Saturday, 16 June 2018

টালা ট্যাঙ্কে আড্ডার রস ( On Tarashankar )

টালা ট্যাঙ্কে আড্ডার রস

টালা পার্কে তারাশঙ্করের বাড়ি। উলটো দিকে থাকেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কাছেই সজনীকান্ত দাস, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরকিশোর ঘোষ, শিবনারায়ণ রায়। লেখকদের একটা উপনিবেশ যেন। প্রায়ই তাঁদের মধ্যে জমে ওঠে আড্ডা, খাওয়াদাওয়া। কখনও কখনও ঝগড়া। 

বারিদবরণ ঘোষ
 
Bangiya Sahitya Parishad
কলকাতার একটা ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। জায়গাটার কথা বলেছিলেন আমাকে এক কলকাতা-বিশেষজ্ঞ বন্ধু— সিসিওএস (CCOS), জায়গাটা নাকি এক কালে ওই নামেই পরিচিত। এই সংক্ষেপিত নামটির গোটা পরিচয় এমনতর— চিৎপুর-কাশীপুর (Cossipore) ওপেন স্পেস। তখন টালা ট্যাঙ্ক হয়েছিল কি না বলতে পারব না, টালা পার্ক নামটিও কবে থেকে চালু হয়েছে জানি না। কিন্তু এই অঞ্চলেরই একদা পরিচয় ছিল সিসিওএস।
টালা পার্ক রাস্তার নামও এক সময় বদলে গেল— হল তারাশঙ্কর সরণি— তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে এবং তাঁর জীবিতকালে নয়, তাঁর তিরাশিতম জন্মোৎসবের (জন্ম: ১৮৯৮, মৃত্যু: ১৯৭১) কালে। তারাশঙ্কর ওই সিসিওএস-এর ১৭১ নং প্লটটি কিনেছিলেন কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের কাছ থেকে। ওটাই ছিল ঠিকানা, ১৭১ সিসিওএস। বছরটা ছিল ১৯৪৭। পরে নতুন করে রাস্তার নামকরণ হল, সংখ্যারও বদল হল। ১৭১ হল ২৭, আর রাস্তার নাম টালা পার্ক অ্যাভিনিউ। ১৯৮০ সালে আবার নাম বদল হল— বাড়ির ঠিকানা ২৭ তারাশঙ্কর সরণি। ছোট ছেলে সরিৎকুমারের পড়ার সুবাদে কলকাতায় এসে উঠেছিলেন আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটা ভাড়া বাড়িতে। অনেক কষ্ট করে ধারদেনা করে টালা পার্কের নতুন বাড়িটি সমাপ্তপ্রায় হলে সরিৎবাবুর বিয়ের পরে পরেই নতুন বাড়িতে এসে উঠলেন ১৯৪৯ সালের রথযাত্রার দিনে।
এই বাড়িতে বসেই লিখলেন ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাস। তখন তুষারকান্তি ঘোষ গুটিপায়ে এই রাস্তা দিয়েই আপন শ্বশুরবাড়িতে আসতেন, তাঁর সহচর দক্ষিণারঞ্জন বসু মশায় তো এই বাড়ির পাশের বাড়িতে বাসিন্দা হয়ে এসে যান। বাড়ির নীচের ঘরে বাঘছালের ওপর (এটা দিয়েছিলেন দুই পুত্রের কমন শ্বশুরমশায় অবনীনাথ ভট্টাচার্য, তাঁর বেয়াইমশায়কে)। সামনে থাকত কাঠের নানা সাইজের ডেস্ক। সেগুলি এখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সম্পদ।
তারাশঙ্কর ছবিও আঁকতেন, তাঁর শিল্পচর্চার শুরু বাড়ির দেওয়ালে— চুঁইয়ে-আসা জলে দেওয়ালের গায়ে যে জলছবি আপনা-আপনিই গড়ে উঠত, তাতে খড়ি-রং-কাঠকয়লা বুলিয়ে।
তত দিনে তারাশঙ্কর সরণি আর তার আশেপাশের রাস্তায় নানা জনের বসবাস, আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েেছে। কাছেই ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে প্রায় সাত কাঠা পরিমাণ জায়গা কিনে সজনীকান্ত দাস আর ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আধাআধি পরিমাণ জমিতে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেছেন। তবে জমজমাট আড্ডাটি সংলগ্ন পাইকপাড়াতেই জমে উঠেছিল। তারাশঙ্করের বাড়ির সামনে বাড়ি করেছেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দোতলা বাড়ি। দু’জনের বাড়ির সামনে একটা লেডিজ পার্ক। সেই সব ঘটনার একমাত্র সাক্ষী হিসেবে বিরাজ করছেন এখনও কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তিনি শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায় এসেছেন ভাড়াটে হিসেবে। নীরেন্দ্রনাথ বললেন, লেডিজ পার্কের ভিতর দিয়ে যাওয়ার একটা অলিখিত অনুমতি পেয়ে গিয়েছিলেন উভয় পক্ষ। প্রায়ই তিনি তারাশঙ্করের বাড়িতে যেতেন এবং তারাশঙ্করও হামেশাই এসে হাজির হতেন শৈলজা-নীরেনের বাড়িতে। আড্ডা হত না, কিন্তু আলাপ-পরিচয়ে কেটে যেত সোনার মুহূর্তগুলি। সে একটা দিন গিয়েছে। কৌতূহলীরা তাঁর গদ্যসমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ডটা একটু উলটে-পালটে দেখে নিতে পারেন।
দেখতে দেখতে টালা পার্কের লাগোয়া পাইকপাড়ায় এসে বাসা বাঁধতে শুরু করেছেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য, গৌরকিশোর ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিমল করদের সঙ্গে ঘোরতর আড্ডাধারী ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার সম্পাদক শিবনারায়ণ রায়, তাঁর যাবতীয় ‘র‌্যাডিক্যাল’ চরিত্রকে দূরে সরিয়ে রেখে। অনেকেই অনেক কথা স্মৃতি থেকে উদ্ধার করেছেন বটে, কিন্তু শিবনারায়ণ রায়ের কলমে তা উজ্জীবিত এখনও। সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের ‘কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর’ বইয়ের পরিশিষ্ট অংশে ধরা আছে সেই সব। কারণ এই আড্ডাতে সাহিত্য ছাড়িয়ে, চপ-কাটলেট মুড়ি খাওয়ার সূত্রে পরস্ত্রী-কাম-বন্ধুপত্নীদের সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়ার কথাটা শিবনারায়ণবাবু নিজের ঘাড়েও নিয়েছেন। ঠিক যেন বুঝতে পারিনি— নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে মোহরের যেন কী একটা সম্পর্কের কথা তিনি আবছা-ধোঁয়াশায় ছেড়ে দিয়েছেন। মোহরকে আপনাদের না-চেনার কথা নয়। ঠিকই ধরেছেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই বলছি। এ-সব পাঁচকান করে শিবনারায়ণবাবু ভাল করেছেন কি না জানি না। তাঁদের উত্তরাধিকারীদের কাউকে কাউকে জিজ্ঞেস করতেই তাঁদের আরক্তিম বদন দেখে বুঝেছি, যা যা রটে, তার কিছু কিছু বটে!
পঞ্চাশের দশকের সূচনায় টালার গা-লাগোয়া নীলমণি মিত্র লেনে একক বাসিন্দা শিবনারায়ণ রায়— তিনতলা একটা বাড়ির ছাদের একটেরে চিলেকোঠায়। এই অধ্যাপক ঘরে গৃহিণী এলেন। এক এক রাতে নাছোড়বান্দা কোনও সাহিত্যিক এসে পাণ্ডুলিপি খুলে পাঠ শোনান। এ হেন কালে এক দিন গৌরকিশোর ঘোষ এসে পাইকপাড়ায় একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিয়ে দু’জনের মিলিত সংসার ফ্ল্যাটে ভাগাভাগি করে স্থাপনের প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাব গিলে ফেললেন রায় মশায়। পরকে আপন-করা দু’টি গেরস্তালিতে হানা দিতে লাগলেন আশপাশের পড়শি সাহিত্যিকেরা। আড্ডাটা জমে ওঠে এই পাড়ার আর এক বাসিন্দা— সাহিত্যিক-কাম-প্রকাশক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের বাড়িতেও তাঁর ‘শয্যাগৃহ-কাম-বৈঠকখানা’য়। এখানে এমনকী বই ছাপানোর সূত্রে তাঁর প্রকাশক গৌরীশঙ্করের আড্ডায় এসে হাজির হতেন তারাশঙ্করবাবুও। আসতেন ‘আরণ্যকের বিভূতিভূষণ’, ‘বিস্তারিতবপু ডাক্তার ঔপন্যাসিক’ বনফুল এবং কুস্তিগীর দীর্ঘকায় প্রতিভাবান ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরি এবং ‘হ্যাংলাটে চেহারার’ অবধূত। একদা শিবনারায়ণবাবু তাঁর লেখা বিষয়ে কটু মন্তব্য করলে অবধূত শিবনারায়ণ রায়কে ভয় দেখান যে তিনি এমন মন্ত্রপূত বাণ প্রয়োগ করবেন যার ফলে সপ্তাহখানেকও কাটবে না, মুখ দিয়ে রক্ত উঠে ‘বাক্যস্ফূর্তি’ চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে।’ তবে আড্ডা জমে উঠত অনেকের গৃহিণীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে— গৌরীশঙ্করের স্ত্রী সুরূপা— চা সরবরাহে অক্লান্তা, রায়গিন্নি, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের স্ত্রী শোভনাদের উপস্থিতিতে। সত্যি কি না জানি না কিন্তু শিবনারায়ণ লিখে গেছেন বলে শোভনা বিষয়ে তাঁর একটি মন্তব্য আমাদের কোনও মন্তব্য ছাড়াই হুবহু তুলে দিচ্ছি—‘আমার সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যের সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের বাড়ির অল্পবয়সিনীরা শুনেছি রঙ্গরসিকতা করতেন।’
আড্ডায় আসতেন যুগান্তরের বার্তা সম্পাদক দক্ষিণারঞ্জন বসু, বাজার যাওয়ার পথে থলি হাতে। আসতেন সন্তোষকুমার ঘোষ ‘কথার অফুরন্ত ফোয়ারা’ নিয়ে। এক বার একটা কাণ্ড করলেন তিনি— সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তারাশঙ্কর, বনফুল, বিমল মিত্র থেকে শুরু করে সমরেশ বসু, সুবোধ ঘোষকে একটানা মুণ্ডপাত করে যেতে লাগলেন নিষ্ঠুর, শ্লীল-অশ্লীল-উলঙ্গ ভাষায় আক্রমণ করে। শিবনারায়ণবাবু সকলের অজান্তে একটি ব্যাটারি-চালিত টেপরেকর্ডার টেবিলের নীচে রেখে সবটা রেকর্ড করে রাখেন, পরে সন্তোষবাবুকে শোনান। সেটি যদি এখন এক বার আমরা পেতাম!
নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে আলাপের সূচনায় পণ্ডিত শিবনারায়ণ বলে ফেলেছিলেন— আপনার ‘কিনু গোয়ালার গলি’ পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছিল। সন্তোষকুমার ঘোষের কৃতিত্ব নরেন্দ্রনাথ মিত্র গ্রহণ করতে চাননি বলে মৃদুকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অনেকেই এ ভুল করে, কিন্তু সন্তোষবাবুর মতো চোখা কলমে আমি তো লিখতে পারি না।’ শোনা যায়, মৃদুকণ্ঠ নরেনবাবু নাকি তাঁর অনেক লেখার রসদ এই আড্ডা থেকেই সংগ্রহ করতেন।
আসতেন সংগীতশাস্ত্রী পণ্ডিত রাজ্যেশ্বর মিত্র, এবং একদা কালীপদ পাঠককে পর্যন্ত আড্ডায় ধরে এনেছিলেন গৌরকিশোর। আসতেন সংগীতবিশারদ, ‘স্মৃতির অতলে’-র লেখক অমিয়নাথ সান্যাল এবং কার্টুনসিদ্ধ চিত্রশিল্পী অহিভূষণ মালিকও। ভারী গলা এবং ভারী শরীর নিয়ে তিনি এক বার গৌরীবাবুর চৌকির একটা পায়া ভেঙে দিয়েছিলেন। আড্ডা সে দিন ‘তিনপেয়ে’ হয়ে পড়েছিল। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথা বলেছি। তাঁর ‘নীল নির্জনে’-র ‘হা-রে-রে, রঙ্গিলা তোর কথার টানে টানে’ পঙ্‌ক্তিতে আড্ডাধারীরা বিমোহিত। আসতেন উত্তরসূরি-বিখ্যাত অরুণ ভট্টাচার্যও।
বিমল কর আড্ডাধারীদের মধ্যে তাঁর বাসস্থানের স্বতন্ত্রতায় স্বতন্ত্র ছিলেন। তিনিই একমাত্র দোতলা কিন্তু টিনের চালওয়ালা ‘দুর্গে’ বাস করতেন। রোগজীর্ণ চেহারা। কিন্তু আড্ডায় ‘ইঁদুর’ গল্পটির পাণ্ডুলিপি গৌরকিশোরকে দিয়ে পড়িয়ে আসর মাত করেছিলেন। যত ক্ষণ পড়া চলেছিল, তিনি গৌরীশঙ্করবাবুর পায়খানাতে নিজেকে অন্তরীণ রেখেছিলেন। আসতেন নবীন লেখক দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘চর্যাপদের হরিণী’-র সেই বিখ্যাত লেখকও! শান্তিনিকেতন থেকে আসতেন শান্তিদেব ঘোষও। রূপদর্শীর সে কী আনন্দ! উদীয়মান কবিদের সংস্পর্শে আড্ডা জমে উঠত।
টালা পার্কে টালা ট্যাঙ্ক থেকে তখন যে বিশুদ্ধ কবিতারস প্রবাহিত হয়ে আপামর বাঙালি রসিকের পিপাসা নিবারণ করত, তাতে আর সন্দেহ কী! সেই পাড়ায় এখন নবীন বাসিন্দা হল আড্ডার স্থানে সাহিত্যের এক পীঠস্থান। অমলশঙ্কররা খুশি, তাঁদের বাড়িতে এখন সশরীরে আড্ডা দিতে এসে হাজির বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ। তার অন্যতম অভিভাবক কবি শঙ্খ ঘোষও ঘটনাচক্রে এই পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন— একদা।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/most-of-the-prominent-writers-came-to-tarasankar-bandyopadhyay-s-house-to-chat-1.772524?ref=archive-new-stry

