Sunday, 10 June 2018

অন্দরের মেয়েদের আঁচলেই বাঁধা আছে বিপ্লবের মুক্তি ( On the wife of Charu Mazumdar)

অন্দরের মেয়েদের আঁচলেই বাঁধা আছে বিপ্লবের মুক্তি

ভদ্রমহিলা সংসার সামলেছেন বিমার চাকরি করে।  আবার রাজপথে, মিছিলে তিনিই প্রতিবাদের মুখ । আজীবন সিপিআই (এম) দলের বিশ্বস্ত সদস্য।  এ-হেন লীলা মজুমদার শুধু চারু মজুমদারের জীবনসঙ্গিনীই নন, প্রধান উৎসাহদাতাও।

অশোককুমার মুখোপাধ্যায়
 
lila majumdar
পঙ্কজদি। মা ওই নামেই ডাকতেন। বাবা ‘দি’ যোগ করতেন কি না মনে নেই। তবে, ক্লাস টু, বড়জোর থ্রি-তে পড়া আমিও ডাকতাম ‘পঙ্কজদি’। শুনেই ওই তামার বরন, পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি ভদ্রমহিলা হেসে আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিতেন। মোটা কালো ফ্রেমের চশমার ওপারে চোখ দুটি ঝলমল করত। বাঁ কাঁধে দুলতে থাকা কাপড়ের ঝোলা থেকে বেরোত ‘ঘরে বাইরে’, পিঠের মলাটে নানা আলপনার ছবি। মা’র হাতে তুলে দিতে-দিতে কখনও বলতেন, ‘‘পরশু মনুমেন্ট ময়দানে মিটিং, দেড়শো রুটি আর তরকারি, অবশ্য তরকারির জায়গায় গুড় হলেও চলবে...।’’ তাঁকে চেয়ারে বসতে দেখিনি কোনও দিন, জল-মিষ্টি খেলেও, দাঁড়িয়ে খেতেন। কী এক তাড়ার মধ্যে থাকতেন সারা ক্ষণ।
মা আর পিসি বানিয়ে রাখতেন রুটি-তরকারি। এক জন এসে নিয়ে যেতেন সেই খাবারের ঠোঙা। এ নিশ্চয়ই ১৯৬৩ সালের গল্প। পরে জেনেছি, ওঁর নাম পঙ্কজ আচার্য। কমিউনিস্ট। স্বামী গোপাল আচার্য। ব্যস ওইটুকুই। ভাবতে শেখার মতো লায়েক হলে কল্পনা করার চেষ্টা করেছি ওই ভদ্রমহিলার ছোটবেলা, বড়বেলা। কিসের জোরে তিনি এমন মেতে থাকতেন সারা ক্ষণ, কী করেই বা এমন নির্মল হাসতে পারতেন!
যাঁর কথায় এই পঙ্কজদির কথা মনে পড়ল, সেই ভদ্রমহিলার জন্ম ১৯২১। ডাক্তার হরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত আর বিজনবালা দেবীর পাঁচ সন্তানের দ্বিতীয় এবং একমাত্র কন্যা। নাম রাখা হয়েছিল আশালতা, পরে লীলা। লীলা এগারো বছর বয়সেই বড় হয়ে যায়। কারণ, বিজনবালা আর একটি সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছেন। নবজাতকও বেশি দিন বাঁচেনি। বাবা, দাদা আর তিন ভাইয়ের সংসারে লীলাই কর্ত্রী। দায়িত্ব নিতেই হবে, কারণ বাবা ঘুরে-ঘুরে ডাক্তারি করেন আর একেবারে ছোট ভাই তখন মাত্র আড়াই বছরের।
–– ADVERTISEMENT ––
রান্নাঘর সামলানোর ফাঁকে তাঁর ম্যাট্রিক এবং আইএ পাশ। বাবার অমতে স্কুলে পড়ানোর কাজ নেওয়া। ইতিমধ্যে জলপাইগুড়িতে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হয়ে শিখে নিয়েছেন লাঠিখেলা, ছোরাখেলা। আঠারো বছর বয়স থেকেই পরতে শুরু করেছেন পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি তো কমিউনিস্ট পার্টির মহিলাদের সহোদরা। অতএব লীলা সেনগুপ্ত যে অচিরেই নিজ যোগ্যতায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পাবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যা আশ্চর্যের, সেই ১৯৪৪-৪৫ সালে, যখন কমিউনিস্ট পার্টির কাজ সহজ নয়, মহিলা সংগঠকদেরও মেয়েদের কাছে পৌঁছতে অনেক সংশয়-সন্দেহের কাঁটাতার পেরোতে হয়, হেঁটে হেঁটেই করতে হয় কাজ— মিল্ক ক্যান্টিন চালানোর সংগঠন, তাঁত চালানোর দল, চাঁদা তোলা, সমিতির সদস্য জোগা‌ড়, পাঠচক্রে উপস্থিতি, বাড়ি-বাড়ি প্রচার— লীলার মতো স্বল্পভাষী মেয়ে তা একদিন-প্রতিদিন করলেন কী করে! কমরেডের সাক্ষ্য, ‘লোকের সাধারণ ধারণা মেয়েরা পরচর্চাপ্রিয়... আমি লীলাদির মুখে কোনও দিন কারও কোনও দুর্বলতার কথা শুনিনি। দৃঢ়তা ছিল যার প্রধান হাতিয়ার, হার না মানার সংকল্প ছিল যার মেরুদণ্ড, সেই লীলাদি কত যে আর্থিক অনটন, কত যে প্রতিকূলতা সহ্য করেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, পার্টির বিভিন্ন কাজ করে গিয়েছেন সর্বদা মুখে একটা মৃদু হাসি নিয়ে, আমি বারবারই অবাক বিস্ময়ে ভেবেছি।’
লীলা মজুমদার এবং চারু মজুমদার
হরেন্দ্রনাথের চাকরির সুবাদে লীলাকেও উত্তরবঙ্গের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত। ১৯৪৬-এর সূচনায় হরেন্দ্রনাথ মারা গেলে, দাদা আর ভাই-সহ লীলা আসেন জলপাইগুড়ি। ইতিমধ্যে দাদার বিবাহ সম্পন্ন, সেজো ভাই ফুসফুসের অসুখে মৃত।
জলপাইগুড়িতে এসে লীলার প্রাণশক্তি তুঙ্গে। শিশুমহল নামে একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো শুরু। পাশাপাশি চলছে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির কাজ। সমিতির মুখপত্র ‘ঘরে বাইরে’-র (যা মেয়েরাই চালায়, মেয়েরাই লেখে, মেয়েরাই বিজ্ঞাপন আনে, টাকার অভাব হলে শো করে টাকা তোলে) প্রচার বাড়ানোয় মন দেন লীলা।
১৯৪৬-এর শেষ দিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষাণ সভার ডাকে গ্রামে গ্রামে তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের ভাগ চাই ভাগচাষিদের— অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে এর পক্ষে প্রচার চালান লীলাও।
১৯৪৮-এ পার্টি নিষিদ্ধ হল, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিও। লীলা প্রথম বারের জন্য গ্রেফতার হলেন। মুক্তির পর স্কুলের চাকরি আর করার উপায় নেই, বিমা কোম্পানির সাধারণ চাকরি জুটল। এই-ই তাঁর আয়ের উৎস, যত দিন সক্ষম ছিলেন, এই কাজও মন দিয়ে করেছেন লীলা। ‘টার্গেট’ পূরণ করেছেন প্রতি বার। নেননি দুর্নীতির, চালাকির গলিপথ, ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
১৯৫০-এ আবার কারাগারে। জেলে রাজবন্দির মর্যাদার জন্য, অন্য কমরেডদের সঙ্গে অনশন আন্দোলন শুরু হল। লীলা নিলেন নির্জলা অনশনের রাস্তা। তিনিই একমাত্র মহিলা বন্দি।
তেভাগা আন্দোলনের সময় আলাপ হয়েছিল যে যুবকটির সঙ্গে, ১৯৫২-তে বিয়ে করলেন  তাঁকে। ছেলেটির নাম চারু মজুমদার।
বিয়ের পর শিলিগুড়িতে দেখা গেল একের মধ্যে বহু লীলাকে। সংসার সামলে, শ্বশুর বীরেশ্বর মজুমদারকে বলেকয়ে পার্টির কাজে বেরোন। তরাই শ্রমিকদের চাঁদায় কেনা পার্টির গাড়িতে মিটিঙে চলেছেন সবাই, সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন, ‘একবার করে শব্দ হয় ‘হৈ’ আর জীপটা অমনি থেমে পড়ে। কখনও একজন, কখনও দুজন করে লোক ওঠে। কারো হাতে হাট থেকে শস্তায় কেনা বোয়াল মাছ; কারো হাতে ধুলোসুদ্ধু শাকডাঁটা; কেউ নেশা করেছে, মুখে ভকভক করছে গন্ধ। যার যার বাড়ির কাছে এসে লোকে নেমে পড়ছে। কিন্তু আবার উঠছেও তেমনি। কেউ সাঁওতাল, কেউ ওরাঁও, কেউ মুণ্ডা, কেউ কোল। ছত্রিশ জাতের লোক। চা-বাগানের কুলি। গাড়ির মধ্যেটা সারাক্ষণ ঠাসাঠাসি হয়ে আছে। থামলে, মদ, মাছ আর গায়ের দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। চললে দমকা হাওয়ায় তবু কিছুটা সোয়াস্তি... কোলে মেয়ে নিয়ে এককোণে বসে থাকা বন্ধুর স্ত্রীর দিকে তাকালাম। কোন ভাবান্তর নেই। ভিড়ের মধ্যে দিব্যি সহজ নির্বিকার হয়ে বসে আছেন...’ এই ‘বন্ধুর স্ত্রী’ই লীলা মজুমদার। বিয়ের পরেও তিনি পার্টির কাজে আগের মতোই সহজ। গাছকোমর করে বাঁধা, পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ির মহিলা কর্মী অনায়াস ক্ষিপ্রতায় মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিতেন তেভাগা আন্দোলনের মিছিলে, সেই আবেগ চা-বাগান আন্দোলনেও অটুট। বরং কাজের পরিধি বেড়েছে।
সংসারের কাজও অনেক। মজুমদারদের যে অল্প কিছু জমি ছিল, তাতে আধিয়াররা চাষ করত। বছরের ধান ওঠালে তার কিছু তারা দিয়ে যেত লীলার কাছে। তাতে সংসার চলে না। ‘আমাদের বাড়ির উঠোনে গোবর লেপে মা ধান সেদ্ধ করে পা দিয়ে মেলে দিচ্ছেন’, সে ছবি বেশ মনে আছে বড় মেয়ে অনিতার। পরবর্তী সময়ে, আধিয়াররা এক বার এসে বলল, ‘‘মা, আমরা তো আর জমিতে চাষ করতে পারছি না। পাশের জমির জোতদার জুলুম চালাচ্ছে।’’ লীলা জানতে চাইলেন, তাকে কী করতে হবে। ‘‘আমাদের নামে জমি লিখে দাও। আমরাও অল্প কিছু টাকা দিচ্ছি, তুমি বাকিটা দিয়ে খাজনা শোধ করে রেজিস্ট্রি করে দাও।’’ লীলা তা-ই করলেন। কোনও হইচই নয়, কোনও প্রচার নয়, তিনি নীরবে যে কাজটি করলেন, তা করতে অনেক আলোকিত কমিউনিস্টও ভিরমি খাবেন।
