Sunday, 3 July 2016

সত্তর দশক (On Kolkata Football)

$image.name

সত্তর দশক

ময়দান। ফুটবল। ঘোড়পুলিশ। জনতা। আগুন ঝরা সেই সত্তর দশকের ধারাবর্ণনায় জয়ন্ত চক্রবর্তী

১৮ জুন, ২০১৬, ০৮:৪৫:৫২
  
patrika

মোহন-ইস্ট ম্যাচে মাঠেই তক্কাতক্কি

মরসুম শুরু হওয়ার আগে ক্লাবের পাপোসটাকে দেখিয়ে
কোচ প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি জানতে চাইতেন,
‘‘এর ইংরেজি কী বলতো?’’এ কে়মন যেন রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেন?

সন্তোষ ট্রফি। পটনায়। তার ঠিক পরেই দল বদল। চব্বিশ ঘণ্টা ইস্টবেঙ্গলের দুই জবরদস্ত কর্তার কড়া নজর শ্যাম থাপার দিকে। সে বছর মোহনবাগানীদের এক নম্বর টার্গেট যে শ্যামই। শেষমেশ কী হয়েছিল? সে এক চমকপ্রদ গল্প!

বড় ম্যাচের ঠিক আগে খবরের কাগজে বেরিয়ে গেল লাল-হলুদের কাজল ঢালির মা মারা গেছেন। অথচ মা যে তখন বহাল তবিয়তে জীবিত! কে রটিয়েছিল অমন খবর? কেনই বা?

সত্তর দশকের ময়দান মানেই এমন টানটান রহস্যে মোড়া অসংখ্য কাহিনির যোগফল। আসা যাক সেই সব অবাক-করা গল্পকথায়।
বড়দার চায়ের দোকানে যে তুমুল কোলাহলটা শুরু হল, সেটাকেই বোধ হয় জয়ধ্বনি বলে!
২৫ সেপ্টেম্বর। সাল ১৯৭০।
সত্তরের ফুটবলের সেই উন্মাদনার কাহিনি লিখতে গেলে ওই তারিখটিকে ভুলে যাওয়া যাবে না। বলতে গেলে, এই দিনটাই যেন দিয়েছিল সত্তরের ফুটবল ঝড়ের পূর্বাভাস!
তখনও সাংবাদিকতা পেশায় আসিনি। নিছকই ছাত্র। ব্যান্ডেলের লাটবাগানের কিশোর তরুণদের কফি হাউস বড়দার চায়ের দোকানে ট্র্যানজিস্টারে কান পেতে শুনেছিলাম ইস্টবেঙ্গলের আইএফএ শিল্ড জয়ের কাহিনি।
ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে পরিবর্ত পরিমল দে-র গোলে ইরানের প্যাস ক্লাবকে হারানোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
তখনও টেলিভিশনের যুগ আরম্ভ হয়নি। রেডিয়োতে সম্ভবত অজয় বসুর গলাই জ্বলে উঠল। ইস্টবেঙ্গল বিদেশি দলকে হারিয়ে এই মাত্র জিতে নিল ভারতীয় ফুটবলের নীল ফিতে আইএফএ শিল্ড। এ এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
লাটবাগানের রাস্তায় মুহূর্তের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান সমর্থক একজোট হয়ে গেল। এ তো ভারতের জয়। রং দেখে উদ্‌যাপনের দিন এ তো নয়!
ইডেনে বিদেশি দলকে হারিয়ে ভারতীয় একটি ক্লাব সে দিন বাঙালিকে জাতীয়তাবাদী করে তুলেছিল। মনে আছে, এল ডোর‌্যাডো নামের একটি দোকানের সামনে ত্রিকোণ পার্কে যেন গুপ্তধন পাওয়ার আনন্দে অনেক রাত পর্যন্ত উড়েছিল তুবড়ি, হাওয়াই বাজি। কলকাতা ময়দানে অখ্যাত দলের স্টপারে খেলা, চুঁচুড়া লিগে বড় দলের শান্তিদা, যার পোশাকি নাম শান্তি ঘোষ, রসগোল্লা বিলি করেছিলেন। সত্তরের ফুটবলকে কেন্দ্র করে আবেগের এই অসাধারণ ঢেউয়ের সেই হয়তো সূত্রপাত।
সময়টা ইংরেজি পরিভাষায় এক ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। এক দিকে নকশাল আন্দোলন দানা বাঁধছে। কখনও ভেঙে যাচ্ছে, এ দিক-সে দিক নকশাল দমনে সিআরপি ক্যাম্প। রাতের বেলা পুলিশের গাড়ির শব্দ। কলেজ স্ট্রিট প্রতি দুপুরেই উত্তাল হচ্ছে বোমায়-গুলিতে, কাঁদানে গ্যাসে।
কাকা মানে অসীম চট্টোপাধ্যায়, আজিজুল হক-রা কখনও আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে, ক‌খনও রণাঙ্গনে ভেসে উঠে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আন্দোলনের। সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তীর মতো যুব নেতারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছেন। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা দ্বারভাঙ্গা হলের সামনে সমবেত হচ্ছেন।
বড় আগুনে সেই সময়।
আর এই মাহেন্দ্রক্ষণেই যেন অগ্ন্যুৎপাত শুরু হল কলকাতার ফুটবল মাঠে। প্রতিভার বিচ্ছুরণে এই প্রতিভাবানরা ষাটের দশকের ভারতীয় ফুটবলের কীর্তির জোয়ারে নাবিক হল। কলকাতা ফুটবলেও এল নবজাগরণ।
তারুণ্যে রেনেসাঁ।
রেফারির সঙ্গে করমর্দনে সুরজিৎ, পাশে প্রসূন
তখনও নিছক ফুটবল দর্শক। নিয়মিত ব্যান্ডেল থেকে ইএমইউ ১টা ৫০-এর ট্রেনে মোহনবাগান কিংবা ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ দেখতে নিয়মিত হাজিরা দিই গড়ের মাঠে। দাদা-কাকাদের, মেম্বরশিপ কার্ড তখন আমাদের কাছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লটারির টিকিট।
সপ্তাহে চারদিন, অর্থাৎ বড় দুই ক্লাবে সপ্তাহের দুটি ম্যাচের কোনওটাই বাদ যায় না আমার আর আমার বন্ধু সুমন্ত অর্থাৎ সুমন্ত সেনরায়ের।
মাঠ কাঁপাচ্ছে তখন সুভাষ ভৌমিক-সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদাররা। আনন্দবাজার লিখছে— জোড়া ফলা। মোহনবাগানের প্রণব গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহেবের মতো চেহারা। প্রবীর মজুমদারকে দেখে বেশ রোম্যান্টিক লাগে। কাজল মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে কেমন যেন একটা হেড স্যার-হেড স্যার ভাব। শান্ত মিত্রর ভাল নাম যে শান্তজ্যোতি মিত্র তা জানিয়ে দেয় গড়ের মাঠ কিংবা অলিম্পিক পত্রিকা, স্বপন সেনগুপ্ত ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গায়ে দিয়ে খেলেন, কিন্তু তাঁর নাম কেন চিংড়ি সেই প্রশ্নের উত্তর পাই না। সুমন্ত বলে, কোনও ছেলের নাম ইলিশ হয় না বলেই বোধহয়!
গড়ের মাঠের দুপুরের রোদ, বিকেলের মায়াবী আলোয় পরিণত হয়। ম্যাচ শেষে তাঁবুতে কুতুহলি চোখ মেলে চলে আসি অনাদির মোগলাই পরোটার দোকানে। এক কাপ চা আর মোগলাই পরোটা।
এর পর হাওড়ায় এসে ট্রেন ধরা। ব্যান্ডেলে আমরা তো হিরো, রোজ বড় দলের ম্যাচ দেখতে যাই।
ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে দুপুর একটা পঞ্চাশের ট্রেন ধরত সে। কাঁধে একটা কিট ব্যাগ। একটু উপেক্ষার চোখেই দেখতাম তাকে। আমরা যাচ্ছি বড় ক্লাবের খেলা দেখতে, আর এ কিনা যাচ্ছে ফোর্থ ডিভিশন ক্লাবে খেলতে। রবার্ট হাডসনের এই ফুটবলার সুরজিৎ সেনগুপ্ত, মানে আমাদের বিশুর খেলা দেখার জন্য ক’বছরের মধ্যেই যে লাইনে দাঁড়াতে হবে, তা কি তখন জানতাম?
এই সুরজিৎ সত্তরে অসাধারণ দুটি ঘটনা ঘটায়। প্রথমটি ১৯৭৮ সালে গুয়াহাটিতে বরদলুই ট্রফিতে ব্যাংককের পোর্ট অথরিটির বিরুদ্ধে সোলো রান দিয়ে দুটি গোল করে। এমনই সে দুটি গোল যা আজও পাড়ার রকে কিংবা ফুটবলের পুরনো আড্ডায় আলোচনার ঢেউ তোলে।
সুরজিৎ যখন মাঝমাঠ থেকে তার সর্পিল দৌড়টি শুরু করে তখন তাকে তাড়া করেছিল ব্যাংকক পোর্ট অথরিটির কয়েকজন খেলোয়াড়। আর সে যখন গোল দুটি করে তখন তারা সেন্টার সার্কেলের কাছ বরাবর জায়গায়।
আজকাল আন্তর্জাতিক ম্যাচে কোনও ভারতীয় ফুটবলার গোল করলেই হইচই শুরু হয়ে যায়, এই সুরজিৎরা এই রকম গোল কত করেছে!
১৯৬৯ সালে আইএফএ শিল্ডের সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়া কম্বাইন্ড ইলেভেনের বিরুদ্ধে সুরজিতের শূন্য ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল থেকে বাঁক খাওয়ানো শটের গোলটি তো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। এমন গোল লাখে একটি হয়। সুরজিতের ট্রেডমার্ক ছিল এই গোল।
সত্তর দশকের ফুটবল উন্মাদনার তখন সূত্রপাত ঘটে গেছে।
বড় ম্যাচে হাবিব