সাত দশকের বহুরূপী

সাত দশকের বহুরূপী

যত দিন ডিসিপ্লিন, তত দিন বহুরূপী। বলেছিলেন দলের প্রথম সভাপতি মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আজও উজ্জ্বল দিকচিহ্ন এই দলের ‘চার অধ্যায়’, ‘রক্তকরবী’ থেকে ‘রাজা অয়দিপাউস’ কিংবা ‘পুতুলখেলা’। আরও একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলাম। শম্ভু মিত্রকে দেখতাম প্রায় উন্মাদের মতো পরিশ্রম করতে।

দেবতোষ ঘোষ
 
sambhu
মাঝে একটা দিন। কাল বাদে আগামী পরশুর মে দিবসেই ভারতের প্রথম সঙ্ঘনাট্য বা গ্রুপ থিয়েটার ‘বহুরূপী’ পূর্ণ করতে চলেছে তার সত্তর বছরের ঘটনাবহুল অস্তিত্ব। এ কোনও অতিকথন নয়, কেননা ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নামের শব্দবন্ধ যেখানে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল, সেই আমেরিকাতে হ্যারল্ড ক্লারম্যান ও স্টেলা অ্যাডলারের সমনামী সংগঠনের আয়ু মাত্র এক দশকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সত্তর বছর আগে পেশাদারি-ব্যবসায়িক থিয়েটারের বিপ্রতীপে সম্পূর্ণ অন্যধারার এই অপেশাদারি আন্দোলন— যেটা অচিরেই মূলধারার থিয়েটার বলে স্বীকৃত হয়— তা সত্যিই ছিল ঐতিহাসিক। আজ মনে পড়ছে আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ বিজন ভট্টাচার্যকে, চরম দারিদ্রে দীর্ণ হয়ে যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন, অনেক কষ্ট নিয়ে।
কোনও সংগঠনের সত্তরটা বছর তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে, তার নিজস্ব ধরনধারণ, কর্মকাণ্ড সব কিছু নিয়ে সুবিশাল, বিপুল। কলম ধরামাত্র ক্যালেইডোস্কোপিক দ্রুততায় সরে যাচ্ছে কত মুখের সারি! মহর্ষি (মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য), শম্ভু মিত্র, গঙ্গাপদ বসু, তৃপ্তি মিত্র, খালেদ চৌধুরী, তাপস সেন, অমর গঙ্গোপাধ্যায়, অশোক মজুমদার, মহঃ জাকেরিয়া, শোভেন মজুমদার, সবিতাব্রত দত্ত, নির্মল চট্টোপাধ্যায়, অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়, গুরুদাস মুখোপাধ্যায়, শিবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ মিত্র, শান্তি দাস, বলাই গুপ্ত, সুনীল সরকার, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, অমরনাথ পাঠক, আরতি মৈত্র, লতিকা বসু, রমলা রায়, আরতি কুণ্ডু, নমিতা মজুমদার, চিত্তরঞ্জন ঘোষ, পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, গৌতম বসু। যাঁরা পাশে আছেন এখনও, সেই শাঁওলী মিত্র, কালীপ্রসাদ ঘোষ, সমীর চক্রবর্তী, মুকুন্দ দাস— তাঁদের কথা স্বতোৎসারিত ভাবেই মনে ভেসে আসছে।
লেবেদেফ, গোলোকনাথ ডোমটোলার কূটকচালি এড়িয়ে প্রকৃতপক্ষে বাংলা থিয়েটারের সূত্রপাত গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির হাতে। সেটা উনিশ শতকের সত্তরের দশক। তার পর পিতৃমুখী প্রতিভা দানীবাবুকে (সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ) পেরিয়ে আরও বছর পঞ্চাশেক পরে আমাদের থিয়েটার যথার্থ নতুন ও আধুনিক রূপ নিল আর এক যুগন্ধর নাট্যপুরুষ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর হাতে। অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে থিয়েটারে এসে, কিছু দিনের মধ্যে যোগেশ চৌধুরীর ‘সীতা’ প্রযোজনা করে তিনি আমাদের নাট্য-ইতিহাসে প্রথম সক্ষম ও সার্থক প্রযোজনার স্বীকৃতি ও আপামর জনসাধারণের আদর পেয়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন শিশিরকুমারের গুণমুগ্ধ; নিজের দু-একটি নাটক তাঁকে প্রযোজনার্থে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৩ ভাদ্র ‘নাচঘর’ পত্রিকা লিখছে: ‘‘রসিক সমাজকে আজ আমরা আর একটি আনন্দ সংবাদ দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুগ্রহে তাঁর নূতন ও অপূর্ব নাটক ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করবার অধিকার (শিশিরকুমার) পেয়েছেন।... এ শ্রেণীর নাটক বাংলা রঙ্গালয়ে আর কখনো অভিনীত হয়নি এবং শীঘ্র হ’তও কিনা সন্দেহ, কারণ প্রকাশ্য রঙ্গালয়ে এখন এরকম নাটক অভিনয় করে সফল হবার শক্তি, সাহস ও প্রতিভা আছে, একমাত্র শিশিরকুমারেরই। পরন্তু ‘রক্তকরবী’র অভিনয়েও শিশিরকুমার যদি তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন, তবে বাংলার নাট্যজগতে যথার্থই নবযুগের প্রবর্তন হবে। আমরা সাগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় রইলুম।’’
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ তখন আসেনি, এসেছিল তিরিশ বছর পরে আর এক জন মানুষের হাতে। তিনি শম্ভু মিত্র, ‘বহুরূপী’র স্রষ্টা। ‘বহুরূপী’র প্রথম তিরিশ বছর শম্ভু মিত্রের প্রযোজনাধন্য, এবং শুরুর প্রথম বারো বছর সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১১এ নাসিরুদ্দিন রোডে তাঁর নিজস্ব ফ্ল্যাট। তার পর সাত-আট বছর তৃপ্তি মিত্র সংগঠন চালু রাখার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ২০-২২ বছর কুমার রায়ের হাতে ছিল দল। এই সময়ের অসামান্য কাজ ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘রাজদর্শন’ ইত্যাদি। তাঁর হাত থেকে সরে আসার পর, আজ পর্যন্ত কিছু আনকোরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বহুরূপী চলছে, চলছে খ্যাতিমান অভিনেতা দেবেশ রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে, শম্ভু মিত্রের দেখানো পথে।
দুজনে: ‘চার অধ্যায়’ নাটকের দৃশ্যে
শুরুর সেই তিরিশটা বছর একটা পর্বতমালার মতো, যার বেশ কতকগুলি শৃঙ্গ নিয়ে আমাদের অহঙ্কার। ‘ছেঁড়াতার’, ‘চার অধ্যায়’, ‘দশচক্র’, ‘রক্তকরবী’, ‘পুতুলখেলা’, ‘রাজা’ আর ‘রাজা অয়দিপাউস’, ‘বাকি ইতিহাস’ ইত্যাদি প্রযোজনা একটা দলের প্রযোজনা-তালিকায়— এটা বেশ শ্লাঘার বিষয়।
‘বহুরূপী’র একটা বিশেষ প্রযোজনার কথা এখানে বলতেই হয়। তৃপ্তি মিত্রের একক অভিনয়ধন্য ‘অপরাজিতা’। ’৭১ সালে আমরা যখন অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের প্রথম নাটক, বাদল সরকারের ‘পাগলা ঘোড়া’র অভাবিত সাফল্যের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছি, তখন নতুন নাট্যকার নীতীশ সেনের প্রায় নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি এই ‘অপরাজিতা’ অনাদরে অবহেলায় কলামন্দিরের বেসমেন্টে ৭ সেপ্টেম্বর ’৭১ প্রথম অভিনীত হয়েছিল। অচিরেই বোঝা গিয়েছিল, এ নাটক এক বিস্ময়। দু’ঘণ্টা ১০-১২ মিনিটের এই প্রযোজনা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল।
এ বার শম্ভু মিত্র। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকার পর সেন্ট জেভিয়ার্সে সামান্য ক’দিন কাটিয়ে তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দেন। তাঁর নিজের কথায়: ‘ঐ কলেজে পড়াটা ছেড়ে আমার নিজের খুব ভালো লাগল। কারণ আমি তখন সুযোগ পেলাম অন্য কতোরকম জিনিস পড়বার।...অনেক বিলিতি নাটকও পড়তে শুরু করলাম।... এতো মানে আছে এই সব নাটকের, এতো গভীর কথা বলা যায়, সেই সমস্তর জন্যে আরও ভীষণ আকর্ষণ বাড়তে লাগলো। তারপর আমি কলকাতা থেকে চ’লে গিয়েছিলুম।’ চলে গিয়েছিলেন অবসৃত পিতার কাছে। বছর দেড়েক পরে ফেরেন কলকাতায়। ওঁর নিজের কথায়: ‘...হয়েছিলো একটা ইচ্ছে ছোটবেলা থেকেই অভিনয় করবার। কেমন ক’রে জানি না অভিনয় খুব ভালো লাগতো। এবং আরো মজা হচ্ছে যে সাধারণভাবে বাইরে এইসব মঞ্চে অভিনয় দেখা বারণ ছিলো।... আমি ঐ শ্যামবাজারের পাড়ায় মঞ্চে গিয়ে অভিনয় দেখেছি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করবার পর যখন কলেজে ঢুকেছি, তখন এবং সেও বাবাকে লুকিয়ে। তখনই প্রথম অভিনয়ে দেখলাম ইনি শিশিরবাবু, ইনি অমুক...।’ কলকাতায় এসে উঠলেন বয়োজ্যেষ্ঠ জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়িতে। তাঁরই স্নেহে প্রশ্রয়ে বাড়ির সবচেয়ে ভাল ঘরে থেকে, তোফা খেয়ে, পড়াশোনা, শরীরচর্চা, গলা সাধা (এ প্রসঙ্গে প্রতিবেশীদের মন্তব্য, ওদের বাড়ির ছেলেটাকে কুকুরে কামড়েছে) নিয়ে বেশ দিন কাটছিল। এক ভদ্রলোকের কথায় গেলেন শ্যামবাজারের থিয়েটার পাড়ায়। প্রথমে রঙমহলে, সেখান থেকে মিনার্ভায়, তার পর নাট্যনিকেতনে এবং পরিবর্তিত নাট্যনিকেতন অর্থাৎ শ্রীরঙ্গমে। পরে শ্রীরঙ্গম ছেড়ে অল্প কিছু দিনের জন্যে যোগ দেন কালীপ্রসাদ ঘোষের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়ে শিশিরকুমার, অহীন্দ্র চৌধুরী, নরেশ মিত্র, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, প্রভা দেবী, ভূমেন রায় প্রমুখ বিরাট সব শিল্পী থাকা সত্ত্বেও বাংলার থিয়েটারে তখন নাভিশ্বাস উঠেছে। ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার ছাড়ার সামান্য কিছু দিনের মধ্যেই ‘ফ্যাসিবিরোধী শিল্পী সংগঠন’-এর গুটি কেটে বেরোনো ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের পক্ষ থেকে বিনয় ঘোষ ও বিজন ভট্টাচার্য শম্ভু মিত্রকে গণনাট্যে শামিল করেন। গণনাট্য সঙ্ঘেই বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’-এর পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত ‘জবানবন্দী’-র বিশাল সফলতায় ‌উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করতে ‘জবানবন্দী’কে নিয়ে যাওয়া হল বোম্বে, হিন্দি ‘অন্তিম অভিলাষা’ রূপে। ‘অন্তিম অভিলাষা’-র জয়জয়কার হল সেখানে। এর সুবাদেই তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান সম্পাদক পি সি যোশী শম্ভু মিত্রকে গণনাট্যের সেন্ট্রাল স্কোয়াডের দায়িত্ব নিতে বলেন, কিন্তু শম্ভু মিত্র অক্ষমতা জানান— কলকাতায় তাঁর বিশেষ কাজ আছে। আজ সকলেই জানেন, সেই বিশেষ কাজটি হল ‘নবান্ন’। ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার প্রথম অধ্যক্ষ সতু সেনের জীবনাবসানের পরে শম্ভু মিত্রকে সেই দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি তাও প্রত্যাখ্যান করেন এই কথা বলে যে তাঁর কাজ বাংলা থিয়েটারে। ১৯৪৪ সালের এই ‘নবান্ন’ নাটক বাংলা থিয়েটারের একটা মাইলফলক। নাটক বিজন ভট্টাচার্যের, নির্দেশনা ছিল নাট্যকার ও শম্ভু মিত্রের যৌথ দায়িত্বে। খালেদ চৌধুরীর মুখে শুনেছি, ‘নবান্ন’র প্রথম পাঠে সময় লেগেছিল চার ঘণ্টা, পরে শম্ভু মিত্রের নিপুণ সম্পাদনায় তা অভিনয়যোগ্য সময়ের পরিধিতে আসে।
শম্ভু মিত্র মৌলবাদী রাজনীতির চাপে বিরক্ত হয়ে গণনাট্য ছেড়ে আসেন ১৯৪৮-এর জানুয়ারির শুরুতে। ওই বছরের মাঝামাঝিই গোড়াপত্তন হয় ‘বহুরূপী’-র (তখনও নামকরণ হয়নি)। আজ সত্তর বছর পূর্তির লগ্নে মনে আসছে সেই মানুষগুলির নাম: কলিম শরাফি (বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক, কিছু দিনের মধ্যেই যিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান), অমর গঙ্গোপাধ্যায়, অশোক মজুমদার ও মহঃ জাকেরিয়া (এঁরা ছিলেন একই অফিসের সহকর্মী), শোভেন মজুমদার (সম্পর্কে তৃপ্তি মিত্রের ভাই), অরীন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় (পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চপদাধিকারী), স্মৃতি ও মুক্তি ভাদুড়ী (তৃপ্তি মিত্রের সহোদরা দু’জন)। আর পুরনোদের মধ্যে শম্ভু মিত্রের গণনাট্যের সঙ্গী মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, বিজন ভট্টাচার্য, গঙ্গাপদ বসু, রবীন্দ্র মজুমদার, সত্যজীবন ভট্টাচার্য, জলদ চট্টোপাধ্যায়, মহঃ ইস্রায়েল, ললিতা বিশ্বাস ও তৃপ্তি মিত্র। মহর্ষির সূত্রেই এসেছিলেন কালী সরকার, বিজন ভট্টাচার্য এনেছিলেন ঋত্বিক ঘটককে এবং ঋত্বিকের সূত্রে এসেছিলেন কুমার রায়।
মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের ‘মহর্ষি’ নামকরণ করেছিলেন শিশিরকুমার, ‘সীতা’ প্রযোজনার সূত্রে। ঢাকা বিক্রমপুরের এই মানুষটি নিতান্ত মামুলি মানুষ ছিলেন না। তাঁর মেধা, নাট্যানুরাগ, সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবের জীবন, তার পর আবার সংসদীয় রাজনীতির দিকে মুখ ফেরানো, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ও নেতাজি সুভাষচন্দ্রের সাহচর্য ইত্যাদি তাঁকে ভিন্ন এক মানুষ তৈরি করেছিল। শম্ভু মিত্র তাঁকে পেশাদারি থিয়েটারে পেয়েছিলেন। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও দু’জনেই যুক্ত হয়েছিলেন গণনাট্যে। ‘বহুরূপী’ প্রতিষ্ঠার পরে তিনি শুধু প্রথম পাঁচ বছরের সভাপতিই ছিলেন না, পুরনো বটগাছের মতো দলকে আগলে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন শম্ভু মিত্রের ফ্রেন্ড, ফিলসফার ও গাইড। ১৯৫০-এ তাঁরই কথামতো দলের নাম হয় ‘বহুরূপী’। তাঁরই উচ্চারিত নিদান ‘যত দিন ডিসিপ্লিন তত দিন বহুরূপী’। আবার স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘‘যদি থিয়েটার করতে গিয়ে ভদ্রলোক থাকা না যায় তো থিয়েটার করা ছেড়ে দেব কেননা সমাজে ভদ্রলোকের প্রয়োজন বেশি।’’ তাঁরই পরামর্শে স্থির হয়েছিল, দলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হতে হবে, সংখ্যার গুরুত্বে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ১৯৫৪-র জানুয়ারিতে তাঁর প্রয়াণে দ্বিতীয় বার পিতৃবিয়োগের কষ্ট পেয়েছিলেন শম্ভু মিত্র।
