Tuesday, 2 August 2016

কালো তারে বলে পাড়ার লোক (On Amita Sen and Rabindranath)

$image.name

কালো তারে বলে পাড়ার লোক

তাঁকে নিয়ে প্যারডি এমনই। এক সময় রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা। পরে তাঁরই সঙ্গে সম্পর্কে চরম অবনতি। ২৬ বছরের জীবনে কত রং অমিতা সেনের! লিখছেন আশিস পাঠক

২১ মে, ২০১৬, ০০:০০:১০
sketch

চিত্রণ: বিমল দাস

তাঁর সঙ্গে নিজের গানের প্রাণ বেঁধে রাখতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷
তাঁকে ঘিরেই লিখেছিলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে’ গানটি৷
অথচ একদিন তাঁকে দেওয়া নিজের গান রেকর্ড করার অনুমতি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। এমনকী যে ক’টি গান রেকর্ড করা হয়েছিল, নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন তার প্রকাশ ও বিক্রিও৷
ছোট্টই জীবন তাঁর। মাত্র ছাব্বিশ বছরের৷ দু’অক্ষরের ছোট্ট ডাকনামটারই মতো যেন, খুকু৷ অথবা হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীতের আকাশে ছোট্ট এক তারার মতো, মেঘে ঢাকা তারা। ‘দুর্দৈব’-র কালো মেঘে৷
অমিত সম্ভাবনা আর কঠিন এক অসুখ নিয়ে এসেছিলেন অমিতা সেন। মৃত্যুও হয়েছিল সেই অসুখে। মাঝখানের সময়টা বিচিত্র ইতিহাস, হতাশা আর উৎসাহের ইতিহাস। কিন্তু সব কিছু নীরবে মেনে নেওয়ার মেয়ে ছিলেন না অমিতা। বেশ ডাকাবুকোই ছিলেন।
শান্তিনিকেতনে তাঁকে প্রথম দেখার স্মৃতি লিখেছেন বন্ধু রমা চক্রবর্তী, ‘‘খুকু কালো ছিল, মুখচোখ খোদাই করা মূর্তি যেন...কমনীয়তা না থাকলেও বুদ্ধির দীপ্তিতে সে ছিল শ্রীময়ী।...যখনকার কথা বলছি তখন তো আমরা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ে। খুকু তখনও ডানপিটে গোছের ছিল।
কাউকে বিশেষ তোয়াক্কা করত না, বিশেষ করে বাইরে থেকে আসা কলেজের ছাত্রদের বাচালতা দেখলে ফোঁস করে উঠত।’’     
সেই ‘ফোঁস’ করা মেয়েকে নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের গানের প্যারডি করে ছড়া লিখেছিলেন নিশিকান্ত রায়চৌধুরী, ‘‘কালনাগিনী আমি তারে বলি/ কালো তারে বলে পাড়ার লোক/ শুনেছিলাম বইগুদামের ঘরে/ কালো মেয়ের কালো মুখের ফোঁস।’’
ছোটখাটো চেহারার উচ্ছল মেয়েটিকে ভারি ভালবাসতেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার গানের জন্য। গানের ক্লাসে একদিন না এলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। লোক পাঠাতেন ডেকে আনতে।
এক বার বেশ কয়েক দিন দিনেন্দ্রনাথের গানের ক্লাসে অমিতা এলেন না। দিনেন্দ্রনাথ শুনলেন, তার নতুন বন্ধুর সঙ্গে নানা বিষয়ে তর্ক করতে করতে গানের ক্লাসের সময় পেরিয়ে যাওয়ার কথা খেয়াল করছে না সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রীটি।
দিনেন্দ্রনাথ তাঁকে বললেন, ‘‘বেশ তো, বন্ধুকে নিয়েই আয়, আমিও তর্কে যোগ দেব।’’
সত্যিই তাই করলেন। রমা চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‘একদিন দেখা গেল, খুকু ও তার বন্ধু দু’জনকে দু’পাশে রেখে দিনদা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বলতে চলেছেন।’’
নিজের ভাল না-লাগাটাকে স্পষ্ট জানান দিতে দ্বিধা করতেন না অমিতা। ভয় ছিল না সত্যি কথা বলাতেও।
এমনকী সেটা রবীন্দ্রনাথের সামনে হলেও। হয়তো এই সাহসের জন্যও রবীন্দ্রনাথ তাঁকে পছন্দ করতেন।
দিনেন্দ্রনাথ গান শেখাতেন উত্তরায়ণ-এ। একদিন সেখানে সব ছাত্রীই হাজির হয়েছেন। দিনেন্দ্রনাথ তখনও এসে পৌঁছননি।
গান শেখাচ্ছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, নিজে গাইতে গাইতে। কিছুটা গেয়ে ছাত্রীরা চুপ করে গেলেন। একই গান দিনেন্দ্রনাথ যে অন্য সুরে শিখিয়েছেন। কিন্তু ‘গুরুদেব’কে সে কথা বলবে কে?
বলে দিলেন অমিতা।
শুনে রবীন্দ্রনাথ মজা করে বলেছিলেন, তাঁর পাঁঠা তিনি ল্যাজায় কাটেন কি মুড়োয় তাতে কার কী?
দিনেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে নিজের গানের সুরের ভাণ্ডারী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতেন ‘খুকু’র ওপরে। ২৬ জুলাই ১৯৩৫-এ তাঁকে লিখেছেন, ‘তোর চিঠি পড়ে মনে পড়ে গেল দিনু তার সকল ছাত্রের মধ্যে তোকেই সকলের চেয়ে স্নেহ করত— সেই স্নেহের দান তুই অজস্র পেয়েছিলি— তোর জীবনে তার সঞ্চয় ফুরোবে না। যা পেয়েছিস তা রক্ষা করার ভার এখন তোদেরই পরে রইল।’’
আর একটি শংসাপত্রে লিখেছেন, ‘‘আমার রচিত যত গান অমিতা তাঁহার  (দিনেন্দ্রনাথের) এবং আমার নিকট হইতে সংগ্রহ করিতে পারিয়াছে এমন দ্বিতীয় আর কেহ পারে নাই এ কথা নিশ্চিত বলা যায়। তাহার সাহায্যে আমার গানগুলি বহু পরিমাণে রক্ষা পাইবে ও বিস্তার লাভ করিবে এই আমার আশা ও আনন্দের বিষয় রহিল। বিস্মৃতি ও অনবধানতাবশত তাহার দ্বারা আমার গানগুলির বিশুদ্ধতা ক্রমশ নষ্ট হইবার আশঙ্কা নাই তাহারও যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।’’
রবীন্দ্রনাথের গানের দ্বিতীয় ভাণ্ডারী হয়েই সারা জীবন শান্তিনিকেতনেই কাটিয়ে দিতে চাননি অমিতা সেন।
গান ভাল লাগত তাঁর, কিন্তু নাচ আর অভিনয় ভাল লাগত না। সে কথা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জানতেন, গান খুকুর শুধু ‘কণ্ঠের কুশলতা’ নয়, ‘অন্তরের সম্পদ’। তাই বার বার তাঁকে, তাঁর অনিচ্ছা মেনে নিয়েই, গান গাওয়াতে চেয়েছেন।
২৭ নভেম্বর ১৯৩৫ এক ছোট্ট চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘গোটাতিনেক নতুন গান হয়েছে, বাকি সব পুরনো। তোকে কিছু সাজতে হবে না, কিন্তু গাইতে হবে। আশ্রমে আজকাল সুকণ্ঠের একান্ত অভাব।’’
কিন্তু অমিতা মেধাবী, উজ্জ্বল ছাত্রী। কলকাতায় উচ্চতর পড়াশোনা করে নানা ডিগ্রির পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেতে চান। রবীন্দ্রনাথ চিরকালই ঔপনিবেশিক ডিগ্রিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
প্রচ্ছন্ন এই টানাপড়েন বোঝা যায় অমিতাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ৬ জানুয়ারি ১৯৩৭-এর চিঠি পড়লে, ‘‘আমরা একটি নতুন গান-শিক্ষক পেয়েছি— গোপেশ্বরের ভাইপো (অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়)— বয়সে অত্যন্ত কাঁচা কিন্তু বিদ্যায় পাক ধরেচে। একবার কোনও ছুটিতে এসে তার গান বাজনা শুনলে হয়তো তোর লোভ হবে। পরীক্ষার প্রতি বীতরাগ হওয়াও অসম্ভব নয়।’
এ ডাকে তেমন সাড়া দেননি অমিতা। রবীন্দ্রনাথও হাল ছাড়েননি।