শুনলাম, হুগলির পুলিশ সুপার অমল দত্তর ভাইপো, হায়ার সেকেন্ডারিতে স্ট্যান্ড করা প্রদীপ দত্তও নাকি দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে। বড় দলে চান্সও পেয়ে গেল প্রদীপ দত্ত।
এক ঝাঁক তরুণ ফুটবলার তখন কলকাতার ফুটবল ধমনিতে নতুন রক্ত— গৌতম সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত ভট্টাচার্য, শ্যামল ঘোষ, ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ বসু— কাকে ছেড়ে কার নাম করব?
আর স্টলওয়ার্ট সুধীর কর্মকার, সমরেশ চৌধুরী, অশোকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহন সিংহ, হাবিবরা তো আছেই।
সত্তর দশকের ফুটবল যেন এক জলপ্রপাত। অবিরাম, অবিশ্রান্ত প্রতিভাবানরা আসছে। মাঠ কানায় কানায় ভরে যাচ্ছে। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের টিকিটের লাইন  দু’রাত আগেই পড়ছে। র‌্যামপার্টেও থাকছে কয়েক হাজার লোক। প্রায়ই কাঁদানে গ্যাস চলে মাঠে। পুলিশ লাঠি হাতে তেড়ে যায় গ্যালারিতে, রেড রোডে গাড়ির কাঁচ ভাঙে। খবরের কাগজের  প্রথম পাতায় হেডলাইন হয়।
একটা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদারের করা গোলে মোহনবাগান ১-০-য় এগিয়ে থাকার সময় বিরতিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা হয় প্রবল বৃষ্টির জন্য। কিংসওয়ে ধরে হাওড়ার বাস ধরার জন্য হাঁটছি আমি আর সুমন্ত। হঠাৎ মালকোঁচা মারা এক যুবক লাফ দিয়ে চিৎকার করে উঠল— ‘‘পাইছি, পাইছি। এই দুই ভাই ঘইট্যা।’’
বলে বুঝিয়ে উঠতে পারি না আমরা মোহনবাগানের ম্যাচ দেখি, ইস্টবেঙ্গেলেরও ম্যাচ দেখি। ১৯৭৪ সালে ইস্টবেঙ্গল মাঠে সুভাষ ভৌমিকের সঙ্গে হেডঅন কলিশনে শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পা ভেঙে স্ট্রেচার বাহিত হয়ে মাঠের বাইরে যাওয়ার সময় দু’হাত জোড়া করে নমস্কারের ভঙ্গিতে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা আমাদের চোখের কোল তখনও শিরশির করে ওঠে।
সত্তরের দশক যে কাঁপাবে মাঠের  মধ্যে এবং মাঠের বাইরে সে তত দিনে গড়ের মাঠে এসে গেছে। শ্যামনগরের অত্যন্ত দরিদ্র একটি পরিবারের সন্তান, ঢ্যাঙা, মাথায় কদমছাঁট চুল। নাকের নীচে এক চিলতে গোঁফ। যুগের প্রতীক, বালি প্রতিভা, বিএনআর হয়ে মোহনবাগান। সুব্রত ভট্টাচার্য।
ইস্টবেঙ্গলে সই করা পাকা হয়ে গিয়েছিল। পল্টু দাস, জীবন চক্রবর্তীরা ফাইনাল করে ফেলেছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন চুনী গোস্বামী। শ্যামনগরের সুব্রত ভট্টাচার্য, যার ডাক নাম বাবলু, তাদের বাড়িতে সটান হাজির। মোহনবাগানে খেলতে হবে।
সুব্রতর মামারা আদ্যন্ত মোহনবাগান। শ্যামনগরের সুযোগ্য সন্তান কেষ্ট পাল মোহনবাগানে খেলে বেজায় সম্মান পেয়েছেন। সুব্রতর পিতৃদেব ফরমান দিলেন— ‘‘চুনীবাবু যখন এসেছেন তখন তুমি মোহনবাগানেই খেলো।’’
আসলে চুনী গোস্বামী খেলা ছাড়লেও তখনও হিরো। শ্যামনগরের গাঁধী কলোনি এই রকম আলোক দ্যুতিময় উপস্থিতি আগে দেখিনি।
রক্তাক্ত দর্শক
মনেপ্রাণে মোহনবাগানি সুব্রতর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না। তখন কি সুব্রত জানত, মোহনবাগানই তার ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন হয়ে উঠবে?
মোহনবাগানে প্রথম বছর সুব্রত দুটি নাম পায়। লগা আর সিআরপি। এরিয়াল বলে তার হেড দেওয়ার দক্ষতা সুব্রতকে লগা নামটি এনে দেয়। আর বিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের তছনছ করার প্রবণতাটি দেয় সিআরপি নামটি। আদরের নাম। পরে অবশ্য গ্যালারি তাকে মোহনবাগানের উত্তম কুমার কিংবা অমিতাভ বচ্চন বলেও ডেকেছে।
সেই সময়ে ময়দানে এসে গেছে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুজ। মোহনবাগানেই। কথা বলে দাদার মতোই অনর্গল। কাইজার স্ট্রিট থেকে স্কুটার নিয়ে ময়দানে প্র্যাকটিসে আসে। বিকেলে খেলা থাকলেও সেই স্কুটার।
ইস্টবেঙ্গলে তখন দাপাচ্ছে বরানগরের ছেলে গৌতম সরকার। কেউ কেউ তখন বলত, ডানপিটে ডাকাবুকো গৌতম নাকি নকশাল করত, সেই মোডটাই ঘুরে যায় ফুটবলে।
আমাদের সেই রবার্ট হাডসনের সুরজিৎ সেনগুপ্ত তত দিনে ইস্টবেঙ্গলে। পরিশীলিত পরিমিত আচরণে সম্ভ্রম আদায় করে নেয়।
সমরেশ চৌধুরী, মানে ময়দানের পিন্টু  মাঠ কাঁপাচ্ছে। ক্যাজুয়াল অ্যাপ্রোচ, কিন্তু মাঠে নেমে ভয়ঙ্কর।
সুধীর কর্মকার তো তখন ইস্টবেঙ্গলের পিলার। সুরজিতের মতোই বর্ধমান কিংবা ব্যান্ডেল লোকাল ধরে মাঠে আসত।
এক ঝাঁক বর্ণময় চরিত্রের উপস্থিতিতে সত্তর দশক তখন উত্তাল।
পঁচাত্তরের শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের সেই পাঁচ গোলের পদস্খলন দেখেছিলাম এক টাকা দশ পয়সার গ্যালারিতে বসে।
আমার সে দিনের সঙ্গী ছিল এখানকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তবলিয়া ব্যান্ডেলের ছেলে সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাগ্যক্রমে টিকিট দুটো পেয়েছিলাম ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের গ্যালারিতে। সুনীল আবার এতটাই মোহনবাগানি যে সবুজ মেরুন হারলে অন্নজল ত্যাগ করে। মোহনবাগান এক-একটি গোল খাচ্ছিল আর সুনীল কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
ম্যাচ দেখব কী, ওকে সামলাতেই আমার হিমশিম অবস্থা। ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে এই রকম কট্টর মোহনবাগানিকে নিয়ে। সন্দিগ্ধ চোখে দু-চারজন ইস্টবেঙ্গল সমর্থক তাকাচ্ছিলেন।
শিল্ড ফাইনাল, ১৯৭৯
ওঁদের বললাম, দলের এই রকম পারফরমেন্স দেখে আনন্দে ওইরকম করছে! ম্যাচ শেষে সুনীলকে নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি।
মনে আছে, ওই ১৯৭৫ সালে কী আগ্রাসী ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কাজল ঢালি তখন ইস্টবেঙ্গলের বিখ্যাত ব্যাক। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালের সকালে কলকাতার একটি খবরের কাগজে চার লাইনের একটি খবর প্রকাশিত হল— কাজল ঢালির মাতৃবিয়োগ!
অথচ কাজল ঢালির মা বহাল তবিয়তেই ছিলেন। শোনা যায়, ইস্টবেঙ্গলের মানসিকতায় চিড় ধরানোর জন্যই নাকি কাগজে খবরটি খাওয়ানো হয়। পরদিন অবশ্য কাগজটি ভ্রম সংশোধন করতে দ্বিধা করেনি।
পঁচাত্তরের শিল্ড ফাইনালের পর রাতে মোহনবাগান ফুটবলাররা তো পালিয়ে বাঁচে। সুব্রত ভট্টাচার্য মাঝগঙ্গায় নৌকায় আশ্রয় নেয়। তখনকার দিনে নগদ ৩০ টাকা গুনে। প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মগোপন করে।
এত দিন পর্যন্ত সার্কাসের এরিনার বাইরে দর্শক আসনে বসে আমি দুরন্ত দুর্নিবার সত্তরকে দেখছিলাম। এক ধাক্কা দিয়ে কে যেন আমাকে এরিনার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল মধ্য সত্তরে।
আমি সাংবাদিকতা পেশায় এলাম। আর আমার সামনে যেন চিচিং ফাঁক মন্ত্রে আলিবাবার গুপ্তধনের দরজা খুলে গেল। ফুটবল মাঠের কুশীলব যে চরিত্রগুলিকে এত দিন রূপকথার নায়কের জায়গায় বসিয়ে রেখেছিলাম, তারা নিদারুণ ভাবে কাছাকাছি চলে এল।
এত দিন গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখতাম, এখন কাঠের প্রেসবক্সে আমার অবারিত দ্বার। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল কিংবা মহামেডান তাঁবুর বাইরে রেলিং ধরে অবাক বিস্ময়ে খেলোয়াড়দের, কিংবদন্তি কর্মকর্তাদের দিকে এত দিন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম, এখন তাঁবুতে আমার অনায়াস প্রবেশ।
ছোট্ট একটা হলুদ রঙের প্রেস কার্ডের কী অপার মহিমা!
নকশাল আমলের বিপ্লবী রোম্যান্টিকতা ভুলে বাঙালি তখন দুর্দান্ত ভাবে মজেছে ফুটবলে আর সিনেমায়। উত্তমকুমার-সুপ্রিয়াদেবী একটার পর একটা হিট ছবি দিচ্ছেন। আর দুপুরের পরেই বাঙালি ছুটছে ময়দানে।
বড় ক্লাবের ফুটবলাররা এক একজন আইকন। সকালে ময়দানে প্র্যাকটিসের পর তাঁবুতেই দুপুরের খাওয়া। তার পর অফিস। অফিসে সই সেরেই ক্যান্টিনে আড্ডা, নয়তো ম্যাটিনি শো। তার পর পাড়ায় ফিরে হিরো ওয়ারশিপ কুড়িয়ে নেওয়া।
ম্যাচের দিনটা ব্যতিক্রম।
সে দিন আর প্র্যাকটিস নেই। দুপুর-দুপুরই ক্লাব তাঁবু। দরজা জানলা বন্ধ করে কুল ডাউন। তার পর ওয়ার্মআপ।
দলবদলের স্বাক্ষরে সুব্রত ভট্টাচার্য
প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ভোকাল টনিকের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। অরুণ ঘোষ আপাত নির্লিপ্ততা নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে এঁকে স্ট্র্যাটেজি বোঝাচ্ছেন, সাত্তার সাহেব ঠান্ডা মাথায় দল নির্বাচন করছেন। অচ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক খেলোয়াড় তৈরি করছেন। স্বরাজ ঘোষ দেখা হলেই বোঝাচ্ছে আধুনিক ফুটবলের অভাবটা কোথায়, নিখিল নন্দী শান্ত চিত্তে খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিচ্ছেন।
ম্যাচ না থাকলে বিকেল হতেই তাঁবুতে তাঁবুতে জটলা।
ভিড় প্রায় উপচে পড়ে পড়ে। তার মধ্যেই স্যুট-টাই পরিহিত ধীরেন দে রাজকীয় মেজাজে নাকে সুগন্ধিমাখা রুমাল চেপে মোহনবাগানের গোলটেবিলে বসছেন। বাইরের লনে কাঠের বেঞ্চিতে ধুতি পাঞ্জাবিতে কুমারবাবু, মানে উমাপতি কুমার। বিকেলেও নানা প্রশাসনিক কাজ নিয়ে ছোটাছুটি করছেন শৈলেন মান্না। চুনী গোস্বামী এলে তখনও তাঁকে ঘিরে ভিড়ের বলয়।
ইস্টবেঙ্গলে নিশীথ ঘোষ, সুপ্রকাশ গড়গড়ি, স্বপন ঘোষদের পদচারণা। জিপ, মানে জীবন চক্রবর্তী, পল্টু দাসদের দাপট আরেকটু পর থেকে। সুপ্রকাশ গড়গড়ি বিখ্যাত ইমপ্রেশারিও। লতা মঙ্গেশকর থেকে কিশোরকুমার তাঁর এক ডাকে উড়ে আসেন। ব্যস্ত গড়গড়িদাকে দেখলেই ইস্টবেঙ্গল জনতা আশান্বিত। এ বার কিছু একটা ঘটবে। স্বপন ঘোষ স্ট্র্যাটেজিস্ট। সন্ধের পর হাইকোর্ট পাড়ার একটা রেস্তোরাঁয় বসে ক্লাবের রাজনীতির ছক কষেন। সিআইটি রোডের অরুণ ভট্টাচার্য কিংবা দেবুদারা তখন রীতিমতো ক্লাবে নেপথ্যের চালিকাশক্তি।
মহমেডানে যেমন কখনও এরফান তাহের র‌্যান্ডেরিয়ান কিংবা তাঁর মামা গোলাম মোস্তাফা। আর পরে তো এসে গেলেন ডন মীর মহম্মদ ওমর কিংবা ইব্রাহিম আলি মোল্লারা।
খেলোয়াড়দের মতোই সত্তর দশকে এঁদের কার্যকলাপ নিয়েও প্রভূত কৌতূহল।
মোহনবাগান তাঁবুতে অসাধারণ ঘুগনি- আলুর দম বিক্রি করে সদর স্ট্রিটের একজন মানুষ। ঘুগনিতে আবার চাকা চাকা করে কেটে ছড়িয়ে দেয় ডিমসেদ্ধ। ফুটবলার, কর্মকর্তা থেকে সমর্থক সবার কল্যাণে শালপাতার পর শালপাতা ঘুগনি-আলুরদম উড়ে যায়।
মাঝমাঠে সুভাষ ভৌমিক
ইস্টবেঙ্গল মাঠের ক্যান্টিনটির তেমন নামডাক ছিল না। ছিল শরিক দল এরিয়ানের ক্যান্টিনের। জনৈক বড়ুয়ার ক্যান্টিনে চপ-কাটলেট, ফিশফ্রাই, গরম চা মিলত।
মোহনবাগানের ক্যান্টিনের বিখ্যাত ছিল মাটন কিংবা চিকেন স্টু। মহমেডানে গেলেই মিলত তেলেভাজা। পেঁয়াজিকে কেন যে ওঁরা পেঁয়াজু বলে ডাকতেন কে জানে!
সত্তরের দশকে ফুটবলের উন্মাদনার সঙ্গে এ সব খাবারের গন্ধ ম’ম’ জড়িয়ে আছে অনুষঙ্গ হিসেবে।
ম্যাচের সময় গ্যালারিতে লজেন্স বিক্রি করতেন লজেন্স দাদু। বয়ামে করে লাল-হলুদ-সাদা লজেন্স। ভারতের যে কোনও মাঠে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান কিংবা মহামেডানের খেলা থাকলে সেখানে পৌঁছে যেতেন লজেন্স দাদু।
পরে এলেন লজেন্স দিদি। ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার। কিন্তু মোহনবাগান গ্যালারিতেও সমান আদৃত।
সত্তর দশকের ফুটবলের এমনই মহিমা যে দলের ম্যাসিওররাও রীতিমতো বিখ্যাত, তাদের নিয়ে ফিচার লেখা হয়। মোহনবাগানের ফুটবল সচিব তখন তিওয়ারি ব্রাদার্সের তিওয়ারিদা, ম্যাসিওর লক্ষ্মণ। এই লক্ষ্মণ কত গোপন খবর যে আমাদের দিয়েছে!
যেমন ইস্টবেঙ্গলের সেই বিখ্যাত রোগা ম্যাসিওর ভদ্রলোক, যিনি কোনও খেলোয়াড় চোট পেলেই হাতে মাসাজ অয়েল আর লোশন নিয়ে কার্ল লিউইস হয়ে যেতেন।
শ্যাম-মনোরঞ্জন ডুয়েল
সত্তর দশকের সেই অলৌকিক রূপকথার বর্ণনা দিতে গিয়ে এঁদের উপেক্ষা করি কী ভাবে?
সেই সময়ে খবরের কাগজও বদলাচ্ছে। ফুটবলারদের জীবনের কাহিনি, তাদের মাঠের বাইরের জীবনযাত্রাও খবর হচ্ছে। নানা ধরনের ফিচার বের হচ্ছে। ফুটবলাররাও দিব্যি উপভোগ করছে তাদের স্টারডম।
লিন্ডসে স্ট্রিটে ধুলনের টেলারিং শপটি ছিল সেই সময়ের মাঠ কাঁপানো কয়েকজন ফুটবলারের আড্ডার জায়গা, ঝুলন নামটি যতই রোম্যান্টিক বলে মনে হোক, এই ঝুলনের চোখে চশমা এবং নাকের নীচে পুরুষ্টু একটি গোঁফ।
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম সরকার আর অন্য ফুটবলাররা নিয়মিত দুপুরবেলা আড্ডা দিতে আসত ঝুলনের টেলারিং শপে।
সুব্রত ভট্টাচার্যকেও বোধ হয় দু-একবার দেখেছি এখানে। এই ফুটবলারদের সঙ্গে সাংবাদিক আমার বয়েসের ফারাক প্রায় না থাকাতে প্রত্যেকের সঙ্গেই একটা নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল
সেই সময়ে। যেটা পেশাগত
ক্ষেত্রে কাজ দিত, আবার অসুবিধারও কারণ হত।
এই লিন্ডসে স্ট্রিটে যাওয়ার মুখে আমি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম সরকারকে মব্‌ড হতে দেখেছি। জনতার ভি়ড় থেকে তাদের মুক্ত করতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এমন দৃশ্যও দেখেছি।
(চলবে)

