Sunday, 10 June 2018

সত্তরের দশক মুরগির দশক

সত্তরের দশক মুরগির দশক

তখন থেকেই পাড়ায় পাড়ায় চিকেন রোল। হিন্দু বাঙালির হেঁশেলেও ঢুকে পড়ল একদা-নিষিদ্ধ রামপাখি। প্রেশার কুকার, মিক্সি বদলে দিল রন্ধন-সংস্কৃতি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে হাঁড়ির বিরিয়ানি। মধ্যযুগে অবশ্য হরিণ, খরগোশ, গোসাপ, শজারু সবই চলত।

জহর সরকার

 
Biryani
সাবধানে গাড়ি চালান, মনে রাখবেন রাস্তায় কুকুর-বিড়াল মরলে আপনাকেই খেতে হবে।— এ রকম নানান রসিকতা গত কিছু দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। বিপাকে পড়লে বাঙালির বুদ্ধি খোলে, রসের বান ডাকে। বিপাক বইকী— মাংস খাওয়া বাঙালির এমনই অভ্যেস যে ভাগাড় থেকে হরেক রকমের মাংস সরবরাহ হয়ে আসছে জেনে অনেকেরই অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়! ঘড়া ঘড়া গঙ্গাজলেও এই পাপের ক্ষালন হওয়ার নয়। তা ছাড়া গঙ্গাজলে তো কলুষ আরও বাড়বে, কারণ সেই যে মোদীজি এবং উমা ভারতী গঙ্গাকে স্বচ্ছ করবেন বললেন, তার পর থেকে পতিতোদ্ধারিণী আরও দূষিত হয়েছে।
বাঙালির মাংস খাওয়া ইদানীং ভয়ানক ভাবে কমে গিয়েছে। রাস্তার ধারে চিকেন রোল কিনে খেতে গেলে এখন বুকের পাটা লাগে। রান্না করা মাংস দেখলে তো বুক কেঁপে ওঠে, কোন ভাগাড়ের কোন প্রাণী তার উৎস, কে জানে বাবা! মাছ আর ডিমের কদর বেড়েছে, হয়তো দরও। এমনকি প্রায় পাঁচশো বছর আগে শ্রীচৈতন্য যাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করে তেমন সফল হননি, সেই গাছপাঁঠাও নাকি বীরবিক্রমে বাঙালির রসনার দখল নিয়েছে। সত্যি বলতে কী, সমস্ত ভাগাড়-বিশুদের যদি ধরে ফেলা হয় এবং এই ধরনের সমস্যা বন্ধ করার সব ব্যবস্থা করা হয়, তা হলেও অনেক বাঙালিই বোধহয় চট করে অন্তত বাড়ির বাইরে মাংস খাওয়ার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারবেন না।
কিন্তু আমাদের মহান ঐতিহ্যের তা হলে কী হবে? ভারতের জনগণনা সংস্থার রেজিস্ট্রার জেনারেল মাত্র চার বছর আগে এক বিশদ সমীক্ষা করিয়েছিলেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, গোটা দেশে বাঙালি হল সবচেয়ে বেশি আমিষাশী— ৯৮.৫৫ শতাংশ বাঙালি মাছ-মাংস খান, রাজস্থানে যে অনুপাতটি মাত্র ২৫ শতাংশ। তিনটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি আছে: অন্ধ্র, ওড়িশা ও কেরল, সেগুলিতে শতকরা মোটামুটি ৯৭-৯৮ জন আমিষ খান। ভারতের অন্য রাজ্যের লোকে বাঙালি ব্রাহ্মণকে আমিষ খেতে দেখে হেসেছেন, কিন্তু আমাদের পণ্ডিতরা তাঁদের ব্রহ্মবৈবর্ত এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণের কথা খেয়াল করিয়ে দিতে ভোলেননি। বাঙালি ব্রাহ্মণের বুদ্ধি কেন চিরকালই বেশি, কেনই বা তাঁরা ভারতের নবজাগরণের পুরোধা হতে পেরেছিলেন, তার একটা উত্তরও এখানে নিহিত আছে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গদেশে অসংখ্য জলাশয়, আর সেখানে অফুরন্ত মাছ, তাই মাছই এখানকার মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস। আর, মাছ খেলে যে বুদ্ধি বাড়ে, সে কথা তো পি জি উডহাউসের গল্পের মহাবুদ্ধিধর জিভসও জানত।
–– ADVERTISEMENT ––
বস্তুত, বাংলার জমি এবং আবহাওয়া এত ভিজে বলে এখানে কোনও দিনই ডাল খুব বেশি হত না— যে ডাল প্রোটিনের আর একটি ভাল উৎস। যেটুকু ডাল হত, তার অনেকটা দিয়ে আবার বড়ি তৈরি করা হত। অনেকের ধারণা, বাংলায় শ্রীচৈতন্যের আন্দোলনের পরেই বাকি ভারতের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বাড়ে এবং তখন ডাল খাওয়ার প্রচলন হয়, বিশেষত নিরামিষাশী নতুন বৈষ্ণবদের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতেই অন্য রাজ্য থেকে ডাল আমদানি শুরু হয়। কিন্তু আসলে এখানে ডালের বহুলপ্রচলন শুরু হয়েছে অনেক পরে, তত দিনে বেশির ভাগ বাঙালি স্থির করে ফেলেছেন যে, তাঁরাই হবেন ভারতের একমাত্র আমিষাশী বৈষ্ণব। তবে আজ পর্যন্ত বঙ্গভূমিতে অনেকেই ঠিক করে উঠতে পারেননি, ডালটা কখন খাবেন— খাওয়ার শুরুতে না শেষে।
কিন্তু এটা ভাবলে খুব ভুল হবে যে, বাঙালিরা সবাই সর্বদা মাংসাশী ছিল। মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ মানুষ তিনটি বৃত্তির মধ্যে কোনও একটি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন: শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ, পশুচারণ এবং মাছ-ধরা। মধ্যযুগে এই তিন বৃত্তির লোকেরাই, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, চাষের কাজে এলেন— ‘ব্যাধে গোপে জেলে/ তিনই হল হেলে’। তাঁদের নীচে অবশ্যই আরও অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠী ছিল।
মাংসের কথায় ফেরা যাক। বাংলার নানা উপপুরাণে এবং জীমূতবাহনের কালবিবেক, ভবদেব ভট্টের প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ, সর্বানন্দের টীকাসারভাষ্য ইত্যাদিতে আর বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে সে সময়ের মানুষ কী কী মাংস খেতেন তার একটা বেশ ভাল পরিচয় পাই। সেই তালিকায় ছিল হাঁস, ছাগল (পুরুষ ও স্ত্রী), হরিণ, পায়রা, খরগোশ, গোসাপ (কালকেতুর আখ্যান স্মরণীয়), কচ্ছপ এমনকি শজারু। আজ খুব পাঁড় মাংসাশীও গোসাপ বা শজারু খেতে পারবে বলে মনে হয় না। হিন্দুসমাজের উচ্চকোটির মানুষ এই সব রকম মাংস খেতেন কি না তা পরিষ্কার নয়। তবে তিন রকম মাংস তাঁদের খাদ্যতালিকায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। গোমাংস ভক্ষণের ব্যাপারটা সারা দেশেই হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে এক গভীর বিভাজন রেখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যে সব নিম্নবর্গের মানুষ গরু খাওয়া বজায় রাখলেন, তাঁরাও সেটা বিশেষ জাহির করতেন না। এ ছাড়া, শুয়োর এবং মুরগি নিয়েও উচ্চবর্গের হিন্দুদের একটা ছুতমার্গ ছিল— এরা যা-নয়-তাই খেয়ে বেড়ায়, তাই খুব নোংরা বলে প্রতিপন্ন হত। মুসলমানরা অবশ্যই শুয়োর ছুঁতেন না, কিন্তু নিম্নবর্গের হিন্দুরা তার মাংস খেতেন। অন্য দিকে, এই সে দিনও হিন্দুরা মুরগি একটি নিষিদ্ধ মুসলমানি খাদ্য হিসেবেই গণ্য করতেন। এখন অবশ্য চিকেন একেবারে সর্বজনীন। এখানে একটা কথা বলা দরকার। দেড়শো বছর আগে ডিরোজিয়ো তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন, গোমাংস হল ‘মুক্তি’র প্রতীক। তবুও অধিকাংশ হিন্দু বাঙালি আজও গোমাংসকে দেখেন ভয় বা ঘৃণার চোখে, ঠিক যেমন ধর্মভীরু মুসলমান শুয়োর ছুঁতেও রাজি নন।
বাংলায় তুর্কি শাসনের শুরু থেকেই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সতর্ক ছিলেন, যাতে শাসকদের সংস্পর্শে তাঁরা ‘অশুচি’ হয়ে না যান। মুরগি, পিঁয়াজ বা রসুনের মতো মুসলমানি খাদ্য তাঁরা ছুঁতেনও না। অবশ্য একটা সত্য খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাভাষীদের মধ্যে তিন ভাগের দু’ভাগই ধর্মে মুসলমান। তবে এটা একটা ভুল ধারণা যে মুসলমানরা বরাবর গোমাংস খেয়ে এসেছেন। ঘটনা হল, হিন্দু বা মুসলমান, খুব কম বাঙালিরই গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য ছিল। তা ছাড়া একটা গরু কাটলে অনেক মাংস হয়, মোষ হলে তো আরও বেশি। বড় বা মাঝারি শহর ছাড়া মাংসের দোকান বিশেষ ছিল না যে, প্রয়োজন মতো অল্প করে কেনা যাবে। তাই গরু-মোষের মাংস খাওয়া হলেও তা হত বড় কোনও অনুষ্ঠানে। মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে একটা জাল-দেওয়া ছোট আলমারি থাকত, ‘মিট সেফ’ বলা হত— এখন তা উধাও হয়ে গিয়েছে। মিট সেফ ব্যাপারটা বাঙালি ফিরিঙ্গি বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের থেকে নিয়েছিল, তাঁরা ওর মধ্যে রান্না-করা মাংস দু’এক দিন রেখে দিতেন। তবে বাঙালি ঘরে অনেক সময়েই মিট সেফের পায়াগুলি ছোট ছোট জলের পাত্রের মধ্যে বসিয়ে রাখা হত, যাতে তার মধ্যে খাবার রাখলে পোকামাকড় সে খাবারের নাগাল না পায়। সে যা-ই হোক, একটা ব্যাপার বোঝা যায়। মাংসের অর্থনীতি, পচে যাওয়ার সমস্যা এবং যৌথ পরিবারের ভাঙন, সব মিলিয়েই তুলনায় ছোট প্রাণী বা পাখির মাংসের দিকে ঝোঁকটা বেশি পড়েছে। এই সূত্রে হাঁসের মাংস বিষয়ে একটি ছড়া মনে পড়ে: জামাইয়ের নামে মারে হাঁস/ গুষ্টিসুদ্ধ খায় তার মাস।
কিছু বিলেতফেরত বাঙালি সাহেব অন্যদের চেয়ে একশো বছর আগে চিকেন ধরেছিলেন বটে (রবীন্দ্রনাথের বিনি পয়সার ভোজ-এর ‘ধরো হুইস্কি সোডা আর মুর্গি-মটন’ স্মরণীয়), কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে রামপাখির প্রবেশ ১৯৭০-৮০’র দশকে, কিংবা তারও পরে। শুরুটা হয় মামলেট (ওমলেট) দিয়ে— প্রসঙ্গত, হাঁস এবং কচ্ছপের ডিমেরও কদর ছিল। তার পরে ক্রমশ একটা যুক্তির উদয় হল: বাড়িতে কারও শরীরস্বাস্থ্য ভাল করার জন্যে চিকেন খাওয়ানো দরকার। দেখতে দেখতে বাংলা জুড়ে পোলট্রির প্রসার ঘটল, ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন’ ব্রয়লারের ভান্ডার উপচে পড়ল।
বাঙালির খাওয়াদাওয়া নানা ভাবেই বদলে যাচ্ছিল। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে খাদ্যের অভাব, রেশনের দাপট, সব মিলিয়ে আমরা রুটি ধরলাম, বাদাম তেলকে মেনে নিলাম, এমন নানা ব্যাপারে আমাদের হেঁশেলের চরিত্র পালটে গেল। আশির দশকে দেখতে দেখতে সাম্রাজ্য বিস্তার করল ‘চাইনিজ’, রাস্তার ধারে সস্তা চাউমিন হয়ে উঠল সর্বহারার খাবার, অফিসের কর্মী থেকে কলেজের ছাত্রছাত্রী— কম পয়সায় পুষ্টির জনপ্রিয়তা হুহু করে বেড়ে গেল। এখানেও বিশেষ সমাদৃত হল ‘চিলি চিকেন’। বেচারি মুড়ি-তেলেভাজা আর শিঙাড়া-কচুরির আদর কমে গেল সেই অনুপাতেই। এই দশকগুলিতেই, মাইনেপত্র এবং বোনাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ঘরে জোর কদমে ঢুকেছে প্রেশার কুকার, গ্যাস আভেন, ফ্রিজ, পাশাপাশি এসেছে মিক্সি আর গুঁড়ো মশলা। আমাদের রান্না এবং খাওয়াদাওয়ার দুনিয়াটাই দেখতে দেখতে বেবাক পালটে গেল।
বাঙালির খাওয়াদাওয়ার বিবর্তন অবশ্য অনেক দিন ধরেই চলছে। পর্তুগিজরা ষোড়শ শতকে লঙ্কা আর আলু এনেছিল। আঠারো-উনিশ শতকে ব্রিটিশরা নিয়ে এল টম্যাটো, বিট, গাজর, ফুলকপি ইত্যাদি। তবে জমিদার শ্রেণি এবং সম্পন্ন মানুষের মধ্যে মাংস খাওয়ার রমরমা শুরু হল ১৮৫৬ সালের পরে, যখন অযোধ্যার গদিচ্যুত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ কলকাতায় বাসা বাঁধলেন। যত বাবুর্চি আর খানসামা তাঁর পিছু পিছু শহরে এলেন, তাঁদের সবাইকে ভরণপোষণের সামর্থ্য তাঁর ছিল না। অন্য দিকে, একঘেয়ে খাবার খেয়ে খেয়ে বড়লোক বাঙালির অরুচি ধরে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নানান জায়গা ঘুরে ঘুরে মুঘল খানাপিনা পরিমার্জিত হয়েছে— সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল, দিল্লি, আগরা, লাহৌর, ফৈজাবাদ এবং শেষে লখনউ। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কত দিন আর মন-মাতাল-করা গোলাপজল, ঝাড়বাতির আলোয় হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং ঘুঙুরের আকর্ষণ উপেক্ষা করে থাকবেন? অচিরেই সূক্ষ্ম মসলিন আর আদ্দির পোশাক জমিদারবাবুদের অঙ্গে উঠল, সঙ্গে এল আতর, সুগন্ধি পান, জলসা এবং অবশ্যই বুলবুলি আর ঘুড়ির লড়াই। বাঙালি মেয়েরা এবং সমাজের অন্য বর্গের মানুষ অবশ্য এই নতুন চালে অভ্যস্ত হতে আরও কয়েক দশক বেশি সময় নিল। তবে ক্রমশ আমাদের সাদাসিধে ঝাল-ঝোল-অম্বলে তেল-মশলায় সমৃদ্ধ মোগলাই রান্নার প্রভাব পড়ল এবং বাঙালির পাতে কচি পাঁঠার জায়গা  নিল খাসি-মাটন। বাঙালি তার কষা মাংসের মতো পদগুলিকেও মোগলাই রান্নার ধাঁচে কিছুটা পালটে নিল, দেখতে দেখতে মধ্যবিত্ত বাড়িতে রবিবারের দুপুরে কিংবা বিয়েবাড়ির ভোজে অথবা পিকনিকে মশলা-সমৃদ্ধ মাংসের জয়জয়কার। আহা, বিয়েবাড়ির কথায় মনে পড়ল, রাত্রের খাওয়াদাওয়ার পরে যে মাংস বেঁচে যেত— পরের দিন, বাসি বিয়ের সকালে তার স্বাদ যেন দ্বিগুণ খুলত! আমাদের সেই পুরনো ঠাকুরদের রান্নার হাতই ছিল আলাদা, আজ খুব কম কেটারারই তেমনটা রাঁধতে পারেন।
এ কালের কথায় যদি ফিরে আসি, সত্তরের দশক থেকে পাড়ায় পাড়ায় ফুটপাতের ধারে গজিয়ে উঠল রোল কর্নার, তথাকথিত মোগলাই খাবার মিলতে শুরু করল যত্রতত্র। মুসলমানি খানার জন্যে আর কর্পোরেশন-ধর্মতলা, চিৎপুর বা খিদিরপুর  দৌড়নোর দরকার থাকল না, সেই খাবার আমাদের পাড়ায় পাড়ায় চলে এল। গত দশ-বারো বছরে শুরু হয়েছে শহরের সর্বত্র ফুটপাতে সরাসরি হাঁড়ি থেকে বিরিয়ানি পাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা। চিকেন এবং মাটনের চাহিদা অসম্ভব বেড়েছে, কোথা থেকে এত মাংস আসে তা নিয়ে নানা রকম রসিকতাও চালু হয়েছে অনেক দিন, কিন্তু আমরা কেউ ভয়াবহতম দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি, ভাগাড় থেকে নানা মৃত পশু সরাসরি আমাদের পেটে ঢুকে যাচ্ছে! খাবারে এবং লাইফস্টাইলে বাঙালি হয়তো ক্রমশ খুব দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। এখন আর লড়াইটা ‘যাদের আছে’ এবং ‘যাদের নেই’ তাদের নয়, দ্বন্দ্ব এখন ‘যাদের আছে’ এবং ‘যাদের পেতেই হবে’, এই দুই দলের মধ্যে। এই ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’দের একটা অংশের মূল্যবোধ একেবারে ভাগাড়ে চলে গিয়েছে।
তবে উৎসা রায় তাঁর চমৎকার গবেষণা-সমৃদ্ধ বইয়ে দেখিয়েছেন, আমিষ খাবারের প্রতি বাঙালির এই আকর্ষণ খুব বেশি দিনের নয়, অনেক মধ্যবিত্তের বাড়িতেই বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানে মাত্র একশো বছর আগেও সম্পূর্ণ নিরামিষই খাওয়ানো হত। বাইরে খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হয়তো আবার সেই নিরাপদ খাবারেই ফিরতে হবে। পুরনো একটা কথা মনে পড়ছে: মাংসে মাংস বাড়ে/ ঘৃতে বৃদ্ধি বল/ দুধেতে সকলই বৃদ্ধি/ শাকে বৃদ্ধি মল।
প্রশ্ন হল, এই দুষ্টচক্রের স্বরূপ পুরোপুরি উন্মোচন করে আসল অপরাধীদের ধরা হচ্ছে না কেন। পুরসভা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একাংশের মদত ছাড়া কি এত বড় অপরাধের চক্র এ ভাবে চলতে পারে? কিন্তু তারা কারা? এ তো কেবল অপরাধ নয়, এ একেবারে আমাদের রসনার সংস্কৃতির তলপেটে লাথি মারা!

