Sunday, 12 August 2018

সতীনাথ ভাদুড়ীর হাত ধরেই ‘গানহী বাওয়া’কে চিনেছিল বাংলা সাহিত্য (On Satinath Bhaduri)

সতীনাথ ভাদুড়ীর হাত ধরেই ‘গানহী বাওয়া’কে চিনেছিল বাংলা সাহিত্য

শুধু সাহিত্য সৃষ্টি নয়, বরং জীবনের এক অন্য অর্থের খোঁজই করেছেন সতীনাথ ভাদুড়ী। তাঁর পথ চলা কোন খাতে, তারই সন্ধানের চেষ্টায় অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 
Satinath Bhaduri

হস্তান্তরিত হওয়ার পরে সতীনাথ ভাদুড়ীর বাসভবন

(১)
মাঝবয়সি এক বাঙালি ঘুরছেন ফ্রান্সের রাস্তায়। সিন নদীর পাড়ে পুরনো দোকানে প্রাণ ভরে গন্ধ নিচ্ছেন উইপোকায় খাওয়া বইয়ের। দেখছেন ফরাসিদের। আর তাদের দেশে আসা ধরাধামের লাখো মানুষকে। সেই প্রতিটি মানুষের দিকেই হয়তো ‘অনন্তযৌবনা প্যারিস পাতলা ফরাসি সিল্কের আধাঘোমটার ভিতর দিয়ে চোখ ইসারা করে।’— ‘ইসারা’য় ধরা দেন কেউ কেউ।
ধরা হয়তো দিতে চাইলেন ওই বাঙালি ভদ্রলোকটিও। এ ইশারার বার্তা এসেছে ফরাসি তন্বীরূপে নয়, বরং এক হিটলারি জার্মানি থেকে বিতাড়িত (সম্ভবত ইহুদি বলে) এক মহিলার চোখে। যাঁকে ওই বাঙালি দেখাতে চান তাঁর দেশ, মহা-ভারত। বাঙালিটি সতীনাথ ভাদুড়ী। মহিলাটি হোটেলের পরিচারিকা। নাম অ্যানি। অ্যানি এমন এক জন, যাঁর কথা ‘একসঙ্গে বেশিক্ষণ ভাবতে’ পারা যায়। ভাবনার সূত্রেই জড়িয়ে পড়ে ‘অবিচ্ছেদ্য’ সতীনাথ-কথাও।
কিন্তু দেশ দেখানো হল কই? সতীনাথ জানলেন, অ্যানির স্বামী-পুত্র নিয়ে ভরা সংসার। তবুও... নোটবইয়ের পাতায় অন্য অ্যানি বেঁচে থাকেন। পাতা ওল্টালে ভেসে আসে অ্যানির হাতের লেখা ঘরকন্নার গন্ধ। আর সতীনাথ প্রশ্ন করেন নিজেকেই, ‘মানুষ অতৃপ্ত— কী যেন খুঁজছে সারা জীবন— কী সেই জিনিস?’
(২)
এই ‘অতৃপ্তি’ কেন, তার খোঁজ সতীনাথ শুরু করলেন সেই ছেলেবেলা থেকেই।
সতীনাথের জন্ম বাংলা তারিখ ১১ আশ্বিন, ১৩১৩, বৃহস্পতিবারে। বিজয়া দশমী, মায়ের বিদায়ের দিন সন্ধেয়। চার দিকে উৎসব শেষের বিষণ্ণতা। তার মধ্যেই কোশী নদীর পাড়ে পূর্ণিয়ার ‘সবুজকুন্তলা’ ভাট্টাবাজারে ইন্দুভূষণ ভাদুড়ী ও রাজবালাদেবীর ঘরে এলেন ষষ্ঠ সন্তান সতীনাথ। হয়তো বা অদূরে বেলাশেষের গান গাইল গাছগাছালিতে ঘরে ফেরা পাখির দল। ঘটনাচক্রে সতীনাথের ‘জাগরী’ উপন্যাসের বিলুরও জন্ম ওই দশমীর দিনেই।
মায়ের আঁচলের খুঁট ধরে ঘোরাঘুরি। বড় হচ্ছেন সতীনাথ। বাবা ইন্দুভূষণ পূর্ণিয়া আদালতের ডাকসাইটে দেওয়ানি উকিল। তাঁর থেকে কেমন যেন দূরে দূরে থাকেন সতীনাথ।
বেশ চলছিল। আচমকা পড়়াশোনার পাট চলে এল। ভর্তি হলেন ভাট্টাবাজার লাগোয়া প্রাথমিক স্কুলে। সেখানে অবশ্য উপচে পড়া স্নেহ মিলল শিক্ষক দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কাছে। পরে বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন সদর হাসপাতালের কাছে পূর্ণিয়া জেলা স্কুলে। শিক্ষক-ভাগ্য ভালই। প্রধান শিক্ষক প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় আর সংস্কৃত পণ্ডিত তুরন্তলাল ঝা বেশ পছন্দ করেন এই ঝকঝকে ছেলেটিকে। পণ্ডিতজি তো নামই দিয়ে ফেললেন ‘ক্লাস কী রোশনি’। ক্লাসে সতীনাথ না এলে সহপাঠীরা মজা করে বলে, ‘ক্লাস আঁধিয়ালা হো গয়া’। আসলে ‘রোশনি’ই বটে। প্রতি শ্রেণিতেই যে প্রথম হন ওই সতীনাথ!
কিন্তু আর পাঁচটা ছেলের মতো  দামাল নয় ছাত্র সতীনাথ। সঙ্গী গুটিকয় বন্ধু। খেলাধুলোয় তেমন আগ্রহ নেই। কিন্তু স্কুল চত্বরেই অমন ছাতার মতো গুগগুল, পাইন, বট, অশ্বত্থের ভিড় কেমন যেন দিকশূন্যপুরের ডাক শোনায় সতীনাথকে। সেই ডাক শুনতে শুনতেই মাঝেসাঝে উঁকি দেন অদূরের প্ল্যান্টার্স ক্লাবে। এই ক্লাবই ‘আন্টা বাংলা’, ‘জাগরী’তে ফিরে আসবে নিজস্ব রূপ-রং নিয়ে।
স্কুলজীবন এটুকুই।
আসলে দিকশূন্যপুরের ডাক শোনা হোক বা ক্লাবে উঁকি, এর মধ্য দিয়ে সতীনাথ চাইছিলেন অজানাকে দেখতে। সেই কৌতূহল থেকেই হয়তো একদিন একটু সিদ্ধি চেখে দেখা! তার পরেই কয়েক দিন ঘরবন্ধ, অসুস্থ হয়ে পড়া।
(৩)
কিন্তু সিদ্ধি-পর্ব স্কুলজীবনের ওই কৌতূহলে মোটেই দাঁড়ি টানল না। বরং আইএসসি পড়তে মাখানিয়াকুঁয়ার বাঙালি মেসে ঠাঁই নেওয়া সতীনাথের কৌতূহল বেড়েই চলে। আর তাই পটনা সায়েন্স কলেজে বিজ্ঞান প়ড়েন বটে। কিন্তু নিয়মের বাঁধা জাল অপেক্ষা রং-তুলিতেই যেন প্রাণ খুঁজে পান সতীনাথ।
পূর্ণিয়া আদালত চত্বর
এর পরে পটনা কলেজ, অর্থনীতিতে বিএ। মেসজীবনও শেষ। বাক্স-প্যাঁটরা উঠল পটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহমেডান হস্টেলে। আশ্চর্য সমাপতন। সতীনাথ যে ঘরে উঠলেন, তার ঠিক পাশের ঘরেই এক সময় ছিলেন আরও এক জন, অন্নদাশঙ্কর রায়। যাঁর ঘরের বাইরে আবার লেখা, ‘ডোন্ট কোয়ার্ল উইথ ফ্যাক্টস’। বিএ-র পরে এমএ, স্বাভাবিক নিয়মেই। আর এই সময়েই ব্যক্তি-জীবনের প্রথম ‘নির্জনতা’র সঙ্গে পরিচিত হওয়া সতীনাথের।
এক সপ্তাহের ব্যবধান। মা রাজবালাদেবী ও বড় বোন করুণাময়ী মারা গেলেন। মাতৃহারা সতীনাথ যেন খানিক আলুথালু। মন চায়, সুদূর দক্ষিণ আমেরিকা পাড়ি দিতে। কিন্তু মায়েরা এত সহজে সতীনাথের জীবন থেকে বিদায় নেননি। পূর্ণিয়ার দাক্ষায়ণী দেবী, কুসুমকুমারী দেবীরা স্নেহ দিলেন। সতীনাথও এঁদের কথাই বুনছেন ‘অচিন রাগিণী’ বা ‘জাগরী’তে। এমএ-র পরে আইন পড়া, পৈতৃক পেশায় যোগ দিতে।
ওকালতির কাজে বাবার মুখরক্ষা করলেন সতীনাথ। সাত বছরের জন্য সহকারী হিসেবে নাড়া বাঁধলেন আইনজীবী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। ‘মোতির দানা’র মতো অক্ষরে ইংরেজি, বাংলা বা কৈথিতে সতীনাথের লেখা সম্ভ্রম তৈরি করল। কোর্ট চত্বরে ফিসফাস, ‘এ তো আর একটা ইন্দুবাবু তৈরি হয়ে গেছে’!
কিন্ত বাবার সঙ্গে দূরত্ব বোধহয় কমল না। আর তাই বার-লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালেও সকলে অবাক চেয়ে দেখে, ইন্দুবাবু আদালতে আসেন জুড়িগাড়ি চড়ে। আর তাঁরই ছেলে সাইকেলে, মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে করতে।
এই সাত বছরে সতীনাথের রুটিন সকালে আইনের বই পড়া, দাদামশাই কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে আড্ডা, দুপুরের খাওয়া শেষে খানিক বিশ্রাম। তার পরে বিকেলে হাঁটাহাটি, রাত ৯টা পর্যন্ত স্টেশন ক্লাবে টেনিস খেলা আর রাতে নিজের লেখালেখি।
লেখালেখি। এই সূত্রেই আর বোধহয় ভাল লাগে না ‘উকিলের কারবার’। কারণ তা যে মন নিয়ে নয়। ‘নবশক্তি’তে স্যাটায়ারধর্মী লেখায় হাত পাকালেন সতীনাথ। ‘পূর্ণিয়া দর্পণ’-এ লিখলেন কিছু চুটকি। খানিক বাদে ‘বিচিত্রা’য় প্রথম গল্প প্রকাশ পেল, ‘জামাইবাবু’।
কিন্তু শুধু মাত্র লেখালেখিতে বাঁধা পড়ার সময় তখনও আসেনি। অন্য কিছুর খোঁজ শুরু করে দিয়েছেন তত দিনে সতীনাথ।
(৪)
সেই অন্য কিছুর খোঁজেই শুরু হয়ে গিয়েছে ‘অন্য’ জীবনের প্রস্তুতি পর্ব। তাই দিনভর আদালতের কাজ সেরে রাতে লণ্ঠন হাতে সতীনাথ ঘুরে বেড়ান বই সংগ্রহের জন্য। আর সকলের সঙ্গে মিশে তৈরি করলেন পূর্ণিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। পরে যার নাম ইন্দুভূষণ লাইব্রেরি। পূর্ণিয়ায় মহিলা সমিতি সংগঠন ও মন্দির তৈরি, পশুবলির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠন— সব ভূমিকাতেই দেখা যেতে লাগল সতীনাথকে।
সবই হচ্ছে। কিন্তু ওই একলাপনার অভ্যেস যেন গা ছাড়া হয় না! আর তাই রাতে কাজ সেরে ব্যঙ্গ করেন নিজেকেই, ‘বাড়ি এসে নিজেরই হাসি আসে এসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর জন্য’।
আসলে সময়টাই ‘মাথা ঘামানোর’। মহাত্মা গাঁধী যে তত দিনে প্রান্তিক মানুষের ‘গানহী বাওয়া’ হয়ে উঠেছেন। ডাক দিয়েছেন অধীনতা থেকে মুক্তির।
গতানুগতিক জীবন আর পোষাল না। তেত্রিশ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়লেন সতীনাথ। যোগ দিলেন পূর্ণিয়া থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরে কংগ্রেস নেতা বিদ্যানাথ চৌধুরীর টিকাপট্টি আশ্রমে। গায়ে উঠল খাদির ধুতি, চাদর, পাঞ্জাবি। শীতে গলাবন্ধ কোট, পায়ে চপ্পল। স্বাধীনতার খোঁজে সতীনাথ ছুটলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। ‘অখ্যাত, অজ্ঞাত, অবজ্ঞাত গ্রামের লোক’দের গানহী বাওয়ার কথা বোঝাতে এবং ওই ‘বন্ধু’দের বুঝতে।
বাবা ইন্দুভূষণ সবই হয়তো দেখছিলেন, দূরে দাঁড়িয়েই। কিন্তু আর পারলেন না। প্রিয় সতু যাতে বাড়ি ফেরে, তার জন্য ছেলে ভূতনাথকে কলকাতায় টেলিগ্রাম করলেন বাবা।
সতুর দুই বন্ধু দ্বারিক সুর ও কমলদেও নারায়ণ সিংহের সঙ্গে দাদা ভূতনাথ গেলেন ভাইকে ফেরত আনতে। কিন্তু ভূতনাথের নিজেরই কথায়, ‘সে আমাকে ফিরিয়ে দিল’। ভূতনাথ দেখলেন, ভাইয়ের ফেরার পথ আপাতত বন্ধ। বিস্মিত হলেও স্বাগত জানালেন দাদামশাই। বুঝলেন, ‘সাধারণে যা করে তাতে মন সায় দেয় না’ যে ও ছেলের! মন সায় দেয় না আদর্শকে ফেলে আসতে। আর তাই আশ্রমিক পর্বে বাড়ি এলে সঙ্গী হয় দাঁতোয়ান। টুথপেস্ট-ব্রাশ... ও সব বিলিতি অভ্যেস যে! পাতে পড়ে দই, কাঁচকলা সিদ্ধ, আলু সিদ্ধ। আর বিলাসিতা এক চামচ মাখন!
কিন্তু শুধু কংগ্রেস স্কুলের মাস্টার হিসেবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন সতীনাথ, এমনটা হওয়ার নয়।
(৫)
সেটা হওয়ার নয় বলেই আশ্রমের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে সতীনাথ দাঁড়ালেন খেটে খাওয়া ভারতবর্ষের সন্তান-সন্ততিদের দু’চোখের সামনে। কাজ করলেন তাৎমা, ধাঙ়ড় সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাঁদের গলায় দিলেন মহা-ভারতের স্লোগান— ‘সরকার জুলুমকার। আংরেজ জুলুমকার।’ পিকেটিং করলেন ভাট্টাবাজারের বিলিতি মদের দোকানের সামনে। পুলিশ এল, মারমুখী পেয়াদা দেখে অনেকেই চম্পট দিলেন। কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সতীনাথ।
কংগ্রেসকর্মী, নেতা থেকে জেলা সেক্রেটারি, বাগ্মী, তিন বার জেল খাটা (মতান্তরে চার বার), জেল ভাঙার চেষ্টা— অস্থির সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার যাবতীয় ‘গুণ’ সতীনাথের রাজনৈতিক ঝুলি কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলল। সেই পূর্ণতার জন্যই ‘জল কাদা ভেঙে বিনা টর্চের আলোয় ১৫-২০ মাইল’ হাঁটা আদালত চত্বরের ছোটবাবু সতীনাথ হয়ে উঠলেন ‘ভাদুড়ীজি’।
’৪২-এর অগস্ট আন্দোলন। ফের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময়। ইংরেজ সরকার ঘিরে ফেলল টিকাপট্টি আশ্রম। শুরু হল গণ অভ্যুত্থান। হরতাল, মিছিল, কিষাণগঞ্জ আদালতে রানির দেশের পতাকা টেনে নামানো, রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া— সব হল। ‘জাগরী’র বিলু বা সতীনাথও শরিক হলেন ‘জনশক্তির প্রকৃত স্বরূপ’-এর সঙ্গে। আর তাই ‘জাগরী’ উৎসর্গীকৃত ‘যে সকল অখ্যাতনামা রাজনৈতিক কর্ম্মীর কর্ম্মনিষ্ঠা ও স্বার্থত্যাগের বিবরণ, জাতীয় ইতিহাসে কোনোদিনই লিখিত হইবে না, তাঁহাদের স্মৃতির উদ্দেশে—’