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/remembering-maidan-of-70-1.413875

রায় বনাম ঘটক

$image.name

রায় বনাম ঘটক

১২ জুন, ২০১৬, ০০:০২:০০
Shooting of Ajantrik

অযান্ত্রিক-এর শ্যুটিং

অভিযান’ দেখতে গিয়েছেন সত্যজিতের অনুরোধে। মাঝপথেই উঠে পড়লেন। প্রকাশ্যেই সত্যজিৎকে গালিগালাজ করতে শুরু করলেন। কেন মেজাজ হারিয়েছিলেন? মদ্যপান করে একদিন তুষার তালুকদারকে বলেছিলেন তার উত্তর।
‘‘মৃণাল ছবিটি দেখে এসে বলল, ঋত্বিক ছবিটি দেখে এসো। তুমি দেখবে মানিকবাবু বহু জায়গায় অযান্ত্রিক-এর প্রায় হুবহু কপি করেছেন। আমি ইন্দিরাতে ছবিটি দেখতে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই! অসংখ্য ফ্রেম এক্কেবারে হুবহু এক। মাঝপথে খেপে গিয়ে উঠে পড়লাম। কারণ আমার মনে হল, ছবিটা কিছুই দাঁড়ায়নি।’’   
অথচ, নিজের ‘অযান্ত্রিক’ রিলিজ হওয়ার পর তার বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত সত্যজিৎ রায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন! যখন সত্যজিতের ‘অশনি সঙ্কেত’ রিলিজ করল, তখনও!
ঋত্বিক হাসপাতালে। ঠিক করলেন উৎপল দত্তর ‘ব্যারিকেড’ দেখতে যাবেন। হঠাৎ করেই মত বদলে দেখলেন ‘অশনি সঙ্কেত।’ সেবারও হল থেকে বেরিয়ে হতাশ! বললেন, ‘‘অশনি সঙ্কট দেখিয়ে কেন আমার মতো অসুস্থ লোককে আরও সঙ্কটে ফেললে। মানিকবাবু চূড়ান্ত ধেড়িয়েছেন। শেষ দৃশ্যটা মনে করো, সেখানে মন্বন্তরের কোপে পড়া হাজার হাজার ভুখা মানুষের মিছিল দিয়ে ছবি শেষ হয়েছে, তাই তো?’’
ঋত্বিক মনে করতেন, গল্পের মতোই শেষটা হওয়া দরকার ছিল।
বলেছিলেন, ‘‘মৃত্যুর মিছিল নয়, নতুন জীবনের সৃষ্টি। এইটাই শেষ কথা।’’ নিজেও সব ছবির শেষে তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন।
এর মানে এই নয়, মানিকের সঙ্গে ঝগড়া ছিল ঋত্বিকের। ৬৫-তে সত্যজিতের সুপারিশেই তাঁর পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে কাজ হয়। শোনা যেত, সারা কলকাতা ঘুরে ঋত্বিক লেক রোডে সত্যজিতের বাড়ি দেখিয়ে দিতেন ট্যাক্সিওয়ালাকে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসতেন। ড্রাইভারকে কেবল জিজ্ঞেস করতেন, ‘‘কত?’’
সত্যজিৎ মিটিয়ে দিতেন বিল!
জানলায় এসে দাঁড়াবেন চিরচেনা সওয়ারিকে দেখতে, ততক্ষণে ঢো‌লা পঞ্জাবি, কাঁধে ব্যাগ ভবা হাওয়া!
স্মৃতি থেকে সত্যজিৎ জানিয়েছিলেন, ঋত্বিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই চিনতেন। সেটা ‘ছিন্নমূল’ ছবির সুবাদে। ফিল্ম সোসাইটির একটা মিটিং-এ প্রথম আলাপ হয়। স্মৃতি থেকে তিনি বলছেন, ‘‘সে সময় বোম্বেতে বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করছে, বিমল রায়ের ছবির চিত্রনাট্য লিখছে। তার কিছু আগে ‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে, সে ছবি দেখেছে এবং দেখে তাঁর খুবই বেশিরকম ভালো লেগেছিল। সে-কথা সে প্রাণ খুলে আমার কাছে বলে। কিন্তু আমার কাছে যে-জিনিসটি সব চাইতে ভালো লেগেছিল সেটা সে যে ভাবে ছবিটাকে বিশ্লেষণ করেছিল, তার কয়েকটা দৃশ্যকে, সেটা থেকে আমার মনে হয়েছিল, ঋত্বিক যদি ছবি করে তাহলে সে খুব ভালোই ছবি করবে।’’
সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ দেখে কয়েকটি দৃশ্যের সমালোচনাও করেছিলেন ঋত্বিক। তাঁর মনে হয়েছিল, ‘‘দুর্গা মারা যাওয়ার আগের ঝড়বৃষ্টির দৃশ্য, সেটা বেশ কাঁচা। দুর্গার মৃত্যুর খবরে হরিহর বা সর্বজয়ার প্রতিক্রিয়াও ঠিকমতো ফোটেনি।’’ তুষার তালুকদারকে তার কারণ বলতে গিয়ে ঋত্বিক বলছেন, ‘‘অভিনয়ের দুর্বলতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে দক্ষিণা ঠাকুরের তারসানাইয়ের সুর।’’
সত্যজিৎ তাঁকে নিয়ে বলতে গিয়ে বলছেন, ‘‘আমরা যারা প্রায় গত চল্লিশ বছর ধরে ছবি দেখছি, তাদের মধ্যে তো প্রায় ত্রিশটা বছর কেটেছে হলিউডের ছবি দেখে, কেন-না কলকাতায় তার বাইরে কিছু দেখবার সুযোগ ছিল না সে সময়টা। উনিশো ত্রিশ বা পঁচিশ থেকে শুরু করে প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বা ষাট অবধি আমরা হলিউডের বাইরে খুব বেশি ছবি দেখতে পারিনি।... কিন্তু ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে সম্পূর্ণ সে-প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল, তাঁর মধ্যে হলিউডের কোনও ছাপ নেই। ... ঋত্বিক মনে-প্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল, আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তাঁর বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট।’’
ঋত্বিকের স্মরণসভায় সভাপতি ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
শোকসন্তপ্ত সরলা মেমোরিয়াল হল। মঞ্চে মৃণাল সেন, বিজন ভট্টাচার্য। ছিলেন কবি পূর্ণেন্দুও। লিখছেন, ‘‘সভাপতি শেষ করলেন তাঁর ভাষণ। দর্শক বা শ্রোতা নিস্পন্দ। এ বার তিনি পাঠ করবেন একটি শোকপ্রস্তাব। পাঞ্জাবির পকেট ঘাঁটছেন চশমার জন্যে। তখন চোখে পড়ল, তাঁর চোখের প্রান্তে একবিন্দু গোপন অশ্রু!’’