প্রথম দিকে লীলাকে নিয়ে আপত্তি থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তাঁর উপর নির্ভরতা বেড়ে গেল বীরেশ্বর মজুমদারের। দেখা গেল, লীলাকে ‘মা’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন তিনি।
পক্ষাঘাত এবং প্রস্টেট জনিত শল্য চিকিৎসায় শয্যাশায়ী মানুষটিকে কেমন ভাবে সেবা করতেন লীলা? বড় মেয়ে অনিতা বলছেন, ‘‘সকালবেলায় উঠে প্রথমে দাদুর বেডপ্যান নিয়ে সেটা পরিষ্কার করতেন। তার পর দাদুর বিছানা চেঞ্জ করতেন এবং সেগুলি কেচে, স্নান করে রান্নাঘরে ঢুকতেন। তাঁর কোলে তখন আড়াই বছরের অভি...’’
এ সেই সময়কার কথা, যখন লীলা এবং চারুর তিন সন্তান— অনিতা, মধুমিতা আর অভিজিৎ। এর মধ্যেই লীলা সাংসারিক সব কাজ নিজ সামর্থ্যে চুকিয়ে, চা-বাগানে ঘুরে-ঘুরে সংগঠনের কাজ করছেন, পার্টির মহিলা ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, দার্জিলিং জেলা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়েছেন। এত কিছুর মধ্যে চলেছে পরিবারের অন্ন জোগাড়ের কাজ— জীবনবিমা করানো। এই অতিমানবিক চারিত্রবৈশিষ্ট্যের জন্যই চারু মজুমদারের চিরবন্ধু, চির নির্ভরতা— লীলা।
সরকার ঠিক করেছে, রাজনৈতিক কারণে জেলবন্দিদের পরিবারকে ভাতা দেওয়া হবে। নিয়মমতো টাকা গেল চারুর মহানন্দা পাড়ার টিনের চালওয়ালা কাঠের বাড়িতে। তার পর? সেই ১৯৬৩ সালে লীলার উদ্দেশে জেল থেকে লিখছেন চারু মজুমদার: ‘তুমি family allowance এর টাকা ফেরৎ দিয়ে ভাল কাজই করেছ। ও টাকা নেওয়ার কোনও অর্থ হয় না। সরকারের family allowance এর ব্যাপারে কোনও নীতি আছে বলে মনে হচ্ছে না...’
অথচ মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে তখন চরম দারিদ্র। একই ঘটনা ঘটল দু’বছর পরে আবারও। তখনও চারু কারাগারে। আবারও সেই ‘ভাতা’র প্রশ্ন। আবারও লীলাকে লেখা চারুর চিঠি: ‘family allowance বাবদ ১১৫ টা. দেবে 19.9.65 থেকে। কোনও উত্তর দিই নি দিতেও পারব না। তোমরা যা বিবেচনা হয় কোর।.....আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমাদের স্বপ্ন দেখি। তোমাদের ওখানে annular eclipse দেখা গিয়েছে।’
এই কয়েকটি উচ্চারণই তো দুজনের সম্পর্কের সব কিছু হাট করে দেয়। জেলের মধ্যে যখন খুব অসুস্থ, কর্তৃপক্ষও ভয় পেয়ে গিয়েছে, দরকার পড়লে কী করে হুট করে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা হবে সেই নিয়ে, চারু তখন নিশ্চিন্ত গলায় বলেছেন, ‘‘আমার স্ত্রীকে খবর দিন, উনি আমাকে নিয়ে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে দেবেন।’’
১৯৬৬-৬৭ সালে চারু যখন নতুন রকম ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন, লীলা ছিলেন তাঁর প্রধান উৎসাহদাতা। মানুষ চিনতে লীলার জুড়ি নেই। এ-কথা মানতেই হয় চারুকে। অনেক তথাকথিত কমিউনিস্ট বাড়িতেই দেখা যায়, পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলছে। মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে তেমনটা ছিল না কখনওই। মজুমদার দম্পতির সম্পর্কটি দাঁড়িয়ে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নিখাদ
শক্ত জমিতে। সেখানে কোনও ভেজাল নেই। একাধিক প্রতিবেশীর সাক্ষ্য পাওয়া যাবে এই কথার সমর্থনে। পাড়ায় তাদের ‘চারুদা’ যেমন, ‘লীলাদি’ও তেমনই প্রিয়জন।
চারুর মতো তার সন্তানদেরও অগাধ ভরসার জায়গা লীলা। মা যেন সবাইকে আগলে রেখেছিলেন দুর্গের মতো, এমনই অনুভব তাঁদের।
তাঁর স্নেহ-মমতার পরিচয় পেয়েছেন ‘আত্মগোপনকারী’ নিমাই ঘোষ। তিনি বলেছেন, ‘‘কমরেডরা আত্মগোপন করে গোপনে চারুদার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, লীলাদি জানতেন কতটা সতর্ক থাকা দরকার। সে সব বিষয়ে লক্ষ রেখেও কোন কমরেড কী খেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য সেই পদ তৈরি করতেন।’’
এক বার ধুম জ্বর নিয়ে নিমাইবাবু ছিলেন মজুমদার বাড়িতে। ‘ঘুমের মধ্যেই আমার মুখ দিয়ে কোনও গোঙানির শব্দ লীলাদির কানে গিয়েছিল। হঠাৎ মনে হল কে যেন আমার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। ঘোরের ভিতর ভাবলাম মা বোধহয়।...আমার তখন তন্দ্রা ভেঙে গেছে। চোখ খুলে দেখি লীলাদি আর চারুদা (চারুর শরীরও সে সময় বেশ খারাপ)। আমি উঠে বসতে যাচ্ছিলাম। লীলাদি বললেন, উঠো না, আমি ওষুধ দিচ্ছি। সেদিন প্রায় অনেক রাত পর্যন্ত লীলাদি আমার মাথার গোড়ায় বসেছিলেন। সেদিনের সেই স্মৃতি আজও আমার মনকে নাড়া দেয়।... চারুদা এক বুক স্বপ্ন নিয়ে, ওই অসুস্থ অবস্থাতে, কোন মানসিক দৃঢ়তার সঙ্গে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে, সারা ভারতবর্ষকে নতুন পথের দিশা দেখাবার প্রয়াসে সচেষ্ট হয়েছিলেন! লীলাদির মতো সাথী পাশে থাকলেই তা সম্ভব।’
স্নেহময়ী লীলা প্রয়োজনে কড়া হতেও জানতেন। ছত্রিশ রকম কাজের মধ্যে একটি বড় দায়িত্ব ছিল শিলিগুড়ির শিশু বিদ্যাপীঠের সম্পাদকের দায়ভার পালন। সেখানে শিক্ষিকাদের আচরণে প্রয়োজনে কঠোর হয়েছেন, বলেছেন: ‘‘এমন ভাবে কাজ করবি না যাতে তোদের নামে আমাকে নালিশ শুনতে হয়!’’
এমনই দাপট বাড়িতেও। ‘‘কোনও খাতা কিনতে হলে মাকে শুক্রবার বলতে হত, তবে মা সোমবারের মধ্যে সেটা কেনার ব্যবস্থা করতেন।
এর অন্যথা হলে বকাবকি শুনতে হত। তখন সংসারে খুবই অনটন,’’ অনিতা জানিয়েছেন। যেই কানে এল তাঁর ননদের (চারুর একমাত্র বোন বেলা) ছেলের নানা স্খলনের খবর, লীলা তাকে জোর করে নিয়ে এলেন মহানন্দা পাড়ার বাড়িতে। জুড়ে দিলেন ইনশিয়োরেন্স কোম্পানির নানা কাজে। সে ছেলে সোজা পথে এল। এমনই সহৃদয় আন্তরিকতায় যুক্ত ছিলেন প্রতিবেশীদের সঙ্গেও। চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর নিজস্ব একান্ত শোক গোপন করে, শোকবিহ্বল সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যত দিন না তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অবলম্বন দিয়েছেন তাদের।
চারু মজুমদারের রাজনীতি নিয়ে কোনও বাক্য উচ্চারণ করেননি কোনও দিন পরবর্তী সময়ে। এমনকী ঘরোয়া হালকা আলোচনাতেও নয়। সব কিছুই কি তাঁর পছন্দ ছিল? তাও জানার উপায় নেই। তবে তিনটি ঘটনা মনে রাখবার। হরেকৃষ্ণ কোঙার যখন জনসভায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের নিন্দেমন্দ করছেন, কিশোরী অনিতাকে নিয়ে সভা ত্যাগ করেন লীলা। সত্তরে যখনই সশস্ত্র পুলিশ বাড়িতে তল্লাশিতে এসেছে, সমস্ত অস্ত্র সদর দরজায় মাটিতে রাখলে, তবেই ঘরে ঢুকতে দিয়েছেন তাদের। আবার গুনে গুনে প্রতিটি অস্ত্র ফেরত নেওয়ার পর তবে তাদের রেহাই। ঘরের মধ্যে অকস্মাৎ ‘অস্ত্র আবিষ্কার’ বন্ধ করতে এ তাঁর চমৎকার প্রতিরোধ।
আবার ১৯৭১-এ যখন তাঁর বাবার কমরেড সৌরেন বসু অনিতাকে বলছেন, পরীক্ষা বয়কট করো, লীলা মেয়েকে বলছেন, পরীক্ষা দাও। তাঁর মতামত স্পষ্ট, চিন্তা স্বাধীন। এরই পাশাপাশি তাঁর লেটারপ্যাডে নিজের নামের তলায় লেখা: কেয়ার অব লেট চারু মজুমদার! অথচ, কেউ তাঁকে বৌদি বলে ডাকেনি। হয় ‘লীলা’, নয় ‘লীলাদি’!
পঙ্কজদির জীবনকাহিনি জানার ইচ্ছে হত মাঝে মাঝে। এখন লীলা মজুমদারের কথা জানার পর, তা পূর্ণ হয়েছে। নিশ্চয়ই এমনই কিছু হবে তা। কলকাতার রাস্তায় ২৭ এপ্রিল ১৯৪৯ শহিদ হওয়া লতিকা, প্রতিভা, অমিয়া, গীতা কিংবা ‘স্তালিন-নন্দিনী’ ইলা মিত্র এবং লীলা— এঁরা সবাই একই গোত্রের। এমনকী এই ক’দিন আগে পদ্মশ্রী পেলেন যিনি, সেই সুবাসিনী মিস্ত্রি, তিনিও— খাতায়-কলমে কমিউনিস্ট হোন চাই নাই হোন— এই রকমই এক মানবী।
ঘরে ঘরে অন্দরে এঁরা আছেন। খুঁজে দেখতে হবে শুধু। অন্দরের দিকে ফিরে তাকিয়ে, এই সব শক্তিরূপিণীদের খুঁজে বার করলে দেখা যাবে, এক ফুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে নারী নির্যাতন আর অবমাননার সব মুখ কালো করা খবর।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/lila-mazumdar-was-not-only-the-wife-of-charu-majumder-but-also-the-main-motivator-1.811213?ref=archive-new-stry

