Thursday, 15 August 2019

বন্ধু জামশিদকে দেখে আবেগে ভেসে গেলেন মজিদ বাসকার

বন্ধু জামশিদকে দেখে আবেগে ভেসে গেলেন মজিদ বাসকার

 নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দীর্ঘদিন পর প্রিয় বন্ধু জামশিদ নাসিরিকে দেখে আবেগতাড়িত একদা ইস্ট বেঙ্গল জনতার নয়নের মণি মজিদ বাসকার। রবিবার বিকেলে জামশিদ নাসিরি হোটেলে গিয়ে দেখা করেন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে। এক সঙ্গে প্রায় আধ ঘণ্টা কাটান। সেখানে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি থেকে ময়দানে টানা চার বছর খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁদের মধ্যে নানা কথা হয়। ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে মজিদ ও জামশিদ একসঙ্গে খেলেছিলেন ইস্ট বেঙ্গলে। ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে তাঁরা কালো-সাদা জার্সি গায়ে একসঙ্গে খেলেছিলেন। ১৯৮৫ সালে জামশিদ ইস্ট বেঙ্গলে চলে গেলেও মজিদ আরও দু’বছর ছিলেন মহমেডান স্পোর্টিংয়ে। তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য ১৯৮৬ সালে আর তেমনভাবে খেলতে পারেননি মজিদ। এদিনের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে কলকাতায় তাঁদের প্রথম ঠিকানা নটরাজ বিল্ডিংয়ের কথাও। জামশিদ বলছিলেন,‘প্রায় আড়াই দশক বাদে দেখা হল। মজিদের চেহারায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুরানো দিনের অনেক কথাই হল।’
ঠিক ঠিক বিচারে মজিদ ও জামশিদের কলকাতায় প্রথম ক্লাব হওয়ার কথা ছিল মহমেডান স্পোর্টিং। সুলেমান খুরশিদ, হায়দার আলি নস্করদের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের দলবদলের আগে এরফান তাহের- গোলাম মুস্তাফারা (মামা) হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে জিতে যান। ১৯৭৯ সালে ইস্ট বেঙ্গলের বাঙালি ফুটবলারদের সঙ্গে ভিনরাজ্যের খেলোয়াড়দের বিবাদের ফলে ১৯৮০ সালে ভাস্কর গাঙ্গুলি, প্রশান্ত ব্যানার্জি, সুরজিৎ সেনগুপ্তসহ সাত-আটজন ফুটবলার চলে যান মহমেডান স্পোর্টিংয়ে। তাই এরফান তাহের প্রথম সুযোগেই দারুণ দল গড়েছিলেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা মজিদ-জামশিদ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে দারুণ খেলছেন সেই খবর ছিল মহমেডান শিবিরের পরাজিত গোষ্ঠীর কাছে। তাঁরাই ইস্ট বেঙ্গলের তৎকালীন সহ সচিব অরুণ ভট্টাচার্যকে সন্ধান দিয়েছিলেন মজিদ- জামশিদের। লাল-হলুদে ওই দুই বছর মজিদ- জামশিদকে দেখাশোনা করতেন রাজশাহীর ছিন্নমূল পরিরার থেকে ক্লাব প্রশাসনে উঠে আসা অরুণ ভট্টাচার্য, ক্লাবের অন্দরে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘মধুদা’ হিসাবে।
মজিদের সঙ্গে এসেছেন তাঁর এজেন্ট। আছেন ভাইপোরাও। মজিদের রবিবার হোটেলেই বিশ্রাম নেওয়ার কথা ছিল। সন্ধ্যার পর তিনি সিসিএফসি ক্লাবে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। টপ ফর্মে অনেক সময়ে এই ক্লাবেই বাড়তি প্র্যাকটিস করতেন তিনি এবং জামশিদ। শেষোক্তজন তো সিএফসি ফুটবল টিমের সঙ্গে জড়িত। আইএফএ’তে জামশিদ সিএফসি’র সরকারি প্রতিনিধি। বন্ধুর সাহচর্যে রবিবারের সন্ধ্যা বেশ ভালোই কাটল মজিদের।
দমদম বিমানবন্দরে তেহরান থেকে আসা বিমানটির নামার কথা ছিল রাত ২.২০ মিনিটে। কিন্তু ফ্লাইট দেরি থাকায় রাত সোয়া তিনটে নাগাদ তেহরান থেকে আসা বিমানটি দমদম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সিকিউরিটি চেকিংয়ের পর ভোর পৌনে চারটা নাগাদ তিনি দমদম বিমানবন্দর থেকে বের হতেই উদ্বেলিত জনতা জয়ধ্বনি দিতে থাকে তাঁর নামে। বেশ কিছু সমর্থক তাঁর কাছাকাছি চলে আসেন। বেশি রাতে দমদম বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। নিরাপত্তাহীনতার জন্য আবার ভিতরে ঢুকে যান তিনি। এর কিছুক্ষণ পরে আবার বেরিয়ে ভোর রাতে মধ্য কলকাতার হোটেলে ওঠেন ‘আশির বাদশা’।

সুব্রত ভট্টাচার্যই আমার বিরুদ্ধে খেলা সেরা ডিফেন্ডার: মজিদ বাসকর

পিকে ব্যানার্জি বড় বেশি কথা বলতেন
সুব্রত ভট্টাচার্যই আমার বিরুদ্ধে খেলা সেরা ডিফেন্ডার: মজিদ বাসকর
জয় চৌধুরি