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/roy-vs-ghatak-their-relationship-1.408020

ঋত্বিককে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন উৎপল দত্ত

$image.name

ঋত্বিককে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন উৎপল দত্ত

কেন? ঋত্বিক ঘটকের থিয়েটার করার নানান কাহিনি

১১ জুন, ২০১৬, ০০:০২:০২
Ritwik Ghatak
খুব অল্প বয়সেই গল্প লিখতে লিখতে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল ‘‘গল্পটা inadequate।’’
সেই জন্য নাটকে চলে এসেছিলেন ঋত্বিক। বলছেন, ‘‘ভাবলাম গল্প ক’জন লোককে নাড়া দেয়, আর নাড়া দেয় অনেক গভীরে গিয়ে, কাজেই অনেক সময় লাগে পৌঁছতে। আমার তখন টগবগে রক্ত, immediate reaction চাই। সেই-সময়ে হল ‘নবান্ন’। ‘নবান্ন’ আমার সমস্ত জীবন-ধারা পাল্টে দিল।... আমি নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়লাম!’’
আবার নাটক করতে করতেই তাঁর মনে হল, কয়েক হাজার নয়, লক্ষ মানুষের কাছে যেতে হবে। ‘‘এই ভাবে আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে better medium বেরয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি চলে যাব। I don’t love film. সিনেমার প্রেমে মশায় আমি পড়িনি।’’
কিন্তু নাটকই ছিল তাঁর সারা জীবনের পথের দাবি, বক্তব্য প্রকাশের জোরালো মাধ্যম! 
‘নবান্ন’ দেখার পরেই ঋত্বিকের সঙ্গে যোগ বাড়ে প্রগেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের। সেখানে তখন চাঁদের হাট। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, সুধী প্রধান, গোপাল হালদার প্রমুখ। সভাপতি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সদস্য হয়ে গেলেন ঋত্বিক। কিন্তু এখানেও যেন স্বস্তি মিলছে না। এমন অস্থিরতাই যে তাঁকে সারাজীবন তাড়া করেছে। যার সমালোচনাও করেছেন তাঁর গণনাট্যের সহ-যোদ্ধারা।
ঋত্বিকের প্রথম দিকের নাট্য অভিনয় ‘চন্দ্রগুপ্ত।’ সেটা ১৯৩৬ সাল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই নাটকে ঋত্বিক চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করত রিচি-রোড, ম্যাডক্স স্কোয়ারে। সে সময় তাঁর অল্প বয়স। দাদা মণীশচন্দ্র কলকাতায় তাঁকে এনে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তার পরে পরেই ঋত্বিকের নাটকে হাতেখড়ি।
যুদ্ধ শুরু হলে, রাজশাহী ফিরেও নাটক থেকে সরলেন না।
১৯৪২ সালে ঋত্বিক যখন ম্যাট্রিক দিয়ে ঝাড়খণ্ড কোলিয়ারিতে গেল দিদির বাড়ি, সেখানেই ফের অভিনয় করলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নটীর পূজা।’ সে কী উন্মাদনা! নিজেই নির্দেশনায় নামলেন এর পরে পরেই। পরের বছরই রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে করলেন ‘অচলায়তন।’ একে একে ‘ডাকঘর’, ‘রাজা’, ‘ফাল্গুনী’, ‘বিসর্জন’, ‘পরিত্রাণ।’ কখনও অভিনয় করছেন, কখনও নির্দেশক। আবার কখনও মেতে উঠছেন নাটকের আবহ নিয়ে!
 রবিঠাকুর থেকে বের হলেন ‘জাগরণ’ করতে গিয়ে।
সেটা ১৯৪৭। বহরমপুরে কৃষ্ণনাথ কলেজের পরীক্ষা দিতে গিয়ে ‘ক্রান্তি শিল্পী সঙ্ঘ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ। ক্রান্তি শিল্পী সংঘের প্রযোজনাতেই ঋত্বিক জিন্নার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ৪৭-৪৮ থেকেই বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা। তখন নাটক নিয়ে খুব মেতেছেন। ‘বহুরূপী’ ১৯৪৮ সালে ‘নবান্ন’ নাটকের শো করে। শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় তাতেও অভিনয় করলেন ঋত্বিক। শম্ভু মিত্র- দয়াল ওটাউট, ঋত্বিক- রাজীব।
‘নবান্ন’ নাটকে সাফল্যের পরে ৪৯-এ গণনাট্যের নতুন নাটকে হাত দিলেন। ‘ঢেউ।’ নাটকে বৃদ্ধ কৃষকের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করলেন। প্রথম অভিনয় যাদবপুর কলেজের হস্টেলের ছাদে। পরের শো সেই রাতেই। সিটি কলেজে। সে দিন ঋত্বিক মেকআপ নিয়ে উৎপল দত্তের কাছে পয়সা চাইতে গেলেন।
তাড়িয়ে দিলেন উৎপল!
চিনতে পারেননি! অভিনেতা ঋত্বিকের পরের নাটক বিজন ভট্টাচার্যের নির্দেশনায় ‘নীলদর্পণ।’
‘জাগরণ’-এর জিন্না থেকে ‘বিসর্জন’-এর রঘুপতি, ‘ঢেউ’-এর বৃদ্ধ কৃষক, ‘নীলদর্পণ’-এ তাঁর অভিনয়, তাঁর নির্দেশনা ক্রমশ তাত ছড়াল শহরে।
কিন্তু কিছুতেই যেন শান্তি পান না ঋত্বিক। গল্প, নাটক, সিনেমা... কোথাও না! সারাক্ষণ অদ্ভুত এক ছটফটানি।
একটু একটু করে সেটাই কাল হল। দলে তাঁর শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন উঠল। বিজন লিখছেন, ‘‘ওকে অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি। বলেছি, ‘অ্যানার্কি’রও একটা ডিসিপ্লিন আছে। ... কিন্তু একটা ‘ডিমিনিক ক্রিমিন্যালিটি’, একটা ‘ম্যাসোকিজম’ ওকে পেয়ে বসেছিল!’ একই কথা বলেন তাপস সেনও। ‘‘ফেলে-আসা গ্রাম, নদী, আর্কিটাইপাল চরিত্র, এসব নিয়ে থিয়েটার হয় না।’’
ঋত্বিক বুঝতে পারেন না তাঁর দোষ কোথায়!
‘নাগরিক’ যন্ত্রণা যে তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।
মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় দেশভাগ, রাজনীতি, বিষণ্ণ দেশ-কালের ছবি। সেই ছবিতে নোঙরহীন চরিত্রের মিছিল। লিখতে বসলে, ছবির অবয়বের মিশে যায় মেলোড্রামা! পুরাণ থেকে কখনও গল্পের গায়ে এসে ঠেকে পুরাণ-কল্প। তাঁর সম্পর্কে তাঁরই সহ-যোদ্ধা উৎপল দত্ত বলছেন, ‘ঋত্বিক যখন থিয়েটার করত, তখনও ছবি করার কথাই ভাবত।’
সে সময় শহরে পর পর ৩১টা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল!
‘পিপলস এজ’ কাগজে রিপোর্ট করতে গিয়ে অস্থিরতা বাড়ল ঋত্বিকের। লিখলেন, বিষাদময় ‘জ্বালা।’ অনুপকুমার বিবেকানন্দ রোডের একটি ঘরে মহলার ব্যবস্থা করে দিলেন। আলো করলেন তাপস সেন। প্রম্পটার, মৃণাল সেন! কোথায় কোথায় সব অভিনয় হয়েছিল। লেকভিউ রোডে খোলা জায়গায়, ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে, হরিশ পার্কে!
রিহার্সাল হয়েছিল শোভা সেনের বাড়ি!
১৯৫১ সালে ঋত্বিক মেতে উঠলেন বন্ধু বিজনের ‘কলঙ্ক’ নাটক নিয়ে।
দুই গোরা সৈন্যের ভূমিকায় ঋত্বিক এবং উৎপল দত্ত। বিজন লিখছেন, ‘‘ঋত্বিকের মাতলামি আর উৎপলের বীভৎস উল্লাসে প্রথম দৃশ্যটাই একটা বীভৎস ক্রুঢ় রূপ নিত। তার মুখোমুখি দাঁড়াতেন প্রভাদেবী।’’ এর পরেই অভিনয় করলেন উৎপলের ‘ভাঙা বন্দর’-এ। গণনাট্যের মধ্য কলকাতা শাখার প্রযোজনায় সঙ্গীত করেছিলেন সলিল চৌধুরী। আর আবহ হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজিত বসু।
পার্টিতে ঋত্বিককে নিয়ে নানা বিরোধ থাকলেও যখন তিনি রস্ট্রামের সামনে দাঁড়ান, অন্য মানুষ।
১৯৫৫-তেই উৎপলের পরিচালনাতেই অভিনয় করলেন ‘বিসর্জন’ নাটকে।
আবার রঘুপতি। রস্ট্রামের উপর উঠতে উঠতে তাঁর অবিস্মরণীয় সেই অভিনয়, সংলাপের থ্রোয়িং মনে রেখেছে এ শহর! উৎপলের পরিচালনাতেই একবার ঘাটশিলায় সেই নাটক করতে গিয়ে নিদিষ্ট সময়ের আগে পর্দা ফেলে দিয়েছিল গণনাট্যের এক কমরেড। তাতে ঋত্বিেকর শেষ দৃশ্যটি অধুরা রয়ে যায়।
রেগে গেলেন। বেরিয়ে সেই কমরেডের গালে সপাটে চড়!
এ শহর মনে রেখেছে, ভোটের হাওয়ায় ভারতীয় গণনাট্যের জন্য ‘ইনস্পেক্টর জেনারেল’-এর অনুবাদ নাটক ‘অফিসার।’
এ নাটকে কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই একটি চরিত্রে নেমেছিলেন ঋত্বিক। শোভা সেনের স্মৃতি বলছে, ‘‘প্র.না.বি-র অনুবাদ আমাদের মনে ধরল না। তখন ঋত্বিক এর নতুন নাট্যরূপ দিল। সেটি সকলেরই বেশ ভাল লাগল। আমার বাড়িতেই মহড়া শুরু হল জোর কদমে। প্রথমে কালী ব্যানার্জি করত অফিসারের ভূমিকাটি। কিন্তু বাইরের কোনও একটি জায়গায় কালী এসে পৌঁছলো না। তখন ঋত্বিক ওই সময় নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে পার্টটি করে সুষ্ঠুভাবে।’’
শহরের মনে আছে পথনাটিকা ‘ভোটের ভেট।’ ট্রাক ভাড়া করে তাতে অভিনয় করতেন উৎপল দত্ত, পানু পাল, শোভা সেনদের সঙ্গে এক বুড়ো কৃষকের ভূমিকায় ঋত্বিক। গোটা দিন শো। শহিদ মিনার থেকে কসবা-কৃষ্ণনগর, খাওয়া নেই, ঘুম নেই।
রাঙা টুকটুকে দিনের স্বপ্নে অক্লান্ত ছিল সেই পথ চলা!
যে কয়েকটি নাটকের জন্য ঋত্বিকের নাম নাট্য-আন্দোলনে চিরদিনের জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নাটক ‘দলিল।’ ১৯৫২ সালে নিজের লেখা সেই নাটকটি নিয়েই তিনি পাড়ি দিলেন গণনাট্যের কনফারেন্সে বোম্বে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় হয় আমন্ত্রিত কয়েক জনের সামনে, ভূপতি নন্দীর বাড়ির ছাদে।
পরিচালনা ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। বোম্বে ছাড়া ভদ্রেশ্বর, উত্তরপাড়া, বালিতে অভিনয় হয়। তাঁর ‘সাঁকো’, ‘স্ত্রীর পত্র’ খুবই চর্চিত প্রযোজনা। ১৯৬৯ সালে, প্রান্তবেলায়, যখন অসুস্থ, গোবরা মানসিক হাসপাতালে রয়েছেন, লিখলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে অভিনয়ও করালেন।
আর মৃত্যুর ঠিক আগের বছর করলেন ‘জ্বলন্ত।’
সারা জীবনে যখনই গল্প লিখতে লিখতে, ছবি করতে করতে থমকেছেন তিনি, নাটকই সেই খরার দিনে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সরে যেতে চেয়েছেন, পারেননি।
ঠোক্কর খেতে খেতেও টাল সামলে বার বার ভাঙা দেশ, উদ্বাস্তু জীবন আর কলোনির গল্পকে নিজের মতো করে বলেছেন মঞ্চের সংলাপে। তাঁর সুহৃদদেরই কেউ কেউ বলছেন, ‘হি ওয়াজ নেভার সিনসিয়ার টু দ্য থিয়েটার’, কিন্তু, শেষ পর্যন্ত গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে ঋত্বিকই জায়গা করে নিল অনেকখানি। শোভা সেন তাই তাঁকে বলছেন, ‘নাট্য-আন্দোলনের হোতা বা পুরোহিত!’ 

