Thursday, 28 June 2018

বর্শায় সিংহ এফোঁড়-ওফোঁড় (On Hiren Bose)

বর্শায় সিংহ এফোঁড়-ওফোঁড়

মাংসের টোপে উত্তেজিত সিংহ লাফিয়ে উঠবে, আর শিকারির বর্শা বিঁধে যাবে তার শরীরে। হোটেলের ঘরে বসে এমনই চুক্তি হয়েছিল। ঝুঁকি নিয়ে তোলা হচ্ছে গন্ডার, কুমির, জলহস্তীর ছবি। ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরুর সময় কলকাতার বাঙালি পরিচালক হীরেন্দ্রনাথ বসুর আফ্রিকা অভিযান।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়
 
Hiren Bose

চিত্র-পরিচালক হীরেন্দ্রনাথ বসু

সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে শুটিং হয়েছে। সূর্যের আলোয় ঝকমক করছে চাঁদের পাহাড়। কিন্তু বিকেলের ধূসর ছায়া বরফের উপর পড়তেই পালটে গেল রূপ। সে কি ছাড়া যায়! রাস্তার মধ্যিখানে ক্যামেরা পাতা হল আবার। দূর থেকে এগিয়ে আসছে একটা মোটরগাড়ি। কাছেই এসে পড়েছে, কিন্তু গতি কমানোর লক্ষণ নেই। এ দিকে পরিচালক, চিত্রগ্রাহক তাঁদের কাজ চালিয়েই যাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা পটেলজি আচমকা দৌড়ে এসে ক্যামেরাটা কাঁধে তুলে পাশের খাদে লাফিয়ে পড়লেন!
১৯৩৯ সালের টাঙ্গানাইকা। মানে, এখনকার তানজানিয়া। মোসি শহর লাগোয়া জঙ্গলের রাস্তায় ক্যামেরা তাক করেছে মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর দিকে। তার মাঝে এ কী পাগলামো! খাদটা অগভীর, ক্যামেরাও অক্ষত। পটেলজি উঠে এসে বললেন, গোরা সাহেবের গাড়ি ক্যামেরা দেখে থামবে, এমন ভাবার কোনও কারণই নেই। ওরা অবলীলায় ক্যামেরা গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে যেত আর সেই সঙ্গে গুলি চালিয়ে ক’জনকে জখমও করত। এ অঞ্চলে এটাই দস্তুর।
মোম্বাসা থেকে নাইরোবি আসার সময়েই বা কী হল? পাঁচশো মাইল রাস্তা। শুটিংয়ের লটবহর রয়েছে। ট্রেন পেলে সুবিধা হত। জানা গেল, ফার্স্ট ক্লাসে যদি এক জনও শ্বেতাঙ্গ থাকেন, তা হলে টিকিট মিলবে না। ওঁরা বাধ্য হয়ে মোটরগাড়িই নিলেন।
ওঁরা মানে হীরেন বসু আর তাঁর ইউনিট। বাঙালি আজই কেবল আফ্রিকা-অ্যামাজন দৌড়চ্ছে না। তিরিশের দশকের শেষেই এই বঙ্গতনয় নায়ক-নায়িকা-কমেডিয়ান-ভিলেন সমেত সদলবল আফ্রিকায় শুটিং করে এসেছিলেন! সাহেবরা পারলে আমরাই বা পারব না কেন, এ রকমই ছিল ওঁদের মনের ভাব। ‘ইন্ডিয়া ইন আফ্রিকা’ নামের সেই হিন্দি ছবি মুক্তি পায় ১৯৪০-এর ২৮ জুন। রোমাঞ্চকর শুটিংয়ের গল্প ‘বনে জঙ্গলে’ বইয়ে নিজেই লিখে গিয়েছেন পরিচালক। বইয়ের প্রচ্ছদে তিনি, হীরেন্দ্রনাথ বসু (১৯০৩-১৯৮৭)। কিন্তু চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতজগতে তাঁর খ্যাতি হীরেন বসু নামেই। এই  হীরেনই ‘জোর বরাত’ (১৯৩১) ছবিতে এ দেশে প্রথম প্লেব্যাক ব্যবহার করেন। ইনিই ‘আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও’, ‘শুকনো শাখার পাতা ঝরে যায়’, ‘আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ’-এর মতো বিখ্যাত গানের গীতিকার এবং সেই সঙ্গে প্রায় এগারোটি ছবির পরিচালকও। ‘ইন্ডিয়া ইন আফ্রিকা’ যার অন্যতম।
বিশ শতকের সেই সময়টায় লেখালিখির জগতে আর সেলুলয়েডে আফ্রিকা নিয়ে বেশ মাতামাতি চলছে। ১৯১৪ সালের মধ্যে আফ্রিকার প্রায় নব্বই শতাংশই পশ্চিমি দেশগুলোর দখলে চলে এসেছে। সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেওয়ার প্রতিযোগিতাও তখন জোরকদমে। সেই সঙ্গে তার ভূপ্রকৃতি, বন্যপ্রাণ এবং অরণ্যচারী জনজীবনকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে রোমহর্ষক সব মিথ।
ঐতিহাসিক: ‘ইন্ডিয়া ইন আফ্রিকা’ ছবির পোস্টার।
১৯৩১ সালে আফ্রিকার মাটিতে শুট হচ্ছে প্রথম কাহিনিচিত্র ‘ট্রেডার হর্ন’, তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৩২ সালে সুবিখ্যাত ‘টারজান দি এপ ম্যান’। আফ্রিকা নিয়ে উদ্দীপনা তখন এ দেশে বা এ রাজ্যেও কিছু কম ছিল না। বাংলায় প্যারীমোহন সেনগুপ্তের বই ‘কাফ্রিদের দেশ আফ্রিকা’ বেরিয়ে গিয়েছে ১৯২২ সালেই। ১৯৩৩ সালে হেমেন্দ্রকুমার রায় লিখে ফেলেছেন ‘আবার যকের ধন’, ১৯৩৫ থেকে ‘মৌচাক’-এ ধারাবাহিক ভাবে বেরোতে শুরু করছে ‘চাঁদের পাহাড়’। আর ছায়াছবির জগতে তো টারজানের জাদু দিকে দিকে। ১৯৩৭-এ ওয়াদিয়া মুভিটোন বিপুল ব্যবসা করল ‘তুফানি টারজান’ ছবিতে। পরের বছরই আবার অরোরা বানিয়ে ফেলল ‘টারজান কি বেটি’।