ঠিক যেন যৌথ পরিবারের বড়দা (On Uttam Kumar)

ঠিক যেন যৌথ পরিবারের বড়দা

Uttam-Bhanu
 
Uttam Kumar, Bhanu Bandopadhyay and Soumitra Chatterjee

মেজাজ: আড্ডাতেও যেন বড়দা। পাশে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমিত্র

যদুবংশ’ ছবির শুটিং চলছে। সাতের দশকের গোড়ার দিক। পার্থপ্রতিম চৌধুরী, পরিচালক, হেঁকে উঠেছেন, ‘‘অল লাইটস’’। পজিশন নিতে গিয়ে উত্তমকুমার খেয়াল করলেন, টপ থেকে কোনও একটা লাইট ঠিকমত তাঁর শরীরে এসে পড়েনি। তখন উপরে কাঠের পাটাতনে লাইটম্যানরা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতেন, নির্দেশ মতো সুইচ অফ-অন করতেন। সে দিন তেমনই এক জন, নাম তাঁর কালী, হাঁক শোনার পরও ভুলে গেলেন আলো জ্বালতে। শট অবশ্য হয়ে গেল, তবে হয়ে যাওয়ার পর কালীকে ডেকে পাঠালেন উত্তম। শুনে কালী কাঁপতে কাঁপতে উত্তমের মেক-আপ রুমে এলেন। এমনিতে তাঁর কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই বিড়ি চেয়ে খান উত্তম, কিন্তু কাজের ভুলের তো কোনও ক্ষমা নেই। কিন্তু উত্তম বকুনি না দিয়ে সস্নেহে তাঁকে বললেন, ‘‘কী হয়েছে রে কালী? অন্যমনস্ক ছিলিস মনে হল, এনি প্রবলেম?’’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন কালী, বলেন, ‘‘মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে দাদা, কিন্তু আমি কিছুতেই টাকা জোগাড় করে উঠতে পারছি না। তাই... এমনটা আর হবে না।’’
পরের দিন স্টুডিয়োতে বেরনোর আগে উত্তমের বাড়িতে তাঁরই নির্দেশ মতো কালীকে নিয়ে হাজির পার্থপ্রতিমের সহকারী বিমল দে। তাঁদের দুজনকে নিয়ে স্টুডিয়ো যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠে উত্তম কালীর হাতে হাজার পাঁচেক টাকার একটা খাম ধরিয়ে বললেন, ‘‘এটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখ।’’
এ ভাবে হরদম যাঁদের পাশে দাঁড়াতেন, তাঁরা কেউ আত্মীয় ছিলেন না উত্তমের। অথচ উত্তম প্রায়ই তাঁদের অভিভাবক হয়ে উঠতেন, প্রায় একান্নবর্তী পরিবারের স্নেহপরায়ণ দাদার মতো। কত মেয়ের যে বিয়ে দিয়েছেন, আজ আর সে কথা কে-ই বা মনে রাখে। মণি শ্রীমানির মতো অভিনেতার যাতে অসম্মান না হয়, সে জন্য তাঁর মেয়ের বিয়ের টাকা নিজে না দিয়ে ফাংশন করে তুলে দিয়েছিলেন উত্তম। রাসবিহারী সরকার বিনা ভাড়ায় ‘বিশ্বরূপা’ হলটি দিয়েছিলেন, গোটা অনুষ্ঠানটা আয়োজন করেছিলেন ভাই তরুণকুমার আর সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল আকর্ষণই ছিল উত্তমের গানের সঙ্গে অসিতবরনের তবলা। হইহই করে টিকিট বিক্রি হল আর মণি শ্রীমানির মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেল।
বিপদে-আপদে সব সময় অন্যের পাশে দাঁড়াতেন, বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিতেন। কোনও শিল্পী অপমানিত হলে, কলাকুশলীদের কোনও অসুবিধে হলে, বিশেষত নীচের দিকে যাঁরা, তাঁদের হয়ে প্রতিবাদ করতেন।
আবার ভবানীপুরের বাড়িতে ধুমধাম করে লক্ষ্মীপুজোও করতেন সকলের সঙ্গে। সেখানেও তিনি বড়দাদা, প্রায় যেন অভিভাবক গোটা বাড়িটার। মায়ার বাঁধন প্রত্যেকের সঙ্গে। পরদার বাইরে তাঁর এই জীবনটা নিয়ে একটা বই লিখেছেন অশোক বসু, ‘পর্দার বাইরেও মহানায়ক’, তাতে উত্তমের জীবনের এ রকম অজস্র অনুষঙ্গ।
এগুলি ছাপ ফেলত তাঁর অভিনয়েও। অথচ আমরা সে সব খেয়ালও রাখি না। অভিনয় জীবনের শুরুতে ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২), যে ছবি করে উত্তমের প্রসিদ্ধি হল প্রথম, আর একেবারে শেষে ‘দুই পৃথিবী’ (১৯৮০)। এই দু’টি ছবিতেই তিনি পরিবারের বড় ভাই, একান্নবর্তী পরিবারের মাথা। উত্তমের বাবা ছিলেন একা রোজগেরে, সিনেমাহলের প্রজেকশন অপারেটর। ফলে যথেষ্ট স্ট্রাগল দেখেছেন উত্তম, উঠে এসেছেন একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত একটা বড় পরিবার থেকে। নিজের পারিবারিক জীবন আর অভিনয় জীবন যেখানে একাকার, সে সব ছবিতে অভিনেতা হিসেবে অসামান্য তিনি। স্টারডম, লার্জার দ্যান লাইফ বা রোম্যান্টিক ম্যানারিজম-এর খাঁচাটাঁচা সব ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। পরিবার থেকে সমাজ, সর্বত্রই যেন দায়িত্ববান এক অভিভাবক, জাগ্রত বিবেকের মতো। দুই ভাই, থানা থেকে আসছি, চৌরঙ্গী, নিশিপদ্ম, এখানে পিঞ্জর, যদি জানতেম, যদুবংশ, অগ্নীশ্বর, নগর দর্পণে... এ রকম আরও কত ছবি।
আড্ডায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মাঝেমধ্যেই উত্তমকুমারকে নিয়ে স্মৃতিতে ফিরে যান... তখন শিল্পী সংসদ আর অভিনেতৃ সংঘের ঝগড়াঝাঁটি বাক্‌যুদ্ধ চলছে, প্রথমটিতে উত্তম আর পরেরটিতে সৌমিত্র। বসুশ্রী সিনেমায় পয়লা বৈশাখ, সৌমিত্র গিয়ে দেখেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে বসে আছেন উত্তম। ওঁরা দু’জন তখন দুই যুযুধান শিবিরে। বাকিটা সৌমিত্রের মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘‘আমি গিয়ে ভানুদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। আর যেহেতু দুই শিবিরে আমরা বিভক্ত, তাই উত্তমদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম না করে, হাতটা ধরে ‘শুভ নববর্ষ’ বললাম। বলামাত্র উত্তমদার মুখটা লাল হয়ে গেল। রাগে দুঃখে। এবং এই হচ্ছে লোকটার মহত্ত্ব। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বড় ভাই, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পারিস না!’ আমার পরম সৌভাগ্য যে, এই মুহূর্তে আমি যে অন্যায় করেছি, সেই চেতনাটা হল।’’ সে দিন ক্ষমা চেয়ে নিয়ে যখন উত্তমকে প্রণাম করলেন সৌমিত্র, তখন তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করলেন উত্তম।
এই কথাগুলো হয়তো আজ অনেকেরই জানা, তবে মুশকিল হল এটা থেকে আমরা কখনও উত্তমের অভিনয় জীবনের বিচার করতে শিখিনি, যেটা ভারী চমৎকার শিখিয়েছেন সৌমিত্র। বলছেন, ‘‘একটা বিশেষ ধরনের চরিত্রে আমি ওঁর কোনও জুড়ি পাই না। সেটা হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের বড় ভাই। যেটা ওঁর নিজের মধ্যেও ছিল এবং সে রকম একটা পরিবার থেকেই উঠে এসেছিলেন। অসাধারণ অভিনয়, এই জিনিসগুলো বোধহয় ওঁর মতো ভাল আর কেউ করতে পারে না।’’

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/uttam-kumar-was-so-called-a-guardian-in-tollywood-industry-1.646358?ref=rabibashoriyo-new-stry

পাঠকও ধরতে পারেননি নকল কে (On Bimal Mitra)

পাঠকও ধরতে পারেননি নকল কে

লেখক বিমল মিত্রের নামে গল্প-উপন্যাস লিখতেন প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন নকল বিমল মিত্র। আসল আর নকল লেখকের নামযুদ্ধ গড়িয়েছিল আদালতেও।