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/various-stories-of-ghatak-s-works-in-theater-1.408022

ঋত্বিক! একটি নদীর নাম

$image.name

ঋত্বিক! একটি নদীর নাম

ঋত্বিক কুমার ঘটক। তাঁর রাগ, যন্ত্রণা, হতাশা, ঘেন্না, বিচ্ছেদ, একরোখামি, চিৎকার নিয়ে এক গনগনে জীবনের ছবি আঁকছেন আবীর মুখোপাধ্যায়

১১ জুন, ২০১৬, ০০:০২:০০
Ritk Ghatak
রাতের ট্রেন।
গন্তব্য বহরমপুর।
সংবর্ধনা নিতে চললেন ঋত্বিককুমার ঘটক। সঙ্গে তাঁর সহকারী সুনীল দত্ত, গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কবি পূর্ণেন্দু পত্রী। শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরার আগে, মিনার্ভা হোটেলে সন্ধ্যা-আহ্নিকে বসেছেন ঋত্বিক। বজ্রের মতো গর্জমান।
‘‘দাঁড়াও হে, দাঁড়াও! সবটা শুনে যাও। দু’পেগ একসঙ্গে নিয়ে আসবে। দু’ পেগ!’’ 
‘‘সোডা?’’
‘‘না হে না, আমার নাম ঋত্বিককুমার ঘটক! সোডা দিয়ে কখনও মদ খাই না। যাও, যাও জলদি নিয়ে এসো! জলদি!’’
দু’পাত্তর চড়তেই চোখ লাল। গাড়ি ছুটল শিয়ালদার দিকে। যাত্রাসঙ্গী পূর্ণেন্দু জানাচ্ছেন, ট্রেনে উঠেই ঋত্বিক তাঁর ময়লা পাঞ্জাবিটা খুলে মেঝেতেই দু’পা ছড়িয়ে বসলেন। ঢোলা পায়জামা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে শুরু হল ফের মদ্যপান। সহকারী কিছু একটা বলতেই গলা চড়ল তাঁর! দাউ দাউ জ্বলে উঠলেন!
‘‘কেন রে শুয়োর! আমার কী দোষ?’’
‘‘হাতে টাকা পেলেই তো আপনার অন্য চেহারা। মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা... জীবনে কিছু তো কম পাননি। কত লোক আপনার পিছনে টাকা ঢালতে রাজি, যদি সুস্থ থাকেন। সে তো থাকবেন না।’’
‘‘কে আমাকে টাকা দেবে শুনি? তোদের ওই বেঙ্গলি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি? মরে গেছে!’’
‘‘মাধবী মুখার্জি ডিস্ট্রিবিউটরদের দোরে দোরে ঘুরে বেড়ায়নি আপনার জন্য? বিশ্বজিৎ প্রোডিউসার, সকলে রাজি ছিল। সেই আপনি বিশ্বজিৎবাবুকে স্ক্রিপ্টটা পর্যন্ত শোনালেন না। বম্বেতে শক্তিদার অনুরোধ ফেরালেন। কেন? না, শ্যুটিং-এ মদ খাওয়া যাবে না।...হিন্দিতে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ হল না! রাজেশ খন্নার অফারও ফিরিয়ে দিলেন! ছিঁড়ে উড়িয়ে দিলেন স্ক্রিপ্ট।... বলুন, মিথ্যে কথা বলছি? জবাব দিন! বলুন?’’
সুনীলের কথা শুনে শিশুর মতো হাসছেন ঋত্বিক! আর হাসতে হাসতেই রেলগাড়ির কামরায় অন্যদের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলছেন, ‘‘হারামজাদা সব জেনে ফেলেছে!’’
তাঁর উচ্ছ্বল হাসি একটু একটু করে ভেঙে ভেঙে মিশে যাচ্ছে রাতের রেলগাড়ির ঝমঝম শব্দে। কামরার পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে পথের হাওয়া। ‘লাথি ছোড়াছুড়ি, খিস্তি, ঠাট্টা’— সবই ঠিক ছিল, গোল বাধল টিটাগড়ে। দু’জন রেলপুলিশ উঠতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল! চিৎকার করে উঠলেন ঋত্বিক, ‘‘এখানে কী? ফার্স্ট ক্লাস কামরায় উঠেছ কেন? শালারা জানে না, চোর-ডাকাত কোথায় থাকে? জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা হচ্ছে? নামো। নামো এখুনি! নইলে লাথি মেরে নামাব। আবার বন্দুক!... ঋত্বিক ঘটকের নাম শুনেছ? শোনোনি। তোদের বাবা কে আছে, তাকে গিয়ে বল যে আমি আছি এই গাড়িতে। বুঝলি...!’’

পূর্ণেন্দু লিখছেন, ‘‘হ্যাঁচকা টানে বন্দুক দুটো ছিনিয়ে নিলেন তাদের কাছ থেকে। ...ঠিক কোন মুহূর্তে যে রক্তপাতের ঘটনা ঘটবে, আমরা শুধু তারই অপেক্ষায়। আমরা অনুনয় করি। চুপ করুন। নেমে যাবে পরের স্টেশনে। আমাদের কথায় তাঁর কান নেই। ...আমাদের দিকে তাকান চোখে-ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি মাখিয়ে।... হাতে গেলাস। টলমলে লাল জল। টলমল ঋত্বিক ঘটকও। হাসিটাও টলমলে জলের ঢেউ। বিজয়ীর হাসি!’’
না, সেদিন কোনও রক্তপাত হয়নি!
খাকি দুটো ‘নুন-গেলা জোঁকে’র মতো চুপটি করে নেমে গিয়েছিল পরের এক স্টেশনে!
আর তাদের নামবার সময় ঋত্বিক খেলনা লাঠির মতো বন্দুক দুটো ছুড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে ফের ডুবলেন লালজলে। তাঁর চাহনি বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে। হাওয়ায় হাওয়ায় এলোমেলো তাঁর চুল। কত কথা মনে পড়ছে আজ। পদ্মা, হাওড়বিল, কাশবনের কথা, রাজশাহী-পাবনার গল্প। বিএ পরীক্ষা দিতে এসে বহরমপুরের দেশভাগের দীর্ণ দিনকাল!

‘‘ভবা? এই ভবা... বড় গাঙে চলল মাল্লারা, ঘাটে যাবি?’’
‘‘কে! কে ডাকে!’’
চমকে ওঠেন ভবা। রেলগাড়ির জানলায় মাথা রেখে কোথায় যেন ভেসে যান! ছলাৎ ছল ঘাটের সামনে এসে দাঁড়ান। স্মৃতির ভিটে ভারেঙ্গা।
দেখেন, কবেকার যমুনা নদী দিয়ে পাবনার গ্রামে পালতোলা নৌকো ভিড়ছে। আশ্বিনের উদাস দুপুর। এক নদী নৌকো। তাঁর মনে পড়ছে, একবার কোজাগরীর আগের রাতে আবছা বিলে সারারাত লগি ঠেলেছিলেন। সারারাত! ‘শেষ রাতে দাঁতে দাঁত লাগা হিমে সে এক অদ্ভুত হতাশার অনুভূতি।’
ঢাকা শহরে শিশিরভেজা হেমন্তে তাঁর জন্ম। বাবা সুরেশচন্দ্র ছিলেন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মী। মা ইন্দুবালা। ঋত্বিক নয় ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন অষ্টম। তিনি এবং তাঁর পরের বোন সাত মিনিটের ছোট, প্রতীতি দেবী। ছোটটির সঙ্গে কত খেলনাবাটি! স্ম়ৃতি যেন আত্ম-হারা পাখি।
‘‘যাস না ভবা, ভবা শোন... ভবা!’’
ছেলেবেলায় ঠিক যেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-র কাঞ্চন ছিল সে। বাঁধন-ছেঁড়া একরোখামি।
প্রথমে ময়মনসিংহের মিশন স্কুলে। তারপরে কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস থ্রিতে। কিন্তু স্কুল পালানো ছেলে, তার কি ক্লাসঘরে মন টেকে! সই জাল করে স্কুল থেকেও উধাও সে! মন যে তার নাটকে। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে সে-ই সাজত চাণক্য। বয়স গড়াতে গড়াতেই ডায়েরির পাতা ভরল গোপন প্রেমের কবিতা। সেই দেখে ম্যাডক্স স্কোয়ারের ছেলের দল খুব খ্যাপাত তাকে।
একদিন যুদ্ধ শুরু হল!
কলকাতা ছেড়ে চলল ভবা। ঠিকানা রাজশাহীতে, ডাকঘর ঘোড়ামারা। একবার পাবলিক লাইব্ররির মাঠে ‘ডাকঘর’ হল। নির্দেশক সে-ই।
কিন্তু ক্রমেই বাতাসে বারুদের গন্ধটা বাড়ছে। ক্রমে অস্থির সে চারপাশের ঘটনায়। তাঁর নিজের কথায়, সে ‘এক বিড়ম্বিত কাল।’
দেশ স্বাধীন হল। ঠিক পরের বছর, ভবা ইংরেজি অনার্সের ছাত্র। তার তখন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই, বের করল কাগজ, ‘অভিধারা’। তাঁর মনে পড়ে, বহরমপুরে কৃষ্ণনাথ কলেজে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল।
তখন থেকেই কাঁটাতারে রক্তাক্ত তাঁর বুক। হাঁটতে হাঁটতে লালবাগ, খোশবাগ ছাড়িয়ে দূরে দূরে কোথায় যে চলে যেতেন। মর্মদাহে কেবলই বলে, ‘বাংলারে কাটিবারে পারিছ, কিন্তু দিলটারে কাটিবারে পার নাই!’

‘‘ঋত্বিকদা, দুই বাংলার ভাগ নিয়ে আপনার সব ছবিতেই বড্ড মাতামাতি!’’
‘‘মাতামাতি! বাংলাকে ভেঙে চুরমার করে দিল, আর মাতামাতি! বিক্ষুব্ধ সময়ে মুজরো করব? এটা বদমাইসি! আমি ওই শুয়োরের বাচ্চা...! চাই, খুব বেশি করে চাই দু’ বাংলার সংস্কৃতিকে এক ফ্রেমে আঁটতে। তাতে তোমরা মাকর্সবাদীই বলো আর যাই বলো। প্রতিবাদ করাটা দরকার। কিন্তু শালা বুঝল না কেউ।’’
নেশায় চুরমার ঋত্বিক! একে একে নিঃশেষ অমৃতের বোতল!
জায়গাটা খালাসিটোলা নয়, অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ক্লাব। ‘যুক্তি-তক্কো-গপ্পো’র পরে নতুন ছবি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলেন ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিক। ঋত্বিক বলছিলেন ‘সে বিষ্ণুপ্রিয়া’ নামে একটি ছবি করতে চান। তার মাঝে দেশভাগ প্রসঙ্গ এসে পড়ায় বাধল তুলকালাম!
‘‘এ দেশের কমিউনিস্টরা...!’’
‘‘শুয়োরের বাচ্চা! সব শালা অশিক্ষিতের দল। কেউ কিছু বোঝে না। ও সব ছাড়ো। ছবির গল্পটা শোনো।’’
বিপদ তখনও ঢের বাকি। ঋত্বিকের উত্তেজিত হয়ে স্টোরি লাইন বলার ফাঁকে হল্লা করতে করতে মঞ্চে প্রবেশ করলেন ত্রয়ী। শক্তি-সুনীল-সন্দীপন!
অদূরে বসে প্রমাদ গুনলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। ছিলেন তুষারবাবুও। তাঁর স্মৃতি বলছে, মদ্যপান করতে করতে হঠাৎ উঠে পড়লেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সকলের পিঠ চাপড়ে ঋত্বিকের ছবির প্রশংসা আদায় করতে শুরু করলেন। একসময় ঋত্বিকের কাছে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন। রেগে গিয়ে উঠে পড়লেন ঋত্বিক!
মুহূর্তে থমথমে পানশালা!
ঋত্বিক বললেন, ‘‘মদ খেয়ে হুল্লোড় করা ব্যাপারটা আমার একদম বরদাস্ত হয় না। এতে নেশাটা চটে যায়!’’
টালমাটাল পায়ে বাইরে গাড়িতে বসতেই গাড়ি ছুটল ময়দানের দিকে। নেশার ঝোঁকে এলোমেলো বকছেন। ময়দানি হাওয়ায় মুঠো ছুড়ে বলছেন, ‘‘প্রতিবাদ করাটা দরকার। কিন্তু শালা বুঝলো না কেউ। সব ভেঙে গেল। দেশ। দল... সব!’’
ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার অনুষ্ঠানে, ১৯৬৪
ভিক্টোরিয়ার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ভবা। একপায়ে চটি। একটু পরেই বেন্টিক স্ট্রিটে তুষারবাবু চটি কিনতে নিয়ে যাবেন। এসপ্ল্যানেডের মো়ড়ে বসে পড়ে ফের মদ খেতে চাইবেন ভবা। ... জ্যোৎস্নায় চারপাশ ধবধবে। একটা নিভন্ত বিড়িকে ধরিয়ে চাইলেন পরীর দিকে।
তাঁর মনে পড়ছে কলকাতার বিক্ষুব্ধ সময়! একদিকে এমএ ক্লাস চলছে, অন্য দিকে গণনাট্য। কখনও বসন্ত কেবিন। সেখানে বসেই সে গল্প-নাটক শোনাচ্ছেন সুহৃদ বিজন ভট্টাচার্য, কুমার রায়দের। একসময় মনে হল, ‘‘গল্পটা inadequate।’’ নিজেই লিখছেন, ‘‘আমার তখন টগবগে রক্ত, immediate reaction চাই। সেই-সময়ে হল ‘নবান্ন’। ‘নবান্ন’ আমার সমস্ত জীবন-ধারা পাল্টে দিল।... আমি নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়লাম!’’
বসন্ত কেবিন থেকে বেরিয়ে হাঁটছেন ওয়েলিংটন স্কোয়ারের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে হাজরা।
ছোট্ট চায়ের দোকানটায়। সেখানেই যে রোজ আড্ডা জমছে। ওরা বলে, ‘প্যারাডাইস কাফে।’ কয়েকটা ভাঙা চেয়ার-টেবিল, কাপ-প্লেট। ঘন ঘন চা খেতে খেতে কথা বলছেন একবগ্গা ঋত্বিক। শুনছেন সলিল চৌধুরী, ঋষীকেশ মুখোপাধ্যায়, তাপস সেন, মৃণাল সেন। সিগারেট নয়, ঋত্বিকের ব্র্যান্ড লাল সুতোর বিড়ি। বলতেন, ‘আমরা আগুনখেকো আঁতেল।’
‘নবান্ন’ দেখার পরেই তাঁর সঙ্গে যোগ বাড়ল প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের। কিন্তু কোথাও যেন স্বস্তি মিলছে না। মনে হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে যেতে হবে! ছবি করতে হবে!
‘‘কিন্তু গল্প কার? তোমার গল্প মানেই তো সেই দেশভাগ, ক‌লোনি আর দাঙ্গা।’’
সহযোদ্ধাদের কথায় খেপে যান ভবা, ‘‘অশিক্ষিতের মতো কথা বোলো না। ছবিতে গল্পের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন এসেছে বক্তব্যের যুগ।’’
‘‘সেই তো ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল মানুষের...!
রুক্ষ রাগি মুখে হঠাৎ উঠে পড়েন ঋত্বিক। আড্ডা ছেড়ে যেতে যেতে বলেন, ‘‘শুয়োরের দল। বাংলার আবার এপার-ওপার কি রে!’’

