Saturday, 25 March 2017

ফিরে কেন এলে না... (On Begam Akhtar)

$image.name

ফিরে কেন এলে না...

এ যেন তাঁর গান নয়, শ্রোতার অনুচ্চারিত হাহাকার। কাল বেগম আখতারের মৃত্যুদিন। কী ভাবে আজও তিনি বেঁচে স্মৃতিতে, লিখছেন কৃশানু ভট্টাচার্য

২৯ অক্টোবর, ২০১৬, ০০:০০:০০
singers
আখতারি বাঈ এখনও ঝকঝকে স্মৃতি হয়ে ভাসেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মনে।
‘‘কত বছর আগের কথা। অথচ মনে হয়, এই তো সে দিনের ঘটনা।”
মেগাফোন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জে এন ঘোয তখন অসুস্থ।
তাঁর প্রিয় ‘বড়িবাবা’-কে দেখতে এক সন্ধ্যায় গড়িয়াহাটের হিন্দুস্তান রোডের বাড়িতে এসেছিলেন বেগম আখতার।
‘‘সৌজন্য সাক্ষাৎকারের পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে আখতারি বাঈ সে দিন গান গাইতে চাইলেন।’’
বছর দুই আগে মহাত্মা গাঁধী রোডে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির অফিস ঘরে বসে সে দিনের স্মৃতিচারণ করছিলেন কর্ণধার অমলকুমার ঘোষ।
সম্পর্কে যিনি প্রয়াত জে এন ঘোষের ভাইপো এবং প্রয়াত ডি এন ঘোষের কনিষ্ঠ পুত্র।
বলছিলেন, ‘‘তখন আমার বয়স ১৮-২০।  কিন্তু আজও ভুলিনি গানবাজনার সেই আসর।’’
নিতান্তই ঘরোয়া এক আসর। কিন্তু তবলা আর তানপুরায় সঙ্গত করবেন কে?
তার ব্যবস্থাও হয়ে গেল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ফিরে গেলেন ফেলে আসা দিনের টানে।
“আমি ছাড়া শ্যামল মিত্র আর সুরকার রবীন চট্টোপাধায়ও সে দিন হাজির সেখানে। দিদি (বেগম আখতার) আমাকে তানপুরা বাঁধতে বললেন। আমি বললাম, আমি তো তানপুরা বাঁধতে জানি না, ছাড়তে পারি।’’
শুনে তানপুরা হাতে ধরে বড় যত্ন করে বেঁধে দিয়েছিলেন বেগম আখতার। তার পরে নিজেই ধরলেন গজল। ‘‘আর আমিও মন দিলাম তানপুরায়”, দূরভাষে বলছিলেন সন্ধ্যা।
বেগম আখতারের গজলে সন্ধ্যার তানপুরার সঙ্গে সেই আসরে তবলা বাজিয়েছিলেন রাধাকান্ত নন্দী।
বেগমের অনুপম কণ্ঠে গাওয়া গজলের সুরে সুরে সে-দিন ভেসে গিয়েছিলেন উপস্থিত শ্রোতারা।
••••
দিল্লিতে সপ্রুহাউস। বেগম আখতারের গজল পরিবেশনের কথা বলছিলেন তাঁর শিষ্যা ঋতা গঙ্গোপাধ্যায়।
‘‘আম্মি’র গান শুনতে সে দিন দর্শকাসনে ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী।’’
দর্শকদের কাছে ঋতাদেবীকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বেগম আখতার।
গজল সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে গজল গেয়ে সে দিন তিনিও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর।
“লখনউ থেকে গান গাইতে এলে আখতারি বাঈ কোথায় বাস করতেন জানেন? আমাদের এই অফিস বাড়িরই একটি ঘরে,’’ বলছিলেন অমলবাবু।
অমলবাবু জানালেন, শুধু বেগম আখতারই নন, বড়ে গোলাম আলি, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়-সহ সঙ্গীতের আরও অনেক দিকপাল বছরের পর বছর বাস করে গিয়েছেন সেই ঘরে।
এইচএমভি-র দমদম স্টুডিয়োয় তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট এবং পরে ওই স্টুডিয়োর ম্যানেজার সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।
চোখ বুজলে তিনিও যেন দেখতে পান গজল সম্রাজ্ঞীকে।
‘‘পরনে শাড়ি। ডান নাকে নীলরঙা হিরের নাকছাবি। আঙুলের ফাঁকে ধরা লম্বা  সিগারেট। বোধহয় ফাইভ ফিফটি ফাইভ-এর প্যাকেট কিনতেন। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে শেষ। পান চিবোতেনও খুব।’’
তবে কথাবার্তায় অসম্ভব সংযমী। তেমনই ব্যক্তিত্ব আর ব্যবহার।
মেগাফোন থেকে তাঁকে এইচএমভি-তে নিয়ে আসেন বিমান ঘোষ।
বেগম আখতারের কাছে গান শিখেছিলেন কলকাতার ধ্রুপদী গায়িকা প্রভাতী মুখোপাধ্যায়।
তাঁর স্মৃতিতেও চিরকালের মতোই আঁকা হয়ে আছে কিংবদন্তি গজল সম্রাজ্ঞীর এক উজ্জ্বল ছবি।
সাদা পোশাক। হাতে, কানে, নাকে হিরে-মানিকের জড়োয়া। আঙুলে লম্বা সিগারেট।
‘মা’-এর স্মৃতিচারণে এখনও চোখে জল এসে যায় প্রভাতীদেবীর।
‘‘খুব ছোট্টবেলায় রেডিয়োতে তাঁর গান শুনলে মনে হতো, রেডিয়ো থেকে উনি বেরিয়ে এলেই জড়িয়ে ধরব। স্বপ্নের সেই গায়িকার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল বালিগঞ্জ মিউজিক কনফারেন্সে। সে ’৬২ সালের কথা।’’
প্রভাতীদেবী তখন ‘অল ইন্ডিয়া আকাশবাণী’ গানের প্রতিযোগিতায় ক্লাসিকাল-সেমি-ক্লাসিকাল মিলিয়ে তিনটি ক্যাটেগরিতে সাতটি পুরস্কার পেয়েছিলেন। 
বেগম আখতারের সঙ্গে কথা হয়ে যাওয়ার পরেই গান শিখতে  মা-বাবার হাত ধরে প্রভাতী সোজা পৌঁছে যান লখনউয়ে তাঁর লালবাগের বাড়িতে।
‘‘তাঁকে ‘মা’ বলেই ডাকতাম। পুরনো একটা হারমোনিয়াম দিলেন আমাকে, শিখলাম মনপ্রাণ ঢেলে। পেলাম তাঁর সান্নিধ্য। সকাল ৮-৯টায় ঘুম থেকে উঠেই রেওয়াজ শুরু করে দিতেন। মেয়ের মতো করে আমাদের শেখাতেন।”
কণ্ঠস্বরে কর্কশ ভাবটা যাতে এক্কেবারে চলে যায়, তার জন্য বারবার বলতেন, ‘গলে মে মিঠে আওয়াজ লাও’। ...তাঁকে যেমন নকল করা যায় না, তাঁর পর্যায়ে নিজের গায়কিকে নিয়ে যাওয়াও  কারও পক্ষে সম্ভব নয়।’’
তবে আশ্চর্য, বহু বছর পরে এই প্রভাতীদেবীরই গান শুনে বেগম আখতারের বোনের স্বামী মুক্তার আহমেদ নাকি মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘আরে, এ তো পুরো বেগমের মতো গায়।’’
বেগম আখতারের জীবনের অসাধারণ সব ঘটনার সাক্ষী ঋতাদেবী। 
কলকাতায় আয়োজিত সঙ্গীত সম্মেলন। শ্রোতারা সারা রাত জেগে থাকতেন বরকত আলি, উস্তাদ ফৈয়াজ খান, উস্তাদ মুস্তাক খান, পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী, পণ্ডিত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গান শোনার জন্য।
‘‘শুনেছি, ভোর রাতে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলির সারেঙ্গির সঙ্গে বেগম আখতারের মধ্যসপ্তকের ভৈরবী সারা রাত্রির গায়নকে নাকি ম্লান করে দিত। উস্তাদ ফৈয়াজ খান নাকি আল্লাকে ধন্যবাদ দিতেন, আখতারি বাঈয়ের আগে গান গাওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য। বলতেন, ‘নহি তো খুদা কসম, ইসকে বাদ বৈঠ্না মুস্কিল থা।’’
জীবনের অমূল্য ন’টি বছর ঋতাদেবী বেগম আখতারের কাছে গান্ডাবন্দি হয়ে শুধু গানই শেখেননি, তাঁর লউনউয়ের বাড়িতে বাস করেছেন মেয়ের মতো স্নেহযত্নে।
••••
‘‘রেকর্ড ডিস্কের জমানায় বেগম আখতার এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন, এমনটা কিন্তু মোটেই হয়নি’’, অমলবাবুর এমন তথ্যে যে-কেউ চমকে উঠবে।
বলছিলেন, ‘‘প্রথম দিকে একের পর এক রেকর্ড ফ্লপ। মোট ১১-১২টি ৭৮এমআরপি রেকর্ড ডিস্ক (দু’পিঠে একটি করে গান) তেমন চলেনি বাজারে। শুরুর শুরুতে ‘মেরে জাঁহানে’, ‘চলো আয়ে চলো’, ‘ওয়াফা নহি না সহি’র মতো সব গান গেয়ে আখতারি বাঈ জয় করতে পারেননি শ্রোতাদের  মন।’’
কিন্তু তাঁর গায়কির উপরে অগাধ আস্থা ছিল অমলবাবুর জ্যাঠ্যামশাই জে এন ঘোষের।
“বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি আখতারি বাঈকে।  ‘দিওয়ানা বনানা হো তো দিওয়ানা বনা দে’ আর ‘ঝুটি জাগ কি ঝুটি প্রীত’ গজলের রেকর্ড ডিস্ক বাজারে আসার পরে খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছে গেলেন তিনি। এর পর তাঁর ফ্লপ রেকর্ডও কেনার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল শ্রোতাদের মধ্যে। সঙ্গীত জগতে বেগম আখতারের স্বপ্নের উড়ানের সেই শুরু।’’
••••
ফেলে আসা দিনের নানা জলছবি একের পর এক তুলে আনছিলেন অমলবাবু।
যাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং সঙ্গীতশিক্ষা ফৈজাবাদ এবং লখনউয়ে, সেই আখতারি বাঈকে ভারতীয় সঙ্গীতজগতে প্রতিষ্ঠিত করার সিংহভাগ কৃতিত্বের অনেকটাই দাবিদার  লখনউ এবং এই কলকাতার বাঙালিরা।
‘‘ঘরে ঘরে বেগম আখতারের গজলকে সমাদরের সঙ্গে পৌঁছে দিয়ে তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিতে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অবশ্যই আছেন আমার জ্যাঠামশাই যতীন্দ্রনাথ ঘোষ আর আমার বাবা দিগেন্দ্রনাথ ঘোষ। মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির দুই কর্ণধার।’’