 এতদিন পর কলকাতায় এলেন। রবিবার গিয়েছিলেন টপ ফর্মে থাকাকালীন আড্ডার জায়গা সিসিএফসি’তে। আপনার অনুভূতি কীরকম?
মজিদ: কলকাতায় ফের আসব তা আমি এক বছর আগে স্বপ্নেও ভাবিনি। এই বছরের গোড়ায় নতুন করে যোগাযোগ হয়। ইস্ট বেঙ্গলের শতবর্ষে আসার ব্যাপারে ক্লাব থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি প্রথমে খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না। কিছুদিনের মধ্যে কর্তাদের পাশাপাশি বেশ কিছু সমর্থকেরও ফোন পেলাম। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য আর জামশিদও ফোন করেছিল। ভাইপো ফেসবুক দেখে বলল, কলকাতার ফুটবল অনুরাগীরা তোমাকে দেখতে মুখিয়ে আছে। তাই চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
 কলকাতা কতটা বদলেছে?
মজিদ: খুব বেশি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি। আমাদের টপ ফর্মে কলকাতায় এত গাড়ি ছিল না। আর এত ওভারব্রিজও দেখিনি। ফ্লাইওভার-ওভারব্রিজই আমার চোখ টেনেছে। জামশিদের মুখেই শুনলাম, যমুনা সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। ওই হলে অনেক সিনেমা দেখেছিলাম। 
 কলকাতায় ছয়-সাত বছরের ফুটবল জীবনে আপনার প্রতিপক্ষ হিসাবে সেরা ডিফেন্ডার কে?
মজিদ: নিঃসন্দেহে সুব্রত ভট্টাচার্য। তবে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যও বেগ দিয়েছে। মহমেডান স্পোর্টিংয়ে খেলার সময়ে প্রতিপক্ষ হিসাবে ওকে পেয়েছি। এই তালিকায় প্রদীপ চৌধুরিও থাকবে। ও আমার চেয়েও জামশিদের পিছনে বেশি লেগে থাকত। তবে সুব্রত একটু ‘ঝামেলাবাজ ’হলেও প্রচণ্ড বুদ্বিদীপ্ত ছিল (এরপর টেবলে রাখা কফির ফ্লাস্কের ঢাকনা-বোতলের ছিপি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন সুব্রত তাঁকে কীভাবে গার্ড করতেন)। সুব্রত পিছন থেকে সহ খেলোয়াড়দের বলত ‘মজিদ, মজিদ’। 
 আপনার সেরা টুর্নামেন্ট কোনটি?
মজিদ: অবশ্যই ১৯৮০ সালের ফেডারেশন কাপ। রাজনীতি আমি পছন্দ করি না। কিন্তু ১৯৭৯ সালে রাজনীতিই হয়েছিল লাল-হলুদ ফুটবল টিমে। ১৯৮০ সালে ইস্ট বেঙ্গলের সাত ফুটবলার চলে গিয়েছিল মহমেডান স্পোর্টিংয়ের। এখনও মনে আছে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিল। আমি, জামশিদ ও খাবাজি তখন ইস্ট বেঙ্গলে নতুন এসেছি। দলটিকে দাঁড় করাতে আমরা তিনজন বড় ভূমিকা দিয়েছিলাম। আমি ও জামশিদ ছোটবেলা থেকে একই ক্লাবে খেলেছি। তেহরানে আমরা খেলতাম ৪-৩-৩ ছকে। কিন্তু কলকাতায় এসে দেখলাম ৪-৪ -২ ছকে খেলা হচ্ছে। প্রথমে ভড়কে গিয়েছিলাম। আমি হাবিবকে নীচে নেমে আসতে বলি। কোচ পি কে ব্যানার্জি ৪-৪-২ ছকে খেলালেও আমরা চলে যেতাম ৪-৩-৩ ছকে। অনেক ম্যাচে সমর ভট্টাচার্য নামার পর সুধীর কর্মকারও ব্লকারের কাজ করেছে। সেই জন্য টিম ভেঙে খানখান হয়ে গেলেও আমরা ১৯৮০ সালে ডিসিএম ফাইনাল ছাড়া আর কোনও টিমের কাছে হারিনি। ফেড কাপে গ্রুপ লিগের সব ম্যাচ জিতে উঠেছিলাম ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত মোহন বাগানের সঙ্গে যুগ্মজয়ী হয় ইস্ট বেঙ্গল। ইডেনে ফেড কাপ আমাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।’
 সেরা ডার্বি কোনটি?
মজিদ: ভারতে একটা প্রচলিত ধারণা আছে মোহন- ইস্ট ম্যাচে কোনও দল দু’গোলে লিড নিলে সেই দলই জিতবে। ১৯৮০ সালে দার্জিলিং গোল্ড কাপের ফাইনালে মোহন বাগান দু’গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। পুজোর মুখে টুর্নামেন্ট। ইস্ট বেঙ্গল ২-০ গোলে পিছিয়ে আছে দেখে দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতা থেকে যাওয়া অনেক সমর্থক ঘুরতে চলে যায়। সেই দৃশ্যই তাতিয়ে দিয়েছিল আমাকে। শেষ ২০ মিনিটে তিনটি গোল করেছিলাম আমরা। ওটাই সেরা ডার্বি। জামশিদও দারুণ খেলেছিল ওই ম্যাচে (ওই ঐতিহাসিক ম্যাচে মজিদ গোল না করলেও তাঁর পাস থেকে সিডি ফ্রান্সিস, সোমনাথ ব্যানার্জি, জামশিদকে দিয়ে গোল করেন)। এর পাশাপাশি ১৯৮০ সালের রোভার্স কাপে মোহন বাগানের বিরুদ্ধে ডাবল লেগ সেমি-ফাইনালের কথাও বলতে হবে। প্রথম লেগে মোহন বাগান দু’গোলে লিড নিলেও ম্যাচ শেষ পর্যন্ত ২-২ হয়ে গিয়েছিল। পরদিন পিছিয়ে পড়েও জিতেছিলাম আমরা। ওই প্রতিযোগিতায় নিয়মিত খেলা দেখতে আসতেন বলিউডের নামী অভিনেতা দিলীপকুমার। ওঁর সঙ্গে ওখানেই প্রথম আলাপ। ফাইনালে মহমেডানের মুখোমুখি হই আমরা। সেই ম্যাচেও ছিলেন দিলীপকুমার। প্রচণ্ড প্রশংসা করেছিলেন আমার খেলার। আর ১৯৮৪ সালে মহমেডানকে রোভার্সে চ্যাম্পিয়ন করার পর দিলীপকুমার প্রচণ্ড খুশি হয়েছিলেন। সেই স্মৃতি এখনও আমার মনে আছে। মাঝের ৩০ বছর ভারতীয় ফুটবল সম্বন্ধে যে প্রচুর খোঁজ খবর রেখেছি তা নয়। তবে কলকাতায় আসার পর সবকিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এখানেই ফের থেকে যাই। কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। তেহরানে বেসরকারী সংস্থায় কাজ করি দায়িত্বপূর্ণ পদে। দিন পাঁচেকের ছুটি নিয়ে এসেছি। ইদ থাকায় আমার কাজের চাপও কম। এই কথোপকথনের মাঝেই পিকে’র সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন মজিদ।
 পি কে ব্যানার্জি সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী?
মজিদ: দেখুন, ট্রফির সংখ্যা যদি একজন সফল কোচের মাপকাঠি হয়, তবে পিকে ব্যানার্জিই সেরা কোচ। তবে উনি বড় বেশি কথা বলতেন। ওঁর কোচিংয়ে ভোকাল টনিক বেশি, টেকনিক্যাল ব্যাপার কম। ১৯৮০ সালে ৪-২-৪ পদ্ধতিকে ভেঙে ৪-৩-৩ করার প্রস্তাব ছিল আমার। হাবিব ও খাবাজি সেই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। পরে উনি এই ফর্মেশন বদলের কৃতিত্ব নেন। একদিন পিকে বলেছিলেন, তোমাদের দেশের রেভেনিউশনারি নেতা আয়াতুল্লা খোমেইনির চেয়েও এই দেশে আমার জনপ্রিয়তা বেশি। আমি হলাম ভারতীয় ফুটবলের সুপার পাওয়ার। আমি যা বলছি শোনো।
 খাবাজি-সানজারি এখন কী করেন?
মজিদ: খাবাজি তেহরানে কোচিং করাচ্ছে। সানজারি আছে দুবাইয়ে। বিগ বিজনেসম্যান।
 ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থেকেও খেলতে পারেননি। আর ইরানের ফুটবল এখন কোন পথে?
মজিদ: বিশ্বকাপে এক মিনিট খেলতে না পারার দুঃখ তো আছেই। তবে টিমের সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে ছিলাম। সেটাও গর্বের। সেবার আমাকে কেন খেলানো হয়নি জানেন? কারণ, তখন আমার বয়স মাত্র ২০ বছর। তার আগের বছরই আমি ইরানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে এশিয়া কাপে খেলেছি। এখন তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০ বছরের ছেলেরাই তারকা হয়ে যাচ্ছে। ফিল ফোডেন, জ্যাডন স্যাঞ্চো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তবে সেবার খেলার সুযোগ পেলে আমার হয়তো কলকাতায় আসা হত না। অন্য কোনও দেশে চলে যেতাম! সবই ভবিতব্য। এই যে কলকাতায় আমার কেরিয়ার দীর্ঘায়িত হতে পারত, কিন্তু হল না। সেটা রাজনীতির পাকচক্রে। বিস্তারিতভাবে কিছু বলতে চাই না। আর ইরানের ফুটবল? সাতের দশকে ইরানের যা মান ছিল সেই অনুসারে আমরা এগতে পারিনি। জাপান-কোরিয়া এগিয়ে গিয়েছে। ইরানের ফুটবলের অগ্রগতি অনেকটা ভারতের মতোই। ছয়ের দশকে কত ভালো জায়গায় ছিল ভারতীয় ফুটবল! শুনলাম এখন দুই প্রধানেই স্প্যানিশ কোচ। আমি একটু বিস্মিতই।
 মোহন বাগানে খেলতে না পারার জন্য কোনও আক্ষেপ?
মজিদ: ১৯৮১ সালে মোহন বাগান কর্তারা আমার কাছে এসে বলেছিলেন, তোমার জন্য আমরা ক্লাবের সংবিধান পরিবর্তন করতে রাজি। আমাকেও টলিয়ে দিয়েছিল সেই কথা। তবে ইস্ট বেঙ্গলের রিক্রুটাররা অনেক বেশি চালাক। অরুণ ভট্টাচার্য আমাকে সরিয়ে দেন গোপন স্থানে। তাছাড়া সেই বছর মোহন বাগানে অন্তর্দলীয় কোন্দলও ছিল। মোহন বাগানে না খেলা নিয়ে তেমন কোনও আক্ষেপ নেই।
 পেলে ও মারাদোনার মধ্যে কীভাবে তুলনা করবেন আপনি? লায়োনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মধ্যে সেরা কে?
মজিদ: পেলেই সেরা। কারণ ওঁর ধারাবাহিকতা সবথেকে বেশি। তিনবার বিশ্বকাপ জেতা মুখের কথা নয়। তবে মারাদোনা ওই রকম ছোট চেহারা নিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে মাত করে দিয়েছিলেন। আমি মারাদোনারও গুণমুগ্ধ। আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর থেকে লিও মেসিকেই আমার বেশি ভালো লাগে। ব্যাক্তিগত স্কিলের বিচ্ছুরণ ওর মধ্যেই বেশি।
 গ্রিজম্যান, মহম্মদ সালাহ এবং নেইমারের মধ্যে ভবিয্যতের সুপারস্টার কে?
মজিদ: আমার মনে হচ্ছে গ্রিজম্যান সকলকে টপকে যাবে। নেইমারের প্যারিসে খেলতে যাওয়াটা ভুল। মো সালাহর চেয়ে গ্রিজম্যান সব ব্যাপারেই এগিয়ে।


