Saturday, 28 July 2018

‘উত্তমের ফুলশয্যায় ট্রাঙ্কের পিছনে লুকিয়েছিলাম’ (On Uttam Kumar)

‘উত্তমের ফুলশয্যায় ট্রাঙ্কের পিছনে লুকিয়েছিলাম’

বসুমতী চট্টোপাধ্যায় মন খুললেন দেওর, বন্ধু উত্তমকুমারকে নিয়ে। সুচিত্রা থেকে সুপ্রিয়া, ফুলশয্যার রাতে আড়ি পাতা— সব গল্প বেরিয়ে এল স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে স্মৃতিচারণে।

uttam

বৌদিদের সঙ্গে দেওর উত্তম। বাঁ দিকে রয়েছেন বসুমতী চট্টোপাধ্যায়।

আমি ওকে উত্তম বলেই জানি। ওর ভাদ্রে জন্ম। আমার আষাঢ়ে। আগে ছিলাম ওর মাসির মেয়ে আর পরে হলাম ওর জ্যাঠতুতো ভাইয়ের বউ। মানে ওর বৌদি। কথায় কথায় টক্কর ঠাট্টা! ও আমায় আহিরিটোলার লোক বলে আওয়াজ দিলেই আমি ওকে ভবানীপুর বলে খেপাতাম! আমি হয়তো বাড়ির কাজে ব্যস্ত, ও এসেই বলে উঠল, ‘নাম রেখেছি বনলতা...’, আমি তৎক্ষণাৎ বলতাম, ‘যে নামেই ডাক তুমি...’।
আমার বিয়ের দু'বছর পর, ১৯৪৮-এ উত্তমের বিয়ে। আমার দশ মাসের বাচ্চা, তাকে এক পিসিশাশুড়ির কাছে রেখে, আর এক ননদকে নিয়ে আমি উত্তমের ফুলশয্যায় আড়ি পাততে গেলাম। উফ! সে কী উৎসাহ আমার। পিসিশাশুড়িকে বলে এসেছিলাম, বাচ্চা কাঁদলেও না ডাকতে। ঘরে চুপটি করে ট্রাঙ্কের পেছনে লুকিয়ে রইলাম। আরে, উত্তমের ফুলশয্যা বলে কথা! দশ বছর বয়স থেকে আমরা একে অপরকে চিনি।
কিন্তু উৎসাহে জল ঢালল ওই বাড়ির এক জন! ট্রাঙ্কের সামনে ধড়াম করে জলের গ্লাস রেখে উত্তমকে ইশারা করতেই ও বুঝে গেল ট্রাঙ্কের পেছনে গন্ডগোল আছে! আমাদের দেখে বলল, ‘‘ওহ, তোমরা পারো! আমার ফুলশয্যা দেখবে তো? বেশ আজ আমি জানলা-দরজা সব খুলে রাখছি। ট্রাঙ্কের পেছনে যাওয়ার কী দরকার? বারান্দা থেকে দেখো সব্বাই!’’ এই ছিল উত্তম।
তবে এত উত্তম, উত্তম করছি, একটা কথা বলি। এই উত্তম নামটা অনেকেই ভাবেন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের পর দেওয়া। তা কিন্তু নয়।
উত্তমের মায়ের নাম ছিল চপলা। উত্তম যখন জন্মেছিল ওর দাদামশাই তখন ওর মাকে বলেছিলেন, ‘বাহ্ চপি, এ তো উত্তম খবর!’ সেই থেকে ওর নাম হয় উত্তম। আর ভাল নাম অরুণ।
আমাদের সকলের জীবনে, পরিবারে ও আলো হয়েই এসেছিল। এই শ্রাবণ মাস এলেই বুকটা বড্ড চিন চিন করে। অমন দিলদরিয়া মানুষ! কিন্তু...
(কিন্তুতে সব চুপ। বাইরে তখন বুক ভাঙা শ্রাবণ। আর নিজের মধ্যে উত্তম নিয়ে ক্লান্ত তিনি!)
একটু সামলে নিয়ে আবার শুরু হল স্মৃতির সঙ্গে বাক বিনিময়...
আমি গুছিয়ে সংসার করতাম। আমার শ্বশুরবাড়িতে লোকজন আসা লেগেই থাকত। কলাপাতার এঁটো নিজে হাতে কুড়োচ্ছি দেখে উত্তমও দেখি হাত লাগাত। কত রকমের কাজ যে ও করতে পারত। আদপে ছিল শিল্পী। বাড়িতে রাশ হবে। উত্তম শোলার পুতুল সাজাতো। মাটির কুঁজোয় চালগুঁড়ো দিয়ে আলপনা দিত। যে কোনও পারিবারিক উৎসবে ও যে কী আনন্দের সঙ্গে যোগদান করত...
দোলের দিন উত্তম বেরিয়ে পড়ত লরি নিয়ে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিজে গলা ছেড়ে গান গাইত। শুটিংয়ের ফাঁকে ছুটি পেয়েছে তো সব্বাইকে গাড়িতে তুলে পিকনিকে যাওয়া হত। উত্তম খুশি নিয়ে নিতে পারতো মনভোলানো হাসি দিয়ে। লোকজন, আড্ডা, খাওয়া, গান গিরীশ মুখার্জি রোডের ওই বাড়িটা একটা মানুষের জন্য গমগম করত।

বসুমতী চট্টোপাধ্যায় এখন যেমন।
এক দিন বাড়িতে রান্না করছি হয়তো। উত্তম এসে বলল, ‘‘বউদি, আমার গেস্ট এসেছে। একটু কথা বলবে এসো।’’ এটা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। আমরা তো পাশাপাশি থাকতাম। ও বাড়িতে কেউ এলেই ও আমায় ডাক দিত। আমি খুব কথা বলতে পারতাম যে। আর গৌরী একটু চুপচাপ ধরনের ছিল। তো যাই হোক, গিয়ে দেখি ওমা, সুচিত্রা সেন আর ওর মেয়ে মুনমুন! একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম সে দিন। আশা করি এখানে বললে কেউ আমায় তেড়ে আসবে না। অমন রূপবতী, ব্যক্তিত্বময়ী সুচিত্রা। সে দিন দেখলাম চমৎকার শাড়ির একটু ছেঁড়া। পিনের খোঁচার মতো। হয়তো খেয়াল করেনি। তবে সুচিত্রা ওই বাড়িতে খুব যে আসতে পারত এমন নয়। গৌতমের পাঁচ বছরের জন্মদিনে আর উত্তমের বাবার মৃত্যুদিনে এসেছিল। সে দিন অনেক ক্ষণ ছিল। তখন তো ওদের ‘সপ্তপদী’-র শুট চলছে। আর যে বার এসেছিল সে বার তো উত্তম নিজেই নেই! উফ! কী দিন...সেই চব্বিশে জুলাই।
পরিবার নিয়ে থাকতে ভালবাসত উত্তম। পরিবারে জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো কোনও ভাই অসুস্থ কানে এলেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা, খরচ, সব কিছুর দায়িত্ব ও নিত। কাউকে মুখ ফুটে চাইতেও হয়নি। আমাদের পরিবারে বিয়ের কথা শুনলেই ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। অন্য দিকে, পরিবারের কোনও মানুষের থেকে এতটুকু সাহায্য পেলে আজীবন সকলের সামনে সেটা স্বীকার করে গেছে। প্রথম দিকের কথা, উত্তমের কোনও একটা ছবিতে ঘোড়া চড়তে হবে। উত্তম ঘোড়া চড়তে জানে না। তখন ওর হাতে টাকা ছিল না। আমার দেওর ওকে একশো টাকা দেয়। সেই ঘটনা ‘নায়ক’-এর জন্য ভেনিস থেকে অ্যাওয়ার্ড নিয়ে ফিরেও সকলকে বলেছিল। এইটুকু তো ঘটনা! ক’জন বলে? শুধু কি তাই? উত্তমকুমার মহানায়ক হওয়ার পরেও সকলকে বলত, ‘‘আমি সকলের সাহায্য পেয়েছি বলে এ ভাবে অভিনয় করেছি। আমার পরিবারেই এমন কেউ আছে যে আমার মতো সাহায্য পেলে উত্তমকুমার হতে পারত।’’ আজকের যুগে ক’জন অভিনেতা এমন বলতে পারবেন?
অথচ নিজে যখন ‘ছোটিসি মুলাকাত’ করে আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হল? জানি, সেই সময়টা খুব খারাপ গেছে ওর জীবনে। বলতে দ্বিধা নেই, তখন সুপ্রিয়া ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল। পরে যা-ই হয়ে থাক, সুপ্রিয়া ওকে ভালবাসত। ঝগড়াও হয়েছে ওদের।
সিনেমা জগতের মহানায়ক, কিন্তু তাই বলে আমরা পরিবারের কেউ যখন-তখন ওর শুটিং দেখতে চলে যাব, এমনটাও ছিল না। বাড়িতে ফিল্ম নিয়ে আলোচনা বা হামবড়াই, এ সব ওর স্বভাবেই ছিল না। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে বসুশ্রীতে প্রিমিয়ারে যাওয়ার নেমন্তন্ন পেতাম। কিন্তু...
(বৃষ্টি কিছু ক্ষণ থেমে গিয়েছিল। আবার অঝোর শ্রাবণ...)
কী বলতে চাইছেন তিনি?
ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তাঁর।
মানুষটা এত করেছে পরিবারের সকলের জন্য। মানুষটাকে নিজের ঘরে কেউ রাখতে পারল না? ফিরিয়ে আনতে পারল না? জানেন এমন মানুষ কেন?
লোকে ওকে পুজো করেছে। ভালবেসেছে। কত মানুষের মনের মানুষ ও আজও! কিন্তু ওর মনের মানুষ ও পায়নি। আজীবন খুঁজেছে। বাড়ি ছেড়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। কেউ আটকালো না! কেউ ওকে আনতে গেলে আমি জানি ও নিশ্চয় ফিরে আসত।
কই হল সে সব?
বড় হয়ে ওঠার প্রত্যেকটা ব্যর্থ দুপুর আর নিষ্ফল রাতে যে ছিল আমার বন্ধু, বছরের পর বছর আমার সঙ্গে নিজের স্বামী, কন্যার খুশির মুহূর্তরা এঁটো হাতের গল্পে, হাতে হাত মিলিয়ে নেমন্তন্ন বাড়িতে পরিবেশনের গল্প ভাগ করে নিয়েছি। ওর চলে যাওয়ার জন্য কেঁদেছি, সেই কান্নাকে কখন যেন বিদায় দিয়েছি। হয়তো মন শুকনো রাখার তাগিদেই। 
কিন্ত মন কি মানে?
বয়স ফুরনো এই নারীর মধ্যে সন্ধের উত্তম শ্রাবণ হয়ে ঝরে যায়।

https://www.anandabazar.com/entertainment/basumati-chatterjee-remembers-uttam-kumar-on-his-death-anniversary-dgtl-1.837329

জাগাও কবিকে, ও সে ঘুমে অচেতন (On Rajanikanta Sen)

জাগাও কবিকে, ও সে ঘুমে অচেতন

হাসপাতালে মারাত্মক রোগযন্ত্রণায় কেটেছে জীবনের শেষ কয়েকটি মাস। কথা বলা, গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরতরে। তবু তাঁর গানে, কবিতায় অশেষ সমর্পণ আর শরণাগতি। ২৬ জুলাই ছিল রজনীকান্ত সেনের জন্মদিন। লিখছেন শিশির রায়।

