Thursday, 15 August 2019

বাদশা ফিরলেন কলকাতায়, গভীর রাতেও উন্মাদনা (On Majid Bishkar)

বিমানবন্দর থেকে পুলিশের গাড়িতে হোটেলে মজিদ

বাদশা ফিরলেন কলকাতায়, গভীর রাতেও উন্মাদনা

নিজস্ব সংবাদদাতা

Majid Bishkar

উচ্ছ্বাস: বিমানবন্দরে পতাকা উড়িয়ে স্বাগত ভক্তদের (বাঁ দিকে)। হোটেলে হাল্কা মেজাজে কিংবদন্তি। টুইটার, নিজস্ব চিত্র

তিন দশকে কলকাতা বদলে গিয়েছে। তিনি নিজেও বদলে গিয়েছেন। একমাথা ঝাঁকড়া চুল এখন আর নেই। রোদে পুড়ে গায়ের রং তামাটে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে উন্মাদনা ও আবেগের কোনও পরিবর্তন হয়নি। তিনি, মজিদ বাসকর। ভারতীয় ফুটবলের বাদশা। ফুটবলপ্রেমীদের ভালবাসার হাত থেকে বাঁচতে পুলিশের গাড়িতে বিমানবন্দর ছাড়লেন!
ইস্টবেঙ্গলের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইরানের খোরামশায়ার থেকে শনিবার যখন কলকাতায় নামলেন মজিদ, তখন গভীর রাত। ভেবেছিলেন, দ্রুত হোটেলে পৌঁছে ঘুমিয়ে পড়বেন। কিন্তু অভিবাসন কাউন্টারে যাওয়ার পরেই ভুল ভাঙল বাদশার। সবাই নিজস্বী তুলতে চান। মজিদ তখন জানেন না, বিমানবন্দরের বাইরে কী অবস্থা। রাত আড়াইটের সময় যে মজিদ কলকাতায় নামবেন, তা দুপুর থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল শহরে। রাত ১টা থেকেই বিমানবন্দরে আসতে শুরু করে দিয়েছিলেন লাল-হলুদ সমর্থকেরা। যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই মজিদের খেলা দেখেননি। পূর্বসূরিদের কাছে শুনেই বাদশার ভক্ত হয়ে গিয়েছেন। মজিদ তো শুধু ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবলার নন, আবেগের নামও। রূপকথার নায়কের মতো যাঁর আবির্ভাব ও প্রস্থান। তিন দশকেরও বেশি সময় পরে ফুটবল বাদশার প্রত্যাবর্তনে আবেগের বিস্ফোরণ তো ঘটবেই।
ভোর প্রায় ৪টে নাগাদ তিন জন আত্মীয়কে নিয়ে মজিদ বিমানবন্দরের গেটের বাইরে বেরিয়েই চমকে গেলেন। লাল-হলুদ সমর্থকদের কেউ কেউ শুয়ে পড়লেন পায়ে। অনেকেই মজিদের গলায় মালা পরিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ঝাঁপালেন। সকলেই অন্তত এক বার ছুঁতে চান বাদশাকে।  মজিদ...মজিদ...জয়ধ্বনি তো শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক আগে থেকেই। আশির দশকে কলকাতা ফুটবলের উন্মাদনার সাক্ষী মজিদও হতবাক। নিরাপত্তারক্ষীরা অনেক চেষ্টা করেও কিংবদন্তি ফুটবলারকে ভিড়ের মধ্য থেকে বার করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ফের বিমানবন্দরের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ভেবেছিলেন, একটু পরে হতাশ হয়ে লাল-হলুদ সমর্থকেরা ফিরে যাবেন। তার পরেই মজিদকে বার করা হবে। 
ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা হতাশ হওয়া তো দূরের কথা, দ্বিগুণ উৎসাহে প্রিয় তারকার জয়ধ্বনি দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভোর ৪.৩০ নাগাদ বাধ্য হয়ে অন্য গেট দিয়ে মজিদকে বার করে পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় হোটেলে। রবিবার দুপুরে হোটেলে নিজের ঘরে বসে অভিভূত বাদশা বললেন, ‘‘রাত আড়াইটের সময় আমাকে দেখার জন্য বিমানবন্দরে কেউ আসবে বলে ভাবিনি। জানতাম, আমাকে যাঁর হোটেলে নিয়ে যাওয়ার কথা, তিনি শুধু আসবেন। কিন্তু গেটের বাইরে পা-দিয়ে চমকে গিয়েছিলাম। এত সমর্থক শুধু আমাকে স্বাগত জানাতে এসেছেন! ওঁদের এই আবেগ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আশির দশকে। তখনও একই রকম উন্মাদনা ছিল। এত বছর পরেও ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আবেগ এতটুকু কমেনি।’’
শুধু কলকাতা নয়, বাংলার খাদ্যের প্রতিও ভালবাসা কমেনি মজিদের। প্রিয় শহরে ফিরে মজে গিয়েছেন বাঙালি খাদ্যে। ঘুম থেকে উঠে হোটেলের রেস্তরাঁয় খেলেন বাঙালি খাবারই। প্রিয় বন্ধু জামশিদ নাসিরি দেখা করতে এসেছেন শুনে দ্রুত খাওয়া শেষ করে চলে এলেন নিজের ঘরে।
আশির দশকে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একসঙ্গে পথ চলা শুরু করেছিলেন দু’জনে। কলকাতা ময়দানে অভিষেকও একসঙ্গে। যদিও অকালেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মজিদ-জামশিদ যুগলবন্দি। তার পরে মজিদ ফিরে গিয়েছিলেন ইরানে। জামশিদ পাকাপাকি ভাবে থেকে গিয়েছেন কলকাতাতেই। মাঝেমধ্যেই ইরান গিয়েছেন জামশিদ। কিন্তু দেখা হয়েছিল মাত্র এক বার। রবিবার সকাল থেকে জামশিদও তাই উত্তেজিত। বলছিলেন, ‘‘কলকাতা থেকে যখন চলে গিয়েছিল মজিদ, বিমানবন্দরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, আবার দেখা হবে। গত কয়েক বছরে মনে হত, কলকাতায় মনে হয় মজিদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে।’’ তিনি যোগ করেন, ‘‘মজিদ যখন কলকাতায় ছিল, তখন আমরা একসঙ্গে থাকতাম। দল বদলের পরে ও থাকত মহমেডান মেসে। আমি থাকতাম পার্ক সার্কাসে। তবে রোজই আমাদের দেখা হত।’’ 
এত দিন পরে দেখা হওয়ায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না দুই বন্ধুই। ঘরে ঢুকতেই জামশিদকে জড়িয়ে ধরলেন মজিদ। নিজের হাতে প্রিয় বন্ধুর কাপে চা ঢেলে দিলেন। স্মৃতির সরণি ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখন ফিরে গেলেন ইরানে শৈশবের দিনগুলোয়। কখনও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন থেকে কলকাতা ময়দানে। এর মধ্যেই জামশিদের স্ত্রী ফোনে মজিদকে বাড়িতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু প্রিয় বন্ধুর বাড়িতে মজিদ যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে। 
বিমানযাত্রার ক্লান্তিতে রবিবার বিশ্রাম নিয়েছেন মজিদ। আজ, সোমবার বিকেলে প্রিয় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যাবেন তিনি। ১২ নম্বর লেখা লাল-হলুদ জার্সি পরে মাঠেও নামার পরিকল্পনা রয়েছে।  মঙ্গলবার মূল অনুষ্ঠান নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। শতবর্ষে জীবিত ইস্টবেঙ্গলের সব অধিনায়ককে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এ ছাড়াও সম্মানিত করা হবে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার ও নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে। আকর্ষণের কেন্দ্রে অবশ্য থাকবেন মজিদই।

