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলার ছবি ‘হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগ’
, Ei Samay

অভিষেক সেনগুপ্ত

কলকাতা থেকে সাও পাওলোর এরিনা কোরিন্থিয়ান্স! নরেন্দ্রপুর থেকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান! বাংলা আর বাঙালি হইহই করে ঢুকে পড়তে চলেছে ব্রাজিল বিশ্বকাপে!

১২ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনের ঠিক পরেই ব্রাজিল আর ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ৷ উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর আগে কোরিন্থিয়ান্স স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছেয়ে ফেলবে এক বিশাল পতাকা৷ যার নাম 'হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগ'৷ সারা বিশ্বের নানা দেশের ফুটবল খেলার মুহূর্তের নানা কোলাজ নিয়ে তৈরি হচ্ছে সেই ফ্ল্যাগ৷ ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেই বিশ্ব পতাকায় জায়গা পেতে চলেছে খাস বাংলার ফুটবল মুহূর্তের ছ'টা ঝলমলে ছবি৷ একটি নামী ফুটবল ওয়েবসাইট 'গোলডেন টাইমস'এর নির্বাচিত ছবি ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে ফিফা৷

ওই ওয়েবসাইটের সাংবাদিক ইন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় দিল্লি থেকে ফোনে বলে দিলেন, 'জীবনের সেরা স্বীকৃতি বলতে পারেন৷ আমরা ভাবিনি যে আমাদের পাঠানো ছবি অন্য দেশগুলোর সঙ্গে হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগে জায়গা পাবে৷' বিশ্বকাপে 'হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগ' এই প্রথম৷ ব্রাজিল বিশ্বকাপের অন্যতম স্পনসর কোকাকোলাই এ বার নিয়েছে এই উদ্যোগ৷ ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের আগে যে পতাকা তুলে ধরা হবে গ্যালারিতে৷

হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগে কী ভাবে জায়গা পেল বাংলার ছবি?

গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব শান্তি দিবসে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল 'গোলডেন টাইমস'৷ সঙ্গে ২৫ জন অনাথ শিশুকে নিয়ে দিনভর নানা কর্মসূচি৷ জার্সি দেওয়া থেকে শুরু করে তাদের ফুটবল কোচিংও দেওয়া হয়৷ ওই দিনই ফুটবল ম্যাচের ছ'টি কোলাজ তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগের উদ্যোক্তা কোকাকোলাকে৷ বহু দেশের মধ্যে তারাই বেছে নিয়েছে বাংলার ফুটবল আবেগের নিখাদ কিছু ছবির কোলাজ৷

ইন্দ্রনাথবাবু বলছিলেন, 'আমরা ছবিগুলো পাঠিয়ে এক প্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম৷ ভাবিনি যে, হ্যাপিনেস ফ্ল্যাগে জায়গা পেতে পারি৷ কিন্ত্ত কয়েক দিন আগে জানতে পেরে আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছি৷ বিশ্বকাপের মতো আসরে বাংলার ফুটবল যে জায়গা পাবে, এটাই বিরাট ব্যাপার৷ তাও কিনা হ্যাপি ফ্ল্যাগে৷'

এত উচ্ছ্বাসের মধ্যেও হতাশা কম নেই৷ 'গোলডেন টাইমসের' তরফ থেকে বিশ্বকাপের উদ্বোধনে হাজির থাকতে পারবেন না ইন্দ্রনাথবাবুরা৷ তাঁরা গিয়ে পৌঁছবেন দু'দিন পর৷ কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই ইন্দ্রনাথবাবু বলছিলেন, 'ভেবেছিলাম, বিশ্বকাপ উদ্বোধনের দিনেই থাকব সাও পাওলোতে৷ কিন্ত্ত সেটা হচ্ছে না৷ দু'দিন পরে গিয়ে পৌঁছব৷' একটু থেমে ফের জুড়ে দিলেন, 'আমরা না থাকি, আমাদের ছবি তো থাকছে বিশ্বকাপে৷'

