Sunday, 10 June 2018

বেদের ভাষা থেকে পানশালার হাঁকডাকও আছে তাঁর ব্যাকরণে ( On Panini )

বেদের ভাষা থেকে পানশালার হাঁকডাকও আছে তাঁর ব্যাকরণে

তিনি পাকিস্তানের তক্ষশীলার বাসিন্দা। কোন সময়ের লোক, তা নিয়ে মতভেদ প্রবল। কিন্তু তাঁর হাত থেকেই জন্ম নিল সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ। পাণিনি সংস্কার করেছিলেন বলেই তো এ ভাষা সংস্কৃত!

মৌ দাশগুপ্ত
 
Graphics

ছবি: বৈশালী সরকার

দেশ সলাতুর। নাম পাণিনি। মা দাক্ষী। বাবার অথবা গোত্রের নাম পাণিন। এর বেশি কিছু জানা যায় না সারা পৃথিবীর সর্বকালের অত্যাশ্চর্য ব্যাকরণের রচয়িতা পাণিনির সম্পর্কে, আমেরিকার গঠনতাত্ত্বিক ভাষাতত্ত্বের জনক লিওনার্দ ব্লুমফিল্ডের মতে যিনি ‘মনুমেন্ট অব হিউম্যান ইনটেলিজেন্স’, এবং যাঁর ভাষাদর্শনে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন আধুনিক গঠনতাত্ত্বিক ভাষাতত্ত্ব আর সেমিয়োটিক্স–এর পথিকৃৎ ফার্দিনান্দ দ্য সাস্যুর । 
কে এই পাণিনি আর কেমন-ই বা তাঁর সেই ‘অত্যাশ্চর্য’ ব্যাকরণ, যা নিয়ে এত মাতামাতি এই একবিংশতি শতকেও? এ বিষয়ে আলোচনা একটু গোড়া থেকে শুরু করা ভালো। 
প্রাচীন ভারতের প্রায় সমস্ত শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যের রচনাকাল নিয়েই বিতর্কের যেমন শেষ নেই, পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ও তার ব্যতিক্রম নয়। খ্রিস্টজন্মের মোটামুটি চারশো বছর আগে পাণিনির জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এ-মতের বিপক্ষেও অবশ্য কিছু কম যুক্তি নেই, আর সেগুলির মধ্যে কয়েকটি আবার নেহাত ফেলনাও নয়, সেগুলি গ্রহণ করলে আরও পিছিয়ে যাবে পাণিনির কাল।
বেদের যুগের শেষ স্তরে পাণিনির আবির্ভাব; তাঁর অন্তত দেড় হাজার বছর আগে থেকে যে বৈদিক সাহিত্য সঙ্কলিত হতে শুরু করে, তার ভাষা পাণিনির সময়ে আমজনতার কাছে ক্রমশ অতিপ্রাচীন এবং দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে থাকে— যেমনটা হাজার বছরের পুরনো চর্যাপদের ভাষা আধুনিক বাংলাভাষীর কাছে হয়েছে। বেদের ভাষার ব্যাপারটা অবশ্য অনেক গুরুতর ছিল কারণ সুবিপুল বৈদিক সাহিত্য ছিল সম্পূর্ণই শ্রুতিনির্ভর, অর্থাৎ শুধুমাত্র শুনে শুনে তা মনে রাখতে হত। বৈদিক সাহিত্য হল আর্যসংস্কৃতির ভিত্তিস্তম্ভ, তাই তাকে অতি যত্নে রক্ষা করাটা ধর্ম বলে মনে করা হত। কোনও ভাবে বেদের একটুও বিকৃতি ঘটতে দেওয়া যাবে না, তার একটি বর্ণ, মাত্রা বা অক্ষরও হারিয়ে গেলে চলবে না। এই প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম নিল বেদাঙ্গ সাহিত্য। বৈদিক সাহিত্য যে কত বিশাল, তা এটুকু বললেই পরিষ্কার হবে যে চার বেদের মধ্যে শুধু ঋগ্বেদ-সংহিতার মন্ত্রসংখ্যাই হল প্রায় সাড়ে দশ হাজার, এর পরে আছে তার ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ, সবই আবার একাধিক শাখায়। এ হেন বেদকে সম্পূর্ণ অলিখিত অবস্থায় সংরক্ষণ করতে হলে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পূর্ণ বিকাশ আমরা বেদাঙ্গগুলির মধ্যে দেখি। অঙ্গ বা অবয়ব যেমন অঙ্গী বা প্রাণধারীকে বাঁচিয়ে রাখে আর রক্ষা করে, সে রকম এই বেদাঙ্গগুলিও বেদের রক্ষাকবচের কাজ করেছে।
ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, শিক্ষা, কল্প, নিরুক্ত, ছন্দ, ব্যাকরণ আর জ্যোতিষ— এই ছয়টি বেদাঙ্গ কী অসাধারণ কৌশলে ধরে রেখেছে বেদের ত্রিমূর্তি— শব্দ, অর্থ, উচ্চারণ। এ ছাড়াও, বেদের প্রধান উপযোগ যে যজ্ঞকর্মে, তাকেও পুঙ্খানুপুঙ্খ ধরে রেখেছে কল্প নামে বেদাঙ্গটি। বেদের মতো বেদাঙ্গগুলিও কিন্তু লিখিত হত না, তাদেরকেও ধারণ করতে হত স্মৃতিতেই। বিশালাকৃতির বেদ মুখস্থ করার পর বেদাঙ্গগুলির জন্য মস্তিষ্কে আর বেশি স্থান রাখা মুশকিল, বোধহয় এই রকম একটা ধারণা থেকেই বেদাঙ্গগুলিকে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে রচনা করার একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছিল; যার ফলে গদ্য ও পদ্য, সাহিত্যরচনার এই দুই প্রচলিত মাধ্যমের অতিরিক্ত এক নতুন ধারার উদ্ভব ঘটে— যার নাম সূত্রসাহিত্য।
সব বেদাঙ্গসূত্রের মধ্যে সেরা সূত্র হল পাণিনির ব্যাকরণ ‘অষ্টাধ্যায়ীসূত্র’। কত বড় বই এই অষ্টাধ্যায়ী তা দেখা যাক: এর আটটি অধ্যায়ে চারটি করে পরিচ্ছেদ বা পাদ, প্রতি পাদে রয়েছে শতাধিক সূত্র, এ ভাবে সব মিলিয়ে মোট ৩৯৯৫টি সূত্র। পর পর লিখলে একটা এক ফর্মার লিটল ম্যাগাজিনে ধরে যাবে গোটা অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ! কিন্তু সে বই আজও বিশ্বের পণ্ডিতদের বিস্ময়। এতে রয়েছে বেদের সেই প্রাচীন ভাষার ব্যাকরণ, অর্থাৎ সে ভাষার শব্দগুলির বিভিন্ন ধ্বনির উচ্চারণ, সন্ধির ফলে তাদের নানান বিকার ও পরিবর্তন (ধ্বনিতত্ত্ব), শব্দের গঠনপদ্ধতি-বিশ্লেষণ (রূপতত্ত্ব), যার মধ্যে আছে শব্দরূপ, ধাতুরূপ, প্রত্যয়, সমাস প্রভৃতির আলোচনা, এবং বাক্যে পদগুলির পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয়, যাকে আমরা ‘কারক’ বলে জানি— ইত্যাদি বিষয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।
মজার কথা এই যে, পাণিনির ব্যাকরণ বেদের অঙ্গ হলেও সেটি কিন্তু তাঁর সময়ে প্রচলিত লৌকিক ভাষারও ব্যাকরণ। এক কথায়, পাণিনি একই সঙ্গে দুটি ভাষার জন্যে ব্যাকরণ রচনা করেছেন, তারা হল যথাক্রমে ‘ছন্দস্‌’ অর্থাৎ বৈদিক সংস্কৃত এবং ‘ভাষা’, যেটি ছিল তাঁর সময়ে প্রচলিত লোকব্যবহারের ভাষা অর্থাৎ লৌকিক সংস্কৃত। প্রাচীন ভারতের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, আইন-কানুন, মামলা-মোকদ্দমা, ধর্ম-কর্ম ইত্যাদি সব কিছুর প্রধান মাধ্যম ছিল এই সংস্কৃত। অবশ্য ভাষা হিসেবে সংস্কৃত নামটির প্রচলন হয় পাণিনির অনেক পরে। প্রাচীন স্তরে বৈদিক ও পরবর্তীতে লৌকিক বলে পরিচিত এই ভাষার ব্যাকরণ পাণিনি এমন নির্দিষ্ট করে বেঁধে দিয়েছিলেন যে প্রায় আড়াই হাজার বছরেও সে ভাষার মৌলিক কোনও পরিবর্তন হয়নি।
পাণিনি এক আশ্চর্য কৌশলে গেঁথেছেন সূত্রগুলিকে, যার ফলে সব চেয়ে কম শব্দে বোঝানো গিয়েছে ভাষা-বিষয়ক সর্বাধিক নিয়ম, এই কৌশলে প্রধান হাতিয়ার তাঁর এক বিশেষ সাংকেতিক ভাষা, আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিকরা যাকে বলছেন পাণিনির অধিভাষা বা মেটাল্যাংগোয়েজ। যেমন ধরুন একটি সূত্রে ব্যবহৃত একটি শব্দ পর পর বেশ কয়েকটি সূত্রেই প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু প্রতি বার তার পুনরাবৃত্তি না করে ধরে নেওয়া হয় যে সেটি আগের সূত্রটি থেকেই পরের সূত্রগুলিতে চলে আসছে, এ ব্যবস্থার নাম হল অনুবৃত্তি। পাণিনির ব্যাকরণ দাঁড়িয়ে আছে বর্ণবোধক চোদ্দোটি প্রত্যাহার সূত্রের ওপরে, যেগুলি ‘শিবসূত্র’ নামে প্রসিদ্ধ। এগুলি পাণিনির নিজের রচনা বলেই অনুমান, যদিও প্রাচীন কিংবদন্তি বলে যে এগুলির উৎপত্তি নাকি শিবের ঢক্কানিনাদ থেকে। এগুলি আসলে সংস্কৃতের যাবতীয় স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনি, এমন সুকৌশলে সাজানো যে বীজগণিতের (a+b)2 ফর্মুলার মতো অতি সংক্ষেপে জুগিয়ে দেয় অনেক বড় তথ্য। যেমন, ‘অচ্‌’ বললে বোঝায় যাবতীয় স্বরবর্ণকে, ‘হল্‌’ হল সমস্ত ব্যঞ্জন, আর ‘অল্‌’ মানে সব স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ একত্রে। এই অধিভাষার জোরে ‘ইকো যণচি’— এইটুকু পাণিনিসূত্রের মানে দাঁড়ায় “ই, উ, ঋ, ৯ – এই চারটি বর্ণের পরে যদি এরা নিজেরা ছাড়া অন্য কোনও স্বরবর্ণ থাকে তবে তারা যথাক্রমে য্‌, ব্‌, র্‌, ল্‌ হয়ে যায়”; এরই ফল হিসেবে আমরা পাই অতি+অন্ত = অত্যন্ত, ইতি+আদি = ইত্যাদি জাতীয় সন্ধি।
আজকের যুগের ভাষাতাত্ত্বিকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে পাণিনির ব্যাকরণের নির্মাণকৌশল। দেখা গিয়েছে কম্পিউটার যে-কোনও ভাষা শেখার জন্যেই সব থেকে বেশি গ্রহণীয় মনে করছে পাণিনির কৌশলকে, তাঁর ভাষা-বিশ্লেষণের পদ্ধতিকে। প্রাচীন ভারতে পাণিনির ব্যাকরণ ভাষাচর্চার একটা ধারা তৈরি করেছিল, যার ফলে পরবর্তী কালে তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে কাত্যায়ন পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ ব্যাকরণকে আরও সম্পূর্ণতা দিতে রচনা করলেন ‘বার্ত্তিক’, এবং তাঁরও প্রায় দেড়শো বছর পরে পতঞ্জলি লিখলেন ‘মহাভাষ্য’। এই তিন বৈয়াকরণের গ্রন্থ সম্মিলিতভাবে ‘ত্রিমুনি ব্যাকরণ’ নামে পরিচিত।   
তক্ষশিলার অধিবাসী ছিলেন পাণিনি, এমনটাই প্রচলিত মত। আর কে না জানে, অধুনা পাকিস্তানের সেই জায়গাটিতে ছিল প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। সপ্তম শতকে ঝুয়ান ঝাং তাঁর বিবরণে উল্লেখ করেছেন, তিনি নাকি লাহুরে (লাহৌর) পাণিনির মূর্তি দেখেছেন। আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা পাণিনির, তাঁর কান এড়িয়ে যায়নি হাটে আসা মানুষদের কথা, পানশালার খদ্দেরদের হাঁক অথবা বিপাশা নদীর উত্তরের আর দক্ষিণের বুলির মধ্যে আঞ্চলিক টানের তফাত। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে তাই তখনকার ভাষাই শুধু নয়, ধরা পড়েছে সেই যুগের সমাজ, সাধারণ মানুষ আর তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ছবিও। 
শেষ কালে বলতে চাই সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘বৈয়াকরণ’ নামে একটি অসাধারণ গল্পের কথা, যেখানে একটি মেয়ে-স্কুলের সংস্কৃতের বৈয়াকরণ পণ্ডিত এক বৃদ্ধ মৈথিলি ব্রাহ্মণ গভীর আত্মসংকটে পড়ে তাঁর আজীবনের সঙ্গী পাণিনির ব্যাকরণ দিয়েই করেন নিজের মনঃসমীক্ষণ, এবং শিউরে ওঠেন সদাচারের আড়ালে ঢাকা নিজের কামাতুর পুরুষমুখটি দেখে। পাণিনির ব্যাকরণের এমন প্রয়োগ কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল?

