Thursday, 8 September 2016

প্রথম পার্থর কর্ণ যেন আমার বাবা (Interview of Buddhadeb Basu's daughter)

$image.name

প্রথম পার্থর কর্ণ যেন আমার বাবা

বুদ্ধদেব বসু। কেন আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন সমসাময়িক সাহিত্যিকদের? অভিযোগ, তিনি না কি রবীন্দ্রবিরোধী! কীসের খোঁজে তাঁর কাছে যেতেন শক্তি-সুনীলরা? সোজাসাপ্টা জবাব কবি-কন্যা দময়ন্তী বসু সিং-এর। সামনে স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

১২ ডিসেম্বর, ২০১৫, ০০:৪৮:০০
  
buddhadeb
দুপুর ছোঁওয়া ৩০ নভেম্বরের বিকেল।
সল্টলেকে নিজের বাড়িতে বুদ্ধদেব-কন্যা দময়ন্তী বসু সিং।
সামনে খোলা বাবার লেখার খাতা।
টেবিলের সব কাগজ ঠেলে হাতে তুলে নিলেন ডায়েরিটা। কাগজের ওপর কালো মুক্তোমালার মতো অক্ষর।  তার ওপরে আদরের হাত  বুলিয়ে বললেন, ‘‘বলুন, আজ কী জানতে চান...’’

পত্রিকা: নতুন প্রজন্ম বুদ্ধদেব বসু মানেই জানে শুধু বিতর্ক। কীসের এত বিতর্ক?
দময়ন্তী: আমার বাবা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। ওঁর প্রথম বই ‘বন্দীর বন্দনা’ থেকেই সেই কালের লোক ‘অশ্লীল’ কবি বা লেখক বলে ওঁকে চিহ্নিত করেছিলেন। আসলে উনি নারী-পুরুষের প্রেম এবং নারী দেহের বর্ণনা কবিতা বা গল্পের মধ্যে আনতে দ্বিধা করেননি। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসও অশ্লীলতার দায়ে পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু যখন বুদ্ধদেব বসুরা, তাঁর প্রজন্মের লেখক-কবিরা, মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেন, তখন তাঁরা রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে গিয়ে আরও উঁচু কণ্ঠে কথা বলতে চেয়েছিলেন।

পত্রিকা: এই বিতর্কের প্রশ্নে অশ্লীলতা বড় ছিল? নাকি বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্র বিরোধী, এটা বড় ছিল?
দময়ন্তী: এই প্রাথমিক পর্বে অশ্লীলতাটাই ‘আধুনিক’ কবি লেখকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বস্তু ছিল। সেটা যে একচেটিয়া বুদ্ধদেবের উপরেই আরোপিত হয়েছিল তা নয়। ‘কল্লোল’ গোষ্ঠী, যার হোতা ছিলেন দিনেশ রঞ্জন, সঙ্গে ছিলেন অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র’র মতো তরুণ সাহিত্যিকরা, তাঁরাও আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। ঢাকা থেকে বুদ্ধদেব বসু ‘কল্লোল’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। তখন থেকেই অচিন্ত্য-প্রেমেন-বুদ্ধদেব এই নাম তিনটি একসঙ্গে উচ্চারিত হত। ‘কল্লোল’-এই ‘রজনী হল উতলা’ বেরিয়েছিল। কাজেই বোঝা যাচ্ছে অশ্লীলতার দায় মাথায় নিয়ে সেই সময় থেকে শুরু করে ষাটের দশকে লেখা ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ পর্যন্ত বুদ্ধদেব বসুকে চলতে হয়েছিল। উনি সহাস্যে চলেওছিলেন।

পত্রিকা: ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ নিয়ে তো অশ্লীলতার দায়ে মামলা পর্যন্ত হয়েছিল ...
দময়ন্তী: সেটা একটা ঘটনাই বটে! এর আগেও তো বাবার একাধিক বই অশ্নীলতার দায়ে পুলিশের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।

পত্রিকা: আচ্ছা, দ্বিতীয় বিতর্কটা কী নিয়ে ছিল ?
দময়ন্তী: বাবা কলকাতায় এসে যখন ক্রমশ প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন, বাংলার সব্যসাচী লেখক বলে ওঁকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তখন মনে হয় কোথাও একটা প্রতিরোধ গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক ভেবেছি জানেন, কেন তাঁকে বার বার নানা ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে আমার মনে হয় ঢাকা-কলকাতা সাংস্কৃতিক বিভেদ তখনও যথেষ্ট তীব্র ছিল। বাংলা সাহিত্যের জগৎটা পুরোটাই দখল করে ছিলেন খাস পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যিকরা। তখন বুদ্ধদেব বসু নিতান্তই কিশোর। হাতে লেখা ‘প্রগতি’ পত্রিকা বের করেন, সজনীকান্তের (দাস) ‘শনিবারের চিঠি’-তে বাবা এবং জীবনানন্দ দাশ অশ্লীল ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। এই আক্রমণ আমাদের বড় হওয়া পর্যন্ত চলেছিল। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে ‘শনিবারের চিঠি’ গোষ্ঠীর প্রতিটি লেখকই মূলত পশ্চিমবঙ্গীয়। হয়তো একজন বেঁটে কালো বাঙাল ছেলের হঠাৎ কলকাতায় এসে আধুনিক বাংলা কাব্য-সাহিত্য নামক দ্রুতগামী রথের সারথি হওয়াটা এঁরা কেউ মেনে নিতে পারেননি। কেননা বাবা কোনও দলাদলি পছন্দ করতেন না। কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে আড্ডা দিতেন না। চিরকাল নিজের ঘরে বসে প্রচুর কাজ করতেন। তখনও পরিশ্রম করে চলেছিলেন সমসাময়িক ও তরুণতর কবিদের প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৯৩৫ থেকে ১৯৬১ অবধি প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকা আজও তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী। সত্যি বলতে তখন কবিতা প্রকাশের কোনও জায়গাই ছিল না। প্রতিষ্ঠিত মাসিকগুলিতে কবিতার জায়গা হত (রবীন্দ্রনাথ ছাড়া) গদ্য রচনার নীচে। ‘কবিতা’ পত্রিকার আগেও উনি বিষ্ণু দে’র কবিতার বই ছাপেন। সত্যি বলতে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’ পর্যন্ত সবই সর্বপ্রথম কবিতা ভবন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

পত্রিকা: এই বিতর্কের কথায় আপনি ‘প্রাথমিক’ কথাটা ব্যবহার করলেন। তা হলে আরও অন্যান্য কারণ আছে কি?
দময়ন্তী (একটু হাসলেন): হ্যাঁ আছে। সেই সময় অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া। কবিতা ভবনে তখন বুদ্ধদেব বসুর চারপাশে অনেক তরুণ কবি, যাঁরা পুরোপুরি সেই দলভুক্ত। বাবা-মা দু’জনেই সক্রিয় ভাবে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

পত্রিকা: তরুণ কবিরা কারা ছিলেন?
দময়ন্তী: সমর সেন, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়—ছোটবেলা থেকেই এঁদের কাকা বলেই জানি। বামপন্থী আন্দোলন যখন দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তার আগেই বুদ্ধদেব বসু অনুভব করেছিলেন অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট আন্দোলন আর আগের মতো নেই। শিল্পীর স্বাধীনতায় তাঁরা যেন হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছিলেন। কে কী লিখবে, পড়বে, ওপর থেকে নির্ধারিত হয়ে আসতে শুরু করল। এই বাধ্যবাধকতা বুদ্ধদেব বসু যে মানতে পারবেন না, সেটা তো স্পষ্টই ছিল।

পত্রিকা: বুদ্ধদেব বসু কি দল ছাড়লেন তখন?
দময়ন্তী: অবশ্যই বাবা দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তখন থেকেই বাবার বিভিন্ন লেখায় ব্যক্তির স্বাধীনতা, শিল্পীর স্বাধীনতার কথা।এই বক্তব্য বার বার তাঁর নানা প্রবন্ধে এসেছে। কিন্তু পরবর্তী কালে বামপন্থীরা তাঁর দল ছেড়ে যাওয়া, স্বাধীন মত প্রকাশের এই সাহস বরদাস্ত করতে পারেননি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদের মতো আপনজনরাও আর কবিতা ভবনের ছায়া মাড়াননি। পরে আমাকেও অনেক বিশেষ বিশেষ মানুষ বলেছেন, বুদ্ধদেব বসুর বই পড়া দলের মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছিল। তিনি নাকি ‘শ্রেণিশত্রু’। যাঁকে কমিউনিস্ট রেজিমে বলা হত ‘এনিমি অব দ্য পিপল।’

পত্রিকা: শুনেছি বুদ্ধদেব বসুকে একটি বিশেষ শ্রেণির লেখক বলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তিনি দারিদ্রচর্চায় মনোযোগী নন। তাঁর ওপর দক্ষিণপন্থী ও ‘গজদন্ত মিনারবাসী’, এটা ঠিক?
দময়ন্তী: (বেশ রেগে) কবিতা ভবন নামক প্রতিষ্ঠানটি যে কোন ধরনের গজদন্তের মিনার, যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন। বুদ্ধদেব বসু নিজের জন্য কোনও দিন বাদ-প্রতিবাদে নামেননি। তাঁর জবাবটুকু ‘মিনার’ নামক কবিতাটা পড়লেই বোঝা যাবে।

পত্রিকা: আর দক্ষিণপন্থা?
দময়ন্তী: একবার মার্কিন দেশে গেলেই মানুষকে যদি দক্ষিণপন্থী হতে হয় তা হলে বলার কিছু নেই। তিনি কেবল প্রতিষ্ঠিত লেখকই ছিলেন না, মেধাবী ছাত্রও ছিলেন। সেই জোরেই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে সরকারি উদ্যোগে প্রথম ১৯৫৪-তে মার্কিন দেশে পড়াতে যান। এর পরে যাদবপুরে ১৯৫৬-য় তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

পত্রিকা: বুদ্ধদেব বসু’র নামে রবীন্দ্র বিরোধিতার ধুয়োটা কবে থেকে উঠল?
দময়ন্তী: ( প্রচণ্ড উত্তেজিত) বিতর্ক সবচেয়ে বেশি উস্কেছিল রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষে (১৯৬১) যখন সারা পৃথিবী থেকে বাবার বক্তৃতা দেবার নিমন্ত্রণ আসে। প্যারিসে ওঁর একটি বিশেষ বক্তৃতা সূত্রে কোনও একটি সংবাদপত্র সম্পূর্ণ পরিকল্পিত মিথ্যা অপপ্রচার করতে শুরু করেছিল। আয়রনিক্যালি এই প্রবন্ধটি তার আগে ন’বার বাংলা ও ইংরেজিতে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে। এবং প্রথম বেতার ভাষণ হিসেবে লেখা হয়েছিল। তখন আমি কলেজে। এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল কত মানুষের আগ্রহ আসলে নোংরা গসিপে। সত্য-মিথ্যা বিচারে নয়। একটা সংবাদপত্রের পাতায় কত যে নোংরামি করা যায়, এটা তার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ বিষয়ে কথা বলতে ঘেন্না বোধ হয়।  

পত্রিকা: ওই বক্তৃতার মূল বাংলা ভার্সান তো ‘দেশ’ পত্রিকাতেই বেরিয়েছিল।
দময়ন্তী: হ্যাঁ, ওই সময় আনন্দবাজার গোষ্ঠী আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দেশ-এর সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তখন বক্তৃতাটির বাংলায় পুনর্মুদ্রণ করেন। এই সঙ্গে এম.সি সরকারের কর্ণধার সুধীর সরকার মানহানির মামলা করতে উদ্যোগী হন। যেটা অবশ্য আমাদের পরিবারের সর্বসময়ের শুভাকাঙ্খী সত্যেন বসু এসে নাকচ করেন। সংগৃহীত কাগজপত্র তৎক্ষণাৎ জ্বালিয়ে দিয়ে বহ্ন্যুৎসব করা হয়।
বুদ্ধদেব বসু-প্রতিভা বসু
পত্রিকা: অথচ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ সব প্রবন্ধ, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ‘সব পেয়েছির দেশে’-র পাতায় পাতায় ছড়ানো আছে। দুই অসমবয়সি কবির মধ্যে লেখা চিঠিপত্রেও ...
দময়ন্তী: (থামিয়ে দিয়ে) বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে যে ঠিক কী চোখে দেখতেন সেটা যদি কেউ জানতে চান, তা হলে শুধুমাত্র ‘সব পেয়েছির দেশে’ পড়াই যথেষ্ট। বাবা মাত্র ছয় বছর রবীন্দ্রনাথকে কাছে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আগ্রহে শান্তিনিকেতনে আমাদের পুরো পরিবার আমন্ত্রিত হয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত অতিথি হয়ে। আমেরিকা থেকে চিঠি লিখছেন বাবা— ‘‘চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে জগতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য। আমাকে শুধু রবি-তৃষ্ণায় পেয়েছে’’।

পত্রিকা: কিন্তু ১৯৩৫-এ ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের কবিতা চাইলেন না কেন?
দময়ন্তী: রবীন্দ্র-পরবর্তী যাঁরা নিজেদের আধুনিক বলে ঘোষণা করেছিলেন, তাঁদের রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরিয়ে আসতেই হত। বিশাল বটগাছের তলায় ছোট গাছ থাকলে তার মৃত্যু অনিবার্য। ‘কবিতা’ পত্রিকার পুরোধা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা না চেয়ে শুধুমাত্র নিজেদের প্রজন্মের কবিদের নিয়ে তিনি একটি ‘লিটল ম্যাগাজিন’ (এই শব্দটিও বুদ্ধদেব বসুর অবদান) তৈরি করেন। সেটা তাঁদের ঔদ্ধত্য ছিল না। ছিল তারুণ্যের যোশ। তাঁদের দেখাতেই হত যে তাঁরাও স্বকণ্ঠে তাঁদের নিজস্ব কথা নিজের ভঙ্গিতেই বলতে পারেন। তবুও প্রথম সংখ্যাটি বাবা সাহস করে প্রথম রবীন্দ্রনাথকেই পাঠান। শুধু তাই নয়, অনুরোধ করেন দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে কবিতা দেওয়ার জন্য। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তৎক্ষণাৎ কবিতা পাঠিয়ে এই পত্রিকাকে স্বীকৃতি দেন।