শৈশবে পিতা-মাতার বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পরে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন আখতারি। কিন্তু বেগম আখতারের সঙ্গীত এবং দৈনন্দিন জীবনে মেগাফোন কোম্পানির দুই কর্ণধারের ভূমিকা ছিল পিতার মতোই।
“জ্যাঠামশাই জে এন ঘোষকে তিনি ডাকতেন ‘বড়ি বাবা’ আর ‘ছোটি বাবা’ বলতেন আমার বাবাকে। দাদার সঙ্গেও তাঁর দারুণ বোঝাপড়া ছিল”, জ্যাঠা-বাবার পরে মেগাফোনের হাল ধরেছিলেন অমলবাবুর দাদা প্রয়াত কমলকুমার ঘোষ। বাঙালির এই সাধের সংস্থাকে তিনিও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
‘দিবানা বনা দে’র সাফল্যের পরে ভারতের যে-কোনও প্রান্তে মার্গসঙ্গীতের যে-কোনও মেহফিলের শিল্পীতালিকায় তখন থেকেই অনেকের আগে থাকত বেগম আখতারের নাম।
আজ থেকে ৭৬ বছর আগে শুরু হয়েছিল আখতারি বাঈয়ের উল্কা-সম উত্থান। 
ভারতের গানবাজনার ইতিহাসে কেন তিনি আজও অনন্যা, অতুলনীয়া এবং স্মরণীয়া?
প্রয়াত গজল সম্রাজ্ঞীর জন্মশতবর্ষের স্মরণে এগিয়ে এসেছিল তথ্য ও বেতার মন্ত্রকও। দূরদর্শনের আঞ্চলিক চ্যানেলে শুরু হয়েছিল গজল প্রতিযোগিতা ‘জসন্-এ-বেগম আখতার’।
এই প্রতিযোগিতায় সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ১৮-৪০ বছর বয়সি গজল গায়কদের। ভাবনাটি ছিল ঋতা গঙ্গোপাধ্যায়ের।
সেরার সেরাদের নিয়ে তার পরে ডিডি উর্দু চ্যানেলে শুরু হয়েছিল ফাইনাল রাউন্ড।
ভারতের আর কোনও গায়কের জন্মশতবর্ষে সরকারি চ্যানেলে এমন অভিনব অনুষ্ঠান আগে কখনও হয়েছে কি?
••••
দমদমে স্টুডিয়োর দিনগুলো বলছিলেন সুশান্তবাবু— ‘‘রিহার্সাল বিশেষ করতেন না রেকর্ডিংয়ের আগে। গজলকে অন্য মাত্রায় তুলে নিয়ে যেতেন স্রেফ সারেঙ্গি, তবলা আর তানপুরার সঙ্গত নিয়ে। কেন তাঁর গজল সরাসরি পৌঁছে যেত শ্রোতাদের হৃদয়ে জানেন? তিনি গান করতেন এক্কেবারে সহজসরল ঢংয়ে। সুরের বিস্তারে গানকে অনর্থক জটিল না-করার অনবদ্য দক্ষতা ছিল তাঁর। আসলে নন-ফিল্মি গানে যতটা স্বাধীনতা নেওয়া যেতে পারে, তার সবটার সদ্ব্যবহার করতেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।”  
পরাধীন ভারতে উচ্চবর্ণের শিক্ষিত, মার্গসঙ্গীতের সমঝদার সমাজে সঙ্গীতশৈলী হিসেবে কোঠিবাড়ির গজলের বিশেষ কোনও স্থান ছিল না।
কিন্তু পরবর্তী কালে ত্রিশের  দশক থেকে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের রসাস্বাদনে আগ্রহী রসিক, শিক্ষিত শ্রোতাদের জলসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় বসিয়ে রাখতেন সৈয়দ আসগর হুসেন ও মুস্তারি বেগমের মেয়ে আখতারি বাঈ।
আর এই সঙ্গীত সাধনার কঠিন রাস্তায় হেঁটেই তিনি পাল্টে ফেলেন নিজের ভাগ্য।
নিজস্ব গায়কি তৈরি করে গজলের উড়ানে চেপে তিনি বাঈ থেকে হয়ে গেলেন বেগম।
 “তাঁর উপদেশ ছিল, ‘বঁয়া অপনা’, অর্থাৎ আমাকে নকল না-করে নিজস্ব গায়কিতে গাও। নকল করে কেউ কোনও দিন সাফল্য পায় না”, গুরুর সেই উপদেশ আজীবন পালন করে এসেছেন ঋতা দেবী।
সঙ্গীত জীবনের শুরু থেকেই তিনি গতানুগতিকতার পথ না মাড়িয়ে সঙ্গীতশিক্ষার কঠিন থেকে কঠিনতর শৃঙ্গে পা রাখার লক্ষ্যে ডুব দিয়েছিলেন সাধনার অতল গভীরে। ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের উচ্চ পর্যায়ে সেরার সেরাদের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন নিজেকে।
••••
সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছিলেন পাতিয়ালার উস্তাদ আতা মহম্মদ খানের কাছে।
কিরানা ঘরানার উস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খানের তালিমে তাঁর গায়কির ভিত শক্ত জমির উপরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আখতারি বাঈ।
আব্দুল করিম খানের ভক্ত আখতারি বাঈ ধ্রুপদী সঙ্গীতের রেশ এবং আমেজ মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন তাঁর নিজস্ব গায়কি, যার সাহায্যে তিনি গজলকে সরাসরি পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন তাঁর শ্রোতাদের হৃদয়ে।
তাঁর নিজস্ব সাবলীল গায়কি এবং কণ্ঠসম্পদে সময় এবং বয়স কখনও থাবা বসাতে পারেনি।
শোনা যায় নিজের কণ্ঠস্বরকে আল্লার দান বলে মনে করতেন বেগম।
 “ওই ন’বছরে কত কী যে শিখেছি তাঁর কাছে,” সারা ভারতে বিভিন্ন মেহফিলে ‘আম্মি’র পাশাপাশি ঋতাদেবী নিজেও গজল পরিবেশন করে গিয়েছেন শ্রোতাদের।
দিল্লিতে গাইতে এসেই ঋতাদেবীর সঙ্গে দেখা বেগম আখতারের। প্রথম দর্শনেই ভাললাগা।
ঋতাদেবীর আগের গুরু সিদ্ধেশ্বরী দেবীও ছিলেন ধ্রুপদী সঙ্গীতের বড় শিল্পী। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে ঋতাকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন বেগম আখতার।
তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী দেবী।— “আরে তুমি ওকে কী শেখাবে, আমি দেড় ঘণ্টার বোল শিখিয়েছি ওকে। জবাবে আম্মি বলেছিলেন, তিন মিনিটেই দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিতে হবে। দেড় ঘণ্টার বোল এখন অচল।”
সৈয়দ ঘরের মহিলা ছিলেন আখতারি বাঈ। শোনা যায়, নার্গিসের মা জদ্দনবাঈয়ের গায়কি নাকি তাঁকে অনুপ্রাণিত করত।
তাঁর সাফল্যের পিছনে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের ভাই উস্তাদ বরকত আলি খানের অবদানও নাকি কম ছিল না।
কোন প্রতিভায় তিনি কালজয়ী গজল গায়িকার সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছিলেন? কোন গুণে তিনি ‘গজল কুইন’?
ঋতাদেবী ব্যাখা করলেন।
“আম্মি বলতেন, জন্মেই কেউ সঙ্গীতজ্ঞ হয় না। নিজেকে গড়ে নিতে হয় তালিম আর ‘রিওয়াজ’-এর কঠিন সাধনায় ডুবে থেকে। আর সবার আগে প্রয়োজন নিজেকে ভাল মানুষ হিসেবে তৈরি করা। ভালমানুষ না-হলে, বড় শিল্পীও হওয়া যায় না।” আরবিতে গজল শব্দের মানে প্রেমিকের সঙ্গে কথোপকথন। কবিতা না-বুঝতে পারলে সম্ভব নয় গায়কিতে গজলের বড় শিল্পী হওয়া। বারবার তিনি নাকি এই কথাই বলতেন।
••••
গান গাইতে গাইতেই হঠাৎই  তিনি যোগ দিলেন কলকাতার বাণিজ্যিক থিয়েটারে।
তাঁকে নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল দর্শকদের মধ্যে। গানে-অভিনয়ে-ব্যক্তিত্বে সীতার ভূমিকায় তিনি অনবদ্য। প্রচারের সার্চলাইটে তাঁর সুনাম  পৌঁছে গেল আরব সাগরের তীরের সেই স্বপ্নশহরেও।
আখতারি চলে এলেন বলিউডে। ‘টকি’তে অভিনয় করলেন। ‘নল-দময়ন্তী’ ‘রোটি’-র মতো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করার পরেই তিনি ফের ঘরমুখী।
কাঁকুলির নবাব বিপত্নীক ব্যারিস্টার ইশতিয়াখ অহমেদ আব্বাসি গান শুনতে আসতেন আখতারি বাঈ ফৈজাবাদীর লখনউয়ের লালবাগের বাড়িতে।
শেষমেশ তাঁকেই বিয়ে করে আখতারি বাঈ হলেন বেগম আখতার।
কিন্তু গান গাইতে পারবেন না, এই শর্তে আব্বাসিসাব তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পরে একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন গজল কুইন। কিন্তু কোনও সন্তানই তাঁর বাঁচেনি।
সন্তান-হারানোর দুঃখ, গান গাইতে না-পাওয়ার বেদনা, গৃহবন্দি জীবন তাঁকে অসুস্থ করে তোলে।
ফের তাঁকে গানবাজনা করার অনুমতি দেন নবাবসাব। তৈরি হল গান শেখানোর স্কুল।
খবর পেয়ে বেগম আখতারের সঙ্গে দেখা করতে এলেন  লখনউ রেডিয়ো স্টেশন ডিরেক্টর সুনীল বসু এবং সঙ্গীত বিভাগের প্রধান এল কে মলহোত্র।
তাঁদের অনুরোধ ঠেলতে না-পেরে বেগমকে রেকর্ড করানোর অনুমতি দেন আব্বাসিসাব।
এইচএমভি-র কর্তৃপক্ষ হাজির হলেন লখনউয়ে। রেকর্ডিং হয়ে গেল। এক পিঠে ‘কোয়েলিয়া মত করো পুকার’ আর অন্য পিঠে ‘সঁইয়া ছোড় দে নৌকরিয়া’।
দু’টি দাদরা-সহ এই রেকর্ড প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ফের আলোড়ন। ঘরে ঘরে বাজতে শুরু করল ‘কোয়েলিয়া মত করো পুকার’।
তত দিনে বেগম আখতারের ব্যক্তিগত জীবনেও এসে গিয়েছে বিরাট পরিবর্তন।
শোক-দুঃখ-বিষাদ-নিরাশা-হতাশার অভিজ্ঞতার আগুনে ক্রমাগত পুড়তে পুড়তে তাঁর সঙ্গীতজীবন পরিণত হয়ে গিয়েছে এক্কেবারে তপ্তকাঞ্চনে। সঙ্গীতশিক্ষার আরও কঠিন থেকে কঠিন পথের সন্ধান করে তিনি নিজের গায়কিকে নিয়ে গিয়েছিলেন সবার ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে।