কী ভাবে মিলবে সাফল্য, ইস্টবেঙ্গলকে ‘টিপস’ দিলেন মজিদ

কী ভাবে মিলবে সাফল্য, ইস্টবেঙ্গলকে ‘টিপস’ দিলেন মজিদ

নিজস্ব সংবাদদাতা
Majid Bishkar and Jamshed Nasiri

ইস্টবেঙ্গল ক্লাব তাঁবুতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক বৈঠকে মজিদ ও জামশিদ। নিজস্ব চিত্র।

ইস্টবেঙ্গলের স্পেনীয় কোচ আলেয়ান্দ্রো মেনেন্দেজের দলের জন্য পরামর্শ মজিদ বাসকরের। কলকাতা ফুটবল লিগ শুরু হয়ে গিয়েছে।
পাশাপাশি চলছে ডুরান্ড কাপও। ডুরান্ডে দুটো ম্যাচ জিতে শেষ চারে পৌঁছনোর গন্ধ পেতে শুরু করে দিয়েছে লাল-হলুদ শিবির। কলকাতা লিগে প্রথম ম্যাচেই পা হড়কেছে ইস্টবেঙ্গল। সামনে অবশ্য রয়েছে অনেক ম্যাচ। রয়েছে আইলিগ। দীর্ঘদিন আইলিগ জেতেনি লাল-হলুদ। কীভাবে মিলবে সাফল্য? ইরানি-তারকা জানিয়ে দিলেন সাফল্যের রসায়ন। মজিদের কথা মেনে চললে সাফল্য আসবেই ইস্টবেঙ্গলে।
ফুটবল মরসুম সবে শুরু হয়েছে। লাল-হলুদের স্পেনীয় কোচ দলটাকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করছেন। সমর্থকরা আশা করছেন প্রিয় দল পাসের বিচ্ছুরণ ঘটাবে মাঠে, লাল-হলুদ-এর ঝলকানি দেখা যাবে সবুজ গালচেতে। আজ, সোমবার লাল-হলুদ ক্লাব তাঁবুতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক বৈঠকে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঢুকে মজিদ বলে দিলেন, ‘‘ব্যক্তিগত দক্ষতায় সব ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। টিম গেম খেলতে হবে। তা হলেই সাফল্য পাওয়া যাবে।’’ মজিদের ছোট্ট টোটকা। শুনতে খুব সহজ মনে হলেও, মোটেও তা সহজ সরল নয়। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলেই একটা দল টিম হয়ে ওঠে। সেই অভ্যাসটার উপরেই জোর দিতে বলছেন ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ১২ নম্বর জার্সিধারী।
শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে পুরনো ক্লাবের খেলা দেখা হয়নি তাঁর। মাঝেমধ্যে তাঁর কাছে একটা-দুটো খবর এসেছে লাল-হলুদের। কিন্তু, সেই সব খবর থেকে এখনকার ইস্টবেঙ্গল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হয়নি মজিদের মনে। এ দিন ক্লাব-তাঁবুতে পা রেখে দেখলেন বহিরঙ্গে তাঁর পুরনো ক্লাবের অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। জার্সির ডিজাইন আগের থেকে বদলে গিয়েছে। মজিদের এ সব জানাই ছিল না। সময়ের নিয়মে কোচের রিমোট কন্ট্রোল চলে গিয়েছে বিদেশি কোচের হাতে। সেটাও তাঁর কাছে অজানাই থেকে গিয়েছিল। ভেবেছিলেন এই শহর তাঁর কথা হয়তো ভুলেই গিয়েছে। কলকাতায় পা রেখে ভুল ভাঙল বাদশার। তাঁকে ভোলেনি এই শহর। এখনও ম-জি-দ, ম-জি-দ নামে জয়ধ্বনি ওঠে। ঠিক যেমন আগে উঠত। কত ম্যাচ একাই তিনি বের করে দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর খেলা একবার যে দেখেছেন, তাঁর মনে থেকে যাওয়ারই কথা। নিজের খেলা প্রসঙ্গে মজিদ বলেন, ‘‘আমি লিঙ্কম্যান ছিলাম।’’ মাঝমাঠ ও আক্রমণের মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করতেন মজিদ। ব্যক্তিগত স্কিলে তাঁর কাছাকাছি নেই অনেকেই। রোভার্স কাপ ফাইনালে মজিদের ভলি জাল কাঁপিয়ে দিয়েছিল মহমেডান স্পোর্টিংয়ের। মৃদু হেসে মজিদ বলেন, ‘‘রোভার্স ফাইনালে ওই গোলটার কথা খুব মনে পড়ছে। মহমেডানের গোলকিপার ছিল ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়। ইস্টবেঙ্গল ও মহমেডান যুগ্ম ভাবে জয়ী হয়েছিল সে বারের রোভার্সে।’’ আর সেরা ম্যাচ? এক মুহূর্তও না ভেবে মজিদ রোভার্স কাপ থেকে দার্জিলিং গোল্ড কাপের স্মৃতিতে ডুব দেন। বলেন, ‘‘দার্জিলিং গোল্ড কাপে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে একসময়ে ইস্টবেঙ্গল দু’ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল। পরে আমরা তিন গোল করে ম্যাচ ৩-২ জিতে নিই।’’ 
তাঁর সময়ের সেরা ডিফেন্ডার কে? প্রশ্ন শুনে মজিদের জবাব, ‘‘সুব্রত। খুব টাফ ডিফেন্ডার ছিল।’’ সুব্রত এখন যে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের কোচ তা শুনেছেন তিনি। পুরনো ক্লাবে পা রেখে নস্ট্যালজিক ইরানি-তারকা। সেই সঙ্গে মেনেন্দেজের দলকে ট্রফি জেতার প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিয়ে গেলেন মজিদ বাসকর।  