তার বছরখানেক পরে শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনার জন্য ডাক দিলেন, লিখলেন, ‘‘তোর শক্তি আছে, অনুরাগ আছে, এবং কণ্ঠ আছে। সেইজন্যে আমার এই কাজে তোকে পেতে অনেক দিন থেকে ইচ্ছা করেছি। ভয় ছিল তোর দুরাশা হয়তো অন্য কোনও পথে ধাবিত। যদি তা না হয় এবং যদি আমার প্রতি থাকে তোর ভক্তি এবং আশ্রমের প্রতি নিষ্ঠা, তবে অন্য কর্মজাল থেকে নিষ্কৃতি নিয়ে এখানে চলে আয়।’
নিষ্কৃতি অবশ্য পাননি অমিতা, চানওনি।
শম্ভুনাথ গঙ্গোপাধ্যায় নামে যে বন্ধুকে ভালবাসতেন তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরিশ্রম করতেন।
তার যখন যক্ষ্মা হল, চিকিৎসার জন্য বীণাপাণি পর্দা হাইস্কুলের সামান্য বেতনে খরচে কুলোত না। ঘর ভাড়া থেকে ওষুধ, পথ্য সব ব্যবস্থা করার জন্য অমিতা তখন বিক্রি করে দিলেন নিজের সব গয়না, এমনকী পরীক্ষায় ভাল ফল করে পাওয়া সোনার পদকগুলিও।
এক দিন বিকেলে বন্ধু শম্ভুনাথকে দেখতে গিয়ে দেখলেন ঘর তালাবন্ধ। বাড়িওয়ালা জানালেন, কোনও এক অধ্যাপকের মেয়ে তাঁর স্বাস্থ্য ফেরাতে তাঁকে নিয়ে গিয়েছে পাহাড়ে, অমিতা যেন বাড়িভাড়া মিটিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যান। অথচ এই শম্ভুনাথের জন্যই অমিতা  রবীন্দ্রনাথকে শর্ত দিয়েছিলেন, সেই বন্ধুটিকে বিশ্বভারতীতে চাকরি দিলে তবেই তাঁর প্রস্তাবে সায় দেবেন! রবীন্দ্রনাথ প্রাথমিক ভাবে রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটা সঙ্গত কারণেই ছেড়ে দিয়েছিলেন আশ্রমের কর্তৃপক্ষের হাতে।
আর তার পরেই চরম ছন্দপতন। সঙ্গীতভবনের কাজ ছেড়ে অমিতা ফিরে গিয়েছিলেন কলকাতায়।
ছুটি নিয়েই গিয়েছিলেন, কিন্তু আর শান্তিনিকেতনে ফেরেননি। দীর্ঘ এক চিঠিতে নিজের ক্ষোভ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। সে চিঠি অবশ্য পাওয়া যায় না।
তবে রবীন্দ্রনাথ তার উত্তরে যা লিখেছিলেন তা থেকেই অনুমান করা যায় সম্পর্কের অবনতি কত দূর হয়েছিল।
সেই চিঠিতে এত দিনের ‘তুই’ হয়ে উঠল ‘তুমি’। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, ‘‘তোমার সঙ্গে আমার এই শেষ ব্যবহার বলেই শরীরের ক্লান্তি এবং অস্বাস্থ্য সত্ত্বেও কিছু স্পষ্ট করে লিখতে বসেছি।’’
অমিতার চিঠির অভিযোগগুলি স্পষ্টত জানা যায় না, রবীন্দ্রনাথের জবাব থেকে অনুমান করা যায়। ‘রিহর্সলের অশুচিকর ও দুঃখকর আবেষ্টন’ আর সেই বন্ধুটিকে অধ্যাপনার কাজ না দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘তোমার অভিযোগগুলি বিশ্লেষণ করে দেখলে দুটি সংখ্যায় এসে দাঁড়ায়। ১ম রিহর্সলের অশুচিকর ও দুঃখকর আবেষ্টনে তোমাকে ক্লিষ্ট করা। এ সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষের কোনও আদেশ ছিল না। আমি বৌমাকে একাধিকবার জানিয়েছিলুম তুমি এতে সম্মত হবে না, কিন্তু যখন এতটা অবনতি স্বীকার করতে সম্মত হোলে দেখা গেল তখন সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলুম।...২য় তোমার বন্ধুকে আশ্রমে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত করবার জন্যে তুমি আমাকে অনুরোধ করেছিলে। আমি তদনুসারে আশ্রমের কর্তৃপক্ষদের কাছে আমার প্রস্তাব জানিয়েছিলুম। কাজ খালি ছিল না তবু তাঁরা সম্মত হয়েছিলেন। এটা নিয়ম, এতে মানী লোকের মানহানি হয় না। ভাইসরয়কে নিযুক্ত করবার সময়েও ক্যাবিনেটে আলোচনা হয়ে থাকে। ব্যাপারটাকে যদি অপরাধজনক মনে করে থাকো সে অপরাধ তোমার একলার।’’
২৭ মে ১৯৩৯-এর এই চিঠির তর্ক-বিতর্ক থেকে তখন একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছেন অমিতা।
এর ছ’মাসের মধ্যেই কঠিন অসুখে তখনকার কারমাইকেল, এখনকার আর জি কর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সেটাই তাঁর জীবনের শেষ বছর। এর মধ্যে ছটি-র মতো রেকর্ড তৈরি হয়েছে অমিতার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। কিন্তু প্রকাশিত হয়নি।
খোলা গলায় একদিন শান্তিনিকেতনের পথে গান গেয়ে বেড়াতে যে মেয়েটি, রবীন্দ্রনাথের অনেক গান প্রথম গলায় তুলে নেওয়ার জন্য ডাক পড়ত যাঁর, তাঁরই রেকর্ড আটকে রাখা হয়েছিল!
‘অন্য কর্মজাল থেকে নিষ্কৃতি নিয়ে’ পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের গানে নিজেকে নিবেদন করার ডাক অমিতাকে একদিন দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
সেই রবীন্দ্রনাথই ‘খুকু’র কাছ থেকে ‘নিষ্কৃতি’ চাইলেন এ বার। ‘খুকু’কে শেষ চিঠি লেখার মাসখানেক পরে ২৪ জুন ১৯৩৯ কিশোরীমোহন সাঁতরাকে লিখলেন, ‘‘খুকুর কথা তোমাকে বলিনি। তার সঙ্গে আমার একটি শেষ পত্র বিনিময় হয়েছে। তার দুর্বলতাকে ক্ষমা করতে পারি কিন্তু তার ছলনা আমার কাছে অতিশয় ঘৃণ্য হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। আমি তাকে স্নেহ করেছিলুম বলে তার স্বভাবের অসরলতা বুঝতে পারিনি। বৌমাকেও সে ভুলিয়েছিল। তিনিও বিস্মিত হয়েছেন। যাক্, নিষ্কৃতি পেয়েছি।’’
কিন্তু একটা কাঁটা, মনের মধ্যে, কোথাও কি ছিল? হয়তো।
‘নিষ্কৃতি’ নেওয়ার পরেও তো হাসপাতালের ঠিকানায় ‘খুকু’কে চিঠি লিখে তার সেরে ওঠা চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে ডেকে বলেছিলেন, ‘‘খুকু এই চকোলেট খেতে খুব ভালবাসত। ও তো এমনিও বাঁচবে না, তুমি নিজে গিয়ে ওকে এই চকোলেট খাইয়ো।’’
শুধু চকোলেট নয়, এত দিন আটকে রাখা রেকর্ডও ‘ক্ষমা’ করে মুক্ত করে দিলেন।
২৮ জানুয়ারি ১৯৪০ প্রফুল্লচন্দ্র মহলানবিশকে লিখলেন, ‘‘খুকু আজ কারমাইকেল হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়। তাকে আমি ক্ষমা করলুম। তার সেই ছয়টা রেকর্ড মুক্ত করে দিস।’’
তত দিনে ‘খুকু’ নিজেও বুঝে গিয়েছেন যে তিনি আর বাঁচবেন না। টিবি ভেবে ভুল চিকিৎসা চলছিল তাঁর, নেফ্রাইটিস যখন ধরা পড়ল তখন দেরি হয়ে গিয়েছে।
যে ঘরে জন্মেছিলেন সেই ঘরেই মৃত্যু হোক, চেয়েছিলেন অমিতা। সেইমতো নিয়ে যাওয়া হল ঢাকায়।
শেষ চেষ্টা হিসেবে শুরু করা হল কবিরাজি চিকিৎসা। কিন্তু কবিরাজমশাইও একদিন চরম নিদান দিলেন। সামনেই তখন তার ছাব্বিশ বছরের জন্মদিন।
জেঠিমা জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী খেতে ইচ্ছে করে খুকু?’
খুকু বলল, ‘‘দেবে আমায় খেতে—যা চাইব? আমার খেতে ইচ্ছে পোলাও, ডিমের ডালনা, মাছ এই সব।’’
শেষ জন্মদিনের দিন সাজিয়ে দেওয়া হল সব। কালো মেয়েটির পরনে তখন ঢাকাই শাড়ি, কপালে চন্দনের ফোঁটা...।
পরের দিনই কোমায় চলে গেলেন অমিতা সেন। ইতিহাস ঢেকে রাখল তাঁর নাম। কালো মেঘে, নাকি ‘রঙিন ছায়ার আচ্ছাদনে’?