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/a-return-to-70s-food-when-bongs-just-started-eating-chicken-1.809579?ref=rabibashoriyo-new-stry

বহিরাগত

বহিরাগত

একদা এঁরা বাংলায় আসেন, রাজাদের পৃষ্ঠপোষণায় জমিজিরেত ও হরেক সুবিধা ভোগ করেন। অতঃপর আদিশূর নামে আধা-কল্পিত এক চরিত্রকে ঘিরে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা আরও বাড়িয়ে নেন, সেই অনুযায়ী স্মৃতি, শাস্ত্র ও কুলজিগ্রন্থ রচনা করেন। ক্রমশ বৈদিক, রাঢ়ী, বারেন্দ্র, কুলীন, ভঙ্গ ইত্যাদি হরেক ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। এঁরাই  বাঙালি ব্রাহ্মণ!

কুণাল চক্রবর্তী
ব্রাহ্মণরা বাংলার আদি অধিবাসী নয়। বস্তুত দীর্ঘ দিন বাংলা ব্রাহ্মণদের প্রভাবসীমার বাইরে ছিল। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকেরা লক্ষ করেছিলেন, ‘আর্য’রা পূর্ব ভারতে কিছুটা দেরিতে পৌঁছেছিল এবং তাদের অগ্রগতি স্থানীয় মানুষ প্রতিরোধ করেছিল। বাংলা অবশ্য শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্য বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু প্রক্রিয়াটি খুব সহজ হয়নি।
ব্রাহ্মণ্যবাদ যে ক্রমশ পূর্ব দিকে বিস্তৃত হচ্ছিল, প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অথর্ব বেদেই মগধ ও অঙ্গের প্রথম নিঃসংশয় উল্লেখ আছে। এই গ্রন্থটির মতে এ দুটি ছিল ব্রাত্যদের দেশ। বঙ্গের প্রথম দ্বিধান্বিত উল্লেখ পাই ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে, যেখানে বৈদিক বৃত্তের বাইরে তার স্থান নির্দেশ করা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে বাংলার প্রাথমিক উল্লেখগুলিতে এই অঞ্চলের প্রতি ব্রাহ্মণদের অবজ্ঞাই প্রকাশ পেয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির আরও স্পষ্ট প্রকাশ দেখি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সেই কাহিনিতে যেখানে বিশ্বামিত্র তাঁর পুত্রদের অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তাদের উত্তরপুরুষরা পৃথিবীর পূর্বতম প্রান্ত উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে এবং তাদের স্থান হবে বর্ণ-শ্রেণিবিভাগের সর্বনিম্ন ধাপে। মহাভারতে বাংলার উপকূলবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীদের ম্লেচ্ছ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র অনুযায়ী পুন্ড্র ও বঙ্গে পা রাখা অপরাধ বলে গণ্য হত এবং এই বিধিভঙ্গের জন্য প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, সূত্রগুলির রচনাকালে বাংলা ব্রাহ্মণদের কাছে পরিচিত হতে শুরু করেছিল, কিন্তু তা তখনও নিষিদ্ধ দেশ।
তবে বাংলার প্রতি ব্রাহ্মণ্য উপেক্ষা যে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, সে কথা সত্যি। মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকার অধিবাসীরা ক্রমশ পূর্বদেশের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, রঘু, কর্ণ ও ভীমের বিজয় অভিযানের কাহিনিতে তার পরিচয় আছে। রামায়ণ অনুযায়ী মৎস্য, কাশী ও কোশলের রাজপরিবারগুলি অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধে বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন শুরু করেছিল। আরও ইঙ্গিতপূর্ণ কাহিনিটি পাওয়া যায় বায়ু ও মৎস্য পুরাণে। ঋষি দীর্ঘতমস অসুররাজ বলির স্ত্রীর গর্ভে পাঁচটি পুত্র উৎপাদন করেন, তাদের নাম হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুক্ষ্ম। কাহিনি অনুযায়ী যে পাঁচটি জনপদ এই নামে পরিচিত, সেগুলি দীর্ঘতমসের সন্তানদের নাম থেকেই গৃহীত।
দেখা যাচ্ছে, বাংলা ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছিল এবং ব্রাহ্মণ্য বৃত্তের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছিল। ধর্মসূত্রগুলি রচনাকালে আর্যাবর্তের পূর্ব সীমা ছিল প্রয়াগ; মানব ধর্মশাস্ত্র রচনার সময় তা পূর্ব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। মনু পৌন্ড্রদের পতিত ক্ষত্রিয় বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মহাভারতে বঙ্গ ও পৌন্ড্রদের এবং মৎস্য ও বায়ু পুরাণে বঙ্গ, সুক্ষ্ম ও পৌন্ড্রদের ক্ষত্রিয় বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে ব্রাহ্মণ পরিবারের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্রাহ্মণ বলেও স্বীকৃত হচ্ছিল। সুতরাং খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় ব্রাহ্মণদের অগ্রগতি একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
তথ্য-প্রমাণ থেকে নিশ্চিত ভাবে বলা চলে, গুপ্ত যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ব্যাপক ভাবে বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। গুপ্ত যুগের গোড়াতেও কিন্তু এই যোগাযোগ খুব স্পষ্ট ছিল না। গুপ্ত লেখমালায় সমতটের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে। ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে সেখানে সমতটকে ডবাক ও কামরূপের সঙ্গে বন্ধনীভুক্ত করে প্রত্যন্ত প্রদেশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সমুদ্রগুপ্ত প্রত্যক্ষ ভাবে শাসন করতেন না। বাংলায় যখন গুপ্তদের দৃঢ় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম হল, তখনও এখানে ব্রাহ্মণরা সেই সব সুবিধা ও সম্মান ভোগ করত না যা সমসাময়িক উত্তর ভারতে তাদের প্রাপ্য বলে গণ্য হত। গুপ্তদের রাজত্বকালে বাংলায় ব্রাহ্মণরা শাসন-বিভাগের কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়নি। এমন কোনও পরিচয় নেই যে, গুপ্তরাজারা বাংলায় ব্রাহ্মণ্য উপনিবেশ স্থাপন করতে সচেষ্ট ছিলেন। ভূমিদান সংক্রান্ত লেখগুলিতে ব্রাহ্মণদের কোনও বিশেষ যোগ্যতার উল্লেখ নেই। এমনকী তাদের গোত্র-নাম পর্যন্ত অনুক্ত থেকে গিয়েছে।
গুপ্তোত্তর যুগ থেকে বাংলায় ব্রাহ্মণ্য প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পাল-চন্দ্র-কাম্বোজ রাজাদের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রসারের প্রক্রিয়াটি আরও গতি পায়। ব্রাহ্মণরা নিয়মিত রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতেন, শাসনবিভাগের উচ্চপদে নিযুক্ত হতেন, বিশেষ সামাজিক সুবিধা ভোগ করতেন। ব্রাহ্মণরা বাংলায় যে শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ প্রণয়ন শুরু করেন, যেমন বাংলার প্রাচীন পুরাণগুলি, তা এই সময়ই আরম্ভ হয়। এই গ্রন্থগুলিতেই প্রথম বাঙালির সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং ধর্মীয় বিধি সুনির্দিষ্ট রূপ পায়। যারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুগামী ছিল, তারা যে বাংলায় সপ্তম শতাব্দীর মধ্যেই বৌদ্ধদের থেকে সংখ্যায় বেশি হয়ে গিয়েছিল, চৈনিক পরিব্রাজক জুয়ান ঝাং (হিউয়েন সাঙ)-এর সাক্ষ্য থেকে তা জানা যায়।
সেন-বর্মণ যুগে সক্রিয় রাজকীয় পোষকতার প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত রূপ পায়।  স্থানীয় রাজবংশগুলিও প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল। সেন ও বর্মণ রাজবংশ দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় এসেছিলেন। তাঁরা ব্রাহ্মণ্য আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি গভীর দায়বদ্ধ ছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার ও বর্ণাশ্রম বিধির প্রয়োগ তাঁরা কর্তব্য বলে মনে করতেন। তাঁদের নানা কর্মোদ্যোগে এই প্রবণতার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। যেমন, এই সময় থেকে ব্রাহ্মণদের প্রতি রাজকীয় দানের মাত্রা ও সংখ্যা দুই-ই বেড়ে গিয়েছিল। এই সময়কালেই বাংলায় বহু শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যাতে ব্রাহ্মণ্য বিধিনিষেধের মূল সূত্রগুলি গ্রন্থবদ্ধ হয়। এই সময় থেকে ভূমিদান সংক্রান্ত লেখমালায় ব্রাহ্মণ গ্রহীতাদের গোত্র, প্রবর, বৈদিক শাখা ইত্যাদির উল্লেখ হতে থাকে, যা থেকে বোঝা যায় তারা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন। বৈদিক ও পৌরাণিক আচার-অনুষ্ঠান পালনেও জোর দেওয়া হতে থাকে।
সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের যে ব্রাহ্মণ্য আদর্শ তা এই স্মৃতিগ্রন্থগুলিতেই প্রথম সুষ্ঠু ভাবে প্রণালীবদ্ধ হয়। সেন-রাজা বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেনের মহাধর্মাধ্যক্ষ হলায়ুধ, হরিবর্মণের মন্ত্রী ভট্ট ভবদেব, জীমূতবাহন ও অনিরুদ্ধ ভট্ট এই সময়কার স্মৃতিকারদের অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁরা যে সব গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাতে বর্ণ-জাতির ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগ ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বণ্টন সংক্রান্ত আইন, প্রাত্যহিক আচার ও প্রায়শ্চিত্ত, গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ খাদ্য, শুভ ও অশুভ কর্ম এবং সর্বোপরি ব্রাহ্মণদের কর্তব্য ও তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আলোচিত হয়েছে। পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণরা যে হিন্দু বাঙালি জনসাধারণের ধর্মীয়-সামাজিক জীবনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, এই স্মৃতিগ্রন্থগুলিকে তার অন্যতম ভিত্তি বলা চলে।
বস্তুত ভূমিদান সংক্রান্ত লেখগুলি থেকে মনে হয়, পালযুগ থেকেই বাংলার রাজারা বৈদিক ভাবধারা ও আচার-অনুষ্ঠানের পোষকতা করছিলেন। কাম্বোজ-রাজ নয়পালের ইর্দা তাম্রশাসনে তাঁর রাজধানী প্রিয়ঙ্গুর একটি বর্ণনা আছে। সেখানে দেখি, যজ্ঞে আহুতিরূপে নিক্ষিপ্ত পূণাসীর ধোঁয়ার সঙ্গে উপরে উঠে প্রিয়ঙ্গুর আকাশকে মেঘের মতো আচ্ছাদিত করে রাখত। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর লেখ-এ দাবি করা হয়েছে, রাঢ় দেশের সিদ্ধল গ্রামের সৌন্দর্য বেদের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী ব্রাহ্মণদের উপস্থিতিতে আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তিতে রাঢ়দেশের সামন্তসেনের সময়কার একটি আশ্রমের বর্ণনা আছে। সেখানে দেখি, ঋষিরা নিয়মিত যে সব যজ্ঞানুষ্ঠান করতেন, তা থেকে নিঃসৃত সুগন্ধ বাতাসকে পরিশুদ্ধ রাখত, হরিণশিশু ঋষিপত্নীদের স্তন্যপান করত, শুকপাখি বেদের স্তোত্র আবৃত্তি করত। এ সব সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বাংলাকে ‘বৈদিক সংস্কৃতির একটি সুরক্ষিত আশ্রয়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও কিন্তু হলায়ুধ, যিনি লক্ষ্মণ সেনের সমসাময়িক এবং তাঁর যুগের প্রধান স্মৃতিকার ছিলেন, তাঁর ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থরচনার সমর্থনে এই যুক্তি দিয়েছিলেন যে রাঢ় ও বরেন্দ্রর ব্রাহ্মণরা বেদ পাঠ করে না, এবং ফলত তারা বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের নিয়মাবলির সঙ্গে পরিচিত নয়। এই মন্তব্যের নিহিতার্থ অন্য রকম ভাবে বুঝতে হবে। জানতে হবে আদিশূরের কাহিনি।
প্রথম যে ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল তারা খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল। সমসাময়িক লেখগুলি থেকে জানা যায়, মধ্যদেশ থেকে বাংলায় ব্রাহ্মণদের অভিপ্রয়াণের এই ধারা অব্যাহত ছিল এবং অষ্টম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্রাহ্মণরা উত্তর ভারতের নানা প্রদেশ, এমনকী গুজরাতের লাট অঞ্চলের মতো দূর দেশ থেকেও আসত। পাল রাজারা যে এই সব ব্রাহ্মণদের শাসনবিভাগের উচ্চপদে নিযুক্ত করতেন তা থেকে মনে হয়, বহিরাগত ব্রাহ্মণরা সমাজে বেশি মাননীয় বলে গণ্য হত। ব্রাহ্মণ অভিপ্রয়াণের এই অবিচ্ছিন্ন ধারাই প্রমাণ করে, তারা সমাজের বিশেষ প্রয়োজন সাধন করত। না হলে তারা জমির অনুদান এবং এত সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার প্রাপক হতে পারত না। এই সব তথ্যই সেই সামূহিক স্মৃতিভাণ্ডার নির্মাণে সাহায্য করেছিল, যার কল্পরূপ মধ্যযুগের শেষ ভাগে রচিত কুলজি গ্রন্থগুলিতে প্রকাশ পায়।
কুলজিগুলি বাংলার ব্রাহ্মণদের বংশবৃত্তান্ত। ধ্রুবানন্দ মিশ্রের মহাবংশাবলী, নুলো পঞ্চাননের গোষ্ঠীকথা, বাচস্পতি মিশ্রের কুলরাম, ধনঞ্জয়-এর কুলপ্রদীপ, হরি মিশ্র ও এড়ু মিশ্রের কারিকা, সর্বানন্দ মিশ্রের কুলতত্ত্বার্ণব, বরেন্দ্র কুলপঞ্জিকা ও কুলার্ণবই সর্বাধিক পরিচিত। বেশির ভাগই আধুনিক যুগের গোড়ার দিকে লেখা, যদিও পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকেই কয়েকটির রচনার সূত্রপাত।
কুলজি গ্রন্থগুলি যে সব কাহিনি বর্ণনা করে, তারা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ও নানা অসঙ্গতিতে পূর্ণ। কিন্তু রূপভেদ থাকলেও এদের একটি কেন্দ্রীয় কাহিনি আছে, যা মোটামুটি এক রকম। আদিশূর নামে বাংলার এক রাজা ছিলেন। তিনি কান্যকুব্জের রাজকন্যা চন্দ্রমুখীকে বিবাহ করেছিলেন। চন্দ্রমুখীর চান্দ্রায়ণ ব্রত পালনের ইচ্ছে হল। কিন্তু দেখা গেল, এই ব্রতানুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করতে পারেন এমন ব্রাহ্মণ বাংলায় নেই। আদিশূর তখন তাঁর শ্বশুর মহাশয়কে পাঁচ জন সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠাতে অনুরোধ করেন, যাঁরা এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন। সেই অনুযায়ী শাণ্ডিল্য, কাশ্যপ, বাৎস্য, ভারদ্বাজ এবং সাবর্ণ গোত্রধারী পাঁচ ব্রাহ্মণ গৌড়ে আসেন ও পরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁরা স্থানীয় সপ্তশতী ব্রাহ্মণ-কন্যাদের বিবাহ করেন এবং কালক্রমে তাঁদের ঊনষাটটি পুত্রসন্তান জন্মায়। ক্ষিতিশূর এঁদের প্রত্যেককে একটি করে গ্রাম দান করেন যা থেকে বাংলার রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের ৫৯টি গাঞীর উৎপত্তি বলে চিহ্নিত করা হয়। পরে ধরাশূর লক্ষ করেন, এই সব রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের চরিত্রের অবনতি ঘটছে। তাই তিনি তাঁদের আনুষ্ঠানিক শুদ্ধতা অনুযায়ী তিনটি ক্রমনিম্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেন— মুখ্য ও গৌণ কুলীন এবং শ্রোত্রিয়। কুলজি গ্রন্থগুলি দাবি করে, পরে রাজা বল্লাল সেনও একই কারণে বাংলার ব্রাহ্মণদের মধ্যে একই শ্রেণিবিন্যাস প্রতিষ্ঠা করেন। কুলজি গ্রন্থগুলিতে ছ’টি আলাদা অনুষ্ঠানের উল্লেখ আছে যে জন্য পাঁচ জন কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণকে আনানো হয়েছিল। যে ভাবে এই ব্রাহ্মণদের নিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই বর্ণনাও পরস্পরের সঙ্গে মেলে না। ঘটনাটি কবে ঘটেছিল, তা নিয়েও মতভেদ আছে— শক ৬৫৪ থেকে ৯৯৯ পর্যন্ত নানা তারিখের উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রাহ্মণদের নামও এক-একটি কাহিনিতে এক-এক রকম। তবে মোটের ওপর মূল কাহিনি নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই।
অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন, আদিশূরের কাহিনির কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। নৃপেন্দ্র কুমার দত্ত দেখিয়েছেন, কোনও বিখ্যাত পাল বা সেন রাজার নামের সঙ্গেই যে কুলজি গ্রন্থ প্রণেতারা পরিচিত ছিলেন, এমন নিদর্শন নেই। অন্য পক্ষে, সমসাময়িক লেখমালায় এবং পুঁথিপত্রে আদিশূর বলে কোনও রাজার উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমন কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণও নেই যে এই ব্রাহ্মণদের আসা থেকে বল্লাল সেনের রাজত্বকাল পর্যন্ত অন্তবর্তী শতাব্দীগুলিতে বাংলার ব্রাহ্মণরা কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ থেকে তাঁদের বংশপরম্পরা দাবি করেছেন। কাজেই নৃপেন্দ্র কুমার এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, আদিশূরের কাহিনি কল্পিত ও নানা টুকরো ঘটনা জোড়াতালি দিয়ে অনেক পরে নির্মিত হয়েছিল। রমেশচন্দ্র মজুমদারও কুলজি গ্রন্থগুলির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তাঁর গবেষণাগ্রন্থে বলেছেন, এই কাহিনির ঐতিহাসিকতা নিয়ে এতটাই সন্দেহের অবকাশ আছে যে, একে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে একেবারেই গ্রহণ করা যায় না।
সাক্ষ্যপ্রমাণের এই বিশৃঙ্খল এবং স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী চরিত্র সত্ত্বেও এমন ঐতিহাসিকের কিন্তু অভাব নেই যাঁরা আদিশূরকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। নগেন্দ্রনাথ বসু ও লালমোহন বিদ্যানিধি কুলজি কাহিনির ঐতিহাসিকতা সমর্থন করেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র জটিল অঙ্ক কষে দাবি করেছেন, কান্যকুব্জের ব্রাহ্মণরা ঠিক ৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এসেছিলেন। এ ছাড়াও কিছু ঐতিহাসিক আদিশূরকে নানা ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে চিহ্নিত করার প্রয়াস করেছেন। প্রমোদলাল পাল, যিনি কুলজিগুলিকে অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক বলে বর্ণনা করেছেন, তিনিও বলেছেন, দুধপানি শিলালেখ থেকে মগধের আদিসিংহ নামে যে রাজার কথা জানা যায় তিনি আদিশূর হতে পারেন। নামের খানিকটা মিল আছে এবং বাংলা ও বিহার পাশাপাশি— এ ছাড়া এই প্রস্তাবের আর কোনও ভিত্তি নেই। দীনেশচন্দ্র সরকার স্বীকার করেছেন, বাংলার শূর রাজবংশের বংশতালিকায় আদিশূরের নাম পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, মিথিলার পণ্ডিত বাচস্পতি মিশ্রের ন্যায়কণিকা গ্রন্থে এই আদিশূরের উল্লেখ আছে। তিনি ৮৪২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ন্যায়সূচি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং তিনি আদিশূরের সমসাময়িক ছিলেন। এ থেকে দীনেশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করেন, পূর্ব ভারতের আদিশূর খ্রিস্টীয় নবম শতকের মাঝামাঝি মিথিলা ও তৎসংলগ্ন উত্তরবঙ্গে পালদের সামন্তরাজা হিসেবে রাজত্ব করতেন।
আদিশূরের ঐতিহাসিকতা নিয়ে যে বিতর্ক তা হয়তো এই আলোচনার জন্য খুব প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু কৌলীন্য প্রথা, যার উৎস এই কাহিনির সঙ্গে জড়িত, যা একদা অনেক হিন্দু বাঙালির জীবনে এমন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছিল এবং মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্রাহ্মণের এমন অযৌক্তিক আস্ফালনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, বাংলার ব্রাহ্মণদের নিয়ে আলোচনায় এর উল্লেখ জরুরি। যতই অসঙ্গত ও বেমানান হোক, সামাজিক স্তরবিন্যাসে তাদের অবস্থানের উন্নতি ঘটাতে অ-কুলীন ব্রাহ্মণরা কুলীন পাত্রের সঙ্গে তাদের কন্যার বিবাহ দিত। কুলীন ব্রাহ্মণদের বিবাহের সংখ্যার ওপর কোনও বিধিনিষেধ ছিল না এবং অনেকে বিবাহকেই তাদের জীবিকা করে নিয়েছিল। এই ব্যবস্থার কুৎসিত নিষ্ঠুরতার দিকটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে নির্মোহ দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’র প্রথম পর্ব ‘বল্লালী বালাই’, দরিদ্র, পরিত্যক্ত কুলীন বিধবা ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুতে শেষ হয়েছে যা, লেখকের ভাষায়, নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে ‘সেকাল’-এর অবসান ঘটিয়েছিল। দীনবন্ধু মিত্রের ঊনবিংশ শতকে রচিত প্রহসন ‘সধবার একাদশী’র নায়ক নিমচাঁদ দত্ত মত্ততার সুযোগে অনেক অপ্রিয় সত্য বলতেন। তিনি যে এক বার একটি কুলীন কায়স্থ সন্তানকে বলেছিলেন, ‘তুমি পাজী, তোমার বাবা পাজী, তোমার বাবার বাবা পাজী, তোমার সাত পুরুষ পাজী, তোমার আদিশূরের সভা পাজী,’ তা বিনা কারণে নয়।
দুর্ভাগ্যবশত কল্পিত আদিশূর বাঙালি হিন্দু সমাজে সত্য হয়েই দেখা দিয়েছিল। তা ছাড়া উচ্চবর্ণের মানুষদের সামাজিক বৈষম্যকে বৈধতা দিতেই যদিও এই কাহিনিটি উদ্ভাবিত হয়েছিল, এটি বাংলার সামাজিক সংগঠনের বিকাশের প্রক্রিয়াটি প্রায় নিখুঁত ভাবে প্রতিফলিত করে। নীহাররঞ্জন রায় বিশ্বাস করেন, কুলজি গ্রন্থগুলির সাক্ষ্য ইতিহাসে প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হওয়ার যোগ্য নয় ঠিকই, তবু পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বাঙালি সমাজে বর্ণ ও জাতির যে জটিল বিন্যাস, যা স্মৃতিগ্রন্থগুলির নির্দেশ দ্বারা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হত, তার একটি সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যে লোক-স্মৃতি গড়ে উঠেছিল, তাই-ই এই কাহিনিটির উদ্ভব ও বিকাশের জন্য দায়ী।
আদিশূরের কাহিনি বাংলার সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন, কেন না এই বঙ্গভূমিতে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই অন্তবর্তী বর্ণ দুটি কখনও ছিল না। প্রথম অভিবাসী ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী বাংলার সমস্ত স্থানীয় অধিবাসীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন— সৎ শূদ্র এবং অসৎ শূদ্র। আদিশূরের কাহিনিতে সেন যুগের যে উল্লেখ আছে, তা সেই অস্পষ্ট কালসীমার মধ্যে পড়ে যেখানে বস্তুগত ইতিহাস ও কল্প-ইতিহাস জড়িয়ে যায় এবং পরস্পরের অবলম্বন হয়ে ওঠে। শেষ-মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক বিন্যাসের যে পুনর্গঠন হয়েছিল তা প্রমাণভিত্তিক ইতিহাস এবং সামূহিক স্মৃতি— এ দুইয়ের মধ্যেই পড়ে। অর্থাৎ কুলজিগুলিতে কল্প-ইতিহাসের মোড়কে এই পুরো ইতিহাসটাই ধরা আছে।
সর্বোপরি, কুলজি গ্রন্থগুলি একটি জরুরি তথ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলার পুরাণগুলি স্বীকার না করলেও, ব্রাহ্মণরা যে সকলেই এক অভিন্ন শ্রেণিভুক্ত ছিলেন না, কুলজিগুলি সেই সাক্ষ্যই বহন করে। ব্রাহ্মণদের মধ্যে রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ— এঁরা আবার কুলীন ও ভঙ্গ— এই দুই ভাগে বিভক্ত, শ্রোত্রিয় ও বৈদিক ব্রাহ্মণ, সপ্তশতী, মধ্যশ্রেণী, গৌড়ীয় ও বঙ্গজ ব্রাহ্মণ, গ্রহ-বিপ্র,বর্ণ ও অগ্রদানী ব্রাহ্মণ— এদের অসংখ্য উপভেদ এবং গোত্র, প্রবর, চরণ, শাখা, মেল, গাঞী ও আরও নানা বিভাগ— যদিও সকলেই ব্রাহ্মণ বন্ধনীভুক্ত। এদের অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস এমনই সুদৃঢ় ও অনমনীয় ছিল যে, উঁচু থাকের কোনও ব্রাহ্মণ অগ্রদানীর মতো নিচু থাকের ব্রাহ্মণের কাছে জল পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না। বিবাহের ব্যাপারেও অনুরূপ বাধানিষেধ ছিল। বাংলার ব্রাহ্মণদের এই বিভিন্নতা পুরাণগুলি গোপন রাখতে চেষ্টা করলেও এ সম্পর্কে যে তারা সম্পূর্ণ অবহিত ছিল, কলিযুগের অধঃপতিত ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে তাদের বদ্ধমূল ভীতিতেই তার প্রমাণ।
মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কয়েকটি তথ্য অনস্বীকার্য ভাবে উঠে আসে। প্রথম, বাংলায় ব্রাহ্মণরা বহিরাগত। দ্বিতীয়, এদের অধিকাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল না। তৃতীয়, এদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্নতা এতই ব্যাপক ও প্রকট ছিল যে এদের ব্রাহ্মণ— এই একটিমাত্র অভিধায় চিহ্নিত করাই কঠিন। তবু ব্রাহ্মণরা বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয়-সামাজিক জীবনে দীর্ঘ দিন তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। তা কী করে সম্ভব হয়েছিল, সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের সময় এসেছে।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/brahmins-are-not-the-original-inhabitants-of-bengal-actually-they-are-outsiders-1.806224?ref=rabibashoriyo-new-stry