কিন্তু শুধু ‘অখ্যাতনামা’ নন, খ্যাতিমান অনেকের সঙ্গেই পূর্ণিয়া ও ভাগলপুর জেল বা রাজনৈতিক জীবন একসঙ্গে কাটল সতীনাথের। সেই তালিকায় ভিড় জমান জয়প্রকাশ নারায়ণ, বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহ-সহ একঝাঁক প্রথম সারির দেশনেতা। জেলের মধ্যেই দিনভর আলাপ চলতে থাকে দেশ-সমাজ-আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে।
সতীনাথের অবশ্য ও সব রূপরেখায় তেমন মন নেই। আর তাই জেলজীবনের কোনও পর্বে তাঁকে দেখা যায় লৌহকপাটের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যরেখায় তুলসীদাসের ‘রামায়ণ’ পড়তে। রপ্ত করতে উর্দু-ফারসি ভাষা। কখনও বা জেলের ‘টি’ সেলে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়ে দেখা যায়, খসখস করে ‘বেশ মোটা মোটা গাঢ় সবুজ রংয়ের দু’খানা খাতা’য় কী যেন লিখে চলেন সতীনাথ। ওই লেখাটিই ‘জাগরী’!
মাঝেসাঝে এই মানুষটিই সহ-আবাসিকদের পাউরুটি টোস্ট, ডিমের পুডিং বা ‘মোতঞ্জন’ (এক ধরনের পোলাও) রান্না করে চমকে দেন। আর ভলিবল খেলেন। ভলিবলে এক দলের ক্যাপ্টেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কৃষ্ণবল্লভ সহায় (‌কেবি), অন্য দলের রণেন রায়চৌধুরী। সতীনাথ কেবি-র দলে। সতীনাথ খারাপ খেললেন। কেবি বললেন, ‘এ সাহব! কল সে আপ হমারে তরফ সে মত খেলিয়েগা। সমঝে?’ এর পরের দিনেই বদলে গেল খেলা। নেতার আর্জি, ‘হমারে সাইড সে খেলিয়ে কৃপা কর’।
ভাগলপুর সেন্ট্রাল জেলেই একটি ঘটনা সতীনাথের চরিত্রকে আরও সামনে আনে। সাক্ষী তাঁরই় ‘শিষ্য’, হিন্দি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণু। ঘটনাটি—
‘লাহোর কংগ্রেস’-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি ‘পূর্ণ-স্বরাজ’ দিবস পালন করতেই হবে। এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হল ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষের তানাশাহি। জাতীয় পতাকা, পোস্টারের জন্য রাখা লাল রং, সবুজ কাগজের খোঁজে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে শুরু হল ব্যাপক তল্লাশি।
২৫ জানুয়ারি। জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন, ‘হল্লা’ হলেই চলবে লাঠি। সেই সঙ্গে ২৬ জানুয়ারি ওয়ার্ডের কপাট দিনভর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এ বার রাজবন্দিরা দু’ভাগ। এক দল বললেন, এই পরিস্থিতিতে কী ভাবে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস পালন সম্ভব! অন্য দল অনড়। সতীনাথের সমর্থন দ্বিতীয় দলেই।
২৬ জানুয়ারি। সকাল থেকেই নিজের লেখায় মগ্ন সতীনাথ। ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ। বাইরে রক্ষীদের জুতোর মচমচ। সতীনাথের ওয়ার্ডের কয়েক জন আচমকা স্লোগান দিলেন। শুরু হল ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়া। গাঁধীবাদীরা বসে পড়লেন চরকা কাটতে। ‘হল্লা’র খবর পৌঁছল জেলকর্তাদের কাছে। ব্রিটিশ অফিসার চিৎকার করে ‘বেয়াদপি বন্ধের অর্ডার’ দিলেন। উঠে দাঁড়ালেন সতীনাথ।
শিষ্য ফণীশ্বরনাথ থমকে গেলেন। ক’দিন আগের লাঠিচার্জের ফলে ভাদুড়ীজির ঘাড়ের কাছে কালশিটেটা যে এখনও মেলায়নি। ফের যদি... সতীনাথ তত ক্ষণে দ্বিতীয় দলের এক্কেবারে গোড়ায় এসে আওয়াজ তুললেন ‘বন্দেমাতরম!’
সশস্ত্র ও নিরস্ত্র আন্দোলনে দেশ স্বাধীন হল ’৪৭-এ। একদিন দেখা গেল, ডক্টর রাজেন্দ্রপ্রসাদ এবং সস্ত্রীক আচার্য কৃপালনী সতীনাথের বাড়িতে এসে আতিথ্য গ্রহণ করলেন। খবর রটল, কংগ্রেস কোনও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী করছে সতীনাথকে। কিন্তু সতীনাথ অন্য রকম।
(৬)
সতীনাথ অন্য রকম বলেই দেখা গেল, ১৯৪৮-এ দুম করে পূর্ণিয়া কংগ্রেসের সেক্রেটারির পদ ত্যাগ করলেন। স্পষ্ট বললেন, ‘কংগ্রেসের কাজ ছিল স্বাধীনতা লাভ করা, সে কাজ হাসিল হয়ে গেছে, রাজকাজ ছাড়া কোনো কাজ নেই আর।’ সেই ‘কাজ’ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই দূরত্ব বজায় রাখলেন নির্জনতায় অভ্যস্ত সতীনাথ।
কিন্তু রাজনীতির মধ্য দিয়ে যাঁর মহা-ভারতকে চেনা, তাঁর পক্ষে বেশি দিন দূরে থাকাটাও সম্ভব হল না। আর তত দিনে মাথার মধ্যে গিজগিজ করছে কার্ল মার্ক্স থেকে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের লেখা। বারবার ডাক আসে সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার। তাতে বিশেষ লাভ হওয়ার নয়। শেষমেশ আর কারও ডাকে নয়, বরং নিজেই একদিন পার্টি অফিসে গিয়ে সোশ্যালিস্ট দলে নাম লেখালেন সতীনাথ। তাঁর সদস্যপদে প্রস্তাবক হিসেবে সই থাকল রেণুর। এ বার কলের মজুরদের জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু হল। হয়তো এই ঘাঁটাঘাঁটিই রূপ পেল ‘চিত্রগুপ্তের ফাইল’-এ। কিন্তু সোশ্যালিস্ট পার্টিতেও বেশি দিন মন টিকল না। কারণ তত দিনে সে দলে ভিড় দুর্নীতিগ্রস্ত ‘জমিদারনন্দনদের’।
এক নির্জন রাজনীতিকের দলীয় রাজনীতির খোঁজ এখানেই শেষ হল। আসলে ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে’, রূঢ় বাস্তবের এই সংশয়ই নির্জন করে সতীনাথকে। কারণ তত দিনে রাজনৈতিক নেতাদের দলাদলি, ১৯৩৪-এ বিহার ভূমিকম্পের সময়ে এক শ্রেণির নেতার আখের গোছানোর চেষ্টা দলীয় রাজনীতি সম্পর্কে হয়তো প্রশ্ন তৈরি করেছে সতীনাথের মনে। তাই পরাজিত ‘ঢোঁড়াই’ যখন ‘সলন্ডর’ করে মহকুমাশাসকের অফিসে, তখন মনে হয়, এ আসলে অভিমানী সতীনাথেরই রাজনীতিকে বিদায় সম্ভাষণ।
আর তাই ‘লোকনায়ক’, ‘জনজাগৃতি’র মতো কথাগুলি শুনলে হাই ওঠে সতীনাথের!
(৭)
হাই ওঠারই কথা। কারণ রাজনীতি যে জন্য, সেই মহা-ভারতের পথ তত দিনে চেনা হয়ে গিয়েছে সতীনাথের। শুধু রাজনীতি নয়, তাঁর ‘অতৃপ্তি’ অধ্যাত্মবাদ নিয়েও। কিন্তু এই মানুষটিকেই আবার পাড়ি দিতে দেখা যাবে বৃন্দাবনে। তা অধ্যাত্মবাদের জন্য নয়, ‘দিগ্ভ্রান্ত’ লিখতে। আসলে অধ্যাত্মবাদের কাছে সমর্পণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই বউদি রেণুকাদেবীকে স্পষ্ট ভাবে বললেন, ‘কিছু মানতে পারলে হয়তো ভাল হত, তবু পারছি না যে মানতে।’
আর তাই এ বার পাড়ি দেওয়া প্যারিস, লন্ডন, জার্মানি... সে সব দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানুষদের কাছ থেকে দেখা, তা-ও হল। দেখলেন ভ্যাটিকানের উৎসবে ‘সাদা, কালো, হলদে সব জাত’ এক হয়ে যাওয়ার আখ্যান। কিন্তু দেখা হল না, যা চেয়েছিলেন দেখতে। সেই সোভিয়েত রাশিয়া! পর্যটন জটিলতায় সে দেশে যাওয়া আটকে গেল। তবে পাঠক এই ভ্রমণপর্বের কানায় কানায় পূর্ণ বিবরণ পেলেন ‘সত্যি ভ্রমণকাহিনী’তে। এই লেখা প্রকাশের আগে ‘দেশ’ পত্রিকা বিজ্ঞাপন দিল, ‘ইহা ভ্রমণকাহিনী না উপন্যাস রসিক পাঠকেরাই বিচার করিবেন।’
কিন্তু লেখালেখির জগতেও সহজে প্রতিষ্ঠা হয়নি। সতীনাথের প্রথম উপন্যাস ‘জাগরী’র পাণ্ডুলিপি সজনীকান্ত দাস ফেলে রাখলেন পাঁচ-ছ’মাস। শেষমেশ সমবায় পাবলিশার্স তা প্রকাশ করে। প্রকাশ হতেই তাকে স্বাগত জানাল ‘দেশ’ ও ‘পরিচয়’ পত্রিকা। স্বাগত জানালেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বইখানি পড়ে চমকে গেলাম। একেবারে নূতন কথা, নূতন সুর, নূতন সব মানুষের ভিড়, একেবারে সম্পূর্ণ নূতন মনোভাব।’
বিহার সাহিত্য ভবন থেকে এর হিন্দি অনুবাদ বেরোল। ভূমিকা লিখলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। পরে এর ইংরেজি অনুবাদ করবেন লীলা রায়। ইউনেস্কোর প্রযোজনায় যা এশিয়া পাবলিশিং হাউস থেকে ছাপা হবে ‘ভিজিল’ নামে। গল্প, ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ প্রকাশ... সতীনাথ লিখে চললেন। বাস্তবের ঢোঁড়়াই কিন্তু আসলে দুর্নীতিপরায়ণ। অথচ তাঁকেই ‘সারা দেশের সাধারণ লোকের’ প্রতিনিধি করে তুললেন সতীনাথ।
এ সব সাহিত্যসৃষ্টি আনল স্বীকৃতিও। কিন্তু সতীনাথ সে স্বীকৃতিতে থিতু হওয়ার লোক নন। ‘লেখকের লেখক’টি তখন প্যারিসে। দাদা ভূতনাথ টেলিগ্রামে খবর দিলেন, ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রাপ্তি ঘটেছে। সতীনাথ খবরটা জানালেন প্রিয় অ্যানিকে। পুরস্কারের চেেয়ও বোধহয় বড় পুরস্কার এ বার মিলল। অ্যানি ‘ওলালা’ বলে উচ্ছল হয়ে ওঠেন। এই-ই ভাল লাগে সতীনাথের। কিন্তু অ্যানি অন্য রূপে নয়, বরং ধরা দিয়েছেন মাতৃরূপে। পুত্রহারা অ্যানির শোকজর্জর, কালো জালে ঢাকা মুখটিই বেশি মনে পড়ে...
বিভুঁইয়েও তাই অতৃপ্তি পিছু ছাড়েনি সতীনাথের।
(৮)
সেই অতৃপ্তি বুকে করেই সতীনাথ ফিরলেন প্রিয় পূর্ণিয়ায়। সঙ্গী পরিচারক বাবাজি আর ‘খাঁকি খাঁকি রং, পোড়া কালোমুখ, খাড়া কান, গুটনো লেজ’ওয়ালা কুকুর। নাম তার ‘পাহারা’। মাঝেসাঝে যান কলকাতায় নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে দাদার বাড়িতে। মগ্ন থাকেন দেশ-বিদেশের বইয়ে। আর পূর্ণিয়ার সতীনাথকে দেখা যায় বাড়ির বাগানে খালি পায়ে ঘুরে বেড়াতে। ‘অচিন রাগিণী’র ‘বৃষ্টির পর মাটির গন্ধ বদলে’ যাওয়ার গল্প হয়তো তাই সতীনাথের নিজেরই পাওয়া। আসলে এই ‘অতৃপ্ত’ জীবনে খানিকটা হলেও বোধহয় তৃপ্তি এনেছিল প্রকৃতি।
তাই লেখা-রাজনীতি ছাড়া আর যে বিষয়ে বিশেষ যত্ন দেখা গেল সতীনাথের, তা হল ওই বাগান করায়। কেমন ধারার তা?
এক রাত্তিরে বাড়িতে এসেছেন গোপাল হালদার। দু’জনে গল্প চলে। এমন সময়ে হঠাৎ আসর থামালেন সতীনাথ। টর্চ হাতে পা টিপে টিপে বেরোলেন। কেন? সতীনাথ বলেন, ‘একটা ফুল ফুটতে আরম্ভ করেছিল, কতটা ফুটেছে’ তা দেখতেই আড্ডা ছে়ড়ে বেরোনো।
পরের দিন সকাল ৮টা-৯টা। বারান্দায় দু’জনে চা খাচ্ছেন। আলাপে ফের বাধা। ‘শুনছো’? কান পেতেও কিচ্ছুটি বোধহয় শোনা হল না গোপালবাবুর। বাড়ির অদূরের গাছে এসেছে এক বিশেষ পাখি। ওই পাখিই অমন ডাক পাড়ে। এ বার আরও চমকের পালা। সতীনাথ হিসেব দিলেন, গত বছরের তুলনায় ‘এ বার নয় দিন আগে এল’ পাখিটি! এই অন্য সতীনাথ ‘বাগানীয়া’, ‘গোলাপীয়া’, গোপালবাবুরই ভাষায়। তবে শুধু মগ্ন-নির্জনেই সতীনাথের প্রকৃতি-প্রেম শেষ নয়। আর তাই বনফুল হোন বা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, দেখা হলেই একটি উপহার বাঁধা— অর্কিড। বিলিতি এক লতার নাম রবীন্দ্রনাথ রেখেছিলেন, ‘নীলমণিলতা’। সতীনাথ ওই লতার নাম বদলে রাখলেন, ‘নীলমণি রবীন্দ্রাণী।’
এই বাগান, বাড়িই ‘অতৃপ্ত’ জাগতিক জীবনের শেষ ঠিকানা হল। ৩০ মার্চ, ১৯৬৫। সকালে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন সতীনাথ। বাগানের রাস্তার ধারে পায়চারি করছেন ‘ভিজিল’ হাতে নিয়ে। পরিচারক বাবাজি বাজারে গিয়েছেন বাবুর জন্য পাবদা আনতে। আর সঙ্গে নতুন ধুতি।
বাবাজি ফিরলেন। দেখলেন, লাইব্রেরি ঘরের বারান্দায় টেবিলে আধখাওয়া জলখাবার। পাতকুয়োর পাশে পড়ে সতীনাথের দেহ। হৃদযন্ত্রে বাসা বাঁধা টিউমারটা বোধহয় ফেটে গিয়েছে। মুখ থেকে অল্প অল্প রক্ত ঝরছে। অদূরেই মুখ গুঁজে পাহারা!
কোশী নদীর তীরে কাপ্তানপুল শ্মশানঘাটে কাকাকে দাহ করলেন গৌতম ভাদুড়ী। গৌতমবাবু যেন ‘প্রথমবার পিতৃহারা’ হলেন। এই কাকার হাত ধরেই এক সময়ে যে গৌতমের গাছ চেনা হয়েছিল।
আসলে গাছ হোক বা দেশের মানুষ, লেখক ও মানুষ সতীনাথ তা-ই বিজনে আমাদের চেনাতে চেয়েছেন। তা আমরা চিনতে পেরেছি কি না, সে ‘খোঁজ’ উনি নিতে যাননি।