ঊর্মি নাথ
Bimal Mitra

আসল: বিমল মিত্র

মুর্শিদাবাদের লালগোলার মহারাজা ধীরেন্দ্রনারায়ণের ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছেন সাহিত্যিক বিমল মিত্র। বিয়ে বাড়ির হইচইয়ের  মধ্যে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল একটা চমক। খাবার টেবিলে ধীরেন্দ্রনারায়ণ পুত্রবধূর সঙ্গে বিমল মিত্রের আলাপ করাতে গিয়ে বললেন, ‘এই হলেন আসল বিমল মিত্র। আর এই হলেন নকল বিমল মিত্র!’ বলে পা‌শে বসা এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। নকল বিমল লজ্জায় খাবারের প্লেট ফেলে ছুটে পালালেন।
হওয়ার কথা ছিল এমনটাই। কিন্তু হয়নি। বরং নকল বিমল মিত্রের অট্টহাস্য শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলেন আসল বিমল। ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক বিমল মিত্রের নামেই লিখতেন, বাজারে ছিলেন এমন ২০-২৫ জন। বেশ কিছু প্রকাশক সে সব লেখা প্রকাশও করতেন। রমরম করে বিক্রি হয়েছে সে সব বই। পাঠক ধরতেই পারেননি। কিন্তু আসল বিমল মিত্রের আর্থিক ক্ষতি তো হয়েইছিল, কপালে জুটেছিল সমালোচনাও। চেন্নাইয়ের ভেনাস পিকচার্স স্টুডিয়োর নানু ঘোষ বিমল মিত্রের মুখের উপর বলেছিলেন, তাঁর পাঠানো গল্পটি এক কথায় রাবিশ। শুনে আকাশ থেকে পড়েছিলেন বিমলবাবু। কারণ তিনি কোনও দিনই কোনও পরিচালককে তাঁর গল্প থেকে ছবি করার জন্য সুপারিশ করেননি। ঘোষবাবুর থেকে বিমলবাবু জানলেন, তাঁকে নকল বিমল মিত্র লিখেছিলেন, ‘‘আমি ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক, আমার নতুন বই ‘কড়ির চেয়ে দামী’ সিনেমা করার জন্য পাঠাচ্ছি।’’
নকল লেখকের উৎপাতে বিদেশ থেকেও নিন্দা শুনতে হয়েছে তাঁকে। ফিলাডেলফিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিমল মিত্রের বই পড়ে তাঁর বন্ধু দিলীপ ঘোষ বিমলবাবুকে লিখে জানিয়েছিলেন, তাঁর ‘কড়ির চেয়ে দামী’, ‘বসন্ত মালতী’, ‘মানস সুন্দরী’ বইগুলো অপাঠ্য। ১৯৭১ সালে ‘ফুল ফুটুক’ উপন্যাসটির নিবেদন অংশে জাল বইয়ের জন্য তাঁর বিড়ম্বনার প্রসঙ্গে এই ঘটনার উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘সে সব যে আমার নামে প্রকাশিত জাল বই, দুঃখের সঙ্গে তাঁকে সে কথা জানাতেও ঘৃণা হল।’’
১৯৭০ সালে এক দিন, স্টেট লটারি ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন। ও পারে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের লটারি ডিপার্টমেন্টের অফিসার,  বিমল মিত্রকে অনুরোধ করছেন লটারি বিচারক হওয়ার জন্য। বিমলবাবু লটারির টিকিট বিক্রির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বারংবার অনুরোধে রাজি হতে হল। নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানে পৌঁছে জানতে পারলেন, তাঁকে নিয়ে প্রবল সমস্যায় পড়তে হয়েছিল অফিসারটিকে। অফিসার ফোন গাইড দেখে বিমল মিত্রকে ফোন করতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। বিমল মিত্রের মতো মানুষ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হচ্ছেন, সন্দেহ হয় তাঁর। তখন ফোন করেন আর এক বিমল মিত্রকে। বারংবার আপত্তিতেই বুঝে যান, আসল বিমল মিত্রকে পেয়েছেন।
সত্তরের দশকে কলেজ স্ট্রিটের কয়েকটি ছোট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক গড়েপিঠে তৈরি করেছিলেন নকল বিমল মিত্রদের। নকলদের মধ্যেও আবার সবচেয়ে বেশি দর ছিল রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর। বছর কয়েক আগে, সদ্য প্রয়াত সাহিত্য গবেষক  অদ্রীশ বিশ্বাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথবাবু জানিয়েছিলেন, বিমল মিত্র ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক, সাহিত্যচর্চার গুরু। নিজের বই প্রকাশের ইচ্ছে নিয়ে এক প্রকাশকের কাছে গেলে সেই প্রকাশক তাঁকে একটা টোপ দেন। তিনি শ্রীচক্রবর্তীর বই ছাপবেন, যদি বিমল মিত্রের নামে তিনি একটা উপন্যাস তাঁকে লিখে দেন। ওই প্রকাশকের ক্ষমতা ছিল না বিমল মিত্রের মতো বড় লেখকের বই প্রকাশ করার। আর এ দিকে বিমল মিত্র মানেই আজকের ভাষায় বেস্টসেলার। টোপ গেলেননি রবীন্দ্রনাথবাবু, তবে মনে মনে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন। দেখি তো পারি কি না বিমল মিত্রের মতো লিখতে! লিখলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রক্ত পলাশ’। প্রকাশককে পড়ালেন। প্রকাশক বুঝলেন, তিনি লোক চিনতে ভুল করেননি। রবীন্দ্রনাথবাবু গোড়ায় পাণ্ডুলিপি দিতে অস্বীকার করলেও প্রকাশকের মগজধোলাইয়ের কাছে তাঁকে হার মানতে হয়। ‘রক্ত পলাশ’ খুব হিট করে বইবাজারে। ১৯৬৮-’৭৩-এর মধ্যে তিনি একাধিক বই লিখেছেন ‘বিমল মিত্র’ হয়ে। লিখতে-লিখতে ভুলেই গিয়েছিলেন, তিনি বিমল মিত্র নন। আজ অবধি তার নিজের নামে কোনও বই প্রকাশ পায়নি। বিমল মিত্রের নামে চিঠি এলে তিনিই উত্তর দিতেন। সর্তক থাকতেন যাতে তাঁর লেখা বইয়ের রিভিউ ছাপা না হয়, তা হলেই আসল বিমলের নজরে এসে যাবে। ১৯৭৩-এ ‘চতুরঙ্গ’ প্রকাশের পর ধরা পড়েছিলেন নকল বিমল। নকল বিমলকে বাঁচাতে প্রকাশক রাতারাতি জাল রেশন কার্ড, কর্পোরেশনের সার্টিফিকেট বের করে ফেলেছিল। একই নামে দু’জন লেখক থাকতেই পারেন। আইনত কিছু করা যায় না। মামলাটি হেরে যান আসল বিমল মিত্র!
১৯৭৮ সালে ‘যা ইতিহাসে নেই’ উপন্যাসে এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিমল মিত্র জানিয়েছিলেন, ‘আমার পাঠক-পাঠিকাবর্গের সতর্কতার জন্য জানাচ্ছি যে, সম্প্রতি দুই শতাধিক উপন্যাস ‘বিমল মিত্র’ নামযুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠক মহলে আমার লোকপ্রিয়তার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব হয়ছে। .... একমাত্র কড়ি দিয়ে কিনলাম ছাড়া আমার লেখা প্রত্যেকটি গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার স্বাক্ষর মুদ্রিত আছে।’ একেই কি বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা?

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/readers-were-unable-to-catch-the-writing-of-real-bimal-mitra-1.649890?ref=rabibashoriyo-new-stry

সত্তরের দশক মুরগির দশক

সত্তরের দশক মুরগির দশক

তখন থেকেই পাড়ায় পাড়ায় চিকেন রোল। হিন্দু বাঙালির হেঁশেলেও ঢুকে পড়ল একদা-নিষিদ্ধ রামপাখি। প্রেশার কুকার, মিক্সি বদলে দিল রন্ধন-সংস্কৃতি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে হাঁড়ির বিরিয়ানি। মধ্যযুগে অবশ্য হরিণ, খরগোশ, গোসাপ, শজারু সবই চলত।