 
Rajanikanta Sen

রজনীকান্ত সেন

‘‘কী লিখবেন রজনীকান্ত সেন সম্পর্কে?’’
আপনিই বলে দিন, কী লিখব আপনার দাদুকে নিয়ে। কী লেখা উচিত, বলুন।
‘‘রজনী সেনের মতো এক জন মানুষ কী খেতেন, কী পরতেন, এই সব লেখার জিনিস নয়। লিখলে ওঁর গান নিয়ে লিখতে হয়। ওঁর ভাব নিয়ে, ওঁর গানের কথায় সমর্পণ, ভক্তি নিয়ে লিখতে হয়। ওঁর সুরে বৈচিত্র নেই, রামপ্রসাদ থেকে কাঙাল হরিনাথ, প্রচলিত সবার সুর নিয়েছেন। নিয়ে মিশিয়েছেন নিজের সারল্য, শরণাগতি। এগুলো ধরতে পারলেই রজনী সেনকে ধরা যাবে।’’
জুলাইয়ের সন্ধে নেমে এসেছে তখন। ডোভার লেনের এই শান্ত, চুপচাপ, একতলা বাড়িটা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কাজফেরতা সান্ধ্য বিনোদন, পানভোজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর একটা কলকাতা। আর এই ঘরে, চেয়ারে বসে আছেন যে মানুষটা, তাঁর বয়স একশো এক পেরিয়ে দুই। রজনীকান্ত সেনের সার্ধশতবর্ষ পেরিয়েছে গত বছর, আর আমার চোখের সামনে এক জীবন্ত শতবর্ষ! তাঁর বসার ভঙ্গি ঋজু, কণ্ঠস্বর অকম্প্র, আর স্মৃতিশক্তি? নিখুঁত, নির্ভুল, অবিরল কান্তকবিতা বলে চলেছেন, ‘‘ওরে, ওয়াশীল কিছু দেখিনে জীবনে, সুধু ভূরি ভূরি বাকি রে;/ সত্য সাধুতা সরলতা নাই, যা আছে কেবলি ফাঁকি রে।/... কত যে মিথ্যা, কত অসঙ্গত স্বার্থের তরে ব’লেছি নিয়ত;/ (আজ) পরম পিতার দেখিয়া বিচার, অবাক্‌ হইয়া থাকি রে!’’ আজকের প্রজন্ম ‘ওয়াশীল’ শব্দের অর্থ জানে?
‘‘জানবে কী করে? একটা বড় মানুষকে, প্রতিভাকে সংরক্ষণ করে প্রথমত তার পরিবার। তাঁদের মধ্য দিয়েই তো ভবিষ্যৎ দেশ-কাল জানবে তাঁকে। উই আর ভেরি ব্যাড প্রিজ়ার্ভার্স। আমার মামারা, এমনকি দিদিমাও তেমন বলতেন না পরে, দাদুর কথা। দিদিমা বলতেন, মেডিক্যাল কলেজে যে রাতে উনি চলে গেলেন, ওই শোকের মধ্যে শুধু এটাই মনে হয়েছে, কাল সকালে আমার এতগুলো ছেলেমেয়েকে আমি কী খাওয়াব?’’
রজনীকান্তের স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী, প্রৌঢ় বয়সে
শুনে মনে হচ্ছে তো, বাঙালি প্রতিভা আর মনীষার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে যে, সেই আদি ও অকৃত্রিম দারিদ্রের আর একটা উদাহরণের গল্প শুনতে বসেছি? আদৌ তা নয়। রজনীকান্তের গলায় ক্যানসার হয়েছিল, ১৯১০ সালের কলকাতায় ক্যানসারের চিকিৎসা কোথায়? তাঁর ডায়েরিতে পাওয়া যায়: ‘‘...গলায় একটা ছিদ্র করে দিয়েছে। সেইখান দিয়ে নিশ্বাস চলছে। গলার ক্যান্সার যেমন, তেমনি গলার মধ্যে বসে রয়েছে। তার তো কোনও চিকিৎসাই হচ্ছে না।...’’ তবু কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ১২ নম্বর কটেজ ওয়ার্ডে রজনীকান্ত সেন যে মাস সাতেকের চিকিৎসা পেয়েছিলেন, তা কিন্তু রীতিমতো খরচসাপেক্ষ ছিল। দোতলা কটেজে অনেক ঘরে পরিবারের সবাই এমনকি দর্শনার্থীরাও থাকতে পারতেন ভাল ভাবে, সর্বক্ষণ ডাক্তার, নার্স, প্রয়োজনীয় ও জরুরি পরিষেবা সবই পাওয়া যেত— কিন্তু এই সব কিছুতেই তো প্রয়োজন অর্থের। রজনীকান্ত অতুলপ্রসাদের মতো পসারওয়ালা উকিল ছিলেন না ঠিকই, তবে রাজশাহীতে তাঁর অর্থাভাব ছিল না। কিন্তু তিনি সঞ্চয় করেননি, ও জিনিসটা তাঁর ধাতে ছিল না। চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে তাঁর ঋণ হয়েছিল, তিনি বন্ধু-পরিজনদের ‘দান’ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থসাহায্য করেছিলেন দীঘাপতিয়ার কুমার শরৎকুমার রায়, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বিচারপতি সারদাচরণ মিত্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অশ্বিনীকুমার দত্ত-সহ বহু শুভার্থী গুণিজন। এর পাশাপাশিই পড়া যেতে পারে রজনীকান্তের মেয়ে শান্তিবালার (শান্তিলতা রায়) লেখা: ‘‘বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পরে আমার মা মহারাজার কাছ থেকে মাসিক সাহায্য ও বাবার ঋণ শোধের জন্য পাওনা সমস্ত টাকাই মহারাজের অনুরোধে মহারাজার কাছেই শোধ করে দিয়েছিলেন। দেশবাসী সকলের ধারণা হয়েছিল যে বাবা কপর্দকহীন দরিদ্র ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভিতরকার কথা কিছু জানতেন না। সেই জন্য এই কথা কয়টি আমায় বলতে হল।...’’
মেয়ে শান্তিবালা দেবী (শান্তিলতা রায়)
এই শান্তিবালার কথা উঠতেই সামনে বসা মানুষটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘‘আমার মা-ই তো গলায় তুলে নিয়েছিলেন দাদুর অনেক গান!’’ রজনীকান্তের এক ছেলে (ভূপেন্দ্র) ও এক মেয়ে (শতদলবাসিনী) অসুখে ভুগে মারা যাওয়ার পরে বাকি ছেলেমেয়েদের চোখের আড়াল করতে চাইতেন না গায়ক-কবি। তাঁদের মধ্যেও ছেলে ক্ষিতীন্দ্র ও মেয়ে শান্তিবালার কথা বলতে হয় আলাদা করে। এঁরাই তাঁদের বাবার অধিকাংশ গান শিখে নিয়ে গাইতেন— উৎসব-অনুষ্ঠানে বা বাড়িতে। একটু বলুন না, মায়ের কাছে শোনা কোনও বিখ্যাত গান তোলার ঘটনা, বা অন্য কোনও গানের গল্প?—  সাংবাদিকসুলভ কৌতূহলকে মুহূর্তে দমিয়ে দেন গম্ভীর বরিষ্ঠ মানুষটি: ‘‘ঘটনা আবার কী? বাবার কাছে মেয়ে গান শিখছে, যেমন শেখে— চলতে-ফিরতে। হয়তো নতুন গান লিখেছেন একটা, মেয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ডেকে তুলিয়ে দিলেন। এ ভাবেই মায়ের শেখা। পরে ওঁর কাছ থেকে আমার।’’
রজনীকান্তের গানের গল্প লিখে গিয়েছেন অন্যেরা। যেমন জলধর সেন। রাজশাহী লাইব্রেরিতে সাহিত্যসভা, সেখানে যাওয়ার পথে বন্ধু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র বাড়িতে এসেছেন রজনীকান্ত। বন্ধুই বললেন, খালি হাতে কেন সভায় যাবে, একটা গান বেঁধে নাও। জলধর সেন শুনে অবাক, সভা শুরু হতে বাকি এক ঘণ্টা, এখন গান বাঁধা হবে? তার পরে সুর দেওয়া, তারও পরে গাওয়া? রজনীকান্ত কিন্তু এক কোণে টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। খানিক ক্ষণ চুপচাপ, তার পর একটা কাগজ টেনে খসখস লেখা। সেই গানই ছিল ‘তব চরণ-নিম্নে, উৎসবময়ী শ্যাম-ধরণী সরসা’। আর ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’, যে গানের মধ্য দিয়ে রজনীকান্ত হয়ে উঠেছিলেন সারা বাংলার ‘কান্তকবি’, তার জন্মকাহিনিও তো চমৎকার। বঙ্গভঙ্গের সময়ে স্বদেশি আন্দোলনে উত্তাল কলকাতায় অক্ষয়কুমার সরকারের মেসে এসেছেন রজনীকান্ত। মেসের ছেলেরা ধরে বসল, একটা গান লিখে দিতে হবে। স্থায়ী আর অন্তরাটুকু লিখে রচয়িতা নিজেই যারপরনাই উত্তেজিত, ‘‘চল জল’দার ওখানে যাই।’’ কী না, ওখানে ‘আদ্ধেক’ গান কম্পোজ় হতে হতে বাকিটা লেখা হয়ে যাবে। জল’দা মানে জলধর সেন, ‘ওখানে’ মানে ‘বসুমতী’র দফতরে। সত্যিই তাই হল! এক দিকে কম্পোজ় চলছে, অন্য দিকে বাকি গান লেখা হচ্ছে। তার পর গানের সুর হল, কাগজে ছাপা গান নিয়ে চলে গেল মেসের ছেলেরা। সন্ধেয় জলধর সেন বিডন স্ট্রিটের এক বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ শুনলেন, দূর থেকে এক দল ছেলে গান গাইতে গাইতে আসছে। কয়েক ঘণ্টা আগে বসুমতীর প্রেসে ছাপা গান— ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’। আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর লেখাতেও আছে, বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার কয়েক দিন পর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে তরুণ-যুবার দল খালি পায়ে হাঁটছে আর ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ গাইছে। শুনে রোমাঞ্চ হয়েছিল তাঁর।
রাজশাহীর বাড়ি। ২০১৪ সালের ছবি
বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের ভাঙাবাড়ি গ্রামের ছেলে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন আর এক শহর রাজশাহীতে। জ্যাঠামশাই ও বাবার পথে গিয়ে নিজেও আইন পড়ে ওকালতি পেশায় এসেছেন। কিন্তু মন ছিল সাহিত্যেই। বৈষ্ণব ভক্তিতে বিবশ তাঁর মুন্সেফ বাবা ব্রজবুলিতে রচনা করেছিলেন ‘পদচিন্তামণিমালা’। ও দিকে জ্যাঠামশাই পরম শাক্ত, বাড়িতে দুর্গাপূজা করেন, বলি দেন। রজনীকান্ত এই দুই ধারা থেকেই ছেঁকে নিয়েছিলেন বিশুদ্ধ ভক্তিটুকু। মায়ের মুখে রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সে কালের নাটকগুলির পাঠ শুনতেন, আর তা বসে যেত মাথায়, মনে। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল। নিজেই বলেছেন সে কথা: ‘‘বই একবার পড়্‌লে প্রায় মুখস্থ হ’ত... একটা পরখ এখনও দিতে পারি। যে কোন একটা চারি লাইনের সংস্কৃত শ্লোক (যা আমি জানি না) তুমি একবার ব’লবে, আমি immediately reproduce কর্‌ব। একটুও দেরী হবে না।’’
রজনীকান্ত সংস্কৃত জানতেন দুর্দান্ত। রাজশাহী কলেজে তাঁর সহপাঠীরা সাক্ষী, মাস্টারমশাইয়ের ক্লাসে আসতে দেরি হলে তিনি মুখে মুখে সংস্কৃত কবিতা বানাতেন, ব্ল্যাকবোর্ডে সংস্কৃত ধাঁধা লিখতেন। মাস্টারমশাইদের নকল করে ছড়া কাটতেন সংস্কৃতে, কখনও ব্যাকরণে সুপণ্ডিত কিন্তু জনসমক্ষে বক্তৃতায় অপটু মাস্টারমশাইকে নিয়ে, কখনও বৃহদ্বপু শিক্ষকের মোটা পেটটি নিয়েও: অজরো(অ)মরঃ প্রাজ্ঞঃ হরগোবিন্দশিক্ষকঃ।/ বেতনেনোদরস্ফীতঃ বাগ্‌দেবী উদরস্থিতা।। (মাস্টারমশাই হরগোবিন্দবাবু অজর, অমর,
প্রাজ্ঞ। মাসমাইনে পেয়ে পেটটি মোটা, বিদ্যেও সমস্তটাই পেটে (মুখে সরে না)।
এই ছেলে যে পরে হাসির গান-কবিতায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে পাল্লা দেবেন, আশ্চর্য কী! ‘সাধনা’ পত্রিকায় দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির কবিতা ‘আমরা ও তোমরা’ বেরিয়েছে (যা আবার রবীন্দ্রনাথের করুণরসাশ্রিত কবিতা ‘তোমরা এবং আমরা’র দ্বিজেন্দ্র-প্রতিক্রিয়া), রজনীকান্ত সমান হেসে ও হাসিয়ে লিখলেন ‘তোমরা ও আমরা’— ‘উৎসাহ’ পত্রিকায়। জীবনের শেষ দিকে যখন গলার ক্যানসারে বাক্‌রুদ্ধ, হৃতকণ্ঠ, তখনও ডায়েরিতে লিখে গিয়েছেন ‘জোক’: ‘‘একটা রাখাল দুটো গরু নিয়ে যাচ্ছিল— তার একটা খুব মোটা, আর একটা খুব রোগা। একজন উকীল সেই পথে যান। তিনি রাখালকে জিজ্ঞাসা কর্‌লেন,— তোর ও গরুটা অত মোটা কেন, আর এটা এত হাল্‌কা কেন? এটাকে খেতে দিস্‌নে না কি? রাখাল উকীলকে চিন্‌ত; ব’ল্লে— আজ্ঞে না। মোটাটা উকীল, আর রোগাটা মক্কেল,— রাগ কর্‌বেন না।’’