হীরেন বসুর আফ্রিকা-চিত্র সে দিক থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিন্তু এ দেশে তখনও আর কেউ যা করেনি, সেটাই তিনি করেছিলেন, অর্থাৎ খাস আফ্রিকার লোকেশনে গিয়ে শুটিং করে এসেছিলেন। ছবিটার পিছনে একটা জাতীয়তাবাদী তাগিদও ছিল। সেটার অনেকখানি কৃতিত্ব ছবিটির প্রযোজক, তখনকার নামকরা কংগ্রেসি নেতা শেঠ গোবিন্দদাসের। বস্তুত এমন একটি ছবির আইডিয়া গোবিন্দজির মাথাতেই প্রথম এসেছিল। ‘ট্রেডার হর্ন’ ছবিটি দেখে গোবিন্দজির মনে হয়, সাহেবরা ভুল ইতিহাস শেখাচ্ছে। আফ্রিকার জনজাতিদের সঙ্গে সাহেবদের বাণিজ্য শুরু হওয়ার অনেক আগে, প্রাচীন কাল থেকে ভারতের, বিশেষত কাথিয়াবাড়ের বণিকদের সঙ্গে যে আফ্রিকার নিয়মিত বাণিজ্য ছিল, সে কথাটা কেউ তুলছেই না। গোবিন্দজি এর পর থেকেই নিজের সমস্ত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে আফ্রিকায় একটি বড় মাপের সাফারির বন্দোবস্ত করেন, ছবির টাকাও জোগাড় করেন। পাচ্ছিলেন না শুধু উদ্যমী, সাহসী পরিচালক। ১৯৩৮ সালের পুজোয় হীরেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে সেই অভাবটুকু আর রইল না।
১৯৩৯-এর ৩১ জানুয়ারি হীরেনরা মুম্বই থেকে মোম্বাসাগামী জাহাজে চড়ে বসলেন। সঙ্গে আছেন ক্যামেরাম্যান সুধীর বসু, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার পরিতোষ বসু, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট জগতাপ, সহপরিচালক অশ্বিনী মিত্র ও এস ব্যানার্জি, এবং ছবির নায়ক নান্দরেকর আর দুই নায়িকা ঊর্মিলা দেবী ও বিদ্যা দেবী। আর এক জন আছেন, আলিভাই, তিনি আফ্রিকা থেকে এসেছেন, ইউনিটের গাইড হিসেবে থাকবেন। মোম্বাসা থেকে সবাই যাবেন নাইরোবি হয়ে একশো মাইল দূরের থিকা শহরে। সেখানে কিছু শুটিং হবে। তার পর মেয়েরা সেখানেই থেকে যাবেন। বাকি ইউনিট টাঙ্গানাইকা রওনা হবে।
ক্যামেরা অবশ্য চালু হয়ে গেল সমুদ্রপথেই। উড়ুক্কু মাছ থেকে শুরু করে পথিমধ্যে সিসিলি-তে আদিবাসী নাচগান, উটপাখির সার— সবই তোলা হল। মোম্বাসা থেকে নাইরোবির পথেও হুডখোলা গাড়িতে ক্যামেরা প্রস্তুত রাখা হল, সঙ্গে চালু রইল দু’টো আইমো হাত-ক্যামেরাও। কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে ছবি তোলার আসল পাঠ নেওয়া তখনও বাকি। নাইরোবিতে পৌঁছে প্রথম গন্তব্য জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর স্টুডিয়ো। পূর্ব আফ্রিকায় শুটিং করতে এলে তখন বেশির ভাগ দলই এখান থেকে ক্যামেরার সরঞ্জাম ভাড়া নিত। এখানেই শিখিয়ে দেওয়া হত, কোন জন্তুর কেমন মেজাজ। সিংহের ছবি তুলতে গেলে কী করতে হবে, হাতির কাছাকাছি যাওয়ার নিয়ম কী, গন্ডারের ছবি গাছ থেকে নেওয়াই ভাল, জলহস্তী কী করলে জল থেকে উঠবে, ঘুমপাড়ানি মাছি থেকে সাবধান, এই সব।
থিকায় পৌঁছে চেনিয়া আর থিকা নদীর প্রপাত দেখেই হীরেন চিনলেন, এই তো টারজানের লোকেশন! এ তো পরদায় দেখা! বাজারে একটি ক্যামেরার দোকানে গিয়ে আলাপ হয়ে গেল মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার-এর এক ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে। ওঁদের ইউনিটও এসেছে শুটিং করতে। সঙ্গে এনেছে মুভিং ল্যাব, মুভিং জেনারেটর আর লাইট, ছোট প্রজেক্টর, আরও কত কী! চিত্রগ্রাহক সুধীর বেশ একটু দমেই গেলেন! হীরেন উৎসাহ দিয়ে বললেন, নিধিরাম সর্দার হয়েই আমরা লড়ে যাব ঠিক! পরের দিন মহরত শট! হলিউডি ক্যামেরাম্যানও দেখতে এসেছেন! অশ্বিনী মিত্র কমেডিয়ানের ভূমিকায়। গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে নদীতে ঝাঁপ দিলেন! স্রোতের টানে গড়িয়ে গেলেন খাদের দিকে! কাট! অশ্বিনী জল থেকে উঠে এসে বললেন, ঠিক হয়েছে তো?
পরের দিন আর একটা প্রপাতে নায়িকার স্নানদৃশ্য তোলা হচ্ছে। সঙ্গে গানও আছে। টেলিফোটো লেন্স পড়ে গেল জলে। দলের একটি রাঁধুনি যুবক সাঁতার জানতেন। তিনিই উদ্ধার করলেন। তাঁর সাহস দেখে তাঁকেই নায়কের পোশাক পরিয়ে একটা স্টান্ট করানো হল। সকলের উৎসাহে তিনি করেও ফেললেন, কিন্তু উপরে উঠে এসেই অজ্ঞান। সেবাশুশ্রূষা করে তাঁকে সুস্থ করা হল।