ঋণ: আনন্দবাজার আর্কাইভ; ‘দেশ’; ‘সতীনাথ গ্রন্থাবলী’ (সম্পাদনা: শঙ্খ ঘোষ, নির্মাল্য আচার্য); ‘সতীনাথ ভাদুড়ী’: সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়; ‘সতীনাথ ভাদুড়ী’: স্বস্তি মণ্ডল; ‘সতীনাথ ও ফণীশ্বরনাথ ব্যক্তি ও শিল্পী’: নন্দকুমার বেরা; ‘দিবারাত্রির কাব্য’; ‘কোরক’। ছবি ঋণ: দিবারাত্রির কাব্য।

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/a-write-up-of-satinath-bhaduri-1.842249?ref=patrika-new-stry

সঙ্গীতের দুই ধারাকে মিলিয়েছিলেন তিনি (On Abdul Karim Khan)

সঙ্গীতের দুই ধারাকে মিলিয়েছিলেন তিনি

আব্দুল করিম খান গান গাইতেন ধ্যানমগ্ন হয়ে। শ্রোতারাও সুরের মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন। তাঁর সুমধুর, নরম কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের অন্তর ভেদ করে কখনও আবেগে আপ্লুত করেছে, কখনও কাঁদিয়েছে। লিখছেন বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য