Friday, 30 March 2018

দেখিলাম ফিরে (On Ramkinkar Baiz)

দেখিলাম ফিরে

ভাঙাচোরা বাড়ি, বিবর্ণ স্মৃতিফলক। আঁকার কাগজ কিনতেন যেখানে, সেখানে চাউমিনের দোকান। শিল্পবোধহীন বাঙালি জীবনে এই ভাবেই বেঁচে আছেন রামকিঙ্কর বেইজ। বাঁকুড়ায় দেখে এলেন গৌতম চক্রবর্তী

 
Ramkinkar Baij
মফস্সলের দোকান যেমন হয়! সরু রাস্তার এক পাশে সাইনবোর্ড: সুমন ভ্যারাইটি স্টোর্স। নুড্লস, ঝুরিভাজা থেকে কেক, পাউরুটি, সরষের তেল মায় দশকর্মার দ্রব্য... সব মজুত। সবুজ দেওয়াল, সদর দরজায় বিবর্ণ ফলক। কষ্ট করে পড়তে হয়: ‘এই বাসগৃহে নিতান্ত দীন অবস্থার মধ্যে শৈশব কাটিয়ে মাটীর পুতুল তৈরী করে’…মাটি বানানে দীর্ঘ-ই দেখে প্রথমটা খারাপ লাগছিল। তার পর নজরে পড়ল, রামকিঙ্করের মৃত্যুর চার বছর পর ১৯৮৪ সালে বাঁকুড়া লায়ন্স ক্লাবের তরফ থেকে এই ফলকটি বসানো হয়েছিল। তার পর আর সংস্কার হয়নি। টানা সাড়ে তিন দশক সরকার, ইতিহাসবিদ থেকে কলারসিক কারও টনক নড়েনি।
শরিকি বাড়ি, ভিতরে প্লাস্টারহীন ন্যাড়া ইটের দেওয়ালের গায়ে গাছের ডাল, ভিজে জামাকাপড় শুকোনোর দড়ি, ইলেকট্রিকের তার সব কিছু জট পাকিয়ে। এই বাড়িরই একটা ঘরে থাকেন শিবপ্রসাদ বেইজ। রামকিঙ্করের ভাইপো দিবাকর বেইজের ছেলে। অকৃতদার, বেকার। ছোটদের আঁকা শিখিয়ে, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে দিন গুজরান করেন। তাঁকে প্রথমে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘দাদুর কথা মনে আছে?’
শিবপ্রসাদ ঘাড় নাড়লেন, ‘হ্যাঁ। মাধ্যমিক অবধি রতনপল্লিতে যাতায়াত ছিল। দাদু পড়াশোনার জন্য মানি অর্ডারে টাকা পাঠাতেন, তিন-চার মাস অন্তর যেতে হত।’
–– ADVERTISEMENT ––
সেই মানি অর্ডার ফর্মের নীচে ভাইপো দিবাকরকে বালক শিবপ্রসাদের জন্য ভাতের ফ্যান, আলুসিদ্ধ আর ডিম খাওয়ানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিতেন রামকিঙ্কর, ‘তোর ছেলেটা বড় রোগা।’
শিবপ্রসাদকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদু কত টাকা পাঠাতেন?’
‘কত আর! কখনও একশো,  কখনও দুশো। বলতেন, আমি তো রিটায়ার করেছি। টাকাপয়সা নাই।’
শিবপ্রসাদের ঘরের কুলুঙ্গিতে অনুকূল ঠাকুরের ছবি। বললেন, ‘আমরা বংশপরম্পরায় ওঁর দীক্ষিত। আমার মা-বাবাও ওঁর কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন।’
‘দাদু বেঁচে ছিলেন তখন?’
‘না, না, দাদুর মৃত্যুর পরে।’
রামকিঙ্কর বেইজেরও এক ঠাকুর ছিল। বলতেন, ‘আমার ঠাকুর রবি ঠাকুর।’
এই সব জীবন্ত ঠাকুর অনেক পরে। ক্ষৌরকার চণ্ডীচরণ বেইজ আর তাঁর স্ত্রী সম্পূর্ণার বাড়িটা তখন মাটির, খড়ের চালা। পাঁচ বছর বয়সে সেখানে রামকিঙ্করের হাতেখড়ি। মেঝেয় অক্ষর লেখা শেখাচ্ছেন দাদা রামপদ। ‘শেখাচ্ছেন, কিন্তু আমার চোখ দুটো আটকে আছে দেওয়ালে টাঙানো রাধাকৃষ্ণের পটে। কানে হাত পড়তেই চোখ নামাতে হয়। তখন থেকেই ছবি আমার চোখ টেনেছে,’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রামকিঙ্কর। শিল্পীর শুরু জানতে এই ভাঙাচোরা, বিবর্ণ, শরিকি বাড়িতে আসতেই হবে।
বাদনরত রামকিঙ্কর। ছবি সৌজন্য: বাসুদেব চন্দ্র
শিবপ্রসাদের বাবা দিবাকরই প্রথম পাকা ঘর তোলেন। খরচ দিয়েছিলেন রামকিঙ্কর। দুই পক্ষে তখন অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছিল। রামকিঙ্কর এক বার লিখলেন, ‘মাটির ছাদ করে উপরে আলকাতরা দিয়ে দে।’ ভাইপো নারাজ, তাঁর পাকা ঘর চাই। রামকিঙ্করের চিঠি, ‘তোরা দালান করতে চাস! হাঃ… হাঃ… হাঃ।’ পোস্টকার্ডে লেখা দু’-একটা চিঠি এখনও রেখে দিয়েছেন শিবপ্রসাদবাবু।
শেষ অবধি এই বাড়ি তুলতে তিনশো টাকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু রামকিঙ্কর বেইজ ওই রকমই। স্বজনের স্বগৃহের স্বপ্ন অট্টহাস্যে উড়িয়ে দেন। শিবপ্রসাদ আরও একটা কথা জানালেন, ‘দাদুর নির্দেশে প্রথম থেকেই সেপটিক ট্যাঙ্ক।’ হাল আমলের তথাকথিত ‘স্বচ্ছ ভারত’ও অক্লেশে তাঁর কাছে নতজানু হতে পারে।
দিল্লিতে যক্ষ-যক্ষী তৈরি করছেন, শান্তিনিকেতন ভরিয়ে দিচ্ছেন ‘কলের বাঁশি’, সাঁওতাল রমণীর মূর্তিতে, কিন্তু বাঁকুড়ার সঙ্গে ভূমিপুত্রের সংযোগ কখনও ছিন্ন হয়নি। ‘শিল্পী রামকিঙ্কর আলাপচারি’ গ্রন্থের লেখক সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এক সময়ে শান্তিনিকেতনের অ্যান্ড্রুজপল্লিতে ছিলেন রামকিঙ্করের প্রতিবেশী। একদিন তিনি ঢুকতেই রামকিঙ্করের হাঁক, ‘তোমাকে একটা নতুন জিনিস খাওয়াবো। এসো।’ কী খাওয়ালেন? হলদে মুড়ি। ভাজার সময় চালে হলুদ মাখানো হয়। তার মধ্যে কুসুমবীজ, কুমড়োবীজ আর ছোলাভাজার মুখরোচক মিশেল। সোমেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘তুমি মুড়িভাজা দেখেছ? কুঁচা হে, কুঁচা জানো তো?’
বাঁকুড়ার ভাষায় কুঁচা মানে রান্নার কাঠের টুকরো। বাঁকুড়ার অশন, ব্যসন সবই তাঁর হৃদয়ে। মাঝে মাঝে বাড়ি আসতেন। কখনও দু’ দিন, কখনও বা টানা দশ-বারো দিন। এসেই সোজা চলে যেতেন তাঁর বাল্যবন্ধু অতুল কুচলান, বিশ্বনাথ নন্দী, বলাই কর্মকারদের কাছে। গেরুয়া পাঞ্জাবি আর পায়জামা অনেক পরের পোশাক। তার আগে যুবক রামকিঙ্করের  চোখে কালো রোদচশমা, মাথায় তালপাতার টুপি। বন্ধুদের আড্ডা জমত, শান্তিনিকেতন-ফেরত রামকিঙ্কর মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘এসরাজটা নিয়ে এসো।’ জমে যেত গানের আড্ডা। রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন রামকিঙ্কর। কখনও ‘আকুল কেশে আসে কে গো চিরবিরহিনী,’ কখনও বা রক্তকরবীর ‘আঁধার রাতে একলা পাগল।’ যুগীপাড়ার বাসুদেব চন্দ্র এখন বৃদ্ধ। যৌবনকালে এই বন্ধুদের ছবি তুলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত সং‌গ্রহ থেকে জোগাড় করা গেল একটি ছবি।
এটুকুই যা প্রাপ্তি। বাঁকুড়া শহরের পাশে গন্ধেশ্বরী নদী আজ শীর্ণ স্রোতধারা। এই নদীর ধার থেকেই মাটি এনে ছেলেবেলায় মূর্তি গড়তেন তিনি। বাসুদেববাবুর বাড়ির অদূরে চাউমিন, এগ রোলের এক বৈশিষ্ট্যহীন দোকান। একদা এটাই ছিল গোলক দত্তের গোলদারি দোকান। এখান থেকে ছবি আঁকার কাগজ ও রং কিনতেন রামকিঙ্কর।
গিয়েছিলাম দোলতলা। নাটমন্দিরের পাশে বাজার, বিক্রি হচ্ছে ঘুগনি, খাসির মাংসের চটপটি। এখানেই কংগ্রেসের প্রদর্শনী, সভাসমিতি হত। কংগ্রেস নেতা অনিলবরণ রায়ের নেতৃত্বে রামকিঙ্কর আঁকতেন মহাত্মা গাঁধী, সুভাষচন্দ্র ও নেতাদের ছবি।
তাঁর ছবি আঁকা, মূর্তি গড়া সব কিছুর সঙ্গে এই মফস্সল জড়িয়ে। গিয়েছিলাম সন্ন্যাসীতলা হয়ে পচার পাড়ে। এই পুকুরপাড়েই এক সময় থাকতেন শহরের বারাঙ্গনারা। স্কুল-বালক রামকিঙ্কর তাদের ভাদুপুজোর মূর্তি গড়ে দিতেন। উচ্ছেদ এবং উন্নয়নের এই মহাযুগে সেই পচার পাড় থেকে যৌনকর্মীদের মহল্লা তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে পুকুরধারে বিত্তমধ্য তিন, চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি।
তারই মধ্যে হঠাৎ চোখ গেল অন্য দিকে। পুকুরধারে কে যেন বাঁশের ছোট্ট কাঠামোয় মাটি দিয়ে আধখানা মূর্তি গড়ে রেখেছে। এখনও পুজোর আগে ঠেলাগাড়ি করে গন্ধেশ্বরী নদীর পাড় থেকে মাটি নিয়ে আসা হয়। যে মাটিতে এই শহরে ঠাকুর গড়তেন রামকিঙ্কর, তন্ময় হয়ে দেখতেন তাঁর প্রথম গুরু অনন্ত সূত্রধরের হাতের কাজ। কী ভাবে মাটি ছেনে গড়ে তোলা হয় দুর্গা, কালী, কার্তিক, গণেশকে। সেই পুকুরপাড়ে আজও ছেলেপিলেরা কেউ কেউ মূর্তি গড়ে!
বাড়িঘর, পথঘাটের বদল নয়। এই প্রবহমান জীবনেরই অন্য নাম বোধ হয় রামকিঙ্কর।