••••
একবার লখনউ রেডিয়ো স্টেশনে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী সঙ্গীতের ‘লাইভ’ অনুষ্ঠান।
সন্ধ্যা বলছিলেন সে দিনের গল্প, “রেকর্ডিং রুমে গিয়ে দেখি দিদি বেগম আখতার বসে আছেন। আমি তো বেশ ঘাবড়ে গেলাম। দিদি থাকলে আমি গাইব কী করে! আমার জড়সড় ভাব দেখে তিনি আমাকে অভয় দিলেন। বললেন ‘চৈন সে গা লেনা। ডরনা কেয়া হ্যায়’।  গান শেষে তাঁর প্রশংসাও পেলাম।”
এর পর বিমান  ঘোষের সঙ্গে বেগম আখতারের লালবাগের বাড়ি গিয়ে সন্ধ্যা অবাক। সার দিয়ে বসে এক দল ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। বেগমের এত ছেলেমেয়ে?
তাঁর মনের কথা বুঝে বিমান ঘোষ বলেন, ‘‘আরে না না। উনি সন্তানহীনা। এরা সব পোষ্য। এদের সব খরচা উনি দেন।’’
মা ডাকের জন্য আকুল হয়ে থাকতেন সন্তানহীনা চিরদুঃখী বেগম।
‘আপনাকে কী বলে ডাকব?’, সন্ধ্যার মনে আছে, এই প্রশ্নে বেগম  জানিয়েছিলেন, আমাকে ‘মা’ বলেই ডাকবে।
মানুষ বেগম আখতারকে নিয়ে ঋতাদেবীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। গরিব মানুষদের পাশে সর্বদাই দাঁড়িয়েছেন আম্মি। বই-খাতা, ওষুধ থেকে সাইকেল, স্কুটার পর্যন্ত সব কিনে দিতেন।
শিয়া পরিবারের মেয়ে বেগম আখতার মহরম পালন করতেন। আর বহু বছর ধরে প্রয়াত ‘আম্মি’র সম্মানে মহরমের সপ্তম বা নবম দিনে দিল্লিতে গজলের মেহফিল বসান ঋতাদেবী।
জলসায় তিনি কতটা অনবদ্য ছিলেন, ভাবা যায় না। শ্রোতাদের সম্বোধন করে গাইতেন। গানে অহেতুক কালোয়াতি করতেন  না।  উদাস ভাব আনতেন গজলে। আর তার সঙ্গে ঋতা বলছিলেন, ‘‘আমাদেরও কেবলই হুঁশিয়ারি দিতেন, উপরে নীচে, এ দিক ও দিক, তান মারবে না।”
বেগমের মৃত্যুর পরে দিল্লিতে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন ঋতাদেবী।
তখনকার একটি অভিজ্ঞতা বলছিলেন তিনি, ‘‘আম্মি-র প্রসঙ্গ উঠতে রবুদা বললেন, ‘আমরা বসে থাকতাম কখন আখতারি সুর ভুল করবে। কিন্তু ও ছিল বসরার মোতির মতো।  কখনও আমরা ওর ভুল ধরতে পারিনি। ওর সঙ্গে কারও তুলনা হয় না।”
বেগমের চলে যাওয়ার চার দশক পরেও পণ্ডিতজির এ কথাগুলিই যেন আজও মিঠে সুরের তান হয়ে ঘুরপাক খায় রসিকজনের কানে!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/she-dwellers-in-our-heart-even-after-her-death-1.503549