পত্রিকা: চিঠিপত্রে দেখেছি ‘চোখের বালি’, ‘যোগাযোগ’ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথকে সরাসরি তাঁর মতামত দিয়েছিলেন। কী হয়েছিল?
দময়ন্তী: ‘চোখের বালি’র শেষ অংশে অর্থাৎ বিনোদিনীর মধ্যে সাহস ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের একটা বদল ঘটে যায়। সেটা বাবার পছন্দ হয়নি। সরাসরি রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন লেখকের অনেক সাহসী হওয়া উচিত ছিল। রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছিলেন এ কথা সত্যি। যা তিনি করতে চেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে করে উঠতে পারেননি।

পত্রিকা: ‘যোগাযোগ’এর ক্ষেত্রে?
দময়ন্তী: ‘যোগাযোগ’ প্রসঙ্গ অন্য রকম। বাবা বলেছিলেন ‘যোগাযোগ’-এর দ্বিতীয় খণ্ড হওয়া উচিত। কুমুদিনী-ই হোক বা বিনোদিনী, দেহ বিষয়ে তাদের ছুৎমার্গ ছিল না। তারা বঞ্চিত বলে বারে বারে প্রতিবাদ করেছে। বাবার এই কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ প্রতিভা বসু’র দিকে নাকি তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেছিলেন, দ্বিতীয় খণ্ড তোমার স্বামীকেই লিখতে বলো না গো। 

পত্রিকা: রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আপনার মায়ের নাকি বুদ্ধদেব বসু’র সঙ্গে বিয়ের আগেই দেখা হয়েছিল?
দময়ন্তী: ঠিক কথা। মা তখন হাওয়া বদলের জন্য কাকার কাছে দার্জিলিং-এ। শোনা গেল রবীন্দ্রনাথ আসছেন সেখানে। মা সারাদিন দাঁড়িয়ে রইলেন কবির যাওয়া-আসার পথে। কিন্তু কবির দেখা পেলেন না। সেদিন কবি অন্য পথে গিয়েছিলেন। মা যখন অপার দুঃখে হাহুতাশ করছেন তখনই এক বেয়ারা মারফত চিঠি এল। প্রতিমা দেবী লিখেছেন অমুক দিন বিকেলে ওঁর সঙ্গে চা খেলে বাবামশাই খুশি হবেন। মা তো আকাশ থেকে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ  নাকি মায়ের দেখা পাওয়া মাত্র বলেছিলেন, তুমি তো সবার গান গাও। আমার গান তো গাও না! এখন থেকে রোজ ভোর হলেই চলে আসবে, আমি তোমায় গান শেখাব।
বুদ্ধনামা
সাড়ে ছ’টায়: ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা। (সেটা আর খেতেন না)।
সকাল সাতটায় আবার গরম গরম চা।
ন’টায় প্রাতরাশ: ডিম (অবশ্যই হাফ বয়েল। পরে সেটা আবার ওয়াটার পোচ হয়ে গিয়েছিল), টোস্ট। স্বাস্থ্যের কারণে পরে পাঁউরুটির ওপর চিকেন লিভার স্প্রেড দিয়ে।
লেখার টেবিলে লেখা শুরু।
দুপুর একটা থেকে দেড়টা: স্নান সেরে মধ্যাহ্নভোজ। ডাল, ভাত, মাছ (একটা ছোট মাছ। একটা বড় মাছ)। দই।
আবার লেখার টেবিলে ফেরা। এর মাঝে অগুন্তি সিগারেট আর চা।
বিকেল পাঁচটা: চা এবং সিগারেট। টায়ের খুব একটা চল ছিল না।
দশটা: রাতের খাবার। শেষের দিকে গ্লাসভর্তি বরফে হাফ পেগ ইন্ডিয়ান হুইস্কি। রোজ।
রুটি, মাংস।
পত্রিকা: সবার গান গাও বলতে?
দময়ন্তী:  মা ধ্রুপদী গানের চর্চা করতেন। অতুলপ্রসাদ, নজরুল, দিলীপ রায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়—এঁদের গানই রেকর্ড করেছিলেন। ঢাকায় বসে সঠিক ভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার কোনও গুরু পাননি। সে কারণেই নিজের মনে গাইলেও রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করার সাহস পাননি। তখন ভদ্র পরিবারে মেয়েদের রেকর্ড করা, গান করা ভাল চোখে দেখা হত না। কিন্তু ওঁর প্রতিভার আশৈশব এত খ্যাতি ছিল যে দিলীপ রায়, নজরুল—এঁরা তাঁকে নিজেদের গান নিজেরাই তুলিয়েছেন। দিলীপ রায় অবশ্য অতুলপ্রসাদ আর দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানও শিখিয়েছিলেন। দার্জিলিং যাত্রায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখালেন।

পত্রিকা: নজরুল এবং প্রতিভা বসু’র যে আশ্চর্য সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল সেটা নিয়ে বলুন না ...
দময়ন্তী:  ‘জীবনের জলছবি’-তে  মা লিখেছেন সে সব দিনের কথা। আমাদের বাড়িতে নজরুলের সেই গানের খাতা আজও আছে, যার মধ্যে মায়ের ঢাকার বাড়িতে বসে নজরুল মা-কে যত গান শিখিয়েছিলেন তার বড় অংশ নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন। প্রতিটি গানের তলায় ওঁর সই। রাগ-এর নাম লেখা। মা-কে উনি গানের বই উৎসর্গ করেছেন। নিজের হাতে লিখেছেন—‘কিন্নরকণ্ঠী রাণু মনিকে কবিদা’, ‘কোকিলকণ্ঠী রাণু মনিকে কবিদা’। সেই বাচ্চা মেয়েটির মধ্যে যে প্রতিভা দেখেছিলেন, তাকে কুর্নিশ না করে পারেননি।

পত্রিকা: আপনাদের ২০২ বাড়ির আড্ডায় শুনেছি বসু দম্পতি পরবর্তী প্রজন্মকে প্রচুর প্রশ্রয় দিয়েছেন। এও শুনেছি যাঁরাই আসতেন, তাঁরাই আপনার মায়ের ভক্ত হয়ে যেতেন।  আপনার বাবা …
দময়ন্তী: (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) কী ভাবে নিয়েছেন, তাই তো?

পত্রিকা: তাই।
দময়ন্তী: বাবা জানতেন, বিশ্বাস করতেন, মা একজন বিশেষ নারী। আমরা তো সারাক্ষণ মজা করে বলতাম, মা তোমার কাছে আমরা সবাই হেরে গেছি। ২০২ নম্বরে যিনিই আসতেন, তিনিই মায়ের ভক্ত হয়ে যেতেন। আনন্দবাজারের প্রাক্তন বার্তা সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষ মায়ের নাতনি তিতির কিশোরী হওয়ার পরে হঠাৎ একদিন আমাকে আর দিদিকে বললেন, ‘তোমরা এখন মধ্যপদলোপী সমাস’ অর্থাৎ মা আর তিতিরের মধ্যে আমরা বেচারিরা একদম আউট!  একজন রোম্যান্টিক কবি হিসেবে বাবা এটা উপভোগই করতেন। আসলে বাবার মধ্যে কোনও দিনই কোনও সন্দেহ, সংস্কার, এসব কিছুই দেখিনি। শুনেছি ফুলশয্যার রাতে বউয়ের শাঁখা ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন! কোনও সংস্কার আমাদের কারও মধ্যে থাকুক সেটা চাননি কখনও। বাঙালি বাড়ির রবিবারের দুপুরের মাংস-ভাতের মতোই আমাদের বাড়িতে হত বিফের ঝোল।

পত্রিকা: আপনার বাবার বিষয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন— ‘তরুণদের মধ্যেও তরুণতম।’ বুদ্ধদেব বসুর সন্তানের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে এ রকম উক্তি আর কারও ভাগ্যে জোটেনি। আপনার বাবা কি সেই প্রজন্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন?
দময়ন্তী: উনি তো সময়ের আগে হেঁটেছেন। তাই সবচেয়ে উপভোগ করতেন তরুণদের সংস্পর্শ। সুনীলের আগের প্রজন্মে যে চার যুবক ২০২-এর আবহাওয়াকে আনন্দে মুখর করতেন, তাঁরা ছিলেন অরুণ সরকার, নরেশ গুহ, অশোক মিত্র, নিরুপম চট্টোপাধ্যায়। এঁরা রাত তিনটেয় কড়া নেড়ে লেক-এর গাছ থেকে শিরীষ ফুল এনে চা দাবি করতেন। বাবা-মা আনন্দে তাঁদের আবদার মেটাতেন। এঁদের পাগলামি খানিক থিতু হওয়ার পর এল সুনীল-শক্তিদের দল। বাবার সঙ্গে বসে সিগারেট খাওয়া ওঁরা সবচেয়ে বেশি এনজয় করতেন। বাবা নিজেই সিগারেট অফার করতেন।
আর অরুণ সরকার তো মায়ের জন্মদিনে কবিতাই লিখে ফেললেন, ‘সিন্দুক নেই : স্বর্ণ আনিনি,/ এনেছি ভিক্ষালব্ধ ধান্য।/ ও দুটি চোখের তাৎক্ষণিকের/ পাব কি পরশ যৎসামান্য?’ বাবা এক দিন আমাকে বললেন, ‘তোর জন্য খবর আছে। অরুণ সরকারের বিয়ে।’ আমি তো শুনে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়েছিলাম (হাসি)।

পত্রিকা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তো ২০২-এ খুব নিয়মিত যেতেন!
দময়ন্তী: সুনীল-শক্তি যখন তখন এসে প়ড়ত। বাবার সঙ্গে কবিতার ছন্দ নিয়ে তর্ক জুড়ে দিত ওরা। দু’জনেই খুব ভালবাসত বাবাকে। বাবারও ছিল তাদের প্রতি অপত্য স্নেহ।

পত্রিকা: আচ্ছা শিবনারায়ণ রায়ের কাছে সজনীকান্ত দাস আপনার বাবাকে কি কিছু মেসেজ পাঠিয়েছিলেন?
দময়ন্তী: আজ যা বলব, তা পুরোটাই শিবনারায়ণ রায়ের মুখে শোনা। এই কথাটা প্রকাশ্যে বলতে পারি কি না, তার অনুমতিও শিবনারায়ণ রায়ের কাছ থেকে আমি নিয়ে রেখেছিলাম। সজনীকান্ত দাস যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন শিবনারায়ণ রায়কে বাবার কাছে পাঠিয়েছিলেন। বাবাকে বলতে বলেছিলেন, বাবার প্রতি তাঁর আচরণের জন্য তিনি সত্যিই অনুতপ্ত। বাবা যেন তাঁকে ক্ষমা করে দেন।

পত্রিকা: তার পর?
দময়ন্তী: শিবনারায়ণ রায়ের কাছেই শুনেছি, কথাটা শুনে বাবা খানিক ভাবলেন। তার পর শিবনারায়ণ রায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি ওঁকে ক্ষমা করতে পারলাম না। এমনই দৃঢ়, ভেতরে ভেতরে কঠোর মনের মানুষ ছিলেন বাবা। কোথাও কোনও সমঝোতা করেননি। অথচ সেই বাবাই আমায় শিখিয়েছিলেন সজনীকান্তের মেয়ের সঙ্গে আমেরিকায় দেখা হলে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে। বাবা বলেছিলেন, ‘‘আমরা ইতালিয়ান নই যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শত্রুতা টানব।’’

পত্রিকা: বাংলাদেশের কবিদের অনেক কবিতাও ‘কবিতা’ পত্রিকায় বেরিয়েছে। ওখানে বুদ্ধদেব বসুর প্রতি অনুরাগ এখনও প্রগাঢ়...
দময়ন্তী: বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিরা আমাকে নিজেরাই বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কেমন করে পড়ব, তা শিখিয়েছেন বুদ্ধদেব। আবার জীবনানন্দ কেমন করে বুঝব, তাও জানিয়েছেন তিনিই। অন্য দিকে অমিয় চক্রবর্তীকেও বুদ্ধদেবের জন্যই চেনা।

পত্রিকা: দু’জন প্রতিভাবান মানুষের সন্তান আপনি। মা, না বাবা, কাকে আগে রাখবেন?
দময়ন্তী: মা-বাবাকে কখনও কি আগে পরে করা যায়! তবে বাবার জন্য মন কেমন বড্ড বেশি। এত দেশ তো ঘুরলাম, কত জ্ঞানীগুণী মানুষও দেখলাম। আমার বাবার মতো অমন অসূয়াহীনচিত্ত আর একজনকেও পেলাম না।
আজ মনে হয়, ‘প্রথম পার্থ’র সেই কর্ণ আর কেউ নয়, আমার বাবা-ই। লোহার বর্ম পিঠে নিয়ে অগুনতি সৈন্যের মাঝে লড়ছেন নিজের লড়াই। কেউ যদি সত্যিকারের গুণগ্রাহিতা নিয়ে বাবাকে পড়েন, তা হলে দেখবেন, উনি কী
ভাবে ক্রমশ পরিণত হয়েছেন।
আবেগে ভেসে না গিয়ে যে আঁধার আলোর অধিক, সেই জায়গায় নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/damayanti-basu-singh-on-his-father-poet-buddhadeb-basu-1.260007