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/p%C4%81%E1%B9%87ini-s-grammar-formed-the-foundation-of-rigorous-intellectual-work-in-india-1.802096?ref=archive-new-stry

ভাঁড় এবং জিনিয়াস ( On Richard Feynman)

ভাঁড় এবং জিনিয়াস

কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। ১১ মে তাঁর জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হল। প্রাণোচ্ছল, পরিহাসপ্রিয় এই মানুষটিকে কি ভোলা যায়!

পথিক গুহ
Richard Feynman

রিচার্ড ফাইনম্যান। ছবি: গেটি ইমেজেস

সালটা ১৯৫৭। আমেরিকায় আয়োজিত হচ্ছে জি আর-ওয়ান। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অন জেনারেল রিলেটিভিটি অ্যান্ড গ্র্যাভিটেশন-এর দ্বিতীয় দ্বিবার্ষিক সম্মেলন। ওয়ান মানে প্রথম নয়, দ্বিতীয়। এর আগে প্রথম সম্মেলন জি আর-জিরো হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। সুইৎজারল্যান্ডের বার্ন শহরে। সেই যেখানে ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন নামে পেটেন্ট অফিসের এক কেরানি একের পর এক পেপার লিখে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন দুনিয়াকে। সেই ঐতিহাসিক শহরে প্রথম সম্মেলন, দ্বিতীয় সম্মেলন আমেরিকায়, নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটিতে।
সম্মেলনে আমন্ত্রিত ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এক অধ্যাপক। তিনি কেমন? নিজের কথায়, ‘‘আমি বড় বেখেয়ালি। কোথাও আমন্ত্রণ পেলে, যারা ডেকেছে, তাদের ঠিকানা ফোন নম্বর সঙ্গে থাকে না। ধরে নিই আমাকে নিতে কেউ আসবে; কেউ না কেউ জানবে কোথায় যেতে হবে; কোনও ভাবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’’
প্রফেসর নামলেন র‌্যালে-ডারহ্যাম এয়ারপোর্টে। ভোঁ-ভাঁ। কেউ নেই। থাকবে কী করে? তিনি যে এসেছেন সম্মেলন শুরুর এক দিন পরে! আমন্ত্রিতরা সবাই এসে গিয়েছেন আগের দিন। এই প্রফেসর লেট-লতিফ।
প্লেন থেকে নেমে প্রফেসর বোকা বনলেন। পায়ে পায়ে এগোলেন ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। ট্যাক্সি ডেকে দেওয়ার দায়িত্বে যে, সেই ডিসপ্যাচারকে বললেন, ‘‘নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটি যেতে চাই।’’ উত্তর এল, ‘‘কোন নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটি, র‌্যালে-র স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা, না কি চ্যাপেল হিল-এ ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা?’’ তাঁর গন্তব্য কোথায়, জানেন না প্রফেসর। বললেন, ‘‘কোথায় ও দুটো?’’ উত্তর এল: ‘‘একটা উত্তরে, অন্যটা দক্ষিণে। দুটোই এখান থেকে সমান দূরে।’’ প্রফেসর হতভম্ব।
মাথায় এল এক আইডিয়া। ডিসপ্যাচারকে বললেন, তিনি এসেছেন এক সম্মেলনে। তবে এক দিন দেরিতে। আগের দিন নিশ্চয়ই অনেকে নেমেছেন এই এয়ারপোর্টে। তাঁদের একটু বর্ণনা দেওয়া যাক। ওঁরা যেন ভাবরাজ্যে বিচরণ করছেন। আশেপাশে কী ঘটছে, খেয়াল নেই। নিজেদের মধ্যে কথায় মশগুল। আর হ্যাঁ, ওঁদের মুখে কথাগুলো অবশ্যই ‘জি-মিউ-নিউ, জি-মিউ-নিউ...’। ক্লু পেয়ে ঝলকে উঠল ডিসপ্যাচারের মুখ। ট্যাক্সির ড্রাইভারকে তার নির্দেশ, ‘‘এই ভদ্রলোককে চ্যাপেল হিল-এর ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে দিন।’’ ‘‘ধন্যবাদ,’’ বলে প্রফেসর উঠলেন ট্যাক্সিতে। আর পৌঁছে গেলেন কনফারেন্সে।
আনমনা ফিজিক্স প্রফেসর, না শার্লক হোমস! গুরুর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে বিস্মিত সহকারীকে কৌশলটা ব্যাখ্যা করতে গোয়েন্দাপ্রবর হয়তো বলতেন, ‘‘এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন!’’ গ্র্যাভিটি নিয়ে কনফারেন্স। গ্র্যাভিটির শ্রেষ্ঠ থিওরি আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি। এবং তার ফরমুলায় ওই জি-মিউ-নিউ চিহ্ন সদা-হাজির। বিজ্ঞানী এমনিতেই গবেষণার বাইরের জিনিসে মন দেন না। গ্র্যাভিটি কনফারেন্সে এসে ওঁরা তো সব ভুলে জি-মিউ-নিউ নিয়ে বকবক করবেনই। ওঁদের চেনানোর অব্যর্থ উপায়, সুতরাং, ওই বর্ণনা।
বিজ্ঞান নাকি, আইনস্টাইন বলেছিলেন, কেবলই ‘রিফাইন্ড কমন সেন্স’। কোন সেন্স যে ‘কমন’, আর তার মধ্যে কোনটা ‘রিফাইন্ড’, সে তর্কে না গিয়ে বলা যায়, বিজ্ঞান শেষ বিচারে স্রেফ গোয়েন্দাগিরি। ক্যালটেক-এর যে প্রফেসর শেষমেশ তাঁর গন্তব্যে পৌঁছলেন, তিনি সে রকমটাই ভাবতেন। বলতেন, ‘‘সায়েন্স ইজ নট গেটিং ফুল্‌ড বাই নেচার।’’ তিনি রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। ইদানীং কালে বিজ্ঞানে সবচেয়ে বর্ণময় ব্যক্তিত্ব। এই নোবেলজয়ীর বর্ণনায় আর এক নোবেলজয়ীর মন্তব্যই যথেষ্ট। তিনি মারে গেল-মান। একদা ক্যালটেক-এ ফাইনম্যানের সহকর্মী। সতীর্থের প্রয়াণে ‘ফিজিক্স টুডে’ পত্রিকায় গেল-মান লিখেছিলেন, ‘রিচার্ড ওয়জ আ পিকচার অব এনার্জি, ভাইটালিটি অ্যান্ড প্লেফুলনেস।’ ফাইনম্যানের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হল দু’দিন আগে।
জন্ম নিউইয়র্কে ১১ মে, ১৯১৮। বাবা মেলভিল ফাইনম্যান। বেলোরুশিয়ার মিনস্‌ক শহর থেকে আমেরিকায় পাড়ি-জমানো ইহুদি। মা লুসিল-ও রুশ ইহুদি। তিনি যখন অন্তঃসত্ত্বা, তখনই মেলভিল ঘোষণা করেন, লুসিল যদি ছেলে প্রসব করেন, তবে সে হবে বিজ্ঞানী। ভদ্রলোক স্বল্পশিক্ষিত। রোজগার সেলসম্যানগিরি থেকে। কিন্তু স্কুল-কলেজের বাইরে তাঁর পড়াশোনা বিস্তর। বিশেষত বিজ্ঞানে। ছেলে রিচার্ড স্কুলে যায় বটে, তবে তার শিক্ষাগুরু বাবা। শেখানোর পদ্ধতি বিচিত্র। রিচার্ড যখন খুব ছোট্ট, তাকে কিনে দিলেন এক বাক্স নানা রঙের টালি। রিচার্ডের কাজ এক-একটা টালি পরপর বসানো। কেন? রিচার্ড অঙ্ক শিখছে। কী ভাবে? মেলভিলের ব্যাখ্যা: নানা রঙের টালি পরপর ঠিকমতো বসালে তৈরি হয় এক প্যাটার্ন। আর অঙ্ক মানে তো হযবরল-র মাঝে প্যাটার্ন আবিষ্কার!
একটা পাখি দেখিয়ে মেলভিল রিচার্ডকে বললেন নানা দেশের ভাষায় পাখিটার নাম। পরে মন্তব্য, এতগুলো নাম জেনেও কিন্তু পাখিটাকে চেনা গেল না। নানা নাম থেকে বরং খানিকটা চেনা গেল নানা দেশের মানুষকে। তা হলে পাখি চেনার উপায়? তার আচরণ খুঁটিয়ে দেখা। কী খায়? কেমন করে বাসা বানায়? বাচ্চাদের কি উড়তে শেখায়?
রিচার্ড তখন একটু বড়। খেলনা গাড়ি টানতে গিয়ে অবাক। গাড়ির পাটাতনের উপরে ছিল একটা বল। রিচার্ড দেখল, থেমে-থাকা গাড়ি টানা শুরু করলে পাটাতনের উপরে বলটা গড়াচ্ছে পিছন দিকে। আর, চলমান গাড়ি হঠাৎ থামলে বল গড়াচ্ছে সামনে। কেন? কঠিন প্রশ্নের উত্তর নেই মেলভিলের কাছে। তবে ছেলেকে উপহার দিলেন এক দারুণ উপলব্ধি। বললেন, স্থির বল স্থির থাকতে চায়। চলমান বল থাকতে চায় চলমান। এই ইচ্ছের কারণ আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি। মেলভিলের শিক্ষাদান পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে চমৎকার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন ফাইনম্যানের জীবনীকার জন ও মেরি গ্রিবিন। ‘রিচার্ড ফাইনম্যান: আ লাইফ ইন সায়েন্স’ বইতে ওঁরা লিখেছেন, মেলভিলের দিকে তাকিয়ে আমরা টের পাই, সাধারণ মানুষ চাইলে নোবেল-বিজেতা হতে না পারলেও, তাঁরা নোবেল-বিজেতার বাবা হতে পারেন!
স্কুলে ফাইনম্যান ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। অঙ্ক কষে ফেলে নিমেষে, মুখে মুখে। ক্রমে ছেলেটার খ্যাতি ছড়াল এক বিশেষ কাজে। তখন রেডিয়ো জিনিসটা বাজারে নতুন। রীতিমতো বিলাসদ্রব্য। কিন্তু, চালাতে গিয়ে খারাপ হয় যখন-তখন। ফাইনম্যান দারুণ রেডিয়ো মেকানিক। এক বার পড়শির বাড়িতে রেডিয়ো বিগড়েছে। ডাক পড়ল ফাইনম্যানের। রেডিয়োর যন্ত্রপাতি খুলে ঘরময় ছিটোনো। ছোকরা গম্ভীরমুখে পায়চারি করছে। দেখে পড়শি বললেন, ‘‘রেডিয়ো সারাবে কখন?’’ ফাইনম্যানের সপাট জবাব, ‘‘দেখছেন না, আমি ভাবছি!’’ পড়শির সুবাদে মহল্লায় নাম জুটে গেল, দ্য বয় হু ফিক্সেস রেডিয়ো বাই থিঙ্কিং। এই ছাত্রের এক দোষ। সাহিত্য ইতিহাস ভূগোল তার দু’চোখের বিষ। ও সব যে কেন পড়ানো হয় স্কুলে! শুধু অঙ্ক আর বিজ্ঞান পাঠ্য বিষয় হলে কী ভালই যে হত!
