Monday, 27 March 2017

মহুয়ায় মাতাল ছিল (On Mahua Roychoudhury)


$image.name

মহুয়ায় মাতাল ছিল

এক সময়ের টালিগঞ্জ। তুখড়় সুন্দরী, মরমি অভিনেত্রী, ফুটবল ভক্ত, বেপরোয়া প্রেমজীবনের মহুয়া রায়চৌধুরী। অগ্নিদগ্ধ হয়ে তাঁর চলে যাওয়া আজও রহস্য। লিখছেন দীপান্বিতা ঘোষ মুখোপাধ্যায়

৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ০০:০০:৪১
mohua
১৯৮৫।
সে এক আষাঢ় শেষের বেলা। বিরামহীন বৃষ্টি।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত নার্সিং হোমের আট তলায় ৭২২ নম্বর ঘর।
ঝলসানো শরীর অস্ফুট উচ্চারণে শুধু কয়েকটা শব্দ শোনা গিয়েছিল, ‘‘আমার গোলা রইল। ওকে দেখিস।’’
না, কোনও প্যারালাল সিনেমার দৃশ্য নয়।
এ এক জীবনের দলিল।
যে জীবনের নাম মহুয়া রায়চৌধুরী।
‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এ ঘোড়সওয়ার হয়ে যে মেয়েটা বাংলা ছায়াছবিতে এসেছিল। সে এক আবির্ভাব যেন!
এক্কেবারে আসা, দেখা, জয় করা। তবে কিনা নিজস্বতা বজায় রেখে। তার পরই দ্রুত  প্রস্থান।
ঘোর বর্ষামুখর রাতেই ভয়ঙ্কর ভাবে আগুনে পুড়ে এগারোটা দিন মৃত্যুর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ শেষ করে অগুনতি মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছিল সে।
চলে গিয়েছিল স্বামীপুত্রের ভরাট সংসার ফেলে, বাংলা চিত্রজগতের নির্দেশক প্রযোজকদের এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে।
ঠিক তার আগে প্রাণের বন্ধু মাটুর হাত ধরে সাত বছরের গোলার কথা বলে যেতে পেরেছিল শুধু।
আত্মহত্যা না হত্যা?
নাকি নিছকই দুর্ঘটনা?
এ সংশয় রয়ে গেছে আজও।
ফেরা যাক বহু যুগ আগের সেই সন্ধেবেলায়।
আসর বসেছে উত্তর কলকাতার চৌধুরীপাড়ায়। সে আমলে এমনি অস্থায়ী স্টেজেও স্বনামধন্য শিল্পীরা অংশ নিতেন।
দর্শক আসনে হাজির স্বয়ং সুচিত্রা সেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং শ্যামল মিত্রর মতো অদ্বিতীয় শিল্পীরা।
অনেক কষ্ট করে এখানেই জনৈক নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী তাঁর ছোট্ট সাত বছরের মেয়ে শিপ্রার নাচ দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন।
নীলাঞ্জন এক সময় নিজে উদয়শংকরের দলে নাচতেন, নামী এডিটরের শাগরেদি করেছেন, মায় বম্বে পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন যশের আশায়, অর্থের সন্ধানে।
লাভ হয়নি।
ফিরে এসেছিলেন কলকাতায়। কনিষ্ঠা কন্যা শিপ্রা তখন সবে চার বছরের শিশু। তাতে কী! যে কোনও গানের সঙ্গে সে সারা বাড়ি প্রজাপতির মতো নেচে বেড়ায়। স্তম্ভিত হতে হয় তার তালজ্ঞানে!
এক দুঃসাহসী চিন্তা মাথায় এল নীলাঞ্জনের। ক্যারিকেচার আর্টিস্ট বেণু সেন ছিলেন ওঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁকে মনের কথা জানালেন। অতঃপর  চৌধুরীপাড়ার আসর। 
সেদিনের সেই প্রমোদমেলায় হেমন্ত, সন্ধ্যা, শ্যামলের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিল ছোট্ট শিপ্রা।
আর শার্গিদ-এর ঝমঝমে গান— দিল ভিল, প্যার প্যার, ম্যায় কেয়া জানু রে’র তালে তালে জন্ম হল ছন্দিত সোনালি রায়ের।
মন্ত্রমুগ্ধ দর্শকরা সে দিন জানতেও পারেননি তাঁরা এক ইতিহাসের সাক্ষী রয়ে গেলেন। এক তারার জন্মলগ্ন প্রত্যক্ষ করলেন।
বেশ কিছু দিন সোনালি রায় কলকাতা আর তার আশপাশে অস্থায়ী স্টেজ মাতিয়ে রাখল।
পয়সা রোজগারও শুরু হল ওই পুতুলখেলার বয়স থেকেই। তারপর স্টেজ এবং বাবার টালিগঞ্জ পাড়ার যোগাযোগের সুবাদে এক দিন গুটি গুটি পায়ে হাজির হল স্টুডিয়ো পাড়ায়।
সুখেন দাসের প্রযোজনায় পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় !নয়া মিছিল’ ছবির জন্যে নায়িকার খোঁজ চলছে।
জহুরি সুখেন দাসের খাঁটি সোনা চিনতে ভুল হয়নি। কিন্তু বিধি বাম। নির্দেশকের ওই চরিত্রের উপযুক্ত মনে হল না রোগাসোগা সোনালি কিংবা শিপ্রাকে।
বাবার হতাশা দেখে ছোট হলেও অপমান বড় বেজেছিল!
স্টুডিয়ো চত্বর ছেড়ে ভগ্নমনোরথ বাপ-মেয়ে  বাড়ির পথ ধরেছে। পিছু ডাকলেন সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিগত মেকআপ-ম্যান জামালভাই।
খবর পাওয়া গেল তরুণ মজুমদার তাঁর আগামী ছবির জন্যে অল্পবয়সি নতুন মুখ খুঁজছেন। আবার আশার আলো।
কনেবউ সেজে সন্ধ্যা রায়, তরুণ মজুমদারের সামনে দাঁড়াল সদ্য কৈশোর-পাওয়া শিপ্রা ওরফে সোনালি।
মাত্র তেরো বছর বয়স। নামকরণের তখনও কিছু বাকি ছিল। শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-এর বউ থেকে প্রেয়সী হবার যাত্রা শুরু হল নতুন নামে।
বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা অধ্যায়ে নবতম সংযোজনের নামকরণ করা হল মহুয়া রায়চৌধুরী।
কাঁচামাটির তাল নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন সন্ধ্যা রায়! অস্থায়ী স্টেজের অখ্যাত এক রোগাসোগা শিশুশিল্পীকে অপত্য স্নেহে অভিনয়ের পাঠ থেকে শারীরিক যত্নে লালন করা। তবু আজ অনায়াসে বলেন, ওকে কিছু শেখাতে হয়নি। আমি শুধু পড়ে দিলাম। বাকিটুকু ও নিজেই তরতর করে বলে গেল।
নাচ, অভিনয়, সবই ছিল ওর জন্মগত প্রাপ্তি। দুরন্ত, চঞ্চল তেরো বছরের বালিকা যখন পার্ট বুঝত, চরিত্র শুনত তখন একবারে স্থির এবং আত্মমগ্ন। তাঁর ভাষায় মহুয়া এক ‘লিটল গ্লোরিয়াস টুইলাইট’।
মাধবী চক্রবর্তী ছিলেন তার মাধুমা। ভাত না খেয়ে কাজে বেরোতে পারত না। দূর দমদম থেকে ভোরের কল টাইমে হাজির হতে হলে, নির্দ্বিধায় থেকে যেত মাধুমার কাছে।
‘‘সকাল সকাল দুটো ভাত রান্না করে দিতাম। খেয়ে বেরোত। আমারও শান্তি হত,’’ সেকালের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্না নায়িকা ঘরোয়া মা-মাসির মতোই অপার স্নেহমাখা মুখে বললেন।
বলতে বলতে বিষণ্ণতার আকুল করা ব্যথা চারিয়ে উঠল যেন টলটলে চোখের পাড়ে— ‘‘সাবুর মতো অভিনয়ের ধরন ছিল। অমনি স্বচ্ছন্দ, অমনি আন্তরিক। ও চলে যাবার পর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিল। সেটা তপন সিনহার কাছেই রয়ে গেল। ওর বাড়ির কেউ ওর হয়ে নিতেও আসে নি। অভিমান, অবহেলা নাকি আশঙ্কা? কেউ জানি না।’’