শুরু করার মতো মানুষজন তো পাওয়া গেল, কিন্তু মনের মতো নতুন নাটক কই! অগত্যা অশোক মজুমদার ও সম্প্রদায়-এর নামে তিন রাত্তির— ১৩, ১৪ ও ১৬ অক্টোবর ১৯৪৮— রঙমহলে পুরনো ‘নবান্ন’র অভিনয় হল। আগের সেই ঐতিহাসিক প্রযোজনার চারুপ্রকাশ ঘোষের জায়গায় মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুধী প্রধানের বদলি কালী সরকার, তৃপ্তি মিত্র নিজের পুরনো চরিত্রের বদলে শোভা সেনের জায়গায় আর তাঁর পুরনো চরিত্রে দেখা গেল সহোদরা মুক্তি গোস্বামীকে। বিজন ভট্টাচার্য এই প্রযোজনায় প্রথম ও শেষবার যুক্ত ছিলেন নিজের পুরনো চরিত্রে। অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও বেশ কিছু আর্থিক ঘাটতি থেকে গেল যেটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ক্ষতি বলে মেনে নেওয়া হয়।
এই সময়ে শোনা গেল তুলসী লাহিড়ী একটা নাটক লিখেছেন, দলের বেশি বয়সিদের অনেকেরই ভাল লেগেছে। সেইমতো একটা রবিবার নাটকটা পড়া হল। নাম ‘পথিক’। কিন্তু অল্পবয়সিদের ও তাদের নেতার তেমন ভাল লাগেনি। আরও ঘষামাজা দরকার।
নাটকীয়: ইবসেনের ‘অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল’ অবলম্বনে তৈরি ‘দশচক্র’ নাটকের দৃশ্য
ক’জন মানুষ তখন নিত্য যাতায়াত করছেন নাসিরুদ্দিন রোডের ফ্ল্যাটে। শুরু হল আবৃত্তির চর্চা। আবৃত্তি একক, দ্বৈত ও সমবেত কণ্ঠে। বহুরূপীর মানুষজন ছাড়াও তিনটি মেয়ের— প্রবোধ মিত্রের মেয়ে সুলেখা (পরবর্তী কালে অশোক সেনের স্ত্রী) আর জ্যোতিনাথ ঘোষের দুই মেয়ে প্রভাতী আর ভারতীর— বেশ বড় ভূমিকা ছিল। নানা জায়গায় আবৃত্তির অনুষ্ঠানগুলি সুখ্যাতি কুড়িয়েছিল সেই দিনগুলোয়। তুলসীবাবুর সংশোধিত ‘পথিক’ সামান্য পরিমার্জনা করে নিয়ে মহলা শুরু হল। ‘নবান্ন’র প্রায় এক বছর পরে, রেলওয়ে ম্যানসন ইনস্টিটিউটে ১৬ অক্টোবর ১৯৪৯ নতুন দলের নতুন নাটক ‘পথিক’ মঞ্চস্থ হল। খরচ-খরচা বাদ দিয়ে বেঁচেছিল তিনশো টাকা— প্রথম মূলধন। পরে এই প্রযোজনাকে চলচ্চিত্রায়িত করেন দেবকীকুমার বসু। ১৯৫০-এই বহুরূপীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অনুগ্রাহক সভ্য প্রথা চালু করা হল। উৎসাহী মানুষজন ইচ্ছে করলে বার্ষিক ছ’টাকা দিয়ে অনুগ্রাহক হয়ে নাটকের প্রথম প্রযোজনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠান দেখতে পারেন এবং সরাসরি নিজের মতামত জানাতে পারেন। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, পরবর্তী প্রযোজনা থেকেই প্রতিষ্ঠিতদের সঙ্গে নতুন মুখদের প্রকাশ্যে আনতে হবে।
১৯৫০-এর ১২ অগস্ট রেলওয়ে ম্যানসন ইন্সটিটিউটে ‘শ্রীসঞ্জীব’ ছদ্মনামে শম্ভু মিত্রের লেখা নাটক ‘উলুখাগড়া’ মঞ্চস্থ হল। বেশ আদৃত হল নাটকটি। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল, ‘‘সম্পূর্ণ নূতন ধরনের নাট্যখানি... এক কু-চরিত্র ব্যক্তির ভূমিকায় গঙ্গাপদ বসু, এক অর্দ্ধবিকৃতমস্তিষ্ক মহিলার ভূমিকায় শ্রীমতী তৃপ্তি মিত্র এবং উদ্ভট চরিত্র যুবকের ভূমিকায় শম্ভু মিত্র প্রথম শ্রেণীর অভিনয় করেন।’’
তৎকালীন বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে এর পরে বড় ঘটনা, ’৫০-এর শেষ ও ’৫১-র গোড়াতে ‘পথিক’, ‘উলুখাগড়া’ ও ‘ছেঁড়াতার’ নাটক নিয়ে প্রথম নাট্যোৎসবের আয়োজন— নিউ এম্পায়ারে পরপর ছ’টি রবিবার সকালে। উত্তরবঙ্গের পটভূমিকায় এক কৃষক পরিবারের ঘটনা নিয়ে লেখা তুলসী লাহিড়ির লেখা নাটক ‘ছেঁড়াতার’ প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৭ ডিসেম্বর ১৯৫০-এ। এই নাটকের খ্যাতি ‘বহুরূপী’র কাছেও নতুন। প্রবীণ নাট্যরসিক হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘এই নাট্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও শিল্পীগণ যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিয়েছেন তার মধ্যে পেয়েছি ভবিষ্যতের আশার ইঙ্গিত।’ অন্নদাশঙ্কর রায় লেখেন, ‘যদি এক হাজার লোক একশো টাকা করে দেয় কিংবা একশো লোক এক হাজার করে টাকা দেয় তা হলেই বহুরূপীর অভিনয়ের জন্য একটা মঞ্চ তৈরী করা যেতে পারে।’ ‘ছেঁড়াতার’ নতুন ভাবে মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৬৫-র ফেব্রুয়ারিতে।
এর পরে ১৯৫১-র প্রয়োজনা ‘চার অধ্যায়’— ‘বহুরূপী’র প্রথম রবীন্দ্রনাথ। দুরন্ত এই নাট্যাভিনয়ের জুড়ি বাংলা থিয়েটারে নেই। তবে শম্ভু মিত্রকে আমি ইন্দ্রনাথ করতে দেখিনি। আমি তাঁকে আর তৃপ্তি মিত্রকে অতীন ও এলা হিসেবেই বরাবর দেখে আসছি সেই ১৯৫৩ থেকে। আমার প্রথম দেখা ‘ইন্দ্রনাথ’ ছিলেন মহর্ষি, আর বটু চরিত্রে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক ও অদ্বিতীয় শোভেন মজুমদার। চার অধ্যায়ের প্রথম অভিনয় ২১ অগস্ট ১৯৫১ শ্রীরঙ্গমে, শেষ অভিনয় রবীন্দ্রসদনে ’৭৮-এর ১২ ফেব্রুয়ারি।
এ বারে ‘বহুরূপী’র প্রথম ইবসেন। ‘অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল’-এর শান্তি বসু কৃত বাংলা রূপান্তর ‘দশচক্র’ প্রয়োজিত হয় দু’বার, ১৯৫২ ও ’৬২তে। নির্দেশনা ও প্রধান চরিত্রে ছিলেন শম্ভু মিত্র। শম্ভু মিত্রের সঙ্গে বড় ভাইয়ের ভূমিকায় অমর গঙ্গোপাধ্যায়ের অসাধারণ সঙ্গত। আর সভার দৃশ্যটি চমৎকার আজও চোখ থেকে মুছে যায়নি।
এর পরে শুধু বাংলা নয়, সারা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা, রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’— ১০ মে, রেলওয়ে ম্যানসন ইন্সটিটিউটে। প্রথম অভিনয়ের পরই শোনা গিয়েছিল, ‘বহুরূপী’ রবীন্দ্রনাথ থেকে অনেকখানি সরে এসেছে, এমনকী নাটককে বিকৃত করা হয়েছে বলেও শোনা গিয়েছিল। দ্বিতীয় অভিনয়ের শেষে রটে যায়, বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড হয়তো এ প্রযোজনা আর করতে দেবে না। পরে প্রচুর গুণী, বুঝদার মানুষের প্রয়াসে ‘রক্তকরবী’র গোলমাল বন্ধ হয়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, খালেদ চৌধুরী না থাকলে ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ করা যেত না। অসম্ভব গুণী এই মানুষটির করা বহুমাত্রিক মঞ্চসজ্জা আজ পর্যন্ত অনতিক্রম্য। তাঁর অভিনব আবহ সঙ্গীত, সামান্য দু-একটি যন্ত্রের সাহায্যে সঙ্গীত পরিচালনা এক নতুন পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাপস সেন খুব সংবেদী ও মায়াবী আলোয় ‘রক্তকরবী’কে দৃশ্যমান করেছিলেন। শম্ভু মিত্রের নিপুণ নির্দেশনা এবং নন্দিনী (তৃপ্তি মিত্র), সর্দার (অমর গঙ্গোপাধ্যায়) গোঁসাই (কুমার রায়) অধ্যাপক (গঙ্গাপদ বসু), এঁদের সকলের সম্মিলিত অভিনয় দেখে ‘দেশ’ লিখেছিল ‘স্মরণকালের মধ্যে এমন প্রযোজনা বাংলা মঞ্চে দেখা যায়নি।’ কে না প্রশংসায় কলম ধরেননি! গোপাল হালদার, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, উৎপল দত্ত, আরও কত সব বিখ্যাত মানুষ! দিল্লির সপ্রু হাউসে আয়োজিত প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসবে শ্রেষ্ঠত্বের জয়মাল্য জোটে ‘রক্তকরবী’র কপালে। তার পর ১৯৫৬-তে বোম্বের ওয়ার্ল্ড থিয়েটার কনফারেন্সে আবার জয়জয়কার। ‘বহুরূপী’র জয়যাত্রা শেষ হয়েছিল ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে।
১৯৫৫-য় শুরু হয় ‘বহুরূপী’ পত্রিকা। খালেদ চৌধুরীর অনবদ্য প্রচ্ছদে তারাভূষণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত সেই পত্রিকা আজও প্রকাশিত হয়ে চলেছে। পরবর্তী সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাপদ বসু, শম্ভু মিত্র, কুমার রায়, চিত্ররঞ্জন ঘোষ, তার পর প্রভাত কুমার দাসের হাতে প্রকাশিত হয়ে চলেছে এই পত্রিকা। প্রচ্ছদশিল্পীদের মধ্যে দুটি নাম উল্লেখযোগ্য, খালেদ চৌধুরী ও পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়। বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ ও শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বণিকের পালা’— আমরা পেয়েছি এই নাট্যপত্রে। ১৯৫৭-র মার্চে বহুরূপী প্রথম ঢাকা যায় ‘রক্তকরবী’ আর ‘ছেঁড়াতার’ নিয়ে। পরে আর এক বার, শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে সত্তরের দশকে ‘বহুরূপী’ ঢাকা গিয়েছিল ‘পাগলা ঘোড়া’ আর ‘অপরাজিতা’ নিয়ে। সেই সময়কার সফলতা দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন, এর পরে এক মাস ধরে বাংলাদেশের চারটি জায়গায় ‘বহুরূপী’ নাট্যোৎসব করা হবে। সে আর হয়ে ওঠেনি কেননা মুজিব নিজেই পাড়ি দিয়েছিলেন দূর অজানায়। তবে ‘বহুরূপী’ পরে আবার বাংলাদেশে গিয়েছে।
রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় সরকার ‘বহুরূপী’কে রাশিয়ায় পাঠাবেন, এমনটা শুনেছিলাম। কিন্তু শম্ভু মিত্রের মস্কো, চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া ও পোল্যান্ড সফরের পরে ‘চারটি দেশের থিয়েটার’ নিয়ে তাঁর লেখায় মস্কো বাদ দিয়ে অন্য তিনটি দেশের প্রশংসার তারতম্যের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার এ সদিচ্ছা থেকে বিরত হন। পরে সোনালি রোসেলিনি ব্যক্তিগত ভাবে চেষ্টা করেছিলেন ‘বহুরূপী’কে নিয়ে যাওয়ার, সেটাও ফলপ্রসূ হয়নি।
১৯৫৮-র ১০ ফেব্রুয়ারি ‘বহুরূপী’র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এক দিন যে নাটক ইউরোপকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল, ইবসেনের সেই ‘আ ডলস হাউস’ শম্ভু মিত্রের হাতে হয়ে উঠল ‘পুতুলখেলা’। তারই প্রথম অভিনয় হয়েছিল সে দিন। খালেদ চৌধুরীর মধ্যবিত্তের গৃহসজ্জা, তাপস সেনের আলো, শম্ভু মিত্রের নির্দেশনা আর তৃপ্তি মিত্র-শম্ভু মিত্র-কুমার রায়-আরতি মৈত্রের অভিনয়ে ‘পুতুলখেলা’ এক অনুপম প্রযোজনা। লন্ডনের মঞ্চস্থপতি হার্বাট মার্শাল ১৯৬২-তে ‘প্লেজ অ্যান্ড প্লেয়ার্স’ পত্রিকায় এই নাটককে মস্কো আর্ট থিয়েটারের প্রযোজনার চেয়েও জীবন্ত মনে করেছিলেন।
১৯৫৯-এর ডিসেম্বরে নিউ এম্পায়ারে আবার হল ‘মুক্তধারা’, এবং এ বারও অসফল। এ বারের ব্যর্থতার পরে শম্ভু মিত্রের মন্তব্য ছিল, বাংলা থিয়েটারের জীবিত ও মৃত সব অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করলে ‘মুক্তধারা’ হয়তো সফল হতে পারে। ১৯৬১-তে হল ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ আর রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। ‘বিসর্জন’ করে সফলতা পাননি শিশিরকুমার, শম্ভু মিত্রের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রইল। ‘বিসর্জন’ প্রথম অভিনীত হয়েছিল দিল্লিতে, ১৯৬১-র ১১ নভেম্বর।
নিউ এম্পায়ারে ১৯৬১-র ১২-১৮ জুন পাঁচটি জনাদৃত নাটক ও দুটি নতুন নাটক নিয়ে হল ‘বহুরূপী’র দ্বিতীয় নাট্যোৎসব। নতুন নাটকদুটি— শম্ভু মিত্রের অনুবাদে সোফোক্লেসের ‘রাজা অয়দিপাউস’ ও রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’। এই নাট্যোৎসবে শম্ভু মিত্রকে উন্মাদের মতো পরিশ্রম করতে দেখেছি। এত পরিশ্রমের সুফলও হাতে হাতেই পাওয়া গিয়েছিল। দেড় ঘণ্টার নাটক ‘রাজা অয়দিপাউস’-এর তো জবাব নেই, আর ‘রাজা’ একেবারে অন্যধারার নাটক। ১৯৬৬-র ইস্ট-ওয়েস্ট থিয়েটার সেমিনারে যাওয়ার সময়ে শম্ভু মিত্র আরও এক বার ‘রাজা’র কাটাকুটি করলেন। আরও নতুন গান যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু যত দিন না শাঁওলী মিত্র সুরঙ্গমার চরিত্রে আসেন, ‘রাজা’ তার সম্পূর্ণ সার্থকতা পায়নি।
শম্ভু মিত্রের শেষ বড় কাজ— বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’— ১৯৬৭-তে। সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল। তিনটি ভিন্নধর্মী চরিত্রে তৃপ্তি মিত্র ও কুমার রায়ের অপূর্ব অভিনয়ে মঞ্চসফল হয়েছিল এই নাটক। ‘বহুরূপী’ সত্তর বছরের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলির তালিকায় জ্বলজ্বল করবে ‘বাকি ইতিহাস’।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/back-story-of-bengali-premier-theatre-group-bohurupee-1.811157?ref=strydtl-rltd-rabibashoriyo