হীরেনের বিবরণ পড়লে বেশ বোঝা যায়, সিনেমার শুটিং সে সময়ে আফ্রিকার অরণ্য-জীবনে দৈনন্দিনতার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। টাঙ্গানাইকার আরুশা শহরে হোটেল ম্যানেজারই বলে দিলেন, টাকা দিলে মাসাই যুবকরা এসে তাঁদের সিংহ শিকার করার বিশেষ নাচ দেখিয়ে যাবেন। চাই কি, সিংহ মেরেও দেখিয়ে দেবেন। শুটিংয়ের সময়ে দেখা গেল, নাচিয়েরা ক্যামেরা কী চায় বুঝে গিয়েছেন। লেন্সের সামনে লাফিয়ে পড়ে মুখব্যাদান করছেন, বর্শা নিয়ে এমন সব কসরত করছেন যেন সিংহ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে! 
এমনিতে সিংহের সঙ্গে মোলাকাত এর মধ্যে দু’-এক বার হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আসল শুটিং বাকি। তার জন্য যাওয়া হবে বানাগি হিলস। সেখানকার বন বিভাগের অফিসার বলে দিলেন, সিংহকে জেব্রা বা হরিণ মেরে খেতে দিলে তারা খুশি হয়ে ছবি তুলতে দেবে। কোটপ্যান্ট পরা লোক নাগাড়ে দেখতে দেখতে সিংহেরা বুঝেই গিয়েছে, এরা এলে খেতে দেয়। অতএব একটা লরিতে বড় ক্যামেরা রাখা হল, সঙ্গে দু’টি গাড়িতে দু’টি আইমো ক্যামেরা, হাতে হাতে আরও দু’টি। এ বার একটি জেব্রা মেরে প্রথমে তার একটা পা কেটে বাঁধা হল একটা গাড়ির সঙ্গে। পিছনের পা দু’টিতে এমন ভাবে দড়ি বাঁধা হল যাতে তা গাছে ঝোলানো যায় এবং দরকার মতো উঁচু-নিচু করা যায়। সেই দড়ি বাঁধা থাকল লরির চাকায়। এ বার জেব্রার একটা পা নিয়ে ছুটল গাড়ি আসল টোপ-বাঁধা গাছটার দিকে আর সিংহের দল ছুটল তার পিছন পিছন। পাঁচখানা ক্যামেরা আশ মিটিয়ে তাদের ছবি তুলতে লাগল। এক দল সিংহের পরে আর এক দল, আবার টোপ সাজানো হয়। এ বার টোপের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয় চাদর, যেন সিংহ মানুষই টেনে নিয়ে গেল! আবার একটি সিংহকে টোপ দেখিয়ে উত্তেজিত করে, শেষ মুহূর্তে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সে লাফ দিয়ে উঠতেই মাসাই শিকারির বর্শা তাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ঠিক যেমনটি তাদের সঙ্গে বায়না হয়েছিল হোটেলে বসেই!
শুধু কি সিংহ? সে বার সব মিলিয়ে প্রায় ছ’হাজার মাইল সাফারি করেছিলেন হীরেনরা। আবিসিনিয়ার গ্রামে আদিবাসী মেলা, কেনিয়ার গন্ডার, উগান্ডার কুমির, কঙ্গোর জলহস্তী আর হাতি— প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, পাগলের মতো পরিশ্রম করে তুলে এনেছিলেন সব চলচ্ছবি। কখনও চোরাবালিতে পড়েছেন, কখনও বিষাক্ত মাছির পাল থেকে বাঁচতে গলাজলে নেমে দাঁড়িয়েছেন। এক বার তো মরীচিকা রাস্তা ভুলিয়ে দিয়েছিল বিলকুল। দলছুট গাড়ি মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকল সারা রাত। দশ ফুট দূরে সিংহের চোখ জ্বলছে, দমবন্ধ করে গাড়ির ভিতরে হীরেন জলাভাবে রবার চিবোচ্ছেন।
গায়ে কাঁটা দেওয়া আশ্চর্য সব বর্ণনা হীরেনের লেখার ছত্রে ছত্রে। নিজে পরাধীন দেশের নাগরিক। আফ্রিকার সম্পদ লুণ্ঠনের দিকটি তাঁর মনে বড় বাজে। ‘মনে মনে ভাবি, প্রকৃতি যাদের এ অজস্র দান আপন হাতে দিয়েছেন... তাদের ধন এরা কেড়ে নিয়ে আবার তাদেরই উপর পাহারা বসিয়েছে! কার ধন কে নেয়, কে খায়?’ কিন্তু এই চোখই যখন তথাকথিত ‘সভ্য’জগৎ থেকে দূরে থাকা জনজাতির দিকে তাকায়, তার চশমাটা হয়ে যায় পশ্চিমের মতোই। তখন ভূমিপুত্রদের জন্য ‘জংলী’ ছাড়া অন্য বিশেষণ মেলেই না। তবু সেই ‘জংলী’দের যে ক’জন বিদেশিদের কাছে কাজ করছেন, শুটিং দলের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন, তাঁদের কিছুটা দাম আছে। বহিরাগত চোখে বাকিরা শুধুই কিম্ভূত, বিপজ্জনক, নরখাদক রাক্ষস।
বস্তুত আফ্রিকার বুকে চলচ্চিত্রনির্মাণও যে সে আমলে কী আগ্রাসক চেহারা নিয়েছিল, তার এক দলিল হীরেনের লেখা। অবাধ বন্যপ্রাণ হত্যা তো আছেই, কৃষ্ণাঙ্গদেরই একটি গোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে পিগমিদের খেদানো হচ্ছে এবং তার পর তাদের বস্তি জ্বালিয়ে দিয়ে সেই ছবি তুলছে হলিউড, এমন রেওয়াজের কথাও স্বকর্ণে শুনে এসেছিলেন হীরেন। তাঁর নিজের ইউনিট একেবারে শেষ পর্বে পিগমিদের একটি দলের আক্রমণের মুখে পড়েছিল। ইউনিটেরই এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে তারা তুলে নিয়ে যায়। তার আর খোঁজ মেলেনি।
মিকোয়া নামে ওই যুবক, তাড়া খাওয়া পিগমিদের দল, শুটিং দলের গাড়ির তলায় চাপা পড়া পশুরা, সিংহের টোপ হয়ে যাওয়া জেব্রা আর হরিণেরা—এরা সবাই এক অর্থে শহিদ। আফ্রিকার শহিদ, চলচ্চিত্রের শহিদ।