এ রকমই মানুষটা। সমাজের অবক্ষয় দেখে— ডাক্তার, মোক্তার, উকিলের সমাজ-শোষণ দেখে— কবিতা লিখে গিয়েছেন। আমরা রজনীকান্তকে ‘পঞ্চকবি’র মধ্যে পুরে দিয়েই খালাস, ওঁর গান যদিও বা একটু শুনি-জানি, ওঁর কবিতা (অনেক কবিতা যদিও গানই) নিয়ে চর্চা হয় না বললেই চলে। অথচ মানুষটা উঠতে-বসতে লিখেছেন। টুকরো কাগজে গান বা কবিতা লিখে টেবিলে রেখে দিতেন বা জামার পকেটে। সেই কাগজের টুকরো হয়তো উড়ে গিয়েছে টেবিল থেকে। ওঁর স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী উদ্ধার করেছেন পরে। কত গান, কবিতা হারিয়েও গিয়েছে এই ভাবে। ওকালতি পেশা ছিল বলেই করতেন। কুমার শরৎকুমার রায়কে চিঠিতে লিখেছেন: ‘‘আমি আইনব্যবসায়ী, কিন্তু আমি ব্যবসায় করিতে পারি নাই। কোন্‌ দুর্লঙ্ঘ্য অদৃষ্ট আমাকে ঐ ব্যবসায়ের সহিত বাঁধিয়া দিয়াছিল, কিন্তু আমার চিত্ত উহাতে প্রবেশ লাভ করিতে পারে নাই। আমি শিশুকাল হইতে সাহিত্য ভালবাসিতাম; কবিতাকে পূজা করিতাম; কল্পনার আরাধনা করিতাম; আমার চিত্ত তাই লইয়া জীবিত ছিল।’’ বেঁচে থাকতে তিনটে বই বেরিয়েছিল ওঁর, ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’, ‘অমৃত’। ওঁর কবিতা এমন সাড়া ফেলেছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই একটা বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়। ছোটদের নীতিশিক্ষার জন্য লিখেছেন ‘সদ্ভাব-কুসুম’। হাসপাতালে দুঃসহ রোগযন্ত্রণার মধ্যেও লিখেছেন উমার আগমনী ও বিজয়া সঙ্গীতকাব্য ‘আনন্দময়ী’। আরও আছে— কাব্যগ্রন্থ ‘অভয়া’, ‘বিশ্রাম’, একেবারে শেষের দিকের লেখাগুলি নিয়ে ‘শেষ দান’। চিকিৎসার খরচ জোগাতে ‘বাণী’ ও ‘কল্যাণী’র গ্রন্থস্বত্ব আর কিছু বিক্রি না হওয়া বই বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন মাত্র চারশো টাকায়। স্ত্রী কেঁদে আকুল। তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘আমাকে যদি দয়াল আর কিছু দিন বাঁচিয়ে রাখে তবে শত সহস্র বাণী, কল্যাণী লিখে তোমার পায়ে অঞ্জলি দেব, তুমি আর কেঁদো না।’’ রোজনামচায় লিখে গিয়েছেন, ‘‘আমার এমন অবস্থা হ’ল যে, আর চিকিৎসা চলে না, তাইতে বড় আদরের জিনিষ বিক্রয় ক’রেছি। হরিশ্চন্দ্র যেমন শৈব্যা ও রোহিতাশ্বকে বিক্রয় ক’রেছিলেন। হাতে টাকা নিয়ে আমার চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছিল।...’’
রজনীকান্তের ডায়েরি পড়লে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। এই রোজনামচা বিখ্যাত মানুষের অন্তরকাব্য নয়, পাশের মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন থেকে তার জন্ম। নিজের রোগের কথা নিজেই লিখছেন: ‘‘গলনালী আর শ্বাসনালী দুটো জিনিষ আছে। আমার ভাত খাবার নালীর মধ্যে ঘা নয়, নিঃশ্বাসের নালীর মধ্যে ঘা, সেখানে কোনও ঔষধ লাগানো যায় না।’’ গান গাওয়ার সময় সময়ের হিসেব থাকত না রজনীকান্তের। রংপুরে গিয়ে সন্ধে থেকে রাত একটা-দেড়টা পর্যন্ত টানা গান গাইছেন, আবার পরের দিন অবিশ্রান্ত। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সাহেব ডাক্তার দেখে জানিয়েছিলেন, ‘ওভারস্ট্রেনিং অব ভয়েস’ই সম্ভবত অসুখের কারণ। ধুম জ্বর, খেতে যন্ত্রণা, গলা ফুলে ওঠা, কাশিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ট্রাকিয়োটমি অপারেশন করে গলায় শ্বাসপ্রশ্বাস চলাচলের জন্য ছিদ্র করে বসিয়ে দেওয়া হল রবারের নল। বন্ধ হয়ে গেল গান, কথা বলা— পরে খাওয়াও। বিছানার পাশে কাগজ-পেনসিল থাকত, সেখানেই লিখে দিতেন দরকারি কথা, মনের কথাও। সেই সব টুকরো টুকরো লেখা পড়ে মানুষটার শেষের ক’মাসের প্রতিটি দিন অনুমান করা যায় মাত্র, তল পাওয়া যায় না।
‘‘তোমাদের মতন যদি আমার আগেকার মত Loud Logic থাক্‌তো তবে তর্ক করতেম। তোমরা চট করে বলে ফেল, উত্তর লিখ্‌তে আমার প্রাণান্ত।’’
‘‘আমার শ্রাদ্ধে বেশি খরচ ক’র না। কিন্তু যেমন পিপাসা তেমনি খুব জল দিও। আম উৎসর্গ করিও। জল দিতে কৃপণতা ক’র না। বড় পিপাসায় ম’লাম, জল দিও।’’
‘‘আমি একটু বাঙ্গালা সাহিত্যের আলোচনা করেছিলাম ব’লে বাঙ্গালা দেশ আমার যা কর্‌লে তা unique in the annals of Bengali Literature. এই সাহিত্য-প্রিয় বাঙ্গালা দেশ, মানে— Literature-loving section of Bengalis bearing the major portion of my expenses. Is it not unprecedented in a poor country like mine?’’
সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন কান্তকবির সাহায্যে। কুমার শরৎকুমার রায় টাকা পাঠাতেন। মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ওঁর সংসারের, ছেলেদের পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। হাসপাতালে কত যে মানুষ রোজ আসতেন, তার ইয়ত্তা নেই। মেডিক্যাল কলেজের ছেলেরা পালা করে ওঁর শুশ্রূষা করতেন, কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হেমেন্দ্রনাথ বক্সী তো ছায়ার মতো থাকতেন ওঁর পাশে। স্কুল-কলেজের ছেলেরা রজনীকান্তের ‘অমৃত’ নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দিয়েছিল কবির হাতে। মিনার্ভা থিয়েটারে ‘রাণাপ্রতাপ’ ও ‘ভগীরথ’ নাটকের স্পেশ্যাল শো হয়েছিল সারদাচরণ মিত্রের উদ্যোগে, রজনীকান্ত সম্পর্কে গিরিশ ঘোষের লেখা পাঠ করা হয়েছিল অভিনয়ের আগে। সেই সন্ধ্যার টিকিট-বিক্রির বারোশো টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল ওঁকে। বরিশাল থেকে উকিলরা টাকা তুলে পাঠিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় হাসপাতালে তাঁকে দেখতে এসে বলেছিলেন, ‘‘আমার আয়ু নিয়ে আপনি আরোগ্য লাভ করুন!’’
এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোগযন্ত্রণা ভুলে রজনীকান্ত সে দিন হেঁটে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। সে দিনের করুণ বর্ণনা ধরা আছে মেয়ে শান্তিবালার লেখায়। ‘‘কাকে দেখতে এসেছি, কাকে দেখছি,’’ বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রজনীকান্ত তো কথা বলতে পারেন না, কাগজে লিখেই জানিয়েছিলেন তাঁর মনের ভিতরের তোলপাড়। রাজশাহীতে নাটকের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাণী’তে রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সেই কথা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে রজনীকান্তের গান শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই স্মৃতি। ছেলেমেয়েদের ডেকে গান শোনাতে বললেন— ‘বেলা যে ফুরায়ে যায় খেলা কি ভাঙে না হায়...’ নিজে অর্গান বাজিয়েছিলেন সঙ্গে। চলে যাওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘‘আমায় আশীর্বাদ করুন, দয়াল শীঘ্র আমাকে তার কোলে নিয়ে যান।’’ সে দিন রাতেই গান লিখে বোলপুরে পাঠালেন— ‘আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করিয়া গর্ব করেছ দূর’। আর বোলপুর থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিটা তো ইতিহাস: ‘‘শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে কিন্তু সঙ্গীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই। পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে ম্লান করিতে পারে নাই।...আত্মার এই মুক্ত স্বরূপ দেখিবার সুযোগ কি সহজে ঘটে।’’
বন্ধু যাদব গোবিন্দ সেনকে কথা দেওয়া আছে, তাই হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থাতেও বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। খুব ইচ্ছে ছিল নিজে রাজশাহী গিয়ে ছেলের বিয়ে দেবেন, তা হয়নি। নববধূ হাসপাতালে এসে শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করতে, তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘‘মা তুমি আনন্দময়ী হয়ে ঘরে থাকো। বড় কষ্ট পাচ্ছি মা। আমার একটু আরামের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করিস। লক্ষ্মীরূপিণী মা, তোর প্রার্থনা সেই দয়াল শুনবেন।’’
মৃত্যু ক্রমশ এগিয়ে আসছে দেখতে পাওয়া একটা মানুষ কেমন আচরণ করে? সাহিত্যে-সিনেমায় উদাহরণ ভূরি ভূরি। রোজকার বাস্তবে, মুমূর্ষু প্রিয়জনদের মধ্যেও কি দেখিনি? তীব্র অবিশ্বাস। অতল হতাশা। আকুল কান্না। যে আসছে, বসছে পাশে, তাকেই আঁকড়ে ধরা, ভেঙে পড়া। রজনীকান্তও রোগমুক্তির আশায় ছুটে গিয়েছেন কাশী, বালাজি মহারাজের নিদান মেনে গঙ্গাস্নান করেছেন, প্রলেপ লাগিয়েছেন গলায়। তাঁর বৃদ্ধা মা ছুটে গিয়েছেন তারকেশ্বরে, হত্যে দিয়েছেন। ইউনানি, কবিরাজি চিকিৎসা, কাঁচরাপাড়ার পাগলাবাবা— সব দেখানো হয়েছে। এ দিকে মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসা, গলার ভিতরে এক্স-রে, ক্রমাগত ইঞ্জেকশন। কাজ হয়নি কিছুতেই। হওয়ারও ছিল না। এক দিন সবাইকে ডেকে বললেন, ‘‘আমার ছোট ছেলেটার মাত্র দু’বছর বয়স, ওকে আমার কোলে দিয়ে একটা ফটো তুলে রাখ। বড় হয়ে ও দেখবে ওরও বাবা ছিল।’’
সামনে খাবার, খেতে পারেন না। অসম্ভব পিপাসা, কিন্তু জল দিলে সব পড়ে যায় বুক বেয়ে। মুখ দিয়ে কখনও বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধময় পুঁজ-রক্ত। রাতের পর রাত ঘুম হয় না। তাই কাগজ টেনে রজনীকান্ত সেন লিখে যান একের পর এক লেখা— গান। কবিতা। মনের কথা। কখনও মাকে, কখনও দয়ালকে। সেই গানে যন্ত্রণা কোথায়, বরং অশেষ কৃতজ্ঞতা। ছত্রে ছত্রে নিঃশেষ সমর্পণ, শান্ত শরণাগতি। এক দিন গেয়েছিলেন ‘আমি অকৃতী অধম ব’লেও তো মোরে কম ক’রে কিছু দাওনি’, সেই তিনিই হাসপাতালে বসে লেখেন ‘সেখানে সে দয়াল আমার বসে আছে সিংহাসনে’ বা ‘ওগো, মা আমার আনন্দময়ী, পিতা চিদানন্দময়’। অন্তরে কোন সাধন থাকলে এমন লেখা যায়? এক দিন কাগজের টুকরোয় লেখা ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব’ গানখানি দেখে স্ত্রী উদ্বেগে বলেছিলেন, কথা দাও, এ গান তুমি আর গাইবে না। রজনীকান্তও গাননি আর। তবে হাসপাতালে বলে গিয়েছিলেন, তাঁর শেষযাত্রায় যেন এই গানই গাওয়া হয়। শান্তিবালার লেখায় আছে রজনীকান্তের মৃত্যুর অনেক বছর পরের এক স্মৃতি। সিলেটে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতির সভা, রবীন্দ্রনাথ এসেছেন। মেয়েরা রবীন্দ্রনাথকে তাঁরই গান শোনালেন, তার পর কবিকে অনুরোধ করলেন একটা গান গাইতে। রবীন্দ্রনাথ সে দিন গেয়েছিলেন রজনীকান্তের গান, ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিনমর্ম মুছায়ে...।’
রাত গড়াচ্ছে। উঠতে হবে এ বার। উসখুস মন তবু ‘শেষ কথা’ শুনতে চায়। রাজশাহীতে গিয়েছেন? ওঁর বাড়িটা এখন... উত্তর এল, বাড়িটা আছে। জরাজীর্ণ দশা। এক পাশে কয়েকটা ঘর নিয়ে একটা ব্যাঙ্কের অফিস। রজনীকান্তের স্মৃতি কিছু নেই। ‘কান্তকবির বাড়ি’ জাতীয় একটা ফলকও চোখে পড়েনি।
গড়িয়াহাটে রাস্তা পেরোতে কানে বাজছিল শতায়ুর কণ্ঠস্বর, ‘‘উই আর ভেরি ব্যাড প্রিজ়ার্ভার্স...’’
কৃতজ্ঞতা:
দিলীপকুমার রায়, অর্চনা ভৌমিক, আশীষ সেনগুপ্ত, মধুমিতা ঘোষ