ফ্ল্যাটে ফিরে অভিশপ্ত বড় ম্যাচে মৃত্যু মিছিলের কথা শুনেছিলেন মজিদ

 ফ্ল্যাটে ফিরে অভিশপ্ত বড় ম্যাচে মৃত্যু মিছিলের কথা শুনেছিলেন মজিদ

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা:১৯৮০ সালে ১৬ আগস্ট অভিশপ্ত বড় ম্যাচে যে ১৬ জন ফুটবলপ্রেমী মারা গিয়েছিলেন সেটা মজিদ জানতে পারেন ইডেন থেকে লাল-হলুদ তাঁবু ঘুরে লর্ড সিনহা রোডের ফ্ল্যাটে ফিরে। ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে সরকারি প্রেস কনফারেন্সে মজিদ বললেন,‘মাঠে খেলায় একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। গ্যালারির একটি অংশে গণ্ডগোল হয়েছিল। কিন্তু সেই ভাবে গুরুত্ব দিইনি। লর্ড সিনহা রোডের এক কিমির মধ্যে এসএসকেএম হাসপাতাল। এক প্রতিবেশি এসে বললেন, ইডেনে গ্যালারিতে ঝামেলায় অনেকে মারা গিয়েছেন। পরে শুনলাম ১৬ জন মারা গিয়েছেন। লিগ পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। খুবই খারাপ লেগেছিল আমাদের।’
সোমবার বিকেল চারটা নাগাদ বৃষ্টির মধ্যেই ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর ঢুকলেন মজিদ বাসকর। ক্লাব তাঁবুতে তখন প্রায় হাজার খানেক সমর্থক। মিডিয়া প্রতিনিধির সংখ্যা প্রায় একশো। ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে এসে ক্লাবের পরিকাঠামো দেখে চমকে যান ইস্ট বেঙ্গল সমর্থকদের বাদশা। ক্লাবের অফিস ঘরে বসে তিনি মনে করার চেষ্টা করছিলেন তাঁদের আমলে ড্রেসিংরুম কোথায় ছিল? সভাপতি- সচিবরাই বা কোথায় বসতেন? ড্রেসিংরুম- কনফারেন্স হল ঘুরে দেখেন। লাল হলুদের গ্রাউন্ড স্টাফ হিসাবে শঙ্করবাবাকে (শঙ্কর মালি) তিনি ভালোভাবেই মনে রেখেছেন। সেই সঙ্গে তাঁর মুখে ছিল রামু মালির কথা।
মজিদের মুখে শোনা গেল রিপন স্ট্রিটের ভিতরে লি রেস্টুরেন্টের ফিস ফ্রাইয়ের কথা। তখন এগ রোল-চাইনিজ ফুডের এত কদর কলকাতা শহরে ছিল না। মজিদ জানালেন,‘ ইলিশ মাছ ইস্ট বেঙ্গল সমর্থকদের প্রিয় হলেও আমার খুব ভালো লাগত না।’ সরকারি প্রেস কনফারেন্সেও মজিদ প্রায় আধ ঘণ্টা কথা বলেন। বাইরে তখন ইস্ট বেঙ্গল জনতা উদ্বেল হয়ে উঠেছে। প্রেস কনফারেন্স থেকে তাঁকে সরাসরি মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রেস কনফারেন্সে যেমন পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ছিল না, তেমনি মাঠে ছিল না প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ। জনাচারেক বাউন্সার ভিড় সামলাতে পারেনি। ‘মবড’ হওয়ার আশঙ্কায় কিছু গিয়ে মজিদ ফিরে আসেন তাঁবুতে। ৫০ মিনিট পর লালবাজার ও ময়দান থানা থেকে ফোর্স আসার পর সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ মজিদ বাসকর প্রায় ৩৪ বছর পর ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে ঢুকলেন শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে। ফুটবলারদের জন্য রাখা বেঞ্চের উপরে উঠে অভিবাদন গ্রহণ করলেন সমর্থকদের। দুই সমর্থক মজিদের হাতে তুলে দেন উপহার।
মঙ্গলবার প্রয়াত সচিব পল্টু দাসের জন্মদিন। এই দিনটি ক্রীড়া দিবস হিসাবে পালন করা হয়। সকালে ক্লাব তাঁবুতে হবে পতাকা উত্তোলন। তারপর ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে রক্তদান শিবির। রক্তদাতারা পাবেন সুলে মুসার সই করা সার্টিফিকেট। বিকেলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সংবর্ধনা জানানো হবে ইস্ট বেঙ্গলের জীবিত ৫০ জন অধিনায়ক ও ২৪ জন জীবিত কোচকে। লাল-হলুদের হয়ে ২০০৭ সালে ফেডারেশন কাপ জয়ী কোচ সুব্রত ভট্টাচার্যকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি ইস্ট বেঙ্গলের সংক্ষিপ্ততম সময়ের কোচ মৃদুল ব্যানার্জি এবং মোহন বাগানের বর্তমান সহকারী কোচ রঞ্জন চৌধুরিও ইস্ট বেঙ্গলে স্বাধীন দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরাও আমন্ত্রিত। প্রাক্তন অধিনায়ক এবং কোচরা পাবেন রুপোর তৈরি গোল্ড প্লেটেড মুদ্রা। দুপুর দুটোয় হবে প্রাক্তনদের ম্যাচ। মজিদকেও নামানোর চেষ্টা চলছে। এই ম্যাচে প্রবেশ অবাধ। ইতিমধ্যেই কলকাতায় এসেছেন ইলিয়াস পাশা, সঞ্জু প্রধানরা। আসছেন আর্মান্দো কোলাসোও।
মঙ্গলবার ইস্ট বেঙ্গল শতবার্ষিকী মঞ্চে সংবর্ধিত হবেন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং নামী চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার। সঙ্গীত পরিবেশন করবেন নচিকেতা ও ইমন চক্রবর্তী। সংবর্ধনা দেওয়া হবে পঞ্চপান্ডবদের পরিবারকে।
জামশিদের সই করা সার্টিফিকেট ফুটবলপ্রেমী দিবসে: আগামী ১৬ আগস্ট ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে আইএফএ এবং ভলান্টিয়ার্স ব্লাড ডোনার্স সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পালিত হবে ফুটবলপ্রেমী দিবস। জামশিদ নাসিরির সই করা সার্টিফিকেট পাবেন রক্তদাতারা।

সুব্রতর প্ররোচনায় কখনও পা দিইনি: মজিদ

সুব্রতর প্ররোচনায় 
কখনও পা দিইনি: মজিদ

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিস্তর কথা চালাচালির পর সোমবার রাত বারোটায় মজিদ বাসকর মহমেডান স্পোর্টিং কর্তাদের জানিয়ে দেন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টা নাগাদ তিনি তাঁদের তাঁবুতে যাবেন। তাই মাত্র দশ ঘণ্টার প্রস্তুতিতে মহমেডান স্পোর্টিং বরণ করে নিল আটের দশকের মধ্যভাগের এই মহাতারকাকে। মহমেডান কর্তারা মিডিয়াকে মজিদ বরণের কথা জানান মঙ্গলবার ভোরে।
স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজের মহড়ার জন্য রেড রোড বন্ধ থাকায় মজিদ অবশ্য মহমেডান তাঁবুতে পৌঁছান বেলা এগারোটা নাগাদ। রেড রোডে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপর কিছুটা বিধিনিষেধ থাকায় খুব বেশি সমর্থক মজিদকে দেখতে তাঁবুতে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু মজিদের চোখে সমকালীন সেরা ডিফেন্ডার সুব্রত ভট্টাচার্য মহমেডানের কোচ হওয়ায় আধ ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানটি আলাদা মাত্রা পেয়ে যায়। আশির দশকের প্রথম পাঁচ-ছয় বছর মজিদ-সুব্রতর ‘ডুয়েল’ নিয়ে অনেক গল্পই প্রচলিত আছে। সেটা মঙ্গলবার দুজনেই খোলাখুলিভাবে স্বীকারও করলেন।
দীর্ঘ তিন দশক পর দেখা হতেই সুব্রত জড়িয়ে ধরেন মজিদকে। সেই আলিঙ্গনের মধ্যে উষ্ণতা ছিল। মজিদের সামনে মোহন বাগান জনতার হৃদয়ের ছেলে বাবলু ছিলেন অকপট। ইরানি তারকাটির সামনেই সুব্রত বলেন, ‘১৯৮০ সালের ফেড কাপ ফাইনালে ফুটবল মাঠে প্রথমবার মজিদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। একটি লুজ বলের জন্য দুইজনেই দৌড় শুরু করি। আমাকে টপকে চলন্ত বলে ফ্লিক করে হাবিবকে বল দিয়েছিল মজিদ। তখনই বুঝেছিলাম আমাকে রীতিমতো বেগ দিতে মজিদ এসেছে কলকাতায়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম মজিদ আমাকে ‘ঝামেলাবাজ’ বলেছে। সঠিক কথাই বলেছে। ওর ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এতটাই বেশি ছিল, আমাকে অনেক ম্যাচেই ওর বিরুদ্ধে শুধুই টাফ নয়, রাফ ফুটবল খেলতে হয়েছে। কিন্তু মজিদের মাথা এতটাই ঠান্ডা ছিল কখনও মাথা গরম করেনি। নিজের উপর এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল কার্ডও সেইভাবে দেখত না। ফুটবলের বেসিক ছিল দারুণ। আউট স্টেপে রিসিভিং ছিল দেখার মতো। অত্যন্ত ফ্যান্সি ফুটবলার। রাফ ট্যাকল করলে আমাকে বলত এটা কী হচ্ছে?’
পাশে বসা মজিদ বাসকরের মুখে তখন অমায়িক হাসি। সুব্রতকে ছোটভাই বলে সম্বোধন করে মজিদ বলেন,‘ঝামেলা করে আমাকে প্ররোচিত করতে চাইত। আমি কখনই সেই প্ররোচনায় পা দিইনি। মহমেডান স্পোর্টিং আমার কাছে সেকেন্ড হোম। এখানে এসে মনে হচ্ছে অনেক দিন পর বাড়িতে ফিরলাম। ১৯৮৭’তে আমি সেইভাবে খেলিনি। তবুও মেসে থাকতে দিয়েছিল এই ক্লাব। আমাদের সময়ে ক্লাবটি এত সাজানো- গোছানো ছিল না। তবে ইস্ট বেঙ্গলের ড্রেসিংরুম প্রশস্ত হলেও মহমেডান ড্রেসিংরুম সেই ছোটই থেকে গিয়েছে।’ মজিদের হাতে স্মারক,শাল তুলে দেন মহমেডান সচিব ও ফুটবল টিমের ম্যানেজার। এক ভক্ত তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের হাতে আঁকা একটি ছবি। তবে মজিদের এত প্রশংসা করলেও সুব্রত তাঁকে ভারতে খেলা সেরা বিদেশি বলতে নারাজ। এই প্রশ্নে একটু অন্যভাবে তিনি বলেন, ‘খেলার সৌন্দর্যে মজিদই সেরা। তবে সার্বিক কার্যকারিতায় এগিয়ে এমেকা। আর ধারাবাহিকতায় অবশ্যই এগিয়ে ব্যারেটো।’