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/unknown-stories-behind-the-hiren-bose-s-film-india-in-africa-1.735862

ঘন জঙ্গলে ঢাকা দ্বারকানাথের ‘হলেজ ঘর’

ঘন জঙ্গলে ঢাকা দ্বারকানাথের ‘হলেজ ঘর’

মোটা লোহার তারে বাঁধা ডুলি। তাতে ভূগর্ভ থেকে উঠে আসে কয়লা। এটাই হলেজ পদ্ধতি। এ দেশের প্রথম শিল্পোদ্যোগী দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ঘর, কয়লাখনি ও বাংলো আজ শুধুই ভগ্নস্তূপ।

সুশান্ত বণিক
 
House
আজও তিনি শায়িত লন্ডনের কেনসাল গ্রিন সেমেটরিতে। ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি পর্যটকদের কাছে এখনও সেই সমাধিস্থল অত্যন্ত মর্যাদার। কিন্তু অনেকেরই প্রায় জানা নেই, ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের অগ্রণী পুরুষ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরই প্রথম ভারতীয়, যিনি রানিগঞ্জে একটি আধুনিক কয়লাখনি বানিয়েছিলেন। বাঙালি শিল্পবিমুখ, এই অপবাদ ঘুচিয়ে দ্বারকানাথ ঠাকুর সে দিন যে কারিগরি দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা এখনও তামাম রাষ্ট্রীয় কয়লা উত্তোলক সংস্থাগুলির কাছে এক পরম বিস্ময়। দ্বারকানাথের সৃষ্টি সেই খনি ও বাংলোর ধ্বংসাবশেষ এই এলাকার বাসিন্দাদের কাছে আজও দ্রষ্টব্য।
ভারতে কয়লা খননের আঁতুড়ঘর রানিগঞ্জ। ১৭৪৪ সালে প্রথম এখানে ইংরেজ সাহেবরা মাটির তলা থেকে কয়লা তুলতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাস দাবি করেছে, দ্বারকানাথ ঠাকুরই প্রথম ভারতীয় যিনি ব্রিটিশ শিল্পপতি তথা ইংরেজ বন্ধু উইলিয়াম কার-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কয়লাখনি গড়ে তুলেছিলেন। সংস্থার নাম দিয়েছিলেন কার এন্ড টেগোর কোম্পানি। ১৮৩৫ সালে খনি-শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে দামোদর নদের তীরবর্তী নারানকুড়ি গ্রামে ওই ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি বানানো হয়। খনি বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, বিশাল একটি কুয়োখাদ বানিয়ে তার দেওয়াল কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাটির গভীর থেকে কয়লা খুঁড়ে বের করার পরিকল্পনা করে এই কোম্পানি। কিন্তু ভূগর্ভের কয়লা উপরে তোলা হবে কী করে? জানা যায়, খনি থেকে কিছুটা দূরে একটি ঘরে কপিকলের মতো বিশাল একটি যন্ত্র বসানো হয়। যন্ত্রের সঙ্গে প্যাঁচানো মোটা লোহার তারের উলটো প্রান্তে সার বেধে জোড়া থাকত একাধিক ডুলি। এতেই কয়লা চাপিয়ে, তার গুটিয়ে কয়লা উপরে তোলা হত। ঠিক যেমন ইঁদারা থেকে জল তোলা হয়। ভূগর্ভে শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া ও ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্যও এই ডুলি ব্যবহার করা হত। এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হলেজ’ পদ্ধতি। যে ঘরে যন্ত্রটি বসানো ছিল তার নাম ‘হলেজ ঘর’। এই পুরো কাজটি হাতে নয়, বাষ্পীয় যন্ত্রের মাধ্যমে চালিত হত। খনি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এখনও দেশের সমস্ত ভূগর্ভস্থ কয়লাখনিতে এই পদ্ধতিতেই কয়লা তোলা হয়। তবে বাষ্পীয় যন্ত্রের পরিবর্তে বিদ্যুৎ-চালিত যন্ত্র বসানো হয়েছে।     
আজও নারানকুড়ি গ্রামের ওই পরিত্যক্ত কয়লাখনির পাশে গেলে জঙ্গলে ঘেরা সেই হলেজ ঘরটির দেখা মেলে। খনি থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরেই ছিল প্রশাসনিক ভবনটি। সেখানেই বসে নিয়মিত কাজের তদারকি করতেন দ্বারকানাথ ও উইলিয়াম কার। পাশের একটি ভবনে ছিল অধস্তন কর্মচারীদের ঘর। শোনা যায়, খনির কাজ দেখাশোনা করার জন্য নিয়মিত সেখানে আসা-যাওয়া করতেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বারকয়েক নাকি তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথও। প্রায় ১৯০ বছরের পুরনো ওই হলেজ ঘরটির দেখা মিললেও প্রশাসনিক ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। তবে খুঁজলে পুরনো ইট, মেঝের টালির দেখা মেলে।
কয়লা উত্তোলনের পরে কোথায় সরবরাহ হত সেই কয়লা? ইতিহাস বলছে, উত্তোলিত কয়লার বেশির ভাগই চলে যেত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। কিছুটা সরবরাহ হত বিহারে। খনি থেকে তোলা কয়লা গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হত নারানকুড়ি গ্রামের সীমান্তে মুক্তেশ্বরী মন্দির ঘাটের জেটিতে। সেখানে নৌকায় কয়লা চাপিয়ে তা পাঠানো হত কলকাতার কয়লাঘাটায়। রানিগঞ্জ থেকে কয়লা পরিবহণের জন্য মুক্তেশ্বরী মন্দির জেটিও তৈরি করেছিলেন দ্বারকানাথ। এখন সেখান থেকে নৌকা পারাপার হয় না, তবে সেই জেটির ধ্বংসাবশেষ আজও আছে। এক সময় দ্বারকানাথের মনে হয়, নৌকায় করে কয়লা পরিবহণ অত্যন্ত বিপজ্জনক, আর লাভজনকও নয়। তাই কলকাতা থেকে রানিগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ পাতার পরিকল্পনাও করছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি তো ‘নেটিভ’, তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে রেললাইন পাতার অনুমোদন দেয়নি। তবে পরবর্তী কালে ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকারই রেললাইন পাতার কাজটি করেছে।
এখন পুরো এলাকাটি রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা উত্তোলক সংস্থার আওতায়। সংস্থার আধিকারিকদের দাবি, ওই এলাকায় প্রচুর উন্নত মানের কয়লা মজুত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভূপৃষ্ঠের খুব কাছেই রয়েছে এই কয়লার স্তর। প্রতি মাসে অন্তত পাঁচ লক্ষ টন কয়লা এখান থেকে তোলা যাবে। কিন্তু এলাকার বাসিন্দারা চান, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকাটিকে ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করা হোক, আজকের প্রজন্ম হাতে-কলমে জেনে নেবার সুযোগ পাক বাঙালির প্রথম, অনন্য শিল্প প্রয়াস। কিন্তু তাঁদের আশঙ্কা, সত্যিই যদি দ্বারকানাথের এই কয়লাখনি লাগোয়া এলাকায় নতুন করে খনন করে কয়লা তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে হয়তো দেশের প্রথম ভারতীয় কয়লাখনি মালিকের শেষ চিহ্নটুকুও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/prince-dwarkanath-tagore-was-the-first-indian-who-made-a-modern-coal-mine-in-raniganj-1.735867?ref=archive-new-stry