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/article-on-rajanikanta-sen-1.839133?ref=patrika-new-stry

Thursday, 28 June 2018

২৫ বছর পরেও মোছেনি সে দিনের কলঙ্কের স্মৃতি (On Babri Demolition)

২৫ বছর পরেও মোছেনি সে দিনের কলঙ্কের স্মৃতি

ফের শুরু হয়েছে অযোধ্যা নিয়ে হিন্দুত্ববাদী আস্ফালন। দুনিয়া কিন্তু জানে, আগামী বুধবারই ঐতিহাসিক সেই সৌধ ভাঙার পঁচিশ বছর। কলঙ্কিত সেই দিনের ফ্ল্যাশব্যাক।

Babri Masjid
দেবব্রত ঠাকুর
 
Babri Masjid

উন্মত্ত: অযোধ্যায় বাবরি মসজিদে করসেবকদের দল। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২

বার্তা সম্পাদক গৌরীদি বললেন, ‘‘ধর। চিফ এডিটর কথা বলবেন।’’ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফোনের ও পারে অভীকবাবুর গলা, ‘‘কপিটা কী? এক লাইনে বল।’’ মাথা পুরো ফাঁকাই ছিল এত ক্ষণ। সকাল থেকে ঘটে যাওয়া অতিদ্রুত ঘটনাপ্রবাহে এবং প্রভাবে হতচকিত। প্রধান সম্পাদকের প্রশ্নে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘‘ক্যাডার লিডস দ্য লিডার। নেতাদের নেতৃত্ব দিলেন ক্যাডাররাই।’’ মুহূর্তেই ভেসে এল তাঁর অনুমোদন, ‘‘ঠিক। ওটাই কপি। দ্রুত লিখে ফেল। যে কোনও সময় কিন্তু সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।’’
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। স্থান: অযোধ্যা। ২৫ বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু সে দিনের স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে আজও। কমণ্ডল রাজনীতির সুবাদে ১৯৯১ থেকে ১৯৯২, দু’বছরে বার পনেরো অযোধ্যায় আসা-যাওয়া। প্রতি বারই ‘কী হয় কী হয়’ ভাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধর্মগুরু ও রাজনীতিকদের যৌথ প্রয়াসে লেখা চিত্রনাট্য মেনেই বিতর্ক জিইয়ে রেখে নেতাদের হম্বিতম্বিতে শেষ হয়েছে এক এক পর্ব। প্রতি বারই বিফলমনোরথ হয়ে ফিরেছে দাবার বোড়ে, করসেবকরা। সঙ্গে নিয়ে নেতাদের প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। ৯২’-এর ৬ ডিসেম্বরের আগেও একাধিক বার করসেবকদের একাংশ চড়াও হয়েছে বিতর্কিত কাঠামোটির উপর। তবে প্রতি বারই নেতারা শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে এনেছেন তাদের। আর গালাগালি দিতে দিতে ফিরেছে তারা।

এ বার তারা যেন প্রথম থেকেই বেশ রাগী। মহারাষ্ট্র থেকে আসা এক দল করসেবকের গেরুয়া টি-শার্টের সামনে স্পষ্ট করে ইংরেজিতে লেখা ‘আয়্যাম অ্যান অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’। পিছনে বিশুদ্ধ দেবনাগরীতে ‘জয় শ্রীরাম’। তাদের মুখের ধ্বনিও সেই ‘জয় শ্রীরাম’। প্রতিসম্ভাষণে ‘জয় শ্রীরাম’ না বললেই পাল্টা হুমকি, ‘‘আবে বোল!’’ ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে প্রতিদিনই করসেবকদের ঢল অযোধ্যায়। নেতাদের পরিকল্পনা ছিল, এক একটা দল আসবে। করসেবাস্থল ঘুরে রামলালার দর্শন করে ফিরে যাবে নিজ গন্তব্যে। রামমন্দিরের পয়লা নম্বর প্রবক্তা অশোক সিঙ্ঘল এবং তাঁর লেফটেন্যান্ট, বজরং দল প্রধান বিনয় কাটিয়ার সাংবাদিকদের জানালেন, করসেবকদের যাওয়া-আসা চলতেই থাকবে। ৬ ডিসেম্বর করসেবার ‘ডি-ডে’তে হাজার পঞ্চাশেক সেবক অযোধ্যায় হাজির থাকবেন। তাঁরাই সরযূ নদীর চর থেকে মুঠি-ভর বালি নিয়ে সুশৃঙ্খল ভাবে বিতর্কিত ২.৭৭ একর এলাকার বাইরে, কংক্রিটের চাতালের চার পাশে ছড়িয়ে দেবেন।
কিন্তু নেতারা ভাবেন এক, ক্যাডাররা আর এক। প্রতিদিনই করসেবকরা আসছে দলে দলে। কিন্তু ফিরছে না কেউই। সকলেই চায়, মূল দিনের করসেবায় অংশ নিতে। এর আগে করসেবকরা মূলত এসেছে উত্তরপ্রদেশ থেকেই। কিন্তু এ বার করসেবকরা বিভিন্ন রাজ্য থেকে। বাংলা, অসম, মহারাষ্ট্র তো আছেই, দলে দলে করসেবকরা আসছে বিন্ধ্যর দক্ষিণ দিক থেকেও। অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, কেরল থেকেও করসেবকদের এমন ঢল নতুন ঘটনা বইকী। সব রাজ্যের শিবির আলাদা। সেই সব শিবিরে শিবিরে ঘুরছেন সাংবাদিকরা। কিন্তু ঠোক্কর খেতে হল অন্ধ্রের শিবিরে যেতেই। প্রবেশ নিষেধ। খানিকটা তর্কাতর্কি, এবং তাদের রক্তচক্ষু দেখে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের পিছু হঠা। সে দিনই বিকেলে অন্ধ্রের সেই দলটিকে দেখা গেল রামকথাকুঞ্জ-সহ বিতর্কিত এলাকার চারপাশে ‘পরিক্রমা’ করতে। সুঠাম চেহারা, চোখের কোণে রক্তিম আভা। রশি, গাঁইতি, শাবল, কোদালে সুসজ্জিত জনা পঞ্চাশেক যুবক। 
পাঁচ তারি‌খ সকাল সকাল বার্ব ওয়্যার, জিআই পাইপের বেড়ার মধ্যে শ’দুয়েক সিআরপিএফ প্রহরায় থাকা রামলালাকে ‘দর্শন’। আসলে ভিতরের ব্যবস্থা সাংবাদিকরা যে যাঁর মতো জরিপ করতে ব্যস্ত। বাস্তবিকই ইনস্যাস রাইফেল আর কার্বাইনে সুসজ্জিত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আস্থাশীল সকলেই। ঘেরাটোপের এক পাশে প্রচুর বেতের ঢাল আর বেতের লাঠি। বিতর্কিত কাঠামোর পিছনে অন্তত দু’ফুট চওড়া, পনেরো ফুট উঁচু প্রাচীর। লক্ষ্মণ টিলার দিকে, কাঠামোর পিছন দিক থেকে ঢালু নয়, একেবারে খাড়া মাটির টিলা। চার-পাঁচ তলা বাড়ির সমান উঁচু। তার উপরে প্রাচীর-ঘেরা কাঠামো। কেউ বলেন বাবরি মসজিদ, কেউ বা বলেন রামমন্দির। সাংবাদিকরা লেখেন, বিতর্কিত কাঠামোয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা!!! হায় রে, তখনও কি তাঁরা জানতেন, এই নিরাপত্তা কত ঠুনকো!
৬ ডিসেম্বর দিন শুরু হল সকাল পাঁচটায়। ফৈজাবাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের অযোধ্যার পথে যখন, তখন ঘড়ির কাঁটায় ছ’টা। উত্তরপ্রদেশের শীতের সকাল। ফৈজাবাদের মানুষরা রাস্তার দু’পাশে। হাত দেখিয়ে গাড়ি থামাল এক দল যুবক। মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি। এ আবার কী গেরো! গাড়ির কাচ নামাতেই পোয়া-ভাঁড় ভর্তি দুধেল চা, লেড়ো বিস্কুট। যুবকদের বক্তব্য, অযোধ্যায় ভিড় বাড়াবেন না তাঁরা। শীতের সকালে মানুষকে চা খাইয়েই তাঁদের করসেবা চলছে।
লক্ষ মানুষের ভিড় ঠেলতে ঠেলতে গাড়ির প্রথম গন্তব্য সরযূ নদীর তীর। এখান থেকেই ‘মুঠিভর বালি’ সংগ্রহ করে করসেবকদের জন্মভূমি-যাত্রার কথা। কিন্তু কোথায় কী!
ধু ধু সরযূ তীর। সব পথের লক্ষ্যই করসেবাস্থল। পার্কিং-এ গাড়ি রেখে সেই ভিড়ে ভাসতে ভাসতে করসেবাস্থলে। আগের দিনের মতোই সেই ‘নিশ্ছিদ্র’ নিরাপত্তা। অবাধ প্রবেশের অধিকার নেই। সাংবাদিকদের গলায় ঝোলানো রাম জন্মভূমি ন্যাসের গোলাপি পরিচয়পত্র। প্রেস কার্ড। রুটিন মতোই আবার রামলালা সকাশে ঢু মারা। সেখানেই দেখা হয়ে গেল ফৈজাবাদের সিনিয়র সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ (এসএসপি) ডি বি রাই-এর সঙ্গে। বললেন, মাছিও গলতে পারবে না।
এর মধ্যেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্বেচ্ছাসেবকরা দেখালেন, পাশের মানস কুঞ্জের তিন তলার ছাদ হচ্ছে ‘প্রেস গ্যালারি’। সেখান থেকে সামনে তাকালে বিতর্কিত কাঠামো। নীচে তাকালেই উন্মুক্ত করসেবাস্থল। বাঁ দিকে রামকথাকুঞ্জের অস্থায়ী একতলা অফিস। তার ছাদই আজকের ভিভিআইপি মঞ্চ। সেখান থেকেই ভাষণ দেবেন লালকৃষ্ণ আডবাণী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরকার্যবাহ (সাধারণ সম্পাদক) এইচ ভি শেষাদ্রি, সঙ্ঘের গুরুত্বপূর্ণ নেতা কে এস সুদর্শন, মুরলী মনোহর জোশী, রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়ারা। সুতরাং প্রেস গ্যালারিতে ‘পজিশন’ নেওয়ার জন্য সাংবাদিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। ছাদে পজিশন নিয়েও কী মনে হতে নেমে এলাম নীচে। সামনের দরজায় স্বেচ্ছাসেবকরা আর সাংবাদিকদের বেরোতে দিচ্ছেন না। অতএব খিড়কি দোরই ভরসা। বেরিয়ে এসে গোলাপি প্রেস কার্ড দেখিয়ে করসেবাস্থলে প্রবেশ। দেখা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সহ-সভাপতি পি পি তোষনিওয়ালের সঙ্গে। তিনিই জানালেন, কোনও করসেবকই অত দূরে সরযূ তীরে যেতে রাজি হয়নি। সে কারণেই পরিকল্পনায় ‘ছোট বদল’ করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। তাঁর সঙ্গে কথা শেষ হতেই দেখা গেল, রামকথাকুঞ্জ আর সংলগ্ন অ্যাপ্রোচ রোডে করসেবকদের ভিড় উপচে পড়ছে। সঙ্গে গগনভেদী হুংকার ‘জয় শ্রীরাম’। ভিড় সামলাতে সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবকরা ওই শীতেও খাকি হাফপ্যান্ট আর সাদা হাফশার্ট বা টি-শার্ট পরে মানবশৃঙ্খল রচনা করে দাঁড়িয়ে। বিশৃঙ্খল করসেবকদের সামলানোর দায়িত্ব তাঁদেরই। তার মধ্যেই তদারকি করে বেড়াচ্ছেন ‘পহেলবান ধরমদাস’। একদা বিনয় কাটিয়ারের ছায়াসঙ্গী পহেলবান তত দিনে গেরুয়া বসনধারী ‘স্বামী ধর্মদাস’ হয়ে গিয়েছেন। তত ক্ষণে তাঁর শিষ্যদের নিয়ে হাজির আচার্য বামদেব। পুজোপাঠের প্রয়োজনীয় সাজসজ্জা শুরু হয়েছে। নজরে পড়ল, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত পর্যবেক্ষক তেজশঙ্কর এক কোণে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে সব পর্যবেক্ষণ করছেন। কয়েক দিন আগেই এই তেজশঙ্করের সঙ্গে আলাপ হয়েছে দিল্লিতে, সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি বেঙ্কটচালাইয়ার এজলাসে। করসেবার অনুমতি দিয়ে সে দিনই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তাঁকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেন।