এলেম নতুন দেশে
তাঁর জীবন মানেই তো বাঁক থেকে বাঁকে চঞ্চল এক নদীর প্রবাহ। রামকিঙ্করদের বাড়ি যে যুগীপাড়ায়, সেই যুগীপাড়ার মুখেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের এক মূর্তি। স্থাপিত: ৩১ মে, ১৯৭২। মানে, এই মূর্তি স্থাপনের সময় রামকিঙ্কর বেঁচে। ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যেই তাঁর প্রথম শান্তিনিকেতন যাত্রা। পিতা চণ্ডীচরণ হাজামত করতে গিয়েছেন রামানন্দবাবুর বাড়ি, কথায় কথায় সম্পাদক ‘চণ্ডী লাপতের ব্যাটা’র ছবি দেখে মুগ্ধ।
প্রস্তাব পেয়েও রামকিঙ্কর তাঁরই পাড়ার রাস্তায়, পৃষ্ঠপোষকের মূর্তি গড়লেন না কেন? শিল্পী এক বার সাফ জানিয়েছিলেন, ‘শুন হে, আমি পোর্ট্রেট বানাই না। আমার শিল্প-ভাস্কর্য চিন্তায় রামানন্দের যে মূর্তি উঠে আসত, সে মূর্তি ওরা বুঝত না হে, বলত কিচ্ছু হয় নাই। তাই রামানন্দের মূর্তি বানাতে মন চায় নাই।’
এই যে ‘সে মূর্তি ওরা বুঝত না হে’ এটা শুধু বাঁকুড়ার নয়, রাজধানী কলকাতারও লজ্জা। সত্তর দশকের ওই সময়টায় শিল্পজ্ঞানহীন, এই বেরসিক বঙ্গসমাজকে হাড়ে হাড়ে চিনে গিয়েছেন রামকিঙ্কর। স্বাধীনতার পর শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজি-মূর্তির জন্য প্লাস্টার অব প্যারিসে তৈরি একটি ছোট মূর্তি পাঠান তিনি। ঘোড়ায় চাপা নেতাজি, ঘোড়া আর তার পিঠের সওয়ার একাকার। ঘোড়া আর নেতাজি দু’জনেই যে তেজের প্রতীক! সরকারি কর্তারা সেই মূর্তি ফেরত দিয়েছিলেন।
একটা টিনের তোরঙ্গে কিছু জামাকাপড়, পেনসিল স্কেচ, ওয়াটার কালার নিয়ে রামানন্দবাবুর সঙ্গে শান্তিনিকেতন চলে গেলেন রামকিঙ্কর। সে আমলে যাতায়াত এত সহজ ছিল না। বাঁকুড়া থেকে প্রথমে বাসে দামোদরের চুণপোড়া ঘাট। সেখান থেকে নৌকোয় নদী পেরিয়ে, হেঁটে দুর্গাপুর স্টেশন। খানা জংশনে গাড়ি বদলে লুপ লাইনে বোলপুর।
১৯২৫ সাল। গ্রন্থভবনের দোতলায় তখন কলাভবনের ক্লাস। নীচে আচার্য নন্দলাল বসুর শিল্পসাধনা। খদ্দর পরে, গ্রাম্য চেহারার বালক এসে দাঁড়াল সেখানে। সহপাঠীরা নাম দিল ‘খদ্দর বন্ধু’। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু তার আঁকা ছবি দেখে প্রথমে বললেন, ‘সব তো শিখেই এসেছ।’ তার পর একটু ভেবে: ‘ঠিক আছে, দু’-তিন বছর থেকে যাও।’
নতুন ছাত্রের গান গাইবার ঝোঁক প্রবল। কিন্তু গলা তেমন খোলতাই নয়। সহপাঠীরা বলল, সাঁওতাল গ্রামের দিকে গিয়ে গলা সাধতে। রামকিঙ্কর মেনে নিলেন। তাঁর বেইজ পদবি নিয়ে বাকিরা ঠাট্টা করে। তাই প্রবাসীতে রঙিন ছবি পাঠান ‘রামপ্রসাদ দাস’ নামে। পরে ক্ষিতিমোহন সেন রামকিঙ্করকে বুঝিয়েছিলেন পদবির ইতিহাস। বৈদ্য থেকে বৈজ হয়ে তবে বেইজ।
বাঁকুড়ার এই ছেলে তখন শান্তিনিকেতনে অনেক বিষয়েই পথপ্রদর্শক। কলাভবনে নন্দলাল বাবুরা অয়েল পেন্টিং শেখাতেন না। রামকিঙ্কর তো বাঁকুড়াতেই তেল রঙে হাত পাকিয়েছেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় নেতাদের পোর্ট্রেট করতেন তেল রঙে। কলকাতার দোকানে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী ভাবে করতে হয়। দোকানি বলেছিল, এই তো টিউব টিপে। সেটাই রামকিঙ্করের অয়েল পেন্টিংয়ের শুরু। নন্দলাল পছন্দ করেননি, বাধাও দেননি। পরে রামকিঙ্কর প্রায়ই নিজেকে বলতেন, ‘ভুঁইফোড়’। পোশাকি, শহুরে ‘স্বশিক্ষিত’ শব্দের চেয়ে মাটির
গন্ধ-লাগা ওই ভুঁইফোড় শব্দটিই তাঁর পছন্দের ছিল।
আর আশ্রমগুরু? রামকিঙ্কর বারংবার বলেছেন, ‘পোর্ট্রেট আঁকতে গেলে মুখটাকে ভাল ভাবে স্টাডি করতে হয়। মুখের অ্যানাটমির নকল নয়, ক্যারেক্টারকে ফুটিয়ে তোলা।’
ক্যারেক্টারকে কী ভাবে ফোটালেন তিনি? দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মারা গিয়েছেন, স্মরণসভার জন্য লেখায় ব্যস্ত রবীন্দ্রনাথ। রামকিঙ্করকে শর্ত দিয়েছেন, কোনও ভাবেই বিরক্ত করা যাবে না তাঁকে। কবি তখন অসুস্থ, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। ‘আমি তাঁকেই ধরার চেষ্টা করেছি হে। সিরিয়াস রবীন্দ্রনাথ। বাজারের মিষ্টি মোলায়েম কবিগুরু নয়। সারা জীবন লোকটা কী করে গেল নিজের হাতে, শিলাইদহে, এখানে শান্তিনিকেতনে…সারা জীবন এমন হাড়ভাঙা খাটুনিই বা ক’জন খেটেছে আমাদের দেশে?’ বলতেন রামকিঙ্কর। হাঙ্গেরির বালাতোন হ্রদের ধারে তাঁর সেই ‘রবীন্দ্রনাথ’ নিয়ে কম ঝড়! শিল্পবোধহীন মন্ত্রীরাও একের পর এক মন্তব্য করে গিয়েছেন তখন। শিল্পী মনে মনে হেসেছেন আর তাঁর সেই বাঁকুড়ার ছেলেবেলার কথা মনে করেছেন: আর্টিস্টের কপাল দেখো। আমাদের বাঁকুড়ায় থিয়েটারের দলের একটা ঘর ছিল। সেখানে একটা ঢোল থাকত। দেখতাম যে যখন পাচ্ছে, এক বার করে পিটিয়ে দিচ্ছে।
ঘটনা, এই মূর্তিটি তৈরির সময়েই রবীন্দ্রনাথের মুখের আসল বৈশিষ্ট্যটি ধরা দেয় তাঁর চোখে। রবীন্দ্রনাথের নাক! ‘ওঁর মুখে নাক একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রোফাইলে সেটা আরও স্পষ্ট ধরা পড়ে। খাঁড়ার মতো।’
তাঁর আগে এই ভাবে কে আর শিখিয়েছেন, মুখের ফোটোগ্রাফ মানেই ভাস্কর্য নয়! ফোটোগ্রাফিক রিয়্যালিটির বাইরে বেরিয়ে শিল্পীকে ধরতে হবে মুখের চরিত্র! আলাউদ্দিন খাঁ শান্তিনিকেতনে এসেছেন, রবীন্দ্রনাথ নন্দলালকে বললেন, ‘আলাউদ্দিনের মাথাটা রেখে দে।’ মানে, মূর্তি গড়ে নে। রামকিঙ্কর গেলেন অতিথিশালায়, খাঁ সাহেব সে দিনই চলে যাবেন। দ্রুত কাজ করছেন, কিন্তু তৃপ্তি হচ্ছে না। তার পরই হঠাৎ মনে হল, গত রাতেই তো শুনেছিলেন খাঁ সাহেবের বাজনা। ‘সুরের ঢেউ উঠছে আকাশে দমকে দমকে, আর সুরের জালে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ, গাছপালা, বাড়িঘর। কানে-শোনা শিল্পীর সেই ঝালা আমার ঘাড়ে চাপল, আর কুড়ি মিনিটেই কাজ শেষ।’
রবীন্দ্রনাথের শেষ অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা… সেটিও তো বাঁকুড়ার ছেলের কাছেই। রামকিঙ্কর তখন রবীন্দ্রনাথের মূর্তি বানাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ ফিসফিস করে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, তুই যেমন গড়িস, আমাকে এক তাল মাটি এনে দিস তো।’ রামকিঙ্কর হয়তো এনেই দিতেন, কিন্তু দরজার আড়াল থেকে বারণ করলেন রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী, ‘বাবামশাইয়ের শরীর খারাপ। মাটি এনো না, আবার জল ঘাঁটাঘাঁটি করলে শরীর খারাপ হবে।’ পরের দিন রামকিঙ্কর যেতেই রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রশ্ন, ‘কী রে, মাটি এনেছিস?’ রামকিঙ্কর জানালেন, তিনি প্লাস্টিসিন নিয়ে এসেছেন। ওতেও মূর্তি গড়া যায়। রবীন্দ্রনাথ কোনও উৎসাহ দেখালেন না, ‘দুর, ওতে হাত চটচট করে।’ পরিণত বয়সেও রামকিঙ্করের এই আক্ষেপ দূর হয়নি… সে দিন যদি কবিকে সত্যিই তিনি এক তাল মাটি এনে দিতেন! চিত্রকলার মতো মূর্তি গড়াতেও হয়তো দুনিয়াকে নতুন ভাষার সন্ধান দিতে পারতেন রবীন্দ্রনাথ। 
একদিন রবীন্দ্রনাথই তাঁকে বলেছিলেন সেই কথা, ‘বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বি কাজে। শেষ করে আর ফিরে তাকাবি না। ছেড়ে দিবি। আবার ঝাঁপ দিবি অন্য কাজে।’
এটাই তো রবীন্দ্রনাথের জীবনমন্ত্র। কবিতায়, গানে, নাটকের এক-একটি ফর্মে চূড়ান্ত সিদ্ধিতে পৌঁছনো, তার পর সেই সিদ্ধি ঠেলে ফেলে ফের নতুনের সন্ধানে যাত্রা।
রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর সেই মন্ত্রশিষ্য। একটার পর একটা মূর্তি গড়েছেন, পছন্দ না হলে ভেঙেছেন। আবার গড়েছেন। প্রথমে বাঁশের ফ্রেমে খড় দিয়ে মোটা করে সিমেন্ট লেপে তৈরি করলেন ‘সাঁওতাল পরিবার’। ভার কাঁধে মাঝি, ভারের এক দিকে মালপত্র, অন্য দিকে ছোট ছেলে। পাশে ঝুড়ি মাথায় মেঝেন।
কিন্তু বাঁশের ফ্রেমে সিমেন্ট টিকবে কেন? ভেঙে পড়ল সে। এ বার করানো হল লোহার আর্মেচার। তখনও শান্তিনিকেতনে বিদ্যুৎ নেই, সন্ধ্যার পর তাঁবু ফেলে মূর্তির সামনে বসে থাকেন শিল্পী। খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই, কখনও ভাঙেন, কখনও বাড়তি কংক্রিট চেঁছে দেন। হাতে লণ্ঠন ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর সহকারী। নিজেই বলেছেন, ‘উপোসটুপোসও মনে থাকে না কাজের মধ্যে ঢুকে পড়লে। ওটাই কেল্লা হে। কেউ ছুঁতে পারবে না তোমাকে এই কেল্লায় একবার সেঁধিয়ে পড়তে যদি পারো। যতই চেল্লাক, কানে যাবে না কিছু। ওখানে শুধু কাজ আছে আর তুমি আছো।’ ফাঁকিবাজ বাঙালি সমাজে এটাই হতে পারত রামকিঙ্করের সেরা উত্তরাধিকার। ধান ঝাড়া থেকে কলের বাঁশি, তাঁর প্রতিটি ভাস্কর্যে তো কাজের ছন্দ। ‘সাঁওতাল, গাঁ গঞ্জের খেটে-খাওয়া মানুষ... এরাই আমাকে টেনেছে সবচেয়ে বেশি,’ বলতেন রামকিঙ্কর।
কেনই বা টানবে না? রামকিঙ্কর সেই সময়ে সোমেন্দ্রনাথকে একবার বলেছিলেন, ‘ভদ্রলোকদের অনেক সময় বুঝতে পারি না। ওখানে সুর খুব কম। অনেকে আলাপ করতে আসে। ঢং ঢাং দেখি। কেউ পণ্ডিত সাজে, কেউ কবি আর্টিস্ট, কেউ ভালমানুষ, কেউ বা দাতাকর্ণ। যাত্রাদলের সঙ সব, মনে মনে হেসে মরি!’
এই সব সঙ-সাজা, খড়ের পুতুলেরা তাঁকে কম জ্বালিয়েছে! কলকাতায় এক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে এসেছেন, সেই প্রদর্শনীর পুস্তিকায় এক লেখক রামকিঙ্করকে সাঁওতাল বলে পরিচয় দিয়েছেন। ‘যাঁরা লেখেন, তাঁরা কি একটু খোঁজখবর নেওয়াও দরকার মনে করেন না?’ এক নিবন্ধে লিখেছিলেন রামকিঙ্কর। ‘পোস্ট ট্রুথ’ কি আর শুধু আজকের বৈশিষ্ট্য? বাঙালি ভদ্রলোকও তো বরাবর রামকিঙ্করকে নিয়ে তৈরি করেছে তার পছন্দসই অলীক সত্য!