পাঞ্চ হাউসের সামনে খাটিয়া পেতে ঘুমোত সাহেবরা (Story of Liquor in Kolkata)

পাঞ্চ হাউসের সামনে খাটিয়া পেতে ঘুমোত সাহেবরা

কলকাতায় মদের নেশা কি আজকের? লালবাজার, বউবাজার, বেন্টিংক স্ট্রিট জুড়ে একদা মদের পসরা সাজিয়ে বসত ইংরেজ, ফরাসি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ শুঁড়িরা। ক্রমে মদের ব্যবসায় নামল বাঙালিও। ওয়াইন, ব্র্যান্ডি মন জয় করল বাবুদের।

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
 
Graphics

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

জোব চার্নক বসেছেন কাছারিতে। ব্যবসায়ীরা ভিড় জমাচ্ছেন। সাহেবের সামনের টেবিলে পানীয়— পুরনো আরক আর কিছু তরল। নিপুণ হাতের কারসাজিতে তৈরি হচ্ছে ‘আরক-পাঞ্চ’। এমন সময় চার্নকের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন হিল টোকা দিলেন। ‘‘কী দরকার?’’ ‘‘স্যর, লাইসেন্স...’’ চার্নকের তখন দিল খুশ। মিলল ‘পাঞ্চ হাউস’ খোলার অনুমতি।
ক্যাপ্টেন হিল বুদ্ধিমান লোক। মাতাল সামলাতে ‘বাউন্সার’ হিসেবে নিয়োগ করলেন এক সার্জেন্টকে। সেই সার্জেন্টও চালিয়াত। সেনাবাহিনীর ছোকরাদের পাকড়াও করে পাঞ্চ খাওয়ানো, বেশি ট্যাঁ-ফোঁ করলে উত্তম-মধ্যম দেওয়া— সবেতেই তিনি সাবলীল। সঙ্গে ‘ফলস রিটার্ন’ দিয়ে উপরি আয় তো রয়েইছে। কলকাতার সাহেবি আদিপর্বের এই বাউন্সার গোছের মানুষগুলি, ‘রাম-জনি’।
কলকাতায় প্রথম পাঞ্চ-হাউসের ‘সরকারি’ লাইসেন্স পেলেন ডেনিঙ্গো অ্যাশ নামের এক মহিলা। ডেনিঙ্গো জানেন ব্যবসার অলিগলি। তাঁর চোখের চপল চাহনি হিল্লোল তুলল সাহেবদের বুকে। ভিড় জমল। সঙ্গে গোলমাল।
ঘটনাস্থল, কলকাতারই একটি পাঞ্চ হাউস। এক সাহেব আরকের নেশায় তরোয়াল খাপ-ছাড়া করে ঘোরাতে শুরু করলেন। ব্যস, ফরমান জারি, তরোয়াল নিয়ে পাঞ্চ হাউসে যাওয়া— নৈব নৈব চ।
এমন হুজ্জুতি করে মাতাল সাহেবদের বেশির ভাগেরই আর পাঞ্চ হাউস থেকে পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরার ক্ষমতা থাকে না। অগত্যা পাঞ্চ হাউসের সামনে খাটিয়া পাতা হল। আরকের হ্যাং কাটতে কাটতে সেখানেই দুপুর গড়ায় সাহেবদের।
এই আরক আসলে তাড়ি, হাঁড়িয়া প্রভৃতির চোলাই। চোলাইয়ের এমন রমরমা বাজারের মওকা তুলতে কলকাতায় গজিয়ে উঠল একের পরে এক পাঞ্চ হাউস। বেশ কয়েক দশক পাঞ্চ হাউসের রমরমা চলার পরে ধীরে ধীরে তার জায়গায় এল ট্যাভার্ন বা সরাইখানা। এ বার পানাতুর সাহেবের দল চাক বাঁধল লালবাজার, বউবাজার, বেন্টিংক স্ট্রিট, খিদিরপুর, ডেকার্স লেন, রাধাবাজারে।
লালবাজারের কাছেই বউবাজার স্ট্রিট। সাহেবি লব্‌জে তা ‘ফ্ল্যাগ স্ট্রিট’। এমন নাম কেন? বেন্টিংক স্ট্রিটের খানিকটা আর ফ্ল্যাগ স্ট্রিটের মাঝামাঝি অজস্র শুঁড়ির দোকান। সেখানেই মদিরার পসরা সাজিয়ে বসে ইংরেজ, ফরাসি, মার্কিন, ইতািলয়ান, স্প্যানিশ শুঁড়িরা। প্রতিটি দোকানের মাথায় সাইনবোর্ডে আঁকা অথবা ঝোলানো নিজের নিজের দেশের ‘ফ্ল্যাগ’। রাস্তার নামেও তাই ‘ফ্ল্যাগ’ জুড়ল।
ধীরে ধীরে শুরু হল ক্ল্যারেট, ম্যাডিরা প্রভৃতি ওয়াইনের জয়জয়কার। অবশ্য ক্ল্যারেট কলকাতায় ঢুকল বেশ ঘুরপথে। ফ্রান্স থেকে ডেনমার্ক হয়ে ভায়া শ্রীরামপুর— ‘লাল শরাব’-এর পথ এটাই।
এই লালবাজার স্ট্রিটেই উইলসন অ্যাপলো নামে এক সাহেব তৈরি করেন ‘অ্যাপলোজ ট্যাভার্ন’। কাউন্সিল সদস্যদের ঠেক এই সরাইখানা। সেই সরাইখানার টেবিলের তলায় হরদম মেলে কেচ্ছার গল্প। তেমনই একটা। সাহেবি মহল হঠাৎ সরগরম। বিষয়, জর্জ ফ্রান্সিস গ্র্যান্ডের স্ত্রী ক্যাথরিন গ্র্যান্ডের সঙ্গে স্যর ফিলিপ ফ্রান্সিসের পরকীয়া। আচমকা খবর, গ্র্যান্ডের বাড়িতে নাকি ফিলিপ সাহেবের দেখা মিলেছে। গ্র্যান্ড সাহেব তখন কোথায়? বিশেষ সূত্রে জানা গেল, তিনি নাকি সেই সময় গড়াগড়ি খাচ্ছেন ফ্রান্সিস লে গ্যালের সরাইখানায়।
চিৎপুর রোডের পুব দিকে ‘হার্মোনিক ট্যাভার্ন।’ এখানে ঢুকে দেখা গেল, কমবয়সি সাহেব-মেমরা মদের নেশায় রুটির টুকরো পরস্পরের দিকে ছুড়ে মারছেন। এর নাম ‘পেলেটিং’। এই ট্যাভার্নেই ঠেক ছিল কলকাতার নামকরা মদ্যপায়ী অ্যাটর্নি উইলিয়াম হিকির। নিজের ঠেকেই এক দিন পার্টি দিয়েছেন হিকি সাহেব। ২৯ জন আমন্ত্রিত। শোনা যাচ্ছে কনসার্টের সুর। চলছে বল ডান্স। এবং সঙ্গে মদ্যপান, ভোর রাত পর্যন্ত।