জহর সরকার

 
Biryani
সাবধানে গাড়ি চালান, মনে রাখবেন রাস্তায় কুকুর-বিড়াল মরলে আপনাকেই খেতে হবে।— এ রকম নানান রসিকতা গত কিছু দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। বিপাকে পড়লে বাঙালির বুদ্ধি খোলে, রসের বান ডাকে। বিপাক বইকী— মাংস খাওয়া বাঙালির এমনই অভ্যেস যে ভাগাড় থেকে হরেক রকমের মাংস সরবরাহ হয়ে আসছে জেনে অনেকেরই অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়! ঘড়া ঘড়া গঙ্গাজলেও এই পাপের ক্ষালন হওয়ার নয়। তা ছাড়া গঙ্গাজলে তো কলুষ আরও বাড়বে, কারণ সেই যে মোদীজি এবং উমা ভারতী গঙ্গাকে স্বচ্ছ করবেন বললেন, তার পর থেকে পতিতোদ্ধারিণী আরও দূষিত হয়েছে।
বাঙালির মাংস খাওয়া ইদানীং ভয়ানক ভাবে কমে গিয়েছে। রাস্তার ধারে চিকেন রোল কিনে খেতে গেলে এখন বুকের পাটা লাগে। রান্না করা মাংস দেখলে তো বুক কেঁপে ওঠে, কোন ভাগাড়ের কোন প্রাণী তার উৎস, কে জানে বাবা! মাছ আর ডিমের কদর বেড়েছে, হয়তো দরও। এমনকি প্রায় পাঁচশো বছর আগে শ্রীচৈতন্য যাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করে তেমন সফল হননি, সেই গাছপাঁঠাও নাকি বীরবিক্রমে বাঙালির রসনার দখল নিয়েছে। সত্যি বলতে কী, সমস্ত ভাগাড়-বিশুদের যদি ধরে ফেলা হয় এবং এই ধরনের সমস্যা বন্ধ করার সব ব্যবস্থা করা হয়, তা হলেও অনেক বাঙালিই বোধহয় চট করে অন্তত বাড়ির বাইরে মাংস খাওয়ার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারবেন না।
কিন্তু আমাদের মহান ঐতিহ্যের তা হলে কী হবে? ভারতের জনগণনা সংস্থার রেজিস্ট্রার জেনারেল মাত্র চার বছর আগে এক বিশদ সমীক্ষা করিয়েছিলেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, গোটা দেশে বাঙালি হল সবচেয়ে বেশি আমিষাশী— ৯৮.৫৫ শতাংশ বাঙালি মাছ-মাংস খান, রাজস্থানে যে অনুপাতটি মাত্র ২৫ শতাংশ। তিনটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি আছে: অন্ধ্র, ওড়িশা ও কেরল, সেগুলিতে শতকরা মোটামুটি ৯৭-৯৮ জন আমিষ খান। ভারতের অন্য রাজ্যের লোকে বাঙালি ব্রাহ্মণকে আমিষ খেতে দেখে হেসেছেন, কিন্তু আমাদের পণ্ডিতরা তাঁদের ব্রহ্মবৈবর্ত এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণের কথা খেয়াল করিয়ে দিতে ভোলেননি। বাঙালি ব্রাহ্মণের বুদ্ধি কেন চিরকালই বেশি, কেনই বা তাঁরা ভারতের নবজাগরণের পুরোধা হতে পেরেছিলেন, তার একটা উত্তরও এখানে নিহিত আছে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গদেশে অসংখ্য জলাশয়, আর সেখানে অফুরন্ত মাছ, তাই মাছই এখানকার মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস। আর, মাছ খেলে যে বুদ্ধি বাড়ে, সে কথা তো পি জি উডহাউসের গল্পের মহাবুদ্ধিধর জিভসও জানত।
–– ADVERTISEMENT ––
বস্তুত, বাংলার জমি এবং আবহাওয়া এত ভিজে বলে এখানে কোনও দিনই ডাল খুব বেশি হত না— যে ডাল প্রোটিনের আর একটি ভাল উৎস। যেটুকু ডাল হত, তার অনেকটা দিয়ে আবার বড়ি তৈরি করা হত। অনেকের ধারণা, বাংলায় শ্রীচৈতন্যের আন্দোলনের পরেই বাকি ভারতের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বাড়ে এবং তখন ডাল খাওয়ার প্রচলন হয়, বিশেষত নিরামিষাশী নতুন বৈষ্ণবদের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতেই অন্য রাজ্য থেকে ডাল আমদানি শুরু হয়। কিন্তু আসলে এখানে ডালের বহুলপ্রচলন শুরু হয়েছে অনেক পরে, তত দিনে বেশির ভাগ বাঙালি স্থির করে ফেলেছেন যে, তাঁরাই হবেন ভারতের একমাত্র আমিষাশী বৈষ্ণব। তবে আজ পর্যন্ত বঙ্গভূমিতে অনেকেই ঠিক করে উঠতে পারেননি, ডালটা কখন খাবেন— খাওয়ার শুরুতে না শেষে।
কিন্তু এটা ভাবলে খুব ভুল হবে যে, বাঙালিরা সবাই সর্বদা মাংসাশী ছিল। মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ মানুষ তিনটি বৃত্তির মধ্যে কোনও একটি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন: শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ, পশুচারণ এবং মাছ-ধরা। মধ্যযুগে এই তিন বৃত্তির লোকেরাই, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, চাষের কাজে এলেন— ‘ব্যাধে গোপে জেলে/ তিনই হল হেলে’। তাঁদের নীচে অবশ্যই আরও অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠী ছিল।
মাংসের কথায় ফেরা যাক। বাংলার নানা উপপুরাণে এবং জীমূতবাহনের কালবিবেক, ভবদেব ভট্টের প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ, সর্বানন্দের টীকাসারভাষ্য ইত্যাদিতে আর বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে সে সময়ের মানুষ কী কী মাংস খেতেন তার একটা বেশ ভাল পরিচয় পাই। সেই তালিকায় ছিল হাঁস, ছাগল (পুরুষ ও স্ত্রী), হরিণ, পায়রা, খরগোশ, গোসাপ (কালকেতুর আখ্যান স্মরণীয়), কচ্ছপ এমনকি শজারু। আজ খুব পাঁড় মাংসাশীও গোসাপ বা শজারু খেতে পারবে বলে মনে হয় না। হিন্দুসমাজের উচ্চকোটির মানুষ এই সব রকম মাংস খেতেন কি না তা পরিষ্কার নয়। তবে তিন রকম মাংস তাঁদের খাদ্যতালিকায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। গোমাংস ভক্ষণের ব্যাপারটা সারা দেশেই হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে এক গভীর বিভাজন রেখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যে সব নিম্নবর্গের মানুষ গরু খাওয়া বজায় রাখলেন, তাঁরাও সেটা বিশেষ জাহির করতেন না। এ ছাড়া, শুয়োর এবং মুরগি নিয়েও উচ্চবর্গের হিন্দুদের একটা ছুতমার্গ ছিল— এরা যা-নয়-তাই খেয়ে বেড়ায়, তাই খুব নোংরা বলে প্রতিপন্ন হত। মুসলমানরা অবশ্যই শুয়োর ছুঁতেন না, কিন্তু নিম্নবর্গের হিন্দুরা তার মাংস খেতেন। অন্য দিকে, এই সে দিনও হিন্দুরা মুরগি একটি নিষিদ্ধ মুসলমানি খাদ্য হিসেবেই গণ্য করতেন। এখন অবশ্য চিকেন একেবারে সর্বজনীন। এখানে একটা কথা বলা দরকার। দেড়শো বছর আগে ডিরোজিয়ো তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন, গোমাংস হল ‘মুক্তি’র প্রতীক। তবুও অধিকাংশ হিন্দু বাঙালি আজও গোমাংসকে দেখেন ভয় বা ঘৃণার চোখে, ঠিক যেমন ধর্মভীরু মুসলমান শুয়োর ছুঁতেও রাজি নন।