দেশে ফিরে ইস্টবেঙ্গলের জন্য ইরানি ফুটবলার খুঁজবেন মজিদ

দেশে ফিরে ইস্টবেঙ্গলের জন্য ইরানি ফুটবলার খুঁজবেন মজিদ

নিজস্ব সংবাদদাতা

Majid Bishkar

ইস্টবেঙ্গল মাঠে মজিদ। ছবি— অরিন্দম ব্রহ্ম

মজিদ বাসকরের মতো আরও একজন শিল্পী ফুটবলার কি ভবিষ্যতে পাবে ইস্টবেঙ্গল? লাল-হলুদ ক্লাব-তাঁবুতে বন্ধু জামশিদ নাসিরির সঙ্গে কিছু ক্ষণ পরামর্শ করে মজিদই জানিয়ে দিলেন, ভাল মানের ইরানি ফুটবলারের খোঁজ পেলে তাঁকে ইস্টবেঙ্গলে খেলতে পাঠাবেন।
বিদেশি সমস্যায় বহুবার ভুগতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। নামী প্লেয়ারকেও লাল-হলুদ জার্সিতে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। মরসুমের মাঝখানে কাউকে ফিরে যেতে হয়েছে দেশে। এই ছবি খুবই চেনা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের। কলকাতার জলহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। মজিদ-জামশিদরা অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন। প্রথম মরসুম থেকেই নজর কাড়েন তাঁরা। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে ক্লাব-তাঁবুতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক বৈঠকে মজিদ বলেন, ‘‘আমরা তো এখানে পড়তে এসেছিলাম। কত দিন খেলবো নিজেরাই জানতাম না। ইস্টবেঙ্গলের ডাক ফেরাতে পারিনি।’’
রোভার্স কাপে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে মজিদদের খেলা দেখে মুগ্ধ হন অনেকে। ১৯৮০ সালে ইস্টবেঙ্গল সই করায় মজিদ, জামশিদ ও খাবাজিকে। তার পরের ঘটনা তো ইতিহাস। ১২ নম্বর জার্সি পরে মাঠে ফুল ফোটাতেন মজিদ। তাঁর পিঠে কীভাবে উঠল ১২ নম্বর জার্সি? সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে এই প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হলে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মজিদ ও জামশিদের মুখ। পুরনো দিনের গল্প বলতে শুরু করেন মজিদ, ‘‘আমরা যখন ইস্টবেঙ্গলে খেলতে এসেছিলাম, তখন আমি আর জামশিদ ১২ আর ৯ নম্বর জার্সি বেছে নিয়েছিলাম। বেচারি খাবাজিই বুঝে উঠতে পারছিল না কত নম্বর জার্সি পরবে। ১২ আর ৯ যোগ করলে ২১ হয়। খাবাজির পিঠে উঠল ২১ নম্বর জার্সি।’’ মজিদের মুখে তখন খেলা করছে মৃদু হাসি। জামশিদও হাসছেন।

‘ইতিহাস’ তৈরি হতে দেখে বিস্মিত মজিদ

‘ইতিহাস’ তৈরি হতে দেখে বিস্মিত মজিদ

নিজস্ব সংবাদদাতা

Majid and Jamshid

বাদশাহি মেজাজে মজিদ। —নিজস্ব চিত্র।

প্রায় তিন যুগ পরে ইস্টবেঙ্গল মাঠে ফের মজিদ বাসকর। তাঁকে দেখার জন্যই সোমবার ক্লাব-তাঁবুতে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য লাল-হলুদ সমর্থক। সাংবাদিক বৈঠকের পরে ইস্টবেঙ্গলের ১২ নম্বর জার্সি পিঠে চাপিয়ে দু’ বার মাঠে  ঢোকার চেষ্টা করেন মজিদ।
কিন্তু, ভিড়ের ঠেলায় দু’ বারই মাঠে প্রবেশের চেষ্টা তাঁর ব্যর্থ হয়। ক্লাব-তাঁবুর ভিতরে চলে যেতে হয় মজিদকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে নামে পুলিশ। ভিড় সরানোর চেষ্টা শুরু হয়। এ দিকে মজিদকে মাঠে দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে ভক্তদের।
হাতের মুঠোয় পরিস্থিতি এলে মজিদকে আনা হয় মাঠে। উপস্থিত দর্শকদের দিকে হাত নাড়েন তিনি। তাতেই ভক্তদের ক্ষোভ গলে মুহূর্তে জল। গ্যালারিতে ওঠে ‘ম-জি-দ, ম-জি-দ’ ধ্বনি। বর্ষাস্নাত ইস্টবেঙ্গল মাঠে দাঁড়িয়ে বলে শটও মারেন তিনি। এই মুহূর্তেরই তো অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা। তাঁদের হতাশ করেননি মজিদ।

মনে হাজার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে কলকাতার বিমানে উঠেছিলেন বাদশা। পুরনো শহর কি তাঁকে চিনতে পারবে? মনে উঠেছিল ঝড়। ভেবেছিলেন বিমানবন্দরে তাঁকে দেখার জন্য অল্প কয়েকজন ভক্ত বুঝি উপস্থিত থাকবেন। শনিবার গভীর রাতে দমদম বিমানবন্দরে পা রাখার পরে ভুল ভাঙে ইরানি-তারকার। অসংখ্য ভক্তের উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হয়ে যান বাদশা। সেই কবে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ফিরে এসে দেখলেন এখনও তিনি জনতার মনেই রয়ে গিয়েছেন। মজিদ বলেন, ‘‘একটা ইতিহাস তৈরি হতে দেখলাম। মাঝরাতে এত সংখ্যক মানুষ যে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন ভাবিনি।’’
কলকাতায় না এলে মজিদ সত্যিই জানতে পারতেন না, তাঁকে এখনও আগের মতোই ভালবাসেন ভক্তরা। সমর্থকদের হৃদয়ে এখনও তিনি বাদশা হয়েই রয়ে গিয়েছেন। 

তিন দশক পরে আড্ডায় ময়দানের তিন কিংবদন্তি (Majid-Jamsid-Bhaskar)

তিন দশক পরে আড্ডায় ময়দানের তিন কিংবদন্তি

কলকাতা ময়দানের তিন কিংবদন্তি একসঙ্গে। তিন দশক পরে। মজিদ, জামশিদ ও ভাস্করের সেই আড্ডার সাক্ষী আনন্দবাজার...