এ সব চলতে চলতেই এক দিন হঠাৎ মাতাল কলকাতার আকাশে কালো মেঘ। ক্ল্যারেটের দাম আকাশ ছুঁল। বিলিতি মদের আমদানিতে ঘাটতি। কিন্তু তা বলে কল্লোলিনীর ঠোঁট কি মদ-স্পর্শ পাবে না! তা হতে দিলেন না হিকির এক বন্ধু। ডেনমার্ক থেকে এক জাহাজ ক্ল্যারেট আনালেন। হিকি নিজেই কিনলেন দু’পেটি! ইংলিশ ক্ল্যারেটের কয়েক বোতল তো আগেভাগেই মজুত। ভাবলেন, বন্ধুদের সঙ্গে সেই ক্ল্যারেটের স্বাদ একটু ভাগ করে নেওয়া যাক!
খানিক বাদেই বন্ধুদের হুল্লোড় শুরু। বনেদি মাতাল হিকির সন্দেহ হল। ঠিকই ধরেছেন, খানসামা ভুল করে ড্যানিশ ক্ল্যারেট দিয়েছেন। কিন্তু কী বা এসে যায়— বন্ধুরা এতেই বেজায় খুশি। সেই হিকি সাহেব এক বার কলেরায় পড়লেন। ডাক্তারের পরামর্শ, ‘ক্ল্যারেট খান’! হিকি সাহেব নাকি ওই ক্ল্যারেট পান করে সেরে উঠেছিলেন!
ট্যাভার্নের রমরমা কেমন, তা বুঝতে জে ট্রেশাম সাহেবের শরণাপন্ন হওয়া গেল। এই ভদ্রলোক ১৭৫৮ সালে মেরেডিথ লেনের ঘুপচি গলির মধ্যে মাত্র ফুটখানেক চওড়া ঘরে ‘ট্রেশামস ট্যাভার্ন’ খুললেন। সেখানে মদিরার গন্ধকে ছাপিয়ে যায় নর্দমার দুর্গন্ধ। কিন্তু সাহেব মাতালদের কল্যাণে বছরখানেকের মধ্যেই লাল হয়ে ট্রেশামের সরাইখানার পুনর্বাসন হল কাথাইটোলায়, অর্থাৎ বেন্টিংক স্ট্রিটে। ট্রেশামের ভাগ্য ফেরারই কথা। আর নববর্ষের দিন হলে কথাই নেই। আনন্দে সাহেবরা ২৪ বার বা তারও বেশি স্বাস্থ্য পান করতেন! তাতে বল নাচ, তাস, বিলিয়ার্ডসের সঙ্গত।
শুধু সাহেব না, বাঙালিও এই মদ-ব্যবসায় নামল। আদি পর্বে, গোবিন্দ শুঁড়ির পাঞ্চ-হাউসের কথা জানা যায়। কয়েক দশক বাদে ধর্মতলা, চিনাবাজার প্রভৃতি এলাকায় বাঙালি ব্যবসা ফেঁদে বসল। এঁদের মধ্যে নামকরা শ্রীকৃষ্ণ দত্তের পাঞ্চ হাউস। এখানকার সেরা আকর্ষণ— উৎকৃষ্ট ‘পচাই’। সেখানে ঢু মেরে দেখা গেল, ফরাসি, পর্তুগিজ, ইংরেজ সাহেবদের পাশাপাশি ওডিয়া, বিহারি, বাঙালি— সব লোকজনের আনাগোনা। তবে এখানে অর্ডার দেওয়া-নেওয়া, সবটাই সাংকেতিক ভাষায়। কারণ, ভাষাগত সমস্যা। তবে সে সমস্যা খুব একটা অসুবিধা তৈরি করল না। একটা ছোট্ট হিসেব, ১৭৬৬ সালের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জানাল, কর্মচারীদের ১০৮ পাইপ ম্যাডিরা বিলি করা হয়েছে। এক পাইপ মানে ১০৫ গ্যালন!
মদ্যাভ্যাস তো হল, কিন্তু অন্যতম অনুষঙ্গ, বরফ আর সোডা-ওয়াটারের কী হবে! সাহেবি বরফের জন্য অপেক্ষা উনিশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত। তার আগেই অবশ্য এ দেশের গরম আবহাওয়াতে ওয়াইন ঠান্ডা করার জন্য তৈরি হল ‘আবদার’ নামে একটি বিশেষ পেশার। এঁদের কাজ, বিশেষ উপায়ে ওয়াইন ঠান্ডা করে সাহেবি জিহ্বার উপযুক্ত করে তোলা।
তবে ছবিটা দ্রুত বদলাল আমেরিকার বিখ্যাত ব্যবসায়ী ফ্রেডেরিক টিউডরের সৌজন্যে। তিনি ঠিক করলেন, ভারতবর্ষের বাজার ধরতে হবে। নিলেন এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা। পরিকল্পনামাফিক ১৮৩৩ সালে টিউডর কোম্পানির পাঠানো বরফ বোঝাই একটি জাহাজ চার মাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছল। তা নিয়ে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হল সাহেব মহলে। এই সাফল্যে টিউডর কোম্পানির এজেন্ট মিস্টার রজার্সকে সোনার মেডেল দিয়ে অভিনন্দন জানালেন স্বয়ং লর্ড বেন্টিংক। উনিশ শতকের সাতের দশকে অবশ্য কলকাতাতেই কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটের ধারে তৈরি হল বরফ কল। এর দিন কয়েক আগেই চলে এসেছে সোডা-ওয়াটার। আর এই দুইয়ের অনুষঙ্গে জায়গা হারাল ওয়াইন। এল বিয়ার, এবং বেশ কিছু দিন পরে হুইস্কি।
রবীন্দ্রনাথের ‘প্রজাপতির নির্বন্ধ’-তে ‘পুরা নব্য’ অক্ষয়কুমারও যাত্রার সুরে ‘একটি ছটাক সোডার জলে’ ‘তিন পোয়া হুইস্কি’র বন্দনা করতে শুরু করলেন। আলালও নীলকর সাহেবদের দাঙ্গা করে ‘বিলাতি পানি ফটাস করিয়া’ ব্র্যান্ডি খাওয়ার ছবি আঁকলেন। যদিও হুইস্কি সম্পর্কে সাহেবি আমলের একটা বড় অংশে নাক-সিঁটকানো ভাব। কারণ, ও যে ‘ঘোড়ার ওষুধ’!