তাপস পাল, সন্তু মুখোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, দীপংকর দে ছিলেন সমসাময়িক নায়কের দল।
সন্তু মুখোপাধ্যায়ের গলা থেকে অপরিসীম মমতা ঝরে পড়ল।— ‘‘স্টুডিয়োর কুকুরগুলো পর্যন্ত ছিল ওর ভক্ত। একবার ঢুকতে দেখলেই হল— সার বেঁধে পেছন পেছন ফ্লোর পর্যন্ত চলে আসত। কী যে হই চই করে জমিয়ে রাখত কী বলব!’’
‘দাদু নাতি হাতি’ বলে একটা ছবি করেছিল। স্বভাবতই একটি হাতি ছিল তাতে। প্রতিদিন নিয়ম করে এক ছড়া কলা নিজে হাতে তাকে খাওয়াত।
সন্তু বলছিলেন, ‘‘ওর সঙ্গে শট দিতে গিয়ে সময়-সময়, সত্যি বলছি, কেমন যেন, অস্তিত্বের সংকট হতো। ওকে শুধু অভিনেত্রী বললে কম বলা হয়। ও ছিল জাত শিল্পী।’’
শুধু পশুপাখি বলে নয়, নির্বিচারে সবার জন্য ভালবাসার অনন্ত এক জমি যেন মনের মধ্যে বয়ে বেড়াতেন মহুয়া!
এই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি কোণে তো আলো পৌঁছয় না। মহুয়ার ডান হাতটা যেন সব সময় বাড়ানোই থাকত ওই আলো না-পৌঁছনো কোণগুলোর আনাচেকানাচে। সেখানে জড়োসড়ো হয়ে কোনও ক্রমে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জন্য।
শ্রীলা মজুমদার।
মাত্র এক দিনের আলাপ।
একবার কাজের কথাও হয়েছিল একসঙ্গে। মহুয়া তখন ব্যস্ত নায়িকা। সময় দিতে পারেননি।
‘‘প্রায় এক বছর বাদে ভোরবেলা বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি। একটা গাড়ি এসে হঠাৎ দাঁড়াল। কাচ নামিয়ে কে যেন ডাকছে! এক ঝলক দেখে হঠাৎ করে চিনতে পারিনি। মেকআপ করা একটা মুখ। তার পরই  বুঝলাম, ওম্মা! মহুয়াদি! অনেক দিনের পরিচয় থাকলে যেমন করে মানুষ কথা বলে, ঠিক তেমনি করে আমায় ডাকলেন, ‘কোথায় যাবে? উঠে এসো শিগগির।’’’
‘দাদার কীর্তি’। তাপস পাল প্রথম ফ্লোরে এলেন। এতটাই কাঁচুমাচু জড়োসড়ো ভঙ্গি, যে পাঁচ বছরের শিশুটিও মুখের ভাষা পড়ে ফেলেছিল।
‘‘প্রথম প্রথম সকলেরই একটু অমন হয়। পরে সব ঠিক হয়ে যায়।’’
কার আশ্বাসবাণী?
নবাগত ছেলেটি অবাক হয়ে ফিরে দেখে, বাংলা ছবির ব্যস্ততম নায়িকার মুখ!
ছবিতে মহুয়ার ছোট বোন ছিল দেবশ্রী, স্টুডিয়োপাড়া যাকে চেনে চুমকি নামে। গোপন কথা, বকাবকি, আদর, মান-অভিমান সবটা জড়িয়ে অজান্তেই কখন যেন চুমকির ‘দিদি’ হয়ে যান মহুয়া।
একবার রীতিমত মনকষাকষি।
আশেপাশে যাঁরা ওঁদের জানতেন, তাঁদের আশংকা নায়িকার সঙ্গে নায়িকার এমন বিরল সদ্ভাব এ বার বুঝি আর থাকে না!
কিন্তু মহুয়া তো মহুয়াই।
কখন যে ঝোড়ো হাওয়ার মতো সব উড়িয়ে দু’হাত দিয়ে ফের আগলে ধরলেন তাঁর অভিমানী ‘বোন’-কে, টেরই পাওয়া গেল না। 
আদমি ঔর আউরত
মহুয়ার সব নায়ক অবশ্য আজ আর তাঁর প্রতি সমান সহমর্মী নন।
এঁদেরই এক জন তো মহুয়া প্রসঙ্গে লেখালেখির যথার্থতাই খুঁজে পেলেন না। প্রায় ঠাট্টা করেই উড়িয়ে দিলেন।—‘‘মহুয়া! এটা একটা বিষয় হল!’’
মহুয়াকে স্বহস্তে যাঁরা প্রায় রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ আবার ওঁর সম্পর্কে একান্তই ব্যক্তিগত স্মৃতি ‘বাজার’-এ এনে ফেলতে চাইলেন না।
কেউ যেন এড়িয়ে গেলেন।
ভয়? আজও? অনিশ্চয়তা এখনও? পাছে নিশ্চিত জীবনে বেয়াড়া আঁচ়ড় লেগে যায়!
কে জানে!
কলকাতায় এলে ফাঁকা লাগে
অমল পালেকর
তিরিশ বছর কেটে গেছে। শূন্যতাটা কিন্তু ভরাট হবার নয়। হলও না।
‘আদমি ঔর আউরত’। ছোট টেলিফিল্মে অল্প ক’জন আর্টিস্ট। আমি, কল্যাণ (চট্টোপাধ্যায়), মহুয়া...।
বিহার-বাংলার বর্ডারে লোকেশন। ছোট্ট ইউনিট উঠেছিল মাইথনে ডিভিসির গেস্টহাউসে।
গাড়িতে লম্বা সফরে তিনজন। আমি, তপন সিংহ আর মহুয়া। সারা রাস্তা স্বভাব-চঞ্চল মহুয়া শান্ত বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ গাড়ির জানলায় থুতনি ঠেকিয়ে বসেছিল।
কী ভাবছিল সারাটা পথ, কে জানে!
এর আগে ওর সঙ্গে আলাপ ছিল না। ছবিটা করার জন্য একটা সখ্য, বোঝাপড়া বড্ড জরুরি ছিল। সেটা  তপনদাই গড়ে দিলেন। আমাদের মহুয়া চমৎকার অভিনেত্রী, এইটুকু কথাই যথেষ্ট ওর জন্য।
শুরু হল শ্যুটিং। দিনেরবেলা রুখু লাল মাটি, উঁচুনিচু টিলা, বয়ে চলা নদী ঠেঙিয়ে কাজ করতে হত। ফিরে এসে স্নান করে খোলা বারান্দায় যে যার ড্রিংক নিয়ে সন্ধে শুরু করতাম। দিনগুলোর পিঠে যেন পাখনা লাগানো ছিল।
আমরা একটা গ্যাং ছিলাম। রিয়েল আড্ডা হত। দুষ্টুমি করতে তো গ্যাং লাগে, জোট বাঁধতে হয়। ঠিক তেমনই একটা গ্যাং!
শেষ দিন নিজে হাতে রান্না করেছিল মহুয়া। বাঙালি রান্না। মাছ আর মাছ। খাবার ব্যাপারে আমি মনেপ্রাণে বাঙালি। এই প্রসঙ্গে বলি, আমি বাংলা পড়তে পারি। লিখতেও পারি। তাই বাঙালির সঙ্গে কোথায় একটা আমার আত্মিক যোগ পাই।
তাই সম্পূর্ণ একটা বাঙালি পরিবেশে কাজ করতে গিয়েও সে বার বেশ ভাল লেগেছিল।
কিছুতেই ভোলার নয় সেই সব দিনগুলো। ডাবিং শেষ করে চলে আসার দিন মহুয়া দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল আমায়। দু’চোখ টলটল করছিল জলে। এর পর ‘আদমি ঔর আউরত’-এর মতোই আবার আমরা যে যার পথে!
কিন্তু কোনও দিনই ভুলতে পারিনি ওর আলিঙ্গন। ওর উষ্ণতা। ভুলতে পারব না ওর জলে ভরা চোখ দু’টো।
দুঃসংবাদটা তপন সিংহই ফোনে জানিয়েছিলেন। তারপর প্রথম যখন কলকাতায় এলাম, ব্যস্ত শহরটা বড় ফাঁকা ঠেকেছিল।
আজও কলকাতা এলে সেই মন খারাপ আমার পিছু ছাড়়ে না। কলকাতা থেকে মহুয়াকে আমি এত দিনেও পুরোপুরি আলাদা করতে পারিনি।
(সাক্ষাৎকারভিত্তিক)
প্রেম ছাড়া না কোনও শিল্প হয়, না কোনও শিল্পী বাঁচে!
এক রত্তি মহুয়াও প্রেমে পড়ছিল তিলকের।
কিশোরকণ্ঠী তিলক তখন স্টেজে গান গায়। কোনও এক বৈশাখের দখিন হাওয়ার দোলায়, নাকি সেই প্রহর শেষের চৈত্রের রাঙা আলোয় দেখা হয়েছিল, সে আজ সময়ের অতলান্তে হারিয়ে গিয়েছে।
বাড়ির মত ছিল না। এ দিকে বাঁধা পথে চলবার মেয়ে সে যে নয়। সহায় তখন মাটু। জনগণের চোখে যিনি কিনা অভিনেত্রী রত্না ঘোষাল। উজিয়ে এলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণকুমার... আরও অনেকে।
মেয়ের এই সিদ্ধান্ত বাবা মেনে নেননি। কেন নেননি? কেউ বলেন, মেয়ের সামনে তখন প্রসারিত ভবিষ্যৎ। অপরিমেয় কাঞ্চনযোগ। অতি সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষে তার হাতছানি অগ্রাহ্য করা নিশ্চিত কঠিন। এ ছাড়া রঙিন পৃথিবীর কাজল যার চোখে, খ্যাতির মোহপাশ সে বড় সহজে কাটাতে পারে না।
শিপ্রা থেকে মহুয়ার যাত্রাপথের যে আয়োজন স্বহস্তে করেছিলেন, তার ‘ভাগিদার’ মেনে নেওয়া হয়তো’বা সেদিন সম্ভব ছিল না নীলাঞ্জনের।
হার মানলেন জেদি মেয়ের কাছে!
তিলকদের হেদুয়ার পুরনো বাড়ি। তুলনায় সচ্ছল। ব্যাংকের চাকুরে।
শুরুটা ছিল ভারী সোহাগের।
তিলকের দাদা অলোক চক্রবর্তী ওঁদের দুজনকে নিয়ে প্রযোজনা করলেন ‘আনন্দমেলা’।
ছবি চলল না।
কিন্তু মহুয়ার ডাক আসতেই লাগল অন্য পরিচালকদের কাছ থেকে।
দু’জনে মিলে উঠে এল টালিগঞ্জের বাসাবাড়িতে। অল্প বয়স। বায়োস্কোপের পাত্রপাত্রী।
মাঝরাতে বাইকভ্রমণ।
মদ্যপান।
ফুর্তির ফোয়ারা।
এরই মধ্যে এল ফুটফুটে পুত্রসন্তান।
মহুয়ার দিনগুলি
ছবি: চিত্রজিৎ ঘোষ
অসম্পূর্ণ কুড়ি
শিশুশিল্পী হিসেবে বাদশা ছবিতে তিলকের আত্মপ্রকাশ। সুখেন দাস-এর ‘প্রতিশোধ’-এ দু’জনে একসঙ্গে অভিনয় করে।
উত্তমকুমারের বিপরীতে ‘সেই চোখ’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘মাটির স্বর্গ’।
‘হার মানিনি’ উত্তমকুমারের সঙ্গে অসম্পূর্ণ ছবি। কারণ উত্তমকুমারের মৃত্যু।
মহুয়ার হাতে কুড়িটা ছবি ছিল তার অকালপ্রয়াণের সময়।