Majid, Jamshid and Bhaskar

ত্রয়ী: ফের এক ফ্রেমে তিন তারা। জামশিদ নাসিরি, মজিদ বাসকর এবং ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়। মজলিসে উঠে এল অনেক সোনালি স্মৃতি। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক

রবিবাসরীয় দুপুর। মধ্যাহ্নভোজ সেরে হোটেলের ঘরে ঢুকেই জামশিদ নাসিরিকে দেখে বুকে টেনে নিলেন মজিদ বাসকর। ঠিক তখনই কথা বলে উঠলেন মজিদের একদা সতীর্থ ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়।
ভাস্কর: চিনতে পারছ আমাকে? আমি ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়। 
মজিদ (বিস্মিত): তুমি সেই  ভাস্কর? এত মোটা হয়ে গিয়েছ! আমি তো চিনতেই পারিনি। কী দুর্ধর্ষ গোলকিপার ছিলে তুমি! ওহ! অসাধারণ।
ভাস্কর: কত দিন পরে দেখছি?
মজিদ: প্রায় ৩০ বছর পরে আমি কলকাতায় ফিরলাম।
ভাস্কর: মজিদ, তুমি কিন্তু আমাকে একবারের বেশি গোল দিতে পারনি। অনেক চেষ্টা করেও রোভার্স কাপের ওই গোলটা আটকাতে পারিনি। বাঁক খেয়ে গোলে ঢুকেছিল বলটা। শরীর ছুড়েও আটকাতে পারিনি। অসাধারণ গোল।
ভাস্করকে থামিয়ে জামশিদ: সেই রোভার্স কাপ। আমি আর তুমি তখন ইস্টবেঙ্গলে। ভাস্কর ছিল মহমেডানে। তোমার মনে আছে মজিদ?
মজিদ: (পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে) মনে নেই আবার। প্রায় পঁচিশ গজ দূর থেকে গোলটা করেছিলাম। পায়ের ভিতরের অংশ দিয়ে সোয়ার্ভ করেছিলাম বলটা। (সামনের বসা ভাস্করের দিকে তাকিয়ে হাসি) তোমার মতো জেদি গোলকিপার আমাদের সময় কেউ ছিল না। শেষ পর্যন্ত বল ফলো করতে। কত গোল যে আটকে দিয়েছ। 
ভাস্কর: মঙ্গলবার কিন্তু খেলা হবে। 
মজিদ: তাই নাকি।
ভাস্কর: (হাসতে হাসতে) প্রাক্তন ফুটবলাররা খেলবে। 
মজিদ: দারুণ ব্যাপার হবে। আমি আমার ফুটবল বুটটা নিয়েই এসেছি। ভালই হবে। জামশিদ তো সঙ্গেই রয়েছে।
মজিদ: ইরানে গিয়েও তোমাকে ভুলিনি ভাস্কর। যখনই আমার বিরুদ্ধে খেলেছ, নিজের সেরাটা মেলে ধরেছ। রোভার্সে সেই ম্যাচটার দিন  মাঠে দিলীপকুমার খেলা দেখতে এসেছিলেন। মাঠের ভিতরে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, তুমিই সেরা। সে দিন দেখেছিলাম, শঙ্কর মালি কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষুব্ধ হয়ে কত কী বলছে। এই জামশিদ, শঙ্কর মালি এখন কেমন আছেন?
জামশিদ: উনি প্রয়াত।
(শুনে চুপ মজিদ)
ভাস্কর: মজিদ তুমি এত ফিট কী ভাবে?
মজিদ: ইরানে প্রাক্তন ফুটবলাররা খেলার মধ্যে থাকে। দল গড়ে খেলে। প্রতিযোগিতা হয়। তাই এখনও ফিট আছি। পাশাপাশি বাচ্চাদের খেলা শেখাই। তাই শরীরটা এখনও ঠিক আছে।
জামশিদ: ১৯৭৯-র জুলাই মাসে ভারতে এসেছিলাম। জব্বলপুরে পড়তে। ওখানে ভর্তি হওয়ার পরে বিকেলে ফুটবল খেলতাম। সেখানে এক জন অধ্যাপক ছিলেন। যিনি আগে ফুটবল খেলতেন। আমাদের খেলা দেখে এক দিন বললেন, এখানে কী করছ? আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাও। ওদের অধিনায়ক তোমাদের মতোই এক জন ইরানের ছাত্র। নাম খাবাজি। আমরা আগে খাবাজিকে চিনতাম না। চলে গেলাম আলিগড়ে। কয়েক দিন  পরেই দল যাবে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় খেলতে। তাই খাবাজি পরের দিন ভাইস চ্যান্সেলরকে ডাকলেন অনুশীলনে আমাদের দেখে নেওয়ার জন্য। সে বার উত্তরাঞ্চলের প্রতিযোগিতা হয়েছিল জয়পুরে। সেখানে আমি সর্বোচ্চ গোলদাতা আর মজিদ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। মনে পড়ছে মজিদ?
মজিদ: মনে পড়বে না? তার পরে  মূলপর্বে খেলা তিরুচিরাপল্লিতে। বেশি গোল করার জন্য আমাকে ও জামশিদকে আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করে দিল আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়। সেমিফাইনালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে প্রথম দিন খেললাম ২-২। একটা গোল আমার। আর একটা জামশিদের। পরের দিন ফের খেলা হল। ফের আমরা দু’জনে গোল করলাম। তার পরে ফাইনালে কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন। যে অধ্যাপক আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন, তিনি আনন্দে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। আমি, তুমি আর খাবাজি মিলে চোখেমুখে জল দিয়ে সুস্থ করলাম।  
ভাস্কর: আরে, তুমি তো সবই মনে রেখেছ দেখছি। সুভাষ ভৌমিক তখন খেলা ছেড়ে দিচ্ছে। আমি, সুরজিত চলে যাচ্ছি মহমেডানে। এর পরেই প্রি-অলিম্পিক্স খেলতে সিঙ্গাপুর চলে গেলাম। ফিরে এসে শুনলাম আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই তিন ইরানি ইস্টবেঙ্গল অনুশীলনে দাপাচ্ছে।
জুটি: চা কতটা দেব? বন্ধু জামশিদের কাছে জানতে চাইছেন মজিদ। নিজস্ব চিত্র