 এটাই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, রামকিঙ্কর বেইজের সত্যদর্শন, কর্মদর্শন কিছুই আমরা গ্রহণ করিনি। বরং রামকিঙ্কর কতটা মদ খেতেন, কতটা বোহেমিয়ান ছিলেন— এ নিয়ে বাঙালি যত গপ্পো তৈরি করেছে, তাঁর কাজ নিয়ে সিকিভাগও নয়। শান্তিনিকেতনের প্রখর রোদে খাড়া দাঁড়িয়ে ভাস্কর্য তৈরি করতেন রামকিঙ্কর। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নয়, বিভিন্ন কোণ থেকে কাজটা বারংবার দেখা। ‘স্কাল্পচারে খোদাইয়ের কাজে ছেনির প্রত্যেক ঘাকে মিনিংফুল হতে হয়। মুছে ফেলে আরম্ভ করবে, উটি হবে না হে। মেটিরিয়ালের সঙ্গে লড়াইয়ে দারুণ স্ট্রেন। ভুল করেছো কি কাজটাই নষ্ট,’ বলেছিলেন তিনি। বিশ্বভারতীতে তখন ব্রোঞ্জ-ঢালাইয়ের পয়সাও নেই। রামকিঙ্কর বুদ্ধি বার করলেন। কংক্রিট আর স্টোন চিপসের মেটিরিয়াল।
তাঁর শিল্পসাধনা এই রকমই। যেমন ‘কলের বাঁশি’। বাতাসের বিপরীতে ছুটছে দুই সাঁওতাল যুবতী, উড়ছে আঁচল, পায়ে পায়ে ধুলো। পিছনে একটি ছেলে ছুটতে ছুটতে হাতের বাঁশিটা দিয়ে উড়ন্ত আঁচলটা ধরার চেষ্টা করছে। রামকিঙ্কর বলতেন, ‘ওই যে উড়ন্ত শাড়ির ফোল্ডগুলি, ভার জানো? ওর মধ্যে কতটা লোহা আর কংক্রিট ভাবো দেখি। ছবিতে এই সব ঝামেলা নেই। যখন নাস্তানাবুদ, দিলাম ছেলেটাকে অ্যাড করে। ওটাই সাপোর্ট।’ নিজের জীবন দিয়ে, কাজ দিয়ে চিত্রকলা আর ভাস্কর্যের তফাত বুঝিয়ে দেওয়ার মতো সেই বাঙালি আমাদের মধ্যেই ছিলেন, আমরা তাঁকে শুধুই বেহিসেবি, বাউন্ডুলে জীবনের প্রতীক বানিয়ে উত্তরাধিকারীর তর্পণ সম্পন্ন করছি। রামকিঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাই আমাদের কাছে প্রায় একই... প্রতিভাবান, বাউন্ডুলে, বেহিসেবি এবং মাতাল!
মদ তিনি খেতেন। প্রখর রোদে কাজ করার ক্লান্তি মুছতে। ‘পরিশ্রম থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য একটুআধটু খেতাম। এভাবেই নেশা হয়ে গেল। চূড়ান্ত নেশা করে অজ্ঞান হয়তো কখনও সখনও হয়েছি, কিন্তু সেটাই রুটিন ছিল না। হলে কাজ করতাম কি করে?’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন রামকিঙ্কর। সেই সাক্ষাৎকারে আরও বলেছিলেন, ‘আর্ট বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়... কেউ আমার তুলনায় বেশি পাবলিসিটি পেয়ে যাচ্ছে দেখে চিন্তিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ছবি আঁকা বা মূর্তি গড়ার পর আমার দায়িত্ব শেষ। অহেতুক কোনও পাবলিসিটির চিন্তা না করলেও চলবে।’ ইনস্ট্যান্ট খ্যাতির ইঁদুরদৌড় থেকে বহু দূরে এই মেকি সভ্যতার বিপ্রতীপে বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।
 বলিষ্ঠ, আক্ষরিক অর্থেই। নন্দলাল বসু এক বার বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ‘দেখে এসো, কলাভবনের দেওয়ালে কিঙ্কর আঁকছে। কী ডেক্সটিরিটি! দেখলে বুক কেঁপে যায়।’
এই বলিষ্ঠতা শরীরসর্বস্ব ব্যায়ামবীরের নয়, সভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান-করা এক বাউলমনের। এক বার বিড়ি কিনবেন, দু’টাকার নোট দরকার। সেই সামান্য পয়সাও নেই। সোমেন্দ্রনাথ বিছানার শতরঞ্চি উল্টে দেখতে পেলেন, সেখানে বড় অঙ্কের চেক। তামাদি হয়ে গিয়েছে, তাঁর খেয়াল নেই। খাওয়ার সময় তাঁর পাতেই মুখ দিত বিড়াল, কুকুরেরা। রামকিঙ্কর তেড়ে যেতেন না, উল্টে সস্নেহ বলতেন, ‘খা, খা, তোদেরও তো বাঁচতে হবে।’
শিবপ্রসাদকে লেখা চিঠি। ছবি সৌজন্য: শিবপ্রসাদ বেইজ
পাহাড় কাটা
স্টেলা ক্রামরিশ তাঁকে মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘কিঙ্কর, একটা পাহাড় ধরো।’ রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন অস্ট্রিয়ার এই শিল্পতত্ত্ববিদ।
পাহাড়ও তিনি ধরলেন। দিল্লিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে আজও আছে ২১ ফুটের সেই যক্ষ-যক্ষীর মূর্তি। ১৯৫৪ সালে রামকিঙ্কর কুলু যাওয়ার পথে দেখলেন তাঁর পছন্দসই পাহাড়। ভাকড়ানাঙাল ড্যামের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ব্লাস্ট করিয়ে পাওয়া গেল পাথরের টুকরো। ন্যারোগেজ লাইনের ট্রেনে সেই পাথর আনাও ঝকমারি। বদলানো হল ওয়াগনের চেহারা। পাঠানকোটে এসে ব্রডগেজ ট্রেনে সেই পাথর আনা হল দিল্লিতে।
এত ঝঞ্ঝাট, কাজ আর এগোয় না। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সতর্কবার্তা পাঠাল, ডেটলাইন পেরিয়ে যাচ্ছে। রামকিঙ্কর গেলেন রেগে, ‘দুর, আমাকে ডেটলাইন দেখাচ্ছেন? যান, আমাকে জেলে পাঠিয়ে দিন। ভালই হবে, আমি সেখানে নিশ্চিন্তে অনেক মূর্তি গড়তে পারব।’ ডেটলাইন পেশাদার কর্মীর আয়ুরেখা, শিল্পীর নয়। ডেটলাইনওয়ালারা কি বুঝবে, কত দিন ঘুম ভেঙে মধ্যরাতে তিনি তাকিয়ে থেকেছেন অসমাপ্ত ভাস্কর্যের দিকে, পরদিন সেটাকে ভেঙে ফেলে আবার শুরু করেছেন প্রথম থেকে! ডেটলাইনওয়ালারা কি বুঝবে, তাঁর মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু কী ভাবে তাঁকে আদিগন্ত খোয়াইয়ে নিয়ে গিয়ে প্রথমে চুপচাপ বসে থাকতে বলতেন! আগে ধ্যানস্থ হয়ে পরিপার্শ্ব, প্রকৃতিকে নিজের ভাবনায় নিতে হবে, তার পরই তৈরি হবে শিল্পসম্ভাবনা।
১৯৬৭-তে শেষ হল কাজ। রামকিঙ্কর চিঠিতে রাধারানিকে জানালেন, ‘যক্ষীটা তোমার আদলে। তোমার জন্য অনেকগুলি টাকা পেয়েছি। আমাদের বাড়ি ছেড়ে কখনও যাবে না।’ রাধারানি স্বামী পরিত্যক্তা এক গ্রাম্য মহিলা, কাজ করতেন রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবীর কাছে। রামকিঙ্কর বললেন, ‘খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা হয়, আমাকে লোকটি দিতে পারো?’
সেই শুরু। রাধারানিকে মডেল করে ছবি আঁকেন কিঙ্কর। কখনও দিনে, কখনও বা রাতে। শান্তিনিকেতন আপত্তি তুলেছিল। রামকিঙ্কর স্পষ্টবাক, ‘আমি সেবাদাসী রেখেছি। তোমাদের আপত্তি কেন?’
সেবাদাসী? রাধারানি পরে বলেছিলেন, ‘ওই জড়ামড়িতেই থেকে গেলাম।’ দেশিকোত্তম পেয়েছেন রামকিঙ্কর। ছাত্ররা গিয়ে বললেন, তাঁকে সংবর্ধনা দেবেন। উপাচার্যও থাকবেন সেই অনুষ্ঠানে। রামকিঙ্কর বললেন, মঞ্চে উপাচার্য এবং তাঁর পাশে সম-মর্যাদায় রাধারানিকে আসন দিলে তবেই তিনি যাবেন।
  রাধারানিই একমাত্র নন। কখনও ছাত্রী জয়া আপ্পাস্বামী, কখনও বা মণিপুরী ছাত্রী বিনোদিনীকে নিয়ে তৈরি করেছেন ভাস্কর্য। ‘প্রেম এসেছে জীবনে। সেক্সুয়াল রিলেশনও হয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস, কখনও লেপ্টে থাকিনি,’  বলেছিলেন শিল্পী।  
রামকিঙ্কর ও রাধারানি
একটি চিঠি
সাগরদা... বুঝি লেখাটা কিছু overdue হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি একেবারে নিরুপায়।
১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে সমরেশ বসু এই চিঠি লিখছেন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষকে। তার চার বছর আগে ১৯৮০ সালের অগস্ট মাসে এসএসকেএম হাসপাতালে মারা গিয়েছেন রামকিঙ্কর।
উপন্যাসের মালমশলা জোগাড়ের কাজ শুরু হয়েছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই। সমরেশ তখন বারংবার শান্তিনিকেতন, বাঁকুড়া করেছেন। রামকিঙ্করও এগিয়ে এসেছেন উদার ভাবে। ১৯৭৯ সালের ২৫ এপ্রিল শিল্পীর শেষ বাঁকুড়াযাত্রা। সঙ্গে লেখক। টেপ রেকর্ডারে ধরে রেখেছেন শিল্পীর পরিবার ও তাঁর বন্ধুদের কথা। গাড়িতে উঠতে উঠতে রামকিঙ্কর এক বন্ধুকে বললেন, ‘এই বোধহয় শেষ আসা।’
কে জানত, সে কথা ফলে যাবে এই ভাবে! প্রস্টেটের গোলমাল, মলমূত্র ত্যাগের বোধ অবধি চলে গিয়েছিল। ডাক্তার ঠিক করেছিলেন, শান্ট বসিয়ে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
রামকিঙ্করের বাড়ির সদর দরজা: এখন। ছবি সৌজন্য: অভিজিৎ সিংহ
শান্তিনিকেতন থেকে তাঁকে কলকাতায় এনে অস্ত্রোপচার সফল হয়নি। হাসপাতালে ভাইপো দিবাকরকে দেখে তখন তিনি বলছেন, ‘ও দিবাকর, এসেছিস? ওই দিকে রাধারানির বাড়ি, ওখানে খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি চলে আয়।’ দিগভ্রান্ত তিনি, কলকাতায় খুঁজছেন রাধারানির বাড়ি।
 বহু বছর আগে, শেষ দিকে এ ভাবেই দিগভ্রান্ত থাকতেন রামকিঙ্করের মা সম্পূর্ণা। রাত্তিরে বিছানা থেকে উঠে বেরিয়ে যেতেন, ‘ওই... ওই দিকে যাব।’ রামকিঙ্কর তখন শান্তিনিকেতনে, মা-বাবা কারও মৃত্যুর সময়েই কাছে ছিলেন না তিনি। কিন্তু দিগভ্রান্ত বিকার হাসপাতালের শেষ শয্যায় তাঁর পিছু ছাড়ল না।
সমরেশের উপন্যাসও শেষ হয়নি। তিনি অবশ্যই রামকিঙ্করের জীবনী লিখছিলেন না। তৈরি করছিলেন জীবনভিত্তিক উপন্যাস। ভ্যান গঘকে নিয়ে ‘লাস্ট ফর লাইফ’ বা মিকেলেঞ্জেলোকে নিয়ে ‘অ্যাগনি অ্যান্ড এক্সট্যাসি’ যেমন!  ‘কথ্য ভাষা এখন আমার সম্পূর্ণ আয়ত্তে, সত্তর বছর আগের বাঁকুড়া শহর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,’ আর এক চিঠিতে লিখছেন সমরেশ।
‘দেখি নাই ফিরে’ নামের সে উপন্যাস শেষ হয়নি, মাঝপথে মারা গিয়েছেন সমরেশ। রামকিঙ্কর এই কেচ্ছাভুক, মেকি সভ্যতার কাছে বরাবর অধরা ছিলেন, তাঁর সাহিত্যিক উপস্থাপনাও রয়ে গেল অসমাপ্ত। বাঙালির ট্র্যাজেডি এখানেই!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/sculpture-and-painter-ramkinkar-baij-a-key-figure-of-contextual-modernism-1.775681?ref=archive-new-stry