ঋণ: অমিতা (সম্পাদনা ইলিনা সেন), বুলবুলি (পার্থ বসু), রবীন্দ্রবীক্ষা
(সংকলন ১৮)

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/an-write-up-on-amita-sen-1.391743

দিন কাটিয়েছেন কাঠের গুদামেও (On Narendranath Mitra)

$image.name

দিন কাটিয়েছেন কাঠের গুদামেও

পরিচয়ে তিনি গল্পকার। তাঁর কবিতাতেও মুগ্ধ ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। শতবর্ষে নরেন্দ্রনাথ মিত্র-র কথায় বিনোদ ঘোষাল

৪ জুন, ২০১৬, ০০:০০:০০
narendranath
ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের এক ছাপোষা কেরানি একবার বেজায় ফাঁসলেন।
অভিযোগ গুরুতর।
তিনি নাকি এক জাল চেক পাস করিয়ে দিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ মামলা ঠুকে দিল তার বিরুদ্ধে। সে বেচারার প্রাণান্তকর অবস্থা। সামান্য ক’টা টাকা তো মাইনে, সেই ফরিদপুর থেকে কলকাতায় এসে ছোট একফালি ঘরে ভাইকে নিয়ে ভাড়া থাকেন।
সে ঘর আবার প্রতি বর্ষাকালে এমন ভেসে যায় যে চৌকিতে বসেই খাওয়াদাওয়া সারতে হয়। তার মধ্যে এ কী বিপত্তি!
এইভাবে দিন চলে যার সে কি মামলার খরচ চালাতে পারে? হাজতবাস হয়-হয়, এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন দুই বন্ধু।
একজন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যজন সজনীকান্ত দাস।
বেজায় ছুটোছুটি করতে থাকলেন তাঁরা, তাঁদের নিপাট ভালমানুষ বন্ধুটিকে বাঁচাবেন বলে।
এদিকে মামলা লোয়ার কোর্ট থেকে গড়িয়ে সেসন কোর্টে। মামলা লড়ার টাকা আর নেই। প্রায় টানা এক বছর মামলা চলার পর হাইকোর্টের জজ মিস্টার ব্ল্যঙ্ক এক জব্বর রায় দিলেন। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে বেজায় ধমকে বললেন, ‘‘অভিযুক্ত একজন সাহিত্যিক মানুষ। উনি অন্য জগতে বিচরণ করেন। তাঁর তো ভুল হতেই পারে। আসল দোষ ব্যাঙ্কের। তারা অমন মানুষকে ওই কাজে নিলেন কেন?’’
এই রায়েই বেকসুর ছাড়া পেলেন অভিযুক্ত নরেন্দ্রনাথ মিত্র। ফিরে পেলেন চাকরি, তবে জয়েন করেই রেজিগনেশন।
আবার ওই কাজ! কক্ষনও না। না খেতে পেয়ে মরে গেলেও না।
রোজগারের ভাগ্য গোড়া থেকেই বেশ খারাপ।
১৯৩০ সালের মাঝামাঝির কথা। সেই সময় অনেক ছেলেই খরচ বাঁচানোর জন্য রেসিডেনশিয়াল টিউটর হিসেবে এদিক ওদিক থাকতেন। যে ছাত্র বা ছাত্রীকে দু’বেলা পড়াতে হবে সেই বাড়িতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।
নরেন্দ্রনাথও চেষ্টা করলেন তেমন কিছু একটা করার। কিন্তু স্বভাবে এমনই মুখচোরা যে ছাত্ররা কেউ কথাই শোনে না।
ফলে কোথাও আর ‘রেসিডেন্ট’ হয়ে ওঠা গেল না। একবার সুযোগ পেলেন এক জজসাহেবের বাড়িতে থেকে তার ছেলেকে পড়ানোর। সেই কাজটিও কয়েক দিন বাদে চলে গেল। সেই যাওয়ারও অভিযোগটি বেশ অদ্ভুত।
নরেন্দ্রনাথের পাশবালিশ নিয়ে শোওয়ার অভ্যাস জজ গিন্নির নাকি পছন্দ হয়নি। তাই, একমাত্র সেই কারণেই মাস্টার বিদায়। যে মাস্টার বালিশ জড়িয়ে ঘুমোয় সে নির্ঘাত আলসে, সে আবার পড়াবে কী?
সরকারি চাকরিও ছাড়তে হয়েছে শহরে বোম পড়ার ভয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। যুদ্ধের বাজারে অনেকেই চাকরি পেল। নরেন্দ্রনাথও পেলেন। ভাবলেন, এবার বুঝি অভাব মিটল।
অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে কাজ। ফ্যাক্টরিতে ব্যবহারের জন্য যেসব বালতি  আসত, সেগুলো ঠিকঠাক আছে কি না, তা টিপেটুপে চেক করতে হত। এই ছিল সারাদিনের কাজ। কিন্তু সেই চাকরিও কপালে সইল না।
কলকাতায় শুরু হল বোমা পড়া। অগত্যা তল্পিতল্পা আর মন খারাপ নিয়ে আবার দেশের বাড়ি।
পিতৃদেব মহেন্দ্রনাথ বললেন, ‘‘খবরদার! তোমাকে আর মাথায় বোম নিয়ে চাকরি করতে হবে না।’’
বরাবরই পল্টুকে (নরেন্দ্রনাথের ডাকনাম) নিয়ে চিন্তা ছিল মহেন্দ্রনাথের।
চিন্তা হওয়াই স্বভাবিক। নিজে ছিলেন বিশালদেহী সুপুরুষ, একা হাতে সব কাজ করে ফেলতে পারতেন। বিরাট সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল অনেক অল্প বয়েসে। পাকা সংসারী লোক।
অন্যদিকে নরেন্দ্রনাথ চেহারায়-কাজে বাবার পুরো বিপরীত। খাটো চেহারা, তায় মুখে টুঁ শব্দটি নেই। কাজকর্মেও একেবারে আনাড়ি। চাল কিনে আনতে বললে বাতাসা কিনে বাড়ি ফেরেন।