শেষ শট
শেষ ছবি বীরেশ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘আশীর্বাদ’। চিত্রগ্রাহক শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যামেরা বন্দি করলেন মহুয়ার শেষ শট।
আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফোনে বলছে, ‘‘আমি ভাল নেই, আমি ভাল নেই। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও। সে কি শুধু অভিনয় ছিল?’’
৩ জুলাই-এর পর বাংলাদেশ চলে যাওয়ার কথা। মমতাজ আলমের ‘ঊশীলা’ ছবির নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করবার আয়োজন সম্পূর্ণ। অপেক্ষা শুধু ভিসা পাওয়ার।

সংশয় সন্দেহ আজও
মৃত্যুকালীন জবানবন্দি নেন এনসি বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেণ্ট পুলিশ, সিআইডি এবং এএন  দুবে, ইন্সপেক্টর।
সাক্ষী হিসেবে সই করেন দাদা পিনাকী রায়চৌধুরী এবং সিস্টার ঊষা। উপস্থিত ছিলেন রত্না ঘোষাল।
বহু সংশয়ের নিষ্পত্তি আজও হয় নি। সেই সময়কার সংবাদমাধ্যমে ধরা আছে অগুনতি পরস্পরবিরোধী তথ্য।—
•মাঝরাত অতিক্রান্ত।
বাড়িতে দু’জন পরিচারক। তবু মহুয়া নিজে খাবার বা দুধ গরম করতে গেল  কেন?
•তিলক কিন্তু ডিনারের পরেই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছিল। মহুয়ার কথামতো তার অসাবধানতাবশত যদি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে বাড়িতে চারজন মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও কী করে এমন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল?
•স্টোভ বার্স্টের একটা তত্ত্ব পরিবারের তরফ থেকে বার বার খাড়া করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত কম কেরোসিন ভরা একটি স্টোভ রান্নাঘর থেকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে, যেটা কোনও ভাবে কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে বলে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।
•পিঠে এবং শরীরের আরও কয়েক জায়গায় কালশিটের দাগ পাওয়া যায় যার কোনও সদুত্তর মেলেনি।
•মহুয়ার মুখের ডান দিকে একটা ক্ষতচিহ্নের বিচিত্র ব্যাখ্যা মেলে বাবার কাছে।— কোনও কাপড়ের টুকরো আটকে যায় দুর্ঘটনার সময়, যেটা টেনে তুলতে গেলে মহুয়া ব্লেড দিয়ে কেটে নিতে বলে আর তাতেই নাকি এই বিপত্তি।
প্রায় সত্তরভাগ অগ্নিদগ্ধ মানুষের পক্ষে এ কি সম্ভব?
•রান্নঘর এক রকম অক্ষত। অথচ শোবার ঘরে লেপ তোষক মায় বালিশ পর্যন্ত পোড়া।
নাইটি এবং বিছানায় এত কেরোসিনের গন্ধ কোথা থেকে এসেছিল?
স্টোভ বার্স্ট করলে পিঠ, তলপেট, ঊরু এমন ভয়াবহ দগ্ধ কেন?
•নীলাঞ্জনের মাত্র তিনটি আঙুলের ডগায় সামান্য চোট ছিল। তিলক অক্ষত। শুধুমাত্র খুঁড়িয়ে হাঁটছিল।
অনেকেই মনে করেছিলেন, অমন মারাত্মক আগুন থেকে বাঁচাতে গেলে এ এক রকম অসম্ভব।
•পরিবারের তরফ থেকে কোনও এফআইআর করা হয়নি। শোনা যায়, তদন্ত চলার কিছুদিনের মধ্যে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধের নির্দেশ আসে!
কিন্তু কেন?
আজও জানা নেই তা’ও।