রাতে দোকান খুলিয়ে কিনলেন শেক্সপিয়র (On Bikash Roy)

রাতে দোকান খুলিয়ে কিনলেন শেক্সপিয়র

জীবনে মদ ছোঁননি। নেশা বলতে বই পড়া। শখ বিদেশি গাড়ির। সাদামাঠা গৃহস্থজীবন কাটানো ‘ভিলেন’ বিকাশ রায়কে নিয়ে লিখেছেন দেবাশিস ভট্টাচার্য 

 
Bikash Roy
তাঁর মায়ের কাছে বাবা বললেন, ‘‘তোমার এই ছোট ছেলেটির লেখাপড়া কিচ্ছু হবে না। রেসিটেশন শিখছে, নকল-টকল করতে পারে। যাত্রা, থিয়েটারে নোটো সেজেই ওর দিন যাবে।’’
কী অমোঘ ছিল সেই পর্যবেক্ষণ! বিকাশ রায় নিজেই পরে বলেছেন, ‘‘বাবার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। নোটো হয়েই দিন গেল!’’
যে সময়ের কথা, বিকাশ তখন বালক। জন্ম ১৯১৬য়, নদিয়ার রানিনগরে। বিত্তবান জমিদার বংশের ছেলে। তবে পূর্বপুরুষের বাবুয়ানি এবং উড়নচণ্ডিপনায় ভাঁড়ার প্রায় সবটাই তত দিনে উজাড় হয়ে গিয়েছিল। টিকেছিল শুধু জমিদারিসূত্রে পাওয়া ‘রায়’ পদবিটুকু।