ইরানি পাস ক্লাব ম্যাচের নায়ক পরিমল দে’কে কুর্নিশ মজিদের

 ইরানি পাস ক্লাব ম্যাচের নায়ক পরিমল দে’কে কুর্নিশ মজিদের

অভিজিৎ সরকার: ১৯৭০ সালে ইডেনে আইএফএ শিল্ড ফাইনালে ইরানের পাস ক্লাবের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক গোল। ইস্ট বেঙ্গল জনতার একদা ‘হার্টথ্রব’ পরিমল দে শারীরিক অসুস্থতায় অনেকটাই ন্যুব্জ। মঙ্গলবার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে ক্রীড়া দিবসের মঞ্চে ছয়ের দশকে লাল-হলুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারের গালে চুম্বন এঁকে দিলেন আশির বেতাজ বাদশা মজিদ বাসকার। কারণ, তখন পাস ক্লাব ছিল ইরানের অন্যতম সেরা ক্লাব। নিঃসন্দেহে এদিনের গোটা অনুষ্ঠানের সেরা দৃশ্য এটি। দু’জনের আলিঙ্গন একেবারেই হার্দিক। মিনিট তিনেকের সেই দৃশ্য ছবিতে ধরে রাখতে আলোকচিত্রীদের সে কী মরিয়া প্রচেষ্টা!
এদিন ইস্ট বেঙ্গলের শতবর্ষের স্মরণীয় ক্রীড়া দিবস অনুষ্ঠানে চাঁদের হাট বসেছিল। ছয় থেকে নয়ের দশক পার করে লাল-হলুদে খেলে যাওয়া ফুটবলাররা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন অনুষ্ঠান। ৩২ বছর পর দেখা হতেই ‘মজিদ-জামশিদ’ জুটির মঞ্চে সখ্যতা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল খেলার মাঠে তাঁদের বোঝাপড়া কী ধরনের ছিল! মজিদের গলায় লাল-হলুদ উত্তরীয় পরিয়ে দেন জামশিদই।
শুরুতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন তিন অতিথি- সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার, নাট্য ব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। মঞ্চে তখন উপস্থিত মজিদ বাসকার, আশিয়ান কাপ জয়ী দলের অধিনায়ক ঘানার সুলে মুসা। মঞ্চে উপবিষ্ট প্রত্যেক অতিথিকে আজীবন সদস্যপদ দিয়ে সম্মানিত করে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব। 
একশো বছরে পা দেওয়া ইস্ট বেঙ্গলের সোনালি ইতিহাসের শুভ সূচনা ‘পঞ্চপাণ্ডব’কে দিয়ে। সেই আমেদ-সালে-ধনরাজ-ভেঙ্কটেশ-আপ্পারাও’র পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ইস্ট বেঙ্গল কর্তারা। এর মধ্যে আমেদ খানের পুত্র আব্দুল মজিদ খান, সালের স্ত্রী সেনাবা সালে, পিএম ভেঙ্কটেশের পুত্র ভেঙ্কটেশ শ্রীনিবাসকে বিশেষ সম্মান জানানো হয়। বাকি দুই প্রাক্তন কিংবদন্তি ফুটবলারের পরিবারের সদস্যকে দেখা যায়নি। যেমন ক্রীড়া দিবসের মঞ্চে উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি চোখে পড়েছে সুধীর কর্মকার ও গৌতম সরকারের। যদিও মঞ্চের ব্যাকড্রপ স্ক্রিনে ইস্ট বেঙ্গলের সর্বকালের সেরা সাইডব্যাক সুধীর কর্মকার লাল-হলুদ জার্সি গায়ে খেলার স্মৃতিচারণ করেছেন। সেই স্ক্রিনে ক্লাবের প্রতিষ্ঠা দিবস ১ আগস্টে নেওয়া সাক্ষাৎকারে একের পর এক প্রাক্তনরা স্মৃতির অতলে ভেসে গিয়েছেন। 
ছ’য়ের দশক থেকে শুরু হয় ইস্ট বেঙ্গল অধিনায়কদের সংবর্ধনা পর্ব। ছ’য়ের দশকের তিন ফুটবলার সুকুমার সমাজপতি, চন্দন ব্যানার্জি, পরিমল দে’কে দেখে আবেগে ভেসে যায় ইস্ট বেঙ্গল জনতা। তাঁরা হাত তুলে অভিবাদন গ্রহণ করেন সমর্থকদের। এরপর সাতের দশকের অধিনায়কদের বরণ করে নেওয়ার পালা। সুনীল ভট্টাচার্য, স্বপন সেনগুপ্ত, সমরেশ চৌধুরি, শ্যামল ঘোষ, শ্যাম থাপা, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, প্রশান্ত ব্যানার্জি প্রমুখ। তবে ১৯৭৯ সালের অধিনায়ক প্রশান্ত ব্যানার্জি যখন বললেন, ‘ইস্ট বেঙ্গল জার্সি গায়ে মাঠে নামলে ৩০ শতাংশ সেরাটা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে সমর্থকদের চিৎকারে সেই ক্ষমতা বেড়ে ১০০ শতাংশ হয়ে যেত।’ সঞ্চালক মীরের অনুরোধে প্রশান্ত ব্যানার্জির বক্তব্যে গরম হয়ে ওঠে ইনডোরের গ্যালারি। 
আটের দশকের প্রথম বছরের অধিনায়ক সত্যজিৎ মিত্র ব্যক্তিগত কাজে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে ছিলেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (১৯৮১), ভিক্টর অমলরাজ (১৯৮২), মিহির বসু (১৯৮৩), ভাস্কর গাঙ্গুলি (১৯৮৪), বলাই মুখার্জি (১৯৮৫), তরুণ দে (১৯৮৬), অলোক সাহা (১৯৮৭) ও ১৯৮৮ ও ৯১ সালের অধিনায়ক বিকাশ পাঁজিসহ প্রায় সকলেই হাজির ছিলেন। এরপর ক্রমে নয় ও একবিংশ শতাব্দীর অধিনায়করা সম্মানিত হন। এরমধ্যে তুষার রক্ষিত, বিজেন সিং, ফাল্গুনি দত্ত, সুলে মুসা, মেহতাব হোসেন, সৌমিক দে, অভ্র মণ্ডল, খাবরা, অনীত ঘোষ, রহিম নবি, অর্ণব মণ্ডলরা শতবার্ষিকী স্মারক গ্রহণ করেন। ইস্ট বেঙ্গলে সংবর্ধিত কোচেদের মধ্যে সুভাষ ভৌমিক, আর্মান্দো কোলাসো, অলোক মুখার্জি, মৃদুল ব্যানার্জিরা উপস্থিত থাকলেও উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি সুব্রত ভট্টাচার্যের। তিনি অবশ্য ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘২০০৭ সালে ইস্ট বেঙ্গলের ফেডারেশন কাপ জয়ী দলের কোচ আমি। এটা আমার কোচিং জীবনের অন্যতম সেরা সাফল্য।’
এদিন ইস্ট বেঙ্গল মাঠে প্রাক্তনদের প্রীতি ম্যাচে রহিম নবি হ্যাটট্রিক করেন। দুই দলের কোচ ছিলেন সুভাষ ভৌমিক ও আর্মান্দো কোলাসো। মঙ্গলবার সকালে প্রয়াত সচিব দীপক (পল্টু) দাসের জন্মদিনে ক্রীড়া দিবস উপলক্ষ্যে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত রক্তদান শিবিরে রক্তদাতাদের উৎসাহিত করেন মজিদ বাসকার। আর সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে সুলে মুসা ও মজিদ বাসকারের জন্য বরাদ্দ ছিল সবচেয়ে বেশি করতালি। যা ধ্বনি আরও ছাপিয়ে অনুষ্ঠানের শেষ লগ্নে মজিদ বাসকারকে সংবর্ধিত করার সময়ে। তাঁকে শতবার্ষিকী স্মারক, মুদ্রা, তৈল চিত্র, উত্তরীয় পরিয়ে দেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ক্লাব সভাপতি ডাঃ প্রণব দাশগুপ্ত, সচিব কল্যাণ মজুমদার। অনুষ্ঠানের দুই পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ইমন চক্রবর্তী ও নচিকেতা।