২০ নম্বর পটলডাঙা স্ট্রিট (Narayan Gangopadhyay)

২০ নম্বর পটলডাঙা স্ট্রিট

এককালে যা ছিল সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আস্তানা। এ পাড়াই টেনিদা আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গর দুর্ধর্ষ সব কর্মকাণ্ডের আঁতুড় ঘর। ঘুরে এসে লিখছেন বিনোদ ঘোষাল

২৯ অক্টোবর, ২০১৬, ০০:০০:০৫
narayan gangapadhay

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছবি: পরিমল গোস্বামী

সুনন্দর জার্নাল তখন হই হই করে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
বাঙালি পাঠক প্রতি সংখ্যার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন কলামটি পড়বেন বলে।
প্রতিটি কিস্তিই যেন নলেন গুড়ের রসে ডোবানো এক-একটি তীক্ষ্ণ তির।
তেমনই একটি সংখ্যায় পাড়ার কালীপুজো নিয়ে অসুস্থ শরীরে সুনন্দ লিখেছেন, ‘‘এই এক ঘণ্টার মধ্যে বার আষ্টেক শুনেছি, ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’। অকালমৃত পান্নালাল ভট্টাচার্যের দুর্ভাগ্য (না না আমারই), এমন দরদ দিয়ে গাওয়া গানটিও আমার যমযন্ত্রণা হয়ে উঠেছে। যত দূর খবর পেয়েছি শ্যামাপুজোয় পরম উৎসাহী যুবকবৃন্দের দু’দিনে আনন্দের বন্যার সাধও মেটেনি, আশাও পোরেনি। তারা আরও দিন তিনেক প্রতিমা প্যান্ডেলে রেখে দেবেন এবং এই সঙ্গীতের মহোৎসব সমানে চালিয়ে যাবেন।’’
ব্যঙ্গরসের লেখাটির শেষ লাইন পড়ে একটু চমকেই উঠেছিলেন পাঠক।
নারায়ণ লিখছেন, ‘‘সুতরাং অসুস্থ শরীরে জার্নাল লিখতে লিখতে ভাবছি পরের সংখ্যায় ‘দেশ’-এ সুনন্দর জার্নালের পাতাটি যদি অদৃশ্য হয় আশা করি তাহলে আপনারা কেউই বিস্মিত হবেন না। জানবেন আরেকটি কমনম্যান বাঙালীর অবলুপ্তি বা আত্মবিসর্জন ঘটল।’’ 
সেদিন অবশ্য সকলেই মুচকি হেসে ভেবেছিলেন, ধুস তাই আবার হয় নাকি! এও নিশ্চয়ই এক নারায়ণী রস।
কিন্তু তারপর যখন আর সত্যিই প্রকাশ পেল না সুনন্দ, তত দিনে গোটা বাংলার মানুষ জেনে গিয়েছেন তাদের প্রিয় জার্নাল আর সত্যিই কোনও দিন প্রকাশ পাবে না। আজন্ম রসিক নারায়ণ এবার বড় বাস্তব রসিকতা করেছেন তার নিজের জীবনের সঙ্গেই!
কী করে যে আগাম জেনে গিয়েছিলেন নিজের চলে যাওয়া!

•••••
বাবা প্রমথনাথ ছিলেন দুঁদে দারোগা। আরবি ঘোড়ায় চেপে তিরিশ মাইল দূরে ডাকাত ধরতে যেতেন।
ডাকাত ধরে বাড়ি ফিরেই ছোট তারকনাথকে (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আসল নাম) প্রথম প্রশ্ন, যে বইগুলো ভিপিতে আসার ছিল এসেছে?
এমনই ছিল তাঁর বইয়ের নেশা। সময় পেলেই ডুবে যেতেন দেশ বিদেশের নানা বইয়ে।
ওই সময়ে পুলিশে বই পড়ছে সেটাকে পুলিশমহলে ভারী অন্যায় এবং লজ্জাজনক ব্যাপার বলে ধরা হতো, কিন্তু বাবা ছিলেন পুরো উল্টো। বই-অন্ত প্রাণ। বাড়িতে বিশাল লাইব্রেরি, সেখানে শেলি মিলটন শেক্সপিয়র এর পাশাপাশি থাকে বাংলাদেশের প্রায় সব সাহিত্যপত্রিকা।
নিজে যেমন গোগ্রাসে পড়তেন ছেলের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পড়ার নেশা।
ফলে যে বয়েসে খোকাখুকুর গল্প পড়ে মন ভরার কথা, সেই বয়েসেই ছেলে পড়ে ফেলল ভারতবর্ষর পাতা থেকে ‘শ্রীকান্তর ভ্রমণ কাহিনী’, দেশবন্ধু দাশের ‘স্বামী’র মতো প্রাপ্তমনস্ক লেখা।
সব যে বুঝত তা নয়, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত দোলা লাগত।

•••••
পড়তে পড়তে ইস্কুল জীবনেই একদিন শুরু হয়ে গেল কবিতা লেখা।
নিভৃতে কবিতা চর্চার জায়গা হল বাড়ির বারান্দার এক কোণে ভাঙাচোরা জিনিসে ভর্তি এক কাঠের স্তুপ।
সেই স্তূপের ওপরেই বসে চলতে লাগল অবিরাম কবিতাচর্চা। নীরব সাক্ষী শুধু অজস্র ইঁদুর। লেখে, ছিঁড়ে ফেলে আবার লেখে।
এর মধ্যেই আনন্দলহরী সিরিজের বেশ কিছু ক্রাইম থ্রিলার পরে বালকের মনে হল এইরকম গল্প লিখলে কেমন হয়?
ভাবা মাত্র কাজ শুরু।
কাব্যচর্চা বন্ধ করে আপাদমস্তক একটি সাহিত্য পত্রিকা করে ফেললেন। সে পত্রিকার তিনিই সম্পাদক, লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রক এবং পাঠক।
নিজের পত্রিকাতেই প্রকাশ পেল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের প্রথম উপন্যাস।
সেও এক মজার কাহিনি। আসছি সেই গল্পে।

•••••
সিটি কলেজে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব হবে। ছাত্ররা নাটকের মহলা দিচ্ছে।
নারায়ণ তখন ওই কলেজেরই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। ওঁর লেখা ‘রামমোহন’ নাটকটি মঞ্চস্থ হবে।
নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেদের মহলা দেখছেন নারায়ণ, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন সকলকে।
রামমোহনের চরিত্র করছে যে ছেলেটি, সে তখন বি এ-র থার্ড ইয়ারের ছাত্র। চুটিয়ে ছাত্র ফেডারেশন করা ছেলে। বামপন্থী রাজনীতি করে বলে নারায়ণের একটু বেশিই প্রিয়।
নাটক মঞ্চস্থ হল। সকলেই রামমোহনের অভিনয়ে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু তাও যেন ছেলেটির মন ভরে না। পরের দিন সটান গিয়ে হাজির তার প্রিয় মাস্টারশমাইয়ের বাড়িতে।
‘‘কাল আমার অভিনয় কেমন হয়েছে স্যার?’’
শিক্ষক নারায়ণ তার ছাত্রের দুই হাত নিজের মুঠোয় ধরে বললেন, দেখবে, ‘‘একদিন তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। অনেক বড়। আর তখন আমি বসে বসে তোমার জীবনী লিখব।’’
বুকভর্তি আনন্দ নিয়ে সেদিন পটলডাঙার বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল সেই ছাত্র।
মাস্টারমশায়ের সেই ভবিষ্যদ্বাবাণী ব্যর্থ হয়নি। সেদিনের ওই সদ্য তরুণটির নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