চরণ ছুঁয়ে যাই by শংকর

$image.name

চরণ ছুঁয়ে যাই

সেই সব অগ্রজদের। যাঁদের কেউ বলতেন, পাক্কা শয়তান না হলে খাঁটি ঔপন্যাসিক হওয়া যায় না! কেউ সাহিত্যে মিষ্টতা আনতে খেতে দিতেন গুঁড়ো রাবড়ি। ৭ ডিসেম্বর তাঁর ৮২ বছর ছুঁয়ে সাহিত্যজীবনের বহু ঘাত-অভিঘাত, মান-অপমানের কাহিনিতে শংকর

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:০০
  
 
1

লেখক, ১৯৭৫

প্রত্যেকটা জীবনই সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত ধারাবাহিক উপন্যাস।
হঠাৎ একদিন ছাপা শুরু হয়ে যায়। তার পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস, কখনও বা বছর ধরে চেনা-জানা চরিত্রদের কী হবে তা ঈশ্বরও জানেন না, যাঁর জানবার কথা সেই লেখকও অনেক সময় জানেন না, জানলেও মুখ খোলেন না।
বিশ শতকের মধ্যপর্বে, বাংলা কথাসাহিত্যের সুবর্ণ যুগে স্মরণীয় সাহিত্য-চরিত্রদের কী পরিণতি হতে চলেছে, তা নিয়ে ঘরে ঘরে বিশেষ উত্তেজনা।
এই সময়েই অন্দর মহলে প্রবেশ করে আমি কোনও এক সময়ে এই ধারাবাহিক উত্তেজনার অংশ হয়ে পড়েছি, এই মহাউদ্যমের স্রষ্টা এবং অংশীদারদের খুব কাছ থেকে দেখার দুর্লভ সুযোগও পেয়ে গিয়েছি।
শুধু যা বুঝতে পারিনি, সাহিত্যের রান্নাঘরে এমন ভাবে প্রবেশের সুযোগ কম স্বদেশবাসীই পেয়ে থাকেন। এই বিষয়ে কাউকে খুব খুঁটিয়ে প্রশ্ন করার সাহসও মাথায় আসেনি।
মাতৃমুখে শুনেছি, যাঁরা প্রাণ তুচ্ছ করে বাংলায় ধারাবাহিক লেখার দুঃসাহস দেখান, তাঁরা সব ‘ম্যাজিশিয়ান পি সি সোরকার’। কী করে কী হয় তা তাঁরা মুখ খুলে কাউকে না-বলতে খোদ সম্পাদকের কাছে দায়বদ্ধ।
খোদ সম্পাদকদের মাথার মণি তৎকালীন ‘দেশ’ পত্রিকার সাগরময় ঘোষ সবজান্তা হয়েও একটা বেপরোয়া ভাব নিয়ে চলতেন।
বলতেন, ‘‘আমার কোনও চিন্তা নেই, আমার ব্যবসা স্টেজ ভাড়া দেওয়া, কে কী রকম গাইবে, বাজাবে, নাচবে সে আর্টিস্ট বুঝবে। আদর হলে সে-ই পাবে। আর পাবলিকের মনে না ধরলে কেউ ভবিষ্যতে তার নাম মুখে আনবে না। রিটায়ার্ড আর্টিস্টকে রি-এমপ্লয় করা আমার ব্যবসা নয়, আমাকে সারা ক্ষণ নতুন লেখককে খুঁজে বার করতে হবে।’’
‘‘আর স্টেজে খুব নাম হলে?’’
‘‘আমি তাকে আবার তাতাব, জিজ্ঞেস করব আবার কবে শুরু করবেন? মাতৃগর্ভে অন্তত দশ মাস দশ দিন তো সৃষ্টিকে রাখতে হবে! কিন্তু মুশকিল হল, সাফল্য এলে অনেকের পক্ষেই মাথা ঠিক রাখা শক্ত হয়, আমি তাই মধ্যপথের পথিক হয়ে একজন সফল লেখকের সঙ্গে আরেক জন ‘ভার্জিন আর্টিস্ট’কে একই সঙ্গে এই সাপ্তাহিক যজ্ঞের আসনে বসিয়ে দিতে চাই। আমার দায়িত্ব বেড়ে যায়। লোকে নিন্দা করতে চায় যে আমি শিল্পী নির্বাচনে বেস্ট লোক নই।’’
প্রেমেন্দ্র মিত্র
‘‘তবু আপনি নতুন লোক খুঁজে বেড়ান যাতে দেশের এবং দশের শ্রীবৃদ্ধি ব্যাহত না হয়।’’
সে ছয় দশক আগেকার কথা।
প্রথম বইয়ের কয়েকটা কিস্তি লিখে ভাগ্যক্রমে চিৎপুরে আনন্দবাজারের অফিসে প্রায় অবিশ্বাস্য পথে সাগরময়ের ‘ভার্জিন সিলেকশনে’ পড়ে গিয়েছিলাম।
কয়েকটা কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাতে ফল। উকিলের মুহুরি বা ব্যারিস্টারের ‘বাবু’ থেকে বাঙালি সাহিত্যিক।
সাগরময় বন্ধুমহলে বলতেন, ‘‘আইসিএস-এমএ গোল্ড মেডালিস্ট-ঈশান স্কলার থেকে নন ম্যাট্রিক বেকার বাঙালি পর্যন্ত সব এক। সাপ্তাহিক কিস্তিতে পত্রিকার পাঠক এবং পাঠিকাদের মন জয় করতে পারলে ‘সেভেন মার্ডারস’ অর্থাৎ সাতখুন পর্যন্ত মাপ, অথবা জামিনযোগ্য অ্যাক্টিভিটি।’’
চিৎপুরের বিখ্যাত ফলপট্টিতে তখন সাহিত্য-পত্রিকার অফিস।
দুর্জনরা বলত, ওখানকার স্পেকুলেশনটাই শিখেছিলেন গুরুদেবের শান্তিনিকেতনে বড় হয়ে-ওঠা সাগরময়।
ধারাবাহিকের ক্যান্ডিডেট নির্বাচন করেই সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যেতেন সাগরময়। বলতেন, ‘‘ক্যান্ডিডেটকে প্রত্যেক সপ্তাহে বাঁচিয়ে রাখাটাই আমার কাজ। যত ক্ষণ না লেখার শেষে ছোট্ট করে ঘোষণা করতে পারি ‘আগামী সংখ্যায় সমাপ্য’।’’
‘‘তার মানে, ঘোষণার পরের সংখ্যায় শেষ যে-কিস্তিটা বেরুবে সে সম্বন্ধে আপনার কোনও মাথাব্যথা নেই।’’
‘‘মোটেও তা নয়। ওই পর্বটা হাতে না-পাওয়া পর্যন্ত তো ‘সমাপ্য’ ঘোষণাটা ঘোষিত হচ্ছে না! আমার টাইটেলটাও তো ঘোষ!’’
‘‘আপনি একটা ডেঞ্জারাস কথা বললেন—‘প্রত্যেক সপ্তাহে’ বাঁচিয়ে রাখা। একবার মারা গেলে কোনও লেখকই তো বেঁচে উঠবেন না!’’
‘‘কী বাজে কথা বলছ! জন্ম থেকে‌ই তো শান্তিনিকেতনে শুনছি একমাত্র লেখকরাই অমর হতে পারেন! ওখানে যারা ঘর ঝাঁট দেয় তারাও জানে মরার পরেও লেখকদের পাঠককুল বাড়তে থাকে। তবে আমার ভাগ্য ভাল, শেষ কিস্তি সাপ্লাই না করে দুম করে মরে যাওয়ার তেমন কোনও কেস আমার জীবনে নেই। সমস্যা হল বেঁচে থেকেও কিস্তিবন্দি লেখকদের মরে যাওয়া।’’
তরুণ একজন সাংবাদিক বললেন, ‘‘এই জন্যেই বিলেতে প্রশিক্ষিত অনেক নিউ এজ সাংবাদিক চান পুরো পাণ্ডুলিপিটা সেফ কাস্টডিতে নেওয়া, তার পর হপ্তায় হপ্তায় ছেপে যাবে।’’
এই কথা শুনে ওয়ার্ল্ডের সেরা সম্পাদক বলেছিলেন, তা হলে সেটা কী করে ‘ধারাবাহিক’ হল? ওটা তো ডিপ ফ্রিজে দেড় বছর রেখে দেওয়া মাংস!
তার পর তাঁর আরও ব্যাখ্যা—ধারাবাহিক অত সহজ নয়, প্রিয়জনদের সামনে বসিয়ে তোলা উনুনে এক একটা রুটি সেঁকে দেওয়া সাহিত্য-রন্ধনকে অন্য একটি স্তরে নিয়ে যায়।
উনুনে সেঁকতে সেঁকতে পাকা রাঁধুনি কখনও একটু কম ফুলিয়ে, কখনও একটু বেশি ফুলিয়ে, কখনও একটু বেশি পুড়িয়ে, কখনও একটু কম পুড়িয়ে, পাতে পাতে হপ্তায় হপ্তায় ছুড়ে দেন।
বিজ্ঞাপন লাইনে এর নাম ‘ফিডব্যাক’, যা রাঁধুনি চোখে দেখেন এবং কানে শোনেন।
তার পর সেই অনুযায়ী প্রত্যেক সপ্তাহের রান্না করেন। আরও শুনতাম, ঐতিহাসিক ভাবে সফল কিস্তিবন্দি লেখকদের ফরমুলা হল, পাতে একটা, সম্পাদকের হাতে একটা এবং লেখকের লাইনটানা প্যাডে আর একটা।
আরও শুনতাম নানা দুঃসাহসের কথা, এ কালের কালজয়ী সব কথাসাহিত্যের কথা, শতশত পৃষ্ঠার অনন্য সব সৃষ্টি, যা অর্ধশতাব্দী পরেও দেশবিদেশের রুদ্ধশ্বাস পাঠক-পাঠিকারা আজও পড়ছেন। কিন্তু তার পিছনে লেখকের এক পৃষ্ঠার ওয়ার্কিং পেপার নেই।
এঁদেরই অন্যতম এক কালজয়ী লেখক বলতেন, ‘‘নোটবইফই ওসব গবেষকদের স্বভাব। যাঁরা কেবল অপরের উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেই প্রাণে বাঁচে, নতুন কোনও মন্তব্য তাঁদের ছাঁকনিতে থাকে না। ওটা অন্য ব্যাপার।’’
ভিতরে ভিতরে একাধিক ধরনের ধারাবাহিক-লেখকের বিবরণ লোকমুখে সার্কুলেশন হত।
বিমল মিত্র, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, মুজতবা আলী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র।
এঁদের এক এক জনের এক এক স্টাইল। আলীসায়েব বলতেন, লেখক অনুযায়ী ধারাবাহিকের ধর্মও আলাদা। কারও কারও প্রত্যেকটা কিস্তিই স্বপরিপূর্ণ, পাঠকের যা প্রাপ্য তা প্রতিবারই নগদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং হঠাৎ কিস্তি বাধাপ্রাপ্ত হলে সম্পাদকের বা বিশ্বসংসারের কিছু এসে যাচ্ছে না।
এই ভাবেই মুজতবা আলী অথবা শিব্রাম চক্রবর্তীর কিছু কালজয়ী রচনা আমরা পেয়েছি।
উল্টো দিকে শিব্রাম চক্রবর্তী বলতেন, ‘‘কেউ কেউ ফুলের বাগানে বা সব্জির খেতে এসেছে। প্রত্যেক সপ্তাহে যা পছন্দ, তা পটাপট ঝুড়িতে বা সাজিতে তুলে দায় সেরে নিচ্ছে। কেবল লেখকই হিসেব করে নিয়েছেন, একদিন এই সব ফুল দিয়ে কী ধরনের মালা গাঁথা হবে, অথবা সমস্ত সব্জি থেকে কোন চচ্চড়ি বা ঘণ্ট শেষ পর্যন্ত কোন ভোজনে লাগবে।’’
সুরসিক শিব্রাম আরও বলতেন, ‘‘মেসের বিল মেটাবার জন্য যাঁরা দৈনিকে, সাপ্তাহিকে অথবা মাসিকে ‘কলাম’ চালিয়েছেন, তাঁরাই বিশেষ ভাবে জানেন, এই ধরনের ধারাবাহিকতা কত সহজ এবং কত কঠিন। কিন্তু মিত্তিরদের খপ্পরে পোড়ো না। ওরা খালে, নদীতে, সমুদ্রে মাছ ধরতে বেরুবে, তাই বঁড়শি দরকার। ভাবছ, মাছ ধরবার জন্য। ওদের দুটো সেট বঁড়শি। একটা মাছকে টেনে তুলবার জন্য, আর একটা পাঠককে প্রতি হপ্তায় গেঁথে রাখার জন্যে। এই জন্যে ওরা অনেক ছকটক কেটে নেয়, প্রত্যেক কিস্তির কোথায় ‘ক্রমশ’ শব্দটি ছাপা হবে, তা এদের কাছে মস্ত ব্যাপার। পাঠককে ওরা কিছুতেই বঁড়শি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেবে না।’’
ধারাবাহিক সংক্রান্ত আরও কত মহামূল্যবান ‘টোটকা’ তখন যে শুনতাম তা ভাবলে দুঃখ হয়।