১৯৩৫ সালে সতেরো বছর বয়সে এমআইটি। সেখানে চার বছর কাটিয়ে প্রিন্সটন। ভর্তি পরীক্ষায় খাতা দেখে পরীক্ষকের মন্তব্য: ‘‘এমআইটি-র ছোকরা। ম্যাথ আর ফিজিক্সে রেটিং দেখার মতো। ফ্যান্টাস্টিক! আর যারা পরীক্ষায় বসেছে, ওর ধারেকাছে নেই। ছেলেটা মনে হয় না-কাটা হিরে। তবে, আমরা আগে কখনও ইংরেজি ও ইতিহাসে এত কম নম্বর পাওয়া ছাত্রকে ভর্তি করিনি।’’
এই পরীক্ষক জন আর্চিবাল্ড হুইলার। প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী, অধ্যাপক। বিশেষ জাতের নক্ষত্রের প্রেতাত্মার ব্ল্যাক হোল নামটা চালু করার নায়ক। ঘটনাচক্রে প্রিন্সটনে ফাইনম্যানের পিএইচ ডি গাইডও এই হুইলার। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতও চমৎকার। ফাইনম্যান লক্ষ করলেন, কথা বলার আগে হুইলার পকেট থেকে নিজের ঘড়িখানি বের করে টেবিলের উপরে রাখলেন। অর্থাৎ, কথা শেষ করতে হবে দ্রুত। নষ্ট করার মতো সময় হুইলারের হাতে নেই। বটে! নষ্ট করার মতো সময় যে ফাইনম্যানেরও নেই, তা বোঝাতে পরের দিন তিনি কথা বলতে এসে হুইলারের ঘড়ির পাশে রেখে দিলেন সস্তায় কেনা নিজের পকেটঘড়ি! পিএইচ ডি ছাত্রের আচরণে কিন্তু রুষ্ট হলেন না হুইলার। গাইড এবং গবেষক একসঙ্গে হেসে উঠলেন হোহো করে।
প্রিন্সটন ফাইনম্যানকে জুগিয়েছিল তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডের শিরোনাম। খোলামেলা এমআইটি থেকে কেতাদুরস্ত প্রিন্সটনে যে দিন পৌঁছলেন, সে দিন ডিন-এর চায়ের নেমন্তন্ন। অপছন্দের বেশ কোট-টাই পরে হাজির হতে হল। ডিন-এর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘চায়ে কী খাবে, দুধ না লেবু?’’ থতমত ফাইনম্যান বললেন, ‘‘দুটোই।’’ মহিলা হেসে উঠলেন, ‘‘শিয়োরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফাইনম্যান!’’ ওই ঘটনার চল্লিশ বছর পরে ওই মন্তব্যই শিরোনাম হল আত্মজীবনীর।
প্রিন্সটনে পিএইচ ডি করার পূর্বশর্ত, স্কলারশিপ পেতে হলে বিবাহিত হওয়া চলবে না। এ দিকে ফাইনম্যানের গভীর প্রেম তাঁর গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে। মেয়েটি আরলিন গ্রিনবাম। নিউইয়র্কে ফাইনম্যানের পাড়ার মেয়ে। আরলিনের হল যক্ষ্মা। তখনও ব্যাধিটা কালান্তক। ছোঁয়াচে বলে রোগ সম্পর্কে জনমানসে ভীতিও খুব। একুশ বছর বয়সি ফাইনম্যান টিবি-রুগি গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে চায় শুনে মা-বাবা দারুণ চিন্তিত। ওঁদের আপত্তি খণ্ডনে ফাইনম্যান যুক্তি দিয়ে বোঝালেন, করুণার মনোভাব থেকে নয়, অসুস্থ প্রেমিকার যত্ন নেওয়ার জন্যই তিনি দ্রুত বিয়ে করতে চান আরলিনকে। ডাক্তার জানিয়েছেন, অন্তঃসত্ত্বা হলে আরলিনের বিপদ বেড়ে যাবে বহু গুণ, তাই ফাইনম্যান সে ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধান থাকবেন, তাও মা’কে লিখতে ভুললেন না। ২৯ জুন, ১৯৪২ আরলিনকে বিয়ে করলেন। বিয়েতে অনুপস্থিত বাড়ির লোকজন।
এর পর ফাইনম্যানের ঠিকানা লস আলামস, অ্যাটম বোমা বানানোর ম্যানহাটান প্রোজেক্ট-এ। অসুস্থ আরলিন আলবাকার্কি-র হাসপাতালে। উইকএন্ডে ফাইনম্যান ছোটেন সেখানে। লস আলামস পাণ্ডববর্জিত এলাকা। রাস্তা এবড়োখেবড়ো। ফাইনম্যানকে গাড়ি চালিয়ে আলবাকার্কি পৌঁছে দেয় ক্লস ফুক্‌স। অ্যাটম স্পাই। আমেরিকান অ্যাটম বোমার নকশা সোভিয়েত ইউনিয়নে পাচারের নায়ক। অবশ্য, তখন তাঁর এই পরিচয় গোপন। ১৬ জুন ১৯৪৫, অ্যাটম বোমার প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের ঠিক এক মাস আগে মারা গেলেন আরলিন।
ওই শোক তিনি জীবনে ভোলেননি। দু’বছর পরে যখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত, প্রয়াত স্ত্রীর উদ্দেশে একটি চিঠি লেখেন ফাইনম্যান। ‘প্রিয় আরলিন, আমি তোমায় ভালবাসি। অনেক, অ-নে-ক দিন পর চিঠি লিখছি তোমাকে— প্রায় দু’বছর হবে, কিন্তু আমি জানি তুমি ক্ষমা করবে আমাকে। কারণ তুমি তো জানো, আমি কী রকম। একগুঁয়ে এবং বাস্তববাদী। ভেবেছিলাম লিখে আর কী হবে। কিন্তু, এখন বুঝতে পারছি, যা এত দিন ঠেলে সরিয়ে রেখেছি, তা করে ফেলাই শ্রেয়... আমি যে বলতে চাই, তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে ভালবাসব চিরকাল। তুমি চলে যাওয়ার পরও তোমাকে ভালবেসে যাওয়ার মানে বোঝা কষ্টকর। কিন্তু আমি যে এখনও তোমার যত্ন নিতে চাই, সুখে রাখতে চাই তোমাকে— আর আমি চাই তুমিও ভালবাস আমাকে, আগলে রাখো আমায়। আমার সমস্যা নিয়ে যেন কথা বলতে পারি তোমার সঙ্গে...। পুনশ্চ: চিঠিটা তোমায় না-পাঠানোর জন্য ক্ষমা করে দিও— আমি যে জানি না তোমার নতুন ঠিকানা।’ ফাইনম্যানের মৃত্যুর পর তাঁর ড্রয়ারে কাগজের স্তূপে পাওয়া যায় চিঠিখানি।
ফিরে আসি লস আলামস-এ। বড় বড় দাবির ফুলঝুরি বরাবর ফাইনম্যানের চক্ষুশূল। বোমা বানানো গোপন কাজ। ঊর্ধ্বতন বিজ্ঞানী বা সামরিক অফিসারেরা গণনা বা দলিল পুরে রাখেন সিন্দুকে। গর্ব করে বলেন, সিন্দুকের নিরাপত্তা দারুণ। এক বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলার বড়াই করে বললেন, তাঁর তথ্য এমন সুরক্ষিত, কেউ তার নাগাল পাবে না। বটে? ফাইনম্যান দেখিয়ে দিলেন, শুধু তাঁর কেন, বুদ্ধি খাটিয়ে অনেকের সিন্দুক খুলে ফেলা যায়। এ রকম তামাশার শাস্তি কঠোর। কিন্তু ফাইনম্যানের কিছু হল না। কারণ? তাঁর বিদ্যা। অন্তত দুটি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওঁর গণনা একমাত্র কার্যকরী নির্দেশিকা হিসেবে প্রমাণিত হয়। এক, মশলা ইউরেনিয়াম হলে একটা বোমার ধ্বংস ক্ষমতা ঠিক কতটা। দুই, প্রিডিটোনেশন, অর্থাৎ এক ঢেলা ইউরেনিয়ামের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দ্রুত বিস্ফোরণের সম্ভাবনা কতখানি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ফাইনম্যান যোগ দিলেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ডুব দিলেন গবেষণায়। এই রিসার্চের সূত্রেই ১৯৬৫ সালে ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ। বিষয়? পোশাকি নাম কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স (কিউ ই ডি)। পদার্থকণা ইলেকট্রনের সঙ্গে আলোর বিক্রিয়া।
কিউ ই ডি বিজ্ঞানে সব থিওরির মধ্যে সবচেয়ে নির্ভুল। বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ বিজ্ঞানের থিওরিগুলোকে ভাগ করেছেন তিন শ্রেণিতে। ‘সুপার’, ‘টেন্টেটিভ’ আর ‘ইউজফুল’। ওঁর বিচারে কিউ ই ডি পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। কেন? একটা ইলেকট্রনের চৌম্বক শক্তি পরীক্ষায় মাপলে পাওয়া যাচ্ছে ১.০০১১৫৯৬৫২২১। আর কিউ ই ডি বলছে, তা হওয়া উচিত ১.০০১১৫৯৬৫২৪৬। কতটুকু ফারাক? ফাইনম্যান বলেছেন, ‘‘নিউইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের দূরত্ব মাপতে এক চুল পরিমাণ ফারাক যতটা, এ-ও ঠিক তা-ই।’’
কিউ ই ডি কিন্তু ফাইনম্যান একা আবিষ্কার করেননি। দাবিদার আরও দুই। নিউইয়র্কে একই এলাকা থেকে উঠে-আসা আর এক পদার্থবিজ্ঞানী জুলিয়ান শুইংগার (যাঁকে নিয়ে মা লুসিল নিজের ছেলেকে খোঁটা দিতেন মাঝে মাঝে) এবং জাপানি গবেষক শিন’ইচিরো তোমোনাগা। তিন বিজ্ঞানী গবেষণা করেন আলাদা। পৌঁছন একই তত্ত্বে। এ-ও বিজ্ঞানের এক মজা। পৃথক ভাবে এগোলেও সত্য অনেকের কাছে একই চেহারায় ধরা দেয়। কিউ ই ডি আবিষ্কার করায় ১৯৬৫ সালে ফাইনম্যানের সঙ্গে শুইংগার এবং তোমোনাগাও নোবেল প্রাইজ পান। তিন গবেষক একই তত্ত্বে পৌঁছলেও চরিত্রে কিন্তু ফাইনম্যানের কিউ ই ডি শুইংগার এবং তোমোনাগার আবিষ্কৃত তত্ত্বের থেকে একটু আলাদা। ও দুটো অনেক বেশি গাণিতিক, ফর্মুলা-কণ্টকিত। ফাইনম্যানের কিউ ই ডি ফর্মুলা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। অন্য বিজ্ঞানী যেখানে প্রকৃতিকে দেখেন ফর্মুলার আতস কাচ দিয়ে, সেখানে ফাইনম্যান তাকে দেখেন মনের পর্দায় আঁকা ছবিতে। তাঁর অনেক কালের বন্ধু পদার্থবিদ এবং লেখক ফ্রিম্যান ডাইসন মনে করেন, প্রকৃতিকে দেখার ওই বিশেষ ধরন পদার্থবিদ্যায় ফাইনম্যানের সেরা অবদান। ছোটবেলায় বাবা বলতেন, ‘‘আলাদা হও।’’ সেটা মাথায় গেঁথে বসেছিল। সতীর্থ গবেষকদের পরামর্শ দিতেন, ‘‘সব কিছু উল্টে দেখো।’’