শুধু কি ছবি, বাংলা আর বাঙালিও মিশে যেতে চলেছে ব্রাজিল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আবেগে -উন্মাদনায় !এই সেই ছবির কোলাজ৷ যা স্বীকৃতি পেয়েছে ফিফার স্পনসরের ওয়েবসাইটে৷

মারাদোনার শেষ ম্যাচ, বেকেনবাউয়ারের বিয়ের শুভেচ্ছা

মারাদোনার শেষ ম্যাচ, বেকেনবাউয়ারের বিয়ের শুভেচ্ছা

, Ei Samay

অমিত সেন

জার্মানির লিপজিগে আর্জেন্তিনা-মেক্সিকোর বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ দেখছি গ্যালারিতে বসে৷ ৯০ মিনিট পর্যন্ত ম্যাচ ড্র৷ গোটা গ্যালারি উত্তেজনায় ফুটছে৷ আমরাও ব্যতিক্রম নই৷ ঠিক সেই সময়ই ভয়ঙ্কর চিন্তাটা মাথায় ঢোকাল আমার কলকাতার বন্ধু৷ বলল, 'ম্যাচ তো অতিরিক্ত সময়ে চলে গেল৷ তারপর টাইব্রেকারও হতে পারে৷ বাড়ি ফিরব কী করে?' এই পরিস্থিতিতে এমন ভাবনা বোধহয় আমরা কলকাতার লোকেরাই ভাবতে পারি!

ওর এটা বলার কারণও আছে৷ ম্যাচটা আমরা দেখতে এসেছিলাম বার্লিন থেকে৷ সে বার বার্লিনই ছিল আমাদের বেস ক্যাম্প৷ এসেছিলাম বাসে৷ মনে আছে, বাস চালক যখন শুনলেন, আমরা খেলা দেখতে যাচ্ছি, টিকিটের পয়সা নিলেন না৷ কিন্ত্ত ফেরার কথা ছিল ট্রেনে৷ টিকিটও কাটা ছিল৷ রাত এগারোটায় শেষ ট্রেন ছিল৷ কিন্ত্ত খেলা যখন শেষ হল, তখনই প্রায় এগারোটা বাজে৷ তা-ও অতিরিক্ত সময়ে রদরিগেস গোল করে দিয়েছিল বলে ম্যাচ টাইব্রেকারে যায়নি৷ ট্রেন পাব না, জেনেও স্টেশনে এসেছিলাম৷ এসে দেখলাম, এই ম্যাচের জন্য টাইম টেবল বদলে ফেলা হয়েছে৷ স্টেশনে দাঁড়িয়ে সুন্দরী জার্মানিরা জানিয়ে দিচ্ছেন, কোন ট্রেন কখন ছাড়বে৷ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম আমরা৷

ঘটনাটা শুরুতেই বললাম কারণ, এ বার ব্রাজিল যাওয়ার আগেই মোট চারটে বিশ্বকাপ দেখা হয়ে গিয়েছে৷ সেই আমেরিকা থেকে শুরু৷ মাঝে কোরিয়া-জাপানটা শুধু যেতে পারিনি৷ এতগুলো দেশে বিশ্বকাপ দেখলেও বলব, মন জয় করেছিল জার্মানি৷ আমি যেখানেই যাই, পরিকাঠামো নিয়ে খুব মাথা ঘামাই৷ এটা আমার কাজের মধ্যেও পড়ে৷ সে দিক সেরা জার্মানি৷ বিশ্বকাপের মতো বড় আসর কী ভাবে চালাতে হয়, প্রতি মুহূর্তে শিখেছি৷