লেকের ধার। দুপুর। নিভৃত পূর্ণদাস রোডে পাশাপাশি হাঁটছে দু’জন। 
জলের কাছে পা ছড়িয়ে বসে ঋত্বিক। হাঁটু পর্যন্ত তোলা পাজামা। জলে দুলছে তাঁর ছায়া। বাংলা খাচ্ছেন। পাশে আরেকটা বোতল গড়াগড়ি। তাঁকে ঘিরে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়রা। কেউ একজন বসে থাকতে থাকতে একসময় বলেন, ‘‘ঋত্বিকদা আমরা তাহলে একটু...’’
‘‘খাও।’’
দু’ঢোঁক খেতেই ঋত্বিক বললেন, ‘‘আমার কিন্তু টিবি!’’
বেশিক্ষণ কথা বললে কাশি হয়। কাশলে মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে। রুমালে মুখ মুছে নেন। তবু জনতার কী অপূর্ব মুগ্ধতা! সঞ্জয় লিখছেন, ‘‘ওটাই খাওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি। ওটা তখন ঋত্বিক ঘটকের মদ এবং সেটা হচ্ছে প্রসাদ।’’
‘‘ইউনিভার্সিটিতে বার্গম্যানের একটা রেট্রোস্পেকটিভ হচ্ছে ঋত্বিকদা। যাবেন?’’
‘‘বার্গম্যানের পুরোটাই চালিয়াতি, একশোভাগ জোচ্চুরি। আন্তোনিওনির স্টাইলটা ধ্রুপদী। যাকগে, যা বোঝো না তা নিয়ে তোমরা ফ্যাচফ্যাচ কোরো না। শোনো, আরও আট-দশ বছর বাদে লোকে আমার ছবি নেবে। আমার ছবি পাগলের মতো খুঁজবে। তোমরা দেখে নিও!’’
এমন শিবতুল্য ভবাকে তাঁর শিষ্যরা চেনে। তারা শ্রদ্ধা করে। ভবা লেকের গহনে তাকিয়ে নিজের লেখা কবেকার লাইনগুলো ভাবেন। ‘‘মানুষ, তোমাকে ভালবাসি।/ এইভাবে,/ পৃথিবীর ইতিহাস বারবার/ বদলে গেছে,/ তবুও মানুষ, সবসময় বেঁচেছে। মানুষ, তোমাকে ভালবাসি।’’
লেকের জলে ছায়াময় দুপুর দেখতে দেখতে তাঁর মনে পড়ে লেকভিউ রোডে ‘জ্বালা’-র অভিনয়।
সে সময় শহরে পর পর ৩১টা আত্মহত্যার খবর!
‘পিপলস এজ’ কাগজে রিপোর্ট করতে গিয়ে তাঁর সে কি ছটফটানি। ‘সুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ রিপোর্টাজ লিখেও শান্তি নেই। মনে হল, এভাবে নয়। লিখলেন, বিষাদময় ‘জ্বালা।’ তবু জ্বালা জুড়োল কই! আজীবন নীলকণ্ঠ হয়েই রইলেন!
লেকের জলে ছায়ারা দীর্ঘ হচ্ছে।
ছেঁড়া কাঁথা পরে পাগলের ভূমিকায় অভিনয়-স্মৃতির সংলাপ ভেসে এল হাওয়ার চিৎকারে, ‘‘জ্বালা আমারও কম নয়। ব্যথা আমারও আছে। ধোঁয়াচ্ছে! জানলে ধোঁয়াচ্ছে...!’’ অস্থির হয়ে, একটা লাল সুতোর বিড়ি ধরান ঋত্বিক।
দমকা কাশির সঙ্গে সঙ্গে রক্ত ওঠে কেবল। সুখটান দিয়ে প্রথম ছবি ‘ছিন্নমূল’-এর কথা ভাবেন। মনে পড়ে শোভার মুখটা।

শিলং পাহাড়ের এক মেয়ের প্রেমে পড়ছেন ভবা!
ও দিকে ভিতরে ভিতরে ছটফটানি বেড়েই চলেছে। উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে লিখলেন ‘দলিল।’ সেন্ট্রাল স্কোয়াডের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ করলেন। গণনাট্যের কনফারেন্স যোগ দিতে ‘দলিল’ নিয়ে পাড়ি দিলেন বোম্বে। সেখানেই দেখা!
একুশ বছরের দাম্পত্যের স্মৃতিসুধায় সুরমা লিখছেন, ‘‘একটা ভিড়ের দৃশ্যে সমীরণ দত্তের অনুরোধে একটুখানি অভিনয় করে দিয়ে আসি। রোগা, লম্বা চেহারার মানুষটি আমাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে আসেন।’’ ঘনিষ্ঠতা বাড়ল শহরে ফিরে। 
ঋত্বিক তখন মা, দিদিদের সঙ্গে বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে। আর সুরমা শিলং থেকে কলকাতায়, এমএ পড়তে মামার বাড়িতে।
ভবা রোজ সুরমাকে পড়ায়। বই কিনে দেয়। লেনিন, মার্ক্স, প্লেখানভ! ভবার কথায় যুক্তি, প্রত্যয়, ‘বিসর্জন’-এর রিহার্সালে অপর্ণার চরিত্রটি দেখিয়ে দিতে দিতে গহন চোখে চোখ রেখে বলা, ‘যবে বসে আছি ভরা মনে—/ দিতে চাই, নিতে কেহ নাই!’
সব যেন ওলোটপালোট করে দিল সুরমার। প্রেমে পড়ল সেও!
একদিন তাঁর খুব মনখারাপ। পড়তে পড়তে বলছিলেন দু’বছর জেলের কথা, ছেলেবেলায় মাকে হারানোর কথা। ভবার হাতে মায়ের লেখা ডায়েরি তুলে দিলেন। পাতা উল্টে চোখে জল ভবার!
সেই প্রথম নিবেদন! ‘‘লক্ষ্মী! আমি তোমার জন্য সব করব।’’
মুগ্ধতায় অপলক দু’জন! দেরি হয় রিহার্সালে। দু’জনের ঘনিষ্ঠতার নানা কথা ওড়ে হাওয়ায়। বাড়ির নিষেধ, গণনাট্যের গুঞ্জনের তোয়াক্কা না করে স্কোয়াড বদলে নেন সুরমা। রোজ ঋত্বিকের বাড়িতে যান পড়তে। ফিরতি পথে ভবা বলেন হাওড়বিলের গল্প, ময়মনসিংহ আর রাজশাহীর কথা। ‘বেদেনী’র কথা।
সন্ধেরাতের গলিপথে হাঁটতে হাঁটতে একদিন বাঁশির শোক আর তানপুরার জলধ্বনি।
‘‘বেকার যুবকের ঘর বাঁধার স্বপ্নের ছবি ছিল ‘নাগরিক।’ গাঁটের কড়ি খরচ করে আমরা তুললাম জানো। ভূপতি নন্দী বাড়িটা মর্টগেজ দিল। কে যেন প্রভিডেন্ট ফান্ড ভাঙল। শেষ রক্ষা হল না! ছবির গল্পে ছিল রামু নামে এক যুবক। সে রোজ ঘরের একটি ক্যালেন্ডারের ছবির দিকে তাকিয়ে দেখে, আর রাতে দূরে এক বেহালাবাদকের ছড় টানার শব্দ শুনে ঘুমিয়ে পড়ে।’’
‘‘কাগজে খুব বিজ্ঞাপন দেখেছি। মুক্তি পেল না কেন?’’
‘‘হা হা হা! হয়তো পাবে কখনও! শুনেছ পার্টি আমার বিরুদ্ধে ওয়ান ম্যান কমিশন বসিয়েছে। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত তার মেম্বর!’’
‘‘জানি। সে দিন ‘নীচের মহল’ নাটকের রিহার্সাল থেকে ফিরছি, মামি বলল। পার্টি তোমাকে এক্সপেলড করবে! উমানাথদা, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, মমতাজ আহমেদ খান সকলে নাকি তোমার বিরুদ্ধে চার্জের সমর্থন জানিয়েছে!’’
‘‘তারপরও তুমি...!’’
‘‘দেরি হয়ে যাচ্ছে চলো।’’
‘‘লক্ষ্মী!’’
‘‘কমরেড জ্যোতি বসু তোমার পক্ষে। কিন্তু এই পার্টি, আইপিটিএ, তেইশটা চার্জ কোনও কাজ করতে দেবে না! নতুন দল করো। গ্রুপ থিয়েটার!’’
‘‘লক্ষ্মী! তুমি কি আসবে? তোমাকে পেলে জীবনটা গুছিয়ে আরম্ভ করব!’’
‘‘আসব!’’
গলির বাঁকে অন্ধকারে ওরা হারিয়ে যায়। হাওয়ার হল্লায় ওদের দু’জনের কথা আর উপকথন আর শোনা যায় না! শূন্যে পাক খেয়ে ওড়ে ভবার বিড়ির ধোঁওয়া! ভবা কিছুতেই যেন স্বস্তি পান না। শান্তি নেই কোথাও! উৎপলের পরিচালনাতে ‘বিসর্জন’ করেছিলেন। রঘুপতি।
লক্ষ্মীকে এগিয়ে দিয়ে ফিরতি পথে গলির অন্ধকারই যেন হয়ে ওঠে রস্ট্রাম।
ভবা বলেন, বলে চলেন, ‘‘পাষাণ ভাঙিয়া গেল জননী/ আমায় এ বার দিয়েছ দেখা প্রত্যক্ষ/ প্রতিমা। জননী অমৃতময়ী!’’