মজিদ: (হো হো করে হাসতে হাসতে এ বার জড়িয়ে ধরেন ভাস্করকে)
ভাস্কর: পরশু দিনের অনুষ্ঠানে ইস্টবেঙ্গলের সব জীবিত অধিনায়ক মঞ্চে থাকবেন। সবাই সংবর্ধনা পাবেন। আর তুমি সংবর্ধনা পাবে সেরা বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে।
মজিদ: ইস্, কোনও দিন ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক হতে পারলাম না।
জামশিদ: আরে তুমি তো আমাদের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের দলে অধিনায়ক ছিলে।
মজিদ: ইস্টবেঙ্গল এক বার আমাকে অধিনায়ক হতে বলেছিল। কিন্তু আমার চেয়ে দিলীপ পালিত বয়সে বড়। তাই বলেছিলাম ওকেই অধিনায়ক করতে।
আনন্দবাজার: জামশিদ নাসিরির সাফল্যে মজিদের কী অবদান?
জামশিদ: মজিদের পাস থেকে কত গোল করেছি তা গুনে বলা যাবে না। আমরা তখন ইস্টবেঙ্গলে। একটা ম্যাচ ছিল মহমেডানের বিরুদ্ধে। গোলকিপার বলটা লম্বা করে মারল। আমি সেই বল বিপক্ষের মাঝমাঠে ধরে দিলাম মজিদকে। ও তার পরে আমাকে এমন জায়গায় বলটা বাড়াল যে সেখান থেকে গোল না করাই অন্যায়। তিন টাচে গোল। এ রকমই সব ম্যাজিক আমাকে দিয়ে করাত মজিদ। আর আমি গোল করে বিখ্যাত হতাম। 
আনন্দবাজার: ১৯৮৫ সালে যখন মহমেডান থেকে ইস্টবেঙ্গলে এলেন, তখন মজিদকে নিতে বলেছিলেন ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের?
জামশিদ: সে বার দলবদলের আগে পল্টুদাকে আমিই বলেছিলাম মজিদকে নিয়ে ইস্টবেঙ্গলে ফিরতে চাই। দলবদল যে দিন শেষ হচ্ছে, তার চব্বিশ ঘণ্টা আগে পল্টুদা দেখা করতে বললেন। আমি সে দিন শিলংয়ে ছিলাম।  জলদি ফিরলাম। নটরাজ বিল্ডিংয়ে তখন আমি মজিদের সঙ্গে থাকি। ইস্টবেঙ্গল কর্তারা বললেন, কৃশানু-বিকাশ মোহনবাগান থেকে আসতে পারে। ওদের পেলে মজিদকে খেলাব কোথায়? তাই আর মজিদের সঙ্গে লাল-হলুদ জার্সি গায়ে খেলা হয়নি।
আনন্দবাজার: জুটি ভেঙে যাওয়ার পরে কষ্ট হয়েছিল?
মজিদ: কথাবার্তা তখন একটু  কমে গিয়েছিল। কষ্ট তো হবেই। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা সামলে নিয়েছিলাম। তার পরে রোজ জামশিদের সঙ্গে দেখা হত। দু’জনে এক সঙ্গে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি। কোনও দিন সমস্যা হয়নি।
জামশিদ: সাতাত্তর সালের আগে মজিদের সঙ্গে খোরামশায়ারেই থাকতাম। কলকাতায় এসে মজিদের সঙ্গে পাঁচ বছর এক দলে খেলেছি। সে বার আমাদের জুটি ভেঙে গেলেও আমি রোজ ইলিয়ট রোডে মহমেডান মেসে মজিদের সঙ্গে দেখা করে আসতাম। আর ছুটির দিনে আমার বাড়িতে আসত মজিদ। আমার স্ত্রীয়ের সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব ছিল মজিদের। এই তো একটু আগেই আমার স্ত্রী ফোন করেছিলেন মজিদকে। বলল, চলে এসো বাড়িতে। পার্ক স্ট্রিট মনে আছে তো? মজিদ বলল, পার্ক স্ট্রিট কি ভোলা যায়? 
ভাস্কর: এ বার বলো তো, কলকাতা ছাড়ার পরে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলে? কোনও খোঁজই পাওয়া যাচ্ছিল না তোমার। এখন কী করছ?
মজিদ: ইরানের খোরামশায়ারে থাকি। আমার এক আত্মীয়ের কোম্পানিতে চাকরি করি। ইস্টবেঙ্গল আমাকে অনেক দিন ধরেই আসার জন্য বলছিল। ভেবেছিলাম আসব না। কিন্তু আমার সঙ্গে আসা তিন আত্মীয়ই জোর করে নিয়ে এল।
জামশিদ: আমিও ওকে ফোন করেছিলাম বেশ কয়েক বার। আসতে বলেছিলাম। বলেছিলাম, এখানে সবাই তোমাকে দেখতে চাইছে। এক বার অন্তত কলকাতায় এসো।
আনন্দবাজার: মজিদ, আপনাকে ‘ফুটবলের বাদশা’ নামটা কে দিয়েছিল? 
মজিদ (হেসে): ‘বাদশা’ ইরানে প্রচলিত শব্দ। কলকাতায় মনে হয়, মিডিয়াই আমার খেলা দেখে ‘বাদশা’ নামকরণ করেছিল। মনে পড়ছে, আমি আর জামশিদ নিজ়ামে খেতে যেতাম। পার্ক স্ট্রিটে বেড়াতাম একসঙ্গে। তখন সবাই ‘বাদশা মজিদ’ বলে ডাকত আমাকে। আসলে আমাদের জুটিটা তখন খুবই হিট। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কথা কখনও ভোলা যাবে না। ওঁরা আমাদের দারুণ ভালবাসতেন। 
ভাস্কর: মজিদ, তুমি বিয়ে করেছ?
মজিদ: না, না। ব্যাচেলরই আছি।
ভাস্কর: ব্যাচেলরই থেকে গেলে তা হলে শেষ পর্যন্ত। বিয়েটা কেন করলে না? 
মজিদ: বিয়েটা আসলে করে উঠতে পারলাম না। তাতে অবশ্য কোনও সমস্যা নেই। ভালই আছি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখেই আছি। 
ভাস্কর: মিহির বসুকে মনে আছে? ও তোমার মতোই ব্যাচেলর।
মজিদ (উচ্ছ্বসিত): মির (মিহিরকে মিরই ডাকেন মজিদ)। মনে থাকবে না। সেই বেঁটেখাটো গাট্টাগোট্টা মির! সাইড ভলিতে ভাল গোল করত। (ভাস্কর ফোনে ধরিয়ে দিলেন প্রাক্তন ফুটবলার মিহির বসুকে)
মজিদ: আরে মির। কেমন আছো? কোথায়? তুমিও না কি আমার মতো বিয়ে করোনি। আমরা তা হলে দলে ভারী হয়ে যাচ্ছি। ভাস্করের সঙ্গে দেখা হল। তোমার সঙ্গে হবে তো? চলে এসো ইস্টবেঙ্গলের অনুষ্ঠানে।