ঠিকমতন দ্বাদশ মহারথীর পলিসি তখন ঠিকঠাক ভাবে লিখে রাখলে যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে একটা সাম্মানিক ডক্টরেট দিয়ে দিতে পারত।
নবযুগের গুণমুগ্ধ পাঠক-পাঠিকারাও বাড়তি কিছু পেতেন মৃত লেখকদের জীবিত চরিত্রদের আচরণ থেকে, এবং বুঝতে পারতেন তেমন গল্প-উপন্যাস এখন কেন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। আকারে ঢাউস হয়েও প্রধান চরিত্রগুলো কেন চুনো মাছ মনে হচ্ছে, অথবা মনে হচ্ছে স্বদেশের খালবিলে এদের জন্ম নয়, অন্য দেশের গভীর সমুদ্র থেকে তুলে এনে ডিপ ফ্রিজে রেখে, এদেশে তাদের পুজো করা হচ্ছে।
সাহিত্যের সারস্বত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে একই সঙ্গে পেয়েছি ‘র‌্যাগিং’ বা নিপীড়ন।
এই দু’দলের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
ধারাবাহিক থেকে বই প্রকাশ হবার আগে দিল্লি থেকে সম্পাদককে অভিনন্দন এবং নবাগতকে সুস্বাগতম জানিয়েছিলেন আর একজন কিংবদন্তি সম্পাদক ও লেখক সন্তোষকুমার ঘোষ।
পরে আশীর্বাদ জুটেছিল ধারাবাহিকের নিয়মিত পাঠক অন্নদাশঙ্কর রায় (আইসিএস) মহাশয়ের কাছ থেকে, যিনি জানিয়েছিলেন, আপনার প্রথম সাফল্য যেন জীবনের শেষ সাফল্য না হয়।
এই আশীর্বাদ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা কিছু দিনের মধ্যে হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম।
মন্দিরপ্রাঙ্গণে তীর্থ দরশনে এলে যে বহু জনকে বারেবারে সম্মানিত করতে হয় তা আমার তেমন জানা ছিল না। এমনই একজন শক্তিমান আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন কোন প্রকাশককে আমি বইটা দেব এবং এ বিষয়ে মনস্থির করতে আমি একটু সময় ভিক্ষা করায় তিনি বেশ কয়েক বছর আমার সঙ্গে বাক্যবিনিময় করেননি। এবং কয়েক জন পার্ষদ আমার অঙ্গে ‘ওয়ান বুক অথর’-এর ছাপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। উকিলের মুহুরি কোন সাহসে সরস্বতীর স্নেহধন্য হতে চায়?
এই সময় বাংলার বিশিষ্ট লেখকদের ভালবাসা অকাতরে পেয়ে অপ্রাপ্তির দুঃখ বুক থেকে মুছে গিয়েছিল।
মা বলতেন, ‘‘কার কাছ থেকে কী পেলে তা কখনও ভুলবে না। মনে রাখবে পাওয়াটা তোমার পাওনাগন্ডা নয়। তিনি আরও বলতেন, তোমার কত ভাগ্য, বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মতন লেখকরা দ্বারভাঙা থেকে এসে তোমার বাড়ি খুঁজে আশীর্বাদ করে গেলেন, আমাকে বলে গেলেন, মা, একে দেখবেন যেন শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে লিখে যেতে পারে। লেখাটা বড় পরিশ্রমের এবং কষ্টসাপেক্ষ কাজ।’’
এই সময় ‘পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ’-র লেখকের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল।
বললেন, ‘‘ঠাকুরের আশীর্বাদ তোমার ওপর ঝরে পড়ুক। তারপর আমার শীর্ণ শরীরটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, এত কম বয়সে এ লাইনে কেন এলে ভাই? অনেক বছর তো টিকে থাকতে হবে! বড্ড কষ্টের কাজ।’’
আরও একজন ছিলেন যিনি সদাহাস্যময়। শিব্রাম চক্রবর্তী।
দেখা হলেই পকেট থেকে একটা লজেন্স অথবা একটু ‘রাবড়ি-চূর্ণ দিতেন, যা আসলে হরলিক্সের গুঁড়ো। বলতেন, ‘এটা সারাক্ষণ খাবে যাতে লেখা থেকে মিষ্টতা অদৃশ্য না হয়ে যায়।’
আরও বলতেন, সারাক্ষণ গোমড়া মুখে গল্পের প্লট ভাবলে বেস্টসেলার হওয়া যায়, কিন্তু বড় লেখক হওয়া যায় না। কাজিন-সিস্টারদের সঙ্গে নিয়মিত গল্পগুজব করা বিশেষ প্রয়োজন।
আরও একজন সদানন্দ সুরসিক লেখকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি তখনকার বিখ্যাত ‘অচলপত্র’ পত্রিকার সম্পাদক।
হাওড়ায় আমাদের পড়শি বিজয়গুরুর কাছে আসতেন। একদিন বইপাড়ায় দেখা হল।
বললেন, উকিলের ছেলে এবং ব্যারিস্টারের বাবু হিসেবে খুব বুদ্ধিমানের লাইন বেছে ফেলেছ, প্রতি সপ্তাহে উকিলদের দুনিয়ায় কোন মামলায় জজরা কী জাজমেন্ট দিল তা ছাপা হয়ে যায়। প্লটের দুশ্চিন্তা তোমার থাকছে না। একের পর এক প্রকাশকের খরচায় ‘কত অজানারে’ ওয়ান’, ‘কত অজানারে টু’, ‘কত অজানারে’ ছেপে যাও।
এই কথা শুনে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট ধরে এগিয়ে যাচ্ছি, তখন দীপ্তেনবাবু দ্রুতপদে এগিয়ে আসতে আসতে উঁচু গলায় বলছেন, একটু ভুল বলে  ফেলেছি ভাই! কিছু পয়সা তোমাকে সঞ্চয় করতে হবে, কারণ এই মহাগ্রন্থের লাস্ট খণ্ডের লাস্ট ফরমাটটার খরচ তোমাকেই দিতে হবে, যাতে থাকবে তোমার সঙ্গে তোমার প্রকাশকের মামলার বর্ণানাটা।
এর আগে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু বইটার নাম দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক সপ্তাহে প্রত্যেক পরিচ্ছেদের আলাদা আলাদা নাম। শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবাই বেশ চিন্তিত হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে প্রচ্ছদ শিল্পী অজিত গুপ্ত এবং নিউ এজ পাবলিশার্সের কর্ণধার জানকীনাথ সিংহরায়।
এক রবিবার জানকীবাবু আমাকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রবিবাসরীয় প্রভাত আড্ডায় নিয়ে গেলেন।
তিনিও বললেন, বড্ড বয়স কম। সভাসমিতিতে যেও না, লোকে ভুল বুঝবে। জানকীবাবু বললেন, বিভিন্ন দেবতার তেজে যেমন দেবী চণ্ডীর সৃষ্টি হয়েছিল, এরও তাই। অনেকে নানা রকম সিক্রেট শেয়ার করছে। রূপদর্শী ওর ফার্স্ট বইয়ের ফার্স্ট লাইনটা লিখে দিয়েছে। ওঁর সাজেশন : ‘এর নাম হাইকোর্ট’। ওটাই বইয়ের নাম হোক, কিন্তু লেখকের অনিচ্ছা। কেউ বলছে, নাম হোক ‘কালো গাউন’। কিন্তু এতে আমার আপত্তি। লোকে রহস্যকাহিনি ভাববে। বিয়েতে একদম যাবে না। এখন আপনিই ভরসা। ও শুনেছে আপনিই এখন নামের রাজা।
প্রেমেন্দ্র মিত্র মোটেই বিরক্ত হলেন না। একজন কমবয়সি ও অনভিজ্ঞ লেখককে বিপন্মুক্ত করাটা যেন তাঁরই দায়িত্ব, তা মেনে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভেবে জাজমেন্ট দিলেন, নাম তো রবিঠাকুরই দিয়ে গিয়েছেন— ডিটেক্টিভ গল্প নয়, উকিলের গল্প হয়েও তা নয়, মানবজীবনের অজানা রহস্যের ওপর এক কুমার কিশোরের আলোকপাত, অতএব, ‘কত অজানারে’।
আরও একটু ভেবে বললেন, অনেক দিন পরে বাংলা উপন্যাসে প্রধান চরিত্র এক বিদেশি। মানুষ বুঝবে রবীন্দ্র-কবিতাটির তাৎপর্য : ‘ঘরকে করিলে নিকটবন্ধু, দূরকে করিলে ঠাঁই।’
নামের মধ্যে না থেকেও ওই ব্যাপারটা অদৃশ্যভাবে উপস্থিত রয়েছে। ওইটাই জুনিয়র লেখককে সিনিয়র লেখকের বোনাস।
প্রেমেন্দ্র মিত্র আরও বোনাস দিয়েছেন এই লেখককে। রেলের চাকরিতে দরখাস্ত করতে পারছিলাম না।
প্রেমেন্দ্র মিত্র আমাকে ডেকে নিজের হাতে একটা অবিস্মরণীয় সার্টিফিকেট দিলেন। আর একবার দিল্লি ওয়ার্লড বুক ফেয়ারে বঙ্গীয় লেখকদের ডেলিগেশন লিডার হিসেবে তিনি বললেন, এই লেখকটির ওপর নজর রাখবেন, কঠিন বিষয়কে নিতান্ত সহজ করে বলার দুর্লভ ক্ষমতা ও আয়ত্তে এনেছে।
সভার শেষে বললাম, এ সব কী বললেন আপনি!
উনি হেসে বললেন, ওইটাই তো সব লেখকের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই জন্যেই তো শঙ্করাচার্যকে সরিয়ে রেখে ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে মানুষের এত মাতামাতি। এ সব আলাপ-আলোচনা পরে হবে। এখন চুপি চুপি আমাদের দু’জনকে যেতে হবে দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক মন্ত্রীর বাড়িতে, ছেলের চাকরিতে ট্রান্সফারের প্রচেষ্টায়।
সে অন্য এক গল্প, পরে বলা যাবে।
আমার মুশকিল হল, কোনও ব্যাপারেই কোথাও আমি একলা যেতে পারি না। নিন্দুকরা বলে, আমি যে সব পুরস্কার পেয়েছি তার যোগ্য আমি নই। কিন্তু এমনই আমার জনসংযোগ যে ‘লীলা পুরস্কার’ ছাড়া আর কোনও পুরস্কারই আমার অপ্রাপ্য রইল না।
কলকাতার এই পুরস্কারটি মহিলা সাহিত্যিকদের জন্য এবং কয়েক জন হিংসুটে সাহিত্যিক ওই নামের একজন বিখ্যাত লেখিকার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের প্রতি তির্যক মন্তব্য করতেন।
কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন সব অর্থে পরোপকারী বন্ধু। দিল্লিতে মন্ত্রী-সাক্ষাতে যেতে যেতে দুঃখ করেছিলেন, চাকরি-চাকরি করতে করতেই আমাদের জীবনটা গেল।  একবার আমি ঢাকায় চলে গিয়েছিলাম, সেই সময় আমার বন্ধু শিব্রাম আমার হয়ে অ্যাপ্লিকেশন পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি ফেরবার আগেই ইন্টারভিউ লেটার এসে গিয়েছিল। শিব্রাম টেলিগ্রাম করেছিল, কিন্তু আমি নির্ধারিত দিনে ফিরতে না-পারায় দুঃসাহসী শিব্রাম নিজেই ইন্টারভিউ দিয়ে এল এবং প্রেমেন্দ্র নিত্রের চাকরি হয়ে গেল। ফিরে এসে চাকরিতে জয়েন করে এলাম।