বাংলায় তুর্কি শাসনের শুরু থেকেই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সতর্ক ছিলেন, যাতে শাসকদের সংস্পর্শে তাঁরা ‘অশুচি’ হয়ে না যান। মুরগি, পিঁয়াজ বা রসুনের মতো মুসলমানি খাদ্য তাঁরা ছুঁতেনও না। অবশ্য একটা সত্য খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাভাষীদের মধ্যে তিন ভাগের দু’ভাগই ধর্মে মুসলমান। তবে এটা একটা ভুল ধারণা যে মুসলমানরা বরাবর গোমাংস খেয়ে এসেছেন। ঘটনা হল, হিন্দু বা মুসলমান, খুব কম বাঙালিরই গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য ছিল। তা ছাড়া একটা গরু কাটলে অনেক মাংস হয়, মোষ হলে তো আরও বেশি। বড় বা মাঝারি শহর ছাড়া মাংসের দোকান বিশেষ ছিল না যে, প্রয়োজন মতো অল্প করে কেনা যাবে। তাই গরু-মোষের মাংস খাওয়া হলেও তা হত বড় কোনও অনুষ্ঠানে। মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে একটা জাল-দেওয়া ছোট আলমারি থাকত, ‘মিট সেফ’ বলা হত— এখন তা উধাও হয়ে গিয়েছে। মিট সেফ ব্যাপারটা বাঙালি ফিরিঙ্গি বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের থেকে নিয়েছিল, তাঁরা ওর মধ্যে রান্না-করা মাংস দু’এক দিন রেখে দিতেন। তবে বাঙালি ঘরে অনেক সময়েই মিট সেফের পায়াগুলি ছোট ছোট জলের পাত্রের মধ্যে বসিয়ে রাখা হত, যাতে তার মধ্যে খাবার রাখলে পোকামাকড় সে খাবারের নাগাল না পায়। সে যা-ই হোক, একটা ব্যাপার বোঝা যায়। মাংসের অর্থনীতি, পচে যাওয়ার সমস্যা এবং যৌথ পরিবারের ভাঙন, সব মিলিয়েই তুলনায় ছোট প্রাণী বা পাখির মাংসের দিকে ঝোঁকটা বেশি পড়েছে। এই সূত্রে হাঁসের মাংস বিষয়ে একটি ছড়া মনে পড়ে: জামাইয়ের নামে মারে হাঁস/ গুষ্টিসুদ্ধ খায় তার মাস।
কিছু বিলেতফেরত বাঙালি সাহেব অন্যদের চেয়ে একশো বছর আগে চিকেন ধরেছিলেন বটে (রবীন্দ্রনাথের বিনি পয়সার ভোজ-এর ‘ধরো হুইস্কি সোডা আর মুর্গি-মটন’ স্মরণীয়), কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে রামপাখির প্রবেশ ১৯৭০-৮০’র দশকে, কিংবা তারও পরে। শুরুটা হয় মামলেট (ওমলেট) দিয়ে— প্রসঙ্গত, হাঁস এবং কচ্ছপের ডিমেরও কদর ছিল। তার পরে ক্রমশ একটা যুক্তির উদয় হল: বাড়িতে কারও শরীরস্বাস্থ্য ভাল করার জন্যে চিকেন খাওয়ানো দরকার। দেখতে দেখতে বাংলা জুড়ে পোলট্রির প্রসার ঘটল, ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন’ ব্রয়লারের ভান্ডার উপচে পড়ল।
বাঙালির খাওয়াদাওয়া নানা ভাবেই বদলে যাচ্ছিল। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে খাদ্যের অভাব, রেশনের দাপট, সব মিলিয়ে আমরা রুটি ধরলাম, বাদাম তেলকে মেনে নিলাম, এমন নানা ব্যাপারে আমাদের হেঁশেলের চরিত্র পালটে গেল। আশির দশকে দেখতে দেখতে সাম্রাজ্য বিস্তার করল ‘চাইনিজ’, রাস্তার ধারে সস্তা চাউমিন হয়ে উঠল সর্বহারার খাবার, অফিসের কর্মী থেকে কলেজের ছাত্রছাত্রী— কম পয়সায় পুষ্টির জনপ্রিয়তা হুহু করে বেড়ে গেল। এখানেও বিশেষ সমাদৃত হল ‘চিলি চিকেন’। বেচারি মুড়ি-তেলেভাজা আর শিঙাড়া-কচুরির আদর কমে গেল সেই অনুপাতেই। এই দশকগুলিতেই, মাইনেপত্র এবং বোনাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ঘরে জোর কদমে ঢুকেছে প্রেশার কুকার, গ্যাস আভেন, ফ্রিজ, পাশাপাশি এসেছে মিক্সি আর গুঁড়ো মশলা। আমাদের রান্না এবং খাওয়াদাওয়ার দুনিয়াটাই দেখতে দেখতে বেবাক পালটে গেল।
বাঙালির খাওয়াদাওয়ার বিবর্তন অবশ্য অনেক দিন ধরেই চলছে। পর্তুগিজরা ষোড়শ শতকে লঙ্কা আর আলু এনেছিল। আঠারো-উনিশ শতকে ব্রিটিশরা নিয়ে এল টম্যাটো, বিট, গাজর, ফুলকপি ইত্যাদি। তবে জমিদার শ্রেণি এবং সম্পন্ন মানুষের মধ্যে মাংস খাওয়ার রমরমা শুরু হল ১৮৫৬ সালের পরে, যখন অযোধ্যার গদিচ্যুত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ কলকাতায় বাসা বাঁধলেন। যত বাবুর্চি আর খানসামা তাঁর পিছু পিছু শহরে এলেন, তাঁদের সবাইকে ভরণপোষণের সামর্থ্য তাঁর ছিল না। অন্য দিকে, একঘেয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে বড়লোক বাঙালির অরুচি ধরে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নানান জায়গা ঘুরে ঘুরে মুঘল খানাপিনা পরিমার্জিত হয়েছে— সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল, দিল্লি, আগরা, লাহৌর, ফৈজাবাদ এবং শেষে লখনউ। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কত দিন আর মন-মাতাল-করা গোলাপজল, ঝাড়বাতির আলোয় হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং ঘুঙুরের আকর্ষণ উপেক্ষা করে থাকবেন? অচিরেই সূক্ষ্ম মসলিন আর আদ্দির পোশাক জমিদারবাবুদের অঙ্গে উঠল, সঙ্গে এল আতর, সুগন্ধি পান, জলসা এবং অবশ্যই বুলবুলি আর ঘুড়ির লড়াই। বাঙালি মেয়েরা এবং সমাজের অন্য বর্গের মানুষ অবশ্য এই নতুন চালে অভ্যস্ত হতে আরও কয়েক দশক বেশি সময় নিল। তবে ক্রমশ আমাদের সাদাসিধে ঝাল-ঝোল-অম্বলে তেল-মশলায় সমৃদ্ধ মোগলাই রান্নার প্রভাব পড়ল এবং বাঙালির পাতে কচি পাঁঠার জায়গা  নিল খাসি-মাটন। বাঙালি তার কষা মাংসের মতো পদগুলিকেও মোগলাই রান্নার ধাঁচে কিছুটা পালটে নিল, দেখতে দেখতে মধ্যবিত্ত বাড়িতে রবিবারের দুপুরে কিংবা বিয়েবাড়ির ভোজে অথবা পিকনিকে মশলা-সমৃদ্ধ মাংসের জয়জয়কার। আহা, বিয়েবাড়ির কথায় মনে পড়ল, রাত্রের খাওয়াদাওয়ার পরে যে মাংস বেঁচে যেত— পরের দিন, বাসি বিয়ের সকালে তার স্বাদ যেন দ্বিগুণ খুলত! আমাদের সেই পুরনো ঠাকুরদের রান্নার হাতই ছিল আলাদা, আজ খুব কম কেটারারই তেমনটা রাঁধতে পারেন।
এ কালের কথায় যদি ফিরে আসি, সত্তরের দশক থেকে পাড়ায় পাড়ায় ফুটপাতের ধারে গজিয়ে উঠল রোল কর্নার, তথাকথিত মোগলাই খাবার মিলতে শুরু করল যত্রতত্র। মুসলমানি খানার জন্যে আর কর্পোরেশন-ধর্মতলা, চিৎপুর বা খিদিরপুর  দৌড়নোর দরকার থাকল না, সেই খাবার আমাদের পাড়ায় পাড়ায় চলে এল। গত দশ-বারো বছরে শুরু হয়েছে শহরের সর্বত্র ফুটপাতে সরাসরি হাঁড়ি থেকে বিরিয়ানি পাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা। চিকেন এবং মাটনের চাহিদা অসম্ভব বেড়েছে, কোথা থেকে এত মাংস আসে তা নিয়ে নানা রকম রসিকতাও চালু হয়েছে অনেক দিন, কিন্তু আমরা কেউ ভয়াবহতম দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি, ভাগাড় থেকে নানা মৃত পশু সরাসরি আমাদের পেটে ঢুকে যাচ্ছে! খাবারে এবং লাইফস্টাইলে বাঙালি হয়তো ক্রমশ খুব দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। এখন আর লড়াইটা ‘যাদের আছে’ এবং ‘যাদের নেই’ তাদের নয়, দ্বন্দ্ব এখন ‘যাদের আছে’ এবং ‘যাদের পেতেই হবে’, এই দুই দলের মধ্যে। এই ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’দের একটা অংশের মূল্যবোধ একেবারে ভাগাড়ে চলে গিয়েছে।
তবে উৎসা রায় তাঁর চমৎকার গবেষণা-সমৃদ্ধ বইয়ে দেখিয়েছেন, আমিষ খাবারের প্রতি বাঙালির এই আকর্ষণ খুব বেশি দিনের নয়, অনেক মধ্যবিত্তের বাড়িতেই বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানে মাত্র একশো বছর আগেও সম্পূর্ণ নিরামিষই খাওয়ানো হত। বাইরে খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হয়তো আবার সেই নিরাপদ খাবারেই ফিরতে হবে। পুরনো একটা কথা মনে পড়ছে: মাংসে মাংস বাড়ে/ ঘৃতে বৃদ্ধি বল/ দুধেতে সকলই বৃদ্ধি/ শাকে বৃদ্ধি মল।
প্রশ্ন হল, এই দুষ্টচক্রের স্বরূপ পুরোপুরি উন্মোচন করে আসল অপরাধীদের ধরা হচ্ছে না কেন। পুরসভা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একাংশের মদত ছাড়া কি এত বড় অপরাধের চক্র এ ভাবে চলতে পারে? কিন্তু তারা কারা? এ তো কেবল অপরাধ নয়, এ একেবারে আমাদের রসনার সংস্কৃতির তলপেটে লাথি মারা!