Sunday, 23 September 2018

বই-ই শিল্প ফিনল্যান্ডে

বই-ই শিল্প ফিনল্যান্ডে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে সাহিত্যে নোবেল এনেছিল এই দেশ। আজও বইকে ঘিরে চাঙ্গা ফিনল্যান্ড। বিশ্ব জুড়ে রমরমা বাণিজ্যও।

Frans Eemil Sillanpää and Sofi Oksanen

লেখক: ফ্রান্‌জ এমিল সিলানপা। ডান দিকে, সোফি ওকসানেন

ছোট্ট এক দেশ। পাহাড়, জঙ্গল, হ্রদে মোড়া। জনবসতি বড্ড কম, আরও কম তার শহুরে দিনযাপন। তিন দিকে ঘিরে থাকা সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া আর বাল্টিক সাগরের জলপথ, এই সব মিলেমিশে গড়ে তুলেছে ফিনল্যান্ডের নিজস্ব সংস্কৃতি। নর্ডিক জীবনযাপনে দাগ কেটেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লালরঙা কাঠের বাড়ি কিংবা কফি-কার্ডামম বানের আড্ডা। রাশিয়া কিংবা বাল্টিক অঞ্চলের সংস্কৃতি বা রাজনীতির প্রভাবও কম নয়। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প— ফিনল্যান্ড জুড়ে প্রভাব ফেলেছে বৈচিত্র। শতকের পর শতক পেরিয়ে এমন মিলমিশের সাক্ষী ফিনল্যান্ডের মানুষ।  
নব্বইয়ের দশকের শেষে বিশ্বে সাড়া ফেলল নোকিয়া মোবাইল ফোন। সৌজন্য ফিনল্যান্ড। দাপটে রাজত্ব করা সেই ফোনের দৌলতে চড়চড়িয়ে বাড়তে লাগল দেশের আয়। বাণিজ্যের একটা বড় অংশ জুড়ে রইল তার রফতানি। কিন্তু ব্যবসায় যেমন হয়, ২০০৭-এ প্রতিদ্বন্দ্বী এক ব্র্যান্ডের ফোন দখল নিল বিশ্বের বাজারের। ছোট্ট দেশটার অর্থনীতি ধাক্কা খেল। রাজকোষে তো বটেই, চোট আত্মবিশ্বাসেও। নতুন কিছু চাই, যার হাত ধরে ফের ঘুরে দাঁড়াবে ফিনল্যান্ড।
মন্দার বাজার তখন গোটা বিশ্বেই। তারই মধ্যে খুঁজে নিতে হবে তাকে, যাকে ঘিরে ফের চাঙ্গা হয়ে উঠবে দেশের বাণিজ্য। গোটা দেশ মাথা ঘামাল, আর বুঝেও ফেলল, দরকার শুধু উপযুক্ত ব্র্যান্ডিং। তাতেই হবে কেল্লাফতে। কিন্তু কী হতে পারে সেই জিনিস? প্রযুক্তি? সংস্কৃতি?
এর মধ্যেই চমক। ২০০৮, ফিনিশ-এস্টোনিয়ান লেখিকা সোফি ওকসানেন-এর উপন্যাস ‘পার্জ’ সাড়া ফেলে দিল সাহিত্যের দুনিয়ায়। সোভিয়েতের দখলে থাকা এস্টোনিয়ার দুই নারীর সংগ্রামের সেই কাহিনি যে শুধু ফিনল্যান্ডেরই পুরস্কার জিতে নিল তা-ই নয়, বিদেশেও জয় করল অজস্র খেতাব। বেগুনিরঙা বিনুনি আর পরিপাটি সাজগোজে, একের পর এক সাহিত্য সম্মেলনে নিজের বইয়ের প্রচার নিজেই করা ওকসানেন স্বয়ং হয়ে উঠলেন একটা ‘ব্র্যান্ড’। ৩৮টি ভাষায় তাঁর বইয়ের অনুবাদ, এবং বিপুল বাণিজ্য চোখ খুলে দিল দেশের। শুধু ফ্রান্সেই বিক্রি হল এক লক্ষ সত্তর হাজার কপিরও বেশি!
সবাই বুঝল, পৃথিবীর পাঠকের মনের মতো হয়ে ওঠার যোগ্য হয়েছে ফিনল্যান্ডের সাহিত্য। পরবর্তী ওকসানেন-এরও খোঁজ শুরু করে দিয়েছে বিশ্বসাহিত্যজগৎ। বুঝেশুনে, সাজিয়েগুছিয়ে তুলে ধরা গেলে সাহিত্যই হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের বাজারে ফিনল্যান্ডের তুরুপের তাস। নড়েচড়ে বসল বইপাড়া।
ছোট্ট দেশটার সাহিত্যের ইতিহাস অবশ্য পুরনো। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনিশ শতকের শুরু অবধি ফিনল্যান্ড সুইডেনের শাসনে। সুইডিশই ছিল উচ্চবিত্ত ফিনিশদের ভাষা। তবে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা লোককথা— যার বেশির ভাগটাই পৌরাণিক বীরগাথা— ছিল  ফিনল্যান্ডের নিজস্ব। মালার মতো সেই ছড়া আর গান গেঁথেই অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে তৈরি হল ফিনল্যান্ডের মহাকাব্য ‘কালেভালা’।
উনিশ শতকে সুইডেন থেকে বেরিয়ে রাশিয়ার স্বশাসিত অংশ হল ছোট্ট দেশটা। সাহিত্যেও নিজস্বতা গড়ে তোলার ভাবনা জেগে উঠল তখনই। লেখার মাধ্যম যদিও সুইডিশ। জোহান লুডভিগ রুনবার্গ-এর লেখায় প্রথম জীবন্ত হয়ে উঠল ফিনল্যান্ডের প্রকৃতি আর জীবনযাপন। তার পর এলেন আরও ক’জন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আলেক্সিস কিভি-র লেখায় প্রাণ পেল ফিনল্যান্ডের সাহিত্য। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, বাড়তে লাগল সাহিত্যের পরিধি। পায়ে পায়ে ঢুকে পড়ল নরওয়ে-ফ্রান্সের প্রভাব— বাস্তবতা আর সমাজের আয়না হয়ে উঠল ফিনল্যান্ডের সাহিত্য। তাতে আধুনিক ধারা নিয়ে এলেন লেখিকা মিনা কান্থ ও অন্যেরা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাহিত্যের ধাঁচে এল বাস্তবের কথা, সমাজে মেয়েদের অবদমন আর শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশার ছবি উঠে এল তাঁদের লেখায়। সমালোচিত হল চার্চের ভূমিকা।
উনিশ শতকের শেষ থেকেই সুইডিশ আর ফিনিশ ধারার ক্রমশ আলাদা হওয়া শুরু। বিশ শতকের শুরুতেই তাই দু’রকম ধাঁচে ভাগাভাগি হয়ে গেল ফিনল্যান্ডের সাহিত্যজগৎ। বছর গড়াল একের পর এক। দুই ধারার লেখকদের কলমে কবিতায়, গদ্যে, নাটকে, উপকথায়, গীতিকাব্যে এল আধুনিকতার নতুন স্বাদ। তাতে ঠাঁই পেল বাস্তব সমাজের কথা, ম্যাজিক রিয়েলিজ়ম, নর্ডিক ক্রাইম থ্রিলার, ব্লগ লেখনীর আঙ্গিক, নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক বিষয়বস্তু। ইতিমধ্যে ফ্রান্‌স এমিল সিলানপা-র হাত ধরে ফিনল্যান্ডের মুকুটে এসে গিয়েছে নতুন পালক। প্রথম বার সাহিত্যে নোবেল— ১৯৩৯ সালে।
ফেরা যাক ২০০৮-এর গল্পে, ওকসানেনের তুমুল জনপ্রিয়তায় নড়েচড়ে বসা ফিনল্যান্ডে। নর্ডিক ক্রাইম থ্রিলারের চাহিদায় ভাটার টান চলছে বেশ ক’বছর হল। নতুন কোনও ধারাকে তুলে ধরার এই তো সময়! প্রাক্তন প্রকাশক এলিনা আলবাক-এর মাথায় এল আন্তর্জাতিক সাহিত্য এজেন্সি গড়ে তোলার প্ল্যান। সাহিত্যের প্রচারকে এত কাল বাঁকা চোখে দেখে আসা দেশটাকে তিনি বুঝিয়ে ছাড়লেন তার প্রয়োজনীয়তা। বললেন, সাহিত্যই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বইয়ের রফতানি আগামী দশ বছরে বাড়তে পারে দশ গুণ।
কাজটা সহজ ছিল না। এলিনা ও তাঁর দলের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠল এজেন্সি। তাবড় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর দোরে দোরে ঘুরে প্রচার চলল। গোলাপি স্যুট আর গোলাপি বিজ়নেস কার্ডে এলিনা হয়ে উঠলেন বিশ্বের তাবড় বইমেলার চেনা মুখ।
২০০৯-এ শুরু কর্মযজ্ঞ, আর ফ্রাঙ্কফুর্টের বিশ্বখ্যাত বইমেলায় ডাক এল ২০১৪ সালের অতিথি দেশ হিসেবে। মাঝের পাঁচটা বছরে নিজেকে আমূল বদলে ফেলল ফিনল্যান্ডের বইপাড়া। বাণিজ্যিক চুক্তি, ফরেন রাইটস, অন্য রকম ভাবনার সাহিত্য এবং স্লোগান ‘ফিনল্যান্ড। কুল’। তাতেই বাজিমাত!
অতিথি দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ডের নাম শুনে যাঁরা ভুরু কুঁচকেছিলেন, বইমেলার শেষে তাঁরাই মানতে বাধ্য হলেন— দেশটার দম আছে! পাঠকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল ফিনিশ সাহিত্যের স্বাদ। জার্মানি, অ্যাংলো-আমেরিকান দেশগুলো, যারা ক’বছর আগেও ছিল ফিনল্যান্ডের বইপাড়ার ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেখানেই হইহই ফেলল ফিনল্যান্ডের একের পর এক নতুন লেখকের গল্প-উপন্যাস। হালে ২০১৫ সালে পেঙ্গুইন ক্লাসিকস-এও ঢুকে পড়েছে ফিনিশ উপন্যাস ‘আননোন সোলজার্স’। ফিনল্যান্ডের তিন গুণ বেড়ে যাওয়া বই-রফতানির খাতায় জার্মানিকেও টেক্কা দিয়েছে অ্যাংলো-আমেরিকান দেশের চাহিদা। নর্ডিক এজেন্সি হিসেবে একমাত্র আলবাক-এর এজেন্সিরই এখন নিউ ইয়র্ক এবং লস অ্যাঞ্জেলেস, দু’জায়গাতেই অফিস।
কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল ফিনল্যান্ডের সাহিত্য? পাঠক এবং প্রকাশক, দু’দলই একবাক্যে বলছেন— এ দেশটার সাহিত্য এক্কেবারে আলাদা স্বাদের, অদ্ভুত। আর সেটাই তার ইউএসপি। সঙ্গে ঝরঝরে লেখনী আর ঝকঝকে, টানটান প্লট। জোহানা সিনিসালো-র ‘দ্য কোর অফ দ্য সান’-এ স্বাবলম্বী নারীদের বন্ধ্যাত্বকরণ আর পায়ের নীচে শক্ত জমি না-থাকা মেয়েদের যৌনতায় ঘিরে রাখার এক নয়া ধাঁচের অবদমনের গল্প, পাজ়তিম স্তাতোভসি-র ‘মাই ক্যাট যুগোস্লাভিয়া’য় একেবারে অন্য চোখে যুগোস্লাভিয়ার পতনের কাহিনি কিংবা লরা লিন্ডস্টেট-এর ‘ওনেইরন’-এ এক অন্য জগতে সাত নারীর আলাপচারিতার মতো বিষয় মন টেনেছে সারা বিশ্বের পাঠকদের। 
ফিনল্যান্ডে সাক্ষরতার হার বরাবরই বেশি, বই পড়ার অভ্যাসও। তাই কলমও যে শক্তিশালী হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! প্রকাশক, এজেন্সির ব্যাপক উদ্যোগের পাশাপাশি এখন মিলছে সরকারি সাহায্যও। আর তার জোরে ফিনল্যান্ডের সাহিত্যিকদের সেরা দশে থাকা জ্যানসন, ওকসানেন, লরা লিন্ডস্টেটরা তো বটেই, বছর আঠাশের স্তাতোভসি-র ঝুলিতেও ইতিমধ্যে দু’দুটো উপন্যাস! লিখছেন তৃতীয়টিও। কলম ধরছেন, খ্যাতি পাচ্ছেন আরও আরও নতুন মুখেরা।
লেখিকাদের আধিক্য এবং অদ্ভুত বিষয়বস্তু এখন ফিনল্যান্ডের সাহিত্য-বিপ্লবে দুই মূল অস্ত্র। বই-ই এখন নতুন ইন্ডাস্ট্রি, নিঃসন্দেহে!