লেখকদের মধ্যে এমন ভালবাসা একসময় সম্ভব ছিল।
তারপর দুঃখ করলেন, এখন যা সব শুনি তা বিশ্বাসই হয় না। তিনি বলতে চাইলেন, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের খালের ওপারে সমকালের আর এক দিকপাল সাহিত্যিকের কথা। খালপাড়ে চেতলায় বিমল মিত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় নিবিড়। আর কোনও সাহিত্যসাধকের সঙ্গে এমন নিবিড় সখ্য আর হয়নি। কত সময় যে একসঙ্গে ব্যয় করেছি তার হিসেব নেই। সাহিত্যই ওঁর ধ্যানজ্ঞান। সাহিত্য, সাহিত্যিক এবং পাঠক-মানসিকতা সম্বন্ধে নিরন্তর যে সব স্পার্কলিং কথা বলতেন, তা ঠিকমতো সংগ্রহ করে রাখলে পাঁচ খণ্ডের একটা অবিস্মরণীয় বই হয়ে যেত। মস্ত বোকামি করে ফেলেছি। স্মৃতি যে প্রায়ই বিশ্বাসঘাতকতা করে, তা যখন বুঝলাম তখন দেরি হয়ে গিয়েছে।
সাহিত্যসৃষ্টির বাইরে আর কোনও কথাই তাঁর মুখ দিয়ে বেরুত না। যখন স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রসঙ্গ উঠত তখনও সেটা লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে উঠত।
বিমল মিত্র বলতেন, ‘‘বাংলা কথাসাহিত্যটা বঙ্কিম, শরৎ, বিভূতি থেকে বাউলদের হাতে চলে গিয়েছে, কিন্তু জেনুইন শয়তান না হলে জেনুইন নভেলিস্ট হওয়া যায় না। চাটুজ্জে-বাঁড়ুজ্যেদের উপন্যাসে ব্রাহ্মণোচিত দোষ থেকে যায়।’’
‘‘তাহলে ঘোষ-বোস-মিত্ররাই কথাসাহিত্যের প্রধান নাগরিক হবেন বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে?’’
‘‘ইয়েস। তবে সেখানেও অনেক গণ্ডগোল। খালপাড়ে আপনার শুভানুধ্যায়ী প্রেমেন্দ্র মিত্র সেই লিস্টিতে থাকছেন না। শুনুন, তাঁতি অনেক রকম হয়। কেউ গামছা বোনে, কেউ শাড়ি বোনে, অতি অল্প জনই কার্পেট বোনার হিম্মত রাখে। আমাদের বাংলায় যা উপন্যাস লেখা হয়েছে সব শাড়ি। কিন্তু মিত্তির ছাড়া কেউ সায়েব বিবি গোলাম, কড়ি দিয়ে কিনলাম লেখার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। আমাদের মুশকিল, যা পেয়ে আমরা গদগদ, সেগুলো আসলে বড় গল্প। জাত নভেল কাকে বলে তা আমাদের মাথায় ঢোকে না। ব্যাপারটা ক্ল্যাসিকাল গানের মতন, এর সমঝদার হতে গেলে ধৈর্য লাগে, ট্রেনিং লাগে, সেই সঙ্গে লাগে কান।’’
কোনও বাধা না দিয়ে এ সব কথা শুনে গিয়েছি।
বুঝেছি, উপন্যাসের নির্মাণ সম্বন্ধে এত বেশি চিন্তা করেন বলেই বিমল মিত্র নিদ্রাহীনতায় ভোগেন।
তিনি বলতেন, ‘‘ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়া ঠিক নয়, অনেক ভাল ভাল চিন্তা উঁকি মেরে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে।’’
জিজ্ঞেস করেছি, এতই যদি দুর্বলতা, তা হলে বাংলার কথাসাহিত্য আসমুদ্রহিমাচল জয় করল কী ভাবে?
বিমল মিত্র বলতেন, ‘‘শুনুন মশাই, দু’জন অবাঙালি লেখকের দুখানা বই আমাদের সর্বনাশ করে গিয়েছে। এঁরা হলেন বাল্মীকি এবং বেদব্যাস। রামায়ণ ও মহাভারত আমাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে গিয়েছে। তবে সশ্রম নয়, বিনাশ্রম কারাদণ্ড। কথাসাহিত্য যে কত কঠিন কাজ তা লেখক ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। নিজেকে নিঃস্ব করে নিবেদন করায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা থাকলে লেখক হবার কোনও চান্স নেই।’’
আরও সব আশ্চর্য কথা।
প্রত্যেকটি শত সপ্তাহের ধারাবাহিক উপন্যাস-লেখকের পরমায়ু দু’বছর করে কমিয়ে দেয়। উপন্যাসের পরিণতি কালে যত বেশি বাধা, তত সুলক্ষণ।
বিখ্যাত এক উপন্যাসের ধারাবাহিক রচনাকালে পাঠক-পাঠিকারা টেলিফোনে বলছেন, বন্ধ করুন এবং লেখকের মাথায় ঘোল ঢালুন। উনি সরকারি গ্রন্থালয়ে বসে লেখেন কেন? ওটা তো পড়ার জায়গা।
পরের কিস্তির মধ্যে প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে। সেই সময় গৃহিণীর কণ্ঠেও ব্যঙ্গের সুর। উপন্যাসের নায়িকাই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী! তাঁর সুখের সংসার ভেঙে দিতে চলেছে।
অথচ উপন্যাসের সেই সংসারের ভাগ্যবিধাতা লেখক নিজেই। কোনও কৈফিয়ত না দিয়েই সাজানো বাগান শুকিয়ে দেবার ক্ষমতা তাঁরই আছে।
এমন পরিস্থিতিও হয় যখন ঘরে-বাইরে সবাই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, ভাবে, কবে সাপ্তাহিক কল্পনার এই সংসার বন্ধ হতে চলেছে।
সম্পাদক অধৈর্য হয়ে জানতে চাইছেন কবে লিখতে পারবেন ‘আগামী সংখ্যায় সমাপ্য’।
অথচ কিছু নেশাগ্রস্ত পাঠক লিখে পাঠাচ্ছেন, এই ধারাবাহিক যেন কিছুতেই শেষ না হয়। শরৎ চাটুজ্যের ধারাবাহিকের সময় পাঠকরা লেখককেও বিশ্বাস করতেন না। তাঁরা রেজিস্ট্রি ডাকে অথবা টেলিগ্রাম করে দিতেন, খুব সাবধান! নায়িকার যেন কোনও রকম ক্ষতি না হয়। তাহলে তাঁরা আর গ্রাহক থাকবেন না।
এক একটা ধারাবাহিক যেন এক একটা ফাঁড়া। একমাত্র লেখকই যেন বুঝতে পারেন প্রত্যেক শেষের পরও আর একটা শুরুর ইঙ্গিত থাকে। যেমন প্রত্যেক শুরুর আগেও একটা শেষ থেকে যায়।
বিমল মিত্র ম্যাগনাম সাইজের সাপ্তাহিক ধারাবাহিকের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালবাসতেন। তারপর সমাপ্তির শেষে হাহাকার করতেন। বলতেন, নিষ্ঠুর বিধাতাও চরিত্রদের ওপর এত অবিচার করেন না।
এরই পাশে সৈয়দ মুজতবা আলি।
তিনি বলতেন, ব্রাদার! আমি বেদব্যাসের মতন কুচুটে নই। আমি পরমেশ্বরকে সোজাসুজি বলতে চাই, তুমি দয়াময় হতে পারো কিন্তু তোমার সময়জ্ঞান নেই। তুমি বৃদ্ধকে তরুণী ভার্যা দাও, দন্তহীন বৃদ্ধকে আমিনিয়ায় নেমন্তন্ন করে মজা দেখো।
বিশ্বসংসারের এত কিছু জেনেশুনেও অনেক সার্থকনামা লেখক ছোট ছেলেমেয়েদের মতন সমকালের অন্য স্মরণীয়দের সহ্য করতে পারেন না।
একজন বললেন, আমি মাথাধরার ট্যাবলেট আনতে দিয়েছি। এইমাত্র শুনলাম মেয়ের কলেজে প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা টেক্সট বুক হয়েছে। কী ভীষণ ব্যাপার বলুন তো! বাংলাভাষাটার সর্বনাশ হয়ে যাবে।
আমাকে স্তব্ধ দেখে ওই বিশিষ্ট লেখক বিশেষ ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন, আপনি ওঁকেও শ্রদ্ধেয় লেখক মনে করেন! সন্দেশ ও শুঁটকি মাছ একসঙ্গে খাওয়া যায় না মশাই।
এত দিনের দূরত্ব পেরিয়ে মনে হয়, বড় বড় স্রষ্টারা সমকালের দিকপালদের মূল্যায়নের ব্যাপারে অনেক সময় শিশুর মতন ব্যবহার করতে পারতেন।
পুণেতে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে এ নিয়ে মাঝে মাঝে কথা উঠত। তিনি মৃদু হাসতেন। কোনও মন্তব্য করতে চাইতেন না।
শেষ পর্যন্ত বলতেন, বিচক্ষণ লেখকরা নিজেদের নিয়ে এতই ব্যতিব্যস্ত থাকেন যে অপরের মূল্যায়ন করবার এক্তিয়ার তাঁদের থাকে না।
বড়ই স্নিগ্ধ চরিত্রের মানুষ ছিলেন শরদিন্দু। বলতেন, চান্স পেলে মাইনে-করা এক সংস্কৃত পণ্ডিতমশাই রাখবে, যাতে কয়েক ঘণ্টা তাঁর কথা শুনতে পারো। মনে রাখবে পাতার সংখ্যা অনুযায়ী বইয়ের দাম হওয়ার কোনও যুক্তি নেই। তাঁতিদের প্রত্যেক শাড়ির সাইজই এগারো হাত, কিন্তু দাম দেড় টাকা থেকে দেড় লাখ। আর মনে রাখবে, উপন্যাসের প্রথম তিরিশ পাতা পড়বার দায়িত্ব পাঠকের। তারপর ফুল রেসপনসিবিলিটি লেখকের। আর মনে রাখবে, তিনশ’ পাতার মধ্যে বলে দেওয়া যায় এমন বিষয় বিশ্বসংসারে খুব কমই আছে। আরও বলতেন, পরীক্ষার হলে বসে অন্য লেখকের নিন্দা-প্রশংসার সুযোগ নেই।
আমি ভেবেছিলাম, নিতান্ত ভদ্রতাবশত এ কালের বাংলার জনপ্রিয়তম কথাশিল্পী এই কথা বলছেন। কিন্তু তাঁর দেহাবসানের পর মুম্বইতে তাঁর পুত্রবধূদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁরা একটি ঘটনার কথা বললেন।
একদিন সকালের সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছিল প্রথম জ্ঞানপীঠ সম্মান তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হয়েছে। পুত্রবধূদের একজন বলে উঠলেন, ‘‘ঠিক হয়নি। বাবা, এ সম্মান আপনাকেই দেওয়া উচিত ছিল।’’
স্নেহময় শরদিন্দু শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘‘না মা, ওরা যোগ্য লোককেই সম্মানিত করেছে।’’
লেখক হিসাবে ৬০ বছর ধরে যত সাহিত্যস্রষ্টাকে দেখেছি, তার মধ্যে শরদিন্দুকেই আজও ভুলতে পারি না।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/writer-shankar-writes-his-journey-1.264826