আনন্দবাজার: ইস্টবেঙ্গলে আপনার পরে অনেক বিদেশি ফুটবলার খেলে গিয়েছেন। চিমা, ওকোরো থেকে আজকের কোলাদো। কিন্তু আপনার কথা উঠলেই আজও ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা মেনে নেন মজিদই সেরা। রহস্যটা কী?
মজিদ: আমি ধন্য যে, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা আজও মনে রেখেছেন আমার খেলা। ফুটবলার হিসেবে হয়তো আনন্দ দিতে পেরেছিলাম ওঁদের। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা খুব আবেগপ্রবণ। অনেকটা আমার মতোই। তাই হয়তো ওদের হৃদয়ে ঢুকতে পেরেছিলাম অল্প সময়েই। ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষে আমাকে এ ভাবে ইরান থেকে নিয়ে এসে সংবর্ধনা দিচ্ছে, এটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
আনন্দবাজার: কখনও মনে হয়নি, জামশিদ এত গোল করে। এ বার আমাকেও গোল করতে হবে।
মজিদ: কোনও দিনই মনে হয়নি। জামশিদ আমার চেয়ে লম্বা। যখন ভারতে আসি, তখন ইরানে ৪-৩-৩ ছকে খেলা হত। আর ভারতে ৪-২-৪। তাই জামশিদকে বলেছিলাম, আমি ফ্রি খেলতে চাই। তাই জামশিদকে স্ট্রাইকারে রেখে আমি ওর পিছনে খেলতাম। আমি বল বাড়াতাম আর জামশিদ গোল করত। এতেই আমার আনন্দ হত বেশি।
জামশিদ: একদম। ইস্টবেঙ্গলে আমাদের দু’জনের জার্সির নম্বর ঠিক হওয়ার গল্পটা মনে পড়ছে মজিদ?  
মজিদ: মনে পড়বে না আবার! শঙ্করবাবা তো আমার জন্য ১২ নম্বর জার্সি বেছে দিয়েছিলেন। ১২ নম্বর জার্সি পড়তাম। জামশিদের ছিল ৯ নম্বর। খাবাজি পরত ২১ নম্বর। কারণ, ভারতে আমাদের দু’জনের অভিভাবক ছিল ও। আমাদের দু’বছর আগে এসেছিল ইরান থেকে। ও আমার আর জামশিদের জার্সির নম্বর যোগ করে ২১ নম্বর চেয়ে নিল। এখনও ঘটনাটা মনে পড়লে হেসে ফেলি।
ভাস্কর: তোমার মনাকে (মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য) মনে আছে? ওর সঙ্গে দেখা হলে চিনতে পারবে তো? আমাকে তো প্রথমে দেখে চিনতেই পারোনি! 
মজিদ: মোনা...মোনা! ওকে ভুলব কী করে। দারুণ বন্ধু ছিল আমার। দেখা হলে ভাল লাগবে। 
জামশিদ: সুব্রত ভট্টাচার্যকে মনে আছে মজিদ। মোহনবাগানে খেলত?
মজিদ: আরে আমাদের সময়ের সেরা ডিফেন্ডার। খুব ভাল স্টপার ছিল। প্রদর্শনী ম্যাচে কতবার তোমার মাথায় বল ফেলেছি গোল করার জন্য, সুব্রত হেড করে বার করে দিয়েছে। ও থাকবে নাকি অনুষ্ঠানে? 
আনন্দবাজার: রোভার্স কাপের সেই ম্যাচটা মনে পড়ছে? মোহনবাগানের এক ফুটবলার গান গাইতে গাইতে বুটের ফিতে বাঁধছিল? তখন মোহনবাগানের এক জন বলল, গান বন্ধ কর। মজিদ আসছে। বুঝে যাবে তুই চাপে আছিস। ওই দুই ফুটবলারের নাম মনে পড়ছে?
জামশিদ: না, না সবাই বন্ধু। কারও নাম করতে চাই না। (হাসি)। 
মজিদ: আমাদের সবার সিনিয়র। নাম বলতে চাই না। মনে আছে, ব্যাপারটা আমাকে জামশিদ বলেছিল।
ভাস্কর: পাস ক্লাবের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের জয়ের ম্যাচেই জেনেছিলাম ইরানের ফুটবল ধীরে ধীরে আমাদের পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।
জামশিদ: ওই ম্যাচে আমার দাদা জাহাঙ্গির খেলেছিলেন সেটা জানো তো।
ভাস্কর: শেষ মুহূর্তে পরিমল দে-র গোলে ইতিহাস তৈরি করেছিল ।
মজিদ: ভারতীয় রেফারি ছিল। তাই অফসাইডে গোল করে ইরাকে হারিয়েছিলে (ভাস্কর উত্তেজিত দেখে হো হো করে হেসে উঠলেন মজিদ)। ভাস্কর একই রকম আছে। ওকে একটু রাগিয়ে দিতে হয়।
আনন্দবাজার: আপনি নাকি বহু বার ‘শোলে’ দেখেছেন।
মজিদ: শোলের অমিতাভ দুর্দান্ত। গব্বর সিংহ, ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনি। পরভিন ববিকেও আমার দারুণ লাগে। এখনও দেখি। ইরানে হিন্দি ছবি দেখা যায় না। আরবিক কেবল চ্যানেলে দেখি। ডিভিডি চালিয়েও দেখি।
আনন্দবাজার: ভারতীয় কোনও গানের কথা মনে পড়ে?
মজিদ: কিশোর কুমার, মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, মুকেশের গানের আমি ভক্ত। এঁরা ইরানেও দারুণ জনপ্রিয়। সময় পেলেই আমি এঁদের গান শুনি।
ভাস্কর: জামশিদের ছেলেও ফুটবল খেলছে। মোহনবাগানে এ বছর সই করেছে। 
মজিদ: শুনেছি কিয়ান ফুটবল খেলছে। জামশিদের মতো ক্রাউড পুলার হতে গেলে ওকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। 
আনন্দবাজার: জামশিদের ছেলে মোহনবাগানে ফুটবলার জীবন শুরু করল? 
মজিদ: তাতে কী হয়েছে? ও যেখানে খুশি খেলতে পারে।
আনন্দবাজার: আপনি ইস্টবেঙ্গল-মহমেডানে খেললেও কোনও দিন মোহনবাগানে খেলেননি, কোনও আক্ষেপ?