 
Abdul Karim Khan
সে দিন তাঁর গান শোনার জন্য কলকাতার শহর যেন ভেঙে পড়েছিল। ১৯৩৬ সালের অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সের মঞ্চে তখন শীর্ণদেহী এক শিল্পী, মাথায় পাগড়ি। তিনি গেয়ে চলেছেন পরজ বসন্ত। সেই গান শুনে শ্রোতাদের মধ্যে কারও চেখে ছিল জল, কেউ বা সুরের মূর্ছনায় পৌঁছে গিয়েছিলেন এক ভিন্ন লোকে। হঠাৎ এক সময়ে শ্রোতাদের মনে হল, মঞ্চের শিল্পী যেন হাঁ করে আছেন। তাঁর মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বার হচ্ছে না। পাশে শুধু যেন এক জোড়া তানপুরা বাজছে। সযত্ন মেলানো তানপুরা আর হারমোনিয়ামের ষড়জ তাঁর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে এমনই মিলেমিশে গিয়েছিল যে, এমনটাই মনে হচ্ছিল। সেই আসরেই গান শুনতে এসে গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর মতো সঙ্গীতশিল্পীও এতটাই সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলেন যে, হাতের জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা খেয়ে তবেই সংবিৎ ফিরে পেয়েছিলেন।
সে দিনের সেই শিল্পী কিরানা ঘরানার প্রবাদপ্রতিম উস্তাদ আব্দুল করিম খান।
তিনি শুধু খেয়াল ও ঠুমরির গায়কিতে পরিবর্তনই আনেননি, তিনিই সম্ভবত প্রথম শিল্পী যিনি রাগসঙ্গীতের ভিন্ন দুই ধারার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তাঁর গানে। ১৯২৪ সালে দিলীপকুমার রায় প্রথম তাঁকে যখন কলকাতায় নিয়ে আসেন, তখন সে ভাবে তাঁকে কেউ চিনত না। পরে ১৯৩৬ সালে তিনি যখন অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে গান গাইতে এলেন, তার অনেক আগেই গ্রামোফোন রেকর্ডের দৌলতে তাঁর গান ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই সঙ্গীতরসিকদের মধ্যে তাঁর গান শোনার উৎসাহ ছিল প্রবল।
আব্দুল করিমের জন্ম ১৮৭২ সালের ১১ নভেম্বর উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগর জেলার কিরানা গ্রামে। তিনি সঙ্গীতের তালিম পেয়েছিলেন তাঁর বাবা কালে খান এবং কাকা আবদুল্লা খানের কাছে। এ ছাড়াও নান্‌হে খানের কাছেও তালিম নিয়েছিলেন। ছোট থেকেই আব্দুল করিম অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি সেতার, বীণা, সারেঙ্গি ও তবলা বাজানোয় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
–– ADVERTISEMENT ––
মাত্র এগারো বছর বয়সে মেরঠে কিরানা পরিবারের উস্তাদদের সামনে মুলতানি ও পূরবী গেয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে তাঁর গান শুনেছিলেন মহীশূর দরবারের সারেঙ্গিবাদক হায়দর বখ্শ। বছর পাঁচেক পরে আব্দুল করিম তাঁর কাছেই মহীশূরে গিয়েছিলেন রাজদরবারে দশেরা উৎসবে গান শোনানোর উদ্দেশে। এখানে তোড়ি গেয়ে তিনি সকলের নজর কেড়েছিলেন। মহীশূর দরবারেই তিনি কর্ণাটকী সঙ্গীতের প্রখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসে কর্ণাটকী সঙ্গীতের নানা বিষয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর সরগমেও কর্ণাটকী সঙ্গীতের প্রভাব ছিল।
সেখান থেকে ফেরার পথে আব্দুল করিম জয়পুর গিয়েছিলেন। সতেরো বছর বয়সে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁর বিয়ে হয় আব্দুল রহিম খানের মেয়ে এবং আব্দুল বহিদ খানের জ্যাঠতুতো বোন গফুরনের সঙ্গে। তবে সে বিয়ে সুখের হয়নি। কেননা আব্দুল করিম আর কখনও কিরানায় ফিরে আসেননি। এমনকী পরবর্তী সময়ে তিনি দিল্লি বা তার কাছাকাছি কোনও অনুষ্ঠানও নিতেন না। কেননা আব্দুল করিমের মনে হত, তাঁর আত্মীয়স্বজন জোর করেই তাঁকে কিরানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
প্রথম জীবনে তিনি তাঁর দাদা লতিফ পরে আব্দুল হকের সঙ্গে গান গাইতেন। ১৮৯৪ সালে আব্দুল করিম ও তাঁর দাদা আব্দুল হক বরোদায় আসেন। এখানে তাঁরা আল্লারাখি নামে এক গায়িকার বাড়িতে আশ্রয় নেন। আব্দুল করিম ও আব্দুল হক সারা দিন ঘুড়ি উড়িয়ে রাতে রেওয়াজ করতেন। বরোদার তৎকালীন রাজা সিয়াজিরাও মাঝে মধ্যেই গভীর রাতে প্রজাদের সুখ-দুঃখের কথা জানতে ছদ্মবেশে নগর পরিদর্শনে বেরোতেন। এমনই এক রাতে সিয়াজিরাও দুই ভাইকে রেওয়াজ করতে শোনেন। মাসখানেক পরে আবারও একই ভাবে দুই ভাইয়ের গান শুনে তাঁর ভাল লাগে। এবং পরদিন তাঁদের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। তাঁদের গান শুনে মহারাজ ও মহারানির এতটাই ভাল লেগেছিল যে, পাঁচশো টাকা ও দামি শাল উপহার দিয়ে আব্দুল করিমকে সভাগায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। এ ছাড়াও দু’জনের ভদ্র ব্যবহার ও অতিথিদের মনোরঞ্জনের ক্ষমতা দেখে প্রাসাদের মহিলামহলে গান শেখানোর চাকরিও পাকা হয়ে গিয়েছিল।
১৮৯৬ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন প্রাপ্তির হীরক জয়ন্তী উপলক্ষে বরোদায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাইসরয় লর্ড এলগিন। সেই অনুষ্ঠানে আব্দুল করিম ও আব্দুল হক সঙ্গীত পরিবেশন করেন। আসর জমে উঠেছিল, এমন সময়ে লর্ড এলগিন হঠাৎই রাগের নাম জিজ্ঞেস করায় কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। গান শেষ হওয়ার পরে আব্দুল করিম বিনীত ভাবে জানিয়েছিলেন সেই রাগটিকে ‘রসিকরঞ্জনী’ বলে। গানে মুগ্ধ লর্ড এলগিন সে দিন দুই ভাইকে সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন।
বরোদায় থাকাকালীন বরোদার রাজমাতার ভাই, সর্দার মারুতিমানের মেয়ে তারাবাঈ মানের সঙ্গে আব্দুল করিমের পরিচয় হয়। সিয়াজিরাও ঠিক করেছিলেন, তাঁর সঙ্গীত বিদ্যালয়ের জন্য একটি পাঠক্রম তৈরি করবেন। এ ছাড়াও ফ্রেডরিল সাহেবের অর্কেস্ট্রার দল দেশীয় রাগ-রাগিণী বাজাবে, তার জন্য নোটেশনের প্রয়োজন ছিল। আব্দুল করিম খান অল্প উর্দু পড়তে লিখতে জানতেন। তাই তাঁর একার পক্ষে তা করা সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছিল যে, আব্দুল করিমের গানের নোটেশন করবেন তারাবাঈ।
এ ভাবেই তাঁদের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, তা ভালবাসায় পরিণত হয়। তবে মারুতিরাও মানে মেয়েকে সন্দেহ করে তাঁর উপরে অত্যাচার শুরু করলে তারাবাঈয়ের কথায় আব্দুল করিম রাতারাতি তাঁকে নিয়ে বরোদা ছেড়েছিলেন ১৮৯৮ সালে।
সেই বছরেই তাঁরা মুম্বই এসেছিলেন। সেখানে আব্দুল করিম প্লেগে আক্রান্ত হন। পরে সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি তারাবাঈকে বিয়ে করেন। শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। তাঁদের মোট পাঁচটি সন্তান হয়। তাঁরা হলেন হীরাবাঈ বরদেকর, কমলাবাঈ বরদেকর, সরস্বতী মানে, পুত্র সুরেশবাবু মানে এবং কৃষ্ণারাও মানে। তারাবাঈ ছিলেন সুগৃহিণী এবং এক সার্থক মা। তিনি ভাল নাচ জানতেন এবং খানসাহেবের সঙ্গে সঙ্গতও করতেন। দুঃসময়ে নাচ শিখিয়ে তিনি সংসারও চালিয়েছিলেন।
১৯১৩ নাগাদ আব্দুল করিম পুণেতে আর্য সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সঙ্গীতের সকল শিক্ষার্থীর জন্য তা উন্মুক্ত ছিল। সঙ্গীত নিয়ে তাঁর কোনও সংকীর্ণতা ছিল না। গুরুকুল প্রথায় তিনি গান শেখাতেন। তাই তাঁদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন নিজেই। ১৯১৭ নাগাদ তিনি মুম্বইয়ে এর একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।
বিখ্যাত এই গায়ক ছিলেন উদার মনের মানুষ। তাঁর স্বভাবটি ছিল ফকিরের মতো। কখনও কারও নিন্দা করতেন না, শুনতেনও না। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তবু তা ছিল নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা। তারাবাঈয়ের সঙ্গে তাঁর সুখের সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সম্পর্কের তিক্ততার কারণে তারাবাঈ তাঁকে ত্যাগ করেন। মিরজে তাঁর এক ছাত্রী বন্নুবাঈ লটকর তাঁর দেখাশোনা করতেন। পরবর্তী কালে সামাজিক স্বীকৃতি দিতেই আব্দুল করিম তাঁকে বিয়ে করেন। এই বন্নুবাঈ পরবর্তী কালে সরস্বতীবাঈ মিরজকর নামে পরিচিত হয়েছিলেন। নিজের সন্তানদের ছাড়াও তিনি গান শিখিয়েছিলেন সাওয়াই গন্ধর্ব, শঙ্কর রাও সারনায়েক, বালকৃষ্ণ বুয়া কপিলেশ্বরী এবং রোশনারা বেগম প্রমুখকে।
জীবনের প্রথম দিকটা বরোদা এবং পুণেতে কাটালেও ১৯২০ সাল থেকে জীবনের শেষের দিনগুলি আব্দুল করিম মিরজে কাটিয়ে ছিলেন। জীবনে যে ক’জন শিল্পীর গান শুনে আব্দুল করিম খান প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে গ্বালিয়র ঘরানার হদ্দু খানের ছেলে রহমৎ খান ছিলেন অন্যতম। সে সময় রহমৎ খান কুরুন্দ্বাড়ে গান গেয়ে সাংলির দিকে যাচ্ছিলেন। কুরুন্দ্বাড়েতেই আব্দুল করিম শুনেছিলেন রহমৎ খানের গান। সে দিন রহমৎ খান ভূপালি আর মালকোষ গেয়েছিলেন, যা আব্দুল করিম সারা জীবন ভুলতে পারেননি। আব্দুল করিমের গায়কির উপরে রহমৎ খানের প্রভাব কতটা পড়েছিল, তা রহমৎ খানের মালকোষ রাগে গাওয়া ‘যমুনা কি তীর’ গানটি শুনলে বোঝা যায়।
আব্দুল করিম সম্পর্কে অমিয়নাথ সান্যাল লিখেছিলেন, ‘‘আব্দুল করিম খানের কণ্ঠ এসরাজের মতো তারসপ্তকে পৌঁছে কৃত্রিম ও সুতীক্ষ্ণ রূপ ধারণ করত।’’ তাঁর জীবনের প্রথম দিকে গাওয়া গানগুলি শুনলে বোঝা যায়, তাতে তানের ব্যবহার বেশি। পরবর্তী কালে রেকর্ড করা গানগুলির সঙ্গে এগুলির অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে।
তাঁর গাওয়া বেশ কিছু রাগে হিন্দুস্থানি ও কর্ণাটকী সঙ্গীতের অভূতপূর্ব এক মিলন ঘটেছিল। তার মধ্যে ‘সাবেরী’, ‘আনন্দভৈরবী’, ‘খরহরপ্রিয়া’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী কালে তিনি মহীশূর রাজ দরবারের গায়ক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন এবং ‘সঙ্গীতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন।
খেয়াল, ঠুমরি, হোলি বা ভজন... তিনি যা-ই গাইতেন না কেন, তা ছিল গভীর আবেগে আপ্লুত। তাতে কোনও নাটকীয়তা ছিল না। তাঁর গানে প্রভাব ছিল মরাঠি নাট্যগীতি এবং ভাবগীতেরও। খেয়াল গাওয়ার সময়ে তিনি বিস্তারের উপরেই বেশি জোর দিতেন। এড়িয়ে যেতেন লয়কারি বোল-তান। তেমনই তার গায়কির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যেত সারেঙ্গির গমক এবং বীণার মীড়। তাঁর পছন্দের রাগের মধ্যে ছিল ললিত, জৌনপুরি, মাড়বা, মালকোষ ইত্যাদি। তাঁর গাওয়া ঠুমরি পূরব-অঙ্গ এবং পঞ্জাব-অঙ্গ ঠুমরির চেয়ে ছিল আলাদা। রাগ ঝিনঝোটিতে ‘পিয়া বিন নাহি আবত’ এবং ভৈরবীতে ‘যুমনা কে তীর’ এই দু’টি গান খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তিনি আরও একটি বিশেষ গুণের অধিকারী ছিলেন। তা হল তিনি অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে পুরনো বাদ্যযন্ত্র মেরামত করতে পারতেন। যেখানেই যেতেন, সঙ্গে রাখতেন ছোট্ট একটি বাক্স। তাতেই থাকত সব যন্ত্রপাতি।
আব্দুল করিম খানের আধ্যাত্মিক জীবন ছিল ঘটনাবহুল। হিন্দু–মুসলমানের ভেদাভেদের ছায়া তাঁর জীবনে কখনও পড়েনি। দত্তাত্রেয় মন্দিরে বসে যেমন ধর্মসঙ্গীত গাইতেন, তেমনই দরগায় বসে আপন মনে তানপুরা মেলে গান করতেন। শিরডির সাঁইবাবা ও নাগপুরের তাজউদ্দিন বাবার প্রভাব পড়েছিল তাঁর গানের উপরেও। এক সময়ে তিনি নাগপুরে রাজা লক্ষ্মণরাও ভোঁসলের বাড়িতে অতিথি হয়ে ছিলেন। সেই সময়ে সেখানেই থাকতেন তাজউদ্দিন বাবা। আব্দুল করিম সে কথা শোনার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেখা আর কিছুতেই হয় না। এক দিন ভোরে হঠাৎ তিনি দেখলেন তাজউদ্দিন বাবা প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়েছেন। সেই সুযোগে তিনিও পিছু নিলেন। এ ভাবেই তিন-চার মাইল হাঁটার পরে জঙ্গলের মধ্যে এসে তাজউদ্দিন বাবা পিছন ফিরে প্রবল আক্রোশে আব্দুল করিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সারা দুনিয়াকে যে পাগল করে, এ বার কি সে তাঁকেও পাগল করতে চায়? এর পরে আব্দুল করিম মাটিতে বসে পড়ে যোগিয়া রাগে কবীরের একটি ভজন শুরু করেছিলেন। গান শেষ হতেই তাজউদ্দিন বাবা হাসিমুখে আব্দুল করিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কী চায়? এর উত্তরে আব্দুল করিম আশীর্বাদ ছাড়া কিছুই চাননি। এর পরে প্রায় এক মাস আব্দুল করিম নাগপুরে ছিলেন এবং তাজউদ্দিন বাবা মাঝেমধ্যেই তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে গান শুনতেন। তার মধ্যে একটি গান তিনি বার বার শুনতে চাইতেন, ‘হরিকে ভেদ না পায়ো রামা’।
তেমনই বালকৃষ্ণ বুয়া কপিলেশ্বরীর বইতে একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তারাবাঈ সন্তান-সহ তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আব্দুল করিম অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছিলেন। এক দিন কষ্টের হাত থেকে মুক্তি পেতে তিনি হাত থেকে একটি হিরের আংটি খুলে সেটিকে গিলে ফেলেছিলেন। পরদিন সকালে উঠে দেখলেন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থই রয়েছেন। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল, আগের দিন রাতে স্বপ্নে তিনি বজীরবাবাকে দেখেছেন। কিছু ক্ষণ পরে অন্য এক ব্যক্তি যার নামও আব্দুল করিম (তিনি সেতার তৈরি করতেন) তিনিও এসে জানালেন, রাতে তিনিও বজীরবাবাকে স্বপ্নে দেখেছেন। এর পরে দু’জনেই ঠিক করেছিলেন কোলহাপুরে বাবার কাছে যাবেন। বাবার ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি সরোষে গালি দিয়ে আব্দুল করিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, খোদার দেওয়া জীবন শেষ করার সাহস তাঁর হল কী করে? এর পরে বাবা আরও বলেছিলেন যে, আব্দুল করিমকে আরও কিছু বছর জীবিত থাকতে হবে। আর তাঁর জীবনের শেষ হবে ঠিক সে ভাবেই, যেমন তিনি চেয়েছেন। কোনও কষ্ট না পেয়ে, কাউকে কোনও কষ্ট না দিয়ে।
আব্দুল করিম খানের গলা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য তাঁকে দু’বার বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। তবু দৈব কৃপায় তাঁর কণ্ঠ কখনও নষ্ট হয়নি। প্রথম বার ১৮৯৬ সালে বরোদায় এক অনুষ্ঠানের পরে। দ্বিতীয় বার ১৯০৮ সালের শেষের দিকে বাগলকোট শহরে তাঁর কোনও শত্রু খাবারে বিষ দিয়েছিল। এর ফলে প্রায় ছ’মাস তাঁর গান বন্ধ ছিল। তার পরে গ্রামের কাছে পাহাড়ের উপরে এক সাধুর সমাধি দর্শন করতে গিয়েছিলেন আব্দুল করিম। সেখানেই এক মেষপালকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেই মেষপালক ওই ঘটনার কথা শুনে তাঁকে কিছু গাছের শিকড় খেতে দেন। যা খাওয়ার পরে আব্দুল করিম কয়েক বার বমি করেন এবং পুনরায় নিজের কণ্ঠ ফিরে পান।
আব্দুল করিমের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর পোষা কুকুর টিপু মিঞার কাহিনি। শিষ্যদের সঙ্গে রেওয়াজ করার সময়ে তাকে বেঁধে রাখলে সে বিকট চিৎকার করতে থাকত। তবে বাঁধন খুলে দিলেই সামনে এসে উবু হয়ে বসে উ-উ করে তাঁর ছাত্রদের গলার আওয়াজ নকল করত। অমনটা দেখে আব্দুল করিম ঠিক করেন, কুকুরটিকেও গান শেখাবেন। এতে তাঁর আত্মীয়, বন্ধু সকলেই বেশ বিরক্ত হয়েছিল। তবু আব্দুল করিম সে সব কিছু তোয়াক্কাই করেননি।
তিনি যখন রেওয়াজ করতেন, পোষা কুকুরটিও অদ্ভুত ভাবে সুর মেলাত। এ ভাবেই বেশ কিছু দিন রেওয়াজ চলার পরে আব্দুল করিম বিজ্ঞাপন দিয়েই তাঁর ও টিপু মিঞার এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। মখমলের জামা আর গলায় মুক্তোর মালা পরে মঞ্চে এসে আব্দুল করিমের সঙ্গে সুর মেলানোয় রাতারাতি টিপু মিঞার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। এর পরে টিপু মি়ঞাকে নিয়ে তিনি আরও দু’টি অনুষ্ঠান করেন। একটি মুম্বইয়ে, অন্যটি পুণেতে। মুম্বইয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যানি বেসান্ত, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ।
১৯০৪-০৫ নাগাদ লন্ডন থেকে এ দেশে আগত গ্রামোফোন কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাঁর বেশ কিছু গান রেকর্ড করে, যা এক পিঠে বাজা রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলির মধ্যে ছিল মুলতানি, বসন্ত, মল্লার, ভীমপলশ্রী, ললিত, হিন্দোল ইত্যাদি। পরে ১৯৩৫ সালে রুবি রেকর্ড কোম্পানি এবং ১৯৩৬ সালে ওডিয়ন কোম্পানি তাঁর বেশ কিছু গান রেকর্ড করে। তাঁর সমকালীন বহু শিল্পীই স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও আব্দুল করিম খানের গানের জনপ্রিয়তা কখনও কমেনি। গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ শেষ হওয়ার পরেও চাহিদা থাকায় তাঁর গান লং প্লেয়িং রেকর্ডে, ক্যাসেটে, সিডিতে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৩৭ সালে আব্দুল করিম খান চেন্নাইয়ের একটি সঙ্গীত সম্মেলনে গান গাইতে গিয়েছিলেন। এরই মধ্যে তিনি দিলীপকুমার রায়ের কথায় পুদুচেরিতে গিয়ে শ্রীঅরবিন্দকে গান শোনানোর কথায় রাজিও হয়েছিলেন। সে জন্য চেন্নাই থেকে ট্রেনেও উঠেছিলেন। কিন্তু ২৭ অক্টোবর রাতে ট্রেনের মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। ক্রমেই তিনি দুর্বল বোধ করতে থাকেন। এই সময়ে তাঁর এক বন্ধুকে তিনি বলেন পরের স্টেশনে নেমে পড়তে। তাঁর কথা মতোই সিঙ্গপেরুমল কোইল নামে একটি ছোট স্টেশনে তাঁরা সকলেই নেমে পড়েছিলেন। প্ল্যাটফর্মেই তাঁর জন্য বিছানা পেতে দেওয়া হয়। আব্দুল করিম কাবার দিকে মুখ করে নমাজ পড়লেন। এর পরে সেই নিঝুম রাতে তানপুরাটি নিয়ে দরবারি কানাড়া ধরেছিলেন। গান শেষে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। এ ভাবেই জীবনের শেষ নিদ্রায় প্রবেশ করেছিলেন আব্দুল করিম।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ যখন বরোদায় পৌঁছেছিল, ফৈয়াজ খান চেঁচিয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘‘হায় আল্লা! আজসে সুর মর গিয়া হিন্দুস্থান মে!’’