ভাষ্যকারেরা বলেন, গবেষণার জন্য একটা নয়, ফাইনম্যান নোবেল পেতে পারতেন তিনটে। কিউ ই ডি ছাড়া বাকি দুটো বিষয় হল সুপারফ্লুইডিটি এবং উইক ফোর্স। কিছু কিছু তরল কোনও পাত্রে রাখলে পাত্রের গা-বেয়ে আপনা আপনি বাইরে বেরিয়ে যায়। এটা সুপারফ্লুইডিটির ভেল্কি। এর পিছনে লুকিয়ে যে বিজ্ঞানের গূঢ় রহস্য, তাতে আলোকপাত করেছিলেন ফাইনম্যান। যেমন করেছিলেন উইক ফোর্স বা মৃদু বল বিষয়ে। ওটা হল প্রকৃতিতে ক্রিয়াশীল মোট চার রকম বলের একটা। তেজস্ক্রিয়তার মূলে কাজ করে। এই দু’বিষয়ে ফাইনম্যানের গবেষণা এত বড় মাপের যে সে সব সাফল্যের জন্যও নোবেল পেতে পারতেন তিনি।
বিজ্ঞানী বড় প্রমাণিত হন তাঁর কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে। পদার্থবিদ্যায় অন্তত দুটো বিষয়ে গবেষণার ভগীরথ ফাইনম্যান। একটা হল ন্যানোটেকনোলজি। যে কোনও বস্তুই অণু-পরমাণুর পাহাড়। জটিল জিনিস বানাতে ইটের পর ইট গেঁথে বাড়ি বানানোর মতো পরমাণুর পর পরমাণু সাজালে হয়। আইডিয়াটা ফাইনম্যান পেশ করেন ১৯৫৯-এর ২৯ ডিসেম্বর ক্যালটেক-এ ‘দেয়ার’স প্লেন্টি অব রুম অ্যাট দি বটম’ শীর্ষক বক্তৃতায়। কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে সুদূরপ্রসারী গবেষণারও প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে ফাইনম্যান। আজকের কম্পিউটার যার কাছে ক্ষমতায় হবে নস্যি। কারণ আগামী দিনের সে কম্পিউটার কাজ করবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অদ্ভুতুড়ে নিয়ম মেনে। তেমন যন্ত্রের আভাসও ফাইনম্যান দিয়েছিলেন এক বক্তৃতায়। এমআইটি’তে, ১৯৮১ সালে। বক্তৃতার শিরোনাম ‘সিমুলেটিং ফিজিক্স উইথ কম্পিউটারস’।
পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালান লাইটম্যান ফাইনম্যানকে বলেছেন ‘মাইকেল জর্ডন অব ফিজিক্স’।
শিকাগো বুলস বা ওয়াশিংটন উইজার্ডস দলের এই বাস্কেটবল খেলোয়াড় যে অবলীলায় জালে বল ফেলতেন, তা দেখে তাক লাগত। ফিজিক্সে ফাইনম্যানের চিন্তার লাফগুলোও তেমনই চমকপ্রদ। গণিতজ্ঞ মার্ক কাক এক বার বলেছিলেন, ‘‘জিনিয়াস দু’রকম। সাধারণ আর জাদুকর। সাধারণ জিনিয়াসরা তেমন কিছু নন, আমরা যদি অনেক অনেকগুণ ভাল হই, তা হলে যেমন দাঁড়াবে, তেমন। এ রকম জিনিয়াসের কাজকর্ম মোটেই রহস্যময় নয়। আমরা যদি এক বার জানতে পারি, ওঁরা কী করেছেন, তা হলে আমাদের মনে হয় আমরাই হয়তো সেটা করতে পারতাম। জাদুবিদ জিনিয়াসদের ব্যাপারটা আলাদা।... ওঁদের চিন্তাপদ্ধতি দূরধিগম্য। যদিও বা আমরা বুঝি যে, ওঁরা কী করেছেন, তা হলেও ওঁরা কী ভাবে সেটা করেছেন, তা চিরকাল অজানাই থাকবে।... রিচার্ড ফাইনম্যান হলেন উঁচু দরের জাদুকর।’’ ইংল্যান্ড থেকে ১৯৪০-এর দশকের শেষে আমেরিকায় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে এসে ফাইনম্যানকে কাছ থেকে দেখেন ফ্রিম্যান ডাইসন। চিঠিতে বাবাকে তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে ডাইসন লিখেছিলেন, ‘(মানুষটা়) অর্ধেক জিনিয়াস, অর্ধেক ভাঁড়।’
আমুদে এই বিজ্ঞানী জীবন উপভোগ করেছেন তারিয়ে তারিয়ে। কী করেননি! নাইট ক্লাবে বঙ্গো বাজানো (প্রিয় নেশা), মাদক সেবন, হুল্লোড়, এমনকী গণিকা-সংসর্গও বাদ ছিল না তাঁর জীবনচর্যায়। সহকর্মীদের স্ত্রীর সঙ্গে অ্যাফেয়ার গড়িয়েছে যৌন সম্পর্কে। দ্বিতীয় বিয়ে করলেন ১৯৫২ সালে। পাত্রী মেরি লুইজ়ি বেল। চার বছরের মধ্যে ডিভোর্স। কোর্টে মহিলার অভিযোগ, ‘‘লোকটা সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় মাথায় ক্যালকুলাসের প্রবলেম নিয়ে ওঠে। ক্যালকুলাস করে গাড়ি চালানোর সময়। নিজের ঘরে বসে। এমনকী রাতে বিছানায় শুয়েও।’’ তৃতীয় বিয়ে ১৯৬০-এ। পাত্রী গেনেথ হাওয়ার্থ। তাঁর গর্ভে দুই সন্তান। ছেলে কার্ল, মেয়ে মিশেল।
পৃথিবীভর কলেজ-পড়ুয়ারা ফাইনম্যানকে প্রথম চেনে এক টেক্সট বইয়ের রচয়িতা হিসেবে। তিন খণ্ডের ‘ফাইনম্যান লেকচার্স অন ফিজিক্স’। ১৯৬১। ক্যালটেক কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন, ফিজিক্স পাঠ্যসূচি আমূল বদলাবেন। দায়িত্ব বর্তাল ফাইনম্যানের কাঁধে। তিনি রাজি। লেকচার দিলেন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ক্লাসে। কিছু বাদ গেল না ব্যাখ্যায়। সমুদ্রের পাড়ে বালি, আকাশে মেঘ, পুকুরের জলে রঙের খেলা, অণু-পরমাণু। কেতাবি ঢঙে নয়, ফিজিক্সকে তিনি যে ভাবে জেনেছেন, প্রকৃতিকে তিনি যে ভাবে চিনেছেন। ক্যালটেক রেকর্ড করে ওঁর লেকচার। তা থেকে বই। পদার্থবিদ্যার ছাত্রদের অবশ্যপাঠ্য। পণ্ডিতেরা যে বইয়ের তুলনা করেন অ্যারিস্টটলের রচনাসংগ্রহ, দেকার্তে-র ‘প্রিন্সিপ্‌লস অব ফিলসফি’ কিংবা নিউটনের ‘প্রিনখিপিয়া’-র সঙ্গে।
আমেরিকায় ফাইনম্যান সেলেব্রিটি বনলেন ১৯৮৬ সালে। ২৮ জানুয়ারি কেপ ক্যানাভেরাল থেকে মহাশূন্যে পাঠানো হল স্পেস শাট্‌ল ‘চ্যালেঞ্জার’। উৎক্ষেপণের ৭৩ সেকেন্ডের মধ্যে তাতে বিস্ফোরণ। এবং সাত মহাকাশচারীর মৃত্যু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগন বসালেন তদন্ত কমিশন। কী কারণে দুর্ঘটনা, তা জানতে। ফাইনম্যান কমিশনের এক জন সদস্য। কাজে নেমে তিনি টের পেলেন অনেক গলদ। যে সব ঢাকতে আগ্রহী নাসা। ফাইনম্যান ম্যানেজারদের জিজ্ঞাসা করলেন, উৎক্ষেপণের আগে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কতটা বলে মনে হয়েছিল। উত্তর পেলেন, এক লক্ষে এক। মানে, ম্যানেজাররা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন, দুর্ঘটনা হবে না। একই প্রশ্ন করলেন ইঞ্জিনিয়ারদের। ওঁদের হিসেবে, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা একশোয় এক। মানে, সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। সিদ্ধান্ত: দু’দল লোকের মধ্যে এত বড় উদ্যোগ নিয়ে কোনও যোগাযোগ নেই। ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬। গোটা আমেরিকা জুড়ে প্রচারিত টিভি প্রোগ্রামে ফাইনম্যান দেখিয়ে দিলেন, ছোট্ট একটা কারণে দুর্ঘটনা হল। গলদ ছিল চ্যালেঞ্জার-এর রবারের টালিতে। এক পাত্র বরফজলে টালির এক টুকরো ফেললেন ফাইনম্যান। দেখালেন, রবার যে চুপসে গেল এক বার, আর নরম তুলতুলে হল না। চ্যালেঞ্জার উৎক্ষেপণের দিন ভোরে কেপ ক্যানাভেরালের তাপমাত্রা ছিল শূন্য ডিগ্রির নীচে। অত ঠান্ডায় টালি আর রবার ছিল না। জমাট বেঁধে বনে গিয়েছিল ইট। তুচ্ছ পরীক্ষায়
এত বড় দুর্ঘটনার উৎস সন্ধান! বিজ্ঞানী না গোয়েন্দা! সারা দেশে ফাইনম্যান হিরো।
তিনি আলাদা। বাবা হিসেবেও। বন্ধু ফ্রিম্যান ডাইসনকে এক চিঠিতে ফাইনম্যান লিখেছেন, ‘ভাবতাম আমি বেশ ভাল বাবা। ছেলেমেয়েদের নিয়ে গর্ব ছিল। কোনও নির্দিষ্ট দিকে ওদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করিনি। আমার মতো ওরা অধ্যাপক হবে, সে আশাও করিনি। যদি ওরা কাজে আনন্দ পায়, তা হলে ট্রাক ড্রাইভার কিংবা ব্যালে ডান্সার বনলেও আমি খুশি হব। কিন্তু সন্তানেরা বাঁকা পথে চলতেই পছন্দ করে। আমার ছেলে কার্ল-এর কথাই ধরো। ও এখন এমআইটি-র ছাত্র। কিন্তু কী হতে চায় জানো? হতচ্ছাড়া দার্শনিক!’
১৯৭৮-এ ধরা পড়ল জটিল ক্যান্সার। একাধিক অপারেশন। লাভ হল না। মারা গেলেন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮। শেষ নিশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন ক’টা শব্দ। ‘‘আই উড হেট টু ডাই টোয়াইস। ইট’স সো বোরিং।’’
শিয়রে নিশ্চিত মৃত্যু নিয়েও কী জীবনীশক্তি! ছাত্র ডেভিড গুডস্টাইন লিখেছেন, একের পর এক অপারেশনের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে স্যর কেমন অবলীলায় বিজ্ঞানের জটিল গণনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যেন কিছুই হয়নি। আর এক ছাত্র ড্যানিয়েল হিলিস (যাঁর শৈশব কেটেছে এই কলকাতায়) লিখেছেন, মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও এই ছাত্রের সঙ্গে ফাইনম্যান গিয়েছিলেন ট্রেকিংয়ে। পাহাড় থেকে নামার পথে হিলিস-এর মনখারাপ দেখে স্যর বললেন, ‘‘আমি চলে যাব বলে মনখারাপ? আসলে নিজের কথা এত লোককে এত বার করে বলেছি যে, দেখে নিও আমি ঠিক লোকের মনে থেকে যাব।’’
ঠিক। ফাইনম্যান দীর্ঘজীবী হবেন।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/in-honor-of-his-centennial-some-interesting-facts-about-nobel-laureate-richard-feynman-1.796394?ref=archive-new-stry4