পল কাকার কুটির ( On Paul Robeson)

পল কাকার কুটির

ফিলাডেলফিয়ার ছোট্ট এক বাড়িই তাঁর শেষ আশ্রয়। কৃষ্ণাঙ্গ বলে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই দেয়নি তাঁকে। কমিউনিস্ট সন্দেহে সরকারও কেড়ে নিয়েছিল পাসপোর্ট। তবু তাঁর গান ছুঁয়েছে পৃথিবীকে। তিনি না থাকলে বিস্তীর্ণ দু’পারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও গঙ্গার নীরব প্রবহমানতা নিয়ে অভিযোগ জানাতে পারত বাংলা গান? আগামী কাল পল রোবসন-এর জন্মদিন।

প্রসেনজিৎ সিংহ
 
Paul Robeson

জননায়ক: পল রোবসন, পিয়ানোর সামনে হাসিমুখে। তাঁর গান হয়ে উঠেছিল অগুনতি মানুষের প্রেরণা। ছবি: গেটি ইমেজেস

আপাত-নিরীহ বাড়িটা দেখে আজ আর কিছু বোঝার উপায় নেই। অনুমান করা শক্ত, এফবিআই এই বাড়ির এক বৃদ্ধের প্রতিটি গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখত। এমনকী শেষ বয়সেও, যখন অবসর যাপন করছেন বোন মারিয়ানের কাছে। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত শেষ দশটা বছর সেই ‘ট্রু আমেরিকান হিরো’র ঠিকানা ছিল এই বাড়িটাই।
ফিলাডেলফিয়া শহরের ওয়ালনাট স্ট্রিট আর ফিফটিয়েথ স্ট্রিট যেখানে একে অপরকে কেটেকুটে নিজের মতো চলে গিয়েছে, বাড়িটা সেই সমকোণেই বসানো। ঐতিহাসিক এই শহরে পশ্চিমাংশের অন্য পুরনো বাড়িগুলির সঙ্গে দৃশ্যত কোনও তফাত নেই। ঔপনিবেশিক যুগের ইংলিশ এবং স্প্যানিশ স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি। ফাঁপা ইটের গাঁথনি। কাঠের দেওয়াল। সাদার্ন পাইন ফ্লোরিং। উঁচু বারান্দা। বড় বড় কাচের জানলা। প্রচুর আলো। চিলেকোঠার স্কাইলাইট ইত্যাদি।
 গরিমা বলতে বাড়ির সামনে পেনসিলভানিয়া হিস্টোরিক্যাল অ্যান্ড মিউজিয়াম কমিশনের তরফে খাড়া করা একটা ফলক। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, এ বাড়ির বাসিন্দা রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলম্বিয়া ল’স্কুলের ছাত্র। প্রথম জীবনে খেলোয়াড়। পরবর্তী জীবনে গায়ক এবং অভিনেতা। সেই সঙ্গে হালকা উল্লেখ রয়েছে, মানুষটির কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে।
 ‘বহুমুখী প্রতিভা’ শব্দবন্ধটি তাঁর নামের পাশে হয়তো সবচেয়ে ঠিকঠাক বিশেষণ। তবে শুধু সেটুকু বললে কিছুই বলা হয় না। এমন মানুষ আমেরিকার ইতিহাসে কমই এসেছেন। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যালেডিক্টোরিয়ান স্টুডেন্টের সম্মান পেয়েছিলেন। কলম্বিয়া আইন স্কুলেও তাই। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী এই মানুষটা ছাত্রজীবনে আমেরিকান ফুটবল টিমের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য হিসাবে খেলার সুযোগ পান। আবার ব্রডওয়েতে একটানা ২৯৬ রজনী ওথেলোর ভূমিকায় অভিনয় করার রেকর্ডটিও তার পকেটে। গায়ক হিসাবেও খ্যাতি জগৎজোড়া। তারই টুপিতে গ্র্যামি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের পালক। হার্লেম রেনেসাঁস-এর অন্যতম পুরোধা। জানতেন কুড়িটিরও বেশি ভাষা।
কিন্তু এমন অজস্র অভিজ্ঞানের পরেও আম বাঙালি তার সঙ্গে কোথায় ‘কানেক্ট’ করবেন, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এমনকী, কাচের দরজায় তার হাসিমুখের যে ছবিটা এখনও আটকানো রয়েছে, সেটা দেখেও কোনও বাঙালি একবারেই চিনে ফেলবেন, এমনটা আশা করা উচিত হবে না। এর উত্তর, সম্ভবত দু’টি গান। সে কথায় পরে আসা যাবে।
তথ্য মহাসড়কে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই খোঁজ পেয়ে যখন বুঝলাম, এই মানুষটা প্রতিবেশী, বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটলেই তাঁর জীবনের শেষ আবাসে পৌঁছনো যায়, মনটা ছটফট করে উঠল। ফোন করে সে দিনই যাওয়ার কথা ভাবা গেল। নামের অভিঘাত? না কি সেই দু’টো গান!
হয়তো তাই। একটু পিছনে ফিরতে হবে। বিপ্লবজারিত বুকে গণনাট্যের কর্মীরা তখন পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় গেয়ে বেড়াচ্ছেন ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’। সত্তর দশকের শেষ দিক থেকেই কখনও বাড়িতে বসে, কখনও রাস্তায় যেতে যেতে গানটা কানে আসত। সেই গানেই ‘পল রোবসন’ নামটা কানে এসেছে বহু বার। তবে তিনি কে, কেনই বা তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে বামপন্থীদের গণসঙ্গীতে, সেই বয়সে তা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না। কারণ বামপন্থী আবহাওয়ায় বড় হইনি। তবু এত দিন পরে সেই নামটাই যেন পুরনো আমানতের মতো ফুলেফেঁপে বিশাল আকার নিয়েছে। মনে হল, মানুষটার বাড়ি, তাঁর স্মৃতিজড়িত জিনিসপত্রের সঙ্গে মোলাকাত যেন লাইটহাউসের মতো বিশাল সেই মানুষটার সঙ্গেই দেখা হওয়া।
 একটু খুঁজতে নম্বর পাওয়া গেল। ফোন করতেই এক মহিলা ধরলেন। ভার্নোকা মাইকেল। আমার ইচ্ছের কথা শুনে জানালেন, সে দিন উনি থাকবেন। গেলে দেখা হবে। দুপুরবেলা হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন ভার্নোকা। আলাপ জমে গেল। এক সময় আবিষ্কার করলাম, আমরা দু’জনেই রোবসনের প্রতিবেশী। তফাত শুধু, আমি তাঁকে কোনও দিন দেখিনি। ভার্নোকার ছোটবেলার অনেকটা সময় কেটেছে ‘আঙ্কল পল’-এর সঙ্গে।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর এ বাড়িতে যখন রোবসন থাকতে আসেন, ভার্নোকারা থাকতেন উল্টো দিকের বাড়িতে । কিন্তু আঙ্কল পল-এর সঙ্গে তার সখ্য ছিল। এমন এক মানুষের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা, অথচ বন্ধুবান্ধবদের গর্ব করে সে কথা বলতে পারতেন না। কারণ, তখন রোবসন সরকারের বিষনজরে। বস্তুত রোবসনের সঙ্গে তাদের পরিচিতির কথা ভার্নোকার পরিবারের কেউই বাইরে বলতেন না।
কিশোরীবেলার সেই সখ্যই বড় এক দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে ভার্নোকাকে। তিনিই এই বাড়ি তথা প্রদর্শশালার কিউরেটর। দোতলা বাড়ির একতলায় বসার ঘর। সিঁড়ির পাশে একটা ছোট অর্গ্যান। সাদা-কালো রিডে রোবসনের স্পর্শ, অতীতের সাদা-কালো ছবির মতোই মৌনমুখর। এ বাড়ির চারপাশে অজস্র ছবি। তার মধ্যে দু’টি ছবিতে চোখ আটকে গেল। একটিতে আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে রোবসন। প্রিন্সটনে তোলা। সে সময় হোটেলে থাকতে পারতেন না বলে আইনস্টাইনের আতিথ্য গ্রহণ করতেন তিনি। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর দরজা  তাঁর জন্য সর্বদাই খোলা ছিল। আর একটিতে রোবসনের কোলে ছোট্ট জ্যাকলিন কেনেডি (আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির স্ত্রী। আততায়ীর গুলিতে মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে ছিলেন জ্যাকলিন)।
দোতলায় রোবসনের শোওয়ার ঘর। খাটের পাশে রাখা সে যুগের রকিং চেয়ার, নিতান্ত সাধারণ। তাঁর ব্যবহার করা জিনিসপত্রও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কাপ-ডিশ, ছুরি-চামচ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তাঁর গানের রেকর্ড, ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর পেপার কাটিং।
সময়ের ঝাপটায় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটি ছবিতে আবিষ্কার করা গেল নগ্ন রোবসনকে। ঈশ্বরের হাতে কোঁদা সেই আবলুস ভাস্কর্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই ভার্নোকা জানান, সারা জীবন অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন। অল্প বয়সে শ্বেতাঙ্গরা কখনও তাঁকে স্ট্রিপটিজও করতে বাধ্য করেছে। মডেলিং করে সেই অপমানের মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন তিনি। 
ভর দুপুরের নিরালায় আলাপ এগোয় স্মৃতিসান্নিধ্যের মাঝখান দিয়ে। বুঝতে পারি, ঠিক যে কারণে গণনাট্যের সদস্যেরা তাঁকে নিজেদের লোক মনে করতেন, প্রাণিত হতেন তাঁর গানে, ঠিক সেই কারণেই আমেরিকা সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিলেন রোবসন। কমিউনিজম। কিন্তু কোনও কমিউনিস্ট দলে তিনি নাম লেখাননি কখনও। বর্ণবৈষম্য আর শোষণের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর লড়াই। তবুও। ঠান্ডা যুদ্ধের সেই ম্যাকার্থি-জমানায় মার্কিন সরকার তাঁকে কমিউনিস্টপ্রেমীই ভাবত।
রোবসন রাশিয়া গিয়েছিলেন স্তালিন জমানায়। ১৯৩৪ সালে। রুশ চলচ্চিত্রকার সের্গেই আইজেনস্টাইনের আমন্ত্রণে। রাশিয়ায় পা রেখে রোবসন বলেছিলেন, সেখানে তিনি আর নিগ্রো নন। জীবনে প্রথম বার তিনি একজন মানুষ। সেখানে ভেদাভেদহীন শ্রমিকসমাজ দেখে প্রাণিত হন রোবসন। আর তার দু’বছর পরেই রেকর্ড করবেন দুনিয়া-কাঁপানো গান— ওল’ ম্যান রিভার। সেই গানে শ্রমিকদের যন্ত্রণা, শোষণের কথা ফুটে উঠবে তাঁর ব্যারিটোনে।
সেই ঐতিহাসিক রাশিয়া সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী এসি। কলেজ-জীবনেই যাঁর সঙ্গে পরিচয়, এবং বিয়ে। এক সময় এক অভিনেত্রীকে ঘিরে যাঁর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি। ছিলেন মারি সিটন। যে সিটন জওহরলাল নেহরু এবং সত্যজিৎ রায়েরও জীবনীকার।
ঠিকানা: ফিলাডেলফিয়ার যে বাড়িতে থাকতেন পল রোবসন
যাই হোক, ওল’ ম্যান রিভার-ই সেই দ্বিতীয় গান, যা বাংলার মানুষের সঙ্গে পল রোবসনকে চিরদিন জুড়ে রাখবে। স্কুল-কলেজের দিনগুলোতে ভূপেন হাজারিকার গান মুখে মুখে ফিরত। ‘আমি এক যাযাবর’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’, ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’, ‘হে দোলা’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়’— এমন কত গান। এর মধ্যে ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’-র কথাই এখানে বেশি করে আসবে, কারণ, এই গানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন রোবসন। ‘ওল ম্যান রিভার’ মাথায় রেখেই এই গান রচনা করেছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তবে তারও একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে। 
কটন কলেজ থেকে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি। সেখানকার পাঠ শেষ করে বৃত্তি নিয়ে ভূপেন হাজারিকা এসেছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণা করতে। বছর পাঁচেক ছিলেন। এখানেই বিয়ে করেন বল্লভভাই পটেল পরিবারের মেয়ে এবং তাঁর বান্ধবী প্রিয়ম্বদা পটেলকে। শোনা যায়, সে সময় তিনি পল রোবসনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তবে তা নিয়ে দ্বিমত আছে। নিউইয়র্কে বেশ কাছাকাছি ওঁরা থাকতেন, এ কথা সত্য। তবে একটা সাক্ষাৎকারে ভূপেন জানিয়েছিলেন, তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা গিয়েছিলেন। রোবসন তখন আমেরিকা সরকারের রোষদৃষ্টিতে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণেই তিনি দেখা করার কথা ভাবেননি। তবে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি রোবসনের গান শুনেছেন। আর সে যুগের আকাশে-বাতাসে ভেসে থাকা বার্তাটুকু নির্ভুলভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। শিখেছিলেন, গানকে দিনবদলের হাতিয়ার হিসাবে কী ভাবে ব্যবহার করা যায়।
রোবসনের গাওয়া ‘ওল ম্যান রিভার’ (কথা: অস্কার হ্যামারস্টেইন, সুর: জেরোম কার্ন) প্রাণিত করে ভূপেন হাজারিকাকে। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে অসমিয়ায় ব্রহ্মপুত্রকে নদকে নিয়ে ‘বুড়া লুই’, পরে বাংলা ও হিন্দিতে  গঙ্গাকে নিয়ে ‘ও গঙ্গা বইছ কেন’ এবং ‘ও গঙ্গা বহতি হো কিঁউ’ গানগুলির জন্ম দেন— ‘ওল ম্যান রিভার’-এর ছায়ায়। মূল গানটি মিসিসিপি নদীকে ঘিরে অসংখ্য আফ্রো-আমেরিকান শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামকে ঘিরে। শুধু ভূপেন হাজারিকাই নন, পরে রুমা গুহঠাকুরতার নেতৃত্বে ক্যালকাটা ইউথ কয়্যারের শিল্পীদের কণ্ঠেও গানটা খুব শোনা যেত।
গানটার মধ্যে একটা রক্ত গরম করে দেওয়া ব্যাপার ছিল ঠিকই। কিন্তু তখনও গানটার মূল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা ছিল না। ইমেল ইন্টারনেট, মোবাইল কোথায় তখন! অনেক বড় বয়সে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সৌজন্যে নজরে আসে ‘ওল ম্যান রিভার’ গানটির অস্তিত্ব। সঙ্গীত-নৃত্য মুখরিত সে যুগের থিয়েটার বা বিখ্যাত আমেরিকান মিউজিক্যাল ‘শো বোট’-এ গানটি গেয়েছিলেন পল রোবসন। ১৯২৮ সালে, লন্ডনের রয়্যাল থিয়েটারে। তার পরেও ওই ‘শো বোট’ মঞ্চস্থ করেছেন বাকিংহাম প্যালেসে। পরে সেটি থেকে সিনেমাও হয়েছে। কিন্তু রোবসনের কণ্ঠে সেই গান ১৯৩৬ সালে রেকর্ড হওয়ার পর দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
প্রিন্সটনে জন্ম রোবসনের। গায়ের রংই প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পথে বাধা হয়েছিল। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। আমেরিকান ফুটবলে অংশগ্রহণ করলেও সতীর্থদের সঙ্গে সফর করতে পারতেন না ওই একই কারণে। রোবসন মানুষের সমান অধিকারের কথা বলতেন। মনে প্রাণে এক জন আমেরিকান হয়েও জানতেন, তাঁর নিজের দেশে কালো মানুষদের জন্য সমানাধিকার তখনও অনেকটা দূরে। তাঁর বাবা ছিলেন এক পলাতক ক্রীতদাস। তবে গায়ের রং আর কবে কোথায় কোন প্রতিভাকে আটকাতে পেরেছে?
সমানাধিকারের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও প্রকাশ্যে তার পক্ষে সওয়াল করার অভিযোগে ১৯৫০ সালে রোবসনের পাসপোর্ট বাতিল করে দেয় আমেরিকা সরকার। বন্ধ হয়ে যায় আমেরিকার বাইরে তাঁর সমস্ত অনুষ্ঠান। হতাশা গ্রাস করে তাঁকে। এই কঠিন সিদ্ধান্তের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি তিনি— পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার পরেও। জনতার সরণি থেকে তখনই সরে যান। চলে আসেন ফিলাডেলফিয়ায়।
এই স্মৃতিঘর ছিমছাম, সন্দেহ নেই। তবে প্রত্যাশা ছিল কিছু বেশি। একটি ঘরে দেখলাম, টেবিলের ওপর পর পর ফেলে রাখা হয়েছে বেশ কিছু ছবি। কিছু জিনিসপত্র মনে হয়েছে আরো ভাল করে হয়তো ডিসপ্লে করা যেত। এই ঔদাসীন্যে খারাপ লাগে। ভার্নোকাকে জিগ্গেস করি, এই স্মৃতিরক্ষার জন্য আমেরিকান সরকার সহায়তা করে না আপনাদের? ভার্নোকা অস্বস্তিতে পড়েন। একটু ভেবে বলেন, সংগ্রহশালা সংস্কারের জন্য এককালীন অর্থ তাঁরা পেয়েছেন। তবে অনেক কাজই বাকি রয়েছে অর্থের জন্য।
আমেরিকার কাছ থেকে আরও একটু মর্যাদা প্রাপ্য ছিল বিস্মৃতপ্রায় আমেরিকান হিরোর!