ঋণ: কুদ্‌রত্‌ রঙ্গিবিরঙ্গী: কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আনন্দ
কিরানা ঘরানার সুরসম্রাট: বসন্তগোবিন্দ পোদ্দার: দেশ বিনোদন ১৩৮৭
সঙ্গীতরত্ন উস্তাদ আব্দুল করিম খান: আ বায়ো-ডিস্কোগ্রাফি, মাইকেল কিনিয়ার
সাম হিন্দুস্থানি মিউজিশিয়ানস-দে লেট দ্য ওয়ে: অশোক দা রানাডে
দ্য মেকার্স অব মডার্ন মেলোডি: আব্দুল করিম খান: মোহন ডি নাদকর্ণী

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/article-on-ustad-abdul-karim-khan-1.845863?ref=patrika-new-stry

Saturday, 28 July 2018

‘উত্তমের ফুলশয্যায় ট্রাঙ্কের পিছনে লুকিয়েছিলাম’ (On Uttam Kumar)

‘উত্তমের ফুলশয্যায় ট্রাঙ্কের পিছনে লুকিয়েছিলাম’

বসুমতী চট্টোপাধ্যায় মন খুললেন দেওর, বন্ধু উত্তমকুমারকে নিয়ে। সুচিত্রা থেকে সুপ্রিয়া, ফুলশয্যার রাতে আড়ি পাতা— সব গল্প বেরিয়ে এল স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে স্মৃতিচারণে।

uttam

বৌদিদের সঙ্গে দেওর উত্তম। বাঁ দিকে রয়েছেন বসুমতী চট্টোপাধ্যায়।

আমি ওকে উত্তম বলেই জানি। ওর ভাদ্রে জন্ম। আমার আষাঢ়ে। আগে ছিলাম ওর মাসির মেয়ে আর পরে হলাম ওর জ্যাঠতুতো ভাইয়ের বউ। মানে ওর বৌদি। কথায় কথায় টক্কর ঠাট্টা! ও আমায় আহিরিটোলার লোক বলে আওয়াজ দিলেই আমি ওকে ভবানীপুর বলে খেপাতাম! আমি হয়তো বাড়ির কাজে ব্যস্ত, ও এসেই বলে উঠল, ‘নাম রেখেছি বনলতা...’, আমি তৎক্ষণাৎ বলতাম, ‘যে নামেই ডাক তুমি...’।
আমার বিয়ের দু'বছর পর, ১৯৪৮-এ উত্তমের বিয়ে। আমার দশ মাসের বাচ্চা, তাকে এক পিসিশাশুড়ির কাছে রেখে, আর এক ননদকে নিয়ে আমি উত্তমের ফুলশয্যায় আড়ি পাততে গেলাম। উফ! সে কী উৎসাহ আমার। পিসিশাশুড়িকে বলে এসেছিলাম, বাচ্চা কাঁদলেও না ডাকতে। ঘরে চুপটি করে ট্রাঙ্কের পেছনে লুকিয়ে রইলাম। আরে, উত্তমের ফুলশয্যা বলে কথা! দশ বছর বয়স থেকে আমরা একে অপরকে চিনি।
কিন্তু উৎসাহে জল ঢালল ওই বাড়ির এক জন! ট্রাঙ্কের সামনে ধড়াম করে জলের গ্লাস রেখে উত্তমকে ইশারা করতেই ও বুঝে গেল ট্রাঙ্কের পেছনে গন্ডগোল আছে! আমাদের দেখে বলল, ‘‘ওহ, তোমরা পারো! আমার ফুলশয্যা দেখবে তো? বেশ আজ আমি জানলা-দরজা সব খুলে রাখছি। ট্রাঙ্কের পেছনে যাওয়ার কী দরকার? বারান্দা থেকে দেখো সব্বাই!’’ এই ছিল উত্তম।
তবে এত উত্তম, উত্তম করছি, একটা কথা বলি। এই উত্তম নামটা অনেকেই ভাবেন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের পর দেওয়া। তা কিন্তু নয়।
উত্তমের মায়ের নাম ছিল চপলা। উত্তম যখন জন্মেছিল ওর দাদামশাই তখন ওর মাকে বলেছিলেন, ‘বাহ্ চপি, এ তো উত্তম খবর!’ সেই থেকে ওর নাম হয় উত্তম। আর ভাল নাম অরুণ।
আমাদের সকলের জীবনে, পরিবারে ও আলো হয়েই এসেছিল। এই শ্রাবণ মাস এলেই বুকটা বড্ড চিন চিন করে। অমন দিলদরিয়া মানুষ! কিন্তু...
(কিন্তুতে সব চুপ। বাইরে তখন বুক ভাঙা শ্রাবণ। আর নিজের মধ্যে উত্তম নিয়ে ক্লান্ত তিনি!)
একটু সামলে নিয়ে আবার শুরু হল স্মৃতির সঙ্গে বাক বিনিময়...
আমি গুছিয়ে সংসার করতাম। আমার শ্বশুরবাড়িতে লোকজন আসা লেগেই থাকত। কলাপাতার এঁটো নিজে হাতে কুড়োচ্ছি দেখে উত্তমও দেখি হাত লাগাত। কত রকমের কাজ যে ও করতে পারত। আদপে ছিল শিল্পী। বাড়িতে রাশ হবে। উত্তম শোলার পুতুল সাজাতো। মাটির কুঁজোয় চালগুঁড়ো দিয়ে আলপনা দিত। যে কোনও পারিবারিক উৎসবে ও যে কী আনন্দের সঙ্গে যোগদান করত...
দোলের দিন উত্তম বেরিয়ে পড়ত লরি নিয়ে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিজে গলা ছেড়ে গান গাইত। শুটিংয়ের ফাঁকে ছুটি পেয়েছে তো সব্বাইকে গাড়িতে তুলে পিকনিকে যাওয়া হত। উত্তম খুশি নিয়ে নিতে পারতো মনভোলানো হাসি দিয়ে। লোকজন, আড্ডা, খাওয়া, গান গিরীশ মুখার্জি রোডের ওই বাড়িটা একটা মানুষের জন্য গমগম করত।