সঙ্গে স্ত্রী
আত্মকথায় নরেন্দ্রনাথ নিজেই লিখছেন, ‘‘আমি বাবার মতো হইনি, এ সম্বন্ধে ছেলেবেলা থেকেই আমি সচেতন ছিলাম। বাবা ছিলেন আটপিঠে মানুষ। দরকার হলে যেমন কোদাল কুড়ুল চালাতে পারতেন, তেমনি কলম চালাতেও তাঁর ক্লান্তি ছিল না। কিন্তু গাঁয়ের ছেলে হয়েও আমি না পারি গাছে উঠতে, না পারি নৌকা বাইতে। আরও এমন হাজার কাজ পারি না, যা আমার ছোটভাই পারে। যা আমার সমবয়েসিরা এমনকী কমবয়েসিরাও পারে। বাবা যেমন সামাজিক মানুষ, বলতে-কইতে ওস্তাদ। আমি ঠিক সেই পরিমাণে লাজুক, মুখচোরা, কুনো স্বভাবের। পিতৃদেব মাঝেমাঝেই হতাশ গলায় বলতেন, ‘পল্টুটা যে কোনও কাজই পারে না, ওর যে কী গতি হবে!’ সান্ত্বনা দিতেন ‘পল্টুর মা’। ‘পারবে দেখো ঠিক পারবে। চিরকাল কি আর এমনটি থাকবে আমাদের পল্টু’।’’
এই ‘পল্টুর মা’ কিন্তু নরেন্দ্রনাথের জন্মদাত্রী ছিলেন না। আপন মা গত হয়েছিলেন যখন নরেন্দ্রনাথের বয়স মোটে চার।
মহেন্দ্রনাথের দুই স্ত্রী। মা মারা যাওয়ার পর মহেন্দ্রনাথের প্রথম স্ত্রীর কাছে বড় হন নরেন্দ্রনাথ। ভাই ধীরেন্দ্রনাথেরও শৈশব কেটেছে তাঁরই কোলেপিঠে। জন্মদাত্রী মায়ের অভাব কোনও কালে টের পেতে দেননি ওদের ‘বড়মা’।
একই ঘরের মধ্যে দুই উঠতি সাহিত্যিক গল্প লিখছেন। ঘরে চেয়ার -টেবিলের কোনও বালাই নেই। দুজনেই যে যার তক্তপোশে।
একজন উপুড় হয়ে শুয়ে নিঃশব্দে কলম চালাচ্ছেন, আর অন্যজন বাবু হয়ে বসে সামনে টিনের বাক্স রেখে তার ওপর খাতা রেখে লিখছেন। উঁহু, তিনি নিঃশব্দে নয়, বরং যে লাইনটি লিখবেন তা বেশ শব্দ করে আগে আউড়ে নিচ্ছেন। তারপর লিখছেন।
প্রথমজন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর দ্বিতীয়জন নরেন্দ্রনাথ। কোনও কালেই নিঃশব্দে লিখতে পারতেন না নরেন্দ্রনাথ।
তখন শোভাবাজারের এক মেসে একটি ঘরে পাঁচজন। নরেন্দ্রনাথ, ভাই ধীরেন্দ্রনাথ, বন্ধু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর বাকি দুই বোর্ডার এক গেঞ্জিকলের শ্রমিক। মাথাপিছু মাসিক ভাড়া দুইটাকা।
কিছু দিন আগেই ভাইকে কলকাতার কলেজে পড়াবেন বলে নিয়ে এসেছেন। এদিকে নিজের আয় বলতে মাত্র দুটি টিউশনির টাকা। নিজেরই চলে না। কিন্তু তাই বলে ভাইকে কিছুতেই মফস্‌সল কলেজে বি এ পড়াবেন না।— ‘‘তুই চলে আয়, কলকাতার কলেজে পড়বি। দায়িত্ব আমার,’’ বলে ভাইকে ডেকে নিলেন।
মেসে খাওয়া-দাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। টানাটানির সংসারে পাইস হোটেলে দু’আনায় দুইবেলা ডিম ভাত খেয়ে দিনের পর দিন চলত। তবে নারায়ণ কিংবা নরেন্দ্র যারই গল্প লেখার টাকা যে দিন আসত, সেদিন এক এলাহি ব্যাপার। তিনজনে মিলে রূপবাণী রেস্টুরেন্টে ফাউল কাটলেট আর টকি শো হাউজে তিন আনার সিটে গ্যারি কুপারের ছবি।
তা ছাড়া মাঝেমাঝেই ওই মেসের ঘরেই বসত সাহিত্যের আসর। দুই লেখকেরই বন্ধুরা আসতেন। নীচের শ্যামসুন্দর কেবিন থেকে আসত এক পয়সা কাপের চা।
অনেক রাত অবধি চলত সাহিত্য নিয়ে ধুন্ধুমার চর্চা। তখন বেচারি ওই দু’জন গেঞ্জিকলের কর্মীর মুখগুলো শুধু দেখতে হয়। বেজার মুখে সরস্বতীর অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া উপায় কি!
গল্পলেখক হিসেবে অল্পস্বল্প নাম হতে শুরু করেছেম তখন। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম গল্প ‘মৃত্যু ও জীবন’ পড়ে দেশ-এর দফতর থেকে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় চিঠি লিখেছেন, ‘‘আপনার গল্প আমাদের ভাল লেগেছে। আপনি আরও গল্প পাঠান।’’
আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়-র সম্পাদক মন্মথনাথ সান্যালও প্রায় একই রকম চিঠি দিয়েছেন। উৎসাহে লিখে চলেছেন নরেন্দ্রনাথ।
ঠিক তখনই বাড়ি থেকে চাপ এল বিয়ে করতে হবে।
কান্নাকাটি অবস্থা নরেন্দ্রনাথের। কিছুতেই বিয়ে করবেন না। নিজেরই চলে না, বউকে খাওয়াবে কী?
কিন্তু শেষমেশ করতেই হল।
যদিও বউ রইল ফরিদপুরে দেশের বাড়িতে আর বর কলকাতায়। ভাইয়ের সঙ্গে।
কিন্তু সে আর কত দিন?
বউ শোভনাকে নিয়ে কলকাতায় আসতেই হল একসময়। দুই ছেলেও হল তার পর। আর চলতে লাগল একের পর এক বাসা বদল।
ছোটভাই ধীরেন্দ্রনাথও বিয়ে করে সস্ত্রীক দাদার সঙ্গে থাকে। কখনও বস্তিতে টালির ঘর, তো কখনও দেড়খানা কোঠা ঘরে, সবাই মিলে।
সে ঘর আবার এমন ছোট যে, ছোট একটা খাট পাতলেও, একটা চেয়ার রাখারও জায়গা নেই।
একবার কিছু দিনের জন্য নিমতলার কাঠগুদামের কাঠের ঘরেও থাকতে হয়েছে। এমন দিনও গেছে, সকাল বিকেল দুইবেলা চাকরি করতে হয়েছে সংসারের খরচ মেটাতে।
তার মধ্যেও লেখা কিন্তু থামাননি।
‘রস’ গল্পটি যখন লিখছেন তখন থাকতেন ব্রজদুলাল স্ট্রিটের একটি ঘরে। বর্ষাকালে সেই ঘরে এক হাঁটু জল। ওই থই থই ঘর ভর্তি নোংরা জলে তক্তপোশের ওপর বসে লিখেছেন একের পর এক কালজয়ী লেখা।
‘তোমাকে বাসি ভাল একথা ক্ষণে ক্ষণে/ বলিব তোমা ভাবি সদাই মনে মনে/ বলিতে যবে যাই কথা না খুঁজে পাই/ হতাশ হয়ে ফিরি আপন গৃহকোণে’। ‘মূক’ নামের মোট ষোলো লাইনের এই কবিতাটি প্রকাশ পেল আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে দেশ পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায়।
কবির নাম নরেন্দ্রনাথ মিত্র।
হ্যাঁ, কাহিনিকার নরেন্দ্রনাথের এত তো পাঠক, কিন্তু ক’জনই জানেন তাঁর কবিতার কথা? অথচ প্রায় টানা কুড়ি বছর ধরে কবিতা লিখেছেন তিনি।
‘নিরিবিলি’ নামে নিজের লেখা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন। আর সেই বইয়ের আলোচনা লিখলেন স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু।
‘কবিতা’ পত্রিকায় কী লিখলেন বুদ্ধদেব?
‘‘শ্রী নরেন্দ্রনাথ মিত্রের পাঠক সংখ্যা আজ বিপুল, কিন্তু এ-বইখানা পড়ে (বা দেখে) আজকের দিনে কম পাঠকেরই সন্দেহ হবে যে এর প্রণেতা ও তঁদের প্রিয় কথাশিল্পী একই ব্যক্তি।’’
প্রথম থেকেই নরেন্দ্রনাথকে কবিতা লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন বুদ্ধদেব বসু। কবিতা পত্রিকায় অনেক কবিতা ছাপিয়েছিলেন তিনি।
শুধু তাই নয়, নরেন্দ্রনাথ কেন কবি না হয়ে গদ্যশিল্পী হলেন তাই নিয়ে তাঁর বেজায় আফসোসও গোপন করেননি।
না, আর কোনও কবিতার বই প্রকাশ করেননি নরেন্দ্রনাথ। কিন্তু নিজেই বলতেন, ‘‘কবিতার মধ্যে যে ভাবে নিজের ব্যক্তিসত্তাকে ঢেলে দেওয়া যায়, তেমন আর কোনও রচনায় যায় না।’’
‘সুইজারল্যান্ড’ কবিতায় মাত্র ছয় লাইনে নিজের জীবনকে লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘‘মেসের একতলা স্যাঁতসেতে ঘর/ জীর্ণ তক্তপোশে সহস্র ছারপোকা/ বাতাসে নর্দমার ঘ্রাণ।/ উবু হয়ে বসে দেখি এক পয়সার মুড়ির ঠোঙাতে/ ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ড।’’
স্ত্রী শোভনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। সব কথা ভাগ করে নিতেন তাঁর সঙ্গে। মেয়েদের সেজে গুজে থাকাটা খুব পছন্দের ছিল নরেন্দ্রনাথের। মাঝেমাঝেই স্ত্রীর জন্য নিয়ে আসতেন খোঁপায় বাঁধার জন্য ফুল, ফুলের মালা।
একবার হল কী, বেশ কিছু দিন ধরে কোনও লেখা আসছে না। রাইটার্স ব্লক হলে যা হয়! ভীষণ ভীষণ মন খারাপ। স্ত্রীকে ডাকলেন।
‘‘শোভনা আমি আর লিখতে পারছি না।’’
‘‘পারবে ঠিক পারবে।’’
তাই-ই হল। একদিন সত্যিসত্যিই আবার লেখা ফিরে এল। লিখতে শুরু করে শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠলেন নরেন্দ্রনাথ।
স্ত্রীকে সব কথা বলা চাই। মাঝেমাঝেই লেখার টেবিলের কাছে শোভনাকে ডেকে নিয়ে বলতেন, ‘‘এই দেখো সত্যি সত্যি একটা উপন্যাসের ছক গেঁথেছি। লিখতে খুব ভাল লাগছে, জানো। বলা যায় না হয়তো এটা একটা গ্রেট উপন্যাস হয়ে যেতে পারে।’’
এমন জোর দিয়ে লেখার বিষয় আগে কোনও দিন শোনেননি শোভনা।
ভারী খুশি হয়ে বলেন, ‘‘বেশ তো! তাহলে লেখো না। এবার বরং পুজোর লেখা বন্ধ রেখে এই উপন্যাসটিই শেষ করো।’’
তাই শুনে হাঁ হাঁ করে উঠলেন নরেন্দ্রনাথ, ‘‘বলো কী! পুজোর লেখা লিখব না, তাই কখনও হয়! পুজোর লেখার আনন্দই যে আলাদা। তোমরা যেমন পুজোয় নতুন জামাকাপড় পরে ,অন্যকে দিয়ে আনন্দ পাও, আমরা লেখকরা তেমনি পুজোয় নতুন লেখা পাঠকদের দিয়ে আনন্দ পাই।’’
আরেকদিন বললেন, ‘‘শোভনা, আমার আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছে করছে। বেশ মোটা করে একটা নিজের কথা লেখার ইচ্ছে,’’ বলেই মুচকি হেসে আবার বললেন, ‘‘না না মন খারাপ কোরো না। ওতে তুমিও থাকবে অনেকটা জুড়ে।’’
শোভনাও পালটা উত্তর দিলেন, ‘‘নিজেই লিখবে? আমার তো ইচ্ছে ছিল তোমাকে নিয়ে একটা মস্ত লেখা লিখব। তোমার যা অদ্ভুত স্বভাব। জমিয়ে লিখতে পারলে পাঠকরা খুব মজা পাবে।’’
‘‘বেশ তো তাহলে লিখো। তবে শুধু ত্রুটির কথাই লিখো না। একটু বানিয়ে বানিয়েই না হয় নিজের স্বামীর গুণের কথাও লিখো।’’
তারপর দুজনের সে কী হাসি!
আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেওয়ার পরে অভাব আর অনিশ্চিত জীবন শেষ হল।
পাইকপাড়ায় চলে এলেন সপরিবার। জীবনে অনেক জায়গায় বহু কষ্টে কাটিয়েছেন, তাই বুঝি শখ হল নিজের একটা বাড়ি বানাবার।
পাবলিশার্সদের কাছ থেকে টাকা ধার করে জমি কিনলেন মেন রাস্তার ওপর।
তারপর দোতলা বাড়ি করলেন। তিনতলা করারও শখ হল। ভাই বললেন, ‘‘কী হবে দাদা তিনতলা করে?’’
‘‘থাক না। রিটায়ার করবার পর না হয় ভাড়া দিয়ে দেব।’’
আসলে হয়তো মনের কথা অন্য ছিল। কখনও খুপচি বস্তি, কিংবা মেসের একচিলতে ঘরে দিনের পর দিন কাটানোর যন্ত্রণা ভুলতে চেয়েছিলেন প্রয়োজনের বেশি ঘর করে।
তিনতলার কাঠামোও শুরু হল। হেড রাজমিস্ত্রিকে ডেকে বললেন, ‘‘জয়নুল, আমার কাজটা ভাল করে কোরো তাহলে তোমায় নিয়ে ভাল গল্প লিখব। আমার গল্পের মধ্যে তুমি বেঁচে থাকবে।’’
মাথায় শুধু চিন্তা ঘুরপাক খেত রিটায়ারমেন্টের পর কী করব? কীভাবে চলবে?
তাই কখনও পাড়ায় লাইব্রেরি তৈরির জন্য মাতেন, তো কখনও তিনতলা তৈরির কথা ভাবেন, আবার কখনও আত্মজীবনী লেখার ভাবনা চেপে বসত মাথায়।
ভাইকে ডেকে বললেন, ‘‘বুঝলি আজকাল লেখার স্পিড বড় কমে গেছে। লিখতে কষ্ট হয়। কিন্তু না লিখেও তো থাকতে পারি না। আর দু’বছর পর রিটায়ার করব। পাড়ার লাইব্রেরিটা যদি দাঁড় করাতে পারি তাহলে একটু বসার জায়গা হবে আর কী!’’
আবার কখনও বলে উঠতেন, ‘‘ছেলেরা বড় হল, নাতিনাতনিও দেখলাম। এবার চলে গেলেই হয়।’’
ভাই বুঝতেন, এ’কথা দাদার মনের কথা নয়, কারণ ক’দিন আগেই তো দিস্তা দিস্তা সাদা কাগজ আনিয়েছেন মস্ত এক উপন্যাস লিখবেন বলে।
তারপর রোজের মতো সেদিনও সকাল হয়েছে। পুজোর লেখা চলছে পুরোদমে। সকালে একটি গল্প শেষ করে অফিস গেলেন নরেন্দ্রনাথ।
বিকেলের দিকে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলেন। কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু চিরকালের মুখচোরা যে! কাউকে কিছুই বললেন না।
বাড়িতে গানের আসর বসেছে। অনেক বন্ধুবান্ধব। আড্ডা। সকলের সঙ্গে বসে খেলেনও। কিন্তু অস্বস্তিটা যাচ্ছে না।
এই করতে করতে মাঝরাত।
কষ্টটা বাড়ছে.. বাড়ছে...
চেনা জানা কেউ মারা গেলে আফসোস করে নরেন্দ্রনাথ বলতেন, ‘‘জীবন এইরকমই। চলতে চলতে হঠাৎ কখন থেমে যায়। সবকিছু অসমাপ্ত পড়ে থাকে।’’
১৪ সেপ্টেম্বর সেই গভীর রাত। সত্যি সত্যিই হঠাৎ করেই থেমে গেলেন নরেন্দ্রনাথ। 
পড়ে রইল তাঁর অধরা আত্মজীবনী!