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/paul-robeson-the-story-of-how-an-american-icon-was-driven-to-death-to-be-told-in-film-1.783356?ref=archive-new-stry

চিন-ভারতের সেতু বেঁধেছিলেন কবি ( On China Bhaban)

চিন-ভারতের সেতু বেঁধেছিলেন কবি

রবীন্দ্রনাথের চেষ্টায় ১৯৩৭ সালে শান্তিনিকেতনে তৈরি হয় চীনা ভবন। উদ্দেশ্য, চিনের সঙ্গে এ দেশের গাঁটছড়া বাঁধা। ডোকলামের রণং দেহি বাজারেও আশি বছর পেরিয়ে গেল সেই ভবন।

স্বপনকুমার ঘোষ
 
Tan Yun-Shan

প্রতিষ্ঠাতা: তান-য়ুন শান।

রবীন্দ্রনাথ ১৯২৭ সালে গিয়েছেন চিন ভ্রমণে। এটা দ্বিতীয় বার যাওয়া, ১৯২৪-এ গিয়েছিলেন প্রথম বার। এ বার ভ্রমণের তালিকায় ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও অনেকগুলি জায়গাও। ঘুরতে ঘুরতে এলেন সিঙ্গাপুরে। এখানেই কবির সঙ্গে দেখা ছাব্বিশ বছরের এক চিনা যুবকের। উজ্জ্বল, সপ্রতিভ। নাম তান-য়ুন শান। সিঙ্গাপুরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তান-এর নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয়। বিশ্বকবির ইচ্ছে, পৃথিবীর বহু ভাষা-সংস্কৃতির মিলনায়তন হয়ে উঠবে বিশ্বভারতী, এক নীড়ে বহু বৈচিত্রকে আশ্রয় দেবে সে। রবীন্দ্রনাথ চিনা তরুণ তান-কে বিশ্বভারতীতে চিনা ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। অপ্রত্যাশিত এই প্রস্তাবকে তান গ্রহণ করলেন কবির
আশীর্বাদ হিসেবে।
পরের বছর, ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বরে তান-য়ুন শান এলেন কলকাতায়। ৩ সেপ্টেম্বর জোড়াসাঁকোতে দেখা করলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। রাতের ট্রেনেই চলে এলেন শান্তিনিকেতন। সঙ্গী ছিলেন পাঠভবনের তৎকালীন অধ্যক্ষ সত্যজীবন পাল। শুরু হল নতুন এক জীবন। কবির আমন্ত্রণে চিনা শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে এলেও, তান মনেপ্রাণে হয়ে উঠলেন এক জন ভারতীয় ছাত্র ও গবেষক। এক দিকে পড়ান চিনা ভাষা, অন্য দিকে নিজে পড়েন সংস্কৃত। রানী চন্দের স্মৃতিকথায় আছে ‘প্রফেসর তান’-এর কথা। প্রথমে একাই এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে, পরে স্ত্রী, দু’টি ছেলেমেয়েকেও নিয়ে আসেন। মেয়ে তানওয়েন বড় হয়ে বিশ্বভারতীতে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়, এমএ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল সে। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন আর একটি মেয়ে হয় তান-দম্পতির, রবীন্দ্রনাথ তার নাম রেখেছিলেন ‘চামেলি’। আশ্রমের মাটিতে প্রথম চিনে-কন্যার জন্ম।
রবীন্দ্রনাথের কাছে চিন ছিল পরম আগ্রহের হীরকখণ্ড। তাঁর আন্তরিক এষণা ভারত ও চিন, দুই দেশের শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নিবিড় সেতুবন্ধনের সূচনা করেছিল। কবির এই কাজে তাঁর সহযোগী ও সঙ্গী ছিলেন তান। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, চিনা ভাষা-সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সক্রিয় চর্চা হোক বিশ্বভারতীতে। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক ও ছাত্ররা চিনা ভাষা জানুক, চিনা সংস্কৃতি সম্পর্কে উৎসুক হয়ে উঠুক, সে দিকেও সবিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। আর এই ভাষা-সংস্কৃতির চর্চার কেন্দ্র হিসেবে শান্তিনিকেতনে ‘চীনা ভবন’ স্থাপনা ছিল রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায়। রবীন্দ্র-জীবনকালেই, ১৯৩৭ সালের ১৪ এপ্রিল উদ্বোধন হয়েছিল চীনা ভবন— তান-য়ুন শান ছিলেন তার প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ।  
বিশ্বভারতীতে বছর তিনেক কাজ করার পর ১৯৩১-এর সেপ্টেম্বরে তান চিন-এ যান, চীনা ভবন প্রতিষ্ঠার কাজেই। ১৯৩৩ সালে নানকিংয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সিনো-ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি’। ভারতবর্ষে এই পরিষদের সভাপতি হলেন রবীন্দ্রনাথ। তান-য়ুন শান চীনা ভবন প্রতিষ্ঠার একটি খসড়া-পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। কবির মন্তব্য সহ সমস্ত খসড়া-পরিকল্পনাটি চিন ও ভারত দুই দেশেই চিনা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়।
চিনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চীনা ভবন প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন তান। সে দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, এমনকী রাষ্ট্রপ্রধানেরও সহযোগিতা ও আন্তরিক সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে জোগাড় করেছেন অসংখ্য চিনা বই। চিনের সিনো-ইন্ডিয়ান কালচারাল সোসাইটি এক লক্ষ টাকার বই কিনে, উপহার হিসেবে তা তুলে দেন তানের হাতে। এ ছাড়াও তাঁর অন্যান্য বন্ধু ও প্রকাশকরা প্রায় হাজার পঞ্চাশ চিনা বই উপহার দেন। এর মধ্যে ছিল চৈনিক বৌদ্ধমত, চৈনিক ধ্রুপদী সাহিত্য ছাড়াও ইতিহাস, শিল্পকলা ও দর্শনের বই। চিনা, তিব্বতি ও সংস্কৃত— এই তিন ভাষায় লেখা ধ্রুপদী সাহিত্য সংগ্রহ, বিশেষ করে ত্রিপিটক থেকে অনুবাদ ও টীকার কাজে তানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। চিনা ত্রিপিটকের বিভিন্ন সংস্করণ নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সংগ্রহ করে এনেছিলেন কাঠের হরফে ছাপা (জাইলোগ্রাফ) তিব্বতি ত্রিপিটক। ১৯২২ সালে হাবদুন নামে চিনের এক ধনী ইহুদি বণিক চিনা ভাষায় অনূদিত সমগ্র ত্রিপিটক বিশ্বভারতীকে উপহার দিয়েছিলেন। পরে চিন-এর চব্বিশটি রাজবংশের বিপুল গ্রন্থসমূহ এখানে সংগৃহীত হয়। তান-য়ুন শান চীনা ভবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দুষ্প্রাপ্য বৌদ্ধ গ্রন্থের সম্পাদনা ও অনুবাদের কাজ সুসম্পন্ন করেছিলেন। নিজেও উদ্ধার করেছেন বহু মূল্যবান নথিপত্র, যার মূল্য অপরিসীম।
বিশ্বভারতীর ‘চীনা ভবন’, সে কালে।
সংগৃহীত অর্থ ও সমস্ত বইপত্র নিয়ে ১৯৩৬-এ তান ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে। ওই বছরেই তাঁর উদ্যোগে চীনা ভবন তৈরির কাজ শুরু হয়। বৌদ্ধ স্থাপত্যশৈলী চৈত্যের অনুকরণে ভবনটি নির্মিত। পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন আশ্রম-সচিব ও শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ কর। এ ছাড়াও নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেজ, বিনায়ক মাসোজী এবং কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা চীনা ভবনের স্থাপত্য, দেওয়ালচিত্র (ফ্রেস্কো) গড়ে তুলেছিলেন। রানী চন্দের বর্ণনা: ‘চীনভবনের বাগানে রাশি রাশি ফুল ফুটল। ঘরে ঘরে বৌদ্ধসন্ন্যাসীর বস্ত্রের উজ্জ্বল কমলা রঙে আলো ঝলমল করে উঠল। চীনে পণ্ডিত, চীনে শিল্পী, ছাত্র-শিক্ষকে বাড়ি ভরে গেল।’’
আশি বছর আগে, ১৯৩৭-এর ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিন চীনা ভবনের উদ্বোধন করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‘এ দিনটি আমার কাছে বস্তুতই একটি স্মরণীয় দিন।... ভারতবাসী ও চীনবাসীর মধ্যে সংস্কৃতি ও বন্ধুত্ব আদানপ্রদানের একটি ব্যবস্থার পত্তন আজ করা গেল।...’’ পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানতপস্বীদের এক মিলনকেন্দ্র হিসেবে রূপ নেয়। অনেক উৎসব-অনুষ্ঠান হয়েছে এখানে— রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই, এসেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, দেশবিদেশের বহু গুণী-জ্ঞানী। এসেছিলেন জেনারেল চিয়াং কাইশেকও।
শান্তিনিকেতনে চীনা ভবনের যখন পত্তন হয়েছিল, তখন ভারতবর্ষে চিনা ভাষা চর্চার অন্য কোনও কেন্দ্র খুব সম্ভবত ছিল না। অনেক বছর পরে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে চিনা ভাষা চর্চা ও গবেষণার একটি বড় কেন্দ্র গড়ে ওঠে। চিনা দূতাবাসের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগও স্থাপিত হয়। বৃত্তি নিয়ে বহু ভারতীয় ছাত্রছাত্রী চিন-এ গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে।
চীনা ভবনে এই মুহূর্তে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও গবেষণারত মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৬০। চিন ও ভারতের শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মৈত্রী স্থাপনে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য চীনা ভবন-কে ‘পঞ্চশীল’ স্মারক সম্মান দিয়েছে চিন। গত ১৫ বছরে চীনা ভবন ভারত ও চিনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করেছে আন্তর্জাতিক মানের আলোচনাচক্র। চিনের ইউনান ও বেজিং বিশ্ববিদ্যালয়, সাংহাই গ্রন্থাগারের সঙ্গে  চলছে শিক্ষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদান। সাংহাই গ্রন্থাগার বছরে একশোটি করে বই উপহার দিচ্ছে চীনা ভবন গ্রন্থাগারকে। সমকালীন চিনা সাহিত্য, চিনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও বিদেশনীতির বিষয়ে পঠনপাঠনের জন্য বহু মূল্যবান গ্রন্থ সংগৃহীত হয়েছে। চীনা ভবনের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাগারটির আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
গত পনেরো-বিশ বছরে চিনের আবহাওয়া বদলেছে। মুক্ত উদারনীতির পালে হাওয়া লেগেছে, চিনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যও বেড়েছে লাফিয়ে। আবার উলটো দিকে, অরুণাচল প্রদেশ, ডোকলাম নিয়ে দুই দেশের রাজনীতি-কূটনীতির পরিসরেও মাঝেমধ্যেই ঘনাচ্ছে কালো মেঘ। এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই, শান্তিনিকেতনে চীনা ভবন পেরিয়ে এসেছে গৌরবময় আশি বছর। ডোকলামের বাজারে ভারতীয়রা খেয়াল রাখেনি, চিন মানে শুধুই শত্রু নয়। আশি বছর আগেই শান্তিনিকেতনের মাটিতে সেই চিনের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত এক শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন স্বপ্নের শরিক।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/tan-yun-shan-who-established-cheena-bhavana-in-visva-bharati-1.783333?ref=archive-new-stry

Sunday, 10 June 2018

দুশো বছর পেরিয়ে এসেছে ব্রহ্মসঙ্গীত

দুশো বছর পেরিয়ে এসেছে ব্রহ্মসঙ্গীত

ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছিল ব্রহ্মসঙ্গীত। রামমোহন রায় থেকে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী থেকে সুকুমার রায়, অসংখ্য নাম জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে মিশেছে টপ্পার গায়কি, সুফির ভাব, কীর্তন আর বাউলের সুর।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়
 
Brahma Sangeet Singers

গীতিময়: কামিনী রায়, সরলা দেবী ও ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল। ব্রহ্মসঙ্গীতের ভান্ডারে আছে এঁদেরও লেখা বহু গান, অথচ তাঁরা আজ বিস্মৃতপ্রায়