বসুমতী চট্টোপাধ্যায় এখন যেমন।
এক দিন বাড়িতে রান্না করছি হয়তো। উত্তম এসে বলল, ‘‘বউদি, আমার গেস্ট এসেছে। একটু কথা বলবে এসো।’’ এটা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। আমরা তো পাশাপাশি থাকতাম। ও বাড়িতে কেউ এলেই ও আমায় ডাক দিত। আমি খুব কথা বলতে পারতাম যে। আর গৌরী একটু চুপচাপ ধরনের ছিল। তো যাই হোক, গিয়ে দেখি ওমা, সুচিত্রা সেন আর ওর মেয়ে মুনমুন! একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম সে দিন। আশা করি এখানে বললে কেউ আমায় তেড়ে আসবে না। অমন রূপবতী, ব্যক্তিত্বময়ী সুচিত্রা। সে দিন দেখলাম চমৎকার শাড়ির একটু ছেঁড়া। পিনের খোঁচার মতো। হয়তো খেয়াল করেনি। তবে সুচিত্রা ওই বাড়িতে খুব যে আসতে পারত এমন নয়। গৌতমের পাঁচ বছরের জন্মদিনে আর উত্তমের বাবার মৃত্যুদিনে এসেছিল। সে দিন অনেক ক্ষণ ছিল। তখন তো ওদের ‘সপ্তপদী’-র শুট চলছে। আর যে বার এসেছিল সে বার তো উত্তম নিজেই নেই! উফ! কী দিন...সেই চব্বিশে জুলাই।
পরিবার নিয়ে থাকতে ভালবাসত উত্তম। পরিবারে জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো কোনও ভাই অসুস্থ কানে এলেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা, খরচ, সব কিছুর দায়িত্ব ও নিত। কাউকে মুখ ফুটে চাইতেও হয়নি। আমাদের পরিবারে বিয়ের কথা শুনলেই ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। অন্য দিকে, পরিবারের কোনও মানুষের থেকে এতটুকু সাহায্য পেলে আজীবন সকলের সামনে সেটা স্বীকার করে গেছে। প্রথম দিকের কথা, উত্তমের কোনও একটা ছবিতে ঘোড়া চড়তে হবে। উত্তম ঘোড়া চড়তে জানে না। তখন ওর হাতে টাকা ছিল না। আমার দেওর ওকে একশো টাকা দেয়। সেই ঘটনা ‘নায়ক’-এর জন্য ভেনিস থেকে অ্যাওয়ার্ড নিয়ে ফিরেও সকলকে বলেছিল। এইটুকু তো ঘটনা! ক’জন বলে? শুধু কি তাই? উত্তমকুমার মহানায়ক হওয়ার পরেও সকলকে বলত, ‘‘আমি সকলের সাহায্য পেয়েছি বলে এ ভাবে অভিনয় করেছি। আমার পরিবারেই এমন কেউ আছে যে আমার মতো সাহায্য পেলে উত্তমকুমার হতে পারত।’’ আজকের যুগে ক’জন অভিনেতা এমন বলতে পারবেন?
অথচ নিজে যখন ‘ছোটিসি মুলাকাত’ করে আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হল? জানি, সেই সময়টা খুব খারাপ গেছে ওর জীবনে। বলতে দ্বিধা নেই, তখন সুপ্রিয়া ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল। পরে যা-ই হয়ে থাক, সুপ্রিয়া ওকে ভালবাসত। ঝগড়াও হয়েছে ওদের।
সিনেমা জগতের মহানায়ক, কিন্তু তাই বলে আমরা পরিবারের কেউ যখন-তখন ওর শুটিং দেখতে চলে যাব, এমনটাও ছিল না। বাড়িতে ফিল্ম নিয়ে আলোচনা বা হামবড়াই, এ সব ওর স্বভাবেই ছিল না। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে বসুশ্রীতে প্রিমিয়ারে যাওয়ার নেমন্তন্ন পেতাম। কিন্তু...
(বৃষ্টি কিছু ক্ষণ থেমে গিয়েছিল। আবার অঝোর শ্রাবণ...)
কী বলতে চাইছেন তিনি?
ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তাঁর।
মানুষটা এত করেছে পরিবারের সকলের জন্য। মানুষটাকে নিজের ঘরে কেউ রাখতে পারল না? ফিরিয়ে আনতে পারল না? জানেন এমন মানুষ কেন?
লোকে ওকে পুজো করেছে। ভালবেসেছে। কত মানুষের মনের মানুষ ও আজও! কিন্তু ওর মনের মানুষ ও পায়নি। আজীবন খুঁজেছে। বাড়ি ছেড়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। কেউ আটকালো না! কেউ ওকে আনতে গেলে আমি জানি ও নিশ্চয় ফিরে আসত।
কই হল সে সব?
বড় হয়ে ওঠার প্রত্যেকটা ব্যর্থ দুপুর আর নিষ্ফল রাতে যে ছিল আমার বন্ধু, বছরের পর বছর আমার সঙ্গে নিজের স্বামী, কন্যার খুশির মুহূর্তরা এঁটো হাতের গল্পে, হাতে হাত মিলিয়ে নেমন্তন্ন বাড়িতে পরিবেশনের গল্প ভাগ করে নিয়েছি। ওর চলে যাওয়ার জন্য কেঁদেছি, সেই কান্নাকে কখন যেন বিদায় দিয়েছি। হয়তো মন শুকনো রাখার তাগিদেই। 
কিন্ত মন কি মানে?
বয়স ফুরনো এই নারীর মধ্যে সন্ধের উত্তম শ্রাবণ হয়ে ঝরে যায়।

https://www.anandabazar.com/entertainment/basumati-chatterjee-remembers-uttam-kumar-on-his-death-anniversary-dgtl-1.837329

জাগাও কবিকে, ও সে ঘুমে অচেতন (On Rajanikanta Sen)

জাগাও কবিকে, ও সে ঘুমে অচেতন

হাসপাতালে মারাত্মক রোগযন্ত্রণায় কেটেছে জীবনের শেষ কয়েকটি মাস। কথা বলা, গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল চিরতরে। তবু তাঁর গানে, কবিতায় অশেষ সমর্পণ আর শরণাগতি। ২৬ জুলাই ছিল রজনীকান্ত সেনের জন্মদিন। লিখছেন শিশির রায়।