•••••
কার্টুন: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য 
ছাত্রদের যে কোনও ভাল কাজ মানেই শিক্ষক নারায়ণের বিপুল উৎসাহ। শিক্ষকমশাইকে নিয়েও ছাত্রদের একই রকম টান।
কেউ কবিতা লিখেছে, সটান চলে গেল স্যারকে শোনাতে, কেউ গল্প লিখেও তাই। স্যারকে না পড়ালেই নয়।
স্যারের পটলডাঙার বাড়িতে যখন তখন ছাত্রদের আসা-যাওয়া। হই হই আড্ডা। সে-আড্ডায় ছাত্রদের মধ্যে রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, নির্মাল্য আচার্য্যর মতো তরুণ লেখক।  আবার ম্যাট্রিকে প্রথম হওয়া গৌরমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যেতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও।
অতি ব্যস্ততাতেও নারায়ণের সবসময় হাসিমুখ। ছাত্রদের লেখা পড়েন। মতামত দেন। কোনও ছাত্র বেশ কিছু দিন লেখা না দেখালে নিজেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘লেখা হচ্ছে তো ঠিকঠাক? কী লিখছ দেখিয়ো।’’
কলেজের ছাত্ররা ছিল নারায়ণের প্রাণ। আর সেই ভালবাসা যে শুধু ছেলেদের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ কিংবা ক্লাসে সুন্দর করে পড়ানোর মধ্যেই আটকে ছিল, তা নয়।
এক বারের কথা যেমন। সিটি কলেজে সেদিন নাইট শিফট চলছে। আকাশ মেঘে লালচে। হঠাৎই কলেজের মেন ইলেকট্রিক সুইচে আগুন লেগে গেল।
সবাই আতঙ্কে ছুটোছুটি করে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছে। এ দিকে নারায়ণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। দেখে সহকর্মী অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বললেন, ‘‘আরে শিগগির চলুন নেমে যাই।’’
শুনে স্বভাবমিষ্ট নারায়ণ বেশ রেগে গিয়েই ধমক দিলেন জাহ্নবীকে, ‘‘ছেলেগুলোকে ফেলে আমরা নামব আগে,’’ বলে পাঞ্জাবির পকেটে হাত পুরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো উপরের সিড়ির মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ভিড় হালকা হল। সব ছেলে নেমে গেল। তারপর তিনি নামলেন।

•••••
যে সৌমিত্রকে একদিন তিনি অনেক বড় অভিনেতা হবে বলে আশীর্বাদ করেছিলেন, সৌমিত্রর জীবনের প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিই।
সেও এক ঘটনা।
গল্পটি শোনানো যাক। একদিন মাস্টারমশায়ের বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন ছাত্র সৌমিত্র।
সে দিনের আড্ডায় রয়েছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের এক প্রিয় বন্ধু চিত্র সাংবাদিক খগেন রায়। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ছবিরও পরিচালক ছিলেন তিনি।
কথায় কথায় তরুণ সৌমিত্রকে তিনি প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন, ‘‘তুমি অভিনয় করবে? যদি চাও তো ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’’
উত্তরে সৌমিত্র কিছু বলার আগেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন নারায়ণ—
‘‘না না খগেন, এ কী বলছ তুমি! ওর এখনও সিনেমায় নামার সময় হয়নি। আগে লেখাপড়া শেষ করুক, তার পরে না হয় ও সব হবে। পড়াশোনা থামিয়ে সিনেমায় যাওয়াটা ঠিক হবে না।’’
মাস্টারমশাইয়ের কথা একবাক্যে মেনে নিয়েছিল ছাত্রটিও। সুযোগ পেয়েও সিনেমায় অভিনয়ের ধারেকাছে ঘেঁষেনি।
তার অনেক পর, ছাত্রজীবন শেষ। যখন পাকাপাকি ভাবে সিনেমায় নামবেন স্থির করলেন, প্রথমেই গেলেন মাস্টারমশায়ের কাছে।
প্রিয় ছাত্রকে জড়িয়ে ধরে নারায়ণ বললেন, ‘‘আমি তো বলেইছি তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। আসলে কী জানো, সিনেমার অভিনয়কে বোঝার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। যখন যে চরিত্রেই অভিনয় করবে যত্ন নিয়ে, প্রাণ দিয়ে অভিনয় করবে।’’
স্যরের আশীর্বাদ নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলেন তাঁর ছাত্র।
পটলডাঙা স্ট্রিট ছবি: পীষূষরঞ্জন ঘোষ

•••••
প্রথম সাহিত্যচর্চার প্রথম পাঠক হয়েছিল এক বাল্যবন্ধু।
ইস্কুল জীবনেই দিনাজপুরের বাড়িতে আট পাতার ফুলস্কেপ কাগজে প্রকাশ করলেন পত্রিকা। নাম চিত্র-বৈচিত্র।
নিজেই গল্প, কবিতা লিখে, ছবি এঁকে পত্রিকা তৈরি। শুধু তাই নয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের দরও ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা তো দূরের কথা, পত্রিকার পাঠক কই?
অথচ প্রকাশক কাম লেখক এতই লাজুক স্বভাবের যে কাউকেই নিজের এই কীর্তির কথা জানাতে পারছে না।
এ দিকে বারান্দার কোনে প্যাকিং বাক্সের ওপর বসে রোমহর্ষক সব কাহিনি নিয়ে হাতে গড়া পত্রিকার ওপর ইঁদূর আরশোলারা আক্রমণ চালাচ্ছে। শেষে একদিন ধরাই পড়ে গেলেন।
বাল্যবন্ধু বেস্ত (সুধীন ঘোষ) এসে ডাকল মার্বেল খেলার জন্য।

•••••
নারায়ণ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘এখন যেতে পারব না গল্প লিখছি।’’
বন্ধু অবাক।— ‘‘কী গল্প? দেখি, পড় তো!’’
হত্যা, ডাকাতি, গুলি-গোলায় ভরা ধুন্ধুমার উপন্যাসের প্রথম কিস্তি শুনে বন্ধু বেস্তর চোখ ছানা বড়া। মার্বেল খেলা ভুলেটুলে তার চোখমুখ তখন উত্তেজনায় জ্বলছে। তারপর...তারপর কী হল?
নারায়ণ আবার সম্পাদকীয়-গাম্ভীর্য নিয়ে উত্তর দিল, বাকিটা পরের সংখ্যায়। চাঁদা দিলে পরেরটা পাওয়া যাবে।
‘‘তোর পত্রিকার বার্ষিক চাঁদা কত?’’
নারায়ণ বলল, ‘‘নিয়মাবলি কাগজের পাতাতেই দেওয়া রয়েছে। বিজ্ঞাপন এক পৃষ্ঠা দু আনা, আধ পৃষ্ঠা এক আনা আর বার্ষিক গ্রাহকমূল্য সডাক চার পয়সা।’’
বেস্ত সঙ্গে সঙ্গে প্যান্টের পকেট থেকে হান্ডিভাজা খাওয়ার জন্য জমানো পয়সা বার করে বলল, ‘‘আমি গ্রাহক হব।’’
তারপর থেকেই পুরো দুই কপি কাগজ বেরোনো শুরু। এদিকে কাগজের একমাত্র গ্রাহকের কৌতূহলে পাগল-পাগল অবস্থা। তিনদিন পরেই সে এসে বলল,বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোর কাগজকে সাপ্তাহিক করে দে।
একমাত্র পাঠক বলে কথা! তার আবদার কি অমান্য করা যায়? কাগজ হয়ে গেল সাপ্তাহিক। কিন্তু কিছু দিন পরেই সুধীন পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে যাওয়ায় সেই উপন্যাসও আর শেষ হল না, কাগজও গেল বন্ধ হয়ে।
চারমূর্তি
টেনিদা
ভাল নাম ভজহরি মুখার্জি। পটলডাঙার চাটুজ্জেদের রোয়াকের আড্ডার মধ্যমণি। পুরো ছ’হাত লম্বা। গন্ডারের খাঁড়ার মতো লম্বা নাক। খটখটে জোয়ান। গড়ের মাঠে গোরা ঠেঙিয়ে স্বনামধন্য। পাকস্থলীতে একটি বিয়ে বাড়ির সব খাবার ভরে ফেলতে পারে।
কিন্তু পড়াশোনার ব্যাপারে স্কুলে ক্লাস টেনে একেবারে মনুমেন্ট হয়ে বসে আছে। সেখান থেকে তাকে নড়ায় কার সাধ্য!
টেনিদার মতে ‘পাশ তো যে কেউই করতে পারে, কিন্তু পরীক্ষায় সব উত্তর লিখেও পাশ না করতে পারাই নাকি সব থেকে কঠিন।’
কান ছিঁড়ে কানপুরে পাঠানো কিংবা নাক মুলে নাসিকে পাঠিয়ে দেওয়া অথবা দাঁত পাঠানো দাঁতনে টেনিদার বাঁ হাতের খেল। টেনিদার প্রিয় ধমক হল ‘কুরুবকের মতো বকবক করিসনি’।
হাবুল
ভাল নাম স্বর্ণেন্দু সেন। কাঠ ঢাকাই বাঙাল যাকে বলে, হাবুল ঠিক তাই। তবে পড়াশোনায় মন্দ নয়।
ক্যাবলা
ভাল নাম কুশলকুমার মিত্র। চারজনের মধ্যে পড়াশোনায় খুব ভাল। প্রতিবছর পরীক্ষায় ভাল ফল করে। এই জন্য টেনিদা মাঝেমাঝেই ক্যাবলার ওপর বেজায় খেপে যায়।