শ্রীযুক্তা টিকটিকি অন্তঃসত্ত্বা ( On Ashok Mitra)

শ্রীযুক্তা টিকটিকি অন্তঃসত্ত্বা

চল্লিশের দশকে তরুণ কবির লেখা। পোস্টকার্ডে কবিতা লিখে পাঠান বন্ধুদের। নিঝুম ট্রামলাইনে বসে জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করেন। অশোক মিত্র পরে স্বেচ্ছায় কবিতা থেকে মিছিলে!

শুভাশিস চক্রবর্তী
 
s
এ-ছ’বছরে দেখা যাচ্ছে তাহলে আর বদলাইনি। সময়-কাটানোর মহদুদ্দেশ্যে সে-সময় টিকটিকিগিন্নিকে পাহারা দিতুম, নন্দ নিবাসের এই একতলার ঘরেও আপাতত সারাদিন পড়ে পড়ে তা-ই করি।” একটি চিঠিতে লিখছেন অশোক মিত্র। সুদূর ‘লঙ্কা’ থেকে! বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ওই ‘লঙ্কা’ এলাকাতেই। এখনও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট অফিস লঙ্কায়, গোধূলিয়া মোড় থেকে দিবারাত্র অটো যাতায়াত করে। নন্দ নিবাসের ৪ নং ঘরের বাসিন্দা অশোকবাবু তখন তরুণ, বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র। চিঠিটা লিখেছিলেন কবি-বন্ধু নরেশ গুহকে। নরেশবাবুর এক প্রশ্নের উত্তরে অশোকবাবু পরের চিঠিতে খোলসা করেন, “নন্দ নিবাস আর কিছুই নয়, বড়ো বড়ো হোস্টেল পূর্ণ হয়ে যাবার পর তবু–আসতে–থাকা ছেলেদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে কতগুলো হোস্টেলের মতো খোলা হয়, তাদেরই একটি।”
দুটো চিঠিই ১৯৪৯–এর জানুয়ারিতে লেখা। প্রথমটা চার তারি‌খে, দ্বিতীয়টা চোদ্দোয়। এত ঘন ঘন? জেনে রাখা ভাল, জানুয়ারির পয়লা থেকে একটানা দু’মাস তাঁরা পরস্পরকে চিঠি লিখেছেন। এক-আধটা পোস্টকার্ডে হতে পারে, দু-এক দিন বাদ যায়নি এমনও নয়, তবে অধিকাংশ চিঠিই দীর্ঘ এবং দুই যুবার ব্যক্তিগত আন্তরিক কথনে ভরপুর।
‘টিকটিকিগিন্নিকে পাহারা’ দেওয়ার প্রসঙ্গটিতে অশোক মিত্রের বালক বয়সের একটি কবিতা লেখার ঘটনা জড়িয়ে আছে। বাধ্য হয়ে কাশীবাস, ইংরেজি–নিতে–নিত অর্থনীতি নিয়ে ফেলা অশোক মিত্রের আর ভাল লাগছিল না। ঘরটাতে হাওয়া-বাতাসের প্রবেশ নিষেধ—‘‘বারাণসীর পুণ্যতীর্থে প্রাত্যহিক স্বতোধারায় বয়ে যায় না, কোদাল-কুড়ুল দিয়ে খাল কেটে তাকে বওয়াতে হয়।’’ এমন ভাবে জীবন কাটছে তাঁর। বালক বয়সে লেখা একটি গদ্য-কবিতা মনে পড়ছে, কবিতা-লেখককে প্রত্যহ বিকেলে কেন বাসায় পাওয়া যেত তখন, তারই এক অপরূপ বিবৃতি: ‘‘আমার ঘরের দেয়ালে/ শ্রীযুক্তা টিকটিকি অন্তঃসত্ত্বা।/ মাতৃত্বের টলোমলো গৌরবের উপর/ যাতে নারীধর্ষণের সকলঙ্ক ইতিহাস/ সাংবাদিক প্রোজ্জ্বল অক্ষরে লিখিত না-হয়/ সেজন্যে পাহারায় আছি।’’
–– ADVERTISEMENT ––
নরেশ গুহর স্বলিখিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, অশোক মিত্রের লেখা অজস্র চিঠির মধ্যে ৬৭টি চিঠি তিনি রক্ষা করতে পেরেছিলেন অথবা প্রকাশযোগ্য মনে করেছিলেন। প্রায় সব ক’টি চিঠিই প্রকাশের ইচ্ছেয় স্বহস্তে পুনর্লিখন করেছিলেন, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে। কোনওটার টীকাও করেছিলেন। সব ক’টি চিঠি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে, একটি পত্রিকায় কিছু চিঠি প্রকাশের দিন পর্যন্ত সে-সব চিঠি নাড়াচাড়া করার সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
অনেক চিঠিতেই অশোক মিত্র কবিতা যুক্ত করে দিতেন। কখনও আবার শুধুই কবিতা পাঠাতেন। ১৯৪৯-এর ২৬ অগস্ট বা ১৯ অক্টোবরে চিঠি নেই, শুধুই কবিতা। দ্বিতীয়টির কয়েক পঙ্‌ক্তি: “আর সকলের মতো,/ এটা আমিও ভালো করেই জানি/ সে-মেয়ের জীবন আমার জীবনের সঙ্গে যুক্ত হবে না।/… যে-মেয়েকে ভালোবাসলুম/ অথচ যে-মেয়ের ভালোবাসা পেলুম না,/…তবু সে-মেয়েকেই,/ সে-করুণ-মুহূর্তকেই ভালোবাসা।/ জানি এর পর মৃত্যু।” কবিতাটা সম্পর্কে নরেশ গুহর মন্তব্য: “কবি হিসেবে অশোক কেন আমার প্রিয়, বোধ করি, এই কবিতাটা তার প্রমাণ।”
মেয়েটি কে? দুই বন্ধুই এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। নরেশ গুহর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। মৃদু হেসে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। মনে হয়েছিল অন্য কোনও চিঠিতে লুকিয়ে আছে কাঙ্খিত নামটি। তবে কি ২ জানুয়ারি লেখা চিঠিটাই  উত্তর? “ঢাকাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরে আমার এক সহপাঠিনী জুটলেন, অসম্ভব ক্ষীণাঙ্গিণী, অসম্ভব পড়ুয়া।…জীবন যখন শুকায়ে যায় তিনি বুঝি করুণাধারায়ই এসে থাকেন! এখন বলুন তো আমি কী করি? কী করি! কী করি! তবে কি গলায় দড়ি?” এগারো দিন পরে লেখা আর একটা চিঠির সঙ্গে যুক্ত ‘ঋণশোধ’ নামের কবিতা: “মূর্খ! মূর্খ!/ আত্মার আত্মীয়তাই প্রেম।/ কোনো পুরুষ আত্মার সমকক্ষতায় ভেসে বেড়াতে পারে/ এমন মেয়ে কোথায়?”
এই ভিন্ন সুর আরও স্পষ্ট হয় আর একটি চিঠিতে: “প্রেমের চেয়ে অনেক ভালো প্রেমের কবিতা। আসলে ‘সক্রিয়ভাবে’ প্রেমে পড়লে প্রেমের কবিতা অন্তত লেখা অসম্ভব। হৃদয়ের সমস্ত তন্নিষ্ঠা তখন তো প্রেমকে জড়িয়ে আবেশঅবশ, কবিতা লেখার সময় কোথায়, সচেতনতা কোথায়?” ১৯৫১-র ১৪ নভেম্বরের চিঠিটি অত্যন্ত রহস্যময়। সেখানে এক, দুই, তিন করে পাঁচ জন মেয়ের কথা আছে। যেন একটা উত্তরপত্র, যেন যাঁদের নিয়ে আপনি ‘সন্দেহ’ করছেন তাঁরা পাঁচ জন হলেন এমন: “আর বেশিদিন কুমারী ভূষিতা থাকবেন না তিনি। আজ কলকাতা রওনা হয়ে গেলেন, আগামী ২১ নভেম্বর আপনাদের পাড়ার হরিসাধন দাশগুপ্তকে তিনি হিন্দুমতে বরণ করছেন।” কিংবা “কুমারী কাঞ্চনলতা সাবরওয়ালকে কোনো দিন চোখেই দেখিনি।” এই সমস্ত রহস্যের যবনিকা পড়ে গেল ব্যাঙ্কক থেকে পাঠানো ২৮ এপ্রিল ১৯৫৬ তারিখের চিঠিতে। বৈশাখ মাসে নরেশ গুহর বিবাহ জেনে অভিনন্দন জানিয়ে অশোক লিখলেন: “আমিও বিবাহ করছি। সব কিছু শেষ হয়ে গেছে বলেই; স্মৃতিকে, রক্তকে অন্ধকার আগুনে ডুবিয়ে পুড়িয়ে মারতে চাই বলে। অসম্ভব দুরাশা। তবু, সব আশা শেষ হয়ে গেছে বলে।” চিঠিগুলি আজও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব কালচারাল টেক্সটস অ্যান্ড রেকর্ডস’-এ ডিজিটালি সংরক্ষিত।
এই চিঠিতেই নিরুপম চট্টোপাধ্যায়কে বন্ধুদের ‘বিবাহ অভিযানের’ পথিকৃৎ হিসেবে ‘অভিহিত’ করেছেন অশোক। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ‘চার ইয়ার’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও অন্তরের যোগ অটুট ছিল। ‘চার ইয়ার’ মানে অশোক মিত্র, অরুণকুমার সরকার, নরেশ গুহ ও নিরুপম চট্ট্যোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব বসুর চতুর্ভুজ। রাত বাড়ে, ‘কবিতাভবন’-এর আড্ডা ততই গভীর হয়। গভীর রাতে ২০২ নম্বর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাঁরা ঠিক করেন, রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ট্রাম লাইনের সবুজ ঘাসে বসে চাঁদের আলোয় কবিতা পড়বেন। বসেও পড়েন। অশোক হয়তো আধশোয়া। মুখস্থ বলে যাচ্ছেন ‘ঝরা পালক’-এর কোনও কবিতা। আর একটু হেঁটে গেলেই জীবনানন্দের বাসা। যাবেন সেখানে? না, আজ থাক। ভোর হয়ে এসেছে। দেশপ্রিয় পার্কের পাখিগুলো ডেকে উঠছে। চার জন হেঁটে চলে এলেন সত্যেন দত্ত রোডের ৫ নম্বর বাড়িতে, নরেশ গুহর ভাড়া বাড়িতে। বাইরের ঘরে শুয়ে পড়লেন এলোমেলো।
তবু অশোক ও অরুণকুমারের মধ্যে কিসের দেওয়াল? দুজনেই দুজনকে যেচে চিঠি লিখবেন না। অশোক অকপটে জানান নরেশকে: “অরুণবাবুও আমাকে চিঠি লেখেন না, আমিও লিখি না। কিছুই হয়নি আমাদের মধ্যে, তবু কী যেন হয়েছে। কোনো-এক দেয়াল, যেটাকে ভেঙে ফেলা যায় না, কারণ সেটার শরীর নেই। অথচ সে-দেয়াল ছায়াশরীরী; ছায়ার বিরুদ্ধে তলোয়ার চালিয়ে লাভ নেই, পরাজয় আমার পক্ষে সুনিশ্চিত, অরুণবাবু চেষ্টা করলে তাঁর পক্ষেও।” ভাবীকাল এই দেওয়ালে আজও সুড়ঙ্গ কাটতে পারেনি, সে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অরুণকুমারের কবিতায়: ‘তুমি ডান দিকে যাচ্ছ বুঝি/ তুমি বামে? যাও, ফের দেখা হবে।’
“অশোক মিত্রের অকারণ অবিচল বন্ধুতা আমার জীবনের পরম সম্পদ।… বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার পরেও অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র মহাশয়ের অনেক রচনায় আমার মতো অর্বাচীন অমার্ক্সিস্টের প্রতি তাঁর সদ্ভাবের উল্লেখ থাকায় মহাকরণের অনেকেই অবাক হতেন এবং বিরক্তি বোধ করতেন।”— লিখেছেন নরেশ গুহ। তাঁদের বন্ধুত্ব অবিচল ছিল। প্রথম পরিচয়ের দু’বছরের মধ্যেই অশোক জানিয়ে দিয়েছেন, “আপনাকে আমি যে চিঠি উৎসর্গ করে থাকি তা এ-পৃথিবীতে আর কাউকেই করা যেত না।” নরেশের কাছেই তিনি যেন উন্মুক্ত করতে পারতেন নিজেকে।
“চিঠি লিখছি আর্মানিটোলা স্কুলকে, আমার শৈশবকে, যে অপরিমিত শান্তি সে-শৈশব পৃথিবীতে ছিল তাকে।… চিঠি লিখছি সেই ক্লাসরুমগুলোকে, বেঞ্চিগুলোকে, বর্ষাদিনে স্কুলের মাঠে জল-জমে-যাওয়াজনিত হদয়ের সেই আনন্দউচ্ছ্বাসকে। চিঠি লিখছি সারল্যকে, পবিত্রতাকে আর নিষ্পাপতাকে।”

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/activist-poetry-fan-columnist-ashok-mitra-was-many-things-to-many-people-1.810764?ref=archive-new-stry

অন্দরের মেয়েদের আঁচলেই বাঁধা আছে বিপ্লবের মুক্তি ( On the wife of Charu Mazumdar)

অন্দরের মেয়েদের আঁচলেই বাঁধা আছে বিপ্লবের মুক্তি

ভদ্রমহিলা সংসার সামলেছেন বিমার চাকরি করে।  আবার রাজপথে, মিছিলে তিনিই প্রতিবাদের মুখ । আজীবন সিপিআই (এম) দলের বিশ্বস্ত সদস্য।  এ-হেন লীলা মজুমদার শুধু চারু মজুমদারের জীবনসঙ্গিনীই নন, প্রধান উৎসাহদাতাও।