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/how-books-became-key-economic-tool-in-finland-1.860832?ref=archive-new-stry

ইতিহাসে বাড়ি বদল (On the house of first widow-marriage)

ইতিহাসে বাড়ি বদল

রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপস্থিতিতে প্রথম বিধবাবিবাহের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি সেই ঐতিহাসিক বাড়ির খোঁজ করতে গিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেল, তাতে বিধবাবিবাহের প্রথম বাড়ি-সংক্রান্ত ধারণার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

শেখর ভৌমিক
 
Vidyasagar

বিদ্যাসাগরের তৈলচিত্র।

নগরেতে হইয়াছে গেল গেল রব।
পলাইয়া ক্ষেত্রে যায় নরনারী সব।।
…কাহারো পলায়ে গেল বিধবা বহুড়ী।
এর বাড়ি তার বাড়ি খুঁজিছে শাশুড়ু।।

বিধবাদের জগন্নাথধাম ‘পালানো’ সম্পর্কে এই বর্ণনা পাওয়া যায় ১৮৪৯ সালের ‘সম্বাদ রসরাজ’ পত্রিকায়। উনিশ শতকে এমন পলায়ন সংবাদ রাশি রাশি। অষ্টাদশ শতকেই তো বিজয়রাম সেন বঙ্গবিধবাদের কাশীবাসের কথা লিখে গিয়েছেন, ‘‘কাশীর মধ্যেতে আছেন বিধবা জতেক/ সবাকারে দিলা কর্তা [জয়নারায়ণ ঘোষাল] তঙ্কা এক এক।’’ মনে হয়, দশাশ্বমেধ ঘাটে দাঁড়ানো ‘ঘৃষ্টগাত্রী বাঙালি তরুণী বিধবার দল’ কি এঁদেরই উত্তরসূরি? যাঁদের দেখে ‘মহাস্থবির জাতক’-এ প্রেমাঙ্কুর আতর্থী নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সংসারের সব বাধা ছিন্ন করে রোজ সকালে তাঁরা কাকে প্রণাম করেন। লেখক নিজেই উত্তর দিয়েছেন, তাঁরা এখানে আসেন ‘মরবে’ বলে, কারণ এখানে মরলে আর জন্মাতে হয় না। আসলে বালবৈধব্য যন্ত্রণা, মদনদেবতার শর সইতে না পেরে অনেক সময় ‘গর্ভ’ হয়ে পড়া এবং তা ‘নষ্ট’ করতে গিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ হওয়া (যেমনটা হয়েছিল চন্দ্রা নামের সেই মেয়ের, যাঁর কাহিনি অনেককাল আগে তুলে ধরেছিলেন রণজিৎ গুহ)— এ তো ছিল সে কালের নিত্যকার ঘটনা। বঙ্গবিধবা এগুলোকে অবশ্য ভাগ্য বলেই মেনে নিয়েছিলেন। তবে এক-আধটু আওয়াজ যে মাঝেমধ্যে ওঠেনি এমন নয়। নিজের শিশুকন্যার বালবৈধব্য ঘোচাতে রাজা রাজবল্লভ অনেক কাল আগে বিধবাবিবাহ প্রচলনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, কিন্তু নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজের বিরোধিতায় তা বানচাল হয়ে যায়। ডিরোজিয়োপন্থীদের উদ্যোগের কথা ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪২-এ। তার পর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ সার্থক রূপ পেল বীরসিংহের ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্রটির মাধ্যমে— বাংলাদেশে যিনি করুণাসাগর বিদ্যাসাগর নামেই বেশি পরিচিত।
বিদ্যাসাগর প্রাথমিক ভাবে কেন বিধবাবিবাহ নিয়ে এগিয়ে আসেন তা নিয়ে উনিশ শতকে তাঁর দুই জীবনীকার বিহারীলাল সরকার এবং চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য আলাদা। তাঁর ছোট ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের বক্তব্যটিই অনেকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন (‘বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত ও ভ্রমনিরাস’)। চণ্ডীচরণের মতে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শম্ভুচন্দ্র বাচস্পতির বালিকাবধূর অকালবৈধব্য বিদ্যাসাগরকে এই ‘মহৎ কর্মে ব্রতী’ হওয়ার জন্য প্রাণিত করে। বিহারীলাল লিখেছেন, বীরসিংহে বিদ্যাসাগরের এক বাল্যসহচরী ছিল। সে অকালে বিধবা হয়। এক দিন তিনি শুনলেন একাদশী বলে মেয়েটি সারা দিন খায়নি। আর শুনে তিনি কেঁদেই ফেললেন। তবে এই দুটো ঘটনাই তাঁর ছাত্রজীবনে ঘটা। আর শম্ভুচন্দ্র যা বলছেন তা তাঁর কর্মজীবনের শেষ দিকের। ঘটনা এ রকম যে, এক দিন বিদ্যাসাগর বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বসে বাবার সঙ্গে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা সম্পর্কে যখন আলোচনা করছেন, তখনই তাঁর মা ‘রোদন করিতে করিতে’ সেখানে এসে ‘একটি বালিকার বৈধব্য-সংঘটনের উল্লেখ করত,’ তাঁকে বললেন ‘তুই এত দিন যে শাস্ত্র পড়িলি, তাহাতে বিধবাদের কোনও উপায় আছে কিনা?’ তাঁর বাবাও তখন জানতে চাইলেন, ধর্মশাস্ত্রে বিধবাদের প্রতি শাস্ত্রকারেরা কী কী ব্যবস্থা করেছেন? এর পরই নাকি ‘শাস্ত্র-সমুদ্র মন্থন’ করে তিনি লিখলেন ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি, যা ১৮৫৪-র ফেব্রুয়ারিতে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’-য় প্রকাশিত হয়। ১৮৫৫-র জানুয়ারিতে প্রকাশিত হল তাঁর ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব।’ এর পরই সৃষ্টি হল প্রবল আলোড়ন। শেষে ১৮৫৬-র ২৬ জুলাই অনুমোদিত হল বিধবাবিবাহ আইন। আর চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মাসত্রয় অতীত হইতে না হইতেই এ বৎসরের অগ্রহায়ণ মাসের ত্রয়োবিংশ দিবসে বিধবাবিবাহের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।’ ১৮৫৬-র ৭ ডিসেম্বর রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতার অন্তঃপাতি সিমুলিয়ার সুকেস স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবন’-এ পটলডাঙার লক্ষ্মীমণি দেবীর দশ বছরের বিধবা কন্যা কালীমতির সঙ্গে প্রসিদ্ধ কথক রামধন তর্কবাগীশের কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের বিবাহ হয়। রাজকৃষ্ণবাবু বিদ্যাসাগরের ‘আ-যৌবন সুহৃদ’। বৌবাজারে থাকাকালীন হৃদয়রাম ওরফে হিদারাম বাঁড়ুয্যের এই পৌত্রটির সঙ্গে বিদ্যাসাগরের পরিচয়। তাঁর কাছেই রাজকৃষ্ণবাবুর সংস্কৃত শিক্ষা।