প্যালারাম
ভাল নাম কমলেশ ব্যানার্জি। পড়াশোনায় চলে যায় আর কী! দু’পা হাঁটলেই তার পিলে খটখট করে জানান দেয়। পটল দিয়ে পাতলা শিঙ্গি মাছের ঝোল আর ভাত, এই হল তার দুই বেলার আহার।

•••••
পত্রিকা বন্ধ হলেও কাব্যচর্চা থামল না। ইস্কুলে অঙ্ক ক্লাসে বসে অঙ্কখাতাতেও চলতে থাকল নিরন্তর কাব্যচর্চা।
‘মাস পয়লা’ কাগজে ছোটদের বিভাগে কবিতা পাঠিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। বুক আরও ফুলে গেল।
ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে সরাসরি দেশ পত্রিকায় কবিতা পাঠানো শুরু। সেখানেও পর পর ছাপা হতে লাগল কবিতা।
হঠাৎই একদিন দেশ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি। গল্প দেবার আর্জি।
গল্প! মাথায় হাত নারায়ণের। গল্প লিখব কী করে? কিন্তু ‘না’ বলার উপায় নেই। লিখলেন ‘নিশীথের মায়া’। তখন বয়স মাত্র সতেরো, কী আঠেরো।
প্রবল সুখ্যাতি। তারপরেই ‘বিচিত্রা’, ‘শনিবারের চিঠি’...একের পর এক পত্রিকা থেকে ডাক আসা শুরু। আর পিছন ফিরতে হল না।

•••••
দিব্যি বড়দের গল্প লিখছেন।
নামও ছড়িয়েছে বেশ।
হঠাৎই একদিন বাড়িতে এলেন বন্ধু বিশু মুখোপাধ্যায়। এসেই ফরমাশ। অনেক বড়দের জন্য লেখা হয়েছে, এ বার ছোটদের জন্য লিখতে হবে। মৌচাক-এর জন্য লেখো।
ছোটদের জন্য গল্প!
সেই কবে শৈশব পেরিয়ে এসেছি, আর কি তেমন মন আছে? ছেলেবেলার সেই খুশির জগৎকে আর কোথায় পাব?
‘‘আরে ঠিক পারবে, লেখোই না,’’ উৎসাহ দিলেন বিশুদা।
বিশুদার কথায় লিখলেন বটে। গম্ভীর-গম্ভীর গল্পই। ছাপাও হল কিন্তু নিজেরই মন ভরল না।
এর পর বিশুদার আবার ফরমাশ, ‘‘এবার তোমাকে বার্ষিক সংখ্যার জন্য একটা হাসির গল্প লিখতে হবে।
হাসির গল্প? আমি! ক্লাসে ছাত্রদের হাসি বন্ধ করাই আমার একমাত্র কাজ, সেই আমি লিখব হাসির গল্প!
তারপর যা হল, শোনা যাক নারায়ণের নিজের কথা থেকেই, ‘‘তখন নিজের ছোটবেলায় ফিরে এলাম। স্মৃতির ভেতর থেকে খুঁজে আনতে লাগলাম সেইসব ঘটনাকে— যাদের কথা ভাবলে এখনও তরল হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোনায়। এমন একটি গল্প দিলাম বিশুদাকে। সেই যে মনের ভেতর হাসির স্রোত বইল আজও তা আর থামল না।’’
আর বাংলা কিশোর সাহিত্যে জন্ম নিল এক অদ্বিতীয় চরিত্র— টেনিদা।

•••••
চিরকালের স্বভাব লাজুক এবং আদন্ত্য বিনয়ী নারায়ণ।
বাংলা সাহিত্যে এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন, সে-কথাও যেমন তিনি মুখফুটে কাউকে বলতেন না, তেমনই ক’জনই বা জানে, তিনি ডক্টরেট হয়েও জীবনে কখনও নিজের নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি বসাননি।
এমনকী লেখক-জীবন শুরুর সময়েও নিজের নাম প্রকাশেও ছিল সংকোচ। যে তারকনাথ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পেলেন, লেখা ছাপাতে দেওয়ার সময় নিজের নামটিও বদলে দিয়ে লিখেছিলেন— নারায়ণ।
ঠিক একই ভাবে টেনিদা যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, ঘনাদার প্রসঙ্গে ঠিক তিনি টেনির মুখ দিয়ে বলিয়ে ছেড়েছেন, ‘কী বললি প্রেমেন মিত্তিরের ঘনাদা! কী যে বলিস! তাঁর পায়ের একটু ধুলো মাথায় দিতে পারলে বর্তে যেতুম রে।’
শুধু তাই নয়, লেখক-পুত্র অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা যায়, একবার তাঁকে একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার কথাও উঠেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতবাদ ভিন্ন হওয়ার জন্য পুরস্কার কমিটিতে থাকা  এক স্বনামধন্য সাহিত্যিক একপ্রকার জোর করেই নারায়ণের নাম খারিজ করে দিলেন।
পুরো বিষয়টাই পরে জানতে পেরেছিলেন নারায়ণ কিন্তু জীবনে একবারের জন্যও সেই সাহিত্যিকের প্রতি কারও কাছে উষ্মা প্রকাশ করেননি।
আজীবন নিজেকে যেমন ‘কমনম্যান’ বলতেন, বিশ্বাসও করতেন তেমনই।
১৯৬৫ সালে আকাশবাণীতে স্বরচিত কবিতা পাঠে তিনি পড়লেন— ‘আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস/নিয়ত তরঙ্গাঘাতে দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি/ ...এ বিশ্বেরে ভালবাসিয়াছি এ ভালোবাসাই সত্য এ জন্মের দান।’