তেজশঙ্করকে প্রশ্ন করি, কেমন বুঝছেন? হাসলেন, ‘‘এভরিথিং ইজ ফাইন।’’ ঘড়ির কাঁটায় তখন ন’টা।
রামকথাকুঞ্জের মঞ্চ থেকে তখন ভেসে আসছে রাম-ভজন। করসেবা পরিসরের এক কোণে, বিতর্কিত এলাকা ঘেঁষে একটা মাটির ঢিবি। সেখান থেকে চারপাশটা পরিষ্কার দেখা যায়। এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে সেই ঢিবির উপরে দাঁড়ালাম। সেখানে ইটের উপরে বসে উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন ডিরেক্টর-জেনারেল অব পুলিশ তথা বারাণসীর বিজেপি সাংসদ শ্রীশচন্দ্র দীক্ষিত। তিনি আবার বিশ্ব হিন্দু পরিষদেরও সহ-সভাপতি। পাশেই ফৈজাবাদ ডিভিশনের ডিআইজি উমাশঙ্কর বাজপেয়ী। তিনিও জানালেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
এরই মধ্যে সপার্ষদ হাজির চিত্রকূটের বৈষ্ণবাচার্য হরিচরণ দাস। সঙ্গে ‘টিন-এজ’ সাধু রঘুনন্দন, হরিচরণের শিষ্য। ফর্সা, দোহারা চেহারা। নির্দিষ্ট আসনে বসে রঘুনন্দন তাঁর গেরুয়া ঝোলা থেকে দু’টি ছোট কর্ণিক বের করতেই তেড়ে এলেন পহেলবান। কর্ণিক নিয়ে টানাটানি চলতে চলতেই ছেলেটিকে কাঁধে তুলে নিয়ে পহেলবান ধরমদাস ধেয়ে গেলেন উত্তর-পূর্ব কোণের গেটের দিকে। কার্যত পরিসরের বাইরে ছুড়ে ফেললেন তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে আগুনে যেন ঘি পড়ল। করসেবকদের জমাট ভিড় আছড়ে পড়ল গেটের উপর। স্বেচ্ছাসেবকরা সামলাতে পারলেন না, শ’দুয়েক যুবকের দল ঢুকে পড়ল করসেবাস্থলের মধ্যে। হাতে তাদের কর্ণিক নয়, প্রমাণ মাপের ত্রিশূল। শুরু হল উন্মত্ত নাচ। বোল একটাই, ‘জয় শ্রীরাম’। সঙ্ঘের লাঠিধারী বাহিনী তেড়ে গেল তাদের দিকে। ধাক্কা দিতে দিতে বের করে দিল।
ইতিমধ্যে ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁয়েছে। এত ক্ষণ নোটবই, পেন হাতেই ছিল। গলায় ঝুলছিল প্রেস কার্ড। কী মনে হতে সে সব গুটিয়ে পকেটে চালান করলাম। অন্য পকেট থেকে টেনে বের করলাম ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা সিল্কের ফেট্টি। রামকথাকুঞ্জের মাইকে তখন ভজন থেমে গিয়েছে। বার বার ‘অনুশাসন’-এর হুঁশিয়ারি আসছে। ভেসে আসছে সিঙ্ঘলের গলা, কাটিয়ারের গলা, ‘‘যাঁরা বিশৃঙ্খলা তৈরি করছেন তাঁরা আমাদের লোক নন। করসেবা ভন্ডুল করতে আসা ষড়যন্ত্রী। পিভি, মুলায়ম, ভিপির পাঠানো লোক। কোনও প্ররোচনায় পা দেবেন না।’’  
স্তব্ধ: কলকাতার রাজপথে সেনা প্রহরা। ১১ ডিসেম্বর, ১৯৯২
করসেবক বনাম স্বেচ্ছাসেবকদের এই টানাপড়েনের মাঝে ছিল উত্তরপ্রদেশের ‘কুখ্যাত’ পিএসি, প্রভিনশিয়াল আর্মড কনস্টেবুলারি। এদের হিন্দু-প্রীতি সুবিদিত। টানাপড়েনের মধ্যে তারা কখন এক পাশে সরে গিয়েছে। চারদিকে সমুদ্রের মতো গর্জন, জয় শ্রীরাম।
বেলা সাড়ে এগারোটা। হঠাৎই বিতর্কিত কাঠামোর পিছন দিক থেকে রশি বেয়ে গম্বুজের মাথায় উঠে এল এক দল করসেবক। পিঠে বাঁধা গাঁইতি, শাবল। অন্ধ্রের সেই দলটি। মুহূর্তে বদলে গেল ছবিটা। সঙ্ঘের তথাকথিত অনুশাসনকে পায়ে দলে করসেবাস্থল হয়ে কাঠামোর দিকে ধেয়ে চলেছে করসেবকরা। এই জনজোয়ারকে আটকাতে বেতের লাঠি হাতে এগিয়ে গেলেন পহেলবান ধরমদাস। কিন্তু জনস্রোতে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন তিনি। তার পরই লাফিয়ে ফের দৌড়লেন রামকথা কুঞ্জের দিকে। করসেবকদের কয়েক জন তাড়া করল পহেলবানকে। হাতে ত্রিশূল, মুখে বিশুদ্ধ হিন্দিতে গালি। তত ক্ষণে পহেলবান পগার পা়র।
কোন দিকে যাব বুঝতে পারছি না। রামকথাকুঞ্জে, না কি এখানেই। কী ভেবে করসেবকদের সঙ্গে দৌড়ে গেলাম। ঢুকে পড়লাম বিতর্কিত কাঠামোর মধ্যে। এসএসপি ডি বি রাই চিৎকার করছেন, ‘‘চার্জ টিয়ার গ্যাস!’’ বার বার চিৎকারে তাঁর মুখে দৃশ্যতই ফেনা উঠে গিয়েছে। কিন্তু কাঁদানে গ্যাস যাদের হাতে, সেই পিএসি বাহিনী তখন এসএসপি-র নির্দেশ উপেক্ষা করেই চত্বর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। গোটা কাঠামো তখন করসেবকদের দখলে। শুরু হয়ে গিয়েছে ইটবৃষ্টি। এ বার এসএসপি-র শেষ ভরসা সিআরপিএফ-ও বেতের ঢালে মাথা ঢেকে ছেড়ে যাচ্ছে চত্বর। এক জওয়ান বললেন, ‘‘আপ ভি চলিয়ে, নেহি তো মর যাওগে।’’ তাঁর ঢালে মাথা বাঁচিয়ে নেমে এলাম সীতা রসুইয়ের সামনের রাস্তায়।
এগোলাম রামকথাকুঞ্জের দিকে। সহকর্মী সাংবাদিকরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছে। প্রাক্-মোবাইল যুগ। উপরে তাকিয়ে দেখলাম, মানস কুঞ্জের ছাদের প্রেস গ্যালারিতে শুধু থিকথিকে মাথা। কাঠামোর গম্বুজ ভাঙার কাজ তখন শুরু হয়ে গিয়েছে। কংক্রিট নয়, চুন-সুরকির শক্ত পাঁচশো বছরের পুরনো গাঁথনির গম্বুজ। সাড়ে বারোটা নাগাদ সবসুদ্ধ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল বাঁ দিকের প্রথম গম্বুজটি। মীর বাঁকির গড়া ‘বাবরি মসজিদ’-এর ধুলোয় মিশে যাওয়া তখন মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা।
রামকথাকুঞ্জের মাইক এত ক্ষণ ছিল স্তব্ধ। হঠাৎ ঘড়ঘড় আওয়াজ করে সচল হল। এক এক করে ভেসে আসছে আডবাণী, যোশী, রাজমাতা, সুদর্শন, সিঙ্ঘলদের গলা। সকলের অনুরোধ, এ বার নেমে আসুন। কিন্তু কে শোনে সে কথা!
রামকথাকুঞ্জের দিকে এগনোর বৃথা চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছি। দেখা এক সিনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে। রামকথাকুঞ্জেই ছিলেন এত ক্ষণ। জানালেন, আডবাণীজি খুবই বিভ্রান্ত। প্রমোদ মহাজন মাথা চাপড়াচ্ছেন, ‘আরে ইয়ে ইস্যু হমারা হাথ সে নিকাল গয়া।’ সকলেই আশঙ্কায়, যে কোনও সময় রাজ্যের বিজেপি সরকারকে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবে কেন্দ্র। নরসিংহ রাও সরকার বাকি কাঠামোর সুরক্ষায় ঢোকাবে সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনী। কিন্তু কোথায়
কী! বেলা তিনটেয় ভেঙে পড়ল দ্বিতীয় গম্বুজটিও।
আবার সরব হল মাইক। এ বার ভেসে এল জ্বালাময়ী ভাষণের জন্য বিখ্যাত (কিংবা কুখ্যাত) সাধ্বী ঋতম্ভরা ও উমা ভারতীর গলা। এত ক্ষণের ‘স্টান্স’ পালটে ফেলে হিন্দুত্ববাদ এ বার স্লোগান তুলল, ‘‘এক ধাক্কা অউর দো/ বাবরি মসজিদ তোড় দো।’’ নেতারা ভেসে গেলেন ক্যাডারদের স্রোতে।
ইতিমধ্যে হঠাৎই এক করসেবক লাঠি নিয়ে তাড়া করল। তাড়া খেয়ে উঠে গেলাম বিতর্কিত কাঠামোর ঠিক পাশের বাড়ি, সীতা রসুই ভবনে। রামভক্তদের বিশ্বাস, এখানেই ছিল সীতা মাইয়ার রন্ধনশালা। ছাদে দেখা কয়েক জন সহকর্মী সাংবাদিকের সঙ্গে। অনেকেই তখন অযোধ্যা ছেড়ে ফৈজাবাদের পথ ধরেছেন। কিন্তু ঠিক করেছি, শেষ গম্বুজটি ভেঙে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব। শীতের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। বিকেল ৪টে ৪৯ মিনিট। ভেঙে পড়ল মূল গম্বুজ। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল। ভাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুই ভাবতে পারছি না। সকাল থেকে পেটে দানাপানি পড়েনি। খিদের বোধও চলে গিয়েছে।
নেমে এলাম সীতা রসুইয়ের তিন তলার ছাদ থেকে। চার দিকে থিকথিক করছে করসেবক। কেউ বিতর্কিত কাঠামোর ইট সংগ্রহ করছে। কয়েক জন সহকর্মীও ইট নিল। স্মারক। নিতে গিয়েও নিলাম না। এদিক-ওদিক করে ফৈজাবাদ রোডে। সব গাড়ি পালিয়ে গিয়েছে ফৈজাবাদে। আমাদের গাড়িও। স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদপত্রের ‘বহেনজি বাহিনী’ ডাক দিল, ‘‘ভাইয়া, হমারা গাড়ি মে আইয়ে।’’ ওমনি ভ্যানের পিছনের ডিকির দরজা খোলা। স্টেপনির উপর বসে ফিরছি। রাস্তার এ পাশে, ও পাশে টায়ার জ্বলছে। কোথাও দোকান জ্বলছে। গলির মুখে ভয়ার্ত মুখের জটলা। কপি ভাবার চেষ্টা করছি, ইন্ট্রো কী হবে? দূর, কিছু ভাবতেই পারছি না। মাথা ফাঁকা।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/25-years-of-the-demolition-of-the-babri-masjid-flashback-of-babri-demolition-1.717271?ref=archive-new-stry