‘সংবাদ প্রভাকর’-এ এই বিবাহ এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৫ অগ্রহায়ণ বিয়ের দিন স্থির হলেও শ্রীশচন্দ্র নাকি ‘সময়কালে মাতৃপ্রতিবন্ধকের ছল করিয়া প্রতিজ্ঞাভঙ্গ’ করেন। পত্রিকায় আবার লিখেছে, ‘লোকে কহিতেছে’ পাত্রী বিধবা নয়, ন্যায়রত্ন মহাশয় অনেক টাকা দিয়ে কুমারী মেয়ে কিনে এনেছেন। শেষ অবধি অবশ্য ৭ ডিসেম্বর বিবাহটি হয়। বাবু রামগোপাল ঘোষ, রমাপ্রসাদ রায়, দিগম্বর মিত্র, প্যারীচাঁদ মিত্র বা কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো সমকালীন কলকাতার তাবড় ‘সেলেব’রা সেখানে হাজির ছিলেন। ‘ভাস্কর সম্পাদক’ নাকি ‘নাকে চশমা দিয়া পাঁজি পুঁথি খুলিয়া উক্ত বিবাহ সমাজের মধ্যস্থলে বসিয়া ছিলেন।’ আর ‘রঙ্গতৎপর লোক সমারোহে রাজপথ আচ্ছন্ন হইয়াছিল, সারজন সাহেবরা পাহারাওয়ালা লইয়া জনতা নিবারণ করেন’। লক্ষ্মীমণি নাকি পাত্রের ‘চক্রাকার রূপচাঁদের মোহন মন্ত্রে মুগ্ধা’ হয়ে তাঁকে কন্যা সম্প্রদান করেন। আর ‘কড়ি দে কিনলেম্, দড়ি দে বাঁদলেম, হাতে দিলেম মাকু, একবার ভ্যা করতো বাপু’— মহিলাদের এ জাতীয় ‘প্রার্থনায়’ বরবাবাজি নাকি ‘ভ্যা ও করিয়া ছিলেন।’ পত্রিকা লিখছে, ‘এইক্ষণে বিদ্যাসাগর আনন্দসাগর সলিলে পরিপূর্ণ হইয়াছেন’ এবং এই বিবাহে ‘বাবু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গৃহ পবিত্র হইয়াছে।’
বৌবাজার ত্যাগ করে সুকিয়া স্ট্রিটে বাড়ি তৈরি করে রাজকৃষ্ণবাবুর বসবাসের কথা কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়। আর এই বাড়িতেই যে বিবাহটি অনুষ্ঠিত হয় তা নিয়েও সংশয় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল আজ সেই বাড়িটির অবস্থান কোথায়? ১৯৬১-তে শ্রীপান্থ লিখেছেন, সুকিয়া স্ট্রিটের এই অংশের নাম আজ কৈলাস বোস স্ট্রিট। বাড়ির সংখ্যাও আর ‘১২’ নেই। যদি কেউ বাংলার প্রথম বিধবাবিবাহ বাসরটি খুঁজে পেতে চান, তা হলে ‘‘এ দিকে সে দিকে ঘুরে তাঁকে দাঁড়াতে হবে ‘৪৮ এ’ এবং ‘৪৮ বি’ নম্বর আঁটা যমজ বাড়িটির সামনে।’’ পরবর্তী কালে সুনীল মুন্সি (১৯৭৪) এবং রাধারমণ মিত্রও (১৯৭৭) এই ‘৪৮’ সংখ্যক বাড়িটিকেই অতীতের ১২ নং বলে নির্দিষ্ট করেছেন।
ঠিকানা: প্রথম বিধবাবিবাহের বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত ৪৮ কৈলাস বোস স্ট্রিট।
১৮৫৯-৬৯ সালের কলকাতার ‘স্ট্রিট ডিরেক্টরি’গুলোতে ‘১২’ সংখ্যক বাড়িতে রাজকৃষ্ণবাবুর নাম পাওয়া যাচ্ছে, এক বার তাঁর সঙ্গে পদ্মলোচনেরও নাম আছে। তার পুব দিকে ‘১৩’-তে ছিল থানা এবং ‘১৪’-র মুখে রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট। তখন এই রাস্তায় ২৩ নং বাড়ির অস্তিত্ব ছিল না। ১৮৬৯-৭০’এর মধ্যে পুরনো ১২ থেকে ১৪ নম্বরের জায়গায় অনেক নতুন বাড়ি ওঠে, এবং পুরসভার খাতায় নতুন নম্বর দাঁড়ায় ১২ থেকে ২৪। ১৮৭০-এর ডিরেক্টরিতে প্রথম ২৩ নম্বরে পাচ্ছি রাজকৃষ্ণবাবুকে। আর ১৮৭১-এ ১২ নম্বরের বাসিন্দা প্রিয়নাথ দত্ত। সম্ভবত রাজকৃষ্ণবাবু এই সময় ২৩ নম্বরে নতুন বাড়ি করে উঠে আসেন। ১৮৭০-৭১-এর ডিরেক্টরিতে ২৪ নম্বরে রয়েছে বিদ্যাসাগরের সংস্কৃত প্রেস ডিপজ়িটরি। ১৮৭২-এর ডিরেক্টরিতে দেখছি ২৪ সংখ্যক ভবনে বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত ‘মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন’। পূর্ণচন্দ্র দে কাব্যরত্ন, উদ্ভটসাগর ১৯৩০ নাগাদ লিখেছেন, ‘‘এখন সুকিয়া স্ট্রিটের পার্শ্বস্থিত স্বর্গত রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের বাড়ির পূর্বদিকে লাহা-বাবুদের যে প্রাসাদ রহিয়াছে, ঠিক সেইখানেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘মেট্রোপলিটন কলেজ’ ছিল।’’ ১৯১৫-র পি এম বাকচি-র ‘কলিকাতা স্ট্রিট ডাইরেক্টরি’তেও ২৩ নং বাড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়দের। আরও পরে এই ‘২৩’ সংখ্যক বাড়িটির পরিবর্তিত ঠিকানা দাঁড়ায় ‘৪৮’, যে কথা শ্রীপান্থ প্রমুখ লিখেছেন। বর্তমানেও ৪৮এ নং বাড়িতে বাস করেন রাজকৃষ্ণের উত্তরসূরিরাই।
৩২ কৈলাস বোস স্ট্রিট।