‘সংঘাত অনিবার্য।’ এ পক্ষ, ও পক্ষ ভাগ হয়ে গিয়েছে। জর্জ ওদের কথা শোনে।
এক শনিবার, সন্ধেয় গোপন মিটিং, ঋত্বিক হাজির দুপুর তিনটেতেই। অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন। মাথার চুল মুঠো করে ধরা। একবার এই মোড়া, একবার ওই মোড়া। জর্জ আর থাকতে না পেরে বললেন, ‎‘‘আঃ! স্থির হইয়া বোসো না।’’ 
‘‘সবাই আসবে তো!’’
‘‘খবর পাইছে হক্কলে, আইবে কিনা কইতে পারি না।’’
‘‘সেইটাই প্রধান সমস্যা। বুঝলা, কেউ কারও মনের ভিতরটা জানে না।’’ একই কথা বার বার বলতে বলতে মাথা ঝাঁকাচ্ছেন ঋত্বিক। মোড়ায় বসে, পা-টা তুলে দিয়েছে খাটের ওপর। শীর্ণ, শিরা-ওঠা পায়ে কাদার ছোপ। অস্থিরভাবে পায়ে আঙুল নাড়তে নাড়তে সে বলেই চলেছেন, ‘‘ভাঙনের জয়গান, বুঝলে... ভাঙনের জয়গান! আমি একটু পার্কে ঘুরে আসি। মুক্ত বাতাস দরকার। অন্ন চাই, প্রাণ চাই, চাই মুক্ত বায়ু!’’ ঝোলা কাঁধে উঠে দাঁড়ান ঋত্বিক। জর্জ জানেন ওই ঝোলায় কী আছে!
বললেন, ‘‘মুক্ত বায়ু, না বোতল-বদ্ধ তরল! আমি সব জানি। আমার ঘরে হেই সব চলবো না। তুমি যাও, পার্কে বইস্যা যা খুশি করো।’’
মিটিং ভন্ডুল! সাড়ে সাতটার সময় ঋত্বিক ফিরলেন। টালমাটাল। কোনওমতে টাল সামলে জর্জকে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘মিটিং হইল না? ডিসিশান দাও, দুই বছর এপাশ-ওপাশ ভালো লাগে না। ডিসিশান চাই... কোন পক্ষে যাব, কোন দলে? বলো, বলো?’’
জর্জ চলে যেতে বলেন ঋত্বিককে। তাঁর গলা কেঁপে ওঠে। ঋত্বিক চলে যান।
গলির আলো-অন্ধকারে দীর্ঘ চেহারাটা হারিয়ে যায়। ঘাড় কাত করে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে থাকেন জর্জ। পিছনে পড়ে থাকে ১৭৪-ই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের জর্জের একলা ঘর। একটু পরে হারমোনিয়ামের সামনে বসেন জর্জ। গেয়ে ওঠেন শ্রাবণের গান, ‘‘আমার যে দিন, ভেসে গেছে। চোখের জলে, আমার যে দিন...!’’

কোথায় যাবেন ভবা এখন?
তৃপ্তি থেকে আকণ্ঠ পান করে পথের রোদ-ছায়ায় হাঁটছেন। ভবানীপুরের জগুবাজারের সামনে হাঁটতে হাঁটতে পা টলছে তাঁর। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে কিনলেন দুটি পদ্মফুল। ‘‘কী করবি ভবা?’’
হাসেন ভবা। কাঁধের ঝোলায় ফুলগুলি যত্নে ভরে রাখতে রাখতে বলেন, ‘‘লক্ষ্মীকে দিতে হবে, পদ্মের মতো যার মন তাকেই ত দেব!’’
প্রথম প্রেমের চিঠিতে লক্ষ্মীকে লিখছেন, ‘‘মাসিক একটা আয়ের সংস্থান করা প্রথম কর্তব্য। নইলে জীবনে স্নিগ্ধতা আসবে না।’’ কখনও লিখছেন, ‘‘...আমাকে অ্যাট অল কোন মেয়ের ভাল লাগে কি করে- আমার নোংরা পা, বিড়ি ও হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে বসাসমেত। ... আমি তোমার মোটেই উপযুক্ত নই, মিছিমিছি তোমাকে ডোবাচ্ছি। ‘লক্ষ্মী’ মহিলাটি জলে পড়লেন।’’
দু’জন ঠিক করলেন বিয়ে করবেন! পরস্পরকে জানার সেই চিঠিতেই জানাচ্ছেন পার্টির খবর, উৎপলের খবর, গীতা ঘটকের ‘সাঁকো’-র রিহার্সালে আসার খবর। বোম্বে থেকে চাকরির সুখবর এল তখনই। সলিল চৌধুরী তার করলেন ঋত্বিককে। ফিল্মিস্তানের চাকরি হল ভবার। ১৯৫৫-র বৈশাখে হল বিয়েও!
বোম্বেতেই ‘মধুমতী’র শুটিং-এ আলাপ দিলীপকুমারের সঙ্গে।
জমিয়ে আড্ডা জুহু বিচে বলরাজ সাহনির বাড়িতে। কিন্তু স্বস্তির জীবন যে ভবার নয়!
বিমল রায়ের ‘মধুমতী’ ও ঋষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘মুসাফির’-এর চিত্রনাট্য লিখতে লিখতেই সুরমাকে লিখছেন, ‘‘দশটা-পাঁচটা গিয়ে বসে থাকতে হবে। ... দাঁতে দাঁত চেপে শুধু পয়সার জন্য এখন চেষ্টা করা।... দেখো লক্ষ্মী এ জীবন আমাদের নয়। ... এসব ছেড়ে দেব। এ হবে না!’’
ছেড়ে দিলেন চাকরি!
ফের বেকার! কলকাতায় ফিরে আবার হাত দিলেন ছবিতে। সুবোধ ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ‘অযান্ত্রিক’। চরিত্র বলতে জগদ্দল আর বিমল। ঝরঝরে একটি শেভ্রোলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নেতারহাট, রাঁচি, ঝরিয়ার রুখা-শুখা প্রকৃতির মাঝে। ছবির সঙ্গীত করলেন আলি আকবর খান। স্মৃতি থেকে সুরমা লিখছেন মিউজিকের রেকর্ডিং-এর কথা। ‘‘বিরাট অর্কেষ্ট্রা, অনেক লোকজন। আছেন আলি আকবর খান, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শিশিরকণা ধরচৌধুরী।... পরিচালক ও আলি আকবর খান মাঝে মাঝে একটু একটু মদ্যপান করছেন। শেষ রাতে নেশা কমলেও কাজের বিরতি নেই। ভোর হয়ে আসে!’’
ছবি মুক্তি পেল, উচ্ছ্বসিত দর্শক!
জীবনে সেই প্রথম সংবর্ধনা পেলেন ঋত্বিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
জনপ্রিয় হল পরের বছর শিবরাম চক্রবর্তীর ছোটগল্প অবলম্বনে তাঁর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ছবিও। খালেদ চৌধুরীর আঁকা পোস্টার-হোর্ডিং এখনও কলকাতার স্মৃতির আকাশে। 
গল্পের ঋত্বিক 
আর পাঁচজন বাঙালির মতো প্রেমের কবিতা দিয়েই ঋত্বিকের লেখালিখির হাতেখড়ি। প্রথম গল্প বের হয় ‘গল্পভারতী’তে। সেটা ১৯৪৭ সাল। আর সে বছরই ‘অভিধারা’ নামে একটি কাগজ বের করলেন তিনি। পর পর গল্প লেখেন সেই নিজের কাগজেই। নাটক-উপন্যাস লিখলেন আরও পরে। সে সময় তাঁর গল্প প্রকাশ হয় ‘দেশ’, ‘অগ্রণী’, ‘শনিবারের চিঠি’-তে। তাঁর নিজের দাবি, ৫০টি গল্প লিখেছিলেন। তারমধ্যে উল্লেখ্য ‘চোখ’, ‘কমরেড’, ‘গাছ’, ‘অয়নান্ত’, ‘আকাশগঙ্গা’ প্রভৃতি। বেশিরভাগ গল্পেই এসেছে দেশভাগ, কাঁটাতার, দুই বাংলার বিক্ষুব্ধ সময়ের কথা। আছে প্রেমও। কোনও কোনও গল্প নিছক কবিতাও। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘চারপাশে যে সমস্ত খারাপ বদমাইশি অত্যাচার ইত্যাদি দেখেছি তার রাজনৈতিক জীব হিসাবে সোচ্চার প্রতিবাদ করার ইচ্ছে থেকেই গল্প লেখায় আরজ্ এসেছিল সেই ছোট বয়সেই।’’ আর কাঁচা বয়সের গল্প পড়েই নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ঋত্বিককে ‘শক্তিমান নবীন লেখক’ বলেন।

‘‘নীতাকে বাঁচিয়ে রাখো!’’
‘‘নীতা বেঁচে কী করবে! ওকে মেরে ফেলতেই হবে!’’
রোজ শিলং পাহাড়ের উপর ঝগড়া চলছে ছবির প্রযোজক মহেন্দ্রজি আর পরিচালক ঋত্বিকের। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-এর পরে ফের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের কাছে ফিরে এলেন ঋত্বিক। ছিন্নমূল‌ মানুষের কলোনিতে ফের তাঁর ক্যামেরা আঁতিপাঁতি ধরল ক্ষয়-জীবন।
শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনি নিয়ে ‘চিত্রকল্প’-এর প্রযোজনায় শুটিং শুরু করলেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’র।
একদিন শুটিং-এ বেশ রাত। চারদিক শুনশান। ক্যামেরা রোল করছে। নীতার কাশি হচ্ছে। কাশির গমকে গমকে রক্ত বের হচ্ছে। ঋত্বিক নির্দেশ দিচ্ছেন সুপ্রিয়াকে, ‘দু’ তিন স্টেপ এগিয়ে আয়। আকাশের দিকে তাকা। বাঁদিকে মুখটা ফেরা। চোখ ডান দিকে।’ হঠাৎ একটা প্যাঁচা ডেকে উঠল। ঋত্বিক চিৎকার করে উঠলেন কাট! তারপর, সুপ্রিয়াকে বললেন, ‘‘ছেমরি আজ প্যাক-আপ। বাড়ি যা।’’
শেষ হল ‘মেঘে ঢাকা তারা’র কাজ। ছবি সেন্সর হচ্ছে। বোর্ডের সদস্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবি দেখে বেরিয়ে ঋত্বিককে বললেন, ‘‘মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা ছাড়া কী আর ছবি হয় না?’’
একবগ্গা ঋত্বিক। তাঁর উত্তর, ‘‘আপনার কাছে যা বাস্তব, তা হয়তো আমার কাছে নয়।’’ এর পরেই নিজের গল্প নিয়ে করলেন ‘কোমল গান্ধার।’ সেখানে ঘুরে ফিরে ভৃগু আর অনসূয়ার গল্পে বললেন নিজের দীর্ণ জীবনের কথাই। ছবি মুক্তি পেলে, চূড়ান্ত সমালোচিত হল ঋত্বিকের বামপন্থী বন্ধুদের কাছে! পার্টি সমালোচনা করল ‘সুবর্ণরেখা’-ও! বলা হল, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে ‘বুর্জোয়া নৈরাশ্যবাদ প্রচার করা হয়েছে।’ হতাশায় ভেঙে পড়লেন ভবা, শুরু হল দিনভর নেশা।
সুরমা লিখছেন, ‘‘সুবর্ণরেখা মুক্তি লাভ করল না। তখন থেকে শুনতাম আমি মারা যাব। মাইকেল মধুসূদন, প্রমথেশ বড়ুয়া, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই মারা যাব। কেন এই মৃত্যু? আমি তা জানি না।’’ কখনও সুরমাকে বলছেন, ‘‘লক্ষ্মী, আমি মরে যাব। আর দু’বছর!’’
কখনও বলছেন, ‘‘এক বছর!’’