ফরাসি কবিতার বাঙালি রাজকুমার

$image.name

ফরাসি কবিতার বাঙালি রাজকুমার

চিন্ময় গুহ

১৪ এপ্রিল, ২০১৬, ১১:৩৭:১৪
Loknath Bhattacharya

লোকনাথ ভট্টাচার্য। ছবি সৌজন্য: মার্ক ব্লাঁশে

লোকনাথ ভট্টাচার্যকে (১৯২৭-২০০১) প্রথম বার দেখে চমকে উঠেছিলাম। এত রূপবান হয় মানুষ? মনে হয়েছিল এক ইউরেশীয় ভাস্কর্যের সঙ্গে কথা বলছি। খালি গায়ে বসে ফরাসি দেশ ও সাহিত্য (সম্ভবত দেকার্ত) নিয়ে মৃদু স্বরে কিছু বলছিলেন। জানতাম তিনি পঞ্চাশের দশকে র‌্যাঁবোর ‘মাতাল তরণী’ ও ‘নরকে এক ঋতু’ অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর লেখা ‘কাক’ নাটক রেডিয়োতে শুনেছি, ‘বহুরূপী’তে পড়েছি ‘কালীমাতা রেশন ভান্ডার’। ‘ঘর’ আমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু জানতাম না, ফরাসি কবিতার জগতে কাল্ট ফিগার হয়ে আছেন যে ভারতীয়, তিনি লোকনাথ।
ভাটপাড়ার বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবারের এই বিদ্রোহী সন্তান শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় পড়াশোনা শেষ করে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে সে দেশে যান ১৯৫৩ সালে। সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতে পিএইচডি করার সময় বিদুষী ফরাসিনী ফ্রাঁস মঁতেরু (যিনি ক্রমশ হয়ে উঠবেন ফরাসি দেশ ও বাংলা ভাষাসাহিত্যের প্রধান যোগসূত্র)-র প্রেমে পড়েন। দেখা হয় আরাগঁ-র সঙ্গে, যিনি ‘লে লেত্‌র্‌ ফ্রাঁসেজ’ ও ‘য়্যরোপ’ পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করেন। তখন থেকেই লোকনাথ আধুনিক ফরাসি কবিতার ঐতিহ্য মেনে গদ্যকবিতা রচনায় মন দিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে নেফায় নাগা ট্রাইবালদের মধ্যে সংগীত ও নৃত্যের রক্ষণাবেক্ষণের চাকরি। পরে কিছু দিন পুদুচেরিতে কাটিয়ে ১৯৬১ সাল থেকে ‘স্প্যান’ পত্রিকায়। ১৯৬৩ সালে মলিয়েরের ‘তার্ত্যুফ’ অনুবাদ করেন। ১৯৬৫ সালে সাহিত্য অকাদেমির ‘ইন্ডিয়ান লিটারেচার’ পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৭২ সাল থেকে ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টে, ১৯৮১ সালে সেই সংস্থার ডিরেক্টর। পাশাপাশি চলেছে বিকল্প এক সৃজন।
কমলকুমারের মতোই বিকল্প বাংলা সাহিত্যের তিনি এক পুরোধা। ‘বাবুঘাটের কুমারী মাছ’, ‘অশ্বমেধ’, ‘গঙ্গাবতরণ’ এই শিশ্নোদরতন্ত্রী সময়ে নানা কারণে শিক্ষামূলক। কিন্তু কী করে তিনি জয় করলেন, বিবেকানন্দের ভাষায় ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা-গঙ্গার গোমুখ’ ফরাসি দেশ— যা সারা পৃথিবীর শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বপ্ন? যে দেশ রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা ও সত্যজিৎ রায়ের ছবিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়, যেখানে কল্কে পাওয়া সাধারণের ভাগ্যে জোটে না।
এই ঋজু বিশ্বমনা বাঙালি যে ভাবে শ্রেষ্ঠ ফরাসি মনের কাছে পৌঁছতে পেরেছিলেন, ঈর্ষণীয়। ১৯৯০-এর দশকে স্যাঁ-সুলপিস গির্জার সামনে এক অপূর্ব বইমেলায় (সেরা বই আর লেখকদের এমন সুভদ্র সমাহার প্যারিস ছাড়া আর কোথাও দেখিনি) কবিতাপাঠের আসরে তাঁকে নিয়ে কবিদের উচ্ছ্বাস দেখে হতবাক হয়েছিলাম! এ দেশের নির্জন, লাজুক ও প্রচারবিমুখ এক লেখক কী ভাবে নিঃশব্দে পার হলেন এক অলীক আন্তর্জাতিক দরজার চৌকাঠ? 
১৯৭৪ সাল নাগাদ বেলজিয়ামের ‘নক ল্য জুৎ’ কবিতা-উৎসব থেকে ফেরার পথে লোকনাথ ভট্টাচার্য ফ্রান্সে নেমেছিলেন বিংশ শতকের ফরাসি কবিতার দুই দেবতা অঁরি মিশো আর রনে শারের সঙ্গে দেখা করবেন বলে। কিন্তু মিশো সম্পূর্ণ অগম্য, ফোন করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। প্রকৃত কবি তো জনাকীর্ণ হতে চান না। শেষে ‘গালিমার’ প্রকাশনা-সংস্থার দফতরে তাঁর বেলজিয়ামে প্রদত্ত বক্তৃতার একটি কপি রেখে আসেন তিনি। অবিলম্বে হোটেলে এসে দেখা করেন ফরাসি কবিতার সম্ভবত সবচেয়ে দুঃসাহসী অভিযাত্রী মিশো! তিনি তাঁর আরও কবিতা পড়তে চান। ফ্রাঁস তাঁর ‘ঘর’ কবিতাটি অনুবাদ করে দেন ‘পাজ স্যুর লা শাঁব্‌র্‌’ নামে। মিশো তা পাঠিয়ে দেন ফরাসি কবিতার বিশিষ্ট প্রকাশক ফাতা মরগানাকে। তার পর সেখান থেকে দীর্ঘ দিন ধরে ফরাসিতে প্রকাশিত হতে থাকবে লোকনাথের অভ্রময় আলোছায়ার কবিতা, ইলাসট্রেশন-সহ দশটি গদ্যকবিতার বই। মঁপেলিয়ের ‘ফাতা মরগানা’ সংগ্রহশালায় গচ্ছিত আছে তাঁদের পত্র-সংলাপ। অনুবাদকদের মধ্যে ছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক জেরার মাসে ও ল্যুক গ্রাঁ-দিদিয়ে।
ইতিমধ্যে ফ্রাঁক-আঁদ্রে জাম ভারতে এসে লোকনাথের সঙ্গে দেখা করেন এবং ফ্রাঁসের অনুবাদে তাঁর ‘অতি বিশিষ্ট অন্ধজন’ (‘দেজাভগ্‌ল্‌ ত্রে দিসত্যাঁগে’) প্রকাশ করেন। জামের সহযোগিতায় লোকনাথ অনুবাদ করেন ‘ল্য দাঁসর দ্য কুর’ (রাজনর্তক ও অন্যান্য), যা ১৯৮৫ সালে প্রকাশ করবে গ্রানিৎ।
লোকনাথের ফরাসি ছিল আসাধারণ, অনুবাদের প্রথম খসড়াটি তিনিই করতেন, যা পরে ফরাসিদের সঙ্গে বসে পরিমার্জনা করে নিতেন। রনে শার যে ছোট্ট শহরে বাস করতেন সেই লিল-স্যুর-সর্গের বিশিষ্ট প্রকাশক ‘ল্য বোয়া দরিয়ঁ’ লোকনাথের একাধিক বই প্রকাশ করেন। ২০০০ সালে খোদ গালিমার প্রকাশ করেন ‘ল্য দাঁসর দ্য কুর’ এবং ‘লে মার্শ দ্যু ভিদ’ (যাতে ছিল ‘মদের পাত্র’, ‘শরৎ বসন্ত’ ইত্যাদি)। ফ্রাঁস ভট্টাচার্যের অনুবাদে তাঁর চারটি উপন্যাস ও দুটি বড়গল্প প্রকাশিত হয় তিনটি প্রকাশনা-সংস্থা থেকে।
লোকনাথের অস্থিমজ্জার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল র‌্যাঁঁবোর অন্তর্দীপ্ত স্নায়ুবিপর্যয়ের কবিতা। ফ্রাঁস ভট্টাচার্যের মতে, তাঁর কবিতা প্রথম থেকেই ভাবাবেগ আর সস্তা রোমান্টিকতাকে বর্জন করতে চেয়েছিল। লেখাগুলি গভীর ভাবে দার্শনিক, যদিও সেগুলি দৈনন্দিন জীবন আর অভিজ্ঞতার কথাই বলে। আবার এমন কিছু বলতে চায় যা বলা যায় না, যা অব্যক্ত।
হয়তো বাংলা কবিতা তাঁর জন্য প্রস্তুত ছিল না। হয়তো ফরাসি ভাষা তাঁর অনুরণনকে যে ভাবে ধারণ করেছে, বাংলা তা পারেনি। ‘দুঃখের সবুজ রাত্রি’ আজও অপরিণত কানে কৃত্রিম লাগবে, কিন্তু ফরাসিতে ‘La nuit verte de la désolation’ হয়ে উঠবে মন্ত্রপ্রতিম। লোত্রেয়ামঁ ও র‍্যাঁবোর সময় থেকে ফরাসি কবিতা অন্তহীন ভাবে এই সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য জটিলতাকেই ছুঁতে চেয়েছে। লোকনাথের রচনা ভারতীয় দর্শনে সম্পৃক্ত, সেই সঙ্গে আধুনিক। বিপন্ন এক গ্রহে মানুষ শান্তি ও নিশ্চয়তা খুঁজছে। এমন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা কী করব? তাঁর কবিতায় একটি বৃত্তের মধ্যে আর একটি বৃত্ত জেগে ওঠে, কোনও কিছুই শেষ হয় না। তাঁর কবিতা যেন ‘সত্যের অনুরণন’, vibrations। ছায়ার ভেতর আলো-আঁধারির খেলা। এগুলি যেন পুনর্নির্মিত ধ্বংসস্তূপ...‘débris reconstruits’।
মিশেল দ্যগি, ভেরনার লাঁবেরসি ও আঁদ্রে ভেলতেরের মতো বিশিষ্ট কবিরা ছিলেন তাঁর বন্ধু। তরুণ ফরাসি কবিরা অনেকেই তাঁর ভক্ত। ক্রিস্তিয়াঁ ল্য মেলেক লিখেছেন রনে দোমাল, শার্ল দ্যুই, ক্রিস্তিয়াঁ গাবরিয়েল ও লোকনাথ ভট্টাচার্যকে নিয়ে একটি বই, ‘Le Vent immobile’ (‘স্তব্ধ হাওয়া’)। ২০০১ সালে মার্ক ব্লাঁশে নামে এক তরুণ লোকনাথকে নিয়ে ‘লোত্র্‌ রিভ’ থেকে প্রকাশ করেন একটি সম্পূর্ণ সাহিত্যজীবনী। সেই সিরিজে আর যাঁদের নিয়ে বই আছে, তাঁরা হলেন— পাউল সেলান, ওক্তাভিও পাস, সিলভিয়া প্লাথ ও অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গ। ছবির দেশ, কবিতার দেশ থেকে এর চেয়ে আর কী বড় সম্মান ও স্বীকৃতি মিলতে পারে? ১৯৯৯ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে ‘কমান্ডার অফ আর্ট্‌স্‌ অ্যান্ড লেটার্‌স্‌’ উপাধিতে ভূষিত করে।
২০০১ সালে কায়রোর মোটর-দুর্ঘটনার পর নীল নদে পড়ে যায় তাঁর গাড়ি। সেই মৃত্যু-যন্ত্রণা এ দেশে তাঁর আপনজনদের যতটা কষ্ট দিয়েছে, কবিতার দেশে তার চেয়ে বিন্দুমাত্র কম নয়।

http://www.anandabazar.com/poilaboisakh/special-write-up-on-loknath-bhattacharya-by-chinmoy-guha-1.359604

মহীরুহ ২ (On JC Guha and Dhiren Dey)

মহীরুহ ২

ময়দানের। জ্যোতিষ গুহ ও ধীরেন দে। জাতটাই ছিল আলাদা। প্রবাদপ্রতিম দুই ক্লাবকর্তার বহু অকথিত কাহিনি জুড়লেন চিরঞ্জীব