•••••
ছাত্ররা যেমন মাস্টারমশাই বলতে অজ্ঞান। ছাত্রদেরও যে কোনও সমস্যায় তাদের স্যার সবার আগে। সে কেমন?
একবার ছাত্র রাজনীতি করা এক গরিব ঘরের ছেলের কলেজে ‘ফিজ’ বাকি পড়ল অনেক টাকা। সে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার।
ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে জানাতে ইউনিয়ন সেক্রেটারি জানাল, তারা মেরেকেটে সতেরো টাকা দিতে পারবে, তার বেশি সামর্থ্য নেই। ওতে কিছুই হবে না। শেষ উপায় নারায়ণ স্যার। তাঁর কাছে গিয়েই পুরো ঘটনা জানাল ছাত্রটি।
শোনামাত্র আর এতটুকু সময় নষ্ট না করে নারায়ণ ছেলেটিকে সঙ্গে করে সটান নিয়ে গেলেন কলেজ রেজিস্ট্রারের কাছে।
তাঁর অনুরোধে বকেয়া ‘ফিজ’ দুশো আটাত্তর থেকে নেমে এল সোজা আঠাশ টাকায়। ওই টাকা দেওয়ারও ক্ষমতা নেই জানতেন নারায়ণ। সুতরাং সে-টাকা নিজেই মিটিয়ে দিলেন।
ছাত্রটি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেল। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে এমন সমস্যায় আবার না পড়ে তার জন্য একটি প্রাইভেট টিউশনও জুটিয়ে দিলেন তিনি।
ওই ছাত্র আর কেউ নয়, পরবর্তী কালে যাঁকে বাংলা সাহিত্যজগৎ চিনবে কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত নামে।
ছাত্রদের সঙ্গে একেবারে বন্ধুদের মতো মিশতেন নারায়ণ। অমিতাভর স্মৃতিচারণ থেকে এমনই আরেকটি ঘটনার কথা বলি।
এক বর্ষার দুপুরে অনার্স ক্লাসের ছেলেরা মিলে দরজা বন্ধ করে ‘আজি বরষণ মুখরিত’ গাইছে। সবার ওপরে চড়া গলায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গান তো চলছেই, সঙ্গে কাঠের বেঞ্চে উদ্দাম তবলার ঠেকা। দরজা খুলে ক্লাসে ঢুকলেন মাস্টারমশাই নারায়ণ। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্লাস পাথর। সব চুপ।
নারায়ণ বললেন, ‘‘কী হল? গান থামল কেন? চলুক।’’
ছাত্ররা তাতেও চুপ।
নারায়ণ তখন সাফ জানালেন, গান শেষ না হলে তিনি কিছুতেই ক্লাস নেবেন না। অমিতাভ লিখছেন, ‘‘তাঁর নাছোড়বান্দা মেজাজ দেখে বহুকষ্টে ঠেলেঠুলে সৌমিত্রকে তুলে দিলাম। অমন স্মার্ট ছোকরা; প্রায় কনডেমড সেলের আসামির মতো কাঁপা গলায় শেষ করল গানটি।’’
তারপর রক্তকরবী-র বিশুপাগলকে নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন নারায়ণ।

•••••
পটলডাঙার বাড়িতে তখন সকলের অবাধ যাওয়া-আসা। সকলেই স্বাগতম। দেদার মজাদার আড্ডা, সঙ্গে চা, মুড়ি-ডালমুট।
ছাত্ররা তো বটেই, অনেক নামী অনামী লেখকও চলে আসতেন আচমকা। এমনই একদিন মলিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এসে হাজির হলেন নারায়ণের বাড়িতে।
ঘড়িতে বেলা এগারোটা কী বারোটা।
তাকে দেখে বেজায় আনন্দিত নারায়ণ, ‘‘দাদা এসেছেন! আসুন আসুন কী সৌভাগ্য আমার!’’
ভদ্রলোক বললেন, ‘‘এই তো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। বেশিক্ষণ বসব না। এই আধঘণ্টার মতো বসে একটু গল্প করেই চলে যাব।’’

•••••
টেনিদার জনক
ভদ্রলোকের গলা শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নারায়ণ ঘরণি আশাদেবী। দাদা এসেছেন যখন দুপুরে চাট্টি ভাত খেয়ে যাবেন।
‘‘ভাত? আচ্ছা আপনি বলছেন যখন দুটি খেয়েই যাই। জমিয়ে রান্না করুন দেখি।’’
নারায়ণ ওই বেলায় ছুটলেন বাজারে। ইলিশ মাছ দিয়ে জমিয়ে ভাত খেয়ে তারপর শুরু হল মজলিশি আড্ডা। পাশের ঘর থেকে কান খাড়া করে সেই গল্প শুনছে নারায়ণ-পুত্র অরিজিৎ। সেই ভদ্রলোক এমনভাবে ঘন বন-জঙ্গল, জোৎস্না রাতের পাহাড়, নির্জন টিলার বর্ণনা দিচ্ছেন যে চোখের সামনে সব যেন ছবি হয়ে ধরা পড়ছে। বক্তা শ্রোতা সকলেই মোহিত।
গল্পে গল্পে সেই বরাদ্দ আধঘণ্টা গড়িয়ে বিকেল। হঠাৎই হুঁশ ফিরল ভদ্রলোকের।— ‘‘সর্বনাশ! চারটে বেজে গেছে! আমি যে আধঘণ্টা থাকব ভেবেছিলাম। আমি বেরোলাম।’’
‘‘একটু চা খেয়ে যান।’’
‘‘না না আর চা নয়। আর দেরি হলে ফিরতে পারব না,’’ বলে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।
নারায়ণ দেখলেন। তাড়াহুড়োয় যে দিকে যাবার কথা ঠিক তার উল্টো দিকের বাসে চড়ে বসলেন ভদ্রলোক।
পরে অরিজিৎ জানতে পেরেছিলেন অমন সাধারণ দেখতে কিন্তু অলৌকিক প্রকৃতির বর্ণনা করতে পারা অন্যমনস্ক মানুষটির নাম ছিল বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

•••••
স্মৃতিশক্তি ছিল ঈর্ষা করার মতো। এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে বলে যেতে পারতেন লম্বা লম্বা কবিতা, এমনকী গল্পও। শেক্সপিয়র, মপাঁসা, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ একেবারে কন্ঠস্থ।
একবারের ঘটনা বলি।
ক্লাস ভর্তি ছেলে। নারায়ণ তারাশঙ্করের ‘অগ্রদানী’ গল্পটি পড়াবেন। কিন্তু সে দিনই ক্লাসে কারও কাছে টেক্সট বই নেই।
কী উপায়?
নারায়ণ বললেন, দেখি একবার স্মৃতি থেকে চেষ্টা করে। বলতে শুরু করলেন। পুরো গল্পটার প্রথম লাইন থেকে শুরু করে একেবারে কমা সেমিকোলন পর্যন্ত উল্লেখ করে থামলেন ‘খাও হে চক্রবর্তী’তে। গোটা ক্লাস অভিভূত।
নারায়ণের স্মৃতিশক্তি নিয়ে এমন অনেক মজার ঘটনা রয়েছে। আরেকটি গল্প শোনানো যাক।
নারায়ণ তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তেতলার ঘরে বসে কয়েকজন সহকর্মী মিলে চা সহযোগে আড্ডা চলছে।
সেই আড্ডায় অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও রয়েছেন। আড্ডা চরমে। তখনই ঘরে ঢুকলেন প্রধান শিক্ষক প্রমথনাথ বিশী। আজ নারায়ণ প্র.না.বি-কে চা খাওয়াবেন এই ঘোষণা হওয়ার পর প্র.না.বি কথায় কথায় জানালেন, তিনি খুবই চিন্তিত। কারণ তাঁর নতুন কবিতার বই প্রকাশ হতে চলেছে। কিন্তু বঙ্গশ্রী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রিয় কবিতা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ সেই কবিতাটি সংকলনে রাখার খুবই ইচ্ছে।
শুনে নারায়ণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কবিতাটির নাম জানতে পারি?
প্রমথনাথের কাছে নাম শুনে লাজুকভাবেই নারায়ণ বললেন, ‘‘আমার পুরো কবিতাটিই মনে রয়েছে। প্রয়োজনে আপনি লিখে নিতে পারেন।’’
শুনে প্রমথবাবু পুরো হতভম্ব। তারপর মজার আড়ালে বেশ গম্ভীর হয়েই বলে উঠলেন, ‘‘দেখুন এত স্মৃতি ভালো নয়, ভালমন্দ সবই আপনি মনে রাখতে পারেন দেখছি।’’
হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই।