অশোককুমার মুখোপাধ্যায়
 
lila majumdar
পঙ্কজদি। মা ওই নামেই ডাকতেন। বাবা ‘দি’ যোগ করতেন কি না মনে নেই। তবে, ক্লাস টু, বড়জোর থ্রি-তে পড়া আমিও ডাকতাম ‘পঙ্কজদি’। শুনেই ওই তামার বরন, পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি ভদ্রমহিলা হেসে আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিতেন। মোটা কালো ফ্রেমের চশমার ওপারে চোখ দুটি ঝলমল করত। বাঁ কাঁধে দুলতে থাকা কাপড়ের ঝোলা থেকে বেরোত ‘ঘরে বাইরে’, পিঠের মলাটে নানা আলপনার ছবি। মা’র হাতে তুলে দিতে-দিতে কখনও বলতেন, ‘‘পরশু মনুমেন্ট ময়দানে মিটিং, দেড়শো রুটি আর তরকারি, অবশ্য তরকারির জায়গায় গুড় হলেও চলবে...।’’ তাঁকে চেয়ারে বসতে দেখিনি কোনও দিন, জল-মিষ্টি খেলেও, দাঁড়িয়ে খেতেন। কী এক তাড়ার মধ্যে থাকতেন সারা ক্ষণ।
মা আর পিসি বানিয়ে রাখতেন রুটি-তরকারি। এক জন এসে নিয়ে যেতেন সেই খাবারের ঠোঙা। এ নিশ্চয়ই ১৯৬৩ সালের গল্প। পরে জেনেছি, ওঁর নাম পঙ্কজ আচার্য। কমিউনিস্ট। স্বামী গোপাল আচার্য। ব্যস ওইটুকুই। ভাবতে শেখার মতো লায়েক হলে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি ওই ভদ্রমহিলার ছোটবেলা, বড়বেলা। কিসের জোরে তিনি এমন মেতে থাকতেন সারা ক্ষণ, কী করেই বা এমন নির্মল হাসতে পারতেন!
যাঁর কথায় এই পঙ্কজদির কথা মনে পড়ল, সেই ভদ্রমহিলার জন্ম ১৯২১। ডাক্তার হরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত আর বিজনবালা দেবীর পাঁচ সন্তানের দ্বিতীয় এবং একমাত্র কন্যা। নাম রাখা হয়েছিল আশালতা, পরে লীলা। লীলা এগারো বছর বয়সেই বড় হয়ে যায়। কারণ, বিজনবালা আর একটি সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছেন। নবজাতকও বেশি দিন বাঁচেনি। বাবা, দাদা আর তিন ভাইয়ের সংসারে লীলাই কর্ত্রী। দায়িত্ব নিতেই হবে, কারণ বাবা ঘুরে-ঘুরে ডাক্তারি করেন আর একেবারে ছোট ভাই তখন মাত্র আড়াই বছরের।
–– ADVERTISEMENT ––
রান্নাঘর সামলানোর ফাঁকে তাঁর ম্যাট্রিক এবং আইএ পাশ। বাবার অমতে স্কুলে পড়ানোর কাজ নেওয়া। ইতিমধ্যে জলপাইগুড়িতে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হয়ে শিখে নিয়েছেন লাঠিখেলা, ছোরাখেলা। আঠারো বছর বয়স থেকেই পরতে শুরু করেছেন পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি তো কমিউনিস্ট পার্টির মহিলাদের সহোদরা। অতএব লীলা সেনগুপ্ত যে অচিরেই নিজ যোগ্যতায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পাবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যা আশ্চর্যের, সেই ১৯৪৪-৪৫ সালে, যখন কমিউনিস্ট পার্টির কাজ সহজ নয়, মহিলা সংগঠকদেরও মেয়েদের কাছে পৌঁছতে অনেক সংশয়-সন্দেহের কাঁটাতার পেরোতে হয়, হেঁটে হেঁটেই করতে হয় কাজ— মিল্ক ক্যান্টিন চালানোর সংগঠন, তাঁত চালানোর দল, চাঁদা তোলা, সমিতির সদস্য জোগা‌ড়, পাঠচক্রে উপস্থিতি, বাড়ি-বাড়ি প্রচার— লীলার মতো স্বল্পভাষী মেয়ে তা একদিন-প্রতিদিন করলেন কী করে! কমরেডের সাক্ষ্য, ‘লোকের সাধারণ ধারণা মেয়েরা পরচর্চাপ্রিয়... আমি লীলাদির মুখে কোনও দিন কারও কোনও দুর্বলতার কথা শুনিনি। দৃঢ়তা ছিল যার প্রধান হাতিয়ার, হার না মানার সংকল্প ছিল যার মেরুদণ্ড, সেই লীলাদি কত যে আর্থিক অনটন, কত যে প্রতিকূলতা সহ্য করেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, পার্টির বিভিন্ন কাজ করে গিয়েছেন সর্বদা মুখে একটা মৃদু হাসি নিয়ে, আমি বারবারই অবাক বিস্ময়ে ভেবেছি।’
লীলা মজুমদার এবং চারু মজুমদার
হরেন্দ্রনাথের চাকরির সুবাদে লীলাকেও উত্তরবঙ্গের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত। ১৯৪৬-এর সূচনায় হরেন্দ্রনাথ মারা গেলে, দাদা আর ভাই-সহ লীলা আসেন জলপাইগুড়ি। ইতিমধ্যে দাদার বিবাহ সম্পন্ন, সেজো ভাই ফুসফুসের অসুখে মৃত।
জলপাইগুড়িতে এসে লীলার প্রাণশক্তি তুঙ্গে। শিশুমহল নামে একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো শুরু। পাশাপাশি চলছে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির কাজ। সমিতির মুখপত্র ‘ঘরে বাইরে’-র (যা মেয়েরাই চালায়, মেয়েরাই লেখে, মেয়েরাই বিজ্ঞাপন আনে, টাকার অভাব হলে শো করে টাকা তোলে) প্রচার বাড়ানোয় মন দেন লীলা।
১৯৪৬-এর শেষ দিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভার ডাকে গ্রামে গ্রামে তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের ভাগ চাই ভাগচাষিদের— অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে এর পক্ষে প্রচার চালান লীলাও।
১৯৪৮-এ পার্টি নিষিদ্ধ হল, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিও। লীলা প্রথম বারের জন্য গ্রেফতার হলেন। মুক্তির পর স্কুলের চাকরি আর করার উপায় নেই, বিমা কোম্পানির সাধারণ চাকরি জুটল। এই-ই তাঁর আয়ের উৎস, যত দিন সক্ষম ছিলেন, এই কাজও মন দিয়ে করেছেন লীলা। ‘টার্গেট’ পূরণ করেছেন প্রতি বার। নেননি দুর্নীতির, চালাকির গলিপথ, ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
১৯৫০-এ আবার কারাগারে। জেলে রাজবন্দির মর্যাদার জন্য, অন্য কমরেডদের সঙ্গে অনশন আন্দোলন শুরু হল। লীলা নিলেন নির্জলা অনশনের রাস্তা। তিনিই একমাত্র মহিলা বন্দি।
তেভাগা আন্দোলনের সময় আলাপ হয়েছিল যে যুবকটির সঙ্গে, ১৯৫২-তে বিয়ে করলেন  তাঁকে। ছেলেটির নাম চারু মজুমদার।
বিয়ের পর শিলিগুড়িতে দেখা গেল একের মধ্যে বহু লীলাকে। সংসার সামলে, শ্বশুর বীরেশ্বর মজুমদারকে বলেকয়ে পার্টির কাজে বেরোন। তরাই শ্রমিকদের চাঁদায় কেনা পার্টির গাড়িতে মিটিঙে চলেছেন সবাই, সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন, ‘একবার করে শব্দ হয় ‘হৈ’ আর জীপটা অমনি থেমে পড়ে। কখনও একজন, কখনও দুজন করে লোক ওঠে। কারো হাতে হাট থেকে শস্তায় কেনা বোয়াল মাছ; কারো হাতে ধুলোসুদ্ধু শাকডাঁটা; কেউ নেশা করেছে, মুখে ভকভক করছে গন্ধ। যার যার বাড়ির কাছে এসে লোকে নেমে পড়ছে। কিন্তু আবার উঠছেও তেমনি। কেউ সাঁওতাল, কেউ ওরাঁও, কেউ মুণ্ডা, কেউ কোল। ছত্রিশ জাতের লোক। চা-বাগানের কুলি। গাড়ির মধ্যেটা সারাক্ষণ ঠাসাঠাসি হয়ে আছে। থামলে, মদ, মাছ আর গায়ের দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। চললে দমকা হাওয়ায় তবু কিছুটা সোয়াস্তি... কোলে মেয়ে নিয়ে এককোণে বসে থাকা বন্ধুর স্ত্রীর দিকে তাকালাম। কোন ভাবান্তর নেই। ভিড়ের মধ্যে দিব্যি সহজ নির্বিকার হয়ে বসে আছেন...’ এই ‘বন্ধুর স্ত্রী’ই লীলা মজুমদার। বিয়ের পরেও তিনি পার্টির কাজে আগের মতোই সহজ। গাছকোমর করে বাঁধা, পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ির মহিলা কর্মী অনায়াস ক্ষিপ্রতায় মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিতেন তেভাগা আন্দোলনের মিছিলে, সেই আবেগ চা-বাগান আন্দোলনেও অটুট। বরং কাজের পরিধি বেড়েছে।
সংসারের কাজও অনেক। মজুমদারদের যে অল্প কিছু জমি ছিল, তাতে আধিয়াররা চাষ করত। বছরের ধান ওঠালে তার কিছু তারা দিয়ে যেত লীলার কাছে। তাতে সংসার চলে না। ‘আমাদের বাড়ির উঠোনে গোবর লেপে মা ধান সেদ্ধ করে পা দিয়ে মেলে দিচ্ছেন’, সে ছবি বেশ মনে আছে বড় মেয়ে অনিতার। পরবর্তী সময়ে, আধিয়াররা এক বার এসে বলল, ‘‘মা, আমরা তো আর জমিতে চাষ করতে পারছি না। পাশের জমির জোতদার জুলুম চালাচ্ছে।’’ লীলা জানতে চাইলেন, তাকে কী করতে হবে। ‘‘আমাদের নামে জমি লিখে দাও। আমরাও অল্প কিছু টাকা দিচ্ছি, তুমি বাকিটা দিয়ে খাজনা শোধ করে রেজিস্ট্রি করে দাও।’’ লীলা তা-ই করলেন। কোনও হইচই নয়, কোনও প্রচার নয়, তিনি নীরবে যে কাজটি করলেন, তা করতে অনেক আলোকিত কমিউনিস্টও ভিরমি খাবেন।
প্রথম দিকে লীলাকে নিয়ে আপত্তি থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তাঁর উপর নির্ভরতা বেড়ে গেল বীরেশ্বর মজুমদারের। দেখা গেল, লীলাকে ‘মা’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন তিনি।