ঋণ: প্রসঙ্গ নরেন্দ্রনাথ মিত্র, ভাঙা আবহমান- নরেন্দ্রনাথ মিত্র সংখ্যা, রবি-রসের বশে, অভিজিৎ মিত্র, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমি, কলকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/a-special-write-up-on-narendranath-mitra-1.402420

আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শোনো (On Nachiketa Ghosh)

আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শোনো

ডাক্তারি পাশ করলেও গানই ছিল প্রাণ। তাঁর মেজাজি মন ছাড় দেয়নি উত্তমকুমার থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেও! তিনি নচিকেতা ঘোষ। বাবার বহু অকথিত কাহিনি বললেন পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ। শুনলেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

২৫ জুন, ২০১৬, ০০:০০:০০
Nachiketa Ghosh
ফরিয়াদ’ ছায়াছবির গান শোনাতে নচিকেতা ঘোষ গিয়েছেন সুচিত্রা সেনের বাড়ি।
মন দিয়ে গান শুনলেন মহানায়িকা।
শেষে বললেন, ‘‘শুনুন, গানের মাঝে হাসিটা কিন্তু আমি নিজে হাসব। আপনার আশা ভোঁসলে নয়। আমি রেকর্ড করে দেব। আপনি নিয়ে যাবেন।’’
ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন নচিকেতা।
দিন কয়েক পর।
মুম্বই। আশা ভোঁসলের বাড়ি।
হাজির নচিকেতা ঘোষ।
সব শুনে আশাজি বললেন, ‘‘ইয়ে সুচিত্রা সেন নে হাসকে দিয়া, ইসসে আচ্ছা হাসি আউর হোগাই নেহি। শুনাইয়ে সুচিত্রা সেন কা রেকর্ড। দেখুঙ্গি ক্যয়া হ্যায় উসকি হাসি মে, জো মেরা নেহি হ্যায়!’’
এ রকমটাই চাইছিলেন বাবা।
মনে করতেন, শিল্পীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে, ধাক্কা দিতে পারলে সেরা কাজটা বেরিয়ে আসে।
মহাজাতি সদনের সেই অনুষ্ঠান
পুলককাকু (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়), গৌরীকাকুকে (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার) কত বার লড়িয়ে দিয়েছেন! একজনের গানের লাইন আরেক জনের কথায় মিলিয়ে দিয়েছেন। তার থেকে দুর্ধর্ষ সব হিট গান তৈরি হয়েছে।
বাবা নিজেও মুখড়া লিখে দিয়েছেন কত সময়!— ‘যদি কাগজে লেখো নাম’, ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’, ‘মুকুটটা তো পড়েই আছে’, ‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’...।
এই মুখড়া লেখা, লাইন জোড়ার খেলা নিয়ে এমন সব উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হত যে, বাড়িতে গৌরীকাকু, পুলককাকু একসঙ্গে থাকলে দু’জনে দু’ঘরে বসতেন।
গান তৈরির বেলায় বাবা থাকতেন একেবারে নির্দয়। অসম্ভব মেজাজি। আর অদ্ভুত, সকলেই ওঁর এই মেজাজটাকে মেনে নিতেন। বা মানিয়ে নিতেন। এতটাই শ্রদ্ধা ছিল প্রত্যেকের।
‘ফরিয়াদ’-এর কথায় ফিরি।
সেই গান ‘নাচ আছে গান আছে’। সুচিত্রা সেন যে গানে অমন মন্তব্য করেছিলেন।
রেকর্ডিং-এর সময় গাইতে গাইতে আশাজি হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললেন...‘আমি হাসি শুধু হাসি...আমার লাগে না ব্যথা লাগে না...’।
কলকাতায় ফিরতে রেকর্ডিং শুনলেন সুচিত্রা সেন। স্তব্ধ। মুগ্ধ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘‘এ যাত্রায় আমার হাসিটা বাদ থাক।’’
বাবার কাজের ধাঁচটাই ছিল এ রকম। সেরাটা বের করে আনার তরিকাটাই ছিল ওঁর একদম আলাদা।
‘ইন্দ‌্রাণী’ ছবির গান তৈরি হচ্ছে।
বাবা হেমন্তকাকুকে নিয়ে মুম্বইতে। গীতা দত্তকে সঙ্গে নিয়ে হেমন্তকাকু ডুয়েট গাইবেন ‘সূর্য ডোবার পালা’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’।
রেকর্ডিং-এর দিন আমার মনে আছে স্টুডিয়োতে রাজকপূর ছিলেন, বাবা রেকর্ডিং করাচ্ছেন শুনে ফ্লোরে এসেছিলেন। টান টান উত্তেজনা। অ্যারেঞ্জার লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল।
হল রেকর্ডিং। পরে বাবা বলেছিলেন, সে দিন হেমন্তকাকু আর গীতা দত্তর গলা যে ভাবে বেজেছিল, আর কোনও দিন নাকি ও ভাবে বাজেনি!
‘ইন্দ্রাণী’র কাজ করতে করতে হঠাৎই মাঝপথে বাবা ছবির পরিচালক নীরেন লাহিড়িকে বলে বসলেন, ‘‘এই ছবিতে আমি একটা হিন্দি গান রাখব। আর সেটা গাওয়াব মহম্মদ রফিকে দিয়ে।’’
শুনে পরিচালক-প্রযোজক সবারই তো মাথায় হত। বাংলা ছবিতে মহম্মদ রফি গাইবেন! রাজি হবেন? আর হলেও বা, কত টাকা চাইবেন, সে টাকা জোগাড় হবে কোত্থেকে? ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না ওঁরা।
যে যাই ভাবুক, সকলে কিন্তু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত, নচিকেতা ঘোষ গানের জন্য যা ঠিক করবেন, আদায় করেই ছাড়বেন।
ভরসা সেই হেমন্তকাকু। উনিই রফির বাড়ি নিয়ে গেলেন বাবাকে। ‘সবি কুছ লুটাকার হুয়ে হাম তুমহারে’— গান শুনে মহম্মদ রফি তো প্রায় পাগল হয়ে গেলেন, ‘‘ক্যয়া ধুন বানায়া আপনে! ইতনা মিঠা...!’’
তক্ষুনি রেকর্ডিং-এ রাজি উনি।
এ দিকে প্রযোজকের কথামতো বাবা তখন ওঁকে বললেন, ‘‘ওঁরা কিন্তু আপনাকে পাঁচশো টাকার বেশি দিতে পারবেন না।’’
‘‘পাঁচশো টাকায় রেকর্ডিং!’’ চমকে উঠলেন রফি।
রফির আঁতকে ওঠা দেখে বাবা উঠে পড়লেন। এর পর কী যে মনে হয়েছিল রফিসাবের! দরজার দিকে চলে যাচ্ছেন বাবা, অমন সময় পিছু ডাকলেন তিনি। বললেন, ‘‘ছাড়ুন, ছাড়ুন। ও সব কথা ছাড়ুন। আপনার জন্য এ গানটা আমি বিনা পয়সায় গেয়ে দেব।’’
এই হলেন নচিকেতা ঘোষ। মনে মনে হয়তো জানতেন, তাঁর গান এক বার শুনলে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন না!
অথচ অমন নিয়মনিষ্ঠ, একরোখা বাবা, এক এক সময় গানের ব্যাপারে এতটা উদাসী হয়ে যেতেন, কী বলব!
হেমন্তকাকু ছিলেন বলতে গেলে আমাদের পরিবারেরই একজন। কত  বার হয়েছে, বাবা কাজে যাবেন মুম্বই। স্কুল ছুটি বলে আমিও জুড়ে গেলাম সঙ্গে। বাবা কাজ সেরে ফিরে গেলেন। আমি রইলাম হেমন্তকাকুর কাছে। ফেরার সময় বাবা খালি বলে যেতেন, ‘‘সাত দিন রেখে ওকে পাঠিয়ে দেবেন।’’
এতটাই কাছের ছিল সম্পর্কটা।
লতা মঙ্গেশকরের পাশে
সেই হেমন্তকাকুই হয়তো হঠাৎ বলেছেন, ‘‘নচিবাবু, আপনার একটা গান দিন না!’’
দিয়ে দিলেন বাবা।
‘হাম ভি ইনসান’ ছবিতে আজও যদি কেউ গীতা দত্ত আর সুমন কল্যাণপুরের ডুয়েট ‘ফুলওয়া’ শোনেন, দেখবেন মনে হবে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘলা ভাঙা রোদ উঠেছে’ গানটাই যেন হুবহু হিন্দিতে বাজছে। লোকে ভাবেন বুঝি গানটা চুরি হয়ে গিয়েছিল।
ঘটনা তা কিন্তু নয়।
তখন এ ভাবে বাবা ওঁর বহু গান দিয়ে দিয়েছেন। যেমন ধরুন, ‘অসমাপ্ত’ ছবিতে গাওয়া হেমন্তকাকুর গান ‘কান্দ ক্যানে মন রে’। এটা মরাঠি ভাষায় যখন হয়, তখন হেমন্তকাকু-লতাজি ডুয়েট গাইলেন। বলা হল সুর লতাজির। আসলে কিন্তু সুরটা বাবার। বাবা এ সব নিয়ে কোনও দিন মাথাই ঘামাননি।