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:০০
  
1
লেক প্লেসের বাড়িতে বসে জ্যোতিষ গুহ টেলিফোন কলটা পেলেন।
রিসিভারের অপর প্রান্তে ধীরেন দে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের কর্মকর্তা, ‘‘আপনি নাকি ময়দানে আসা ছেড়ে দিয়েছেন? এটা চলবে না, আমি চলতে দেব না। আপনার মতো মানুষকে ছাড়া ময়দানে খেলাধুলো হবে কী করে? আজ, এই মুহূর্ত থেকে আপনি মোহনবাগানের মেম্বার। অনারারি লাইফ মেম্বার।’’
টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরেও জ্যোতিষদা কিছুটা আপ্লুত, কিছুটা বিহ্বল।
কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না! কারণ, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আর তিনি যে সমার্থক!
১৯৭০-এর কথা।
ক্লাবের নির্বাচনে সে বার জ্যোতিষদা হেরে যান। হারের নেপথ্যে ছিলেন তাঁর একদা অতি বিশ্বাসভাজনদেরই কেউ কেউ। ক্লাবের ক্ষমতায় আসীন হলেন নৃপেন দাস। ওই গোষ্ঠী এসে জে সি গুহকে এক রকম ব্রাত্যই করে দিল।
জ্যোতিষদা ভাবতেই পারছিলেন না, যে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকে তিনি সব সময়ে বুক দিয়ে আগলেছেন, সাফল্যের শিখরে তুলে নিয়ে গিয়েছেন, সেই ক্লাবেই তিনি অপাংক্তেয়!
এটা জ্যোতিষদার মতো মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই, একটা সময়ে ময়দানে যাওয়াই বন্ধ করে দিলেন তিনি।
খবরটা মোহনবাগানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ধীরেন দে-র কানে গেল। আর তার পরেই ওই ফোন।
জ্যোতিষ গুহের সঙ্গে তাঁর এক সময়ের বিশ্বস্তদের অধিকাংশ বিশ্বাসঘাতকতা করলেও অল্প কয়েক জন কিন্তু তাঁকে ছেড়ে যাননি।
ধীরেন দে-র ফোনটা যখন এল, তাঁরা তখন জ্যোতিষদার বাড়িতে। ফোন রেখে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর জ্যোতিষ গুহ তাঁর ওই স্নেহভাজনদের বললেন, ‘‘ধীরেন ফোন করেছিল। আজ থেকে আমি নাকি মোহনবাগানের মেম্বার। একটা সময়ে ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার ছিলাম। পরে সেক্রেটারি হয়েছি। তোমরাই দেখেছ, কী ভাবে সন্তানের মতো লালন-পালন করেছি ক্লাবটাকে। আর আজ সেই ক্লাবেরই আমি কেউ নই।’’
তার পর বললেন, ‘‘তোমরা যারা ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে আর যাবে না বলে ঠিক করেছ, তারাও আমার সঙ্গে কাল মোহনবাগান লনে বিকেলের আড্ডায় চলো।’’ খবরটা পেয়ে মোহনবাগান ক্লাবের লনে পরদিন অপেক্ষা করছিলাম। বিকেল হতেই দেখলাম, ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি শোভিত, ঋজু, দীর্ঘদেহী জ্যোতিষদা সবুজ-মেরুন তাঁবুর গেট দিয়ে ঢুকছেন।
লনে তখন বিভিন্ন গোলটেবিলে প্রবীণ ও মাঝবয়সিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডায়।
জ্যোতিষদাকে দেখেই উমাপতি কুমার বললেন, ‘‘আরে জ্যোতিষ, এ দিকে এসো।’’ অন্যেরাও ডাকছেন। ধীরেন দে ওই ফোনালাপের কথা আগেই বলে রেখেছিলেন সবাইকে। জ্যোতিষদার ক্লাবে ঢোকার খবর পেয়েই টেন্টের ভিতর থেকে স্যুটেড-বুটেড ধীরেনদা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন লনে। তার পর জ্যোতিষদাকে জড়িয়ে ধরলেন।
শৈলেন মান্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘একটু চা খাবেন তো?’’
পরে এক দিন কথায় কথায় এই প্রসঙ্গে জ্যোতিষদা বলেছিলেন, ‘‘ধীরেন দে-র ওই আহ্বান আমার কাছে অভাবনীয় ছিল। আমাকে ওই ভাবে মর্যাদা দিল! কোনও দিন ভুলতে পারব না।’’
আর এখন? কোথায় এই প্রীতির নজির!
উল্টে সর্বত্রই যেন অসহিষ্ণুতা। খেলার মাঠ, রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, সব জায়গাতেই।
জ্যোতিষ গুহ ইস্টবেঙ্গলের ও ধীরেন দে মোহনবাগানের সচিব হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে সহ-সচিব থাকাকালীনই দু’জনে হয়ে উঠেছিলেন নিজের নিজের ক্লাবের সর্বময় কর্তা।
জ্যোতিষ গুহকে যখন মোহনবাগান ক্লাবের আজীবন সদস্য করে দেওয়ার কথা বলে আহ্বান জানানো হল, ধীরেন দে তখন মোহনবাগানের সহ-সচিব। বয়সে জ্যোতিষ গুহর চেয়ে ধীরেন দে অনেকটা ছোট তবে জ্যোতিষ গুহ যেমন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে যাওয়া প্রথম কর্মকর্তা, মোহনবাগানের ক্ষেত্রে ধীরেন দে-ও তাই।
ময়দানে বরাবরই প্রচুর গাছের ভিড়। কিন্তু মহীরুহ আমার চোখে কেবল দু’জন। জ্যোতিষ গুহ ও ধীরেন দে। ব্যক্তিত্ব, কর্মকাণ্ড, পরোপকার এবং সর্বোপরি খেলার উন্নয়নে অবদান— সব মিলিয়ে এঁরা দু’জন যে উচ্চতার, আর কোনও কর্মকর্তা সেটা অতিক্রম করা দূরের কথা, ছুঁতেও পারেননি (জগমোহন ডালমিয়াকে এখানে ধরা হচ্ছে না, তাঁর সঙ্গে তুলনাটা হবে পঙ্কজ গুপ্তর মতো মানুষদের)।
দু’জনের চরিত্রে, কাজের ধরনে প্রচুর পার্থক্য ছিল। জ্যোতিষ গুহের ইউএসপি যদি ব্যক্তিত্ব ও স্থৈর্য হয়, তা হলে ধীরেন দে ছিলেন বর্ণময়।
খেলোয়াড়দের সম্ভ্রম ও সম্মান পাওয়ার পাশাপাশি জ্যোতিষদা ছিলেন তাদের কাছের মানুষ। অন্য দিকে, ধীরেনদা ছিলেন একটু দূরের, যেন ধরাছোঁয়ায় ভয় হয়।
জ্যোতিষদার ট্রেডমার্ক ছিল ধুতি-পাঞ্জাবি, ধীরেনদার স্যুট-টাই। তবে প্রথম জীবনে জ্যোতিষদাও বহু বার সাহেবি পোশাক পরেছেন।
আবার ফি বছর পয়লা বৈশাখে মোহনবাগানে বারপুজোর দিন ধীরেনদা পরনে ধুতি, গায়ে চাদর ও কপালে চন্দনের ফোঁটা নিয়ে হাজির থাকতেন।
এত পার্থক্য থাকলেও দু’জনেরই ঘরানা বা ক্লাসটা ছিল অন্য মাপের। লতাগুল্মদের মতো এলেবেলে নয়।
দু’জনেই ক্লাব অন্তপ্রাণ ছিলেন। ফুটবল অন্তপ্রাণ হওয়ার কারণেই। কোনও মতলবের জন্য নয়।
ষাটের দশকের শেষ দিকে, সকালে ময়দানে ফুটবলারদের প্র্যাকটিস দেখতে যাওয়ার রেয়াজ সাংবাদিকদের মধ্যে তেমন ছিল না। কিন্তু মতিদা অর্থাৎ আধুনিক বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মতি নন্দীর নির্দেশে প্রতিটি বড় ম্যাচের (মহামেডান স্পোর্টিং-ও কিন্তু তখন তিন প্রধানের অন্যতম) আগের দিন প্র্যাকটিস দেখতে যেতে হত।
মতিদা বলে দিয়েছিলেন, এটা করলে খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে, ফিচার লেখারও মশলা পাওয়া যাবে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় আমার কিংবদন্তি ক্রীড়া সম্পাদকের ওই নির্দেশ মেনেই খেলার মাঠের আর এক কিংবদন্তি জ্যোতিষ গুহর সঙ্গে প্রথম পরিচয়।
সাতসকালেও জ্যোতিষ গুহ মাঠে থাকতেন। খেলোয়াড়দের তালিম কোচ দিচ্ছেন তো কী, ইস্টবেঙ্গল সচিবও সব কিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখতেন। ওই রকম ব্যক্তিত্ববানের সঙ্গে প্রথম প্রথম কথা বলার সাহস পেতাম না। কিন্তু রোজই যাচ্ছি দেখে আমি ওঁর মুখচেনা হয়ে গেলাম। একটু ভয় নিয়েই একদিন মাঠে একটা প্রশ্ন করলাম। ওটাই জ্যোতিষদার সঙ্গে আমার প্রথম কথোপকথন।
জিজ্ঞেস করি, ফুটবলারদের প্র্যাকটিসে তো অ্যাথলেটিক্সের কোচ সুজিত সিংহকে দেখছি। ফুটবল কোচ কোথায়?
জ্যোতিষদা বললেন, ‘‘বিলেতে দেখেছি, ফুটবলারদের ফিটনেস বাড়াতে অ্যাথলেটিক্স-এর কোচকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আগে তার কাছেই ফুটবলাররা দৌড়বে, লাফাবে, নানা রকম ব্যায়াম করে ফিট হবে। তার পর শুরু হবে ফুটবল কোচের কাজ।’’ ক্লাবের একজন কর্মকর্তা হয়েও জ্যোতিষদা যে ধেলাধুলোর ব্যাপারে কতটা আধুনিকমনস্ক ছিলেন, ওই কথাই তার প্রমাণ। আসলে ময়দানের সঙ্গে জ্যোতিষ গুহর প্রথম বন্ধন কর্মকর্তা হিসেবে নয়, হয়েছিল ফুটবলার হিসেবে।
১৯৩০-এ শুরু করে বছর খানেক তিনি ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার ছিলেন। তার পর ১৯৪৫-এ চলে যান বিলেতে। শোনা কথা, ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও কারণে সে দিকে না গিয়ে খাস আর্সেনাল ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন, সেখানে ফুটবলের প্রশিক্ষণও নেন। কলকাতায় ফিরে কর্মকর্তা হিসেবে ক্লাবের হাল ধরেন। দেশ জুড়ে ফুটবলের প্রতিভা অন্বেষণ করে তাঁদের কলকাতায় নিয়ে এসে ইস্টবেঙ্গলে খেলিয়ে বিখ্যাত করে তোলা, সুখেদুঃখে খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের মধ্যে পেশাদারিত্ব সঞ্চার, কর্মকর্তা হয়েও তীব্র ফুটবলবোধের পরিচয়— প্রথম জীবনে ফুটবলার হওয়ার জন্য ও আর্সেনালে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার ফলেই জ্যোতিষ গুহ এগুলো করতে পেরেছিলেন।
ইস্টবেঙ্গলে প্রথম বিদেশি, বর্মার (এখন মায়ানমার) তারকা ফরওয়ার্ড পাগসেলেকে খেলানোর ব্যাপারে তিনিই ছিলেন উদ্যোক্তা।
বড় ম্যাচের দিন দল মাঠে নামার ঠিক আগে কোচ রণকৌশল শেষ বারের মতো বুঝিয়ে দেওয়ার পর জ্যোতিষদা দিতেন ভোকাল টনিক।— ‘‘দলের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব তোমাদের। হারা চলবে না কোনও মতেই। লাল-হলুদ রংটা মনে রাখবে। প্রতিটি ইঞ্চির জন্য যুদ্ধ করতে হবে। তোমাদের এ যুদ্ধ জিততেই হবে। যাও, বয়েজ, নেমে পড়ো।’’
এ সব বলে প্রত্যেকের পিঠ চাপড়ে দিতেন। জ্যোতিষদা বলেছিলেন, এই ভোকাল টনিক তিনি শেখেন ইংল্যান্ডে গিয়ে। বিলেতে তিনি দেখেছিলেন, কী ভাবে জেতার জন্য কোচ তথা ম্যানেজার গোটা দলকে উদ্বুদ্ধ করছেন।
খেলায় এ দেশে মনোবিদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও জ্যোতিষ গুহই ছিলেন পথিকৃৎ। মনে হয়, পি কে বা প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোকাল টনিক জ্যোতিষ গুহকে অনুসরণ করেই। তবে পিকে-রটা জ্যোতিষদার ভোকাল টনিকের আরও ধারালো, আরও যুগোপযোগী সংস্করণ।
ইস্টবেঙ্গল হয়তো কোনও ম্যাচে মোহনবাগানের কাছে হেরে গিয়েছে। সে দিন কোচ বকাবকিও করলেন খেলোয়াড়দের। কিন্তু জ্যোতিষদা অবিচল। বললেন, ‘‘খেলায় হারজিত থাকবেই। আর মন খারাপ করবে না। আজ বিশ্রাম নেবে। রাতে ভাল করে ঘুমোবে। সামনে এ মরসুমের অনেক ম্যাচ পড়ে আছে।’’
ম্যাচ হারার পরেও ফুটবলারদের পিঠে হাত রেখে এ সব কথা বলছেন। ভাবা যায়! পর দিন সাতসকালে টেন্টে এসে আগের দিনের ম্যাচে দলের কয়েকটা ভুল ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘মোহনবাগান তোমাদের এই সব দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছিল। এই সব সামান্য ফাঁকফোকর শুধরে নিও। দেখবে, পরের ম্যাচে তোমরাই হারিয়ে দিয়েছ মোহনবাগানকে।’’
তার পর ক্লাবের ক্যান্টিনে নির্দেশ— ‘‘এদের আজ ভাল করে খেতে দাও। কাল অনেক ধকল গিয়েছে।’’
ঠিক যেন অভিভাবক।
সেই জন্যই তো মহম্মদ হাবিবের মতো খেলোয়াড় ওঁকে জ্যোতিষদা বলতেন না, ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন। কেউ আবার ‘গুহ সাব’।
একটা ঘটনা জ্যোতিষদার মুখেই শোনা। ১৯৪৯-এর আইএফএ শিল্ড ফাইনাল। ইস্টবেঙ্গলে তখন আপ্পা রাও। দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়।
আপ্পা রাওয়ের হাঁপানি ছিল। যা ম্যাচের আগের দিন প্রচণ্ড বেড়েছে। ডাক্তার দেখিয়ে, ওষুধ খাইয়ে, ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েও তেমন কাজ হচ্ছে না। ম্যাচের দিন সকালেও আপ্পা রাও বেশ অসুস্থ। জ্যোতিষদা দিশেহারা। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শে মাঠে, সাইড লাইনের পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেওয়া হল।
ম্যাচ শুরুর ১০ মিনিট আগেও আপ্পা রাও শোয়া, তাঁর নাকে অক্সিজেনের নল।
দল যখন মাঠে নামছে, আপ্পা তখন নল খুলে উঠে পড়েন। খেলেন পুরো জান দিয়ে। বিরতিতে আবার সেই নাকে নল।
টানা এই সময়টা সারাক্ষণ আপ্পা রাওয়ের পাশে ছিলেন জ্যোতিষ গুহ।
ঘটনাটা গল্পের মতো শুনিয়ে বলেন, ‘‘জানো, আপ্পার খেলা দেখে কিন্তু সে দিন এক বারের জন্যও বোঝা যায়নি, ও দুই হাফেই মাঠে নামার আগে অক্সিজেন নিয়েছিল। ম্যাচটা আমরা ২-০ জিতি।’’
বিশ্বের আর কোথাও এমন নজির আছে? জ্যোতিষদা বলেছিলেন, ‘‘অন্তত আমার জানা নেই।’’
এই সব কারণে জ্যোতিষ গুহকে যেমন ইস্টবেঙ্গল থেকে আলাদা করা যায় না, তেমনই মোহনবাগান আর ধীরেন দে-ও অবিচ্ছেদ্য। তবে খেলোয়াড়দের ব্যাপারে ধীরেন দে সব সময়ে খোঁজখবর নিলেও, প্রয়োজনে তাদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করলেও ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁর নৈকট্য জ্যোতিষ গুহর মতো ছিল না।
তবে দে’জ মেডিক্যালের ডিরেক্টর ধীরেনদা অনেক সময়েই তাঁর কোম্পানির ওষুধ খেলোয়াড়দের বিনামূল্যে দিতেন। আসলে স্যুট-বুট-টাই, মাঝেমধ্যে গগলস পরা ধীরেন দে ছিলেন আনখশির বাঙালি সাহেব। ধীরেনদার এই পোশাক-পরিচ্ছদই অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি করেছিল।