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/a-return-to-70s-food-when-bongs-just-started-eating-chicken-1.809579?ref=rabibashoriyo-new-stry

বহিরাগত

বহিরাগত

একদা এঁরা বাংলায় আসেন, রাজাদের পৃষ্ঠপোষণায় জমিজিরেত ও হরেক সুবিধা ভোগ করেন। অতঃপর আদিশূর নামে আধা-কল্পিত এক চরিত্রকে ঘিরে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা আরও বাড়িয়ে নেন, সেই অনুযায়ী স্মৃতি, শাস্ত্র ও কুলজিগ্রন্থ রচনা করেন। ক্রমশ বৈদিক, রাঢ়ী, বারেন্দ্র, কুলীন, ভঙ্গ ইত্যাদি হরেক ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। এঁরাই  বাঙালি ব্রাহ্মণ!

কুণাল চক্রবর্তী
ব্রাহ্মণরা বাংলার আদি অধিবাসী নয়। বস্তুত দীর্ঘ দিন বাংলা ব্রাহ্মণদের প্রভাবসীমার বাইরে ছিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকেরা লক্ষ করেছিলেন, ‘আর্য’রা পূর্ব ভারতে কিছুটা দেরিতে পৌঁছেছিল এবং তাদের অগ্রগতি স্থানীয় মানুষ প্রতিরোধ করেছিল। বাংলা অবশ্য শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্য বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু প্রক্রিয়াটি খুব সহজ হয়নি।
ব্রাহ্মণ্যবাদ যে ক্রমশ পূর্ব দিকে বিস্তৃত হচ্ছিল, প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অথর্ব বেদেই মগধ ও অঙ্গের প্রথম নিঃসংশয় উল্লেখ আছে। এই গ্রন্থটির মতে এ দুটি ছিল ব্রাত্যদের দেশ। বঙ্গের প্রথম দ্বিধান্বিত উল্লেখ পাই ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে, যেখানে বৈদিক বৃত্তের বাইরে তার স্থান নির্দেশ করা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে বাংলার প্রাথমিক উল্লেখগুলিতে এই অঞ্চলের প্রতি ব্রাহ্মণদের অবজ্ঞাই প্রকাশ পেয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির আরও স্পষ্ট প্রকাশ দেখি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সেই কাহিনিতে যেখানে বিশ্বামিত্র তাঁর পুত্রদের অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তাদের উত্তরপুরুষরা পৃথিবীর পূর্বতম প্রান্ত উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে এবং তাদের স্থান হবে বর্ণ-শ্রেণিবিভাগের সর্বনিম্ন ধাপে। মহাভারতে বাংলার উপকূলবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের ম্লেচ্ছ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র অনুযায়ী পুন্ড্র ও বঙ্গে পা রাখা অপরাধ বলে গণ্য হত এবং এই বিধিভঙ্গের জন্য প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, সূত্রগুলির রচনাকালে বাংলা ব্রাহ্মণদের কাছে পরিচিত হতে শুরু করেছিল, কিন্তু তা তখনও নিষিদ্ধ দেশ।
তবে বাংলার প্রতি ব্রাহ্মণ্য উপেক্ষা যে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, সে কথা সত্যি। মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকার অধিবাসীরা ক্রমশ পূর্বদেশের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, রঘু, কর্ণ ও ভীমের বিজয় অভিযানের কাহিনিতে তার পরিচয় আছে। রামায়ণ অনুযায়ী মৎস্য, কাশী ও কোশলের রাজপরিবারগুলি অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধে বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন শুরু করেছিল। আরও ইঙ্গিতপূর্ণ কাহিনিটি পাওয়া যায় বায়ু ও মৎস্য পুরাণে। ঋষি দীর্ঘতমস অসুররাজ বলির স্ত্রীর গর্ভে পাঁচটি পুত্র উৎপাদন করেন, তাদের নাম হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুক্ষ্ম। কাহিনি অনুযায়ী যে পাঁচটি জনপদ এই নামে পরিচিত, সেগুলি দীর্ঘতমসের সন্তানদের নাম থেকেই গৃহীত।
দেখা যাচ্ছে, বাংলা ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছিল এবং ব্রাহ্মণ্য বৃত্তের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছিল। ধর্মসূত্রগুলি রচনাকালে আর্যাবর্তের পূর্ব সীমা ছিল প্রয়াগ; মানব ধর্মশাস্ত্র রচনার সময় তা পূর্ব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। মনু পৌন্ড্রদের পতিত ক্ষত্রিয় বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মহাভারতে বঙ্গ ও পৌন্ড্রদের এবং মৎস্য ও বায়ু পুরাণে বঙ্গ, সুক্ষ্ম ও পৌন্ড্রদের ক্ষত্রিয় বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে ব্রাহ্মণ পরিবারের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্রাহ্মণ বলেও স্বীকৃত হচ্ছিল। সুতরাং খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় ব্রাহ্মণদের অগ্রগতি একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
তথ্য-প্রমাণ থেকে নিশ্চিত ভাবে বলা চলে, গুপ্ত যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ব্যাপক ভাবে বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। গুপ্ত যুগের গোড়াতেও কিন্তু এই যোগাযোগ খুব স্পষ্ট ছিল না। গুপ্ত লেখমালায় সমতটের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে। ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে সেখানে সমতটকে ডবাক ও কামরূপের সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত করে প্রত্যন্ত প্রদেশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সমুদ্রগুপ্ত প্রত্যক্ষ ভাবে শাসন করতেন না। বাংলায় যখন গুপ্তদের দৃঢ় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম হল, তখনও এখানে ব্রাহ্মণরা সেই সব সুবিধা ও সম্মান ভোগ করত না যা সমসাময়িক উত্তর ভারতে তাদের প্রাপ্য বলে গণ্য হত। গুপ্তদের রাজত্বকালে বাংলায় ব্রাহ্মণরা শাসন-বিভাগের কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়নি। এমন কোনও পরিচয় নেই যে, গুপ্তরাজারা বাংলায় ব্রাহ্মণ্য উপনিবেশ স্থাপন করতে সচেষ্ট ছিলেন। ভূমিদান সংক্রান্ত লেখগুলিতে ব্রাহ্মণদের কোনও বিশেষ যোগ্যতার উল্লেখ নেই। এমনকী তাদের গোত্র-নাম পর্যন্ত অনুক্ত থেকে গিয়েছে।
গুপ্তোত্তর যুগ থেকে বাংলায় ব্রাহ্মণ্য প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পাল-চন্দ্র-কাম্বোজ রাজাদের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারের প্রক্রিয়াটি আরও গতি পায়। ব্রাহ্মণরা নিয়মিত রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন, শাসনবিভাগের উচ্চপদে নিযুক্ত হতেন, বিশেষ সামাজিক সুবিধা ভোগ করতেন। ব্রাহ্মণরা বাংলায় যে শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ প্রণয়ন শুরু করেন, যেমন বাংলার প্রাচীন পুরাণগুলি, তা এই সময়ই আরম্ভ হয়। এই গ্রন্থগুলিতেই প্রথম বাঙালির সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং ধর্মীয় বিধি সুনির্দিষ্ট রূপ পায়। যারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুগামী ছিল, তারা যে বাংলায় সপ্তম শতাব্দীর মধ্যেই বৌদ্ধদের থেকে সংখ্যায় বেশি হয়ে গিয়েছিল, চৈনিক পরিব্রাজক জুয়ান ঝাং (হিউয়েন সাঙ)-এর সাক্ষ্য থেকে তা জানা যায়।
সেন-বর্মণ যুগে সক্রিয় রাজকীয় পোষকতার প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত রূপ পায়।  স্থানীয় রাজবংশগুলিও প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল। সেন ও বর্মণ রাজবংশ দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় এসেছিলেন। তাঁরা ব্রাহ্মণ্য আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি গভীর দায়বদ্ধ ছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার ও বর্ণাশ্রম বিধির প্রয়োগ তাঁরা কর্তব্য বলে মনে করতেন। তাঁদের নানা কর্মোদ্যোগে এই প্রবণতার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। যেমন, এই সময় থেকে ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজকীয় দানের মাত্রা ও সংখ্যা দুই-ই বেড়ে গিয়েছিল। এই সময়কালেই বাংলায় বহু শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যাতে ব্রাহ্মণ্য বিধিনিষেধের মূল সূত্রগুলি গ্রন্থবদ্ধ হয়। এই সময় থেকে ভূমিদান সংক্রান্ত লেখমালায় ব্রাহ্মণ গ্রহীতাদের গোত্র, প্রবর, বৈদিক শাখা ইত্যাদির উল্লেখ হতে থাকে, যা থেকে বোঝা যায় তারা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। বৈদিক ও পৌরাণিক আচার-অনুষ্ঠান পালনেও জোর দেওয়া হতে থাকে।
সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের যে ব্রাহ্মণ্য আদর্শ তা এই স্মৃতিগ্রন্থগুলিতেই প্রথম সুষ্ঠু ভাবে প্রণালীবদ্ধ হয়। সেন-রাজা বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেনের মহাধর্মাধ্যক্ষ হলায়ুধ, হরিবর্মণের মন্ত্রী ভট্ট ভবদেব, জীমূতবাহন ও অনিরুদ্ধ ভট্ট এই সময়কার স্মৃতিকারদের অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁরা যে সব গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাতে বর্ণ-জাতির ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগ ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বণ্টন সংক্রান্ত আইন, প্রাত্যহিক আচার ও প্রায়শ্চিত্ত, গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ খাদ্য, শুভ ও অশুভ কর্ম এবং সর্বোপরি ব্রাহ্মণদের কর্তব্য ও তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আলোচিত হয়েছে। পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণরা যে হিন্দু বাঙালি জনসাধারণের ধর্মীয়-সামাজিক জীবনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, এই স্মৃতিগ্রন্থগুলিকে তার অন্যতম ভিত্তি বলা চলে।
বস্তুত ভূমিদান সংক্রান্ত লেখগুলি থেকে মনে হয়, পালযুগ থেকেই বাংলার রাজারা বৈদিক ভাবধারা ও আচার-অনুষ্ঠানের পোষকতা করছিলেন। কাম্বোজ-রাজ নয়পালের ইর্দা তাম্রশাসনে তাঁর রাজধানী প্রিয়ঙ্গুর একটি বর্ণনা আছে। সেখানে দেখি, যজ্ঞে আহুতিরূপে নিক্ষিপ্ত পূণাসীর ধোঁয়ার সঙ্গে উপরে উঠে প্রিয়ঙ্গুর আকাশকে মেঘের মতো আচ্ছাদিত করে রাখত। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর লেখ-এ দাবি করা হয়েছে, রাঢ় দেশের সিদ্ধল গ্রামের সৌন্দর্য বেদের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে রাঢ়দেশের সামন্তসেনের সময়কার একটি আশ্রমের বর্ণনা আছে। সেখানে দেখি, ঋষিরা নিয়মিত যে সব যজ্ঞানুষ্ঠান করতেন, তা থেকে নিঃসৃত সুগন্ধ বাতাসকে পরিশুদ্ধ রাখত, হরিণশিশু ঋষিপত্নীদের স্তন্যপান করত, শুকপাখি বেদের স্তোত্র আবৃত্তি করত। এ সব সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলাকে ‘বৈদিক সংস্কৃতির একটি সুরক্ষিত আশ্রয়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও কিন্তু হলায়ুধ, যিনি লক্ষ্মণ সেনের সমসাময়িক এবং তাঁর যুগের প্রধান স্মৃতিকার ছিলেন, তাঁর ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থরচনার সমর্থনে এই যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাঢ় ও বরেন্দ্রর ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করে না, এবং ফলত তারা বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের নিয়মাবলির সঙ্গে পরিচিত নয়। এই মন্তব্যের নিহিতার্থ অন্য রকম ভাবে বুঝতে হবে। জানতে হবে আদিশূরের কাহিনি।
প্রথম যে ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল তারা খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। সমসাময়িক লেখগুলি থেকে জানা যায়, মধ্যদেশ থেকে বাংলায় ব্রাহ্মণদের অভিপ্রয়াণের এই ধারা অব্যাহত ছিল এবং অষ্টম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রাহ্মণরা উত্তর ভারতের নানা প্রদেশ, এমনকী গুজরাতের লাট অঞ্চলের মতো দূর দেশ থেকেও আসত। পাল রাজারা যে এই সব ব্রাহ্মণদের শাসনবিভাগের উচ্চপদে নিযুক্ত করতেন তা থেকে মনে হয়, বহিরাগত ব্রাহ্মণরা সমাজে বেশি মাননীয় বলে গণ্য হত। ব্রাহ্মণ অভিপ্রয়াণের এই অবিচ্ছিন্ন ধারাই প্রমাণ করে, তারা সমাজের বিশেষ প্রয়োজন সাধন করত। না হলে তারা জমির অনুদান এবং এত সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার প্রাপক হতে পারত না। এই সব তথ্যই সেই সামূহিক স্মৃতিভাণ্ডার নির্মাণে সাহায্য করেছিল, যার কল্পরূপ মধ্যযুগের শেষ ভাগে রচিত কুলজি গ্রন্থগুলিতে প্রকাশ পায়।