 
Rajanikanta Sen

রজনীকান্ত সেন

‘‘কী লিখবেন রজনীকান্ত সেন সম্পর্কে?’’
আপনিই বলে দিন, কী লিখব আপনার দাদুকে নিয়ে। কী লেখা উচিত, বলুন।
‘‘রজনী সেনের মতো এক জন মানুষ কী খেতেন, কী পরতেন, এই সব লেখার জিনিস নয়। লিখলে ওঁর গান নিয়ে লিখতে হয়। ওঁর ভাব নিয়ে, ওঁর গানের কথায় সমর্পণ, ভক্তি নিয়ে লিখতে হয়। ওঁর সুরে বৈচিত্র নেই, রামপ্রসাদ থেকে কাঙাল হরিনাথ, প্রচলিত সবার সুর নিয়েছেন। নিয়ে মিশিয়েছেন নিজের সারল্য, শরণাগতি। এগুলো ধরতে পারলেই রজনী সেনকে ধরা যাবে।’’
জুলাইয়ের সন্ধে নেমে এসেছে তখন। ডোভার লেনের এই শান্ত, চুপচাপ, একতলা বাড়িটা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে কাজফেরতা সান্ধ্য বিনোদন, পানভোজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর একটা কলকাতা। আর এই ঘরে, চেয়ারে বসে আছেন যে মানুষটা, তাঁর বয়স একশো এক পেরিয়ে দুই। রজনীকান্ত সেনের সার্ধশতবর্ষ পেরিয়েছে গত বছর, আর আমার চোখের সামনে এক জীবন্ত শতবর্ষ! তাঁর বসার ভঙ্গি ঋজু, কণ্ঠস্বর অকম্প্র, আর স্মৃতিশক্তি? নিখুঁত, নির্ভুল, অবিরল কান্তকবিতা বলে চলেছেন, ‘‘ওরে, ওয়াশীল কিছু দেখিনে জীবনে, সুধু ভূরি ভূরি বাকি রে;/ সত্য সাধুতা সরলতা নাই, যা আছে কেবলি ফাঁকি রে।/... কত যে মিথ্যা, কত অসঙ্গত স্বার্থের তরে ব’লেছি নিয়ত;/ (আজ) পরম পিতার দেখিয়া বিচার, অবাক্‌ হইয়া থাকি রে!’’ আজকের প্রজন্ম ‘ওয়াশীল’ শব্দের অর্থ জানে?
‘‘জানবে কী করে? একটা বড় মানুষকে, প্রতিভাকে সংরক্ষণ করে প্রথমত তার পরিবার। তাঁদের মধ্য দিয়েই তো ভবিষ্যৎ দেশ-কাল জানবে তাঁকে। উই আর ভেরি ব্যাড প্রিজ়ার্ভার্স। আমার মামারা, এমনকি দিদিমাও তেমন বলতেন না পরে, দাদুর কথা। দিদিমা বলতেন, মেডিক্যাল কলেজে যে রাতে উনি চলে গেলেন, ওই শোকের মধ্যে শুধু এটাই মনে হয়েছে, কাল সকালে আমার এতগুলো ছেলেমেয়েকে আমি কী খাওয়াব?’’
রজনীকান্তের স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী, প্রৌঢ় বয়সে
শুনে মনে হচ্ছে তো, বাঙালি প্রতিভা আর মনীষার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে যে, সেই আদি ও অকৃত্রিম দারিদ্রের আর একটা উদাহরণের গল্প শুনতে বসেছি? আদৌ তা নয়। রজনীকান্তের গলায় ক্যানসার হয়েছিল, ১৯১০ সালের কলকাতায় ক্যানসারের চিকিৎসা কোথায়? তাঁর ডায়েরিতে পাওয়া যায়: ‘‘...গলায় একটা ছিদ্র করে দিয়েছে। সেইখান দিয়ে নিশ্বাস চলছে। গলার ক্যান্সার যেমন, তেমনি গলার মধ্যে বসে রয়েছে। তার তো কোনও চিকিৎসাই হচ্ছে না।...’’ তবু কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ১২ নম্বর কটেজ ওয়ার্ডে রজনীকান্ত সেন যে মাস সাতেকের চিকিৎসা পেয়েছিলেন, তা কিন্তু রীতিমতো খরচসাপেক্ষ ছিল। দোতলা কটেজে অনেক ঘরে পরিবারের সবাই এমনকি দর্শনার্থীরাও থাকতে পারতেন ভাল ভাবে, সর্বক্ষণ ডাক্তার, নার্স, প্রয়োজনীয় ও জরুরি পরিষেবা সবই পাওয়া যেত— কিন্তু এই সব কিছুতেই তো প্রয়োজন অর্থের। রজনীকান্ত অতুলপ্রসাদের মতো পসারওয়ালা উকিল ছিলেন না ঠিকই, তবে রাজশাহীতে তাঁর অর্থাভাব ছিল না। কিন্তু তিনি সঞ্চয় করেননি, ও জিনিসটা তাঁর ধাতে ছিল না। চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে তাঁর ঋণ হয়েছিল, তিনি বন্ধু-পরিজনদের ‘দান’ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থসাহায্য করেছিলেন দীঘাপতিয়ার কুমার শরৎকুমার রায়, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বিচারপতি সারদাচরণ মিত্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অশ্বিনীকুমার দত্ত-সহ বহু শুভার্থী গুণিজন। এর পাশাপাশিই পড়া যেতে পারে রজনীকান্তের মেয়ে শান্তিবালার (শান্তিলতা রায়) লেখা: ‘‘বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পরে আমার মা মহারাজার কাছ থেকে মাসিক সাহায্য ও বাবার ঋণ শোধের জন্য পাওনা সমস্ত টাকাই মহারাজের অনুরোধে মহারাজার কাছেই শোধ করে দিয়েছিলেন। দেশবাসী সকলের ধারণা হয়েছিল যে বাবা কপর্দকহীন দরিদ্র ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভিতরকার কথা কিছু জানতেন না। সেই জন্য এই কথা কয়টি আমায় বলতে হল।...’’
মেয়ে শান্তিবালা দেবী (শান্তিলতা রায়)
এই শান্তিবালার কথা উঠতেই সামনে বসা মানুষটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘‘আমার মা-ই তো গলায় তুলে নিয়েছিলেন দাদুর অনেক গান!’’ রজনীকান্তের এক ছেলে (ভূপেন্দ্র) ও এক মেয়ে (শতদলবাসিনী) অসুখে ভুগে মারা যাওয়ার পরে বাকি ছেলেমেয়েদের চোখের আড়াল করতে চাইতেন না গায়ক-কবি। তাঁদের মধ্যেও ছেলে ক্ষিতীন্দ্র ও মেয়ে শান্তিবালার কথা বলতে হয় আলাদা করে। এঁরাই তাঁদের বাবার অধিকাংশ গান শিখে নিয়ে গাইতেন— উৎসব-অনুষ্ঠানে বা বাড়িতে। একটু বলুন না, মায়ের কাছে শোনা কোনও বিখ্যাত গান তোলার ঘটনা, বা অন্য কোনও গানের গল্প?—  সাংবাদিকসুলভ কৌতূহলকে মুহূর্তে দমিয়ে দেন গম্ভীর বরিষ্ঠ মানুষটি: ‘‘ঘটনা আবার কী? বাবার কাছে মেয়ে গান শিখছে, যেমন শেখে— চলতে-ফিরতে। হয়তো নতুন গান লিখেছেন একটা, মেয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ডেকে তুলিয়ে দিলেন। এ ভাবেই মায়ের শেখা। পরে ওঁর কাছ থেকে আমার।’’
রজনীকান্তের গানের গল্প লিখে গিয়েছেন অন্যেরা। যেমন জলধর সেন। রাজশাহী লাইব্রেরিতে সাহিত্যসভা, সেখানে যাওয়ার পথে বন্ধু অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র বাড়িতে এসেছেন রজনীকান্ত। বন্ধুই বললেন, খালি হাতে কেন সভায় যাবে, একটা গান বেঁধে নাও। জলধর সেন শুনে অবাক, সভা শুরু হতে বাকি এক ঘণ্টা, এখন গান বাঁধা হবে? তার পরে সুর দেওয়া, তারও পরে গাওয়া? রজনীকান্ত কিন্তু এক কোণে টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। খানিক ক্ষণ চুপচাপ, তার পর একটা কাগজ টেনে খসখস লেখা। সেই গানই ছিল ‘তব চরণ-নিম্নে, উৎসবময়ী শ্যাম-ধরণী সরসা’। আর ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’, যে গানের মধ্য দিয়ে রজনীকান্ত হয়ে উঠেছিলেন সারা বাংলার ‘কান্তকবি’, তার জন্মকাহিনিও তো চমৎকার। বঙ্গভঙ্গের সময়ে স্বদেশি আন্দোলনে উত্তাল কলকাতায় অক্ষয়কুমার সরকারের মেসে এসেছেন রজনীকান্ত। মেসের ছেলেরা ধরে বসল, একটা গান লিখে দিতে হবে। স্থায়ী আর অন্তরাটুকু লিখে রচয়িতা নিজেই যারপরনাই উত্তেজিত, ‘‘চল জল’দার ওখানে যাই।’’ কী না, ওখানে ‘আদ্ধেক’ গান কম্পোজ় হতে হতে বাকিটা লেখা হয়ে যাবে। জল’দা মানে জলধর সেন, ‘ওখানে’ মানে ‘বসুমতী’র দফতরে। সত্যিই তাই হল! এক দিকে কম্পোজ় চলছে, অন্য দিকে বাকি গান লেখা হচ্ছে। তার পর গানের সুর হল, কাগজে ছাপা গান নিয়ে চলে গেল মেসের ছেলেরা। সন্ধেয় জলধর সেন বিডন স্ট্রিটের এক বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে আছেন। হঠাৎ শুনলেন, দূর থেকে এক দল ছেলে গান গাইতে গাইতে আসছে। কয়েক ঘণ্টা আগে বসুমতীর প্রেসে ছাপা গান— ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’। আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর লেখাতেও আছে, বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার কয়েক দিন পর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে তরুণ-যুবার দল খালি পায়ে হাঁটছে আর ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ গাইছে। শুনে রোমাঞ্চ হয়েছিল তাঁর।
রাজশাহীর বাড়ি। ২০১৪ সালের ছবি
বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের ভাঙাবাড়ি গ্রামের ছেলে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন আর এক শহর রাজশাহীতে। জ্যাঠামশাই ও বাবার পথে গিয়ে নিজেও আইন পড়ে ওকালতি পেশায় এসেছেন। কিন্তু মন ছিল সাহিত্যেই। বৈষ্ণব ভক্তিতে বিবশ তাঁর মুন্সেফ বাবা ব্রজবুলিতে রচনা করেছিলেন ‘পদচিন্তামণিমালা’। ও দিকে জ্যাঠামশাই পরম শাক্ত, বাড়িতে দুর্গাপূজা করেন, বলি দেন। রজনীকান্ত এই দুই ধারা থেকেই ছেঁকে নিয়েছিলেন বিশুদ্ধ ভক্তিটুকু। মায়ের মুখে রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সে কালের নাটকগুলির পাঠ শুনতেন, আর তা বসে যেত মাথায়, মনে। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল। নিজেই বলেছেন সে কথা: ‘‘বই একবার পড়্‌লে প্রায় মুখস্থ হ’ত... একটা পরখ এখনও দিতে পারি। যে কোন একটা চারি লাইনের সংস্কৃত শ্লোক (যা আমি জানি না) তুমি একবার ব’লবে, আমি immediately reproduce কর্‌ব। একটুও দেরী হবে না।’’
রজনীকান্ত সংস্কৃত জানতেন দুর্দান্ত। রাজশাহী কলেজে তাঁর সহপাঠীরা সাক্ষী, মাস্টারমশাইয়ের ক্লাসে আসতে দেরি হলে তিনি মুখে মুখে সংস্কৃত কবিতা বানাতেন, ব্ল্যাকবোর্ডে সংস্কৃত ধাঁধা লিখতেন। মাস্টারমশাইদের নকল করে ছড়া কাটতেন সংস্কৃতে, কখনও ব্যাকরণে সুপণ্ডিত কিন্তু জনসমক্ষে বক্তৃতায় অপটু মাস্টারমশাইকে নিয়ে, কখনও বৃহদ্বপু শিক্ষকের মোটা পেটটি নিয়েও: অজরো(অ)মরঃ প্রাজ্ঞঃ হরগোবিন্দশিক্ষকঃ।/ বেতনেনোদরস্ফীতঃ বাগ্‌দেবী উদরস্থিতা।। (মাস্টারমশাই হরগোবিন্দবাবু অজর, অমর,
প্রাজ্ঞ। মাসমাইনে পেয়ে পেটটি মোটা, বিদ্যেও সমস্তটাই পেটে (মুখে সরে না)।
এই ছেলে যে পরে হাসির গান-কবিতায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে পাল্লা দেবেন, আশ্চর্য কী! ‘সাধনা’ পত্রিকায় দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির কবিতা ‘আমরা ও তোমরা’ বেরিয়েছে (যা আবার রবীন্দ্রনাথের করুণরসাশ্রিত কবিতা ‘তোমরা এবং আমরা’র দ্বিজেন্দ্র-প্রতিক্রিয়া), রজনীকান্ত সমান হেসে ও হাসিয়ে লিখলেন ‘তোমরা ও আমরা’— ‘উৎসাহ’ পত্রিকায়। জীবনের শেষ দিকে যখন গলার ক্যানসারে বাক্‌রুদ্ধ, হৃতকণ্ঠ, তখনও ডায়েরিতে লিখে গিয়েছেন ‘জোক’: ‘‘একটা রাখাল দুটো গরু নিয়ে যাচ্ছিল— তার একটা খুব মোটা, আর একটা খুব রোগা। একজন উকীল সেই পথে যান। তিনি রাখালকে জিজ্ঞাসা কর্‌লেন,— তোর ও গরুটা অত মোটা কেন, আর এটা এত হাল্‌কা কেন? এটাকে খেতে দিস্‌নে না কি? রাখাল উকীলকে চিন্‌ত; ব’ল্লে— আজ্ঞে না। মোটাটা উকীল, আর রোগাটা মক্কেল,— রাগ কর্‌বেন না।’’