•••••
শরীর ঠিক যাচ্ছিল না সেবার। কিন্তু বাইরে সে অসুস্থতার কোনও প্রকাশ নেই।
সকলের সঙ্গে একরকম সুন্দর ব্যবহার আর হাসিমুখ। এক সময়ের ছাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাড়িতে এক কবিতা পাঠের আসরে যাবেন। তখন খ্যাতি গগনচুম্বী, তবু কুণ্ঠা।
সুনীলকে বললেন, ‘‘আমার কবিতা বড্ড সেকেলে। তোমাদের মতো আধুনিক ভাষা আমার কই? পড়তে লজ্জা লাগে!’’
কথায় কথায় স্যারের শরীরের খবর নিলেন সুনীল। জানতেন অসুস্থ, ‘‘এখন কেমন আছেন স্যার?’’
‘‘হ্যাঁ ভালো আছি।’’
চোখের নীচে ক্লান্তি থাকলেও মুখের হাসিটি একইরকম। অনুষ্ঠান শেষে সুনীলকে বলেন, ‘‘একদিন আমার বাড়িতে এসো না, কাছেই তো থাকি।’’
‘‘হ্যাঁ স্যার, এর মধ্যেই একদিন যাব।’’
সে যাওয়া আর হয়ে উঠল না সুনীলের। ঠিক তার পরের দিনই শ’য়ে শ’য়ে মানুষের ভিড় শ্মশানে। হয়তো সেদিন সেই ভিড়ের মধ্যে ক্যাবলা হাবুল, প্যালারামও ছিল। কিশোর অবুঝ মন নিয়ে ভাবছিল এই এক্ষুনি বুঝি ‘ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক’ বলে একমুখ হাসি নিয়ে পালঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়াবে তাদের বন্ধু। অপেক্ষা করছিল...
‘শিলালিপি’-র নায়কের শেষ চিহ্নটুকু যখন ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গার বুকে, সুচিত্রা মিত্র ভিজে গলায় গাইছেন— ‘তবু মনে রেখো...’।
ঋণ: টেনিদা সমগ্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, কোরক-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, শঙ্কর দাশ, উজাগর (নায়ায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা)
সংশোধন: ২২ অক্টোবর ২০১৬-র ‘পত্রিকা’য় প্রকাশিত ‘মৃণালিনী’ শীর্ষক লেখাটিতে কয়েকটি তথ্যের ভুল রয়ে গিয়েছে। সঠিক তথ্য এই রকম: প্রথমত, প্রিয়নাথ সেন বিলেতে রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, ‘আশার ছলনে ভুলি’ মাইকেল মধুসূদনের ‘আত্মবিলাপ’-এর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত, বিহারীলাল চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর যেহেতু তাঁর ছেলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়ের বিয়ে হয়, বিহারীলাল নিজে পণ নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন তা বলা চলে না। চতুর্থত, শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনার সাল ১৯০১। 

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/the-lane-which-created-history-1.503555#


Raasleela

What Is Raas Lila

Raas is divine pleasure and Lila (as per Sanskrit) is play or sport.
According to Vaishnavas, Lila means activities of God and Devotees.
According to Shrimad Bhagwat Puran, Maha Raas was performed by Lord Krishna for his devotees when he was just six years old kid.
Lord Krishna performed Raas Lila. According to Shrimad Bhagwat Puran, Lila means Lord Krishna’s playful dance with his devotees (gopis). Gopis were same saints and sages who performed Tapasya* for Yugas** to become devotee of Lord Krishna in their Dwaparyuga reincarnation. These were saints and sages who met Lord Rama in his exile(when he had to undergo 14 years Sanyasa*** Dharm to fulfill his father’s wishes). Lord Rama interacted with many sages in his way to Sri Lanka, He was unable to spend ample time with them. Most of them got saddened. Then all these sages requested Lord Rama (Lord Vishnu) to being reborn as Gopis in their next birth to become  devotees of Lord Krishna. These Gopis dance with joy when they see playful Lord Krishna, a divine kid of six year old and dance with him.

The rasa lila takes place one night when the Gopis of Vrindavana, upon hearing the sound of Krishna's flute, sneak away from their households and families to the forest to dance with Krishna throughout the night, which Krishna supernaturally stretches to the length of one Night of Brahma, a Hindu unit of time lasting approximately 4.32 billion years. In the Krishna Bhakti traditions, the rasa-lila is considered to be one of the highest and most esoteric of Krishna's pastimes. In these traditions, romantic love between human beings in the material world is seen as merely a diminished, illusionary reflection of the soul’s original, ecstatic spiritual love for Krishna, God, in the spiritual world.

Myths related to Holi

Bhakt Prahlad & Holika

There was a mighty demon king named Hirnakashyipu who had won all the three worlds of heaven, earth and hell and had thus, become very proud. He assumed that he could defeat even Lord Vishnu with his valor. He went to the extent that he had enforced a law that everybody would worship him instead of gods and deities. However, his little son Prahlad refused to accept his commands and continued to worship Lord Vishnu with complete devotion. Infuriated by this defiance of his son, he ordered his soldiers to throw him down a hill. Praying fervently and having full faith in Lord Vishnu, Prahlad did not retract from his word. True to his faith, Lord Vishnu rescued him at the last moment.

Flustered by this news, Hirnakashyipu invoked the help of his sister Holika, who had a boon that she could walk through the fire unharmed to do away with his son. The wicked aunt agreed to the evil desires of his brother and entered the fire with her nephew Prahlad. However, the brother and sister had forgot that Holika could only enter the fire alone or she would perish. Thus, blessed by Lord Vishnu, the child Prahlad remained unharmed but Holika got burnt and died instantly. Holi is thus celebrated to commemorate the death of the evil aunt, after whom the festival is named, and the new life granted to Prahlad for his devotion and faith. To this day, cow dung is hurled into the fire and obscenities are shouted at the Holi fire at some places to insult Holika.



Invincible Dhundhi

During the reign of Prithu, there was a terrible ogress called Dhundhi, who loved to devour innocent children. She had performed severe penances and had won several boons from the deities that made her almost invincible. However, due to a curse of Lord Shiva, she was not so immune to the pranks and abuses of young boys as she was to weapons and arrows. One day, the courageous boys of the village decided to get rid of her forever and chase her away from the village forever. They got intoxicated on bhaang and drunk and then followed Dhundi to the limits of the village, beating drums, making loud noise, shouting obscenities and hurling insults at her and continued doing this until she left the village for good. This is the reason that even today young boys are allowed to indulge themselves in rowdiness, using rude words and intoxication on Holi.


Love Play of Radha & Krishna

Lord Krishna has often been portrayed as a naughty prankster in his childhood and a lover-boy in his youth. His beloved Radha and the cowherd girls 'Gopis' in general loved him even more for his pranks and eve teasing. The Holi of Braj is famous all over India for its intimate connection with the divine deities and their love plays. It is said that when Krishna was a young boy, he asked the reason for his dark color while Radha was so fair. His mother Yashoda playfully suggested that he should smear color on Radha's face too and change her complexion to any color he wanted. Captivated by the idea, Krishna proceeded to do so and thus, introduced the play of colors on Holi.

Even today, Holi is one of the most important festival of Braj, where the men of Nandgaon and women of Barsana play 'latthmar Holi' in the remembrance of the playful throw of colors by Krishna on 'Gopis' and their resistance. The trace of eroticism and romance pervades Holi as depicted in the love plays of Krishna and Radha. In Mathura, Vrindavan, Gokul and Barsana, Holi is a two-week long festival featuring play of colors, folk songs called 'Hori', folk dances such as Raas-Lila, staging the various aspects of Radha and Krishna's love



Sacrifice of Kamadeva

According to Hindu mythology, the world is looked after the Trinity of Gods - Lord Brahma, the creator; Lord Vishnu, the nurturer; and Lord Shiva, the destroyer. According to a legend, Goddess Sati, the daughter of Daksha Prajapati, one of the first sons of Lord Brahma, married Lord Shiva against the wishes of her father. Thus, Daksha did not invite her and her husband to a grand yagya arranged by him. When Sati came to know about the event in her father's house, she thought it to be a slip of mind and proceeded to participate in the event despite the warnings of her husband. But once she reached there, she realized her fault and was infuriated by the insult of her husband. As a penance for her disobedience, she entered the fire. When Lord Shiva came to know of her sudden demise, he was furious. Even after he controlled his anger, he started a severe meditation and renounced all work.

The world's balance soon crumbled in his absence and Sati took rebirth as Goddess Parvati to try and win Lord Shiva's heart and wake him up from his trance. She tried all ways to get the attention of Shiva. When she had exhausted all her feminine ways, she invoked the help of Kamadava, the Indian cupid-god, who agreed to help her in the cause of the world despite the risks involved. He shot his love-arrow on Shiva's heart. Disturbed in his trance, Lord Shiva opened his third eye that fired anger and instantly incinerated Kamadeva. It is said that it was on the day of Holi that Kamadeva had sacrificed himself for the good of all beings. Later, when Lord Shiva realized his mistake, he granted Kamadeva immortality in invisible form. To this day, people offer sandalwood paste to Kamadeva to relieve from his stinging burns and mango blossoms that he loved on Holi


Source : http://www.thecolorsofindia.com/holi-legends/index.html