কুলজিগুলি বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের মহাবংশাবলী, নুলো পঞ্চাননের গোষ্ঠীকথা, বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম, ধনঞ্জয়-এর কুলপ্রদীপ, হরি মিশ্র ও এড়ু মিশ্রের কারিকা, সর্বানন্দ মিশ্রের কুলতত্ত্বার্ণব, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ও কুলার্ণবই সর্বাধিক পরিচিত। বেশির ভাগই আধুনিক যুগের গোড়ার দিকে লেখা, যদিও পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকেই কয়েকটির রচনার সূত্রপাত।
কুলজি গ্রন্থগুলি যে সব কাহিনি বর্ণনা করে, তারা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও নানা অসঙ্গতিতে পূর্ণ। কিন্তু রূপভেদ থাকলেও এদের একটি কেন্দ্রীয় কাহিনি আছে, যা মোটামুটি এক রকম। আদিশূর নামে বাংলার এক রাজা ছিলেন। তিনি কান্যকুব্জের রাজকন্যা চন্দ্রমুখীকে বিবাহ করেছিলেন। চন্দ্রমুখীর চান্দ্রায়ণ ব্রত পালনের ইচ্ছে হল। কিন্তু দেখা গেল, এই ব্রতানুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করতে পারেন এমন ব্রাহ্মণ বাংলায় নেই। আদিশূর তখন তাঁর শ্বশুর মহাশয়কে পাঁচ জন সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠাতে অনুরোধ করেন, যাঁরা এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন। সেই অনুযায়ী শাণ্ডিল্য, কাশ্যপ, বাৎস্য, ভারদ্বাজ এবং সাবর্ণ গোত্রধারী পাঁচ ব্রাহ্মণ গৌড়ে আসেন ও পরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরা স্থানীয় সপ্তশতী ব্রাহ্মণ-কন্যাদের বিবাহ করেন এবং কালক্রমে তাঁদের ঊনষাটটি পুত্রসন্তান জন্মায়। ক্ষিতিশূর এঁদের প্রত্যেককে একটি করে গ্রাম দান করেন যা থেকে বাংলার রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের ৫৯টি গাঞীর উৎপত্তি বলে চিহ্নিত করা হয়। পরে ধরাশূর লক্ষ করেন, এই সব রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের চরিত্রের অবনতি ঘটছে। তাই তিনি তাঁদের আনুষ্ঠানিক শুদ্ধতা অনুযায়ী তিনটি ক্রমনিম্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেন— মুখ্য ও গৌণ কুলীন এবং শ্রোত্রিয়। কুলজি গ্রন্থগুলি দাবি করে, পরে রাজা বল্লাল সেনও একই কারণে বাংলার ব্রাহ্মণদের মধ্যে একই শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠা করেন। কুলজি গ্রন্থগুলিতে ছ’টি আলাদা অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে যে জন্য পাঁচ জন কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণকে আনানো হয়েছিল। যে ভাবে এই ব্রাহ্মণদের নিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই বর্ণনাও পরস্পরের সঙ্গে মেলে না। ঘটনাটি কবে ঘটেছিল, তা নিয়েও মতভেদ আছে— শক ৬৫৪ থেকে ৯৯৯ পর্যন্ত নানা তারিখের উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণদের নামও এক-একটি কাহিনিতে এক-এক রকম। তবে মোটের ওপর মূল কাহিনি নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই।
অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন, আদিশূরের কাহিনির কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। নৃপেন্দ্র কুমার দত্ত দেখিয়েছেন, কোনও বিখ্যাত পাল বা সেন রাজার নামের সঙ্গেই যে কুলজি গ্রন্থ প্রণেতারা পরিচিত ছিলেন, এমন নিদর্শন নেই। অন্য পক্ষে, সমসাময়িক লেখমালায় এবং পুঁথিপত্রে আদিশূর বলে কোনও রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমন কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণও নেই যে এই ব্রাহ্মণদের আসা থেকে বল্লাল সেনের রাজত্বকাল পর্যন্ত অন্তবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাংলার ব্রাহ্মণরা কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ থেকে তাঁদের বংশপরম্পরা দাবি করেছেন। কাজেই নৃপেন্দ্র কুমার এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও নানা টুকরো ঘটনা জোড়াতালি দিয়ে অনেক পরে নির্মিত হয়েছিল। রমেশচন্দ্র মজুমদারও কুলজি গ্রন্থগুলির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তাঁর গবেষণাগ্রন্থে বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, একে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।
সাক্ষ্যপ্রমাণের এই বিশৃঙ্খল এবং স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী চরিত্র সত্ত্বেও এমন ঐতিহাসিকের কিন্তু অভাব নেই যাঁরা আদিশূরকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। নগেন্দ্রনাথ বসু ও লালমোহন বিদ্যানিধি কুলজি কাহিনির ঐতিহাসিকতা সমর্থন করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র জটিল অঙ্ক কষে দাবি করেছেন, কান্যকুব্জের ব্রাহ্মণরা ঠিক ৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন। এ ছাড়াও কিছু ঐতিহাসিক আদিশূরকে নানা ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে চিহ্নিত করার প্রয়াস করেছেন। প্রমোদলাল পাল, যিনি কুলজিগুলিকে অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক বলে বর্ণনা করেছেন, তিনিও বলেছেন, দুধপানি শিলালেখ থেকে মগধের আদিসিংহ নামে যে রাজার কথা জানা যায় তিনি আদিশূর হতে পারেন। নামের খানিকটা মিল আছে এবং বাংলা ও বিহার পাশাপাশি— এ ছাড়া এই প্রস্তাবের আর কোনও ভিত্তি নেই। দীনেশচন্দ্র সরকার স্বীকার করেছেন, বাংলার শূর রাজবংশের বংশতালিকায় আদিশূরের নাম পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, মিথিলার পণ্ডিত বাচস্পতি মিশ্রের ন্যায়কণিকা গ্রন্থে এই আদিশূরের উল্লেখ আছে। তিনি ৮৪২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ন্যায়সূচি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং তিনি আদিশূরের সমসাময়িক ছিলেন। এ থেকে দীনেশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করেন, পূর্ব ভারতের আদিশূর খ্রিস্টীয় নবম শতকের মাঝামাঝি মিথিলা ও তৎসংলগ্ন উত্তরবঙ্গে পালদের সামন্তরাজা হিসেবে রাজত্ব করতেন।
আদিশূরের ঐতিহাসিকতা নিয়ে যে বিতর্ক তা হয়তো এই আলোচনার জন্য খুব প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু কৌলীন্য প্রথা, যার উৎস এই কাহিনির সঙ্গে জড়িত, যা একদা অনেক হিন্দু বাঙালির জীবনে এমন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছিল এবং মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্রাহ্মণের এমন অযৌক্তিক আস্ফালনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, বাংলার ব্রাহ্মণদের নিয়ে আলোচনায় এর উল্লেখ জরুরি। যতই অসঙ্গত ও বেমানান হোক, সামাজিক স্তরবিন্যাসে তাদের অবস্থানের উন্নতি ঘটাতে অ-কুলীন ব্রাহ্মণরা কুলীন পাত্রের সঙ্গে তাদের কন্যার বিবাহ দিত। কুলীন ব্রাহ্মণদের বিবাহের সংখ্যার ওপর কোনও বিধিনিষেধ ছিল না এবং অনেকে বিবাহকেই তাদের জীবিকা করে নিয়েছিল। এই ব্যবস্থার কুৎসিত নিষ্ঠুরতার দিকটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে নির্মোহ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র প্রথম পর্ব ‘বল্লালী বালাই’, দরিদ্র, পরিত্যক্ত কুলীন বিধবা ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুতে শেষ হয়েছে যা, লেখকের ভাষায়, নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে ‘সেকাল’-এর অবসান ঘটিয়েছিল। দীনবন্ধু মিত্রের ঊনবিংশ শতকে রচিত প্রহসন ‘সধবার একাদশী’র নায়ক নিমচাঁদ দত্ত মত্ততার সুযোগে অনেক অপ্রিয় সত্য বলতেন। তিনি যে এক বার একটি কুলীন কায়স্থ সন্তানকে বলেছিলেন, ‘তুমি পাজী, তোমার বাবা পাজী, তোমার বাবার বাবা পাজী, তোমার সাত পুরুষ পাজী, তোমার আদিশূরের সভা পাজী,’ তা বিনা কারণে নয়।
দুর্ভাগ্যবশত কল্পিত আদিশূর বাঙালি হিন্দু সমাজে সত্য হয়েই দেখা দিয়েছিল। তা ছাড়া উচ্চবর্ণের মানুষদের সামাজিক বৈষম্যকে বৈধতা দিতেই যদিও এই কাহিনিটি উদ্ভাবিত হয়েছিল, এটি বাংলার সামাজিক সংগঠনের বিকাশের প্রক্রিয়াটি প্রায় নিখুঁত ভাবে প্রতিফলিত করে। নীহাররঞ্জন রায় বিশ্বাস করেন, কুলজি গ্রন্থগুলির সাক্ষ্য ইতিহাসে প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হওয়ার যোগ্য নয় ঠিকই, তবু পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বাঙালি সমাজে বর্ণ ও জাতির যে জটিল বিন্যাস, যা স্মৃতিগ্রন্থগুলির নির্দেশ দ্বারা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হত, তার একটি সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যে লোক-স্মৃতি গড়ে উঠেছিল, তাই-ই এই কাহিনিটির উদ্ভব ও বিকাশের জন্য দায়ী।
আদিশূরের কাহিনি বাংলার সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন, কেন না এই বঙ্গভূমিতে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই অন্তবর্তী বর্ণ দুটি কখনও ছিল না। প্রথম অভিবাসী ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী বাংলার সমস্ত স্থানীয় অধিবাসীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন— সৎ শূদ্র এবং অসৎ শূদ্র। আদিশূরের কাহিনিতে সেন যুগের যে উল্লেখ আছে, তা সেই অস্পষ্ট কালসীমার মধ্যে পড়ে যেখানে বস্তুগত ইতিহাস ও কল্প-ইতিহাস জড়িয়ে যায় এবং পরস্পরের অবলম্বন হয়ে ওঠে। শেষ-মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক বিন্যাসের যে পুনর্গঠন হয়েছিল তা প্রমাণভিত্তিক ইতিহাস এবং সামূহিক স্মৃতি— এ দুইয়ের মধ্যেই পড়ে। অর্থাৎ কুলজিগুলিতে কল্প-ইতিহাসের মোড়কে এই পুরো ইতিহাসটাই ধরা আছে।
সর্বোপরি, কুলজি গ্রন্থগুলি একটি জরুরি তথ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলার পুরাণগুলি স্বীকার না করলেও, ব্রাহ্মণরা যে সকলেই এক অভিন্ন শ্রেণিভুক্ত ছিলেন না, কুলজিগুলি সেই সাক্ষ্যই বহন করে। ব্রাহ্মণদের মধ্যে রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ— এঁরা আবার কুলীন ও ভঙ্গ— এই দুই ভাগে বিভক্ত, শ্রোত্রিয় ও বৈদিক ব্রাহ্মণ, সপ্তশতী, মধ্যশ্রেণী, গৌড়ীয় ও বঙ্গজ ব্রাহ্মণ, গ্রহ-বিপ্র,বর্ণ ও অগ্রদানী ব্রাহ্মণ— এদের অসংখ্য উপভেদ এবং গোত্র, প্রবর, চরণ, শাখা, মেল, গাঞী ও আরও নানা বিভাগ— যদিও সকলেই ব্রাহ্মণ বন্ধনীভুক্ত। এদের অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস এমনই সুদৃঢ় ও অনমনীয় ছিল যে, উঁচু থাকের কোনও ব্রাহ্মণ অগ্রদানীর মতো নিচু থাকের ব্রাহ্মণের কাছে জল পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না। বিবাহের ব্যাপারেও অনুরূপ বাধানিষেধ ছিল। বাংলার ব্রাহ্মণদের এই বিভিন্নতা পুরাণগুলি গোপন রাখতে চেষ্টা করলেও এ সম্পর্কে যে তারা সম্পূর্ণ অবহিত ছিল, কলিযুগের অধঃপতিত ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে তাদের বদ্ধমূল ভীতিতেই তার প্রমাণ।
মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কয়েকটি তথ্য অনস্বীকার্য ভাবে উঠে আসে। প্রথম, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। দ্বিতীয়, এদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল না। তৃতীয়, এদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্নতা এতই ব্যাপক ও প্রকট ছিল যে এদের ব্রাহ্মণ— এই একটিমাত্র অভিধায় চিহ্নিত করাই কঠিন। তবু ব্রাহ্মণরা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে দীর্ঘ দিন তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তা কী করে সম্ভব হয়েছিল, সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের সময় এসেছে।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/brahmins-are-not-the-original-inhabitants-of-bengal-actually-they-are-outsiders-1.806224?ref=rabibashoriyo-new-stry