র‌্যাচেল থেকে রমলা হয়ে উঠলেন তিনি (On A Jews-Indian actress)

র‌্যাচেল থেকে রমলা  হয়ে উঠলেন তিনি

র‌্যাচেল কোহেন। জন্ম একশো বছর আগে। বাংলা নাটকে, রবীন্দ্রনাথের কাহিিন নিয়ে তৈরি নির্বাক ছবিতে নায়িকা। তার পর মুম্বই, হিন্দি ছবির তারকা। বাঙালির চলমান ইতিহাসে উজ্জ্বল এক ইহুদি কন্যা।

সোমেশ ভট্টাচার্য
 
Ramala Devi
টালিগঞ্জের দিকে হনহন করে হাঁটছিল মেয়েটা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই অত বড় পরিচালকের অফিস পর্যন্ত পৌঁছনো। যে সে লোক নয়, গোটা ইন্ডাস্ট্রি এক ডাকে চেনে। তাঁর মুখে এই কথা! মেয়েটা ভাবতেই পারছিল না।
সেই ছোট বয়স থেকে সে স্টেজে উঠছে। চাইল্ড আর্টিস্ট হিসেবে মুখ দেখানো হয়ে গিয়েছে কয়েকখানা নির্বাক ছবিতেও। কিন্তু আর খুদে অভিনেতা নয়, পুরোদস্তুর নায়িকা হতে চায় সে। বাঙালি নাম একটা জুটেছে ঠিকই, এ বার বাংলাটাও আর একটু ভাল বলতে হবে! তবে সবার আগে চাই একটা সুযোগ। সে জন্যই আসা। তার বদলে এই? দুর্ব্যবহার, উপেক্ষা, মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া তার কাছে নতুন নয়। তাই বলে ইটের উপর দাঁড়াতে হবে!
ইহুদি স্কুলটিচার হায়াম কোহেন যখন বোম্বাই ছেড়ে কলকাতায় আসেন, মেয়ে র‌্যাচেল তখন ফ্রক পরে। চৌরঙ্গির একটা স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের মন নাচগান-নাটকের দিকে। স্কুলে ফাংশন হলেই র‌্যাচেল স্টেজে। হায়াম বেশ বুঝছিলেন, এ মেয়ের লেখাপড়া হবে না। বরং সে যা ভালবাসে, তা করতে দেওয়াই ভাল। তার দুই বোনেরও একই রকম মতিগতি। তিন মেয়েকেই করিন্থিয়ান থিয়েটারে পাঠিয়েছিলেন বাবা। বাংলার পেশাদার রঙ্গমঞ্চ তখন জমজমাট। তিন কন্যা ভিড়ে গিয়েছিল সেই দলে।
–– ADVERTISEMENT ––
তখনও এ দেশে সিনেমার বুলি ফোটেনি। অভিনেতারা বাংলায় কথা বলতে না পারলেও তাই ক্ষতি ছিল না। সাহেবসুবোরা দিব্যি দিশি রাজরাজড়া সেজে চালিয়ে দিত। তাতে সুবিধে হয়েছিল র‌্যাচেলেরও। এমনিতে মাতৃভাষা আরামাইক আর বোম্বাইয়া হিন্দিতে অভ্যস্ত সে। কলকাতায় এসে বাংলা বলছে একটু-আধটু। ছটফটে মেয়েটা চোখে পড়ে গেল ছবিওয়ালাদের। তেরো বছর বয়সেই ক্যামেরার সামনে। ছবির নাম ‘দালিয়া’। পরিচালক মধু বসু, কাহিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। র‌্যাচেল হয়ে উঠল ‘রমলা’— রমলা দেবী। 
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আরও তিনটে ছবিতে মুখ দেখিয়ে ফেলল, ‘মৃণালিনী’, ‘চরিত্রহীন’, ‘গুপ্তরত্ন’। ওই ১৯৩১-এই হইহই করে শব্দ এসে পড়ল সিনেমায়। মুভি হয়ে গেল ‘টকি’। মার্চে মুক্তি পেল হিন্দি টকি ‘আলম আরা’, এপ্রিলে বাংলা ‘জামাইষষ্ঠী’। রুপোলি পরদায় নতুন যুগ শুরু হল। রমলা পড়ল চ্যালেঞ্জের মুখে। টিকে থাকতে গেলে এ বার শান্তিপুরি বাংলায় সংলাপ বলতে হবে! মেয়ে আর কাজ পায় না! ১৯৩২ সালে ‘গৌরীশঙ্কর’ নামে একটা ছবিতে কাজ পেল বটে, কিন্তু সে-ও নির্বাক।
কে নেবে তাকে টকিতে? কার কাছে গেলে মিলবে সুযোগ? ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ মনে হয় র‌্যাচেলের— নীতিন বসু! ১৯৩৫ সালে দিশি সিনেমায় প্লেব্যাক এনে তিনি হইচই ফেলে দিয়েছেন। নিউ থিয়েটার্স স্টু়ডিয়োয় রেকর্ড হচ্ছে গান। সেই থেকে খোঁজ খোঁজ। কত অনুনয়-বিনয়, চোখের জল ফেলে তবে এই অবধি আসা। এই তার পাওনা?
‘‘রমলা, স্টপ...’’ পিছন থেকে ভেসে আসছে কিদার শর্মার গলা। চোখের জলে চারদিক ঝাপসা। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রুমালে মুখ ঢাকল মেয়েটা। ওরা কি কেউ জানে, কোন চোরাটানে তলিয়ে গিয়ে অসম্ভব জেদে ফের ভেসে উঠেছে সে? কত কেঁদেছে ব্রেবোর্ন রোডের পুরনো সিন্যাগগে শুক্রবারের প্রার্থনায়?
কখন তার বালিকা বয়স ফুরিয়েছে, কখন ঢেউ তুলে এসেছে জোয়ার, র‌্যাচেল ছাড়া বাকি সকলেই বোধহয় খেয়াল করছিল। ক্রমশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল সে। রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ছিল যেন। জীবনে আসা-যাওয়া করছিল প্রেম।
হঠাৎই এক দিন টের পেল, সে মা হতে চলেছে। বয়স মোটে ষোলো। প্রেমিকটি ইহুদি নয়, র‌্যাচেলের বাড়ির লোক তাকে মানতে নারাজ। মেয়ের বিয়ে না দিলে কেচ্ছার একশেষ। ছেলেটিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, চাপ দিয়ে ধর্মান্তরিত করা হল। হয়ে গেল বিয়ে। ক’মাস বাদে জন্মাল পুত্র— স্যাম। কিন্তু র‌্যাচেলের এক আকাশ স্বপ্ন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা। অযাচিত সন্তান এসে পায়ে পরিয়েছে পিছুটানের বেড়ি। সে চুপিচুপি কাঁদে, ঈশ্বর, আমি কি এ ভাবেই শেষ হয়ে যাব? কোনও দিনই আর ফিরতে পারব না সিনেমায়?
‘আলম আরা’ ছবির অভিনেতা জগদীশ শেঠির সঙ্গে রমলার পরিচয় ছিল। তিনিই রমলাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন কিদার শর্মার সঙ্গে। পঞ্জাব থেকে কলকাতায় চলে আসা কিদার তখন নিউ থিয়েটার্সে দেবকী বসুর ছবিতে ব্যাক সিন আঁকেন, স্টিল তোলেন, টুকটাক ডায়লগ লেখেন আর ডিরেক্টর হওয়ার খোয়াব দেখেন। সেই কিদারকেই ধরে বসল রমলা, যে ভাবেই হোক এক বার নীতিন বসুর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে হবে।
নীতিন তখন তাঁর পরের ছবির জন্য অভিনেত্রী খুঁজছেন। রমলাকে নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হলেন কিদার। রমলার বুক দুরদুর, তাকে পছন্দ হবে তো ওঁর? দেবেন তো পার্ট? একটু বেঁটে বটে সে, কিন্তু এ রকম মিষ্টি মুখ তিনি আর পাবেন ক’টা? কিদার যখন গড়গড় করে রমলার গুণপনার কথা বলে চলেছেন, ডিরেক্টর আগাগোড়া মেপে নিলেন নবাগতাকে। তার পর কিদারের দিকে ফিরে বললেন, ‘‘ওকে আমার কাছে আনলেই যখন, উঁচু করে দাঁড় করানোর জন্য কয়েকটা ইট আনলে না কেন?’’
একটা ছুরি যেন বিঁধে গেল রমলার বুকে। কোনও রকমে ‘গুডবাই’ বলে মুখ নিচু করে বেরিয়ে এল সে। পিছু-পিছু কিদার। নিজে এক জন স্ট্রাগলার হয়ে বিলক্ষণ জানেন, অপমানের হুল কী তীব্র হয়ে বেঁধে? বললেন, ‘‘রমলা, ভেঙে পোড়ো না। যে দিন আমি ডিরেক্টর হব, তুমিই হবে আমার প্রথম হিরোইন।’’ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল সে, ‘‘বেচারা ডায়লগ রাইটার কিদারনাথ কোনও দিনই ডিরেক্টর হবে না, আর আমিও কোনও দিন হিরোইন হব না!’’
কিদার কিন্তু কথা রেখেছিলেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বানান তাঁর প্রথম ছবি ‘আওলাদ/ দিল হি তো হ্যায়’। নায়িকা রমলা দেবী। তবে তার আগেই ১৯৩৭-এ চারু রায়ের ‘গ্রহের ফের’ টকি-তে শুভ মহরত হয়ে গিয়েছে র‌্যাচেলের। ডায়লগ লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ‘সচিত্র শিশির’ পত্রিকা লিখল, ‘‘শ্রীমতী লছমীর ভূমিকায় শ্রীমতী রমলা দেবীকে (ইহুদী-বালা?) আবিষ্কার করে চারুবাবু তার সুদ শুদ্ধ উসুল করেছেন। এই নূতন অভিনেত্রীটি দেখতেও যেমন সুন্দর, তার অভিনয়ও তেমনি অপরূপ।’’
পরের বছর রবি ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে তৈরি হল ‘গোরা’। তাতেও রমলা। কোথায় গ্রহের ফের, বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। একের পর এক হিন্দি ছবিও আসছে হাতে। নাম হচ্ছে। ১৯৪০ সালে ‘তটিনীর বিচার’ ছবিতে অভিনয়ের সঙ্গে প্লেব্যাকও করে ফেললেন রমলা। আর সবচেয়ে বড় কাণ্ডটা ঘটল তার পরেই। পরের বছর রিলিজ করল ‘খাজাঞ্চি’। মোতি বি গিদওয়ানির ছবিতে গুলাম হায়দারের ছক-ভাঙা সুর আর সামশাদ বেগমের গলা ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভূ-ভারত। ভাসিয়ে দিল রমলার অভিনয়ও।
রাতারাতি স্টার বনে গেলেন রমলা। ক’বছর আগেও যাকে কাজের জন্য দোরে-দোরে ঘুরতে হত, প্রযোজকরাই তখন তাঁর দরজায় লাইন লাগাচ্ছেন। পর পর হিট ‘মাসুম’, ‘খামোশি’, ‘জজসাহেবের নাতনি’। ’৪৩-এ ‘মনচলি’-তে অভিনয়ের জন্য বিএফজেএ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার।
’৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল। ক’বছর আগেই লাহৌর থেকে বোম্বাই চলে এসেছিলেন এক যুবক। কিছু দিন ইতিউতি ঘোরাঘুরির পর, দেশভাগের ঠিক আগের বছর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চাবিটা খুঁজে পেলেন তিনি— দেব আনন্দ! আর দু’বছর পর তিনিই হলেন রমলার হিরো। বক্স অফিসে হইচই ফেলে দিল ‘হাম ভি ইনসান হ্যায়’। মান্না দে-র গলায় ‘হম তেরে হ্যায় হমকো না ঠুকরানা’ তখন লোকের মুখে মুখে।
এরই মধ্যে ফের উথালপাথাল র‌্যাচেলের ব্যক্তিগত জীবন। বিয়েটা অনেক দিন ধরে নড়বড় করছিল। ছেলের দিকেও নজর দেওয়ার সময় ছিল না। বিয়েটা ভেঙেই গেল। র‌্যাচেলের অবশ্য তা নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই। শুধু কাজ, আর স্বপ্ন, আরও উপরে উঠতে হবে।
পুরুষেরও অভাব নেই জীবনে। তবে র‌্যাচেলের মনে ধরেছিল এ দেশে পাইলটদের ট্রেনিং দিতে আসা এক ব্রিটিশ অফিসারকে। সেই দাঁড়েই ডানা গুটিয়ে বসা হল। আর মায়ের থেকে আরও দূরে ছিটকে গেল স্যাম। শেষে ’৫০-এর গোড়ায় মা’কে ছেড়ে ইজরায়েলে ফিরে গেল ছেলে। সেখানেই বিয়ে করে থিতু হল। স্যামের স্ত্রী বারবারার বয়ান অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের পর ছেলেকে চোখের আড়ালে ঠেলে দিয়েছিলেন র‌্যাচেল। গুটিকয় চিঠি লেখা, ওই পর্যন্তই।
ওই ১৯৫০-এর গোড়াতেই আচমকা গুটিয়ে গেল রমলার কেরিয়ার গ্রাফ। তত দিনে এক ঝাঁক নতুন মুখ এসে গিয়েছে— নার্গিস, মধুবালা, মীনাকুমারী, নূতন। আসতে চলেছে সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, সুচিত্রা, ওয়াহিদা রহমান; আর এক তরতাজা ইহুদি মুখ নাদিরাও, যাকে পরে দেখব ‘শ্রী ৪২০’, ‘পাকিজা’, ‘জুলি’-তে।
’৫১ সালে হিন্দি ছবি ‘স্টেজ’-এর পরেই রমলার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় চিত্রজগৎ। শেষ বার তিনি ফিরেছিলেন ১৯৬০-এ, ‘রিক্তা’ ছবিতে, অহীন্দ্র চৌধুরী, নৃপতি, ছায়া দেবীদের সঙ্গে। নিভে যাওয়ার আগে যেন সব শক্তি জড়ো করে জ্বলে ওঠা।
এত দিনে সংসারে ফিরলেন রমলা। ক্লান্ত, অবসন্ন। কিছুই ভাল লাগে না। স্যামের কথা মনে পড়ে, কিন্তু সেই ফাঁক আর জোড়া লাগার নয়। চল্লিশ পার করে ফের মা হলেন র‌্যাচেল। এ বার মেয়ে, নাম দিনা। টিনএজার বম্বশেল হয়ে সে-ও সত্তরের দশকের শেষে নামবে সিনেমায়। একটা মাত্র ছবি— ‘অ্যাহসাস’। পরিচালক জি পি সিপ্পি।
র‌্যাচেল যে বছর জন্মেছিলেন, সেই শীতেই জন্ম রুশ বিপ্লবের। ইলাহাবাদে জন্মালেন ইন্দিরা, ব্রুকলিনে জন এফ কেনেডি। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে। র‌্যাচেল বেঁচে ছিলেন সত্তর পেরিয়ে। ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৮ যে চোখ বুজল তার নাম রমলা নয়, শুধুই র‌্যাচেল।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/unknown-stories-about-jewish-indian-actress-ramala-devi-1.724937?ref=archive-new-stry

চুপিচুপি ৮৪ (Memoir by Shankar)

চুপিচুপি ৮৪

মন্বন্তর, মহাযুদ্ধের এয়ার রেড, বাবার মৃত্যুর দিনে শহর জুড়ে কারফিউ। দেখা হল ব্যারিস্টারের লাইব্রেরির তাকে নাটক, নভেল। অতঃপর কত অজানারে পেরিয়ে এসে এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে চৌরঙ্গীতে দাঁড়িয়ে গ্র্যান্ড হোটেলের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা।