পঁয়ষট্টি থেকেই সারা দিনমান ডুবে থাকেন চোলাই মদে। তার আগে যখন ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ করছেন, সকলেই ভবাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। তিনি যাতে কালীঘাটের পোটোপাড়ায় চোলাইয়ের ঠেকে যেতে না পারেন কিংবা ভবানীপুরের গাঁজা পার্কে, সকলেরই খেয়াল সেদিকে। পুণায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে যখন পড়াবার ডাক এল, ভেবেছিলেন নতুন করে শুরু করবেন। সেও আর হল না!
সুরমা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবার কাছে শিলং-এ গেলেন।
বম্বে থেকে তাঁকে লিখছেন, ‘‘এখানে সম্মান, বাঁধা মাইনে এবং মনের মতো কাজ। ... ইন্দিরা গান্ধীও অনেক কিছু করেছে আমার জন্যে, গিয়ে বলব।’’ ভাইস প্রিন্সিপ্যালও হলেন। নেশার খপ্পরে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল!
চূড়ান্ত অস্বাভাবিকতা নিয়েই চাকরি ছেড়ে একদিন শিলং-এ হাজির। শ্বশুরমশাইকে বললেন, সুরমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। হাজারটা টাকা দিতে! নাগাড়ে ১৭ ঘণ্টা ধরে ‘পণ্ডিতমশাই’-এর গল্প লিখে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। হ্যালিউসিনেশন! ভবাকে ভর্তি করা হল হাসপাতালে। সেই চরম সময়ে পাশে ছিলেন উত্তমকুমার, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তম ‘বনপলাশীর পদাবলী’ করবার জন্য টাকা দিলেন।
কিন্তু ভবার যে আর কোনও কাজে মন নেই। এখন তাঁর বিটোফেনের সিম্ফনি শোনার দিন। একের পর এক রেকর্ড বেজে চলেছে। কখন আব্বাসউদ্দিন শুনছেন, কখনও শচীনকর্তা। আর প্রায়ই রবি‌ঠাকুর।
‘‘রাস্তায় ঋত্বিকবাবু অজ্ঞান হয়ে গেছেন! মুখের ভিতরে একটা টাকার নোট!’’
সুরমার সেদিন কলেজের শেষ ক্লাস। ছুটতে ছুটতে খবর দিল দুটি ছেলে। চারদিক অন্ধকার দেখলেন সুরমা! পাগলের মতো ছুটছেন তিনি। ভবাকে ভর্তি করা হল হাসপাতালে। ভবা তখন দাড়ি রাখছেন। অসংলগ্ন কথা বলছেন,
‘‘দশটা টাকা হবে ডাক্তার? না খেলে সুস্থ হব কী করে! একটু তো খেতেই হবে, নাকি। পারছি না বিশ্বাস করুন। কাজ করতে পারছি না। মাথা কাজ করছে না তো! একটু বাইরে যেতে দিন!’’ নেশা থেমে রইল না !
তুষারবাবুকে বলেছিলেন হাসপাতালে বাংলা মদ জোগাড়ের গোপন কাহিনি।
‘‘কেমনভাবে জোগাড় করতেন?’’
‘‘খুব সোজা। পায়খানার দেওয়ালের দুটো ইট সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেখানে হেড সুইপার এক বোতল মদ রেখে যেত। আর খাওয়ার পর আবার ইট লাগিয়ে দিতাম।’’
‘‘টাকা কে জোটাত!’’
‘‘কিছু ভিজিটর তো আসত নাকি! তারা ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করত। কিছু টাকাও রেখে যেত। সে সময় উত্তম আর রমাও এসেছে।’’
‘‘রমা মানে সুচিত্রা সেন?
‘‘ইয়েস স্যার। সুচিত্রা সেন। এর আগে তাঁর বালিগঞ্জ সাকুর্লার রোডের বাড়িতে ছবির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর উত্তমের ইচ্ছে ছিল টলস্টয়ের রেজারেকশন অবলম্বনে একটি ছবি করা। তাই তারা চাইছিল আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হই আর ছবি করি। কাজ করি।’’
কাজ করেছিলেন। একটু সুস্থ হয়েই গোবরার হাসপাতালে বসেই ঋত্বিক ‘কুমারসম্ভব’-এর অষ্টম সর্গ নিয়ে পড়লেন। আবার লিখলেন ‘সেই মেয়ে!’ হাসপাতালে নাটকটি অভিনয়ও করালেন অন্য রোগীদের দিয়ে, নিজেও অভিনয় করলেন!
কিন্তু ছাড়া পেয়েই, ‘লক্ষ্মী, টাকা দাও। দশটা টাকা। এই শেষ!’

শেষ পর্যন্ত আর পেরে উঠলেন না সুরমা!
’৬৯-এ কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান দিল। এর পরে তাঁর মদ্যপানের মাত্রা যেন বেড়ে গেল। খালাসিটোলায় নিত্যসঙ্গী সন্তোষকুমার ঘোষ, সমরেশ বসু।
আমরা শুনি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-র অবিকল সেই বিচ্ছেদ সংলাপের প্রতিধ্বনি।
‘‘কোনও জিনিসের দরকার আছে নাকি?’’
‘‘শুধু বই ও রেকর্ডগুলো থাক!’’
‘‘বই ও রেকর্ডগুলো রেখে গেলেই বিক্রি করে মদ খাওয়া হবে। তাই ওগুলো দেব না। ছেলের জন্য যত্ন করে রাখব। বড় হয়ে পড়বে ও শুনবে।’’
‘‘তা হলে শুধু পাখাগুলো থাক।’’
সুরমা লিখছেন, ‘‘আমি রাজি হই। যদিও জানতাম, চলে গেলেই বিক্রি করে মদের বোতল আসবে।... চলে আসার সময় কী আকুল দৃষ্টি! তবু, এসে ট্যাক্সিতে উঠি। কী করব, আমি মা! তিনটি ছেলেমেয়েকে তো আমাকে রক্ষা করতেই হবে।’’
৭১-এর ১ জানুয়ারি সংসার দু’ভাগ হয়ে গেল। স্কুলে চাকরি নিয়ে সাঁইথিয়া চলে গেলেন সুরমা!
একা হয়ে গেলেন ভবা!
একা!

মাস পাঁচেক পরে বোম্বে থেকে সাঁইথিয়ায় চিঠি এল পঁচিশে বৈশাখ। ‘‘আসছি। চার পাঁচদিন জ্বালাব। না, শান্তিনিকেতনে থাকব। একবার করে দেখে যাব। তারপর রামপালান পালাব। চিরকালের মতো। দেখি, পারি কিনা।’’ চিঠির শেষে লিখলেন, ‘‘ঘৃণা-ঋত্বিক!’’
সেই পালালেন!
গোছানোই ছিল সুটকেস।
নতুন জামাকাপড়, নতুন সাবান, তোয়ালে। শেভিং সেট। সবার উপর কালো জহরকোট। সেটা পরেই যুক্তি তক্কোতে শুটিং করেছিলেন। সুরমা বার বার নিষেধ করতেন, ওই কোট আর না পরতে। শুনে সে কি প্রচণ্ড অট্টহাসি!

এখনও যেন হাসছেন।
জহরকোটের উপর হাত রেখে হেসে ওঠেন। বলেন, ‘‘লক্ষ্মী তো আমার মারা যাওয়া সহ্য করতে পারে না, তাই জহরকোটটি দেখতে পারে না।’’
‘‘প্লিজ আর খাবেন না!’’ নিষেধ করেন ডাক্তার। বেপরোয়া ঋত্বিক!
‘‘হয়নি, কিছু হয়নি। আরও একটু চাই।’’

হাসপাতালের বেডে শুয়ে সারাক্ষণ স্মৃতির পথে হাঁটেন ভবা। সতত পোড়েন স্মৃতির ধূপে! ‘‘যখন ‘জ্বালা’ লিখেছিলাম, তখন জানতাম না কাশির সঙ্গে রক্ত কেমন করে ওঠে... আর আজ! আর বাঁচতে চাই না। এই শুয়োরের বাচ্চার দেশে বেঁচে লাভ কি?’’
নাগাড়ে কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠেন! কখনও রক্তবমি।
এমন অসুস্থতা সঙ্গে নিয়েই করলেন শেষ দুটো ছবি। জলে ভিজে, রোদে পুড়ে ওপারে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, আর এপারে ‘যুক্তি-তক্কো-গপ্পো।’ কিন্তু ধকল নিতে পারলেন না আর!
ঢাকা থেকে দুঃসংবাদ এল ঋত্বিক অসুস্থ। চিন্তিত কলকাতা। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন সত্যজিৎ রায়। মৃণাল সেন নিজে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিলেন। ফিরলেন। তার পর একদিন বাংলাদেশে মুক্তি পেল ‘তিতাস একটি নদীর নাম।’ ভবা তখন হাসপাতালে।
জানলার বাইরে হাতছানি দিয়ে কে যেন তাকে বার বার ডাকে। হাত ধরে নিয়ে যায় আদিগন্ত পদ্মার চরে। জল ঠেলে ঠেলে নৌকো টেনে চলেছে পটনা-বাঁকীপুর-মুঙ্গেরের মাল্লারা। উদাস, রোগজর্জর ভবা দেখছে, ইলশাগুঁড়ি প্রথম বর্ষায় কেমন খুশিতে মাতোয়ারা মাঝি-মাল্লারা। জলমাখানো হাওয়ায় ভেসে তারা সুর ছাড়ে। ভবা পাগল সুরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে স্টিমারের ছাদে। দোল খায় মাতাল নদীর দাপটে। কান পেতে সে শোনে ‘এঞ্জিনের ধস-ধস, সারেঙ্গের ঘণ্টি, খালাসির বাঁও না মেলা আর্তনাদ!’

একটু সুস্থ হলেই বেরিয়ে পড়ছেন হাসপাতাল থেকে।
তখন রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে এক দোকানির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। খুবই অসুস্থ। তবু ছুটলেন তথ্যচিত্র তুলতে শান্তিনিকেতনে। রামকিঙ্কর।
গোটা গোটা দিন যায়। কিঙ্করের সঙ্গে বাংলা মদে ডুবে দু’জনে শিল্পের গভীর তত্ত্ব আলোচনা করেন।
ছবি এগোয় রয়ে সয়ে! ফের হাসপাতাল। সুরমার সঙ্গে সাঁইথিয়ায় গিয়ে দেখা করে এলেন। সেই শেষ দেখা!
গলির মুখে মিলিয়ে যাচ্ছে কালো জহরকোট, ল্যাকপেকে–লম্বা শরীরটা। যেতে যেতে নিজের মনেই বলছেন, ‘‘লক্ষ্মী! টাকা থাকবে না। কাজটাই থেকে যাবে। তুমি দেখে নিয়ো, আমি মারা যাওয়ার পর, সবাই আমাকে বুঝবে!’’

উনিশ দিনেই সব শেষ!
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভবা। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসছে চরাচর।
ঝাপসা পদ্মার বাঁধ, মেঘনার চর, ভৈরব বাজার। কবে যেন লিখেছিলেন, ‘‘বুড়িগঙ্গা, বহুদিন তোর কোলে মাথা রাখিনিকো!’’
মৃণাল সেন খবর পাঠালেন সুরমাকে। কলকাতার হাওয়ায় ছড়াল শোকসংবাদ। পিজির সামনে অগণিত মানুষের ঢল। কেউ রবিঠাকুর ধরল, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি, ভাঙল ঝড়ে।’ ভবার প্রিয় গান!
স্টুডিয়োপাড়া হয়ে শবযাত্রা এগিয়ে চলল ঘাটের দিকে।

ঋণ: ‘ঋত্বিক’ ও ‘ঋত্বিক পদ্মা থেকে তিতাস’ সুরমা ঘটক, ‘কবিতীর্থ’ ঋত্বিক ঘটক সংখ্যা, ‘ঋত্বিক ঘটক’ সম্পাদক রজত রায়, ‘জর্জ’ বাসব দাশগুপ্ত, ‘টপ্পা ঠুংরী’ পূর্ণেন্দু পত্রী, ‘ঋত্বিকদা, সলিলদা’ তুষার তালুকদার, ‘ঋত্বিকতন্ত্র’ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, ‘১৬টি সাক্ষাৎকার’

patrika
patrika
patrika
patrika
Patrika
patrika
















http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/a-special-write-up-on-ritwik-ghatak-1.408042