খটকা লেগেছিল কয়েক মাস আগে। বিদ্যাসাগর কলেজের আশপাশ চিনতে এই কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা যখন এই অ়ঞ্চলটি পায়ে হেঁটে দেখতে বেরোয়, তখন ওদের সঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল। আর তখনই কিছু প্রশ্ন আসে। প্রথমত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহাফেজখানায় রাখা ১৮৯৪ সালের এক জরিপ নকশায় (সমীক্ষা ১৮৮৭-৯৩) ‘১২’ সুকিয়া স্ট্রিটের যে অবস্থান, মদন মিত্র লেনের বিপরীতে, তার সঙ্গে এখনকার ৪৮এ/বি কৈলাস বোস স্ট্রিটে বিধবাবিবাহ বাসরের গল্পটা ঠিক মেলানো যাচ্ছে না। কারণ রাজকৃষ্ণবাবুর যে ‘২৩’ সংখ্যক বাড়ি (যা পরে ‘৪৮’ হয়েছে), তার অবস্থান মদন মিত্র লেনের মুখ থেকে অনেকটা পুবে, এর মাঝে অনেকগুলো ‘premises’ রয়েছে। অন্তত ১৮৭১-এর স্ট্রিট ডিরেক্টরি থেকে ১৮৯৩-তে প্রকাশিত প্যারীমোহন দাস-এর ‘কলিকাতা পথ-প্রদর্শক এবং ডাইরেক্টরি’ পর্যন্ত সুকিয়া স্ট্রিটে মদন মিত্র লেনটি যেখানে শুরু হচ্ছে, তার ঠিক দক্ষিণ দিকের বা বিধান সরণি দিয়ে ঢুকলে ডান দিকের বাড়ির (তখন ১২, বর্তমান ৩২ নং) বাসিন্দা (occupier) হিসেবে পাচ্ছি প্রিয়নাথ দত্তকে। কলকাতা পুরসভার ১৮৯০-৯২’এর নথি অনুযায়ী ১২ নং এই দোতলা বাড়ির মালিক ছিলেন মন্তাজি (মাহাতাজি) গয়ালি এবং লাগোয়া ১১ নং বাড়িও ছিল হীরালাল পাঠক গয়ালির (গয়ার পাণ্ডাদের ‘গয়ালি’ বলা হত)। ‘মনোমোহন বসুর অপ্রকাশিত ডায়েরি’তে প্রিয়নাথ দত্তকে ‘রাধাকৃষ্ণ মাহাতো (মাহাতা) নামক গয়ালীর গমস্তা’ হিসেবেই পরিচয় দেওয়া হয়েছে। ১৯১৫-য় এই বাড়ির বাসিন্দা নারায়ণলাল মহৎ। ১৯৩৬-এ ৩২ কৈলাস বোস স্ট্রিটের বাড়ির বাসিন্দা এন এল মাহাতা (N L Mahata)। অনুমান করা যায় নারায়ণলাল মহৎ ও এন এল মাহাতা একই ব্যক্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে সে কালে অনেকেই গয়ার পাণ্ডাদের ঘরবাড়ি বা জমি দান করতেন। ৩২ নং বাড়ির মালিক বাস্তবিকই ছিল এই মাহাতা পরিবার। এর বর্তমান বাসিন্দা শিশু মণ্ডল বাড়ি হস্তান্তরের সময় গয়ার পাণ্ডারা এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন। তথ্যটি সমর্থন করেছেন গয়ার কৃষ্ণদ্বারিকা মহল্লার বাসিন্দা, নারায়ণলালের অন্যতম অধস্তন পুরুষ অরুণলাল মাহাতা। পাশাপাশি তিনি আরও জানিয়েছেন ‘ঠনঠনের কোনও এক দত্ত’ নাকি এই বাড়ি তাঁদের দিয়েছিলেন। তা হলে কি রাজকৃষ্ণবাবুই ১৮৬৯-৭০-এর মধ্যে দত্তদের কাছে ওই ১২ নং বাড়িটি বিক্রি করেছিলেন?
শ্রীশচন্দ্র ন্যায়রত্ন   
মানচিত্র অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, রাজকৃষ্ণবাবুর যে বাড়িতে (১২ নং সুকিয়া স্ট্রিট) প্রথম বিধবাবিবাহটি হয়েছিল তা কোনও মতেই আজকের ৪৮ নং কৈলাস বোস স্ট্রিট নয়। কারণ ১৮৫৯-র ‘ডিরেক্টরি’-তে ‘১২’-র যা অবস্থান, উনিশ শতকের প্রায় শেষ দিকের মানচিত্রে তার অবস্থানে বিশেষ বদল ঘটেনি। এটা বলা হচ্ছে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট ও মদন মিত্র লেনের অবস্থানসাপেক্ষে। আজও মদন মিত্র লেনের মুখোমুখি ঠায় দাঁড়িয়ে ৩২ কৈলাস বোস স্ট্রিট, সে দিনের ১২ নং সুকিয়া স্ট্রিটের ‘premises’। ‘১২’ বদলে গিয়ে ‘২৩’ (পরবর্তী কালের ৪৮ কৈলাস বোস স্ট্রিট) হয়নি কারণ দু’য়ের মাঝে আজ প্রায় ছ’খানা বাড়ির দূরত্ব। সুতরাং এই ‘৪৮’ রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় আশ্রয় বলেই ধরা যেতে পারে, প্রথম ভদ্রাসন এখানে ছিল বলে মনে হয় না। যাই হোক অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত ও এই বিধবাবিবাহের প্রথম বাড়ি-সংক্রান্ত ধারণার পুনর্বিবেচনা তাই প্রয়োজন।
রাজকৃষ্ণবাবুর বাড়ি থেকে যার সূচনা, তার সাফল্য কত দূর? মনে রাখতে হবে বিধবাবিবাহ নিয়ে আজও আমাদের ‘কেমন কেমন ভাব’টাকে। বিদ্যাসাগরের লড়াই ছিল সারা জীবনের। ‘শ্রীশচন্দ্রকে বৃক্ষে তুলিয়া দিয়া নিম্নে দণ্ডায়মান থাকিয়া সাহস প্রদান করিতেছেন’ বলে ‘প্রভাকর’-এর তির্যক মন্তব্যও সইতে হয়েছে তাঁকে। বালির কয়েক জন ভদ্রসন্তান ওই অনুষ্ঠানে কেবল দর্শক থাকার অপরাধেই অপদস্থ হন। আর ‘সুরধুনী কাব্য’য় উল্লিখিত ‘বিধবা সধবা করা পথ প্রদর্শক’ শ্রীশচন্দ্র তো স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রায়শ্চিত্ত করেই জাতে ওঠেন। আবার অন্য ছবিও ‘প্রভাকর’ই তুলে ধরেছিল— সিউড়ির শ্রীহরি চক্রবর্তী ‘জ্ঞাতি কুটুম্বের তাড়না’ সত্ত্বেও ‘বিধবাপত্নী ত্যাগপূর্বক প্রায়শ্চিত্ত করিয়া সমাজ ভুক্ত হইতে সম্মত’ হননি। তবে ‘বিধবার গর্ভ হওয়াতে সমাজ ভয়ে উহার আত্মীয়গণ ঔষধ প্রয়োগ বশত তাহা নষ্ট করে’— এ জাতীয় খবর উনিশ শতকের শেষ দিককার পত্রপত্রিকায়ও অজস্র। এমনকি হুগলিতে দুই যুবতী বিধবার মধ্যে সমকামী সম্পর্কের ইঙ্গিতও আছে ‘সম্বাদ রসরাজ’-এর মতো কাগজে। তা হলে কি বলব সার কথাটা অনেককাল আগেই বুঝে গিয়েছিলেন জানবাজারের ওই বুদ্ধিমতী মহিলাটি? ১২৮৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘রাণী রাসমণির জীবনচরিত’-এ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, সহমরণ প্রথা উঠিয়ে দেওয়ার সংবাদে রাণীর প্রতিক্রিয়া ছিল— এটা ‘‘ভালই বটে, কিন্তু বঙ্গ বিধবাদের পরিত্রাণের অন্যবিধ উপায় রহিল না। তাহারা যে কত কলঙ্ক রাশিতে কলঙ্কিত হইবে বলা যায় না।’’ হেমচন্দ্র আরও বলছেন, ‘‘বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হওয়া গিয়াছে যে, তিনি (রাসমণি) বিধবাবিবাহের উপসংহার ও বহুবিবাহ পুস্তকের অনেকাংশ শ্রবণ করিয়া সময়ে সময়ে অশ্রুবর্ষণ করিয়াছিলেন।’’

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/first-widow-remarriage-that-took-place-at-the-house-of-raj-krishna-bandhopadhyay-1.868868?ref=rabibashoriyo-new-stry