Shankar
শংকর
 
Shankar
জন্মদিনের ক’দিন আগেই এই লেখা লিখতে বসেছি, তেমন কিছু না ঘটলে, ৭ ডিসেম্বরে (২০১৭) পৌঁছে, চুরাশিতম জন্মদিনের কৃতিত্ব উপভোগ করা যাবে। বঙ্গজীবনে ব্যাপারটা ছোট কিছু নয়, আমাদের বাল্যবয়সে কলেরা, বসন্ত, প্লেগ ও যক্ষ্মাকে ডোন্ট কেয়ার করে তিরিশ বছরের পরমায়ুটাই বেশ বড় কথা ছিল। তখন ঘরে ঘরে অকালবৈধব্যের বেদনাময় উপস্থিতি, কবিরা মনের দুঃখে লিখছেন— ‘যৌবনে মাতা যোগিনী সেজেছে তাই’। তখন ঘরে ঘরে, মন্দিরে মন্দিরে বাঙালি মায়েদের প্রধান প্রার্থনা, স্বামীপুত্রদের বাঁচিয়ে রাখো হে পরমেশ্বর, এবং তাঁকে প্রশ্ন, হাতের নোয়া এবং সিঁথির সিঁদুর টিকিয়ে রাখতে কত পূজা এবং উপবাস পালন করতে হবে বলো।
এক সময় নন্দনকাননের দেবদেবীরা বাঙালির বেঁচে থাকার মেয়াদ তিরিশ থেকে চল্লিশে বাড়াতে আগ্রহী হলেন। হিটলারের মহাযুদ্ধ এবং পঞ্চাশের মন্বন্তর তখন সব কিছু ভন্ডুল করবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, দুর্ভিক্ষের নাম করে এক কোটি বাঙালি নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগে ‘ফ্যান দাও ফ্যান দাও’ বলে আমাদের এই সোনার বাংলায় কেঁদে বেড়াচ্ছে। দুর্জনরা তখনই বলছে, পৃথিবীর ইতিহাসে কোনও বিদেশি শাসক কখনও পরাধীন দেশের অনশন-মৃত্যু ঠেকাতে পারেনি, অতএব ক্ষুধার্তকে স্বাধীনতা দেওয়া ছাড়া পথ নেই, সব গোলমাল সহজেই মিটে যাবে।
বিশ শতকের এই তিরিশের দশকে এবং চল্লিশের দশকে বাঙালির জীবনে অন্তহীন অমাবস্যা, সর্বত্র মানুষের তৈরি নন-স্টপ বর্বরতা, ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের সুবিশাল বঙ্গভূমে শ্মশানকালীর উলঙ্গ নৃত্য। সেই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের নেই-নেই ডাক। বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ ‘ব্ল্যাক মার্কেট’, ‘ব্ল্যাক আউট’ এবং সেই সঙ্গে ‘ব্ল্যাক মানি’। ভদ্দরলোকদের ভাষায় ‘কাঁচা টাকা’, যার আছে তার যত কষ্ট, যার নেই তারও তত কষ্ট।
আমার জন্মের তিন দশক আগে বেলুড় মঠের এক সন্ন্যাসী বলে গিয়েছিলেন— জন্মালি তো দাগ রেখে যা, বোকা বাঙালি তা বিশ্বাসও করেছিল। তার পরের শিক্ষা হল— জন্মালি তো টিকে থাকো, এই দুনিয়া প্যাঁচপয়জারে ভরা ‘ডেভিলিশ’ শয়তানিতে ভরা, যেন তেন প্রকারেণ হাজার হাঙ্গামাকে কলা দেখিয়ে বলো, কোনও রকমে বেঁচে থাকাটাই মানুষের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার, দুনিয়া জাহান্নমে গেলেও তোমার কিছু এসে যায় না, তমসো মা জ্যোতির্গময় এ কালের ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির স্লোগান, বাংলায় আমাদের একমাত্র মন্ত্র চাচা আপন প্রাণ বাঁচা! অতএব এয়ার রেড, মন্বন্তর, মহামারী পেরিয়ে বাঙালির নতুন সমস্যা চাচা-কাকার দাঙ্গা। আমাদের প্রিয় কলকাতায় কত লোক হত এবং আহত হল তার কোনও হিসেব নেই, আমাদের পাড়ার বাদলকাকু বললেন, ওয়ার্ল্ডের হিস্ট্রিতে কস্মিনকালে কোনও শহরে ভায়ে-ভায়ে নাগরিকদের মধ্যে এমন ‘মহারায়ট’ হয়নি, দেশভাগ ছাড়া নান্যপন্থা বিদ্যতেয়ম্‌! বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীদেরও কেউ কেউ সব বিশ্বাস সাময়িক ভাবে হারিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন— ওঠো জাগো, হে মোর চিত্ত পুণ্যতীর্থে জাগো রে ধীরে। কিন্তু মহামানবের সাগরতীরে, এই সব অমৃতবাণী নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে পরবর্তী পাঁচশো বছরের জন্য।
ছেচল্লিশের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সময় যে দু’টি ইংরিজি শব্দ বাংলা অভিধানে স্থায়ী স্থান লাভ করল তা হল ‘স্ট্যাবিং’ ও ‘কারফিউ’, শেষোক্ত শব্দটি দিনদুপুরে সন্ধ্যা ডেকে নিয়ে এসেও লুঠ, আগুন ও নরহত্যা আটকাতে পারল না, ছুরি ও খাঁড়ার দাম দশগুণ বাড়িয়ে দিল, সেই সঙ্গে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তরের দাম দশগুণ হাইজাম্প করল। বাড়ির মেয়েদের সারা ক্ষণের দুশ্চিন্তা, রোজগেরে স্বামী ও পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা কখন পৃষ্ঠে ছুরিকাহত না হয়ে বাড়ি ফিরবেন।
ছেচল্লিশের সেই অশুভ অগস্ট মাসের ব্যাপারে কেউ কেউ বলত, বড্ড অপয়া এই অগস্ট— পাঁজিফাঁজি না দেখে এই অগস্টেই গাঁধী ‘কুইট ইন্ডিয়া’ ডেকেছিলেন, এই অগস্টেই মুসলিম লিগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, আবার এই অগস্টেই ‘পার্টিশন’, এবং পাঁজিপত্তর না ঘেঁটেই ১৫ অগস্ট, যার স্বদেশি নাম ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ এবং ব্রিটিশ নাম ‘ট্রান্সফার অব পাওয়ার’। ছেচল্লিশের অগস্টে হাওড়া চৌধুরীবাগানের মুখার্জিদের বৃহত্তম দুঃসংবাদ হরিপদ উকিলের অসুস্থতা, যা নিশ্চিত হল সাতচল্লিশের গোড়ার দিকের এক মধ্যরাত্রে, যখন মহানগরে পুরোদস্তুর ‘কারফিউ’ চলছে। তখন মৃতদের নিয়ে শোকযাত্রাও নিষিদ্ধ, মরা মানুষকেও তখন সরকারি সন্দেহের বাইরে রাখা যাচ্ছে না।
তখনকার পাঠ্যপুস্তকে ‘আমরা’ বলে একটা কবিতা ছিল, কবি সত্যেন দত্ত সগর্বে ঘোষণা করছেন, ‘বাঁচিয়া গিয়াছি, বিধির বিধানে অমৃতের টিকা পরি’। এই অমৃতের টিকায় হতভাগা বাঙালির তখন তেমন ভরসা নেই, বিশ্বে বাঙালি বলে কিছুই থাকবে না এমনই আশঙ্কা মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। অমৃত যে টিকে হিসেবে বাঙালিকে দেওয়া যায় সে বিশ্বাস তখন কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু এত বিপদের মধ্যেও আত্মঘাতী বাঙালি যে অমৃতটিকা থেকে বঞ্চিত হয়নি তার প্রমাণ, দাম্ভিক সায়েবরা যে সাত কোটি বাঙালিকে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা বেড়ে বেড়ে আমার মতন নগণ্য মানুষের চুরাশিতম জন্মদিনে পঁচিশ কোটি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধবিগ্রহ, অনাহার, রায়ট, পার্টিশন কিছুই বাঙালির বাড় রুখতে পারেনি, শুধু কয়েক কোটি লোক তাদের জন্মস্থান থেকে উৎপাটিত হয়েছে, নতুন ইহুদি রূপে নানা রঙের পাসপোর্ট নিয়ে এই বাঙালিরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার অশেষ ভাগ্য, হাওড়ার গলি থেকে আমাকে ঘরছাড়া দেশছাড়া হতে হয়নি, আমি সাহস করে বলতে পেরেছি, আমার এই দেশেতে জন্ম, যেন এই দেশেতেই মরি।
সাতচল্লিশের শুরুতে বাবার অকালমৃত্যুর পরে আট নাবালক ও নাবালিকা নিয়ে আমার মা ভাড়াবাড়িতে বাস করেও কী ভাবে তাদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন, তা আজও আমার বুদ্ধির অগম্য। যে পিতৃদেব এই কন্যার নাম ‘অভয়া’ রেখেছিলেন তিনি হয়তো জানতেন, কিন্তু আমাদের বলে যাননি, আর এত যুগ পরে ব্যাপারটাকে দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই মনে হয় না।
এই পর্বে মা এক দিন যখন আড়ালে ডেকে বললেন, তোমাকে উপার্জন করতে হবে, তখন আমার বয়স পনেরো। সেই বয়সেই টুকটাক পার্ট-টাইম রোজগার শুরু হল, কিন্তু সে টাকায় চৌধুরীবাগানের সংসার উদ্ধার হয় না। উকিলবাবুর ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে টুকটাক জিনিসপত্তর বিক্রি করে, সেটা ভাল দেখায় না। তার পরের বছর লেখাপড়ায় ইস্তফা দিতে হল। শিয়ালদহ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে মাইনে বাকি। ছোট্ট একটা অঘটন ঘটে গেল। কলেজের সাহিত্যসভায় একটা রম্যরচনা-কাম-গল্প দুম করে শুনিয়ে ভাইস-প্রিন্সিপালের নজরে পড়ে গেলাম, তিনি সমস্ত দেনাপাওনা মকুব করে দিয়ে আইএ পরীক্ষায় বসবার পথ সুগম করে দিলেন। এবং তার পরেই হাওড়ায় নিজের ইস্কুলের প্রধানশিক্ষকের কৃপাদৃষ্টি লাভ করা গেল। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে, সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য আমাকে একটা অস্থায়ী মাস্টারির সুযোগ করে দিলেন। দুঃখ করলেন, তোমার কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। কেন জানি না, তাঁর প্রত্যাশা ছিল, আমি এক দিন কেষ্টবিষ্টু লেখক হব।
আমার মা অত অভাবের মধ্যেও আমার একটা কুষ্ঠি তৈরি করিয়েছিলেন, সেখানে জাতক সম্বন্ধে অনেক কিছু প্রত্যাশার ইঙ্গিত এবং সেই সঙ্গে মন্তব্য— জাতকের জীবনে এক কর্ম হইতে বারবার আর এক কর্মের উৎপত্তি। এই মন্তব্য আমার মা অন্ধবিশ্বাসে গ্রহণ করেছিলেন। আমি এর তাৎপর্য বুঝতে পারিনি, শুধু আন্দাজ করেছি— জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা। মায়ের ব্যাখ্যা, হাতের গোড়ায় যা কাজ পাওয়া যাবে তা-ই খুব ভাল ভাবে করতে হবে, কারণ এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি কখন হবে তা কালীবাড়ির পণ্ডিতমশাইও জানেন না।
হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে না-ঠেলবার যে উপদেশ মা দিয়েছিলেন তা নিজের অজান্তেই আমার জীবনে বেশ কাজে লেগে গিয়েছিল। ইস্কুলের এক অনুষ্ঠানে পুরনো সহপাঠী অনিলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে বলল, আমার দাদা ব্যারিস্টার বারওয়েলের বাবু, পুরনো শর্টহ্যান্ডের স্পিড বাড়িয়ে নেবার জন্য এক জন কাউকে খুঁজছেন। আমি তখন শর্টহ্যান্ড শেখা শেষ করলেও তেমন দক্ষ হয়ে উঠতে পারিনি, সুযোগটা নিয়ে নিলাম।
পাকেচক্রে বিভূতিদা অন্য এক চাকরি জোগাড় করে হাইকোর্ট থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমাকে বারওয়েল সায়েবের কাছে নিয়ে গেলেন। একটু আশঙ্কা, একটু দ্বিধা ছিল, উকিলের ছেলে ভাগ্যদোষে মুহুরি হতে চলেছে। কিন্তু বিভূতিদা বললেন, যে মানুষ যে কাজটা করে তা খুব ভাল ভাবে করতে পারলে সারা দুনিয়া তার সম্মান করে। বিভূতিদাও হঠাৎ বললেন, এক কর্ম থেকে অন্য কর্মের উৎপত্তি সত্যিই হয়— এই আমি আইনপাড়ার বাবু থেকে সায়েবি অফিসের কোটপ্যান্ট-পরা সায়েব হতে চলেছি, খোদ সায়েবের কাছ থেকে নিজের কাজটা ঠিকমত শিখেছি বলে।
আমার মা একই কথা বলতেন। আমাদের জানাশোনা কেউ নেই, সুতরাং অফিসের সব কাজেই এক নম্বর হতে হবে। এই মাতৃনির্দেশ কর্মক্ষেত্রে খুব কাজে লেগেছিল। এক সময় টেম্পোরারি বেয়ারার কাজ পেয়ে আমি এমন মন দিয়ে কাজ করেছিলাম যে এক জন অফিসার চেষ্টা করেছিলেন আমার কাজটা পাকা করে দিতে, কিন্তু পারেননি। তখন ভাটার সময়, কাজের সংখ্যা এই দুর্ভাগা দেশে তখন ক্রমশই কমে যাচ্ছে।
এ সব নিয়ে দুঃখ করে তখন লাভ নেই। তবে সুযোগের সন্ধানে থেকেছি, টেম্পল চেম্বার্সে বারওয়েল সায়েবের ব্রিফ ও বইয়ের থলে প্রতিদিন হাইকোর্টে নিয়ে এসেছি, আবার যখন হাতে কাজ নেই, তখন কৌতূহলে সায়েবের লাইব্রেরির বইগুলো নেড়েচেড়ে আবিষ্কার করেছি— চেম্বারের আইনের বইগুলো নাটকে-নভেলে ভরা। কত আশ্চর্য ব্যাপার যে আদালতে এবং আইনজ্ঞের অফিসে ঘটে যায়! আবার আমার অজান্তে এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি, ব্যারিস্টারের বাবুর কোন সময়ে গল্পলেখক হওয়ার সাধ হল!