পক্ষাঘাত এবং প্রস্টেট জনিত শল্য চিকিৎসায় শয্যাশায়ী মানুষটিকে কেমন ভাবে সেবা করতেন লীলা? বড় মেয়ে অনিতা বলছেন, ‘‘সকালবেলায় উঠে প্রথমে দাদুর বেডপ্যান নিয়ে সেটা পরিষ্কার করতেন। তার পর দাদুর বিছানা চেঞ্জ করতেন এবং সেগুলি কেচে, স্নান করে রান্নাঘরে ঢুকতেন। তাঁর কোলে তখন আড়াই বছরের অভি...’’
এ সেই সময়কার কথা, যখন লীলা এবং চারুর তিন সন্তান— অনিতা, মধুমিতা আর অভিজিৎ। এর মধ্যেই লীলা সাংসারিক সব কাজ নিজ সামর্থ্যে চুকিয়ে, চা-বাগানে ঘুরে-ঘুরে সংগঠনের কাজ করছেন, পার্টির মহিলা ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, দার্জিলিং জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েছেন। এত কিছুর মধ্যে চলেছে পরিবারের অন্ন জোগাড়ের কাজ— জীবনবিমা করানো। এই অতিমানবিক চারিত্রবৈশিষ্ট্যের জন্যই চারু মজুমদারের চিরবন্ধু, চির নির্ভরতা— লীলা।
সরকার ঠিক করেছে, রাজনৈতিক কারণে জেলবন্দিদের পরিবারকে ভাতা দেওয়া হবে। নিয়মমতো টাকা গেল চারুর মহানন্দা পাড়ার টিনের চালওয়ালা কাঠের বাড়িতে। তার পর? সেই ১৯৬৩ সালে লীলার উদ্দেশে জেল থেকে লিখছেন চারু মজুমদার: ‘তুমি family allowance এর টাকা ফেরৎ দিয়ে ভাল কাজই করেছ। ও টাকা নেওয়ার কোনও অর্থ হয় না। সরকারের family allowance এর ব্যাপারে কোনও নীতি আছে বলে মনে হচ্ছে না...’
অথচ মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে তখন চরম দারিদ্র। একই ঘটনা ঘটল দু’বছর পরে আবারও। তখনও চারু কারাগারে। আবারও সেই ‘ভাতা’র প্রশ্ন। আবারও লীলাকে লেখা চারুর চিঠি: ‘family allowance বাবদ ১১৫ টা. দেবে 19.9.65 থেকে। কোনও উত্তর দিই নি দিতেও পারব না। তোমরা যা বিবেচনা হয় কোর।.....আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমাদের স্বপ্ন দেখি। তোমাদের ওখানে annular eclipse দেখা গিয়েছে।’
এই কয়েকটি উচ্চারণই তো দুজনের সম্পর্কের সব কিছু হাট করে দেয়। জেলের মধ্যে যখন খুব অসুস্থ, কর্তৃপক্ষও ভয় পেয়ে গিয়েছে, দরকার পড়লে কী করে হুট করে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা হবে সেই নিয়ে, চারু তখন নিশ্চিন্ত গলায় বলেছেন, ‘‘আমার স্ত্রীকে খবর দিন, উনি আমাকে নিয়ে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে দেবেন।’’
১৯৬৬-৬৭ সালে চারু যখন নতুন রকম ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন, লীলা ছিলেন তাঁর প্রধান উৎসাহদাতা। মানুষ চিনতে লীলার জুড়ি নেই। এ-কথা মানতেই হয় চারুকে। অনেক তথাকথিত কমিউনিস্ট বাড়িতেই দেখা যায়, পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে। মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে তেমনটা ছিল না কখনওই। মজুমদার দম্পতির সম্পর্কটি দাঁড়িয়ে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নিখাদ
শক্ত জমিতে। সেখানে কোনও ভেজাল নেই। একাধিক প্রতিবেশীর সাক্ষ্য পাওয়া যাবে এই কথার সমর্থনে। পাড়ায় তাদের ‘চারুদা’ যেমন, ‘লীলাদি’ও তেমনই প্রিয়জন।
চারুর মতো তার সন্তানদেরও অগাধ ভরসার জায়গা লীলা। মা যেন সবাইকে আগলে রেখেছিলেন দুর্গের মতো, এমনই অনুভব তাঁদের।
তাঁর স্নেহ-মমতার পরিচয় পেয়েছেন ‘আত্মগোপনকারী’ নিমাই ঘোষ। তিনি বলেছেন, ‘‘কমরেডরা আত্মগোপন করে গোপনে চারুদার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, লীলাদি জানতেন কতটা সতর্ক থাকা দরকার। সে সব বিষয়ে লক্ষ রেখেও কোন কমরেড কী খেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য সেই পদ তৈরি করতেন।’’
এক বার ধুম জ্বর নিয়ে নিমাইবাবু ছিলেন মজুমদার বাড়িতে। ‘ঘুমের মধ্যেই আমার মুখ দিয়ে কোনও গোঙানির শব্দ লীলাদির কানে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হল কে যেন আমার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। ঘোরের ভিতর ভাবলাম মা বোধহয়।...আমার তখন তন্দ্রা ভেঙে গেছে। চোখ খুলে দেখি লীলাদি আর চারুদা (চারুর শরীরও সে সময় বেশ খারাপ)। আমি উঠে বসতে যাচ্ছিলাম। লীলাদি বললেন, উঠো না, আমি ওষুধ দিচ্ছি। সেদিন প্রায় অনেক রাত পর্যন্ত লীলাদি আমার মাথার গোড়ায় বসেছিলেন। সেদিনের সেই স্মৃতি আজও আমার মনকে নাড়া দেয়।... চারুদা এক বুক স্বপ্ন নিয়ে, ওই অসুস্থ অবস্থাতে, কোন মানসিক দৃঢ়তার সঙ্গে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে, সারা ভারতবর্ষকে নতুন পথের দিশা দেখাবার প্রয়াসে সচেষ্ট হয়েছিলেন! লীলাদির মতো সাথী পাশে থাকলেই তা সম্ভব।’
স্নেহময়ী লীলা প্রয়োজনে কড়া হতেও জানতেন। ছত্রিশ রকম কাজের মধ্যে একটি বড় দায়িত্ব ছিল শিলিগুড়ির শিশু বিদ্যাপীঠের সম্পাদকের দায়ভার পালন। সেখানে শিক্ষিকাদের আচরণে প্রয়োজনে কঠোর হয়েছেন, বলেছেন: ‘‘এমন ভাবে কাজ করবি না যাতে তোদের নামে আমাকে নালিশ শুনতে হয়!’’
এমনই দাপট বাড়িতেও। ‘‘কোনও খাতা কিনতে হলে মাকে শুক্রবার বলতে হত, তবে মা সোমবারের মধ্যে সেটা কেনার ব্যবস্থা করতেন।
এর অন্যথা হলে বকাবকি শুনতে হত। তখন সংসারে খুবই অনটন,’’ অনিতা জানিয়েছেন। যেই কানে এল তাঁর ননদের (চারুর একমাত্র বোন বেলা) ছেলের নানা স্খলনের খবর, লীলা তাকে জোর করে নিয়ে এলেন মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে। জুড়ে দিলেন ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির নানা কাজে। সে ছেলে সোজা পথে এল। এমনই সহৃদয় আন্তরিকতায় যুক্ত ছিলেন প্রতিবেশীদের সঙ্গেও। চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর নিজস্ব একান্ত শোক গোপন করে, শোকবিহ্বল সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যত দিন না তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অবলম্বন দিয়েছেন তাদের।
চারু মজুমদারের রাজনীতি নিয়ে কোনও বাক্য উচ্চারণ করেননি কোনও দিন পরবর্তী সময়ে। এমনকী ঘরোয়া হালকা আলোচনাতেও নয়। সব কিছুই কি তাঁর পছন্দ ছিল? তাও জানার উপায় নেই। তবে তিনটি ঘটনা মনে রাখবার। হরেকৃষ্ণ কোঙার যখন জনসভায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের নিন্দেমন্দ করছেন, কিশোরী অনিতাকে নিয়ে সভা ত্যাগ করেন লীলা। সত্তরে যখনই সশস্ত্র পুলিশ বাড়িতে তল্লাশিতে এসেছে, সমস্ত অস্ত্র সদর দরজায় মাটিতে রাখলে, তবেই ঘরে ঢুকতে দিয়েছেন তাদের। আবার গুনে গুনে প্রতিটি অস্ত্র ফেরত নেওয়ার পর তবে তাদের রেহাই। ঘরের মধ্যে অকস্মাৎ ‘অস্ত্র আবিষ্কার’ বন্ধ করতে এ তাঁর চমৎকার প্রতিরোধ।
আবার ১৯৭১-এ যখন তাঁর বাবার কমরেড সৌরেন বসু অনিতাকে বলছেন, পরীক্ষা বয়কট করো, লীলা মেয়েকে বলছেন, পরীক্ষা দাও। তাঁর মতামত স্পষ্ট, চিন্তা স্বাধীন। এরই পাশাপাশি তাঁর লেটারপ্যাডে নিজের নামের তলায় লেখা: কেয়ার অব লেট চারু মজুমদার! অথচ, কেউ তাঁকে বৌদি বলে ডাকেনি। হয় ‘লীলা’, নয় ‘লীলাদি’!
পঙ্কজদির জীবনকাহিনি জানার ইচ্ছে হত মাঝে মাঝে। এখন লীলা মজুমদারের কথা জানার পর, তা পূর্ণ হয়েছে। নিশ্চয়ই এমনই কিছু হবে তা। কলকাতার রাস্তায় ২৭ এপ্রিল ১৯৪৯ শহিদ হওয়া লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, গীতা কিংবা ‘স্তালিন-নন্দিনী’ ইলা মিত্র এবং লীলা— এঁরা সবাই একই গোত্রের। এমনকী এই ক’দিন আগে পদ্মশ্রী পেলেন যিনি, সেই সুবাসিনী মিস্ত্রি, তিনিও— খাতায়-কলমে কমিউনিস্ট হোন চাই নাই হোন— এই রকমই এক মানবী।
ঘরে ঘরে অন্দরে এঁরা আছেন। খুঁজে দেখতে হবে শুধু। অন্দরের দিকে ফিরে তাকিয়ে, এই সব শক্তিরূপিণীদের খুঁজে বার করলে দেখা যাবে, এক ফুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে নারী নির্যাতন আর অবমাননার সব মুখ কালো করা খবর।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/lila-mazumdar-was-not-only-the-wife-of-charu-majumder-but-also-the-main-motivator-1.811213?ref=archive-new-stry