এ রকমই মানুষটা। সমাজের অবক্ষয় দেখে— ডাক্তার, মোক্তার, উকিলের সমাজ-শোষণ দেখে— কবিতা লিখে গিয়েছেন। আমরা রজনীকান্তকে ‘পঞ্চকবি’র মধ্যে পুরে দিয়েই খালাস, ওঁর গান যদিও বা একটু শুনি-জানি, ওঁর কবিতা (অনেক কবিতা যদিও গানই) নিয়ে চর্চা হয় না বললেই চলে। অথচ মানুষটা উঠতে-বসতে লিখেছেন। টুকরো কাগজে গান বা কবিতা লিখে টেবিলে রেখে দিতেন বা জামার পকেটে। সেই কাগজের টুকরো হয়তো উড়ে গিয়েছে টেবিল থেকে। ওঁর স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী উদ্ধার করেছেন পরে। কত গান, কবিতা হারিয়েও গিয়েছে এই ভাবে। ওকালতি পেশা ছিল বলেই করতেন। কুমার শরৎকুমার রায়কে চিঠিতে লিখেছেন: ‘‘আমি আইনব্যবসায়ী, কিন্তু আমি ব্যবসায় করিতে পারি নাই। কোন্‌ দুর্লঙ্ঘ্য অদৃষ্ট আমাকে ঐ ব্যবসায়ের সহিত বাঁধিয়া দিয়াছিল, কিন্তু আমার চিত্ত উহাতে প্রবেশ লাভ করিতে পারে নাই। আমি শিশুকাল হইতে সাহিত্য ভালবাসিতাম; কবিতাকে পূজা করিতাম; কল্পনার আরাধনা করিতাম; আমার চিত্ত তাই লইয়া জীবিত ছিল।’’ বেঁচে থাকতে তিনটে বই বেরিয়েছিল ওঁর, ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’, ‘অমৃত’। ওঁর কবিতা এমন সাড়া ফেলেছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই একটা বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়। ছোটদের নীতিশিক্ষার জন্য লিখেছেন ‘সদ্ভাব-কুসুম’। হাসপাতালে দুঃসহ রোগযন্ত্রণার মধ্যেও লিখেছেন উমার আগমনী ও বিজয়া সঙ্গীতকাব্য ‘আনন্দময়ী’। আরও আছে— কাব্যগ্রন্থ ‘অভয়া’, ‘বিশ্রাম’, একেবারে শেষের দিকের লেখাগুলি নিয়ে ‘শেষ দান’। চিকিৎসার খরচ জোগাতে ‘বাণী’ ও ‘কল্যাণী’র গ্রন্থস্বত্ব আর কিছু বিক্রি না হওয়া বই বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন মাত্র চারশো টাকায়। স্ত্রী কেঁদে আকুল। তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘আমাকে যদি দয়াল আর কিছু দিন বাঁচিয়ে রাখে তবে শত সহস্র বাণী, কল্যাণী লিখে তোমার পায়ে অঞ্জলি দেব, তুমি আর কেঁদো না।’’ রোজনামচায় লিখে গিয়েছেন, ‘‘আমার এমন অবস্থা হ’ল যে, আর চিকিৎসা চলে না, তাইতে বড় আদরের জিনিষ বিক্রয় ক’রেছি। হরিশ্চন্দ্র যেমন শৈব্যা ও রোহিতাশ্বকে বিক্রয় ক’রেছিলেন। হাতে টাকা নিয়ে আমার চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছিল।...’’
রজনীকান্তের ডায়েরি পড়লে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। এই রোজনামচা বিখ্যাত মানুষের অন্তরকাব্য নয়, পাশের মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন থেকে তার জন্ম। নিজের রোগের কথা নিজেই লিখছেন: ‘‘গলনালী আর শ্বাসনালী দুটো জিনিষ আছে। আমার ভাত খাবার নালীর মধ্যে ঘা নয়, নিঃশ্বাসের নালীর মধ্যে ঘা, সেখানে কোনও ঔষধ লাগানো যায় না।’’ গান গাওয়ার সময় সময়ের হিসেব থাকত না রজনীকান্তের। রংপুরে গিয়ে সন্ধে থেকে রাত একটা-দেড়টা পর্যন্ত টানা গান গাইছেন, আবার পরের দিন অবিশ্রান্ত। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সাহেব ডাক্তার দেখে জানিয়েছিলেন, ‘ওভারস্ট্রেনিং অব ভয়েস’ই সম্ভবত অসুখের কারণ। ধুম জ্বর, খেতে যন্ত্রণা, গলা ফুলে ওঠা, কাশিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ট্রাকিয়োটমি অপারেশন করে গলায় শ্বাসপ্রশ্বাস চলাচলের জন্য ছিদ্র করে বসিয়ে দেওয়া হল রবারের নল। বন্ধ হয়ে গেল গান, কথা বলা— পরে খাওয়াও। বিছানার পাশে কাগজ-পেনসিল থাকত, সেখানেই লিখে দিতেন দরকারি কথা, মনের কথাও। সেই সব টুকরো টুকরো লেখা পড়ে মানুষটার শেষের ক’মাসের প্রতিটি দিন অনুমান করা যায় মাত্র, তল পাওয়া যায় না।
‘‘তোমাদের মতন যদি আমার আগেকার মত Loud Logic থাক্‌তো তবে তর্ক করতেম। তোমরা চট করে বলে ফেল, উত্তর লিখ্‌তে আমার প্রাণান্ত।’’
‘‘আমার শ্রাদ্ধে বেশি খরচ ক’র না। কিন্তু যেমন পিপাসা তেমনি খুব জল দিও। আম উৎসর্গ করিও। জল দিতে কৃপণতা ক’র না। বড় পিপাসায় ম’লাম, জল দিও।’’
‘‘আমি একটু বাঙ্গালা সাহিত্যের আলোচনা করেছিলাম ব’লে বাঙ্গালা দেশ আমার যা কর্‌লে তা unique in the annals of Bengali Literature. এই সাহিত্য-প্রিয় বাঙ্গালা দেশ, মানে— Literature-loving section of Bengalis bearing the major portion of my expenses. Is it not unprecedented in a poor country like mine?’’
সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন কান্তকবির সাহায্যে। কুমার শরৎকুমার রায় টাকা পাঠাতেন। মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ওঁর সংসারের, ছেলেদের পড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। হাসপাতালে কত যে মানুষ রোজ আসতেন, তার ইয়ত্তা নেই। মেডিক্যাল কলেজের ছেলেরা পালা করে ওঁর শুশ্রূষা করতেন, কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হেমেন্দ্রনাথ বক্সী তো ছায়ার মতো থাকতেন ওঁর পাশে। স্কুল-কলেজের ছেলেরা রজনীকান্তের ‘অমৃত’ নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে বিক্রি করে সেই টাকা তুলে দিয়েছিল কবির হাতে। মিনার্ভা থিয়েটারে ‘রাণাপ্রতাপ’ ও ‘ভগীরথ’ নাটকের স্পেশ্যাল শো হয়েছিল সারদাচরণ মিত্রের উদ্যোগে, রজনীকান্ত সম্পর্কে গিরিশ ঘোষের লেখা পাঠ করা হয়েছিল অভিনয়ের আগে। সেই সন্ধ্যার টিকিট-বিক্রির বারোশো টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল ওঁকে। বরিশাল থেকে উকিলরা টাকা তুলে পাঠিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় হাসপাতালে তাঁকে দেখতে এসে বলেছিলেন, ‘‘আমার আয়ু নিয়ে আপনি আরোগ্য লাভ করুন!’’
এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রোগযন্ত্রণা ভুলে রজনীকান্ত সে দিন হেঁটে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। সে দিনের করুণ বর্ণনা ধরা আছে মেয়ে শান্তিবালার লেখায়। ‘‘কাকে দেখতে এসেছি, কাকে দেখছি,’’ বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রজনীকান্ত তো কথা বলতে পারেন না, কাগজে লিখেই জানিয়েছিলেন তাঁর মনের ভিতরের তোলপাড়। রাজশাহীতে নাটকের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাণী’তে রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, সেই কথা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে রজনীকান্তের গান শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই স্মৃতি। ছেলেমেয়েদের ডেকে গান শোনাতে বললেন— ‘বেলা যে ফুরায়ে যায় খেলা কি ভাঙে না হায়...’ নিজে অর্গান বাজিয়েছিলেন সঙ্গে। চলে যাওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন, ‘‘আমায় আশীর্বাদ করুন, দয়াল শীঘ্র আমাকে তার কোলে নিয়ে যান।’’ সে দিন রাতেই গান লিখে বোলপুরে পাঠালেন— ‘আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করিয়া গর্ব করেছ দূর’। আর বোলপুর থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিটা তো ইতিহাস: ‘‘শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে কিন্তু সঙ্গীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই। পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে ম্লান করিতে পারে নাই।...আত্মার এই মুক্ত স্বরূপ দেখিবার সুযোগ কি সহজে ঘটে।’’
বন্ধু যাদব গোবিন্দ সেনকে কথা দেওয়া আছে, তাই হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থাতেও বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। খুব ইচ্ছে ছিল নিজে রাজশাহী গিয়ে ছেলের বিয়ে দেবেন, তা হয়নি। নববধূ হাসপাতালে এসে শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করতে, তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘‘মা তুমি আনন্দময়ী হয়ে ঘরে থাকো। বড় কষ্ট পাচ্ছি মা। আমার একটু আরামের জন্য তাঁর কাছে প্রার্থনা করিস। লক্ষ্মীরূপিণী মা, তোর প্রার্থনা সেই দয়াল শুনবেন।’’
মৃত্যু ক্রমশ এগিয়ে আসছে দেখতে পাওয়া একটা মানুষ কেমন আচরণ করে? সাহিত্যে-সিনেমায় উদাহরণ ভূরি ভূরি। রোজকার বাস্তবে, মুমূর্ষু প্রিয়জনদের মধ্যেও কি দেখিনি? তীব্র অবিশ্বাস। অতল হতাশা। আকুল কান্না। যে আসছে, বসছে পাশে, তাকেই আঁকড়ে ধরা, ভেঙে পড়া। রজনীকান্তও রোগমুক্তির আশায় ছুটে গিয়েছেন কাশী, বালাজি মহারাজের নিদান মেনে গঙ্গাস্নান করেছেন, প্রলেপ লাগিয়েছেন গলায়। তাঁর বৃদ্ধা মা ছুটে গিয়েছেন তারকেশ্বরে, হত্যে দিয়েছেন। ইউনানি, কবিরাজি চিকিৎসা, কাঁচরাপাড়ার পাগলাবাবা— সব দেখানো হয়েছে। এ দিকে মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসা, গলার ভিতরে এক্স-রে, ক্রমাগত ইঞ্জেকশন। কাজ হয়নি কিছুতেই। হওয়ারও ছিল না। এক দিন সবাইকে ডেকে বললেন, ‘‘আমার ছোট ছেলেটার মাত্র দু’বছর বয়স, ওকে আমার কোলে দিয়ে একটা ফটো তুলে রাখ। বড় হয়ে ও দেখবে ওরও বাবা ছিল।’’
সামনে খাবার, খেতে পারেন না। অসম্ভব পিপাসা, কিন্তু জল দিলে সব পড়ে যায় বুক বেয়ে। মুখ দিয়ে কখনও বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধময় পুঁজ-রক্ত। রাতের পর রাত ঘুম হয় না। তাই কাগজ টেনে রজনীকান্ত সেন লিখে যান একের পর এক লেখা— গান। কবিতা। মনের কথা। কখনও মাকে, কখনও দয়ালকে। সেই গানে যন্ত্রণা কোথায়, বরং অশেষ কৃতজ্ঞতা। ছত্রে ছত্রে নিঃশেষ সমর্পণ, শান্ত শরণাগতি। এক দিন গেয়েছিলেন ‘আমি অকৃতী অধম ব’লেও তো মোরে কম ক’রে কিছু দাওনি’, সেই তিনিই হাসপাতালে বসে লেখেন ‘সেখানে সে দয়াল আমার বসে আছে সিংহাসনে’ বা ‘ওগো, মা আমার আনন্দময়ী, পিতা চিদানন্দময়’। অন্তরে কোন সাধন থাকলে এমন লেখা যায়? এক দিন কাগজের টুকরোয় লেখা ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব’ গানখানি দেখে স্ত্রী উদ্বেগে বলেছিলেন, কথা দাও, এ গান তুমি আর গাইবে না। রজনীকান্তও গাননি আর। তবে হাসপাতালে বলে গিয়েছিলেন, তাঁর শেষযাত্রায় যেন এই গানই গাওয়া হয়। শান্তিবালার লেখায় আছে রজনীকান্তের মৃত্যুর অনেক বছর পরের এক স্মৃতি। সিলেটে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতির সভা, রবীন্দ্রনাথ এসেছেন। মেয়েরা রবীন্দ্রনাথকে তাঁরই গান শোনালেন, তার পর কবিকে অনুরোধ করলেন একটা গান গাইতে। রবীন্দ্রনাথ সে দিন গেয়েছিলেন রজনীকান্তের গান, ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিনমর্ম মুছায়ে...।’
রাত গড়াচ্ছে। উঠতে হবে এ বার। উসখুস মন তবু ‘শেষ কথা’ শুনতে চায়। রাজশাহীতে গিয়েছেন? ওঁর বাড়িটা এখন... উত্তর এল, বাড়িটা আছে। জরাজীর্ণ দশা। এক পাশে কয়েকটা ঘর নিয়ে একটা ব্যাঙ্কের অফিস। রজনীকান্তের স্মৃতি কিছু নেই। ‘কান্তকবির বাড়ি’ জাতীয় একটা ফলকও চোখে পড়েনি।
গড়িয়াহাটে রাস্তা পেরোতে কানে বাজছিল শতায়ুর কণ্ঠস্বর, ‘‘উই আর ভেরি ব্যাড প্রিজ়ার্ভার্স...’’
কৃতজ্ঞতা:
দিলীপকুমার রায়, অর্চনা ভৌমিক, আশীষ সেনগুপ্ত, মধুমিতা ঘোষ

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/article-on-rajanikanta-sen-1.839133?ref=patrika-new-stry