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। ময়মনসিংহের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্ত পড়শি এক মোক্তারের বাসায় বসে কথা বলছেন। পুকুরপাড় দিয়ে এক যুবক হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখেই মোক্তারমশাই বলে উঠলেন, ‘‘ওই বেটা ব্রহ্মসভায় গান করে।’’ যুবক তথা ব্রহ্মসভা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব দিব্যি বোঝা গেল! কিন্তু কালীনারায়ণ যে মোক্ষের সন্ধানে ব্যাকুল। মোক্তারের ওই বাঁকা মন্তব্যই তাঁকে পথ দেখাল। তিনি ওই যুবককে জিজ্ঞাসা করে জানলেন, সরকারি ইংরেজি স্কুলের হেডমাস্টার ভগবানচন্দ্র বসু (জগদীশ চন্দ্র বসুর বাবা) মহাশয়ের বাড়িতে প্রতি বুধবার উপাসনা ও সঙ্গীত হয়। আর ঈশানচন্দ্র বিশ্বাস মাস্টারের বাড়িতে এই বিষয়ে বইপত্র পাওয়া যায়।
অতুলপ্রসাদ সেনের দাদামশাই কালীনারায়ণের জীবনের এই ঘটনাটির উল্লেখ আছে বঙ্কুবিহারী গুপ্তর লেখা তাঁর জীবনীতে। সে আমলে গানই যে ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছিল, বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। কালীনারায়ণ পরে শুধু ব্রাহ্ম সমাজে যোগই দেননি, নিজেও হয়ে উঠেছিলেন ব্রহ্মসঙ্গীতের অন্যতম গীতিকার। তাঁর সৃষ্টি ‘এ গো দরদি’ বা ‘একবার বল বল মন বুলবুল পাখি’র মতো গানেই গ্রামীণ লোকায়ত সংগীতের আঙ্গিক ব্রহ্মসঙ্গীতে প্রবেশ করে। তাঁর প্রেরণায় গান লিখতে এগিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী অন্নদাও।
আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান থেকে সমাজ সংস্কার, মহিলাদের গীতিচর্চা থেকে সাঙ্গীতিক নিরীক্ষার ইতিহাস— একাধারে এই চারটি বিন্দু যেন ছুঁয়ে আছে কালীনারায়ণের এই কাহিনি, যা আসলে সামগ্রিক ভাবে ব্রহ্মসঙ্গীতেরই কাহিনি। ব্রহ্মসঙ্গীতের ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে আধুনিক বাংলা গানের গতিপথটি অনেকাংশে নির্মিত ও নির্ধারিত হয়েছে। ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠার পরের বছর, অর্থাৎ ১৮১৬ সালে রামমোহন রায় ‘কে ভুলালো হায়’ বলে প্রথম যে গানটি লেখেন, তার নিরিখে বিচার করলে গত বছরেই  ব্রহ্মসঙ্গীতের দ্বিশতবার্ষিকী পেরিয়ে গিয়েছে।
রামমোহন নিজে প্রায় ৩২টি গান লিখেছিলেন। তাঁর সমসাময়িক গীতিকার হিসেবে নীলমণি ঘোষ, কালীনাথ রায়দের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তী কালে ব্রহ্মসঙ্গীতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ একা রবীন্দ্রনাথই লিখে গিয়েছেন। অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্তের বেশির ভাগ গানও ব্রহ্মসঙ্গীতের অংশ। এ ছাড়া ঠাকুরবাড়ি থেকে দেবেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ, সৌদামিনী, স্বর্ণকুমারী, সরলা দেবী, ইন্দিরা দেবী— সকলেই ব্রহ্মসঙ্গীত লিখেছেন।
তার বাইরেও শুধু যে অসংখ্য ব্রহ্মসঙ্গীত আছে তা-ই নয়, ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, কাশীচন্দ্র ঘোষাল, মনোমোহন চক্রবর্তী, পুণ্ডরীকাক্ষ মুখোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, নির্মলচন্দ্র বড়ালের মতো গীতিকারেরা উপযুক্ত প্রচারের অভাবে অনেকটা আড়ালে চলে গিয়েছেন। এঁরা প্রত্যেকেই বাংলা গানের ক্ষেত্রে এক এক জন জ্যোতিষ্কের সম্মান পাওয়ার দাবিদার। যেমন বিবেকানন্দের কণ্ঠে ‘মন চল নিজ নিকেতনে’ গানটির কথা বারবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু গীতিকার অযোধ্যানাথ পাকড়াশীর কথা আলাদা করে সে ভাবে মনে থাকেনি কারও। বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম পুরোধা এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতশিক্ষক হিসেবে যদু ভট্টের কথা যত উচ্চারিত হয়েছে, গীতিকার যদু ভট্টের কথা তত নয়।
আবার বহু উদাহরণ এমন রয়েছে, যেখানে তাঁদের অন্যান্য কীর্তির কথা সকলেই জানেন। কিন্তু তাঁরা যে ব্রহ্মসঙ্গীতেরও রচয়িতা, সেটা বিস্মৃতপ্রায়। শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, বিপিনচন্দ্র পাল, অশ্বিনীকুমার দত্তের নাম এ প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে। বিশেষ করে ‘প্রেমের মন্দিরে তাঁর আরতি বাজে’ বা ‘নমি সত্যসনাতন নিত্যধনে’-র মতো গান শুনলে এক অন্য সুকুমারকে আবিষ্কার করা যায়। একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ দেশে একসঙ্গে এত জন গীতিকারের আবির্ভাব আর ঘটেছে কি না সন্দেহ।
আবার ব্রাহ্ম আন্দোলনের সঙ্গে স্ত্রীশিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সম্বন্ধ কারও অজানা নয়। কিন্তু বঙ্গীয় রেনেসাঁসের যুগে মেয়েদের লেখালেখি নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, মেয়েদের গান নিয়ে ততটা আদৌ হয়নি। ইন্দুবালা ঘোষাল, সরোজিনী দত্ত, চঞ্চলা ঘোষ, সুমতিবালা দেবী, অন্নপূর্ণা চট্টোপাধ্যায়, হেমলতা দেবী, বিধুমুখী দেবী (উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর স্ত্রী), মাতঙ্গিনী চট্টোপাধ্যায়, সুদেবী মুখোপাধ্যায়— এই নামগুলো তাই চট করে চিনতে পারার কথা নয়। ব্রহ্মসঙ্গীতের ভান্ডারে কিন্তু এঁদের সকলের লেখা গান আছে। সেই সঙ্গে আছে নিরুপমা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী, কামিনী রায় এবং ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের লেখা বহু গান। এর বাইরে আর কারা গান লিখেছেন, বা ব্রহ্মসঙ্গীত সঙ্কলনের বাইরে এঁদের অন্য গানও ছিল কি না, জানা কঠিন। বর্তমান লেখক সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ প্রকাশিত সঙ্কলনটির একাদশ (১৯৩১) ও ষষ্ঠদশ (২০১৩) সংস্করণটি দেখার সুযোগ পেয়েছেন। মহিলা গীতিকারদের তালিকা এই দুই সংস্করণের ভিত্তিতেই দেওয়া।
‘জীবনের ঝরাপাতা’য় সরলা দেবী লিখেছেন, জোড়াসাঁকোর বাড়িতে মাঘোৎসবের দিন যে বিপুল লোকসমাগম হত, গানের টানই তার প্রধান কারণ এবং মেয়েদের গলায় গান শোনার আকর্ষণ তার একটা বড় দিক। সঙ্গীতায়োজনের দিক থেকেও ব্রহ্মসঙ্গীত আধুনিক বাংলা সঙ্গীতচর্চার অন্যতম দিশারি। সরলা লিখছেন, ‘‘১১ই মাঘের সঙ্গীত প্রোগ্রামে প্রতি গানের আরম্ভে সেই গানের রাগ বা রাগিণীর খানিকটা আলাপ মিলিত যন্ত্রে খানিকক্ষণ ধরে করে তারপর গানটি ধরতে লাগলুম... গানের পূর্বে ইংরেজি ধাঁচের এই রকম খানিকটা উপক্রমণিকার দস্তুর... সে সময় বাংলা গানে এটা সম্পূর্ণ নতুন ছিল।’’
বাংলা গানে এমন বহু নতুনত্বের সূত্রপাতই ব্রহ্মসঙ্গীতের হাত ধরে। যেমন ১৮৯১ সালেই ‘পরিচারিকা’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা জানাচ্ছে, জগদীশচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি ফোনোগ্রাফ যন্ত্র এনেছেন এবং তাতে কয়েকটি ব্রহ্মসঙ্গীত রেকর্ড করা হয়েছে।
ব্রহ্মসঙ্গীতের এই বিকাশ কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। ব্রহ্মোপাসনায় গানের উপরে রামমোহন প্রথম থেকেই জোর দিচ্ছিলেন। ‘প্রার্থনাপত্র’ (১৮২৩) বইয়ে যাজ্ঞবল্ক্য উদ্ধৃত করে তিনি লিখছেন, ‘‘ঋক, গাথা, পাণিকা ও দক্ষবিহিত গান ব্রহ্ম বিষয়ক। এই সব মোক্ষসাধক গান অভ্যাস করলে মোক্ষ প্রাপ্তি হয়।’’ ভক্তি আন্দোলনের নমুনা টেনে তিনি বলছেন, ‘‘দশনামা সন্যাসী, গুরু নানক, দাদুপন্থী, কবীরপন্থী, সন্তমতাবলম্বীরা— ভাষাগানাদি তাঁদের উপাসনার উপায় হইয়াছে।’’