মজিদ: ইস্টবেঙ্গল, মহমেডানে খেললেও মোহনবাগানে খেলা হয়নি আমার। এই আক্ষেপটা আছে। ওদের মাঠে, তাঁবুতেও গিয়েছি। ইস্টবেঙ্গলে প্রথম বছর খেলা দেখার পরে আমাকে মোহনবাগানে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ওদের তখনকার সচিব ধীরেন দে। কিন্তু ওই ক্লাবে তখন বিদেশি ফুটবলার খেলানোর নিয়ম ছিল না। গঠনতন্ত্র বদলাতে হত। সেটা ওঁরা করতে পারেননি। অনেক পরে নিয়ম বদলেছে শুনেছি।
আনন্দবাজার: কলকাতায় থাকার সময়ে অবসর কী ভাবে কাটাতেন?
মজিদ: পার্ক স্ট্রিটে আড্ডা মেরে, সিনেমা দেখে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, অম্বর। সব জায়গায় যেতাম। ফ্লুরিজ, মোকাম্বোতে আড্ডার দিনগুলো আজও মনে পড়ে।
আনন্দবাজার: এ বার কলকাতা এসে কোথায় যেতে চান।
মজিদ: একটা ভাল বিরিয়ানির দোকানে যেতে হবে। আমি খুব বিরিয়ানির ভক্ত। আমার সময়ে সিরাজ়, আমিনিয়া ছিল। এখন তো শুনলাম অনেক নতুন দোকান হয়েছে। জামশিদের স্ত্রী-ও নিমন্ত্রণ করেছে, ওর বাড়ি যাওয়ার জন্য। ইস্টবেঙ্গল, মহমেডানের যে মেসে থাকতাম সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। কিন্তু সময় খুব কম। 
আনন্দবাজার: বর্ষার কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলে এসে ইলিশ মাছ খাবেন না?
মজিদ: আরে ওই মাছটা তো রোজ ভেজে খেতাম আমি আর জামশিদ। জামশিদের বাড়ি গেলে ওই ফ্রাইটা আবার খাব। দুর্দান্ত স্বাদ। 
আনন্দবাজার: মঙ্গলবার মঞ্চে উঠে কী বলবেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের?
মজিদ: জানি না। হয়তো আবেগে কথাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিন দশক পরে ফিরে যে ভালবাসা পাচ্ছি, সেটাই অভিভূত করে দিচ্ছে আমাকে। সুযোগ পেলে বলব, আনন্দের সঙ্গে শতবর্ষের উৎসব পালন করুন। আমাদের সময়ে ইস্টবেঙ্গল যেমন ভারত সেরা ছিল, সে ভাবেই এই ক্লাবকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যেতে হবে খেলোয়াড়দের।
আনন্দবাজার: কলকাতায় আপনার প্রথম কোচ প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (পিকে) কথা মনে আছে?
মজিদ: আমরা যখন এলাম, তখন আমাদের দেশের আয়াতুল্লা খোমেইনির যুগ। পিকে এক দিন আমাদের তিন ইরানিকে ডেকে বললেন, শোনো হে, আমার ক্ষমতা কিন্তু খোমেইনির থেকেও বেশি। শুনে আমি আর জামশিদ অবাক হয়ে গেলাম। বলে কী লোকটা? খাবাজি আবার এ সব শুনে রেগে যেত। আমরা হাসতাম। তবে নিঃসন্দেহে বড় কোচ। ফুটবলটা ভাল বোঝেন। আমিও মাঝে মাঝে রেগে যেতাম। বলতাম, আপনি এমন সব কথা দ্রুত বলে যান, যা ঠিক নয়। পিকে এ সব শুনলে কোনও কথা বলতেন না। পরে আমাদের দোস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। পিকে কত বড় কোচ তা বুঝেছিলাম ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসে। আমাদের বিশ্বকাপ দলের কোচ আমি ভারতে খেলি শুনে বলেছিলেন, ওখানে পিকে ব্যানার্জি বলে এক জন কোচ আছেন। দুর্দান্ত ফুটবল বোধ ওঁর। আমি যখন বললাম, পিকে-র কোচিংয়ে আমি দু’বছর খেলেছি, তখন উনি অবাক। বলছিলেন, ভারতে গিয়ে তো তুমি দুর্দান্ত এক জন কোচ পেয়েছ। পিকে মঙ্গলবার আসবেন? ওঁকে খুব দেখার ইচ্ছে।
ভাস্কর: কয়েক দিন আগে ইস্টবেঙ্গলের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রদীপদা এসেছিলেন। জানি না, ১৩ অগস্ট আসতে পারবেন কি না? আসতেও পারেন।
আনন্দবাজার: সেরা ম্যাচ কোনটা?
মজিদ: মুম্বইয়ের এয়ার ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক। একটা গোল করেছিলাম ৩০ গজ দূর থেকে।
জামশিদ: খুব সম্ভবত ওটাই ছিল প্রথম এয়ারলাইন্স কাপ। ১৯৮৬ সাল। হারিয়েছিলাম এয়ার ইন্ডিয়াকে।
আনন্দবাজার: ভারতে আপনার ফুটবল জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত কী? 
মজিদ: দার্জিলিং গোল্ড কাপে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ২ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পনেরো মিনিটে তিন গোল করে আমরা জিতেছিলাম। 
আনন্দবাজার: যে দিন কখনও মনে করতে চান না?
মজিদ: ১৯৮০-র ১৬ অগস্ট। ম্যাচের পরের দিন খবরের কাগজে সমর্থকদের মৃত্যুর খবর পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম।
আনন্দবাজার: তিরিশ বছর হল ইরানে ফিরে গিয়েছেন। কলকাতা বা ভারতীয় ফুটবলের খোঁজ রাখেন?
মজিদ: ইস্টবেঙ্গল বা অন্য কোনও ক্লাবের খোঁজ রাখিনি। তবে ভারতীয় দলের খেলা দেখেছি। অনেক উন্নতি করেছে। ক্লাব ফুটবল ছেড়ে ভারতীয়রা জাতীয় দলের দিকে নজর দিলে আরও ভাল করবে।  
(সাক্ষাৎকার: রতন চক্রবর্তী , শুভজিৎ মজুমদার , দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়)
https://www.anandabazar.com/sport/three-legends-of-kolkata-football-met-together-after-three-decades-1.1031120