লতাজিও তো এক রকম আমাদের পরিবারেরই হয়ে গিয়েছিলেন। বাড়িতেও এসেছেন। এক বার মনে পড়ে, হেমন্তকাকুর সঙ্গে রিহার্স করছেন। হঠাৎ কী মনে করে ব্যাগ থেকে সদ্য কেনা ক্যামেরাটা বার করলেন। ভারতে তখন প্রথম অটো-শাটার ক্যামেরা এসেছে। ওটা ছিল তাই-ই। তা দিয়ে শিশুর মতো ছবি তুলে ফেললেন বেশ কয়েকটা।
লতাজি অসম্ভব ভালবাসতেন বাবাকে। এত যে গুণী মানুষের ভালবাসা, শ্রদ্ধা পেয়েছেন বাবা, গান তৈরির ক্ষেত্রে কিন্তু কাউকে রেওয়াত করতেন না। এ সব ব্যাপারে বাবার মতো এত ঠোঁটকাটা মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি।
মান্নাকাকু তো এক বার আমায় বলেই ফেলেছিলেন, ‘‘শোনো খোকা (আমার ডাকনাম), আর যাই হোক, বাবার মতো মুখটা যেন তোমার না হয়, দেখো।’’
বাবার মেজাজের সাক্ষী থেকেছেন খোদ উত্তমকুমারও।
‘নিশিপদ্ম’ ছবির কথা মনে পড়ছে। ‘না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না’-র পিকচারাইজেশন। উত্তমকাকুর ওপর রেগেমেগে সেটই ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বাবা।
ঘটনাটা বলি।তার আগে বলে রাখি, গানে বা ছবিতে ওই যে নটবর চরিত্রটা, ওটা কিন্তু বাবারই তৈরি। ঢুলুকাকুর (পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়) সঙ্গেও বাবার তো খুব দহরম-মহরম ছিল। তো, বাবারই আবদারে ছবিতে নটবরের চরিত্রটা আনেন ঢুলুকাকু।
পিকচারাইজেশন হবে। সে দিন আবার উত্তমকাকুর মুড ভাল নেই। ফ্লোরে এসে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘‘ঢুলুদা, নচির গান, ওকে ডাকুন। ও না থাকলে হবে না।’’
খবর পেয়ে বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির। ইন্ডাস্ট্রিতে বাবা আর উত্তমকাকু প্রায় সমসাময়িক। ওঁদের দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল তুইতোকারির। ফ্লোরে পৌঁছে বাবা আগে চলে গেলেন উত্তমকাকুর কাছে। —‘‘অ্যাই, আজ কী পাঠিয়েছে রে সুপ্রিয়া? দে খাই।’’
প্রচণ্ড খেতে ভালবাসতেন বাবা। সন্ধ্যাপিসি (মুখোপাধ্যায়) উৎপলাপিসিকে (সেন) প্রায়ই ফোন করে বলতেন, ‘‘শোন, চা আর টোস্ট বানা তো, আসছি আমি।’’ বাড়িতে হয়তো গান তোলার জন্যই এসেছেন, আগে চলে যেতেন ঠাকুমার হেঁশেলে। শুরু করে দিতেন, ‘শুক্তুনিতে কী ছ্যাঁকা দিচ্ছ গো?’ ‘বড়ির ঝালে কীসের ফোড়ন?’
তো, সে দিন সুপ্রিয়াকাকিমার হাতের রান্না খেয়েই কাজ শুরু। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজছে। সেতারে খ্যামটার সুর। সেই মোক্ষম সময়টাতেই  তালটা কেটে গেল!
উত্তমকাকু বললেন, ‘‘আমি এখানে শুয়ে শুয়ে লিপ দেব।’’
শুনে বাবা প্রচণ্ড খেপে গেলেন। মুখের ওপর বলে দিলেন, ‘‘ব্যাকগ্রাউন্ডে সুর বাজছে। সামনে নটবর। আর তুই শুয়ে লিপ দিবি? তা হলে আর আমায় ডাকলি কেন? আমি চল্লুম।’’
কথাটুকু বলেই ছিটকে বেরিয়ে গেলেন বাবা। উত্তমকাকু ততক্ষণে বুঝে গেছেন, একটা ভুল হয়ে গেল!
সাততাড়াতাড়ি লোক পাঠিয়ে ডেকে আনা হল বাবাকে। বাবাকে ফিরতে দেখেই উত্তমকাকু আর দেরি করলেন না। নটবরকে দেখিয়ে খ্যামটা নাচতে শুরু করে দিলেন।
ভালবাসা তো ছিলই, উত্তমকাকুর সঙ্গে বাবার এ রকম রাগারাগি, খুনসুটি প্রায়ই চলত। তার মধ্যেই বাবা এক বার উত্তমকাকু আর সুপ্রিয়াকাকিমাকে দিয়ে গান গাওয়ালেন। উত্তমকাকুর গাওয়া এক মাত্র রেকর্ডেড গান। —‘এই মনজোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি’।
আমাদের বাড়িতেই বাবা গানটা শিখিয়েছিলেন ওঁদের। উত্তমকাকু গাইছেন। সঙ্গে সুপ্রিয়াকাকিমা একটা-একটা করে লাইন... কী যে সব মুহূর্ত! উদ্দেশ্য ছিল, মহাজাতি সদনে মেয়র গোবিন্দ দে’র একটা ফান্ড রিলিজ অনুষ্ঠানে ওঁদের দু’জনকে দিয়ে গানটা গাওয়ানোর।
আমার বাবাকে লোকে বলত গম্ভীর। কিন্তু সেটা ছিল আপাতভাবে। প্রথম আলাপে সকলেই ভয় পেত ওঁকে। কিন্তু সেই খোলসটার ভিতরে অদ্ভুত একটা নরম মন ছিল বাবার।
বাবাকে সবচেয়ে ভাল চেনা বা ছোঁওয়া যেত বাবার গানে। আজ মনে হয়, সে দিনের সেই খ্যামটা গানের মধ্যেও বোধ হয় বাবা বলে দিয়েছিলেন ওঁর জীবনের মূল সুরটা— ‘আমার মনটা যদি সিরাজ সাজে, ভাগ্য মিরজাফর’।
বাংলায় দারুণ সব হিট গানের পর হঠাই বাবার জেদ চাপল মুম্বই যাবেন।
কিন্তু মুম্বইয়ের গিয়ে বাবা ওখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি-মানসিকতার সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারলেন না। ফিরে আসেন।
এমন না-মানিয়ে নেওয়া গল্প হয়তো অনেক। একটা বলি। 
মুম্বইতে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবির গান। মান্নাকাকু গাইবেন। সঙ্গে আশাজি। তারিখ-টারিখ সব ঠিক। অ্যারেঞ্জার ছিলেন সুমিত মিত্র। তিনি আবার লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের সহকারী। ওই দিন কিছুতেই ওঁরা সুমিতকে ছাড়লেন না। এমনকী স্টুডিয়োটার ‘ডেট’টাও প্রায় আটকে দেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। ওঁরা বাবাকে বললেন, ‘‘আপনি অন্য একটা ডেট নিন। ও দিন না হয় সুমিতকেও ছেড়ে দেব।’’
এ কথায় ভয়ঙ্কর রেগে গেলেন বাবা। বলে দিলেন, ‘‘শুনুন, গান হবে না তো হবে না। স্টুডিয়োতে তেমন হলে ফুটবল খেলব। কিন্তু এই ডেটটা আপনি পাবেন না।’’
শেষে আশাজি সব শুনে বললেন, ‘‘ঘোষদাদা, ইয়ে সব বদমাসি হ্যায়। আপ কিজিয়ে আপনা কাম। ম্যায় আপকা সাথ হুঁ।’’
নতুন তিনটে গান লেখাই ছিল। মিউজিশিয়ান ডেকে নোটেশন করলেন বাবা। গান রেকর্ড হয়ে গেল। সেই সুমিত মিত্রকে ছাড়াই।
মান্নাকাকু তো ঘরের লোক। ওঁকে অনেক দেখেছি। চিনেছি। কিন্তু সে দিন দেখেছিলাম আশা ভোঁসলেকে— অত অল্প সময়, অত ভাল কাজ করে পেশাদারিত্ব কাকে বলে উনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন। 
তবে এমন অবস্থা বারবার সামলে বাবার পক্ষে কাজ করা ওখানে সম্ভব ছিল না। ফিরেও এসেছিলেন তাই।
আমার স্পষ্টবক্তা মেজাজি বাবার আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে।
গানটা ছিল ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললাম...’। এইচএমভি স্টুডিয়ো। দমদম। হেমন্তকাকু বারবার রেকর্ড করে চলেছেন। বাবার কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না।
হঠাৎ সবার সামনে বাবা গম্ভীর মুখে কাকুকে বলে দিলেন, ‘‘একটু দরদ দিয়ে গাইলে গানটা হিট হবে।’’