চূড়ান্ত অভিযোগ
ব্যক্তিগত ভাবে মাধবী চক্রবর্তী জানান মহুয়ার মৃত্যুর অনতিকাল পরে তার বাবা স্মরণসভা আয়োজন করবার প্রস্তাব নিয়ে  তাঁর কাছে আসেন।
মৃত্যুর যথোচিত কারণ না জানা পর্যন্ত এ ধরনের কোনও সভায় তিনি অংশগ্রহণ করবেন না বলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
দশ বছর পর প্রদেশ মহিলা কংগ্রেস আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারীদিবস উপলক্ষে মাধবী চক্রবর্তী তাঁর ভাষণে মহুয়া রায়চৌধুরীকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ তোলেন।
মহুয়ার ফুটবলপ্রীতি ছিল যখন ও শিপ্রা, তখন থেকে।
দাদা যখন মাঠে খেলতে যেত পিছন পিছন সঙ্গ নিত ছোট বোন।
মন দিয়ে খেলা দেখত মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে।
কখনও খেলোয়াড় কম পড়লে নিজেই মাঠে গোল আগলে দাঁড়াত। অন্য দলের এগিয়ে আসা প্লেয়ারদের রীতিমত শির-ফোলানো গলায় শাসাত। —‘‘খবরদার! যদি আমাকে গোল দিয়েছিস। দেখে নেব, পরে।’’
কী দুর্জয় সাহস! টগবগে প্রাণ! কী নিবিড় মনের বেড়। যা আমার, তা আমারই। জীবনে-মরণে, সতে-অসতে আমি তাকে রাখব।
রাখবই রাখব।
ইস্টবেঙ্গল হেরে গেলে মাথা কুটে কাঁদে।
আর তার আবেগের আধার? সে যেন অকুল দরিয়া! অসীম, অনন্ত। যা কিছু আপন, তার জন্য জান কবুল আর মান কবুল।
পেলেকে নিয়ে কসমস ফুটবল দল এল কলকাতায়। মোহনবাগানের সঙ্গে খেলতে।
’৭৭ সাল।
গড়ের মাঠে খেলা হল সেপ্টেম্বরের চব্বিশ। মায়ের জন্মদিনের দিনই ভূমিষ্ঠ হল মহুয়ার ‘গোলা’।
চতুর্দিকের ‘গোল গোল’ আওয়াজের তোড়ের মধ্যে যে মায়ের কোল আলো করল, পাঁড় ফুটবল ভক্ত তার কী নাম দেবে?— ‘গোলা’।
দাদার কীর্তি-তে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে
মহুয়া নায়িকা হয়েও দর্শকের কাছের মানুষ। ওর সাধাসিধে স্বতঃস্ফূর্ত আনাগোনা চলাফেরার মধ্যে একটা আটপৌরেপনা থেকেও কোথায় যেন সে অনন্যা।
তত দিনে তিলক-মহুয়া উঠে এসেছে বেহালায়। সব বিবাদ চুকিয়ে বাবাও এসে বাস করতে শুরু করেছেন মেয়ের ঘরে।
কচি গোলাকে দেখভাল করতে হবে তো! কিন্তু তা’তেও জীবন সুরে বাজল কই!
দুনিয়ার সব আলো তখন মহুয়ার জন্য। আশেপাশের কেউই সেই ছটার ধারেকাছেও নেই।
প্রযোজক ‘অগ্রগামী’ থেকে নির্দেশক নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, তপন সিংহ সবাই ওর কথা ভাবতে শুরু করেছেন।
ওই মায়াময় দুটো চোখ, ঝিকিয়ে ওঠা হাসি, এক ঢাল চুল, ভেসে থাকা এক পানপাতা মুখ।— সবটা মিলে যেন ঠিক মানবী নয়!
খুব লেগেছিল তবু টুঁ শব্দটি করেনি
রঞ্জিত মল্লিক
এখনও মনে পড়ে সে দিনটার কথা।
 মার খেতে খেতে মাটিতে পড়ে গেছে। তবু মুখ থেকে একটা আওয়াজ বেরোয়নি
সুজিত গুহ-র ছবি ‘অভিমান’-এর শ্যুটিং চলছে। ও আর আমি স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকায়। আমি খোঁড়া। অসহায়। খানিকটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকেই দুর্ব্যবহার করি।
একটা দৃশ্যে হাতের ক্রাচ দিয়ে মারতে মারতে ওকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার ডায়লগ ছিল।
শেষ হবার পর সবাই বুঝতে পারল ভয়ংকর লেগেছে ওর। আমি উত্তেজিত হয়ে বেশ জোরেই আঘাত করে ফেলেছি।
শক্ত শট। তাই যাতে রিপিট না হয় সেই জন্য টুঁ শব্দটি করেনি। কী ভীষণ একাগ্রতা!
পর পর বেশ কয়েকটা ছবিতে কাজ করেছি আমি আর মহুয়া। ‘লাল গোলাপ’, ‘অভিমান’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘শত্রু’, ‘শঠে শাঠ্যং’....।
দু’যুগের বেশি কেটে গেছে তবু অরণ্যবালা কপালকুণ্ডলার সরল চাউনি, তার এক্সপ্রেশন— আজও জ্বলজ্বলে আমার কাছে।
আরেকটি দৃশ্যর কথাও কোনও দিন ভোলার নয়।
‘শঠে শাঠ্যং’ ছবিতে বাবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
মুখোমুখি মহুয়া।
দরিদ্র বেকার প্রেমিককে বলে দিতে বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধনীকন্যাকে বিয়ে করবার মতো রোজগার করে তবে যেন আসে।
উত্তরে মহুয়া শুধু একদৃষ্টে তাকিয়েছিল বাবার দিকে!
অস্বীকার, অভিযোগ, ব্যথা এবং প্রতিবাদের ভাষা সব মিলেমিশে সে কী দৃষ্টি।
প্রতিভা না থাকলে, চারপাশকে তীক্ষ্ণ ভাবে দেখার ক্ষমতা না থাকলে অমন জিনিস অভিনয়ে আনা সম্ভব নয়।
(সাক্ষাৎকারভিত্তিক)
প্রথম জীবনে রোগা বলে বাদ পড়েছিল ‘নয়া মিছিল’ থেকে। বুকের মধ্যে সেই তুষের আগুন নিভতে দেয়নি।
তাই পৃথুলা বলে যখন তপন সিংহ ‘আদমি ঔর আউরত’ থেকে বাদ দেবেন বলে ঠিক করলেন, মহুয়া মাত্র তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিল।
যথাসময়ে যখন তপন সিনহা তাকে দেখে, এক রকম অবাক হতেও ভুলে গিয়েছিলেন।
দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জয় করে বৃত্ত যখন সম্পূর্ণ করল, তত দিনে শুধুমাত্র চন্দ্রাভ সে মুখের স্মৃতিভারটুকু রেখে পুরস্কারের পাশে ‘মরণোত্তর’ কথাটুকু বসিয়ে দিয়ে মহুয়া চলে গেছে চিরকালের মতো। সব মায়ার ও পারে। 
তিলক ছিল ছেলেবেলার বন্ধু। ওদের প্রেম কৈশোরের। ভালবাসার অভাব ছিল না। ছিল প্রাত্যহিক বোঝাপড়ার অভাব।
এই জুটিটির পরম বন্ধুর সে দিনের কথা বলতে বসে আজও গলা ধরে আসে।
রত্না ঘোষাল।
বললেন, ‘‘মৌয়ের মনটা ছিল বিরাট। কিন্তু ...।’’
গলায় স্তব্ধতা নেমে আসে।
‘‘মদ মৌ খাবেই আর...।’’ আবারও নিশ্চুপ।
আর?
‘‘আর মদ খেলেই কেমন যেন পালটে যেত। পুরুষ চাই তখন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কী যে করত, কী বলত, কোথায় পৌঁছত, তার কণামাত্র মনে থাকত না। পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শিশুর মতো জিজ্ঞেস করত— ‘সত্যি মাটু আমি এরকম করেছি? কেন করলাম বল তো?’ সেই সরলতা আরোপিত নয়। কার সাধ্য তাকে অস্বীকার করে!’’
তিলককে তবে কি ধরিত্রীর মতো সহনশীল হতে হয়েছিল?
সেই ধৈর্যের রাশ আলগা হয়েই কি দুর্ঘটনা?
কীসের থেকে এই বেপরোয়া জীবনযাপন?
শেকড় ছেঁড়া দোলাচল?
অতি সাধারণ পরিবার থেকে হঠাৎ পাওয়া খ্যাতি, দুরন্ত আবেগ অথচ সাধারণ মেয়ের মতো স্বামী সংসারের আকাঙ্ক্ষার অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলনে পায়ের তলার জমিটা কি বড় নরম হয়ে গেছিল?
নাকি শৈশবে বিকৃতি আর লালসার শিকার হওয়া সংবেদনশীল মনটা রক্তাক্ত হচ্ছিল বারবার?
একাধিকবার মহুয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। মহুয়ার মাধুমা আর মাটু দুজনেরই চোখ সজল হয়ে এল, গলা ধরে এল এ কথা স্বীকার করে নিতে গিয়ে।
এক বুক শূন্যতা থেকে সুরাসক্তি। যে আসক্তি পৃথিবীর কাউকে কোনও সুস্থ জীবন দেয়নি।
গড়পড়তা মাপকাঠিতে এ চরিত্রের তল পাওয়া অসম্ভব।
তা’হলে এ কি শুধুমাত্র এক শিল্পীর অনন্ত খোঁজের তাড়না? অতি তীব্র আবেগের ভার? বঞ্চিত ছেলেবেলার যন্ত্রণাবোধ? নাকি মানসিক রোগ!
নাকি কোনও একটি নয়, সবই আছে একত্রে?
বহমান সময় আর নদীর জল কারও জন্য অপেক্ষা করে না, করেওনি।
নায়িকারা এসেছে, আসছে, আসবেও।
যে দর্শককুল তাঁকে যথাসময়ে পর্দায় দেখেছিলেন তাঁদের বুকের খুব কাছটাতে ওই প্রাণেশ্বরী কেন যেন বড় আলাদা করে নিজের জায়গাটুকু আগলে রেখেছে। এখনও, আজও।
কোনও অবেলায় একলা বসে কেউ বুঝিবা ভাবেন, এই তো সেই মুখ, যাকে দেখে কেবলই মনে হয়—
ওই মেয়েটির কাছে, সন্ধ্যাতারা আছে!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/a-write-up-on-mahua-raychowdhury-1.525146


Saturday, 25 March 2017

মৃণালিনী

$image.name

মৃণালিনী

বিয়ের আগে ছিলেন ভবতারিণী। কেউ বলেন প্রাক্তন বান্ধবীর নামের আদলে পরে তাঁর নাম বদলে দেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রয়াণদিনের ঠিক এক মাস আগে কবিপত্নীর সংক্ষিপ্ত জীবনের মায়াতুর কাহিনি গাঁথছেন নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

২২ অক্টোবর, ২০১৬, ০০:০০:০০
mrinalini
বন্ধুদের নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে ভালবাসতেন রবীন্দ্রনাথ।
তেমনই একদিন খেতে আসতে বলেছেন  বিলেতে একই শিক্ষকের কাছে পড়া প্রিয়বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে। তারপর ভুলেও গিয়েছেন বেমালুম। স্ত্রীকে বন্ধুর কথা বলা তো দূরের কথা, নিজে খেয়েও নিয়েছেন দুপুরের খাবার।
বিশ্রাম নিচ্ছেন। এমন সময় হাজির প্রিয়নাথ সেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন কী ভুলটাই না হয়েছে!
বন্ধুকে আপ্যায়ন করে বসিয়ে পত্নীকে গিয়ে বলে এলেন নিজের ভুলো-মনের কথা।
কবি-পত্নী বন্ধু অতিথিকে বুঝতে দিলেন না কিছুই। কিছুক্ষণ পর যখন দু’জনকে ডেকে নিলেন খেতে বসবার জন্য, রবীন্দ্রনাথ দেখলেন আয়োজনের কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। রবীন্দ্রনাথের ভুলে যাওয়া, কবিপত্নী সহজেই ঢেকে দিলেন নিজের ভালবাসা উজাড় করে  দিয়ে।
রবি-জীবনে মৃণালিনীদেবী ছিলেন এমনই।