বাবা যুগলকিশোর কলকাতায় এসে সরকারি চাকরি নিলেন। যে কোনও আদর্শ পিতার মতোই তিনি চাইতেন, ছোট ছেলে ‘বিকু’ ভাল লেখাপড়া শিখে আইসিএস হোক।
 বিকাশ ভর্তি হলেন ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে। কিন্তু তাঁর বেশি আগ্রহ আবৃত্তি (সেই শিক্ষা অবশ্য বাবার কাছেই শুরু), অভিনয়ে। তাই হাত-পা নেড়ে ‘পঞ্চনদীর তীরে’ আবৃত্তি করে প্রশংসা কুড়োলেও বাবা যেই ইংরেজি ট্রান্সলেশন ধরলেন, বিকুর হাল খারাপ! 
 ম্যাট্রিকে বাংলায় লেটার ও স্বর্ণপদক নিয়ে পাশ করলেন বিকাশ। পড়তে গেলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানেও নাটকের ভূত তাঁর ঘাড়ে। তখন ঘটল আর এক কাণ্ড! কলেজের থিয়েটারের দলে ঢুকে শরৎচন্দ্রের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’-এ পেলেন বিনোদের ভূমিকা। চরিত্রের দাবি অনুযায়ী মদ, সিগারেট সবই দরকার। কলেজের নাটকে মদ খাওয়া দেখানোর প্রশ্নই নেই। তবে সিগারেট রেখেই মহলা হল। কিন্তু গোল বাধল শেষবেলায়। চূড়ান্ত মহলা দেখতে এসে অধ্যক্ষ রেগে আগুন। প্রেসিডেন্সির ছেলেদের নাটকে সিগারেট খাওয়া! অতএব সেটি অভিনয় থেকে ছেঁটে দেওয়া হল। যদিও সিগারেটের নেশা তত দিনে রপ্ত হয়ে গিয়েছে বিকাশের।
আর মদ? একের পর এক চলচ্চিত্রের খল চরিত্রে মদ্যপান যাঁর কাছে জলপানের চেয়েও স্বাভাবিক লেগেছে, ব্যক্তিজীবনে সেই বিকাশ রায় নেশা করবেন, এতে আশ্চর্য কী!
সত্যিই আশ্চর্য। কারণ কোনও দিন মদের গ্লাসে চুমুকটুকুও দেননি তিনি! ঘনিষ্ঠদের আড্ডায় এ সব নিয়ে মজাও করেছেন। বিকাশ রায়ের বিভিন্ন লেখার সংকলনগ্রন্থ প্রকাশের সূত্রে বইপাড়ার প্রকাশক বামাচরণ মুখোপাধ্যায় তাঁর খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। একবার বিকাশবাবুর কাছে তিনি জানতে চান, নিজে মদ না খেলে মদ্যপের নিখুঁত অনুভূতি বোঝা যায়? বিকাশবাবু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘অভিনয় তো মনে। মদ কী করবে!’’
অভিনয়ের এই সাবলীলতাই বিকাশ রায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চলচ্চিত্র জগতের মানুষজন তো বটেই, একেবারে সাধারণ দর্শকও তাঁর অভিনয় প্রতিভায় মজে থেকেছেন চিরকাল। তিনি আর নেই। কিন্তু সেই স্বীকৃতি আজ পর্যন্ত একই রকম রয়ে গিয়েছে।
পুরোদস্তুর নায়ক তিনি ছিলেন না। নায়কোচিত দর্শনধারীও নন। কিন্তু চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে তিনি বারবার যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ভোলার নয়। যখন খলচরিত্র করতেন, মনে হত এত ঘৃণ্য লোক আর হয় না। ’৪২ ছবিতে অত্যাচারী অফিসার মেজর ত্রিবেদীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় তো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। আবার যখন ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর জীবনমশাই হয়ে পর্দায় এসেছেন, ‘উত্তর ফাল্গুনী’-র মনীশ হয়েছেন, তখন সেই অভিনয় দেখে সম্ভ্রমে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকেরা। ‘ছেলে কার’ বা ‘ছদ্মবেশী’র মতো কিছু ছবি তাঁকে চিনিয়েছে কমেডি অভিনয়ে দক্ষতার মাপকাঠিতে।
বিকাশ রায়ের পাকাপাকি ভাবে অভিনয়ে আসার আগের পথটি কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। চড়াই-উতরাই ছিল বিস্তর। সংসার প্রতিপালনের জন্য কঠিন লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। বিলেত ফেরত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দাদার অকালমৃত্যু, বাবার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে পরিবারে নিদারুণ অর্থকষ্ট, তারই মধ্যে তাঁর বিয়ে। অন্নসংস্থানের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি ছিল তাঁর। সকালে টিউশন দিয়ে শুরু হত দিন। তার পরে বাসভাড়া বাঁচাতে ভবানীপুর থেকে হেঁটে হাইকোর্ট পাড়া। ভাগ্যান্বেষণে এ দুয়ার, সে দুয়ার।
প্রেসিডেন্সি থেকে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেছেন, আইন পাশ করেছেন। ওকালতি করতে গিয়েও সুবিধে হয়নি। বহু ঘাটে ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে অল্প দিন মোটা বেতনে সিভিল ডিফেন্সে পাবলিসিটির চাকরিও করলেন। কাজ করলেন একটি এরোড্রম তৈরির অফিসেও। কিন্তু কোনওটিই তাঁর জীবনে স্থায়ী হল না। অনেক কম টাকায় যোগ দিলেন রেডিয়োর চাকরিতে। মাইক্রোফোনের আকর্ষণ তাঁকে টেনেছিল। নানা বাঁক ঘুরে সেখান থেকেই তিনি এক সময় পৌঁছলেন সিনেমার জগতে। দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। সিনেমায় নামার আগে স্ত্রীর ‘অনুমতি’ নিয়েছিলেন বিকাশ। কারণ এমন একটি কাজে পদে পদে নানা হাতছানি থাকে, নিন্দা রটতেও দেরি হয় না। স্ত্রী কিন্তু মুক্তমনে সায় দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর স্বামী কত ‘খাঁটি’।
‘উত্তর ফাল্গুনী’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে
বিকাশবাবুর একমাত্র পুত্র বিজ্ঞান গবেষক সুমিত রায় ৫৪ বছর আমেরিকা প্রবাসী। পিতৃস্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ওই ঘটনা শুনিয়েছেন তিনিই। বলেছেন, ‘‘আমার ঠাকুরদা তখনও জীবিত। তিনিও মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘শুনেছি সিনেমা লাইনটা অতি খারাপ। লোকে নাকি কুসংসর্গে পড়ে, সংসার উচ্ছন্নে যায়। বিকু এই লাইনে গেলে সামলাতে পারবে তো?’ মা সম্মতি দিয়েছিলেন এবং বাবা আজীবন পরিবারের সেই মর্যাদা রক্ষা করেছেন।’’
১৯৪৭-এ মুক্তি পায় বিকাশ রায় অভিনীত প্রথম ছবি ‘অভিযাত্রী’।  ছবির কাহিনি, চিত্রনাট্য, শিল্পী নির্বাচন ইত্যাদির দায়িত্ব পেয়েছিলেন তাঁর রেডিয়ো-জীবনের বন্ধু জ্যোতির্ময় রায়। তিনিই নিয়ে যান বিকাশবাবুকে। আশ্বাস ছিল, নায়ক হবেন। পেলেন চার নম্বর চরিত্র। পাঁচ হাজার টাকাও। মন না মানলেও অবস্থা তা মেনে নিতে বাধ্য করল। এবং বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ পেয়ে গেল অভিনেতা বিকাশ রায়কে।
প্রথম ছবির পরিচালক হেমেন গুপ্তের কাছেই বিকাশবাবুর দ্বিতীয় ছবি ‘ভুলি নাই’। সেই সঙ্গে পরিচালকের সহকারী হয়ে বুঝতে শুরু করলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্ধিসন্ধি। যেটা পরবর্তী কালে  বিকাশকে নানা ভাবে সাহায্য করেছে। পরিচালনা, চিত্রনাট্য তৈরি, প্রযোজনা— সব ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণে দীর্ঘ সময় জুড়ে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা ছবি।
১৯৫১ সাল। একের পর এক ছবি করতে করতে অভিনেতা বিকাশ রায় তখন বেশ পরিচিতি পেয়ে গিয়েছেন। সেই সময় হেমেনবাবু তৈরি করেন ’৪২। ছবিটিতে নৃশংস অত্যাচারী মেজর ত্রিবেদীর ভূমিকায় অবিস্মরণীয় অভিনয় করেন বিকাশ রায়। দেশ তখন স্বাধীন হওয়ার আবেগে উত্তাল। পর্দায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর মেজরের অত্যাচার দেখতে দেখতে মানুষ এতটাই খেপে উঠেছিল যে, রাস্তাঘাটে বিকাশ রায়কে দেখলে তাড়া করার ঘটনাও ঘটত। ছবির প্রিমিয়ারে তাঁকে দেখতে পেয়ে জুতো তুলে ছুটে এসেছিলেন অনেকে।
‘‘একজন অভিনেতার জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে!’’ স্মৃতিচারণে সশ্রদ্ধ হলেন অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ’৪২-এর বছর দশেক পরে ‘মায়ামৃগ’ ছবি। সেখানে বিকাশ রায়ের সঙ্গে প্রথম কাজ করার সুযোগ পান বিশ্বজিৎ। একেবারে নায়কের ভূমিকা। উত্তমকুমার ছিলেন একটি বিশেষ চরিত্রে।
বিশ্বজিৎ বলেন, ‘‘বিকাশদাকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ এর আগে হয়নি। কিন্তু তাঁর ’৪২ দেখে শিহরিত হয়েছিলাম। অভিনয় এমনও হয়!’’ প্রথম দিন পরিচয় করিয়ে দিলেন ছবির পরিচালক চিত্ত বসু। বিকাশবাবু নবাগত নায়ককে বললেন, ‘‘নতুন এসেছ। হিরোর রোল! তুমি তো অভিমন্যু বধ হয়ে যাবে হে!’’ মানে? প্রথমটা বুঝতে পারেননি বিশ্বজিৎ। নিজেই হেঁয়ালি ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন বিকাশ রায়। হেসে বলেছিলেন, ‘‘তোমাকে কাদের পাশে অভিনয় করতে হবে, জানো? ছবি বিশ্বাস, উত্তম, আমি, সন্ধ্যারাণী... সবাই ঘিরে থাকব কিন্তু। তুমি চক্রব্যূহে একা অভিমন্যু। কেউ বেরোনোর জায়গা দেবে না! বেরোতে পারবে তো?’’
’৪২ ছবিতে
‘‘শুনেই কেমন একটা ধাক্কা লেগেছিল,’’ অকপট স্বীকারোক্তি বিশ্বজিতের। তাঁর মনে হয়েছিল, ‘‘আমাকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য বলছেন নাকি?’’ তার পরেই তিনি বুঝতে পারলেন, বিষয়টা একেবারে উল্টো। আসলে বিকাশবাবু যা বলেছেন, সেটা অগ্রজের উপদেশ। বিশ্বজিতের কথায়, ‘‘সে দিন বিকাশদার বলা কথাগুলো কিন্তু আমাকে সচেতন করে দিয়েছিল। আমি বুঝে নিলাম, পর্দায় টিকে থাকতে হলে নিজের ক্ষমতা উজাড় করে অভিনয়ক্ষমতা দিয়ে নিজেকে চেনাতে হবে। এখন থেকে এটাই হবে আমার ধ্যানজ্ঞান।’’ পরে বিশ্বজিতের পরিচালনায়, প্রযোজনায় একাধিক ছবিও করেছেন বিকাশবাবু।
ছোট-বড় যে চরিত্রই হোক, নিজেকে সেই অনুযায়ী তৈরি করার কাজে বিকাশ রায় কোনও ঘাটতি রাখতেন না। যখন তিনি রীতিমতো নামডাকওয়ালা, তখনও সেই অভ্যেস তিনি ছাড়েননি। শট দেওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত চরিত্রায়ন নিয়ে নিজের মতো কিছু না কিছু ভেবেই চলতেন।
অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী শুনিয়েছেন তেমনই এক টুকরো অভিজ্ঞতা। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োয় কোনও ছবির শুটিং করছেন তিনি। পাশের ফ্লোরে অন্য কোনও ছবিতে বিকাশ রায়। এক ফাঁকে বাইরে বেরিয়ে লিলিদেবী দেখেন, পুলিশ অফিসারের পোশাক পরা বিকাশবাবু বাইরের চত্বরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ‘‘কী হয়েছে, বিকাশদা? পায়ে লাগল?’’ তাঁর প্রশ্নে বিকাশ রায় জানিয়েছিলেন, এই পুলিশ অফিসারের চরিত্রে একটু পা টেনে হাঁটলে ভাল হবে মনে হয়েছে বলে তিনি শটের আগে সেটা অভ্যেস করছেন। ফ্লোরে অন্য কেউ কিন্তু তা জানেননি, বোঝেননি। তাঁরা শুধু শটটাই দেখেছেন।