শুধু মদ্যাভ্যাস নয়, বদলাতে থাকল মদ খাওয়ার স্থানগুলিও। উনিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে পুরনো ট্যাভার্নকে পাশে রেখে ওয়াটারলু স্ট্রিট, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান স্ট্রিট বা রানি মুদি গলি, বেন্টিংক স্ট্রিট, ধর্মতলা প্রভৃতি জায়গায় হোটেলের রমরমা শুরু হল। এই যুগের কলকাতার হোটেলগুলির মধ্যে খুবই নামকরা স্পেন্সেস। সেই হোটেলে প্রায়ই আসতেন এক বিখ্যাত বাঙালি। বিয়ারে বরফ মিশিয়ে পান করতেন তিনি— মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
হোটেলের রমরমা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুয়েজ খাল পেরিয়ে আবির্ভাব হল এক দল তরুণীর— ‘বার-মেড’। অতীতের ড্যানিঙ্গোর স্মৃতিতে মোচড় দিয়ে ছোকরা সাহেবদের হৃদয়ে ফের তুফান! এক জন পরমা সুন্দরী বার-মেড একটি সন্ধ্যায় সাতটি বিয়ের প্রস্তাব পেলেন!
এর উলটো ছবিও আছে। এক ছোকরা সাহেব অনেক ক্ষণ ধরে তরুণী বার-মেডকে উত্যক্ত করছেন। প্রচণ্ড বিরক্ত সেই তরুণী এক হাত কাউন্টারের টেবিলে রেখে সটান দিলেন এক ভল্ট। আর এক হাতের সুদক্ষ চালনায় সাহেবের লাল গালে লেপটে দিলেন পাঁচ আঙুলের ছাপ।
বার-মেডদের ‘জনপ্রিয়তা’ ক্রমে এমন জায়গায় পৌঁছল যে বিলেত থেকে নতুন কেউ এলে সে খবর চাপা দিতে কালঘাম ছুটত হোটেল-কর্মীদের।
এই শতাব্দীতেই ডালহৌসি চত্বর, ট্যাঙ্ক স্কোয়ারে গজিয়ে উঠল ‘অন শপ’। বাঙালির সৌভাগ্য! সময়ের স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ‘ছোটা ব্রিস্টল’ (‘শ ব্রাদার্স’) নামের পানশালাটি। ১৮৭২ থেকে এর পথ-চলা শুরু।
সাহেবি মদ্যপানের সঙ্গে প্রায় দেড়শো বছর ধরে একটা না ছুঁই-ছুঁই ভাব ছিল বাঙালি ভদ্রলোকের। কিন্তু উনিশ শতকের সিংহদুয়ার সবাইকে কাছে টেনে নিল। তৈরি হল দিনভর ‘হ্যাং’-এ থাকা ‘বাবু’ সম্প্রদায়ের। দু’পাত্তর পেটে পড়লেই এই বাবুদের মোক্ষ, ‘জীবনের কলোরব’।
দৃশ্য এক: ষষ্ঠীর রাত। প্রতিমার সঙ্গে মাটির সিংহ দেখে ভারী রাগ হল বাবুর। বাবু ভাবলেন, তিনিই আসল সিংহ। ব্যস। মাটির সিংহের জায়গায় বাবু নিজেই সিংহ হয়ে বসলেন।
দৃশ্য দুই: এক বার দশমীর দিন। গঙ্গায় ঠাকুর বিসর্জন হচ্ছে। এক ‘বুনিয়াদী মাতাল’ নৌকায় দাঁড়িয়েই হঠাৎ কান্না জুড়লেন। বললেন, ‘‘আরে! মা চলিলেন— মার সঙ্গে কেহ যাবে না, আরে বেটা ঢাকি, তুই যা।’’ — বলেই ঢাকিকে এক ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দিলেন।
দৃশ্য তিন: এক মদ্যপ বাবু খেতে বসেছেন। পাশে জল নেই। জলের ঘটির জায়গায় রয়েছে একটি বিড়াল। তাকেই জল ভেবে খেতে গেলেন। বিড়াল বাবাজিও মিউমিউ করে দিলেন আঁচড়।
এই ‘বাবু’দের এক জায়গাতেই মিল— তাঁরা মাতাল! সেই পরিচয়ে স্বর্গের হাতছানিও এঁরা উপেক্ষা করতে পারেন। কেমন তা? এক গণিকা বাবুকে বললেন, যাঁরা মদ স্পর্শ করেছেন, তাঁরা সকলেই ‘নরকে গ্যাচেন।’ শুনে বাবুর চটজলদি জবাব, ‘‘আমি একাকি স্বর্গে গিয়ে কি করবো?’’
বাবুরা ছাড়াও আরও এক দল বাঙালি ছিলেন এই শতকে। শাস্ত্র ও লোকাচার নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছে। মধ্যমণি বাঙালির এক শ্রেষ্ঠ পুরুষ। সামান্য মদ্যপান তাঁরও অভ্যাস। এক শিষ্য উৎসাহ ভরে বাড়তি এক গেলাস এগিয়ে দিয়েছেন। সেই মানুষটি রাগ করে ছ’মাস শিষ্যের মুখই দেখলেন না! তাঁর নাম রাজা রামমোহন রায়। আর এক জন হলেন বিখ্যাত ইয়ং বেঙ্গলি রাজনারায়ণ বসু। পটলডাঙায় থাকেন তখন। গোলদিঘিতে প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে বসে তাঁকে ‘জলস্পর্শশূন্য ব্র্যান্ডি’ পান করতে দেখা যায়। পরে অবশ্য মদ্যপানে তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মাল।
আবার এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা মদ্যপানবিরোধী আন্দোলন করেন, ব্যঙ্গ করেন মদ্যপায়ীদের। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তাঁরাও ঘোরতর মদ্যপ। তেমনই এক জন, ঈশ্বর গুপ্ত। মদ্যপায়ী ‘ইয়ং বেঙ্গলি’দের লক্ষ করে বিস্তর ছড়া কাটেন। কিন্তু নিজে সুরা খেয়ে ‘ধরা দেখি সরা’ করে বেড়ান।
সব বাবুদের ফের ধরার মাটিতে টেনে নামানোর দাওয়াই, তা-ও আছে এই কলকাতায়। তাই তেঁতুলগোলা, কাঁঠাল পাতার রস আর গোলাপজল রাখার নিদান— সবই আছে। এ সব দেখেই কি না কে জানে, লর্ড ক্লাইভ বলেছিলেন, ‘‘পৃথিবীর সব থেকে পাপপূর্ণ জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম এই কল্‌কেতা।’’