বালিকা বধূ ভবতারিণী
কলকাতার অভিজাত, একান্নবর্তী পরিবারের আদরের ছোট ছেলে। তার উপর আবার সুদর্শন এবং প্রতিভাবান। তোড়জোড় হচ্ছিল তাঁর বিয়ের। চলছিল বিয়ের উপযুক্ত কনে দেখাও।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, বিয়ের ব্যাপারে একরকম চাপে পড়েই শেষ পর্যন্ত নিমরাজি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
ঠাকুরবাড়ির নির্বাচকমণ্ডলী অনেক খুঁজেও বিফল হয়ে শেষ পর্যন্ত ঠাকুর এস্টেটের এক কর্মচারীর মেয়ে ভবতারিণীকেই রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী হিসেবে বেছে নিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সেই কনে দেখার দলে ছিলেন কবির দুই বৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী এবং কাদম্বরী, দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ নিজে।
যদিও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁর কনে দেখার দলে ছিলেন কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। নরেন্দ্রপুর গ্রামে জ্ঞানদানন্দিনীর বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে এই দল রবীন্দ্রনাথের জন্য একজন সুন্দরী পাত্রী খুঁজছিলেন। ইন্দিরাদেবী লিখেছেন পিরালী ব্রাম্মণদের আড্ডা ছিল যশোরে। সুন্দরীকূল তত দিনে নাকি উজাড় হয়ে গিয়েছিল ওখানে। অনেক খুঁজে পাওয়া গেল নাবালিকা ভবতারিণীকে।
অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলায় দক্ষিণডিহির ফুলতলা গ্রামে বেণীমাধব রায়চৌধুরী আর দাক্ষায়ণীর মেয়ে ভবতারিণী যখন রবীন্দ্রনাথকে বিয়ে করতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এলেন, তখন তাঁর বয়েস সবে নয়। আর রবীন্দ্রনাথের বাইশ। অনুমানের উপর নির্ভর করে  মৃণালিনীর জন্ম ১৮৭৪ –এর ১ মার্চ ধরা হয়।

বান্ধবীর নামের ছায়ায় মৃণালিনী
গ্রামের পাঠশালায় প্রথম বর্গ পর্যন্ত পড়া শেষ করে এসেছিলেন ভবতারিণী।
ফুলতলায় গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বিয়ে করতে হয়নি। কিন্তু বিয়ে করতে কোন মেয়ে আবার তার শ্বশুর বাড়ি আসে?
সবই ঠাকুরবাড়ির কেন্দ্রে সূর্যের মতো জেগে থাকা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ইচ্ছে।
তাঁর নির্দেশেই কলকাতায় জোড়াসাঁকোর মহর্ষিভবনে এসে ব্রাহ্মমতে রবীন্দ্রনাথকে বিয়ে করলেন ভবতারিণী।
এর পর তাঁর নামটাও গেল বদলে। ‘ভবতারিণী’-কে ‘মৃণালিনী’ করে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। কেউ কেউ বলেছেন  নিজের নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই নাকি রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন এই নাম।
অনেকে আবার ধরে নিয়েছেন কৈশোরে মনের গভীর দাগকাটা মরাঠি বান্ধবী আনা তড়খড়কে দেওয়া তাঁর নাম ‘নলিনী’র ছায়ায় রবীন্দ্রনাথ নববধূর নাম রেখেছিলেন মৃণালিনী।
মৃণালিনী আর রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসরের বর্ণনা লিখে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলের স্ত্রী হেমলতা ঠাকুর।
মহর্ষি তখন হিমালয়ে। খুবই ঘরোয়া আর অনাড়ম্বর ভাবে তাঁদের বিয়ে হল। ঠাকুরবাড়ির বিয়েতে একটা বেনারসি শাল গায়ে দেবার চল ছিল। রবীন্দ্রনাথ সেটিই গায়ে দিলেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ের ঘরে এলেন। ব্যাপারটা এমন যেন অনেক দূর থেকে অনেক ঘুরে বর এলেন কনেকে নিয়ে যেতে।
পিঁড়ির উপর দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথকে বরণ করা হল। কনেকে সাতপাক ঘুরিয়ে করা হল সম্প্রদান। এই ছোট্ট অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়েই ১২৯০ -এর চব্বিশে অগ্রহায়ণ, ইংরেজি ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ মৃণালিনী এলেন রবীন্দ্রনাথের জীবনে। মৃণালিনী জীবিত ছিলেন ঊনত্রিশ বছর। তাঁদের ব্যস্ত, অভাবী বিবাহিত জীবন ছিল উনিশ বছরের।

ছিলেন লাবণ্যে অপরূপা
মৃণালিনী ছিলেন গভীর ব্যক্তিত্বময়ী, সুদর্শনা। নানা বর্ণনা থেকে জানা যায় তাঁর গায়ের রং ছিল একটু চাপা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রূপসী ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় কেন যে লিখেছিলেন তাঁর ‘গুণবান, রূপবান, ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান’ রবিকাকার স্ত্রী মৃণালিনী ‘দেখতে ভাল ছিলেন না’, তা আন্দাজ করা কঠিন।
শুধু ইন্দিরাদেবীই নন, ঊর্মিলাদেবীও তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী, সেরকম তো ভাল দেখতে নন’। তারপর ভাল করে দেখে তিনিই আবার লিখেছেন, ‘‘... এক অপরূপ লাবণ্যে সমস্ত মুখখানা যেন ঢলঢল করছে, আর একটা মাতৃত্বের আভায় যেন মুখখানা উজ্জ্বল। একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে হয়।’’
আসলে ঊর্মিলাদেবী শুনেছিলেন ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সব অপ্সরার মতো, ‘‘তাঁরা দুধ দিয়ে স্নান করেন, ক্ষীর সর ছানা বেটে রূপটান মাখেন— কত গয়না, কত কাপড় যে আটপৌরে পরেন তার ঠিক নেই।’’
সে দিক থেকে একেবারে আড়ম্বরহীন থাকতেন বলেই সম্ভবত মৃণালিনীর চটক ছিল কম।

বাসরে গান জুড়লেন রবীন্দ্রনাথ
ফিরে আসা যাক মৃণালিনীদেবীর বিয়ের গল্পে। বিয়ের বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন দুষ্টুমি।
ভাঁড়-কুলো খেলায় ভাঁড়ের চাল ঢেলে আবার ভাঁড় ভর্তি করে ফেলাই যেখানে নিয়ম, রবীন্দ্রনাথ সেখানে উল্টে দিলেন সব ভাঁড়। জিজ্ঞেস করলে ছোট কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরীদেবীকে বললেন, ‘সব যে উলট পালট হয়ে যাচ্ছে--কাজেই ভাঁড়গুলো উল্টে দিচ্ছি।’ এর পর বাসরে দরাজ গলায় মৃণালিনীর দিকে তাকিয়ে গান ধরলেন  রবীন্দ্রনাথ: ‘আ মরি লাবণ্যময়ী/ কে ও স্থির সৌদামিনী,/ পূর্ণিমা-জোছনা দিয়ে/ মার্জিত বদনখানি!/ নেহারিয়া রূপ হায়,/ আঁখি না ফিরিতে চায়,/ অপ্সরা কি বিদ্যাধরী/ কে রূপসী নাহি জানি।’
লজ্জায় ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে রইলেন মৃণালিনী।
বিয়ের খুঁটিনাটি ব্যবস্থা করেছিলেন মহর্ষি স্বয়ং। ঠাকুরবাড়ির কর্মচারী সদানন্দ মজুমদারকে দিয়ে কনের আর কনের আত্মীয়স্বজনের বাড়ি পাঠিয়েছিলেন নানারকম আশীর্বাদী মিষ্টি আর খেলনা।
বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র বন্ধুদের নিজে হাতে লিখে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কত জনকে পাঠিয়েছিলেন জানা যায় না। তবে প্রিয়নাথ সেনকে লেখা নিমন্ত্রণপত্রের খোঁজ পাওয়া যায় যেখানে মজা করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আগামী রবিবার ২৪শে অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক।’ এই চিঠির উপরে ছাপা ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের একটি পঙ‌্ক্তি: ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়’।