তা ছাড়া জার্মানিকে ভালোবাসার আরও একটা কারণ আছে৷ এখানেই জীবনের অন্যতম সেরা একটা ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম৷ কোনও দিন ভুলব না৷ ঘটনাটা হামবুর্গে৷ ঘুরতে-ঘুরতে হঠাত্‍ দেখা হয়ে গিয়েছিল পিটার ভেলাপ্পানের সঙ্গে৷ ভেলাপ্পান তখন এএফসির সেক্রেটারি৷ আমাকে দেখেই বললেন, 'বিশ্বকাপে যখন এসেছে, শুধু ফুটবল দেখেই সন্ত্তষ্ট থেক না৷ ফিফার হসপিটালিটি কী দেখে যাও৷ আমার অফিসে এস, পাস দিচ্ছি৷' ফিফার হসপিটালিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেটা বলাই বাহুল্য৷ কিন্ত্ত আমার গল্প সেটা নয়৷

ভেলাপ্পনের সঙ্গেই ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম৷ বক্সে যেখানে বসেছিলাম, পিছনে তাকিয়ে চোখ তো কপালে৷ দেখি, বসে রয়েছেন ফিফা সভাপতি শেপ ব্লাটার৷ রয়েছেন বেকেনবাউয়ার৷ তখনকার উয়েফা প্রেসিডেন্ট সুইডেনের লেনার্ট জোহানসন৷ ভেলাপ্পনের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেছিলাম ওঁদের সঙ্গে৷ ভারত থেকে শুধু খেলা দেখতে এসেছি শুনে ওঁরা তো অবাক৷

ওখানে বসেই দেখলাম, প্রায় সবাই এসে বেকেনবাউয়ারকে কী একটা বলছেন৷ মজা করছেন, অভিনন্দনও জানাচ্ছেন৷ তিনি লাজুক-লাজুক মুখে হাসছেন৷ বুঝতে না পেরে ভেলাপ্পনকে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, 'আরে জানো না? বেকেনবাউয়ার সদ্য বিয়ে করেছেন৷ তৃতীয় বিয়ে৷ তাই সবাই মজা করছে৷' কী করি? আমিও তখন অভিনন্দন জানিয়ে এলাম৷

শুধু এটাই নয়৷ বিশ্বকাপে আরও একটা সেরা ঘটনার সাক্ষী আমি৷ ৯৪-এ প্রথমবার আমেরিকা বিশ্বকাপে নাইজেরিয়া-আর্জেন্তিনা ম্যাচ গ্যালারিতে বসে দেখেছিলাম৷ কে জানত, বিশ্বকাপে ওটাই দিয়েগো মারাদোনার শেষ ম্যাচ হবে! তারপরেই সেই বিশ্ব কাঁপানো ডোপ কেলেঙ্কারি৷ মারাদোনা নেই, এটা যেন কেউ ভাবতেই পারছিল না৷ শুধু আর্জেন্তিনা সমর্থকরাই নয়, মন খারাপ হতে দেখেছিলাম অন্য দেশের সমর্থকদেরও৷

আবার সেই আমিই গর্বিত, কারণ কোচ হিসেবে মারাদোনার প্রথম ম্যাচও গ্যালারিতে বসে দেখেছি, গত বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকায়৷ এই বিশ্বকাপ আরও একটা কারণে মনে থাকবে৷ নিজেরা গাড়ি চালিয়ে ঘুরেছিলাম গোটা দেশ৷ তা প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার তো হবেই৷ তিনটে গাড়ি ভাড়া করেছিলাম৷ একটা চালাতাম আমি৷ গাড়ি চালিয়ে এত আনন্দ কোনও দিন পাইনি৷

আর একটা জিনিসও অবাক করেছিল আমায়৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্য দেশের যত মানুষ রয়েছে, তাঁরা সবাই মাঠে গিয়ে নিজের দেশ নয়, চিত্‍কার করত দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে৷ সে ইংল্যান্ডের লোকই হোক বা জার্মানি৷ যে দেশে থাকছে-খাচ্ছে, তার প্রতি বেইমানি করতে পারেনি৷

এটাই বোধহয় বিশ্বকাপের মাহাত্ম্য!
(লেখক কিং ফিশার ইস্টবেঙ্গলের অন্যতম ডিরেক্টর)