ময়দানে ওই রকম সাহেবকে দেখে কারও কারও অস্বস্তি হত। তা ছাড়া, অকৃতদার ধীরেনদার ঠাটবাট, চাল-চলনও ছিল অন্য রকম। দামি গাড়ি চড়েন, বেঙ্গল ক্লাবের মেম্বার আর অনেক দিন সেখানেই লাঞ্চ-ডিনার করেন, এক-এক দিন এক-এক রকম বিদেশি সুগন্ধিতে সুরভিত হয়ে থাকেন।
এক সময়ে ভারতের সেরা মিডফিল্ডার প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৪ থেকে টানা ছ’বছর মোহনবাগানে খেলেছিলেন। প্রশান্তর কথায়, ‘‘ধীরেন দে-কে বড় রাশভারী মনে হত। আসলে অত বড় কোম্পানির মালিক তো! সহজ ভাবে মিশতে বাধো বাধো ঠেকত আমার।’’ 
বাস্তবিকই ধীরেন দে-র বাইরের চেহারার সঙ্গে তখনকার ময়দানের, বিশেষ করে ফুটবল ক্লাবের পরিবেশটা ঠিক খাপ খেত না। আর সেই জন্য ধীরেন দে সম্পর্কে ভুলভাল কথাও শোনা যেত।
একটা ঘটনা বলি।
জ্যোতিষদা যেমন বড় ম্যাচের আগে নিয়মিত ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সকালের প্র্যাকটিসে হাজির থাকতেন, গ্যালারিতে বসে দলের খেলা দেখতেন, ধীরেনদাকে কখনও সে রকম দেখিনি। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। প্রশ্ন করায় দলেরই এক প্রাক্তন খেলোয়াড় এক বার তির্যক ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘‘ধীরেনদাকে কেমন করে মাঠে দেখবে? কী যে বলো! মাঠের নোংরা গ্যালারিতে বসবেন ঝকঝকে, দামি স্যুট-টাই পরা দে’জ মেডিক্যালের মালিক!’’
এটা কিন্তু আদৌ গ্যালারিতে ধীরেনদার নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণ ছিল না।
সত্যিটা কিছু পরে জেনেছিলাম।
আর তখন আরও বেশি করে বুঝতে পারি, মানুষটা নিজের ক্লাবের ব্যাপারে কী ভীষণ স্পর্শকাতর, কী ভীষণ আবেগপ্রবণ।
ইডেনে সে দিন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল সম্ভবত লিগের ম্যাচ।
প্রেসবক্সে বসে ম্যাচ দেখছেন মতিদা, মুকুল দত্ত আর পুষ্পেন সরকার। আমার অ্যাসাইনমেন্ট ড্রেসিংরুমে।
ক্রিকেটের মতো ফুটবলারদেরও ড্রেসিংরুম তখন ছিল এনসিসি প্যাভিলিয়নে। হঠাৎই সেখানে দেখা ধীরেনদার সঙ্গে।
বললাম, চলুন, সামনে গিয়ে ম্যাচ দেখি। ধীরেনদা বললেন, ‘‘ধুৎ। ম্যাচ দেখব কী রে! ফুটবলের যা ছিরি! তুই রেজাল্টটা বল তো!’’
বললাম, এখনও গোললেস। তার পর ওঁর প্রশ্ন, ‘‘কারা ভাল খেলছে রে?’’ বললাম, আপনার টিম। শুনে একটু অসন্তুষ্ট হলেন, ‘‘কী বললি? বল, আমাদের টিম।’’
জ্যোতিষদা যেমন প্রথম আলাপের দিন থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করে গিয়েছেন, ধীরেন দে কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’য়ে পৌঁছে যান।
অথচ আমি পূর্ববঙ্গীয়, দেশ খুলনা জেলায়। বাইরে তেমন প্রকাশ না করলেও মনে মনে ইস্টবেঙ্গলেরই সমর্থক। সবুজ-মেরুনের বিরুদ্ধে লাল-হলুদ জিতলেই বরাবর খুশি হই। কিন্তু ধীরেনদার কেন জানি না বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে, আমি পাঁড় মোহনবাগানী। বহু বার আমি নিজে ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করেছি। তবু ধীরেনদা মানতে চাননি।
ওই বিকেলে মোহনবাগান ভাল খেলছে শুনে আশ্বস্ত দেখাল ধীরেনদাকে।
দামি কোলন মাখানো পাট করা রুমাল বার করে মুখ মুছে বললেন, ‘‘চল, একটু ঘুরে আসি। গঙ্গার ধারে অনেক দিন যাই না।’’
আমি বললাম, ‘‘আমার যে এখানে ডিউটি!’’ উনি নাছোড়, ‘‘আরে যাব আর আসব। বেশিক্ষণ লাগবে না। তুই কিছু মিস করবি না।’’
আউট্রাম ঘাটে গাড়ি থেকে নেমে গঙ্গার দিকে কিছুটা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ধীরেন দে। তার পর বললেন, ‘‘জানিস, ক্লাবের খেলা থাকলেই বুকটা ভীষণ ধুকপুক করে। না জিতলে সমর্থকেরা আমাদের ছিঁড়ে খাবে। ক্লাবের খেলা আমি ভয়ে দেখি না। ম্যাচে খারাপ কিছু হলে তো খেলা দেখতে দেখতেই মরে যাব। চোখের সামনে দেখব, মোহনবাগান হেরে যাচ্ছে, এটা আমি নিতে পারব না রে। তাই, মোহনবাগান মাঠে খেলা থাকলেও দেখি না। পুরো সময়টা টেন্টে থাকি।’’
তখনও কলকাতায় টেলিভিশন আসেনি। তাই, টিভি-তেও খেলা দেখার প্রশ্ন ছিল না।
এমনকী, ম্যাচ চলাকালীন ট্রানজিস্টর মাঝেমধ্যে খুলে খেলার ফল শুনেই সেটা বন্ধ করে দিতেন ধীরেনদা। এতটাই টেনশনে থাকতেন।
ধীরেন দে-র মতো মোহনবাগান ম্যাচ একই কারণে দেখতেন না সাহিত্যিক বিমল করও।
এক বার ঠিক করেছিলাম, মোহনবাগানী বিমলদা বড় ম্যাচ দেখে সেই বর্ণনা লিখবেন। একটু অন্য স্বাদের লেখা হবে। কিন্তু বিমলদা শুনেই সাফ বলে দেন, ‘‘এটা পারব না। আমার খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে। মোহনবাগানের ম্যাচ আমি দেখি না।’’
ফুটবলে মোহনবাগানকে নিয়ে এতটা আবেগপ্রবণ ধীরেন দে একটা সময়ে ছিলেন ক্রিকেটার। ময়দানে চুটিয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন।
আবার জে সি গুহর মতো ফুটবল খেলা বা বিলেত থেকে ফুটবলের প্রশিক্ষণ পাওয়ার অভিজ্ঞতা ধীরেন দে-র ছিল না। কিন্তু অন্য ভাবে খেলাটার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল। কারণ, ধীরেন দে ছিলেন পাশ করা রেফারি।
একটা সময়ে কলকাতা ফুটবল লিগ, আইএফএ শিল্ডের মতো টুর্নামেন্টের ম্যাচও পরিচালনা করেছেন। যে কারণে ধীরেন দে নিছক ব্যবসাদার কর্মকর্তাদের মতো টাকা ঢেলে বা জোগাড় করে এবং তারকা খেলোয়াড়দের দলে সই করিয়ে কৃতিত্ব নেননি। ধীরেন দে-র জন্যই ত্রুকটাউন, পাখতাকোর আর পেলে-র কসমস কলকাতা মাঠে খেলে গিয়েছিল। এবং ক্লাবগুলোর মধ্যে তখন একমাত্র মোহনবাগান মাঠেই যে ফ্লাডলাইট লেগেছিল, তারও মূলে ধীরেন দে।
কোনও এক সময়ে ক্লাবের তহবিলে তেমন টাকা নেই। কিন্তু অবিলম্বে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। মোহনবাগানে ধনী সদস্যের সংখ্যা কম ছিল না।
ধীরেন দে কাউকে কুড়ি, কাউকে পনেরো, কাউকে বা দশ হাজার টাকা দিতে বললেন। ধীরেনদার এক কথায় সবাই টাকা দিয়ে দিত। এমনই ছিল ওঁর ব্যক্তিত্ব।
মোহনবাগানের ঘরের ছেলে বিদেশ বসু বলছেন, ‘‘প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে বারপুজোর দিন ধীরেনদা আগের মরসুমে যারা ভাল খেলেছে, তাদের প্রত্যেককে একটা করে রুপোর কয়েন উপহার দিতেন। আমি প্রত্যেক বার পেয়েছি।’’
আবার প্রশান্ত বললেন, ‘‘টিম খারাপ খেললে ধীরেনদা বকতেন না। বরং, পরের ম্যাচে ভাল খেলতে বলতেন।’’ অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ধীরেন দে আর জ্যোতিষ গুহ ছিলেন এক রকম।
তবে মোটা টাকা দিয়ে অন্য দল থেকে নিয়ে আসা কোনও তারকা খেলোয়াড় যদি প্রত্যাশা মতো খেলতে না পারত, ধীরেনদা তার বকেয়া টাকা মিটিয়ে দেওয়ার আগে তাকে বিস্তর ঘোরাতেন।
শেষ পর্যন্ত টাকা মিটিয়ে দিতেন ঠিকই, কিন্তু ইচ্ছাকৃত বহু টালবাহানা করার পর। মনে করতেন, মোটা টাকা দিয়ে যখন আনা হয়েছে, তখন ঠিকঠাক খেলতে না পারার মাসুল দিতে হবে।
এক দুপুরে ধীরেনদা লিন্ডসে স্ট্রিটে ওঁর অফিসে ডেকেছেন। আগেই বলে রেখেছিলেন, ‘‘অফিস থেকে দু’জনে বেঙ্গল ক্লাবে যাব। তুই আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবি।’’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। ধীরেনদা ওকে ‘মানু’ বলে ডাকতেন। দু’জনের সখ্যের কথা ময়দানের অনেকেরই জানা ছিল। ধীরেনদার অফিসে গিয়ে দেখি, এক তারকা ফুটবলার ওঁর চেম্বারের ঠিক বাইরে অপেক্ষা করছে। নামটা বলছি না, আরও অনেকের মতো আমিও তার ভক্ত।
আমি ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘বাইরে দেখেছিস, কে বসে আছে? ওর বকেয়া ২০ হাজার টাকা আজ আমার দেওয়ার কথা। এই সিজনে ও এখনও পর্যন্ত ক’টা গোল করেছে?’’ বললাম, একটাও না, ওর কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। এ বার ওই ফুটবলারকে ঘরে ডেকে বসিয়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আজ তোর টাকাটা দিয়ে দেব।’’
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই টেলিফোন বাজল।
ধীরেনদা রিসিভার তুললেন। শুনলাম ধীরেনদা বলছেন, ‘‘হ্যাঁ, মানু বলো, কী খবর। সে কী! তাই নাকি! এখনই যেতে হবে? না, না কোনও সমস্যা নেই। আমি এখনই বেরোচ্ছি। গাড়িতে রাইটার্স যেতে যতক্ষণ লাগে।’’
ফোন রেখে প্রচণ্ড টেনশনে কিছু কাগজপত্র খুঁজতে খুঁজতে ওই তারকার উদ্দেশে বললেন, ‘‘দেখলি তো, চিফ মিনিস্টারের ফোন এলো। আমাকে খুব জরুরি দরকারে এখনই রাইটার্স ছুটতে হবে। তুই বরং...।’’
ধীরেনদা কথা শেষ করার আগেই ওই ফুটবলার শশব্যস্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, ‘‘না, না ঠিক আছে, আমি বরং পরে এক দিন আসছি।’’
ওই খেলোয়াড় দরজা ঠেলে বেরিয়ে যাওয়ার পর বললাম, ‘‘ধীরেনদা, আমিও তা হলে আজ উঠি।’’ কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ধীরেন দে মুচকি হেসে বললেন, ‘‘বেঙ্গল ক্লাবে লাঞ্চ করবি না?’’
জিজ্ঞেস করলাম কী করে হবে, আপনাকে তো সিএম ডাকছেন! মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ধীরেনদা বললেন, ‘‘কোথায় সিএম, এই দ্যাখ, টেবলের নীচে।’’
দেখি, পা রাখার পাটাতনের পাশে একটা ঘণ্টি, সেটায় পা দিয়ে চাপ দিলেই বেজে উঠছে টেলিফোন।
আমি একেবারে হাঁ।
খেলোয়াড় ধীরেন দে (মাঝখানে)
ধীরেনদা বলে চলেছেন, ‘‘আমি ব্যবসাদার মানুষ। এ সব ব্যবস্থা রাখতে হয়, বুঝলি? গোল করতে পারে না, আবার এখনই পুরো টাকা মেটাব কী রে?’’
কিন্তু জ্যোতিষ গুহ এ সব ক্ষেত্রে ছিলেন পুরোপুরি পেশাদার। ভাল খেলতে বা গোল করতে পারুক-না পারুক, চুক্তি করে যখন কোনও ফুটবলারকে নিয়েছেন, তখন নির্দিষ্ট সময়ে তার পুরো টাকাটাই মিটিয়ে দিতেন জ্যোতিষদা।
আর সংবাদপত্র তাঁর সম্পর্কে কী লিখছে, না লিখছে, সেই ব্যাপারে প্রকাশ্যে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত বা বিচলিত হতে কখনও দেখিনি। আর এর ঠিক উল্টোটাই ছিলেন ধীরেন দে। সাংবাদিকের কলমের অল্প আঁচড়েই যেন বেশি মাত্রায় রক্তপাত হত তাঁর।
মাঝেমধ্যে এমন আচরণ করতেন, যাতে মনে হত তিনি অপরিণতবয়স্ক। সাংবাদিকদের মধ্যে কারা মোহনবাগান সমর্থক, সেই ব্যাপারে খবর রাখতেন।
রাজন বালা তখন আনন্দবাজার সংস্থার ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এর ক্রীড়া সম্পাদক।
রাজনের বাবা এম এস বালা ছিলেন বার্ড কোম্পানির চিফ এগজিকিউটিভ এবং ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কর্মকর্তা।
সে দিক দিয়ে রাজন শুধু ইস্টবেঙ্গল সমর্থকই নয়, ইস্টবেঙ্গল পরিবারের সদস্য। এক বার ওর কলাম ‘বুলস আই’য়ে রাজন লিখল, ‘দে’জ মেডিক্যালের কেয়ো কার্পিনে এক ফোঁটাও তেল নেই।’
ধীরেনদা রেগে কাঁই। জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘বালা সাহেবের ছেলেটা এমন কেন রে? একেই ইস্টবেঙ্গলের লোক বলে মোহনবাগান নিয়ে যা খুশি তাই লেখে। এ বার আমার কোম্পানির সম্পর্কেও বাজে কথা লিখল? দাঁড়া, তোদের এডিটর অশোকবাবুকে এখনই কমপ্লেন করছি।’’
বললাম, ধীরেনদা, এটা কিন্তু ঠিক হবে না। ‘‘ঠিক বলেছিস, বেচারার চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে।’’
সে যাত্রায় নিরস্ত হলেন ধীরেনদা। কিন্তু রাজন সম্পর্কে ওঁর অ্যালার্জি কিছুতেই গেল না।
কিছুকাল পরে অরিজিৎ সেন হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডে যোগ দিল ডেপুটি স্পোর্টস এডিটর হিসেবে।
অরিজিতের সঙ্গে ধীরেনদার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললাম, ও কিন্তু মোহনবাগান পরিবারের ছেলে। অরিজিৎ আবার ধীরেনদার মতোই স্যুটেড-বুটেড থাকত। এমন ছেলের সঙ্গে আলাপ করে ধীরেনদা খুব খুশি। অরিজিৎ আড়াল হতেই জি়জ্ঞেস করলেন, ‘‘ছেলেটাকে বিশ্বাস করা যায়, কী বল? তবে রাজনকে ও বাঁশ দিতে পারবে তো?’’ বলে অশ্লীল ভাবে হাতের মুদ্রা দেখালেন। আমার চোখমুখ তখন লাল।
মোহনবাগান সম্পর্কে বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ ছিলেন ধীরেন দে।
একদিন বললেন, ‘‘যা-ই বলিস, আমাদের মতো ভদ্র ক্লাব আর হয় না। কুমারবাবু, বলাইবাবু (বলাইদাস চট্টোপাধ্যায়) মান্না, চুনীর মতো লোক আর কোনও ক্লাবে আছে?’’
জ্যোতিষ গুহর মতো অপমানিত হয়ে ধীরেন দে-কে ক্লাব ছাড়তে হয়নি। নতুন কমিটি এসে তাঁকে সভাপতি পদ দিয়েছিল। তবে ধীরেনদা তখন বলতেন, ‘‘বয়স হয়েছে। দিনকালও বদলেছে। আর ভাল লাগে না।’’
আসলে নামে সভাপতি হলেও বাস্তবে তাঁর কোনও ক্ষমতাই ছিল না। সেটা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে ময়দানে যাওয়া কমিয়ে শেষ পর্যন্ত যাওয়া বন্ধই করে দিলেন তিনি।
ধীরেন দে-কে ফের ময়দানমুখো করাতে ইস্টবেঙ্গলের কেউ কিন্তু তাঁকে অনারারি মেম্বারশিপের প্রস্তাব দেননি।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/write-up-on-two-football-officials-jyotish-guha-and-dhiren-dey-1.270215#