ঠিক যেন যৌথ পরিবারের বড়দা (On Uttam Kumar)

ঠিক যেন যৌথ পরিবারের বড়দা

Uttam-Bhanu
 
Uttam Kumar, Bhanu Bandopadhyay and Soumitra Chatterjee

মেজাজ: আড্ডাতেও যেন বড়দা। পাশে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমিত্র

যদুবংশ’ ছবির শুটিং চলছে। সাতের দশকের গোড়ার দিক। পার্থপ্রতিম চৌধুরী, পরিচালক, হেঁকে উঠেছেন, ‘‘অল লাইটস’’। পজিশন নিতে গিয়ে উত্তমকুমার খেয়াল করলেন, টপ থেকে কোনও একটা লাইট ঠিকমত তাঁর শরীরে এসে পড়েনি। তখন উপরে কাঠের পাটাতনে লাইটম্যানরা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতেন, নির্দেশ মতো সুইচ অফ-অন করতেন। সে দিন তেমনই এক জন, নাম তাঁর কালী, হাঁক শোনার পরও ভুলে গেলেন আলো জ্বালতে। শট অবশ্য হয়ে গেল, তবে হয়ে যাওয়ার পর কালীকে ডেকে পাঠালেন উত্তম। শুনে কালী কাঁপতে কাঁপতে উত্তমের মেক-আপ রুমে এলেন। এমনিতে তাঁর কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই বিড়ি চেয়ে খান উত্তম, কিন্তু কাজের ভুলের তো কোনও ক্ষমা নেই। কিন্তু উত্তম বকুনি না দিয়ে সস্নেহে তাঁকে বললেন, ‘‘কী হয়েছে রে কালী? অন্যমনস্ক ছিলিস মনে হল, এনি প্রবলেম?’’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন কালী, বলেন, ‘‘মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে দাদা, কিন্তু আমি কিছুতেই টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছি না। তাই... এমনটা আর হবে না।’’
পরের দিন স্টুডিয়োতে বেরনোর আগে উত্তমের বাড়িতে তাঁরই নির্দেশ মতো কালীকে নিয়ে হাজির পার্থপ্রতিমের সহকারী বিমল দে। তাঁদের দুজনকে নিয়ে স্টুডিয়ো যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে উত্তম কালীর হাতে হাজার পাঁচেক টাকার একটা খাম ধরিয়ে বললেন, ‘‘এটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখ।’’
এ ভাবে হরদম যাঁদের পাশে দাঁড়াতেন, তাঁরা কেউ আত্মীয় ছিলেন না উত্তমের। অথচ উত্তম প্রায়ই তাঁদের অভিভাবক হয়ে উঠতেন, প্রায় একান্নবর্তী পরিবারের স্নেহপরায়ণ দাদার মতো। কত মেয়ের যে বিয়ে দিয়েছেন, আজ আর সে কথা কে-ই বা মনে রাখে। মণি শ্রীমানির মতো অভিনেতার যাতে অসম্মান না হয়, সে জন্য তাঁর মেয়ের বিয়ের টাকা নিজে না দিয়ে ফাংশন করে তুলে দিয়েছিলেন উত্তম। রাসবিহারী সরকার বিনা ভাড়ায় ‘বিশ্বরূপা’ হলটি দিয়েছিলেন, গোটা অনুষ্ঠানটা আয়োজন করেছিলেন ভাই তরুণকুমার আর সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল আকর্ষণই ছিল উত্তমের গানের সঙ্গে অসিতবরনের তবলা। হইহই করে টিকিট বিক্রি হল আর মণি শ্রীমানির মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেল।
বিপদে-আপদে সব সময় অন্যের পাশে দাঁড়াতেন, বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিতেন। কোনও শিল্পী অপমানিত হলে, কলাকুশলীদের কোনও অসুবিধে হলে, বিশেষত নীচের দিকে যাঁরা, তাঁদের হয়ে প্রতিবাদ করতেন।
আবার ভবানীপুরের বাড়িতে ধুমধাম করে লক্ষ্মীপুজোও করতেন সকলের সঙ্গে। সেখানেও তিনি বড়দাদা, প্রায় যেন অভিভাবক গোটা বাড়িটার। মায়ার বাঁধন প্রত্যেকের সঙ্গে। পরদার বাইরে তাঁর এই জীবনটা নিয়ে একটা বই লিখেছেন অশোক বসু, ‘পর্দার বাইরেও মহানায়ক’, তাতে উত্তমের জীবনের এ রকম অজস্র অনুষঙ্গ।
এগুলি ছাপ ফেলত তাঁর অভিনয়েও। অথচ আমরা সে সব খেয়ালও রাখি না। অভিনয় জীবনের শুরুতে ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২), যে ছবি করে উত্তমের প্রসিদ্ধি হল প্রথম, আর একেবারে শেষে ‘দুই পৃথিবী’ (১৯৮০)। এই দু’টি ছবিতেই তিনি পরিবারের বড় ভাই, একান্নবর্তী পরিবারের মাথা। উত্তমের বাবা ছিলেন একা রোজগেরে, সিনেমাহলের প্রজেকশন অপারেটর। ফলে যথেষ্ট স্ট্রাগল দেখেছেন উত্তম, উঠে এসেছেন একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত একটা বড় পরিবার থেকে। নিজের পারিবারিক জীবন আর অভিনয় জীবন যেখানে একাকার, সে সব ছবিতে অভিনেতা হিসেবে অসামান্য তিনি। স্টারডম, লার্জার দ্যান লাইফ বা রোম্যান্টিক ম্যানারিজম-এর খাঁচাটাঁচা সব ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। পরিবার থেকে সমাজ, সর্বত্রই যেন দায়িত্ববান এক অভিভাবক, জাগ্রত বিবেকের মতো। দুই ভাই, থানা থেকে আসছি, চৌরঙ্গী, নিশিপদ্ম, এখানে পিঞ্জর, যদি জানতেম, যদুবংশ, অগ্নীশ্বর, নগর দর্পণে... এ রকম আরও কত ছবি।
আড্ডায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মাঝেমধ্যেই উত্তমকুমারকে নিয়ে স্মৃতিতে ফিরে যান... তখন শিল্পী সংসদ আর অভিনেতৃ সংঘের ঝগড়াঝাঁটি বাক্‌যুদ্ধ চলছে, প্রথমটিতে উত্তম আর পরেরটিতে সৌমিত্র। বসুশ্রী সিনেমায় পয়লা বৈশাখ, সৌমিত্র গিয়ে দেখেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে বসে আছেন উত্তম। ওঁরা দু’জন তখন দুই যুযুধান শিবিরে। বাকিটা সৌমিত্রের মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘‘আমি গিয়ে ভানুদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। আর যেহেতু দুই শিবিরে আমরা বিভক্ত, তাই উত্তমদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম না করে, হাতটা ধরে ‘শুভ নববর্ষ’ বললাম। বলামাত্র উত্তমদার মুখটা লাল হয়ে গেল। রাগে দুঃখে। এবং এই হচ্ছে লোকটার মহত্ত্ব। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বড় ভাই, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পারিস না!’ আমার পরম সৌভাগ্য যে, এই মুহূর্তে আমি যে অন্যায় করেছি, সেই চেতনাটা হল।’’ সে দিন ক্ষমা চেয়ে নিয়ে যখন উত্তমকে প্রণাম করলেন সৌমিত্র, তখন তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করলেন উত্তম।
এই কথাগুলো হয়তো আজ অনেকেরই জানা, তবে মুশকিল হল এটা থেকে আমরা কখনও উত্তমের অভিনয় জীবনের বিচার করতে শিখিনি, যেটা ভারী চমৎকার শিখিয়েছেন সৌমিত্র। বলছেন, ‘‘একটা বিশেষ ধরনের চরিত্রে আমি ওঁর কোনও জুড়ি পাই না। সেটা হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের বড় ভাই। যেটা ওঁর নিজের মধ্যেও ছিল এবং সে রকম একটা পরিবার থেকেই উঠে এসেছিলেন। অসাধারণ অভিনয়, এই জিনিসগুলো বোধহয় ওঁর মতো ভাল আর কেউ করতে পারে না।’’

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/uttam-kumar-was-so-called-a-guardian-in-tollywood-industry-1.646358?ref=rabibashoriyo-new-stry

পাঠকও ধরতে পারেননি নকল কে (On Bimal Mitra)

পাঠকও ধরতে পারেননি নকল কে

লেখক বিমল মিত্রের নামে গল্প-উপন্যাস লিখতেন প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন নকল বিমল মিত্র। আসল আর নকল লেখকের নামযুদ্ধ গড়িয়েছিল আদালতেও।

ঊর্মি নাথ
Bimal Mitra

আসল: বিমল মিত্র

মুর্শিদাবাদের লালগোলার মহারাজা ধীরেন্দ্রনারায়ণের ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছেন সাহিত্যিক বিমল মিত্র। বিয়ে বাড়ির হইচইয়ের  মধ্যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল একটা চমক। খাবার টেবিলে ধীরেন্দ্রনারায়ণ পুত্রবধূর সঙ্গে বিমল মিত্রের আলাপ করাতে গিয়ে বললেন, ‘এই হলেন আসল বিমল মিত্র। আর এই হলেন নকল বিমল মিত্র!’ বলে পা‌শে বসা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। নকল বিমল লজ্জায় খাবারের প্লেট ফেলে ছুটে পালালেন।
হওয়ার কথা ছিল এমনটাই। কিন্তু হয়নি। বরং নকল বিমল মিত্রের অট্টহাস্য শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন আসল বিমল। ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক বিমল মিত্রের নামেই লিখতেন, বাজারে ছিলেন এমন ২০-২৫ জন। বেশ কিছু প্রকাশক সে সব লেখা প্রকাশও করতেন। রমরম করে বিক্রি হয়েছে সে সব বই। পাঠক ধরতেই পারেননি। কিন্তু আসল বিমল মিত্রের আর্থিক ক্ষতি তো হয়েইছিল, কপালে জুটেছিল সমালোচনাও। চেন্নাইয়ের ভেনাস পিকচার্স স্টুডিয়োর নানু ঘোষ বিমল মিত্রের মুখের উপর বলেছিলেন, তাঁর পাঠানো গল্পটি এক কথায় রাবিশ। শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন বিমলবাবু। কারণ তিনি কোনও দিনই কোনও পরিচালককে তাঁর গল্প থেকে ছবি করার জন্য সুপারিশ করেননি। ঘোষবাবুর থেকে বিমলবাবু জানলেন, তাঁকে নকল বিমল মিত্র লিখেছিলেন, ‘‘আমি ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক, আমার নতুন বই ‘কড়ির চেয়ে দামী’ সিনেমা করার জন্য পাঠাচ্ছি।’’
নকল লেখকের উৎপাতে বিদেশ থেকেও নিন্দা শুনতে হয়েছে তাঁকে। ফিলাডেলফিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিমল মিত্রের বই পড়ে তাঁর বন্ধু দিলীপ ঘোষ বিমলবাবুকে লিখে জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘কড়ির চেয়ে দামী’, ‘বসন্ত মালতী’, ‘মানস সুন্দরী’ বইগুলো অপাঠ্য। ১৯৭১ সালে ‘ফুল ফুটুক’ উপন্যাসটির নিবেদন অংশে জাল বইয়ের জন্য তাঁর বিড়ম্বনার প্রসঙ্গে এই ঘটনার উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘সে সব যে আমার নামে প্রকাশিত জাল বই, দুঃখের সঙ্গে তাঁকে সে কথা জানাতেও ঘৃণা হল।’’
১৯৭০ সালে এক দিন, স্টেট লটারি ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন। ও পারে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের লটারি ডিপার্টমেন্টের অফিসার,  বিমল মিত্রকে অনুরোধ করছেন লটারি বিচারক হওয়ার জন্য। বিমলবাবু লটারির টিকিট বিক্রির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বারংবার অনুরোধে রাজি হতে হল। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানে পৌঁছে জানতে পারলেন, তাঁকে নিয়ে প্রবল সমস্যায় পড়তে হয়েছিল অফিসারটিকে। অফিসার ফোন গাইড দেখে বিমল মিত্রকে ফোন করতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। বিমল মিত্রের মতো মানুষ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হচ্ছেন, সন্দেহ হয় তাঁর। তখন ফোন করেন আর এক বিমল মিত্রকে। বারংবার আপত্তিতেই বুঝে যান, আসল বিমল মিত্রকে পেয়েছেন।
সত্তরের দশকে কলেজ স্ট্রিটের কয়েকটি ছোট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক গড়েপিঠে তৈরি করেছিলেন নকল বিমল মিত্রদের। নকলদের মধ্যেও আবার সবচেয়ে বেশি দর ছিল রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর। বছর কয়েক আগে, সদ্য প্রয়াত সাহিত্য গবেষক  অদ্রীশ বিশ্বাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথবাবু জানিয়েছিলেন, বিমল মিত্র ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক, সাহিত্যচর্চার গুরু। নিজের বই প্রকাশের ইচ্ছে নিয়ে এক প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক তাঁকে একটা টোপ দেন। তিনি শ্রীচক্রবর্তীর বই ছাপবেন, যদি বিমল মিত্রের নামে তিনি একটা উপন্যাস তাঁকে লিখে দেন। ওই প্রকাশকের ক্ষমতা ছিল না বিমল মিত্রের মতো বড় লেখকের বই প্রকাশ করার। আর এ দিকে বিমল মিত্র মানেই আজকের ভাষায় বেস্টসেলার। টোপ গেলেননি রবীন্দ্রনাথবাবু, তবে মনে মনে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন। দেখি তো পারি কি না বিমল মিত্রের মতো লিখতে! লিখলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রক্ত পলাশ’। প্রকাশককে পড়ালেন। প্রকাশক বুঝলেন, তিনি লোক চিনতে ভুল করেননি। রবীন্দ্রনাথবাবু গোড়ায় পাণ্ডুলিপি দিতে অস্বীকার করলেও প্রকাশকের মগজধোলাইয়ের কাছে তাঁকে হার মানতে হয়। ‘রক্ত পলাশ’ খুব হিট করে বইবাজারে। ১৯৬৮-’৭৩-এর মধ্যে তিনি একাধিক বই লিখেছেন ‘বিমল মিত্র’ হয়ে। লিখতে-লিখতে ভুলেই গিয়েছিলেন, তিনি বিমল মিত্র নন। আজ অবধি তার নিজের নামে কোনও বই প্রকাশ পায়নি। বিমল মিত্রের নামে চিঠি এলে তিনিই উত্তর দিতেন। সর্তক থাকতেন যাতে তাঁর লেখা বইয়ের রিভিউ ছাপা না হয়, তা হলেই আসল বিমলের নজরে এসে যাবে। ১৯৭৩-এ ‘চতুরঙ্গ’ প্রকাশের পর ধরা পড়েছিলেন নকল বিমল। নকল বিমলকে বাঁচাতে প্রকাশক রাতারাতি জাল রেশন কার্ড, কর্পোরেশনের সার্টিফিকেট বের করে ফেলেছিল। একই নামে দু’জন লেখক থাকতেই পারেন। আইনত কিছু করা যায় না। মামলাটি হেরে যান আসল বিমল মিত্র!
১৯৭৮ সালে ‘যা ইতিহাসে নেই’ উপন্যাসে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিমল মিত্র জানিয়েছিলেন, ‘আমার পাঠক-পাঠিকাবর্গের সতর্কতার জন্য জানাচ্ছি যে, সম্প্রতি দুই শতাধিক উপন্যাস ‘বিমল মিত্র’ নামযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠক মহলে আমার লোকপ্রিয়তার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব হয়ছে। .... একমাত্র কড়ি দিয়ে কিনলাম ছাড়া আমার লেখা প্রত্যেকটি গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর মুদ্রিত আছে।’ একেই কি বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা?

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/readers-were-unable-to-catch-the-writing-of-real-bimal-mitra-1.649890?ref=rabibashoriyo-new-stry