উত্তরে হেমন্তকাকু কিন্তু একটা কথাও বললেন না। এমনকী এই ঘটনার পর দু’জনের সম্পর্কও এতটুকু টাল খায়নি। যেমন বন্ধু ছিলেন, তেমনই থেকে গিয়েছিলেন ওঁরা। গানের সময় কে বন্ধু, কে কার আপন— মনেই রাখতেন না বাবা। অন্যরাও এ কথা বুঝতেন। আর বাবাও জানতেন, কাকে কী বললে কাজ হবে। গানটাও হিট হবে।
তবে বাবার কি কোনও পক্ষপাতিত্ব ছিল?
যেমন ধরুন, সত্তর দশকের শেষাশেষি বাবার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ উঠত প্রায়ই। বাবা সব গানই মান্না দে-কে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন। কিশোরকুমারকে দিয়ে নয় কেন?
উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে অনুপকুমার, সবার ঠোঁটেই তখন মান্না দে’র গান তুলে দিচ্ছেন বাবা।
এ কথায় ফিরব, তার আগে একটা ঘটনা বলে নিই।
রাগ করতেন। মুখের ওপর কড়া কড়া কথা বলে দিতেন। কিন্তু বহু গুণিজনকে দেখেছি, সব কিছুর ওপরে বাবাকে ওঁরা মনে রেখেছেন, বাবার বিশেষ কিছু গুণের জন্য।
সঞ্জীবকুমারের কথাই যেমন।
স্বয়ংসিদ্ধা-র রিমেক। কথা ছিল ছবিতে অভিনয় করবেন সঞ্জীবকুমার। মুম্বইতে গেলাম আমরা। ছবির চিত্রনাট্যকার রানাসাহেব আর আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করলাম শ্যুটিং-এর মাঝেই। লীনা চন্দ্রভরকারের সঙ্গে শ্যুট করছেন। শ্যুটের ফাঁকেই কথা হল।
আমি নচিকেতা ঘোষের ছেলে শুনে উনি যে ভাবে ‘রি-অ্যাক্ট’ করেছিলেন, কোনও দিন ভুলব না। বলেছিলেন, ‘‘আমি দুটো কারণে নচিকেতা ঘোষকে কোনও দিন ভুলতে পারব না। ফিল্মালয়-তে ওঁর সঙ্গে আমি রুম শেয়ার করেছি। কী যে সব মিঠে সুর তৈরি করতেন! আর একটা ব্যাপারও খুব মনে পড়ে, প্রচুর বাঙালি খাবার খাওয়াতেন।’’
শেষ পর্যন্ত ‘ডেট’ পাওয়া গেল না বলে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য় সঞ্জীবকুমারকে দিয়ে অভিনয় করানো যায়নি। কিন্তু বাবাকে নিয়ে ওঁর উচ্ছ্বাসভরা কথাগুলো আমার কানে আজও বাজে।
ফিরছি কিশোরকুমার প্রসঙ্গে।
সঞ্জীবকুমার তো হল না। রানাসাহেব নতুন আব্দার করে বসলেন। রঞ্জিত মল্লিকের মুখে ‘কিচিমিচি কিচিমিচি’ গানটা কিশোরকুমারকে দিয়ে গাওয়াতে হবে।
বাবা ফোন করতেই কিশোরকুমারের গলা, ‘‘আরে, নচিদা, তুমি তো আমায় ভুলেই গেছ! ঠিক আছে, আমি ইকবালকে পাঠাচ্ছি।’’
ইকবালকে পাঠাচ্ছি মানে? ইকবাল কে? তিনি তো কিশোরদার ড্রাইভার!
বাবা তো ভয়ানক চটে গেলেন। গানের কথা বলতে ড্রাইভার পাঠানো— এর মানে কী?
কিশোরকুমারের রেকর্ডিং-এ
ইকবাল আসতে ওঁর কথাতে সব পরিষ্কার হল। টাকার যে অঙ্ক ইকবাল জানালেন তাতে বাবা রাজি হলেন না।
এই ঘটনার পর বাবা মান্নাকাকুকে দিয়ে গানটা গাওয়ালেন। ‘কিচিমিচি’ সুপারহিট হল। এ রকম কিছু ঘটনার সময়ই বুঝতাম বাবার কাছে গানটাই ছিল আসল। আর্টিস্ট নয়। তবে কিশোরকুমারের সঙ্গে যে এ রকম হল, তাতে কি বাবার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক চলে গিয়েছিল? একেবারেই না।
‘শেষ থেকে শুরু’ ছবির গান ‘বলো হরি হরি বোল’, বাবা কিশোরদাকে দিয়েই গাওয়ালেন।
সেও এক গল্প বটে!
কিশোরদার বাড়ি গিয়ে প্রথমেই ওঁকে এক তাড়া নতুন নোট দিলেন বাবা। নতুন নোট কিশোরকুমারের ভীষণ পছন্দের। এক গুচ্ছ অমন নোট পেয়ে উনি তো বেজায় খুশি। প্রাণভরে গন্ধ নিলেন নোটের। তার পর বললেন, ‘‘মা, নচিদা এসেছে, লুচি পাঠাও। জমিয়ে খাওয়া হবে।’’
বাবা শুনে আঁতকে উঠলেন। বললেন, ‘‘আরে আরে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আর তুমি আমায় লুচি খাওয়াচ্ছ?’’
কে শোনে কার কথা!
কিছুক্ষণ বাদেই বাড়ির এক কাজের লোক মাথায় কুলট নিয়ে ঢুকল ঘরে। কুলট উপচে পড়ছে লুচি!
বাবার খুব প্রিয় গায়িকা ছিলেন সন্ধ্যাপিসি (মুখোপাধ্যায়) আর আরতিপিসি (মুখোপাধ্যায়)। তবে এক জন আর্টিস্টকে বাবা খুব ভাল বাসতেন। তিনি রবীন মজুমদার। রবীন মজুমদার কোনও এক নেশায় জীবনটা প্রায় শেষই করে ফেলেছিলেন। বেঁচে ফিরেছিলেন বাবারই জন্য।
বাবা ওঁকে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসেন। আমার বাবা নিজে আরজিকর থেকে এমবিবিএস পাস করেছিলেন। ডাক্তারি করেননি গানকে ভালবেসে। ঠাকুরদা চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে ডাক্তারি পড়ুক। তাই পড়েছিলেন। ওই পর্যন্তই। ঠাকুর্দা সনৎকুমার ঘোষ নিজে ছিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎসক।
এই দু’জনের চিকিৎসাতেই রবীন মজুমদার ‘দ্বিতীয় জীবন’ পেয়েছিলেন। টানা সাত-সাতটা বছর আমাদের বাড়ি ছিলেন উনি। ওঁর সেবায় এক ফোঁটা যাতে ঘাটতি না হয়, সে দিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর ছিল বাবার।
রবিজ্যেঠু সুস্থ হওয়ার পর বাবা গৌরীকাকাকে এক দিন বললেন, ‘‘রবিদার জন্য ফাটাফাটি একটা গান বানা তো।’’
কথা হচ্ছিল শ্যামবাজারের বিখ্যাত কষা মাংসের দোকান ‘গোলবাড়ি’-র সামনে দাঁড়িয়ে। হার্ট অ্যাটাক, শারীরিক অসুস্থতার তোয়াক্কা না করে বাবা তখন বাড়ির বাইরে যথেচ্ছ মুখরোচক খাবার খেয়ে বেড়াতেন। বিধান সরণির চাচা হোটেলের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, যত কাজই থাক থামবেনই থামবেন। ওখানকার ফাউল কাটলেটটা না খেলে চলে! সিমলা পাড়ায় নকুড়ের দোকানের সন্দেশটা চাই-ই চাই।
সে দিন গৌরীকাকা কাটলেটটা সবে শেষ করেছেন, নিয়মের সিগারেটটাও শেষ। হঠাৎই লিখলেন, ‘‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে।’’ তার পর ধীরে ধীরে পুরো গানটা হল। সুরও বসল তাতে।
এ বার রবিজ্যেঠুর গল্পটা শুনুন।
গান শুনে রবিজ্যেঠু বললেন, ‘‘এই গান শুনে একজনের কথাই মনে হচ্ছে। হেমন্তবাবু। উনি এ গান গাইতে পারবেন।’’
ভাবুন শুধু। এই মানুষগুলো এমনই ছিলেন। ‘আগামী পৃথিবী’ আজও সে-গান কান পেতে শোনে।
বাংলা সিনেমায় গান তৈরির ক্ষেত্রে পরিচালকরা শুধু ‘সিচ্যুয়েশন’টা সংক্ষেপ করে বলে দিতেন বাবাকে। বাদ বাকি দায়িত্বটা ছিল বাবারই।
এ নিয়েও অদ্ভুত-অদ্ভুত সব গল্প আছে বাবার। ৈমনে পড়ছে ‘মৌচাক’-এর কথা। ‘পাগলাগারদ কোথায় আছে’ গানটা প্রথমে চিত্রনাট্যে ছিল না। বাবা পরে এটা ঢোকান। এ রকম বেশ কয়েক বার হয়েছে।আবার উল্টো ছবিও আছে। কোনও পরিচালক যদি ছবিতে গান ঢোকানোর জন্য বেশি চাপাচাপি করতেন, বাবা রসিকতা করে প্রায়ই বলতেন, ‘‘এখানে গান দেবেন? দিন। তবে দর্শকরা কিন্তু এই সময় টয়লেটে যাবে।’’
ছবির সিক্যুয়েন্স বুঝে গান ফেলাতে বাবার সত্যি জুড়ি পাওয়া ভার!
অভিন্ন-হৃদয় হেমন্ত-নচিকেতা
‘ধন্যি মেয়ে’র কাজ হচ্ছে। গানের মধ্যে দিয়ে একটা মেয়েকে ডানপিটে বোঝাতে হবে। পুলককাকু লিখলেন, ‘‘যা যা বেহায়া পাখি যানা, অন্য কোথা যানা...।’’ পাখির সঙ্গে কথা বলছে সেই মেয়ে। খুঁজে পেতে বাবা স্টুডিয়োতে মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়কে (হরবোলা) আনিয়েছিলেন রেকর্ডিং-এ।