ব্রহ্মসঙ্গীতের সেই গোড়ার পর্বটিতে একাধারে তাই গান লেখা হচ্ছিল, সেই সঙ্গে চলছিল উপনিষদের মন্ত্রে সুর সংযোজন। রামমোহনের সামনে এক দিকে তখন সামগানের ঐতিহ্য, ভক্তি আন্দোলনের উদাহরণ। অন্য দিকে গির্জায় খ্রিস্টীয় স্তোত্রগানের সঙ্গে পরিচয়। পাশ্চাত্য ঠাটের সঙ্গে বাংলার ভদ্রলোকি বাতাবরণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেরও একটা পুনরুজ্জীবন ঘটে যাচ্ছিল এর মধ্য দিয়ে। ব্রাহ্ম সভা গঠনের বছরেই ব্রহ্মসঙ্গীত সঙ্কলন প্রকাশিত হয়, তাতে শতাধিক গান ছিল। রামমোহন ছাড়া তার গীতিকার ছিলেন আরও সাত জন। ১৮৩৩-এ ক্যালকাটা খ্রিস্টান অবজারভার-এ লেখা হল, ‘‘দেশীয় সঙ্গীত হিসেবে ইউরোপীয়রা এত দিন যা শুনে এসেছেন, তার তুলনায় এর গায়কি এবং সঙ্গীত অতি উচ্চ মানের।’’
জনপ্রিয় আঙ্গিককে ব্রহ্মসঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত করার শুরুও রামমোহনের হাত ধরেই। কালী মির্জার শিষ্য এবং নিধুবাবুর গুণমুগ্ধ রামমোহন টপ্পার গায়কিকে সানন্দে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশের অনুরোধে নিধুবাবু ‘পরম ব্রহ্ম তৎপরাপর পরমেশ্বর’ বলে একটি গানও লেখেন। ১৮৪৩ সালে দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে তত্ত্ববোধিনী সভা আর ব্রাহ্মসভা মিলে গিয়ে বৃহত্তর ব্রাহ্ম সমাজ-এর জন্ম হল। সেই সঙ্গে রামমোহনের আদর্শ স্মরণ করে মহর্ষি ব্রহ্মসঙ্গীতের ভান্ডারে নিয়ে এলেন সুফি গান, হরিদাস, কবীরের দোঁহা, মীরার ভজন, গুরুবাণী। ব্রহ্মসঙ্গীত তাই শুধু নতুন গানের সম্ভারই নয়, সমমনস্ক গানের সংগ্রাহক আর সংকলকও।
উনিশ শতকের ষাটের দশক থেকে কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহে ব্রহ্মসঙ্গীতে আর এক বিপ্লবের সূচনা হল। কেশব শুরু করলেন নগর সঙ্কীর্তন। তার মানে খোল-করতাল সহযোগে বাংলায় কীর্তনের যে ধারা, ব্রহ্মসঙ্গীত এ বার তার সঙ্গেও নিজেকে মিলিয়ে নিল। আবার কেশবের ভক্তিমার্গে ব্রাহ্ম উপাসনায় ঈশ্বরকে মাতৃরূপে আরাধনার রীতিও শুরু হল। ফলে শাক্ত পদাবলির গানের ধারাটিও এসে মিলল উপাসনার গানে।
১৮৬৮ সালের মাঘোৎসবে কেশবপন্থীদের নগরকীর্তনের সাফল্যের কথা শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখায় পাচ্ছি। তিনি লিখছেন, ‘‘উপাসনান্তে আদি সমাজের সিঁড়ি দিয়া নামিয়া আসিতেছি, এমন সময় কয়েক জন বাবু... বলিতে বলিতে আসিতেছেন, ‘মহাশয়, দেখলেন না তো, কেশব শহর মাতিয়ে তুলেছেন।’ তাঁদের কাছেই ত্রৈলোক্যনাথ সান্যালের লেখা ব্রহ্মসঙ্কীর্তন পড়ে শিবনাথের মনে হল, ‘‘এই আহ্বান ধ্বনি আমার প্রাণে বাজিল, আমার যেন মনে হইল আমাকে ডাকিতেছে।’’
পরবর্তী কালে কেশবপন্থীদের সঙ্গে শিবনাথের বিচ্ছেদ হয় ঠিকই, কিন্তু সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ নগর সঙ্কীর্তনকে বাদ দেয়নি। তাঁদের মন্দির প্রতিষ্ঠাও নগর সঙ্কীর্তন করেই হয়েছে। এমনকী শান্তিনিকেতনের মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনেও (২১ ডিসেম্বর ১৮৯১) সকলে গান গাইতে গাইতে মন্দিরে গিয়েছিলেন। গানের দলের পুরোভাগে ছিলেন মহর্ষির স্নেহধন্য শিবনাথ। তত্ত্ববোধিনী-তে সেই বিবরণ বলছে, ‘‘পরদিন প্রত্যূষেই প্রান্তরের নির্জনতা ভঙ্গ করিয়া সঙ্কীর্তন আরম্ভ হইল। ক্রমে মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট সময় আসিয়া পড়িল... বেহালা হইতে আগত কয়েক জন ব্রাহ্মবন্ধু মৃদঙ্গযোগে ‘প্রাণভরে আজ গান কর, ভবে ত্রাণ পাবে আর নাহি ভয়’ গাহিতে গাহিতে অগ্রে চলিলেন।’’
অর্থাৎ রামমোহনের সঙ্গীত-আদর্শ যে ভাবে দেবেন্দ্রনাথের মধ্যে বিস্তার পেয়েছিল, একই ভাবে কেশবের হাত দিয়ে ব্রহ্মসঙ্গীতের যে নতুন ধারা, তা আদি এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মধ্য দিয়েও অনুসৃত হচ্ছে। কীর্তনাঙ্গের গান, বাউলাঙ্গের গান, মাতৃ-আরাধনার গান, আদি ঘরানার ব্রহ্ম-উপাসনা গান— সব ক’টি স্রোতই নিজের মতো করে বহতা থেকে যাচ্ছে। ‘সদা দয়াল দয়াল বলে ডাক’ (ভোলানাথ অধিকারী), ‘হরি হে এই কি তুমি সেই আমার হৃদয়-বিহারী’ (সীতানাথ দত্ত), ‘আমি হব মা তোমার কোলের ছেলে’ (কৈলাসচন্দ্র সেন), ‘বন্দি দেব দয়াময় তব চরণে’ (সুমতিবালা দেবী)— প্রার্থনাসঙ্গীতের এতগুলো ধাঁচ একাত্ম হচ্ছে ব্রহ্মসঙ্গীতের মধ্যে। ব্রাহ্ম পরিবারগুলির মধ্যে সঙ্গীতচর্চা দৈনন্দিনতার অঙ্গ হয়ে উঠছে। পরবর্তী কালেও সাহিত্যে বা সিনেমায় ব্রাহ্ম চরিত্র এলেই এসেছে গান। ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ছবিতে জবা (অনুভা গুপ্ত) পরদায় আসে একটি ‘ফিল্মি’ ব্রহ্মসঙ্গীত গেয়েই। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় সেই  ‘আমি তোমার বীণা’ গানটি লিখেছিলেন কিন্তু ছবির গীতিকার প্রণব রায়ই।
ব্রহ্মসঙ্গীতের অবশ্য এ নিয়ে ছুতমার্গ থাকার কথা নয়। বরং মত ও পথ নির্বিশেষে ব্রহ্মোপাসনার মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতি দেখলে সে গান বরাবর ব্রহ্মসঙ্গীতের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। তা সে মীরার ভজন বা কবীরের দোঁহা-ই হোক, তুলসীদাস-রবিদাস-তুকারামের গানই হোক কিংবা নিধুবাবু-দাশরথি রায়-স্বামী বিবেকানন্দ বা কাঙাল হরিনাথের। এমনকী ‘প্রভু জয় জগদীশ হরে’র মতো অতি পরিচিত ভজনও ব্রহ্মসঙ্গীত সঙ্কলনের অন্তর্গত এবং গীত। কবি গিরধর রায়ের লেখা এমন আরও বেশ কিছু গান, যেমন ‘অন্তরযামী মেরা স্বামী’, ‘অব মেরি বেড়ী পার লঙ্ঘা’ সংকলনে রয়েছে। রয়েছে রজ্জব (অঘ মিটৌ অঘ মোচন স্বামী), বজ্রঙ্গবিহারী লাল (আয় দিলরুবায়া দিল কা দিল), জ্ঞানদাস বঘৈলি-র (ফজরমে জব আয়া য়লচী) মতো কবিদের গান।
এটা যে সচেতন ভাবেই করা হয়েছে, তা পরিষ্কার লেখা আছে ব্রহ্মসংগীত সঙ্কলনের একাদশ সংস্করণের (১৯৩১) ভূমিকায়— ‘‘গানের আদির সূচীতে রচয়িতাদিগের নাম দেখিলে বুঝিতে পারা যাইবে, কত বিভিন্ন যুগের কত বিভিন্ন শ্রেণীর ভগবৎ পিপাসু নরনারীর রচনার দ্বারা এই সঙ্গীত পুস্তক পরিপুষ্ট।’’
ব্রহ্মসঙ্গীত তার মানে শুধু বাংলা গান নয়, বাংলার গানও নয়। নানা ভাষায় ব্রহ্মসঙ্গীত লেখা হয়েছে (অসমিয়া, গারো, গুজরাতি, মরাঠি, তেলুগু, ওডিয়া), নানা ভাষা থেকে ব্রহ্মসঙ্গীত আহরিত হয়েছে। ব্রহ্মসঙ্গীতে আলাদা একটি পরিচ্ছেদ আছে শুধু উর্দু গানের জন্য। বিলেতে গিয়ে স্যালভেশন আর্মি-র কাজকর্ম দেখে শিবনাথ শাস্ত্রীর সবটা মোটেই ভাল লাগেনি। লিখেছেন, ‘‘কেবলই যীশু যীশু দেখিতেছি, ঈশ্বরের নাম কোথাওই নাই।’’ কিন্তু ‘মুক্তি ফৌজ’-এর গানের অনুবাদ ‘প্রভু তু মেরা প্যার হ্যায়’ ব্রহ্মসঙ্গীতের তালিকায় আসা তাতে আটকায়নি। আবার একটা সময়ের পরে, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের ব্রহ্মসঙ্গীত সঙ্কলনে দেশাত্মবোধক প্রার্থনাসঙ্গীতের আলাদা পরিচ্ছেদ যুক্ত হয়। ‘জনগণমনঅধিনায়ক’ বা ‘হও ধরমেতে ধীর’-এর মতো গান গোড়া থেকেই সেই তালিকায় ছিল।
ঠিক কত গান লেখা হয়েছিল ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে? নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ১৮৫১ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ব্রহ্মসঙ্গীতের বইয়ের বিজ্ঞাপন বেরোচ্ছে প্রথম। বারো খণ্ডে সে বই ক্রমে বেরিয়েছিল আদি ব্রাহ্ম সমাজ থেকে।
তার পরেও অজস্র গান লেখা হয়েছে। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের একাদশতম সংকলনে দু’হাজারের বেশি গান ছিল। ষোড়শ সংস্করণে তা কমে দাঁড়িয়েছে বারোশোর কিছু বেশি। ব্রাহ্ম সম্মিলন সমাজের পক্ষ থেকে ব্রহ্মসঙ্গীতের দুশো বছর উদ্‌যাপনের সূত্রে বেশ কিছু দুর্লভ গান শোনার সুযোগ মিলেছিল। এই বছরই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিশতবার্ষিকী পূর্ণ হওয়ার সময়।  বাংলা গানের ইতিহাসে ব্রহ্মসঙ্গীতের ভূমিকা ফিরে দেখার জন্য উপযুক্ত সময়ও হতে পারে এটাই।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/history-behind-brahma-sangeet-1.786931?ref=archive-new-stry