ইংরেজি শেখালেন মহর্ষি
ছেলের বিয়ে দিয়েই অপরিণত পুত্রবধূকে ঘরসংসার সামলানোর কাজে ব্যস্ত করে তোলেননি মহর্ষি। মহর্ষি খুবই স্নেহ করতেন তাঁর ছোট পুত্রবধূটিকে।
বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথের দাদা হেমেন্দ্রনাথের স্ত্রী নীপময়ীদেবী ক্ষীণতনু মৃণালিনীর শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের উন্নতির ভার নিলেন। মৃণালিনীকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে মহর্ষি তাঁকে ভর্তি করলেন কলকাতার লরেটো হাউসে। কিনে দিলেন স্লেট, বইপত্র। তৈরি হল মৃণালিনীর স্কুলের যাবার পোশাক।
এই সবই জানা যায় ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা থেকে।
একবছর লোরেটোতে পড়াশোনা করেন মৃণালিনী। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতে এর পর বাড়িতেই পণ্ডিত হেরম্বচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে সংস্কৃত শেখার ব্যবস্থা হয় তাঁর।
১৮৮৬-র ২৫ অক্টোবর জন্ম হল বেলা অর্থাৎ মাধুরীলতার— মৃণালিনী আর রবীন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান। একটা ছবিতে দেখা যায় বেলাকে কোলে নিয়ে সামান্য উঁচু এক আসনে বসে আছেন মৃণালিনী। পাশে মুগ্ধ বিস্ময়ে নবজাতকের দিকে তাকিয়ে স্থির রবীন্দ্রনাথ। মহর্ষিকে খুবই সমীহ করতেন মৃণালিনী।
ঊর্মিলাদেবী লিখেছেন, মহর্ষি পছন্দ করেন না এমন কোনও কাজ করতে চাইতেন না মৃণালিনী। কখনও তর্ক করে রবীন্দ্রনাথকেও বলতেন, ‘বাবামশায় থাকলে তুমি এ কাজ করতে পারতে?’ তাঁর লেখা থেকেই জানা যায় রবীন্দ্রনাথের উপর অখণ্ড প্রতাপ ছিল অভিমানিনী মৃণালিনীর। আর স্ত্রীয়ের মানভঞ্জনের জন্য বেশ বেগ পেতে হতো রবীন্দ্রনাথকে। একটু ভয়ও পেতেন মৃণালিনীকে।

পড়তেন বাংলা, ইংরেজি আর সংস্কৃত
ভাশুর বীরেন্দ্রনাথের ছেলে বলেন্দ্রনাথের মাধ্যমেও ইংরেজি, বাংলা আর সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন মৃণালিনী। ছিলেন মার্ক টোয়েনের অনুরাগিণী। কন্যা মাধুরীলতার চিঠিতে দেখা যায় কখনও সমস্ত দিন বই পড়তে পড়তে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে উঠতে পারছেন না মৃণালিনী।
ছোট মেয়ে মীরার স্মৃতিকথায় পাওয়া যায় মৃণালিনীর বইপড়ার এই ছবি: ‘শান্তিনিকেতনের দোতলার গাড়িবারান্দার ছাতে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। মার হাতে একটা ইংরেজি নভেল। তার থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিদিমাকে পড়ে শোনাচ্ছেন।’’
কয়েক পৃষ্ঠা মহাভারতের শান্তিপর্বের, ঈশপোনিষদ, কঠোপনিষদের অনুবাদ অভ্যাস করা মৃণালিনীর একটা খাতা দেখা যায় বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে। সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ চর্চার পাশাপাশি ঠাকুরবাড়ির নাটকের দলেও সক্রিয় ছিলেন মৃণালিনী।
‘রাজা ও রানী’ নাটক প্রথমবার মঞ্চস্থ হলে নারায়ণীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। সাহিত্যে আগ্রহ থাকলেও চিঠি আর সামান্য কিছু অনুবাদের খসড়া ছাড়া মৃণালিনী প্রায় লিখে যাননি কিছুই।
শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারীদেবী মৃণালিনীকে তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন যে যাঁর স্বামী বাংলার এক শ্রেষ্ঠ লেখক তাঁর আর নিজের লেখার কী প্রয়োজন!

থিতু হননি এক ঠিকানায়
বিয়ের পর একটি মাত্র ঠিকানায় থিতু হতে পারেননি মৃণালিনী। কলকাতা, শিলাইদহ, সোলাপুর আর শান্তিনিকেতনে বারবার বাসা বদল করেছেন।
বিয়ের পাঁচ বছর পর রবীন্দ্রনাথ আর শিশুকন্যা বেলার সঙ্গে গাজিপুরেও কিছু দিন ছিলেন মৃণালিনী।
পশ্চিমভারতের গাজীপুরে গোলাপবাগানের টানে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বলা যায় সেটাই ছিল তাঁদের মধুচন্দ্রিমা!
বৈশাখ থেকে আষাঢ়ের মধ্যে সেখানেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন আঠাশটি কবিতা। এই আঠাশটা কবিতা ছাপা হয়েছিল তাঁর ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থে।
মৃণালিনীর সঙ্গে গাজীপুরে এসেই রবীন্দ্রনাথ হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর প্রিয় বৌঠান কাদম্বরীর উপহার দেওয়া সোনার এক আংটি।
বিয়ের প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় জমিদারি দেখাশোনার কাজে রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহে পাঠিয়ে দিলেন মহর্ষি। সে বারও সঙ্গে মৃণালিনী। আর দুই শিশু সন্তান মাধুরীলতা আর রথীন্দ্রনাথ।
মাঝে মাঝে সপরিবার থাকতেন ‘পদ্মা’ বোটে, নদীতে ভেসে ভেসে। এক দিকে নাগাড়ে স্থানবদল। অন্য দিকে কোলে আসতে লাগল সন্তানরা।
১৮৮৮-তে রথীর পর ১৮৯১-এ জন্ম হল মেজো মেয়ে রেণুকার। ১৮৯৪-এ ছোট মেয়ে মীরা। আর ১৮৯৬-এ ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের।
১৮৯১-এ রবীন্দ্রনাথ, বেলা, রথী আর রেণুকাকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম শান্তিনিকেতনে এসে এলাকার আদি বাড়ি শান্তিনিকেতন গৃহের দোতলায় কবিপত্নী ছিলেন কিছু দিন।
এর পর বিভিন্ন পর্যায়ে ১৯০২ সাল অবধি সব মিলিয়ে প্রায় সাত বার মৃণালিনী নানা কারণে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন বলে অনুমান করা  যায়।
খাতার সেই শেষ মলাট

চিঠিতেই স্পষ্ট সম্পর্কের গভীরতা
মৃণালিনীকে চিঠি লিখতে উৎসাহ দিতেন রবীন্দ্রনাথ। আর অধীর হয়ে অপেক্ষা করতেন তাঁর চিঠি পাবার জন্য।
মৃণালিনী ছিলেন অভিমানী। সম্ভবত লিখতেন অনেক কম। মৃণালিনীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি পাওয়া গেছে ছত্রিশটি।
রবীন্দ্রনাথকে লেখা মৃণালিনীর দুটোর বেশি চিঠির খোঁজ পাওয়া যায় না।
শিলাইদহ, কালিগ্রাম, কুষ্টিয়া, শান্তিনিকেতন, মজফ্ফরপুর, এলাহাবাদ, কলকাতা, সাহাজাদপুর থেকে প্রতিদিনের নানা খুঁটিনাটি জানিয়ে, পরিবারের নানা কথা জানতে চেয়ে মৃণালিনীকে সুন্দর সুন্দর সব চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ।
দ্বিতীয়বার বিলেত যাবার পথে ২৯ অগস্ট ১৮৯০-এ এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীকে লিখেছিলেন একটা স্বপ্নের কথা।
সেখানে দেখা যাচ্ছে, কবির ‘আত্মা’ যেন শরীর ছেড়ে বেরিয়ে জোড়াসাঁকোয় পৌঁছে যাচ্ছে, তাঁর স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ের কাছে।
লিখেছিলেন—
‘একটা বড় খাটে একধারে তুমি আর বেলি শুয়ে রয়েছ আর তোমার পাশে খোকা শুয়ে।
আমি তোমাকে একটু আধটু আদর করলুম আর বল্লুম ছোট বৌ মনে রেখো আজ রবিবার রাত্তিরে শরীর ছেড়ে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করে গেলুম। বিলেত থেকে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করব তুমি আমাকে দেখতে পেয়েছিলে কিনা।’ 
আইফেল টাওয়ারের ছবি ছাপা পোস্টকার্ডে ১৮৯০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ছেলেদের ‘হামি’ পাঠিয়ে মৃণালিনীকে লিখেছেন, ‘ভাই ছোট বৌ— আমরা ইফেল টাউয়ার বলে খুব একটা উঁচু লৌহস্তম্ভের উপর উঠে তোমাকে একটা চিঠি পাঠালুম। আজ ভোরে প্যারিস এসেছি। লন্ডনে গিয়ে চিঠি লিখব।’
এই চিঠির তিন দিন আগে ৬ সেপ্টেম্বর ম্যাসালিয়া জাহাজে দূর থেকে ইউরোপের ডাঙা দেখতে দেখতে ছোট গিন্নি-কে লিখছেন, ‘সমুদ্রের ঠিক ধারেই নীল পাহাড়ের কোলের মধ্যে সাদা শহরটি বেশ দেখাচ্চে। তোমার দেখতে ইচ্ছে করচে না ছুটকি? তোমাকেও একদিন এই পথ দিয়ে আসতে হবে তা জান? তা মনে করে তোমার খুসি হয় না?’ 
সুদূর প্রবাসে সাহাজাদপুরে একমাস পূর্ণ করে রবীন্দ্রনাথ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন মৃণালিনীর ছবি। ২০ জুন ১৮৯১-এর চিঠিতে ‘ছুটি’ অর্থাৎ মৃণালিনীকে তাঁর ‘রবি’ লিখছেন, ‘আমার খুব সন্দেহ হচ্চে তুমি সেই কেদারাটার উপর পা ছড়িয়ে বসে একটু একটু করে পা দোলাতে দোলাতে দিবি (দিব্যি) আরামে নভেল পড়চ। তোমার যে মাথা ধরত এখন কি রকম আছে?’
মৃণালিনীর চিঠির কতটা আন্তরিক প্রত্যাশী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ তা বোঝা যায় বেশ কয়েকটা চিঠিতে।
একবার অনেক অভিমান করে রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীকে লিখলেন, উত্তর না পেলে আর তিনি চিঠি লিখবেন না তাঁকে।
লিখলেন, ‘এখন আমার ক্রমশঃ বিশ্বাস হয়ে আসচে তোমার কাছে আমার চিঠির কোন মূল্য নেই এবং তুমি আমাকে দু ছত্র চিঠি লিখতে কিছুমাত্র কেয়ার কর না।’
আর একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘যেমনি গাল দিয়েছি অমনি চিঠির উত্তর এসে উপস্থিত।’