১৯৫৩ সালের অগস্ট মাসে বারওয়েল সায়েব মাদ্রাজে মামলা করতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকের বলি হলেন। তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। অনাগতকে আন্দাজ করেই তিনি আমাকে ছোট্ট একটা চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন ডালহৌসিপাড়ায়। কয়েক মাস দু’টো কাজই করতাম। কিন্তু নতুন জায়গায় পদে পদে কনিষ্ঠ কেরানির অবহেলা ও অবমাননা। মনের দুঃখ মুছে ফেলার জন্যে চুপিচুপি লেখক হওয়ার মুসাবিদা শুরু হল। উৎসাহ দিতেন সহকর্মী আর এক কেরানি ভবানী ঘোষ। যে সব চরিত্রকে হাইকোর্টে জলজ্যান্ত দেখেছি, ভবানীবাবু তার বিস্তারিত খোঁজখবর নিতেন এবং তিনিই এক দিন তাঁর বন্ধু ও লেখক রূপদর্শীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের টেবিলে বসে। সাহিত্যিক বন্ধুকে তিনি বললেন, এই ছোকরার যে সব ঘটনা রয়েছে, তা এক দিন পাঠকদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে। তার পর এক সময় রূপদর্শী আমাকে পৌঁছে দিলেন মেছুয়াবাজারে দেশ পত্রিকার দফতরে। আবার এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি— জুনিয়র টাইপিস্টের সাহিত্যের নন্দনকাননে বিনা অনুমতিতে প্রবেশের দুঃসাহস।
এর পরও এক জন কনিষ্ঠ কেরানির জীবনে কত কী যে ঘটে গেল! কনিষ্ঠ কেরানির হাজিরা খাতায় সই করে, বদমেজাজি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সায়েবের দাঁতখিঁচুনি কয়েক ঘণ্টা নিঃশব্দে সহ্য করে, চারটের পরে স্বয়ং চিফ জাস্টিসের কক্ষে বইয়ে অটোগ্রাফ দেওয়া! তার পর সেকেন্ড ক্লাসের ট্রামে চড়ে হাওড়ায় রওনা দেওয়া। একই দিনে কত রকম ঘটনা ঘটে যাওয়া, যার ওপরে আমার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, এক কর্ম থেকে নিরন্তর আর এক কর্মের চলচ্চিত্র একই গতিতে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
ছোটখাটো স্বীকৃতি এলেও সাহিত্যের যাত্রাপথ যে সব সময় সুখবর হয়নি তার বিস্তারিত বিবরণ জন্মদিনের এই লেখায় পেশ করার সময় নেই। তবু বলতে হয়, সাহিত্যের স্টকমার্কেট যাঁরা হাতের মুঠোর মধ্যে রেখে নবাগতদের নিগৃহীত করে অকারণ আনন্দ পেতেন, তাঁদের রোষদৃষ্টি থেকে দূরে থাকতে পারিনি। তাঁরা আমার পিঠে ‘ওয়ান বুক অথর’-এর রবার স্ট্যাম্প মেরে দিতে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠলেন। তাঁদের হৃদয়হীন প্রচার: উকিলের বাবু একখানা বই কোনওক্রমে লিখে ফেলেছে, তার ওইখানেই শেষ, এ বছরের গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা সামনের বৈশাখে সের দরেও কেউ কিনবে না! অভিমান ও আতঙ্ক জোড়াসাপের মতন আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
আমার মা ভরসা দিতেন, তেমন তেমন বই একখানা লিখলেই হাজার বছর বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু মন সায় দেয় না। পথেঘাটে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে পড়ে গেল মায়ের পুরানা কথা, এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি হওয়াটাই আমার কুষ্ঠির ইঙ্গিত। বর্ষায় ভেজা এসপ্ল্যানেডে দাঁড়িয়ে দূরের গ্র্যান্ড হোটেলকে দেখতে দেখতে মনে হল, বারওয়েল সায়েব তো মিডলটন স্ট্রিটের ঘর-সংসার তুলে দিয়ে, অনেক দিন একটা হোটেলে থাকতেন, এবং সেই সুযোগে আমি স্পেনসেস হোটেলের নাড়িনক্ষত্র জানি এবং সেই সূত্রে মহানগরীর আরও একটা বৃহৎ হোটেলে আমার অবাধ যাতায়াত আজও রয়েছে। আমি চোখ বুজে চৌরঙ্গী এবং শাজাহান হোটেলকে দেখতে পেলাম, আমার সমস্ত আশঙ্কা দূর হয়ে গেল।
‘চৌরঙ্গী’-র সাফল্যের পরেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছে, এ সবই বানানো। হাওড়ার কানাগলিতে বিদ্যুৎবিহীন বাড়িতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ফাইভ স্টার গল্প কী করে লেখা হয়? নিশ্চয়ই কোনও বিখ্যাত সায়েবের অখ্যাত ইংরিজি বই থেকে চুরি করা! পরবর্তী কালে লন্ডনের বইমেলায় কেউ সে প্রশ্ন তোলায় কী উত্তর দেব ভাবছি, সেই সময় এক জন ইংরেজ ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, আপনি যে বইয়ের ইঙ্গিত করছেন, সেটি ‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশের চার বছর পরে প্রকাশিত, তা হলে উলটো সন্দেহও করা যেতে পারে! এই অপরিচিত ইংরেজকে যা বলা হয়নি, কোনও পাঁচতারা হোটেলে রাত না কাটিয়েও সেখানে নিত্য যাতায়াত আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ভাগ্যচক্রে, স্পেনসেস হোটেলে এক বছরের বেশি সময় বসবাস করে বারওয়েল সায়েব যে ক্লাবে উঠেছিলেন সেখানেও নিত্য যাতায়াতের সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার গল্প লিখব-লিখব করেও লেখার সাহস হয়নি, কারণ সেখানেই আমার পুনর্জন্ম হয়েছিল— শেষ বিদায়ের সন্ধ্যায় মাদ্রাজগামী বিদেশি ব্যারিস্টার হঠাৎ বলেছিলেন, মাই ডিয়ার বয়, কখনও ভুলো না, তুমি এক জন একসেপশনাল পার্সন, তার পর রসিকতা করে আমার কানটা মলে দিয়েছিলেন। সে দিন হাওড়ার ভাঙা বাড়ির ছাদে বসে স্থির করেছিলাম, যার কিছু নেই তার কাগজ-কলম আছে, এ সব কেনার মতো সামর্থ্য আমার কাছে, আমি পাগল সায়েবের পাগলামির কথা লিখে রেখে যাব।
সে ভাবেই শুরু করে সেই ১৯৫৩-র অগস্ট থেকে দশকের পর দশক কলম চালিয়ে এই ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কখনও পৌঁছনো যাবে ভাবিনি। প্রথম বই প্রকাশের পর অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সঙ্গে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় দেখা হয়েছিল, আমার নিতান্ত কম বয়স দেখে উদারহৃদয় লেখক চিন্তিত হয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘‘এত কম বয়সে মাঠে নামলে কেন? দীর্ঘায়ু হলে বড্ড কষ্ট পাবে, বছরের পর বছর লেখার মালমশলা পাবে কোথা থেকে? ভগবান তো প্রত্যেক মানুষের বুকের মধ্যে একখানা উপন্যাস আর পাঁচ-ছ’খানা ছোটগল্প পুরে পাঠিয়ে দেন, প্রত্যেক মানুষ ইচ্ছা করলেই তাই একটা নভেল লিখতে পারে, কিন্তু তার পর? মা সরস্বতীর রাজত্বে রেপিটিশনের কোনও কদর নেই।’’ বলেছিলাম, ‘‘কুষ্ঠি দেখে আমার মা জেনে গিয়েছেন, আমার জীবনে বারবার এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি!’’ খুব হেসেছিলেন অচিন্ত্য, বলেছিলেন, ‘‘তা হলে খুব ভাল কুষ্ঠি তোমার, এক জন লেখকের পক্ষে আদর্শ গ্রহ-নক্ষত্র যোগ।’’
নিশ্চয়ই তাই, না হলে, সেই ১৯৫৩ থেকে এত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হল কেন? তাঁরা কেন তাঁদের বিচিত্র জীবনকথার ভাণ্ডার কোনও কিছু প্রত্যাশা না করেই আমার হাতে তুলে দিলেন?
তবে কিছু বোকামি করেছি। সুরসিক বারওয়েল সায়েব এক বার বাঙালি শাশুড়িদের প্রসঙ্গ তুলে বলেছিলেন, ‘‘পরের জন্মে আমি এ দেশে বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করব, তাদের পদ্মফুলের মতো চোখের জন্যে নয়, স্রেফ এ দেশের শাশুড়িদের জন্যে— শ্বশুরবাড়িতে এসে জামাইরা যত টাকা দিয়ে নমস্কার করে তা একটু পরে শাশুড়িরা ডবল করে ফেরত দেয় বলে! আমি লাখ টাকা দিয়ে নমস্কার করে বিকেলে দু’লাখ টাকা নিয়ে বড়লোক হয়ে ফিরে যাব।’’ আমি ভেবেছিলুম, এটা তাঁর রসিকতা, কিন্তু পরে দেখলাম একেবারেই নয়। লেখার মাধ্যমে এক জন সায়েবকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমি নিজেই অনেকের কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠলাম, পরে বুঝলাম ঠিকমত বুঝিনি। চেষ্টাচরিত্র করে যদি লাখ টাকার শ্রদ্ধা জানাতাম, তা হলে মরণসাগরের ওপার থেকে তিনি আরও কত আমাকে ফিরিয়ে দিতেন। এক বার নয়, কলম ধরে একই ভুল কত বার করলাম, সাধ্যের অতীত দিয়ে কাউকে ভালবাসা বা শ্রদ্ধা জানানো হল না, তাই যা পাওয়া যেত এই জীবনের শ্রদ্ধাযাত্রায় তা হাতের কাছে পেয়েও পাওয়া হল না।
ভুল শুধরাবার ইচ্ছা প্রবল হলেও, সময় আর নেই। সুযোগ এ বারের মতন হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। যা এখন করতে ইচ্ছে করে, সাহিত্যপথের নতুন যাত্রীদের বলতে, এ ভুল তোমরা কেউ কোরো না, যা সাধ্যের অতীত তাই দিয়েই মা সরস্বতীর সোনার পা দু’টি ভরিয়ে দাও, তিনিও তোমাকে প্রত্যাশার অতীত ফিরিয়ে দেবেন।
এ বার একটু হিসেবপত্তরে মন দেওয়া যাক। বই লেখার তোড়জোড় শুরু হল বারওয়েল সায়েবের আকস্মিক দেহাবসানের পরই— তখন চলছে অগস্ট ১৯৫৩। প্রথম বই হাতে নিয়ে বিভূতিদার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম ১৯৫৫-তে। মা বলতেন, যখন দিবি তখন হিসেবপত্তর করে হাত টান হবি না, যা বুকের মধ্যে আছে সব ঢেলে দিবি, তার পর যা হয় হবে। আশ্চর্য ব্যাপার, দেওয়ার পাত্রটা কখনও শূন্য হয় না, দেওয়া মাত্রই আবার পূর্ণপাত্র হয়ে ওঠে। কী ভাবে? তখন তা ঠিক বুঝিনি, বোধহয়— এক কর্ম থেকে আর এক কর্মের উৎপত্তি যোগের কুষ্ঠি যোগে। ওই যে আমার মা বলেছিলেন, কখনও দরজা বন্ধ করবি না, কখন কে যে মানুষের ভিক্ষাপাত্রে কী দিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। এই ভাবেই তো এত বছর ধরে একের পর এক ঘটনা বুকের মধ্যে জড়ো হয়ে উঠেছে পাঠককে নিবেদন করার জন্য।
এমনি করেই তো এক বার ভয়ে ভয়ে ষাটে পদার্পণ করা গিয়েছিল। বংশের রেকর্ড— পিতৃদেব পিতামহ কেউই হীরকজয়ন্তীর সুখ দেখে যেতে পারেননি। বয়স নিয়ে গর্ব মা মোটেই পছন্দ করতেন না, প্রিয় সন্তানদের বয়স নিয়ে কথা উঠলে খুব রাগ করতেন। তার পর এক দিন সত্তর এল, তখনও খুব কিছু লক্ষ করিনি। বিমল মিত্র বলতেন— বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল, জাত লেখকের বয়স কমেও না, বাড়েও না।
তার পর আর একটা জন্মদিন এল। সাতসকালে ফোন করলেন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অনিল বিশ্বাস, নবদ্বীপ হালদারের মস্ত ভক্ত। বললেন, এখন একটু সাবধানে থাকতে হবে, কিছু লোকে বাহাত্তুরে বলবে, তবে ওনলি ওয়ান ইয়ার, তার পর আবার মেন স্ট্রিমে সহজেই চলে আসতে পারবেন! আচারে-আচরণে একটু সাবধানতা অবলম্বন করেছি, বছরের শেষ দিনে অনিল বিশ্বাস ফোনে বলেছেন, সে কালের নড়বড়ে বাহাত্তুরেদের এ কালে তেমন পাওয়া যাচ্ছে না, দিনকাল সত্যিই খারাপ।
তার পরের গাঁট আশি। বঙ্গবিজ্ঞরা সেই কবে থেকে সাবধান করে দিচ্ছেন, ৮০তে ৮০ও না! কিন্তু সুরসিক বঙ্গীয় লেখকরা প্রাইভেট আলোচনায় বলতেন, আশিতে আসাটা প্রত্যেক লেখকের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজনীয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক বার ‘বিট’ করার একমাত্র উপায়! শিব্রাম চক্রবর্তী বলতেন, মরার মস্ত বড় অ্যাডভান্টেজ, লেখকের বয়স আর বাড়ে না! সুকুমার রায় সুকান্ত ভট্টাচার্য এঁরা চিরকাল তরুণ লেখক থেকে যাবেন, রবিঠাকুর ওঁদের কোনও ক্ষতি করতে পারবেন না।
আশি বছরে পা দিয়ে নির্বাক হয়েই থেকেছি, তার পরের বছর সমসাময়িক লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলনায় বয়োজ্যেষ্ঠতা নিশ্চিত করে একটা আত্মকথা ও বই লিখে ফেলেছি— একা একা একাশি। ওই বয়সে আশ্চর্য এক একাকিত্ব ঘন কুয়াশার মতন নেমে এসে মানুষকে নির্দয় ভাবে ঘিরে ধরে। লক্ষ লোকের ক্রীড়াঙ্গনে আপনি যেন একা একা নিজের উইকেট রক্ষা করছেন, কেউ কাছাকাছি নেই নিন্দা বা প্রশংসা করতে। পরেই একটু ধৈর্য ধরে এই সামনের সাত তারিখে ৮৪। এই জন্মদিনটায় সুখদুঃখ সাফল্য-ব্যর্থতা মান-অভিমান সব কিছু নতমস্তকে বিসর্জন দিয়ে যা একমাত্র বলা যায় তা হল ‘চুপিচুপি চুরাশি’।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/writer-shankar-to-celebrate-his-84th-birthday-this-year-1.717259?ref=archive-new-stry