ভারতে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ তাঁর হাতে

ভারতে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ তাঁর হাতে

কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ মৃতদেহ ছুঁতে দিত না। জড়তা ভেঙে চিকিৎসাজগতে ইতিহাস গড়লেন মধুসূদন গুপ্ত।

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
 
madhusudan gupta
মে  ১৮৩০। গ্রীষ্মের দুপুর যেন আরও তপ্ত হয়ে উঠল গোলদিঘি চত্বরে। সংস্কৃত কলেজে আন্দোলন শুরু করেছেন আয়ুর্বেদের ছাত্ররা। এক সহপাঠীকে শিক্ষক নিযুক্ত করার প্রতিবাদে আন্দোলন। সে কালের ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ এই আন্দোলনের কথা জানাচ্ছে, ‘শ্রীযুত খুদিরাম বিশারদ কর্ম্মে রহিদ হইলে তৎপদে তাঁহার এক ছাত্র শ্রীযুত মধুসূদন গুপ্ত নিযুক্ত হওয়াতে অন্য ছাত্রেরা সমাধ্যায়ির নিকট পাঠ স্বীকার না করাতে কালেজাধ্যক্ষ মহাশয়েরা তাঁহারদিগের প্রার্থনা পূর্ণ না করাতে সকলে কালেজ ত্যাগ করিয়াছেন...।’
আয়ুর্বেদ বিশারদ খুদিরামবাবু ৩০ এপ্রিল শিক্ষকতার কাজে অব্যাহতি নেন এবং মেধাবী ছাত্র মধুসূদন গুপ্তকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করার সুপারিশ করেন। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে অটল থাকায় আন্দোলন নতজানু হল। আর যাঁকে শিক্ষকের আসন এগিয়ে দিয়েছিলেন খুদিরাম, সেই মধুসূদন গুপ্ত বছর তিনেকের মধ্যেই হয়ে উঠলেন শারীরসংস্থানবিদ্যা বা অ্যানাটমির খ্যাতিমান শিক্ষক। যে সহপাঠীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন, তাঁরাই হলেন তাঁর বন্ধু-ছাত্র।
১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে হুগলির বৈদ্যবাটীর কবিরাজ বংশে জন্ম মধুসূদনের। ছেলেবেলায় বড্ড অবাধ্য, একগুঁয়ে ছিলেন, কৈশোরে পালিয়ে যান বাড়ি ছেড়ে। খোঁজ মেলে ১৮২৪-এ, সংস্কৃত কলেজের ছাত্র তখন। বৌবাজার এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে ‘কলিকাতা সংস্কৃত কলেজ’-এর পঠনপাঠন। ১৮২৬-এ সংস্কৃত কলেজ বর্তমান ভবনে স্থায়ী ঠিকানা পেল। ১৮২৭-এ চালু হল বৈদ্যক (আয়ুর্বেদ) বিভাগ— ‘মেডিক্যাল ক্লাস ইন দ্য সংস্কৃত কলেজ’— সাত জন ছাত্র নিয়ে, মধুসূদন যার অন্যতম। তাঁদের শিক্ষক ছিলেন খুদিরাম বিশারদ।
১৮৩৫-এর জানুয়ারি মাসে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত হলে সংস্কৃত কলেজের বৈদ্যক শ্রেণির বিলুপ্তি ঘটল। কিন্তু মধুসূদন থেকে গেলেন স্বমহিমায়। সাহেব চিকিৎসকরা অ্যানাটমিতে তাঁর গভীর মেধার স্বীকৃতি স্বরূপ ডা. ব্রামলি, ডা. গুডিভ-এর মতো সাহেবের সঙ্গে তাঁকে সহ-শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করলেন। অ্যালোপ্যাথির চিকিৎসক হিসেবে প্রথাগত ডিগ্রি তখন তাঁর ছিল না। শিক্ষকতা করতে করতেই ১৮৪০-এ পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এই ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
১৮৩৫-এর ১৭ মার্চ মধুসূদন শারীরবিদ্যা ও শল্যবিদ্যা বিভাগের ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে যোগ দিলেন মেডিক্যাল কলেজে। এ দেশের চিকিৎসকদের সামনে তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা শব ব্যবচ্ছেদ। মানুষের চিকিৎসা করতে হয় তাঁদের, অথচ মানুষের শব ব্যবচ্ছেদ করতে পারেন না তাঁরা। পশুর দেহ ব্যবচ্ছেদ করে কোনও রকমে চিনতে হয় শরীরের অভ্যন্তর। কুসংস্কার-আচ্ছন্ন সমাজ ছুঁতে দেয় না মৃত মানবদেহ। ডাক্তারি-ছাত্ররাও মেনে নেন এ সব। মধুসূদন এর বিরোধিতা করলেন। শিক্ষাদানে অসুবিধাও হচ্ছিল সাহেব শিক্ষকদের। এক দিন ডা. গুডিভ পড়ানোর টেবিলে একটি শবদেহ রেখে দীর্ঘ ক্ষণ ছাত্রদের বোঝালেন শব ব্যবচ্ছেদের গুরুত্ব। তবু জড়তা কাটে না ছাত্রদের। এগিয়ে এলেন মধুসূদন। ১৮৩৬-এর ১০ জানুয়ারি ছুরি হাতে মধুসূদন ব্যবচ্ছেদ করলেন শবদেহ। এ দেশে প্রথম। তৈরি হল ইতিহাস। কিন্তু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা খেপে উঠল। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন, ‘সেকালের লোকের মুখে শুনিয়াছি এই মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ লইয়া সে সময়ে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল।’ জাতধর্ম না জেনে মৃতদেহ ছোঁয়া এবং কাটাকুটির জন্য জাতিচ্যুত করা হল মধুসূদনকে। কিন্তু দমানো গেল না। নব্যবঙ্গের নেতৃবৃন্দ পাশে দাঁড়ালেন। ওই বছর ২৮ অক্টোবর মধুসূদনের অনুপ্রেরণায় চার জন ছাত্র— রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারিকানাথ গুপ্ত, উমাচরণ শেঠ এবং নবীনচন্দ্র মিত্র এগিয়ে এলেন শব ব্যবচ্ছেদে। ক্রমে পিছু হঠল সমাজপতিরা। তথ্য বলছে, ১৮৩৭ সালে ৬০টি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ হয় এখানে।
শুধু কি শব ব্যবচ্ছেদ? মধুসূদন ১৮৪৯-এ ‘লন্ডন ফার্মাকোপিয়া’ এবং ‘অ্যানাটমিস্ট’স ভাদি মেকাম’-এর বাংলা অনুবাদ করেন। ১৮৫২-তে মেডিক্যাল কলেজে বাংলা শ্রেণি খোলা হলে তার সুপারিনটেন্ডেন্ট হন তিনি। ১৮৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘অ্যানাটমি’ নামে তাঁর অমূল্য গ্রন্থ। ‘সুশ্রুত’-ও সম্পাদনা করেন বলে জানা যায়। ১৮৫৬-র ১৫ নভেম্বর মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সেই প্রয়াত হন মধুসূদন গুপ্ত

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/madhusudan-gupta-first-indian-trained-in-western-medicine-to-dissect-a-human-corpse-1.811168?ref=archive-new-stry