ছিল এলোঝেলো, হল পরিবন্ধ
রবীন্দ্রনাথ যেমন ছিলেন ভোজন রসিক, মৃণালিনী তেমনই ছিলেন রান্নায় পটু।
মৃণালিনীকে নিয়ে সামান্য যে কয়েকটা স্মৃতিকথা লেখা হয়েছে, তার মধ্যে বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে মৃণালিনীর রান্নার গল্প।
রবীন্দ্রনাথের প্রিয়পাত্র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে আসতেন প্রায়ই।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই মৃণালিনীকে বলতেন, ‘কাকিমা, বড় ক্ষিদে পেয়েছে।’
হাসিমুখে পাত্র-ভরা খাবার চিত্তরঞ্জনের সামনে সাজিয়ে দিতেন মৃণালিনী।
স্ত্রীকে নিত্য নতুন রান্নার ফরমায়েশ করতেন রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহে মাঝেমাঝেই যেতেন কবির বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসু আর নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়।
তাঁরা কখনও আবার থাকতেন পদ্মা বোটে।  কথামতো একবার  পদ্মাবোটে নাটোরের মহারাজার জন্য মৃণালিনীকে দিয়ে প্রতিদিন একটা না একটা নতুন রান্না করাতেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের উদ্ভাবন করা সেইসব রান্নার উপকরণ আর পদ্ধতি মৃণালিনী লিখে রাখতেন একটি খাতায়। মাধুরীলতার মৃত্যুর পর হারিয়ে যায় সেই খাতা!
শান্তিনিকেতন গৃহে মৃণালিনীর রান্না করার বর্ণনা দিয়ে কন্যা মীরাদেবী লিখেছেন, ‘... সরু এক-ফালি বারান্দায় একটা তোলা উনুনে মোড়ায় বসে মা রান্না করছেন, তাঁর পিঠটা শুধু দেখা যাচ্ছে।’
নানা রকম মিষ্টি রবীন্দ্রনাথের জন্য তৈরি করতেন মৃণালিনী। তাঁর হাতের দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিষ্টি, চিঁড়ের পুলি ছিল বিখ্যাত।
একবার মৃণালিনীকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মানকচুর জিলিপিও বানিয়েছিলেন। কবির ফরমায়েশ শুনে প্রথমে হেসে খুব আপত্তি করেছিলেন কবি-পত্নী। তারপর সত্যি সত্যি তৈরি করে ফেললে দেখা গেল তাঁর হাতের গুণে উতরে গিয়েছে সে-জিলিপিও।
মৃণালিনী রান্না করছেন আর পাশে একটা মোড়ায় বসে রবীন্দ্রনাথ নতুন রান্নার ফরমায়েশ করছেন, কখনও মাল-মশলা দিয়ে শিখিয়ে দিচ্ছেন নতুন প্রণালীতে কোনও রান্না—স্মৃতিকথনে পাওয়া যায় এমন ছবিও। রথীন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, শান্তিনিকেতন গৃহে দোতলার বারান্দার এক কোণে তিনি এক উনুন পেতে নিয়েছিলেন। আশ্রমে ছুটির দিনে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতেন ছেলেমেয়েদের।
মৃণালিনীর হাতের রান্নার যেমন ভক্ত ছিলেন কবি, তেমন তাঁর তৈরি খাবারের নামও বদলে দিয়েছেন, এমনও হয়েছে। একদিন রবীন্দ্রনাথকে একটা মিষ্টি তৈরি করে খাওয়ালেন মৃণালিনী। ওই মিষ্টির নাম  বাঙাল ভাষায় ‘এলোঝেলো’ শুনে নাক সিঁটকোলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর তার নাম রাখলেন ‘পরিবন্ধ’।

সাজতে লজ্জা পেতেন কবির সামনে
একেবারেই সাধারণ সাজগোজে থাকতেন মৃণালিনী। খুব বেশি সাজগোজ পছন্দ করতেন না রবীন্দ্রনাথ নিজেও।
সম্ভবত তাই তাঁর সামনে গয়নাগাটি পরতেও লজ্জা পেতেন মৃণালিনী। হেমলতা ঠাকুর লিখেছেন, একদিন তাঁদের ধরাধরিতে দুই কানে দুই দুল ঝোলানো বীরবৌলি পরেছিলেন মৃণালিনী। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ এসে পড়ায় দুই হাত চাপা দিয়ে আড়াল করে ফেললেন দুল। সমবয়েসি বাড়ির বৌদের সাজতে বলেও মৃণালিনী নিজে থাকতেন অতি সাধারণভাবে।
তবে তাঁর হয়ত ইচ্ছে হতো রবীন্দ্রনাথকে একটু সাজিয়ে দেবার। স্বামীর জন্য তাঁর জন্মদিনে একবার সাধ করে গড়িয়ে আনলেন সোনার বোতাম।
রবীন্দ্রনাথ দেখে বললেন, ‘ছি ছি ছি, পুরুষে কখনো সোনা পরে-- লজ্জার কথা!’
শুনে, মৃণালিনী সেই বোতাম ভেঙে  ওপাল বসানো বোতাম গড়িয়ে দিলেন। আর প্রায় দায়ে পড়ে সেই বোতাম কিছু দিন ব্যবহার করলেন রবীন্দ্রনাথ।
আর একবার, বিয়ের তিন মাস পর, কলকাতা জাদুঘরের প্রথম প্রদর্শনী দেখতে অন্যদের সঙ্গে যাবেন মৃণালিনী। পরেছেন বাসন্তী রঙের জমিতে লাল ফিতের উপর জরির কাজ করা পাড় বসানো একটা শাড়ি। হাতে একটা পাত্রে মিষ্টি খেতে খেতে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথ। সুন্দর সাজে মৃণালিনীকে দেখে তারপর চড়া সুরে গেয়ে উঠলেন, ‘হৃদয়কাননে ফুল ফোটাও,/ আধো নয়নে সখি, চাও চাও!’