ভাস্কর বসুর ‘ঠাকুমার ঝুলি’র কাজ করছেন বাবা। ছোটদের গান, রূপকথার গান নিয়ে প্রবল উৎসাহ ছিল বাবার। ‘ঠাকুমার ঝুলি’র এক জায়গায় বলা হচ্ছে, ‘কুড়মুড় খাই কুসুমের মুন্ডি/কুড় কুড় কুড় করে খাই অজিতের পিন্ডি।’
কিন্তু এই মুন্ডু-পিন্ডি খাওয়ার আওয়াজটা হবে কী করে? মহা মুশকিল। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চলল। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এ দিকে স্টুডিয়োর সময়সীমা ফুরিয়ে আসছে। ভাড়ার অঙ্কও বাড়ার মুখে।
হঠাৎ রাধুকাকু (রাধাকান্ত নন্দী) বললেন, ‘‘ও নচিবাবু, পয়সা দিন তো।’’
কিছু না বলেই বাবা দশ টাকার একটা নোট দিলেন রাধুকাকার হাতে। তা দিয়ে এক ঠোঙা লেড়ো বিস্কুট কিনিয়ে আনা হল। এ বার সেই লেড়ো প্রত্যেকের হাতে দিয়ে বলা হল, প্রত্যেককে এক সঙ্গে মাইক-এর সামনে বিস্কুটে কামড় দিতে হবে। খচরমচর সেই লেড়োর খাওয়ার আওয়াজেই তৈরি হল রাক্ষসখোক্কসের মুন্ডি-পিন্ডি খাওয়ার শব্দ!
নেপথ্যের এই ঘটনাটি শুনে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘‘ঠাকুমার ঝুলির ঠাকুমাকে চিনতাম এত দিন। এ বার ঠাকুরদাকে চিনলাম।’’
রাধুকাকু ছিলেন আমাদের একজন ‘মুশকিল আসান’। ‘বন্ধু’ ছবির কাজ করার সময় রাধুকাকার ওপর দিয়ে যা গেছে! পরিচালক চিত্ত বসু বাবাকে একটা ব্যাপারে হঠাৎ খুব জোর করতে লাগলেন। ‘‘মালতী ভ্রমরে’ গানটিতে উস্তাদ কেরামাতুল্লা খান যেন তবলা বাজান!
বাবা যে খুব একটা রাজি হচ্ছিলেন, এমন নয়। কারণ ওঁর ভয় ছিল, উস্তাদজি তো ঠিক ছবিতে বাজিয়ে অভ্যস্ত নন। ফলে অসুবিধে হতে পারে। শেষে পছন্দ না হলে অত বড় মাপের একজন তবলিয়ার বাজনা বাদ দেওয়াটাও তো অস্বস্তিকর!
কিন্তু-কিন্তু করেও শেষপর্যন্ত পরিচালক এত জোরাজুরি করলেন যে, স্বভাববিরুদ্ধ কাজটা করতেই হল বাবাকে।
রেকর্ডিং হল। বাবার আশঙ্কাই ঠিক। গানের সঙ্গে কিছুতেই উস্তাদজির বাজনা যাচ্ছে না। এখন উপায়?
অনেক ভেবে বাবা রাধুকাকাকেই ডাক পাঠালেন। এ দিকে সব ব্যাপার শুনে রাধুকাকা তো স্টুডিয়োর পথই মাড়াতে চান না। প্রচণ্ড অস্বস্তি ওঁরও।
অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করানো হল রাধুকাকাকে। স্টুডিয়োয় এলেন। গানটা ঠিক দু’বার শুনলেন। তার পর ওঁর হাতে যে বোল উঠল, প্রাণ ভ’রে গেল সবার।
তখন উস্তাদ কেরামাতুল্লাকে দেখতে হয়! কী মানুষ ছিলেন! রাধুকাকাকে বুকে টেনে নিলেন তিনি! এত খুশি হয়েছিলেন ওঁর বাজনা শুনে।
এ সব মানুষজন যে কোথায় হারিয়ে গেল!
তখন অনেক শিল্পীর মধ্যেই এই ধরনের ব্যাপার-স্যাপার দেখেছি। পারস্পরিক অসম্ভব শ্রদ্ধাবোধ। একে অন্যের জন্য চিন্তা করা। শুধুই নিজেরটা না-ভাবা। এমনকী সম্পর্কের মধ্যেও যে কত রকমের ভাললাগা-আবেশ জুড়ে থাকত!
গীতা দত্ত যেমন। কলকাতায় এলেই আসতেন আমাদের বাড়ি। মায়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে বলতেন, ‘‘খুব জোর আপনি নচিদাকে পেয়ে গিয়েছেন। নইলে ওঁর সঙ্গে তো আমারই বিয়ে হত।’’
আবার বাবার কথা বলি। সঙ্গীতকার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শোনা। ‘মধুমতী’ রিলিজ করবে যে দিন, বাবা দেখি কেবলই পায়চারি করছেন, আর অদ্ভুত রকমের টেনশন চোখেমুখে। ঘন ঘন সিগারেট খাচ্ছেন।
কী হয়েছে? জানতে চাইলে শোনা গেল, ‘‘মধুমতী যদি হিট না হয়, তা হলে তো সলিলকে (চৌধুরী) ফিরে আসতে হবে এ বার। মনে মনে কত যে চাইছি, সলিল যেন সফল হয়!’’
প্রতিমাপিসির একটা গল্প।
সকাল সাড়ে সাতটা। একটা রিকশা নিয়ে প্রতিমাপিসি হাজির আমাদের বাড়ি। হাতে কাপড়ের বটুয়া। বাবার তখন ঘুমই ভাঙেনি। প্রতিমাপিসি বসে রইলেন। বাবার সঙ্গে দেখা করে তবে যাবেন। বাবা উঠে এসে দেখা করতেই প্রতিমাপিসি বললেন, ‘‘স্বপ্ন দেখলাম, আপনাকে কতগুলো পাথর দিচ্ছি। তাই ছুটে চলে এলাম। এই নিন,’’ বলে হাতের সেই বটুয়াটা বাবাকে দিলেন। ভেতরে ভর্তি চুনী, পান্না, হিরে...!
এক ধমক দিলেন বাবা, ‘‘তুই পাগল হলি নাকি? রাখ এ সব। নে বোস তো, জীবন নদীর ওপারে-টা গা তো!’’
এর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা এতটাই মুগ্ধ করা, মনে হল যেন, পাহাড়ের গায়ে ভোরের সূর্য উঠছে!
মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে প্রতিমাপিসি একের পর এক গেয়ে চললেন ‘জীবন নদীর ও পারে’, ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা’... সকালের সোনা ঝরা আলো যেন বাবার ভেতর থেকে চুঁইয়ে পড়ছিল প্রতিমাপিসির চোখে। জ্বলজ্বলে সে চোখে মুক্তোদানার মতো টলটল করছিল জল। এখনও যখন সে-ছবি ভেসে ওঠে ভেতরটা কেমন ভিজে যায় ঠিক সে দিনের মতোই!
এক কাপ চা খেলেন। একটু গল্প করলেন। চলে গেলেন।
প্রতিমাপিসির আরেকটা গল্প বলি। অনেক দিন আগের।
শুধু শ্রদ্ধা নয়, কী যে ভয় পেতেন পিসি বাবাকে! রেকর্ডিং হচ্ছে প্রতিমাপিসির। সারা দিন ধরে একটাই গান গেয়ে চলেছেন তিনি। আর বাবার কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না। শেষে এমন অধৈর্য হয়ে পড়লেন, প্রতিমাপিসির গালে মারলেন সপাটে এক চড়। পিসি তো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বাবার তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই। বলে দিলেন, ‘‘ওই কাঁদতে কাঁদতেই রেকর্ড করবি, চল।’’
রেকর্ডিং হল। গানটা ছিল ‘আঙুল ফুলেরে খুন করে গেছে’।
অনেকেই বাবাকে বাইরে থেকে দেখে ভেবে বসতেন লোকটা বুঝি একেবারে মায়াদয়াহীন। পাষাণ।
বাড়িতে কত বার দেখেছি, সকালে স্নান সেরে বেরিয়েছেন, খেতে বসবেন এ বার। খাবার দিতে দেরি হলে মায়ের মুখের ওপর খাবার ছুড়ে দিয়েছেন।
সাদা ধুতি পরতেন। সঙ্গে গিলে করা পাঞ্জাবি। ধুতির সঙ্গে পাঞ্জাবির রংটা না মিললে কিছুতেই পরতেন না।
গায়ে পাউডার দিতেন, তাও যে কী রাজকীয় ঢঙে! কৌটো থেকে হুশ হুশ করে ঢালতেন গায়ে। মাটিতে যতটা পড়ত, তা দিয়ে আরেকজনের হয়ে যেতে পারে।
সুগন্ধি মাখলে দামি হওয়া চাই। নয়তো নয়।
হাবেভাবে একেবারে ‘সন্ন্যাসীরাজা’র সূর্যকিশোর নাগচৌধুরী! অথচ এই বাবা-ই যখন দ্বিজেনকাকার পাশে বসে ‘আমার রাত পোহালো’ শুনতে শুনতে কাঁদতেন, কিছুতেই যেন মেলাতে পারতাম না। আর আমারও চোখের জল বাঁধ মানত না।
কী ছিল মানুষটার ভিতরে, যা শুধু গানেই বলতে পেরেছেন তিনি!
তারই বা কতটুকু বুঝেছি?
আজীবন যেন একটা ঝিনুক খুঁজে বেড়িয়েছেন আমার বাবা, যাতে মুক্তো আছে। একটা মানুষ, যার মন আছে... তা’ও কি পেয়েছিলেন কোনও দিন?
জানা হয়নি!