লাল-হলুদ জার্সি গায়ে ৩৮ বছর পরে মাঠে মজিদ

লাল-হলুদ জার্সি গায়ে ৩৮ বছর পরে মাঠে মজিদ

নিজস্ব সংবাদদাতা
Majid

আবেগ: ইস্টবেঙ্গল মাঠে ভক্তদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন মজিদ। নিজস্ব চিত্র

শতবর্ষ উৎসবের অঙ্গ হিসেবে আজ, মঙ্গলবার বিকেলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ইস্টবেঙ্গলের চমকপ্রদ অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে হাজির থাকবেন মজিদ বাসকার।
আশির দশকে ময়দানের বাদশার খেলোয়াড় জীবনের সেই ‘জাদু-মুহূর্ত’ যখন ভেসে উঠবে মঞ্চের পাশের পর্দায় তখন গত একশো বছরের জীবিত অধিনায়কদের সঙ্গে স্টেডিয়ামে হাজির থাকবেন কোচেরাও। প্রত্যেক অধিনায়কের নেতৃত্বে ক্লাবের গৌরবের জয়গাথাও দেখা যাবে পর্দায়। লাল-হলুদে উৎসব, আর ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর গৌরবের মুহূর্ত থাকবে না, সেটা হয় না কি! সেই স্মৃতিও ফিরবে, যখন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হবে সম্মান। উদ্বোধন হবে অরিজিৎ সিংহের ‘ফুটবল মানেই ইস্টবেঙ্গল’ গান দিয়ে।          
সোমবার সকালে হোটেল থেকে ‘বন্ধু’ জামশিদ নাসিরিকে নিয়ে ময়দান ও শহর ঘুরতে বেরিয়েছিলেন মজিদ। দেখে এলেন ইলিয়ট রোডের সেই মেসও। ইস্টবেঙ্গল তাঁবুর সামনে এসে অবাক মজিদ প্রশ্ন করেন, ‘‘মশাল আর লাল-হলুদ রঙ ছাড়া দেখছি সবই বদলে গিয়েছে!’’ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ছাড়াও মোহনবাগান তাঁবু ও গঙ্গার পাড় দেখে মজিদ ফিরে যান হোটেলে। বিকেলে লাল-হলুদ ক্লাব তাঁবুতে  তিনি পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উন্মাদনা শুরু হয়ে যায় সমর্থকদের। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও কয়েকশো সমর্থক হাজির ছিলেন বাদশাকে দেখার জন্য। ১৯৮১-র সেপ্টেম্বরে ইস্টবেঙ্গল মাঠে শেষ বার অনুশীলন করেছিলেন মজিদ। প্রায় আটত্রিশ বছর পর ফের ‘স্পর্ধার শতবর্ষ’ লেখা লাল-হলুদ জার্সি পরে যখন বাদশা ঢুকলেন, তখন তিনিও উচ্ছ্বসিত।
মজিদকে এত দিন পর কলকাতায় ফিরিয়ে আনার মূল কারিগর ক্লাবের শীর্ষ কর্তা দেবব্রত সরকার বলছিলেন, ‘‘মজিদকে আনার প্রস্তুতি আমরা শুরু করেছিলাম দেড় বছর আগেই। যখন আমরা শতবার্ষিকী উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিই। সম্মানিত করার জন্য দু’জন ভারতীয় ও এক জন বিদেশি ফুটবলারের নাম ভাবতে হয়েছিল। মজিদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। ওর বিকল্প এখনও পাওয়া যায়নি ভারতীয় ফুটবলে। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের মাধ্যমে ইরানের ফুটবল সংস্থায় যোগাযোগ করা হয়েছিল মজিদের ফোন নম্বর জোগাড় করার জন্য। কিন্তু আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ করেই মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যকে দিয়ে এক দিন ফোন করানো হল। কিন্তু ও রাজি হল না কলকাতায় আসতে। জামশিদ নাসিরিও ব্যর্থ হল। আসলে কলকাতায় ফেরা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিল। কিন্তু আমাদের কাছে মজিদকে আনাটা চ্যালেঞ্জ ছিল। সচিব কল্যাণ মজুমদার নিয়মিত তাগাদা দিতেন। শেষ পর্যন্ত মজিদকে রাজি করাতে আমরা সফল হই।’’ 

মজিদের হৃদয়ে ইস্টবেঙ্গল, স্পোর্টসডে-তে চাঁদের হাট

মজিদের হৃদয়ে ইস্টবেঙ্গল, স্পোর্টসডে-তে চাঁদের হাট

নিজস্ব সংবাদদাতা

East Bengal

বন্ধু জামশিদকে সংবর্ধনা দিচ্ছেন মজিদ। —নিজস্ব চিত্র।

তাঁর নাম উচ্চারণ হতেই স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা সমবেত ভাবে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ম-জি-দ, ম-জি-দ’। আশির বাদশা ভক্তদের সেই ভালবাসা গ্রহণ করলেন। জানালেন, ইস্টবেঙ্গল তাঁর হৃদয়ে।
ইস্টবেঙ্গলের স্পোর্টস ডে-তে নবীন ও প্রবীণ অধিনায়ক মিলে মিশে একাকার। প্রাক্তন অধিনায়ক চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হাল আমলের ব্র্যান্ডনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পঞ্জাব থেকে চলে আসেন গুরবিন্দর সিংহ, বেঙ্গালুরু থেকে হরমনজ্যোৎ সিংহ খাবরা। লক্ষণীয় ভাবে এ দিন উপস্থিত ছিলেন না প্রাক্তন অধিনায়ক সুধীর কর্মকার, গৌতম সরকার, সত্যজিৎ মিত্র। চিত্রপরিচালক তরুণ মজুমদার, সাহাত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে সংবর্ধিত করা হয়।
সেই মঞ্চেই অরিজিৎ সিংহের গলায় গাওয়া ইস্টবেঙ্গলের থিম সং উদ্বোধন করেন ইস্টবেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট প্রণব দাশগুপ্ত। পঞ্চপাণ্ডবের পরিবারের সদস্যদেরও সংবর্ধিত করা হয়। ক্লাবের প্রাক্তন অধিনায়কদের সংবর্ধনা দেওয়ার সময়ে আবেগঘন দৃশ্যের মুহূর্ত তৈরি হয়। ১৯৭০ সালের শিল্ড ফাইনালে ঐতিহাসিক পাস ক্লাবের বিরুদ্ধে গোল করেছিলেন পরিমল দে। অশক্ত শরীরে মঞ্চে হাজির তিনি।
তাঁকে দেখেই এগিয়ে আসেন মজিদ। জড়িয়ে ধরেন তাঁকে। বন্ধু জামশিদ নাসিরিকে সংবর্ধনা দেওয়ার সময়ে মজিদ নিজেই আবেগতাড়িত। স্নেহের সঙ্গে কাছে টেনে নিলেন জামশিদকে। মঞ্চে উঠে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না অনেকে। ইস্টবেঙ্গলের স্পোর্টস ডে-তে সকাল থেকে সন্ধে ব্যস্ত থাকলেন মজিদ।  এ বারের স্পোর্টস ডে ছিল সব অর্থেই  ব্যতিক্রমী। কারণ শহরে উপস্থিত মজিদ। ক্লাবের রক্তদান শিবিরে সকালেই উপস্থিত হন ইরানি-তারকা। রক্তদাতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন তারকাকে। সন্ধেয় আগাগোড়া মঞ্চে ছিলেন তিনি। তাঁর পরনে ছিল ১২ নম্বর জার্সি। এই জার্সি পরেই তো একদিন ভক্তদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মজিদ। আজ এত বছর পরে তিনি দেখলেন ভক্তদের কাছে তিনি বাদশা হিসেবেই রয়ে গিয়েছেন।