হারিয়ে গেলেন বালি-সমুদ্রে
১৮৯৮ সালের ৩ অগস্ট পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে পাকাপাকি ভাবে জোড়াসাঁকো থেকে শিলাইদহে বসবাসের জন্য গেলেন মৃণালিনী। গৃহবিদ্যালয় খুলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখানোয় সেখানে যেমন মন দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে ঘরের কাজ শিখিয়েছিলেন মৃণালিনী।
রবিবার বাড়ির কাজের লোকদের ছুটি দিতেন তিনি। কাজেই বাড়ির কাজে সেদিন হাত লাগাতে হতো সকলকে। রবীন্দ্রনাথ যেমন দুর্বল ছিলেন তাঁর দরিদ্র প্রজাদের প্রতি, গরিব মানুষ সাহায্যপ্রার্থী হলে তাঁকে ফেরাতে পারতেন না মৃণালিনীও।
এভাবেই রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতেই শিলাইদহে এক দরিদ্র পঞ্জাবি মূলা সিংহকে মাসিক পনেরো টাকা মাইনেতে বাড়ির দারোয়ানের চাকরি দিয়েছিলেন মৃণালিনী। ঠাকুর এস্টেটের স্বল্পবেতনভোগী আমলা আর কর্মীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে খুলে দিয়েছিলেন একটি মেস। কুঠিবাড়িতেই নিজে করেছিলেন শাক সবজির বাগান।
বলেন্দ্রনাথকে খুবই স্নেহ করতেন মৃণালিনী। শিলাইদহে একবার বলেন্দ্রনাথ আর এক সহচরীকে নিয়ে প্রকৃতি আর পাখির চানে পদ্মার বালি-সমুদ্রের গভীরে হারিয়ে যান মৃণালিনী।
বহু চেষ্টার পর একদল মৎস্যজীবীর কল্যাণে তাঁরা ফেরার পথ খুঁজে পান। পদ্মার বোটে কখনও সন্ধে হলেই সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুর বাঁধতেন এস্রাজে। পালা করে গান গাইতেন রবীন্দ্রনাথ, চিত্তরঞ্জন দাশের বোনঅমলা। শিলাইদহে মৃণালিনীর দুই প্রিয়পাত্র বলেন্দ্রনাথ ও নীতিন্দ্রনাথের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক পেয়েছিলেন  কবি-পত্নী। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরই আর শিলাইদহে থাকতে চাননি মৃণালিনী। চলে আসেন প্রথমে কলকাতায়। তারপরে শান্তিনিকেতনের নির্জনতায়।
দুই মেয়ের বিয়ে দেখে গিয়েছিলেন
বিয়ের পরই মৃণালিনীকে দেখতে হয়েছিল কাদম্বরী দেবীর অস্বাভাবিক মৃত্যু। সম্ভবত নীরবেই তিনি সামলেছিলেন স্বামীর প্রিয়বৌঠানের অপমৃত্যুর গভীর সেই শোক।
রবীন্দ্রনাথের মতো নিজের সন্তানদের মৃত্যু অবশ্য দেখে যেতে হয়নি মৃণালিনীকে।
বড় মেয়ে বেলা আর মধ্যম কন্যা রেণুকার বিয়ে দেখে যেতে পেরেছিলেন।
কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী পণ নিয়ে ছেলে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন পনেরো বছরের কন্যা মাধুরীলতার।
পণ নিয়ে পাত্রপক্ষের রীতিমতো দর কষাকষিতে বিরক্ত হয়েছিলেন মৃণালিনী। বিয়ের আগে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর দশ হাজার পাঁচ টাকা যৌতুক দিয়ে বরকে আশীর্বাদ করেছিলেন মহর্ষি।
বেলার বিয়ে হয়েছিল ১৯০১-এর ১৫ জুন। আর সেবছরই ৯ অগস্ট তিনদিনের ব্যবস্থাপনায় বিলেতযাত্রী সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে রেণুকার বিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। অতি কোমল স্বভাবের রেণুকার বয়েস তখন সাড়ে এগারো বছর। স্বামীর হঠাৎ খেয়ালে ঠিক করে আসা মেয়ের বিয়ের খবর জেনে অবাক হলেও বিয়েতে অমত করেননি মৃণালিনী। নিজের জীবদ্দশায় তাঁকে দেখে যেতে হয়নি এই দুই বিয়ের করুণ পরিণতি।

 
রবিপ্রিয়া

আশ্রমের জন্য বেচলেন গায়ের গয়না
মূলত নিজের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতেই পূর্ববঙ্গ ছেড়ে শান্তিনিকেতনে খোলামেলা প্রকৃতির মধ্যে শাসন আর প্রথার সীমানাবিহীন এক বিদ্যালয় খুললেন রবীন্দ্রনাথ।
১৯০২ সালে তারই সূচনা হল ব্রহ্মচর্যাশ্রম হিসেবে।
জুটে গেল পরিবারের বাইরে থেকে আসা জনাকয়েক ছাত্রও।
কলকাতার শহর আর বিশাল ইমারত ছেড়ে মৃণালিনী গিয়ে উঠলেন রুক্ষ বীরভূমে শান্তিনিকেতনের অতিথিনিবাসে।
আশ্রম বিদ্যালয় গড়ে তুলতে হাত মেলালেন স্বামীর সঙ্গেই। রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয় নিয়ে নিজের বাড়ির লোকেদের থেকে অনেক বিদ্রুপ আর বিরুদ্ধতা সহ্য করতে হয়েছিল মৃণালিনীকে। তবু বিদ্যালয়ের কাজে যখনই অর্থের অভাব দেখা দিয়েছে, নিজের গায়ের গয়না বিক্রি করে রবীন্দ্রনাথকে টাকা এনে দিয়েছেন মৃণালিনী। রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, এইভাবে ‘শেষপর্যন্ত হাতে সামান্য কয়েকগাছা চুড়ি ও গলায় একটি চেন ছাড়া তাঁর কোনো গয়না অবশিষ্ট ছিল না। মা পেয়েছিলেন প্রচুর, বিবাহের যৌতুক ছাড়াও শাশুড়ির পুরানো আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের খরচ জোগাতে সব অন্তর্ধান হল।’
রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেয় অন্য ছাত্রদের সঙ্গে রথীন্দ্রনাথও তখন থাকতেন আশ্রমের ছাত্রাবাসে।
ছেলেকে নিজে রেঁধে খাওয়াতে পারেন না বলে মন খারাপ হত মৃণালিনীর।
আশ্রমে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বুধবার। সেইদিন রথী আর অন্য সমস্ত ছাত্রকে বাড়িতে ডেকে নিজে রেঁধে খাওয়াতেন মৃণালিনী। তারা নাকি ‘লুঠ’ করে নিয়ে যেত ভাঁড়ার ঘরে আলমারির যাবতীয় খাবার।
 
শেষ যেন এক চিঠির গল্প
২৯ অগস্ট। ১৮৯০। প্রবাস যাত্রায়  জাহাজ থেকে মৃণালিনীকে একটা চিঠিতে মা হারা দু-তিনজন ছোট মেয়ে আর তার অসহায় বাবার গল্প শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন, ‘আমাদের জাহাজে দুটো তিনটে ছোট ছোট মেয়ে আছে-- তাদের মা মরে গেছে, বাপের সঙ্গে বিলেত যাচ্চে। বেচারাদের দেখে আমার বড় মায়া করে। তাদের বাপটা সর্বদা তাদের কাছে কাছে নিয়ে বেড়াচ্চে...।’
চলতি পথের এই বিষাদগাথা যে একদিন তাঁর নিজের জীবনেরই গল্প হয়ে উঠবে সম্ভবত স্বপ্নেও তা কল্পনা করেননি রবীন্দ্রনাথ। ১৯০২-এর মাঝামাঝি এতই অসুস্থ হয়ে উঠলেন মৃণালিনী, যে ১২ সেপ্টেম্বর তাঁকে নিয়ে যেতে হল কলকাতায়।
প্রায় দুই মাস তাঁর নিরলস সেবা করলেন রবীন্দ্রনাথ। অসুখ ধরা না পড়ায় হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা হল। শেষ রক্ষা হল না তাতেও। লালবাড়ির এক কোনায় মৃণালিনীর ঘরে তাঁকে রাতদিন পাখার বাতাস করতেন রবীন্দ্রনাথ।
রেলপথে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়, শান্তিনিকেতন থেকে তার সঙ্গে সেদিন রথীন্দ্রনাথ ছাড়াও সম্ভবত ছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রথীন্দ্রনাথ লিখে রেখেছেন মৃণালিনীর শান্তিনিকেতন থেকে সেই শেষ যাত্রার বর্ণনা। মা শুয়ে আছেন,তাঁর পাশে বসে রথীন্দ্রনাথ দেখছেন তালগাছের শ্রেণি, বুনো খেজুরের ঝোঁপ, বাঁশঝাড়ে ঘেরা গ্রামের পর গ্রাম, মোষের পিঠে বসা শিশু। একসময় চোখে পড়ল মাঠের মাঝে অর্ধেক বোজা এক পুকুর। তার ভিতর ফুটে আছে অসংখ্য সাদা পদ্ম। রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দেখে এতো ভালো লাগল, মাকে ডেকে দেখালুম. তারপর কত বছর গেছে, প্রতিবারই বোলপুর-কলকাতা যাতায়াতের সময় সেই পদ্মপুকুর দেখার চেষ্টা করি— কেবল দেখতে পাই--পুকুরে জল নেই, মাটি ভরে মাঠের সঙ্গে পুকুর সমান হয়ে গেছে, পদ্ম সেখানে আর ফোটে না।
১৯০২-এর ২৩ নভেম্বর  সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রাত্রে চলে গেলেন কবিপত্নী মৃণালিনী।
সারাটা রাত ছাদে একা পায়চারি করে কাটালেন রবীন্দ্রনাথ। বলে গেলেন কাউকে তাঁর কাছে না যেতে। নিভে গেল জোড়াসাঁকোর লালবাড়িতে মৃণালিনীর ঘরের সব আলো। রইলেন এক আকুল কবি আর মা-হারা তাঁর পাঁচটি ছেলেমেয়ে। ভিড়ে, আদরের আড়ালে আর রইল নিজের অনুবাদের খাতার শেষ মলাটে দেবনাগরী অক্ষরে মৃণালিনীর নিজের হাতে লিখে রাখা,  অনিঃশেষ ভালবাসা আর বেদনায় ভেজা এক কবির সংসারের সাতটি তারার নাম।


ঋণ:মৃণালিনী দেবী (রবীন্দ্রভবন কর্তৃক সংকলিত), মৃণালিনী দেবী: রবীন্দ্র কাব্যে ও জীবনে
(প্রজ্ঞাপারমিতা বড়ুয়া), চিঠিপত্র : প্রথম খণ্ড (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ (পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়), মর্মের গেহিনী কবিপত্নী মৃণালিনী (সবুজকলি সেন)

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/mrinalini-1.499542