‘আমি সিরাজের বেগম’ ছবিতে মিরজাফর হয়েছিলেন বিকাশবাবু। সিরাজের ভূমিকায় বিশ্বজিৎ। শট দেওয়ার সময় বিশ্বজিতের মনে হত, বিকাশ রায়ের মিরজাফর যেন একটু ভালমানুষ গোছের। চুপচাপ বসে মালা জপছেন, আর ঘাড় হেলিয়ে তাকাচ্ছেন। ক্রূরতার প্রকাশ কি কম হচ্ছে? তখন সংশয় ছিল বিশ্বজিতের। এখন বলেন, ‘‘পরে ছবি দেখে মালুম হল, মিরজাফর চরিত্রকে কী অসীম দক্ষতায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন বিকাশদা। ওই ঠান্ডা দৃষ্টিতে কী অসম্ভব কুটিলতা, ভাবা যায় না!’’
প্রমথেশ বড়ুয়া ছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পী। অভিনয়ে আসার আগেই বড়ুয়া সাহেবের স্টাইল তাঁকে টানত। ফিল্মে পরিমিতি বোধের অনুভূতি তিনি বুঝতে শিখেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়ার ছবি দেখে। বিকাশ রায়ের কাটা কাটা সংলাপ বলার ভঙ্গিতেও অনেকে তাই বড়ুয়া-স্টাইল খুঁজে পান।
আবৃত্তির প্রতি অনুরাগ তো শৈশব থেকেই ছিল। তাই প্রতিটি শব্দ উচ্চারণে যত্ন এবং স্বর প্রক্ষেপণ তাঁর অভিনয় প্রতিভায় যোগ করেছিল বাড়তি মাত্রা। কিন্তু তার বাইরেও আবৃত্তি তাঁকে প্রেরণা দিত। কাজ থেকে ফিরে সময় পেলেই ছেলে সুমিতের সঙ্গে বসে কত কী যে পড়তেন— ‘শেষের কবিতা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘সঞ্চয়িতা’র পাতা উল্টে কোনও কবিতা। বাবা-ছেলের পাঠে ঘর গমগম করে উঠত।
ইডেনের খেলায় উত্তমকুমারের সঙ্গে
ছেলেকে ডাকতেন ‘বেণুবাবু’ বলে। তবে ছেলে-মেয়ের মুখে সাদামাঠা ‘বাবা’ শুনতে চাইতেন না। তাঁকে সন্তানেরা বলতেন ‘বাবু’। ধমনীতে জমিদারের রক্ত বলেই হয়তো ‘কর্তা’ ডাকটিও অপছন্দের ছিল না।
ছেলেকে নিয়ে এক সান্ধ্য পাঠের আড্ডায় একদিন ঘটল মজার কাণ্ড। সে দিন শেক্সপিয়র-এর লেখা পড়া হবে। বিকাশ রায়ের বাড়ি ছিল বইয়ের গুদাম। পুস্তক অনুরাগী এই অভিনেতার নিজস্ব সংগ্রহে ছিল কয়েক হাজার বই। তাঁর যোধপুর পার্কের ভাড়াবাড়িতে কাজের বাইরে সর্বদা বই নিয়ে মগ্ন থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন শিল্পী। তাঁর ছেলের কথায়, ‘‘বাবুকে বইয়ের পোকা বলা হত। বাড়ি জুড়ে শুধুই বই, বই, আর বই। কত রকম বিষয়। বিশেষ কোনও বাছবিচার নেই। বই পেলেই তিনি কিনতেন।’’ ছেলেকেও বইয়ের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন পুরোদস্তুর।
কিন্তু সে দিন শেক্সপিয়র পড়তে গিয়ে দেখা গেল, রচনাসমগ্রটি বেপাত্তা! তন্ন তন্ন করে খুঁজে বোঝা গেল, কোনও বহিরাগত অতিথি হয়তো ‘নিজের’ ভেবে সেটি কোনও দিন হস্তগত করেছেন। ‘‘সে হোক। তা-বলে শিক্ষিতের বাড়িতে শেক্সপিয়র থাকবে না! রবীন্দ্রনাথ এবং শেক্সপিয়র যে বাড়িতে নেই, সে বাড়ি বাসের যোগ্যই নয়।’’ মেজাজ হারালেন বিকাশবাবু।
অতএব সিদ্ধান্ত হল, তখুনি শেক্সপিয়রকে বাড়িতে এনে পুনর্স্থাপন করতে হবে। ছেলেকে বললেন, ‘‘বেণুবাবু, গাড়ি বের করো।’’ পুত্র সুমিতবাবুর মনে আছে, তিনি গাড়ি চালিয়ে বাবাকে নিয়ে এলেন চৌরঙ্গির ফারপো হোটেলের কাছে। ফুটপাতের এক পরিচিত বই বিক্রেতা তখন ঝাঁপ ফেলে শোওয়ার আয়োজন করছেন। বই পাওয়া গেল তাঁর ভাণ্ডারে। স্বস্তি পেলেন বিকাশ রায়!
আরও একবার একই ভাবে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ খুঁজে পাননি। পরদিন বিশ্বভারতীর গ্রন্থন বিভাগে কিনতে গিয়ে শুনলেন, ছাপা নেই। আপাতত বাজেট-বরাদ্দও নেই। সুমিতবাবু বলেন, ‘‘বাবু ওঁদের বললেন, আমি যদি গোপনে ছাপার টাকা দিই, তা হলে নেবেন? কাউকে বলতে হবে না। শুধু ছাপলেই হবে।’’ শুনে বিশ্বভারতীর কর্তারা হতবাক!
প্রসঙ্গ শুরু হয়েছিল আবৃত্তির কথা দিয়ে। সেখানেই ফেরা যাক। এখন যে শ্রুতিনাটকের চল, বিকাশবাবু তার অন্যতম সূচনাকার। তাঁর পরিচালনায় ‘শেষের কবিতা’ ছিল প্রথম মঞ্চস্থ শ্রুতিনাটক।
সপরিবার বিকাশ
লিলি চক্রবর্তী বলেন, ‘‘একদিন স্টুডিয়োয় কাজ করছি। একটু বাইরে বেরোতেই দেখি বিকাশদা। সৌমিত্রদা (চট্টোপাধ্যায়) তখন পাশের ফ্লোরে ঢুকছেন। আমাকে দেখিয়ে বিকাশদাকে বললেন, ‘তুমি লিলিকে ওটা বলেছ?’ বিকাশদা বললেন, ‘এখনই বলব।’ তার পরে ‘শেষের কবিতা’য় আমাকে লাবণ্যর চরিত্র দিলেন। সৌমিত্রদা অমিত। যত্ন করে, ধরে ধরে শিখিয়েছেন বিকাশদা। উত্তর কলকাতায় আমার রাজবল্লভ পাড়ার বাড়িতেও গিয়েছেন বোঝাতে। দারুণ হিট হয়েছিল।’’
চিত্র পরিচালক হিসেবে বিকাশ রায়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। আনুমানিক শ’আড়াই ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। পরিচালনা করেছেন আটটি ছবি। এর মধ্যে পাঁচটি আবার নিজেরই প্রযোজনা। ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ তার একটি।
ছবির নায়ক থিরুমলের চরিত্রে উত্তমকুমার। নায়িকা সাবিত্রী ছিলেন কুন্তীর ভূমিকায়। দিঘার কাছে সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে মরুভূমি বানানো হয়েছিল। ছবিতে ব্যবহারের জন্য দু’টি উট এনে রেখেছিলেন। এক চরম নাটকীয় মুহূর্তে মানসিক বিকারগ্রস্ত থিরুমল আচমকা কুন্তীর গলা টিপে ধরবে। সেই দৃশ্য গ্রহণের কয়েক দিন আগে থেকে উত্তমকুমার চুপচাপ। বিশেষ কথা বলছেন না কারও সঙ্গে। কেমন যেন আত্মভোলা ভাব। শুটিং শুরু হল। উত্তমকুমারের দৃষ্টি বেশ অস্বাভাবিক লাগছে। গলা টিপলেন যখন, তখন যেন তিনি আর নিজের মধ্যে নেই। সাবিত্রীর দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শট শেষ করেই ছুটে এলেন পরিচালক বিকাশ রায়। সাবিত্রীর তখন হুঁশ নেই। বমি করে অজ্ঞান। জলটল দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তুলে বিকাশবাবু উত্তমকে ধমক দিলেন, ‘‘তুই তো ন্যাচারাল অ্যাকটিং করতে গিয়ে মেয়েটাকেই মেরে ফেলছিলি!’’ উত্তম বললেন, ‘‘সাবু, প্লিজ ক্ষমা করে দে।’’
ছবির কাজ যখন কমে এল, তখন বেশি বয়সে মঞ্চে গেলেন বিকাশ রায়। সে-ও অনেক সাধ্যসাধনার পরে। তরুণকুমার এবং সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এক রকম জোর করে রাজি করালেন তাঁকে। প্রথম নাটক ‘চৌরঙ্গি’। তিনি স্যাটা বোস। চলচ্চিত্রের দৌলতে উত্তমকুমারের স্যাটা বোস তত দিনে বাজার মাত করেছে। সেই চরিত্রকে মঞ্চে ফোটাতে গোড়ায় খুব আপত্তি ছিল বিকাশবাবুর। বলেছিলেন, ‘‘উত্তমকে পর্দায় দেখার পরে আমাকে দর্শক নেবেই না।’’ উত্তম তা শুনে বলেছিলেন, ‘‘তুমি নিজেকে এত কম ভাবছ কেন? আমি জানি, তুমি নিজের মতো করে চরিত্র ফোটাবে। আমি দেখতে যাব।’’ বিকাশবাবু উত্তরে বলেন, ‘‘দর্শক আসনে তোকে দেখলে আরও নার্ভাস হয়ে যাব রে!’’ উত্তমকুমার গিয়েছিলেন। না জানিয়ে অন্ধকারে হলে ঢুকে বসে পড়েছিলেন। পরে গ্রিনরুমে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর বিকাশদাকে। এর পরেও আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন বিকাশ রায়। প্রায় সবই তরুণকুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে।
কাজের জগতের বাইরে বিকাশ রায় ছিলেন একেবারেই পারিবারিক। স্বামী, বাবা, গৃহকর্তা ঠিক যেমনটি হন। তাঁর ছেলের কাছে শুনেছি, ওঁদের বাড়িতে ফিল্ম নিয়ে আলোচনা কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। বাবার সহকর্মী বন্ধুদের আর পাঁচ জনের মতোই কাকা, জেঠু বলে সম্বোধন করতে হত। উত্তমকাকা, ভানুকাকা (বন্দ্যোপাধ্যায়), পাহাড়িজেঠু (সান্যাল), হেমন্তকাকা (মুখোপাধ্যায়), বসন্তকাকা (চৌধুরী) ইত্যাদি। তাঁরা কাজের সূত্রে বাড়িতেও আসতেন। কিন্তু সৌজন্যের বাইরে সেখানে ছোটদের প্রবেশাধিকার ছিল না।
বিকাশবাবুর বইয়ের প্রকাশক বামাচরণবাবু বলেছেন, তিনি বছর দশেক প্রায় নিয়মিত বিকাশ রায়ের যোধপুর পার্কের বাড়িতে যাতায়াত করলেও সিনেমার লোকজনকে বড় একটা দেখেননি। দেখেছেন এক নিপাট সাদামাঠা গৃহস্থ বিকাশবাবুকে। ছেলে দীর্ঘ দিন বিদেশে। মেয়ে বিবাহিত (পরে মারাও যান)। বাড়িতে সেই সময় শুধু স্ত্রী আর তিনি। কাজ না থাকলে তাঁর একমাত্র বিনোদন ছিল বই এবং গান শোনা।
সিগারেট খেতেন। বিদেশি গাড়ির শৌখিনতা ছিল। আর হয়তো বংশের ধারায় কোঁচানো ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনচর্যায় অন্য কোনও উচ্ছ্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি।
পড়ায় মগ্ন
আমেরিকা থেকে তাঁর ছেলে সুমিতবাবু জানিয়েছেন, ‘‘দেশ ছাড়ার আগে পর্যন্ত আমরা সাধারণত একসঙ্গে রাতের খাওয়া সারতাম। নিয়মটা বাবুই চালু করেছিলেন। তখন খাওয়ার টেবিলে বাবু, মা, আমি, বোন সবাই মিলে কথা হত। সারা দিন কে কী করলাম তা নিয়ে আলোচনা হত। বাবু লেখাপড়ার খোঁজ নিতেন।’’
হাঁপানির প্রকোপে গলার স্বর যখন ভেঙে গেল, তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন— আর নয়। এ বার সরে দাঁড়াতে হবে। স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘‘যা দিতে চাই, তা দিতে পারব না। মানুষ যা চাইবে, পাবে না। এই অবস্থায় কাজ করলে দর্শকের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হবে। সেটা সইবে না।’’
ছেলে চেয়েছিলেন, বাবা-মা তাঁর কাছে আমেরিকায় গিয়ে থাকুন। যাননি। নিজের শহর, চেনা পরিমণ্ডল তাঁকে পিছু টেনে ধরেছে। শেষ জীবনে তাঁর ৪৩১, যোধপুর পার্কের ভাড়াবাড়ির রাস্তার দিকের বারান্দায় আরামকেদারায় বসে চলমান জীবন দেখতেন। বই পড়তেন, অথবা আত্মমগ্ন হয়ে ভাবতেন। কোনও দিন কোনও অভিযোগ ছিল না। চাহিদাও ব্যক্ত করেননি।  জীবনের পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে নীরবই থেকেছেন।
 কারও হয়তো মনে পড়তে পারে ‘বনপলাশীর পদাবলি’ ছবির সেই দৃশ্য। কর্মজীবনের শেষে আপন ঘরে ফিরে জগৎ ও জীবনকে যেন নতুন করে চিনলেন শিক্ষক গিরিজাপ্রসাদ। বড় বেদনার সেই অনুভব। ভাঙা মনে, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে আসছেন তিনি। নেপথ্যে ভেসে আসছে সংগীত— ‘সাথীহারার গোপন ব্যথা, বলব যারে সে জন কোথা...’
১৯৮৭ সালে জীবনাবসান হয় বিকাশ রায়ের। বয়স তখন ৭১।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/actor-and-book-lover-bikash-roy-never-touched-alcohol-1.779088?ref=archive-new-stry