https://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/history-of-alcohol-business-in-kolkata-1.739658?ref=archive-new-stry

Sunday, 24 June 2018

বুকের কাছে বাজল যে বীণ (On Krishna Chattopadhyay)

বুকের কাছে বাজল যে বীণ

তিনি চলে গেছেন নিঃশব্দে। মৃত্যুর অনেক আগেই চলে গিয়েছিল কণ্ঠ। কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো কৃতীরা। এই কঠিন ব্যক্তিত্ব ছাড় দেয়নি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কেও। গুরুকে নিয়ে এমনই বহু অকথিত কাহিনি শোনালেন তাঁর ছাত্রী নূপুরছন্দা ঘোষ।

 
Krishna Chatterjee

কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়।

এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। টালিগঞ্জের শুটিং- ফেরত উত্তমকুমার চলে এলেন প্রণব রায়ের বাড়ি। ‘আমি বনফুল গো’ রচনা করে প্রণব রায় তত দিনে বেশ নাম করেছেন। উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের, শ্রদ্ধার, আড্ডার। রোজই এক পেয়ালা চা নিয়ে গল্প করতে বসতেন মহানায়ক। সে দিনও তার অন্যথা হয়নি। চায়ে চুমুক দিয়েছেন, অমনি ভেসে এল এক সুরের যন্ত্রণা। ‘পাগলা, মনটারে তুই বাঁধ’ গানটা শুনে থমকে গেলেন তিনি। এমনই সুরের মায়া যে, সেই বেদনাঘন গান একটানা সারা রাত ধরে উত্তম কুমার বার বার কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের রেকর্ড থেকে শুনে যাচ্ছিলেন। এমনই সেই আচ্ছন্নতা যে, কেউ তাঁকে এক বারের জন্যেও ডাকতে সাহস করেনি। অন্ধকার বর্ষারাতে রেকর্ডটি কেবল বেজেই চলেছিল ... ‘কতই পেলি ভালবাসা/ তবু না তোর মেটে আশা/এবার তুই একলা ঘরে/নয়ন ভরে কাঁদ/পাগলা মনটা রে তুই বাঁধ।’ যেন গানই তাঁকে জীবনখাতার পাতা খুলে রাতভর প্রশ্ন করে চলেছে।
সলিল চৌধুরী আর রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়।
কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আমার বাবার কাকা বিমান ঘোষের সূত্রে—যাঁকে মজা করে আমরা ‘বৃষ্টিদাদু’ বলতাম। কর্মসূত্রে এইচএমভিতে থাকার জন্য প্রচুর গুণী মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি। আমরা তার কিছু কিছু আঁচ পেয়েছি। বৃষ্টিদাদুই আমাকে কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গান শেখানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। মনে আছে, অত অল্প বয়সেই তাঁকে দেখে চোখ সরাতে পারছিলাম না। যেমন ছিপছিপে চেহারা, তেমনই সুন্দর সাজ। দিদি সব সময়ই কানে বড় হিরের দুল আর হাতে হিরের আংটি পরে থাকতেন। গানের অনুষ্ঠান মানেই চওড়া পাড়ের গাদোয়াল বা দামি সিল্ক। বাড়িতে থাকলে ‘ভোজরাজ’-এর বাহারি প্রিন্টের শাড়ি। এর অন্যথা খুব একটা দেখিনি। হুট করে চলে গিয়েও দেখেছি, বাড়িতে লম্বা কাফতান পরে আছেন। আমাকে দেখেই পোশাক পাল্টে শাড়ি পরে সুন্দর সেজে চলে এলেন। দিদির গানের মতোই সাজ একটা বিশেষ ব্যাপার ছিল। খুব ট্র্যাডিশনাল শাড়ি পছন্দ করতেন। করবেন না-ই বা কেন! দিদির বিয়ে হয়েছিল রয় অ্যান্ড রয় কোম্পানির বাড়িতে। মিহির রায় ছিলেন স্বামী। বরাবরই দেখেছি দিদিকে রুপোর গ্লাসে জল খেতে। সব কিছুর মধ্যেই ছিল একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া।
দিদি গান শিখেছেন তাঁর বাবা হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। হরেন্দ্রনাথ স্বয়ং অতুলপ্রসাদ সেনের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। গল্পের ছলে দিদি একবার বলেছিলেন, কলকাতায় এক সঙ্গীতের আসরে হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় কৃষ্ণনগর থেকে এসেছেন গান গাইতে। সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দীনু ঠাকুর প্রমুখ। হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের গান শুনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বাঃ তুমি তো ভারী সুন্দর গান গাও!’ কিন্তু শুধু অতুলের গান গাইলে কেন? আমার গান গাইলে না কেন?’ অতুলপ্রসাদ লজ্জায় বিব্রত। হরেন্দ্রনাথ কিন্তু একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে ঝটপট উত্তর দিলেন, ‘আপনার গান তো আমায় কেউ শেখায়নি, তাই আমি জানি না।’ কবিগুরু তখন উচ্ছ্বসিত। বললেন, ‘শিখবে তুমি আমার গান? দীনু, আজ থেকে তুমি ওর দায়িত্ব নাও গান শেখাবার।’ যেমন কথা তেমন কাজ। দীনু ঠাকুরের কাছে গান শিখে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ডও করেছিলেন হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। তবে হরেন্দ্রনাথ ছাড়াও দক্ষিণী-তে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিলেন দিদি। যদিও দিদির শিক্ষায় অতুলপ্রসাদ সেনের গায়কির ছাপ সুস্পষ্ট। আর সেই কারণেই ঘরানার ছাপটা দিদির গলায়ও এসেছিল। এ প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প আছে।
পাহাড়ী সান্যালকে ঘিরে বসেছে এক ঘরোয়া আসর। সেখানে নানা গুণিজনের মধ্যে আছেন কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়। পাহাড়ী সান্যালও অতুলপ্রসাদের ছাত্র। খুব ভালবাসতেন অতুলপ্রসাদের গান গাইতে। শুধু যে গানই গাইতেন এমনটা নয়। গানের পিছনের ইতিহাসগুলোও তিনি আড্ডার ছলে সমানে বলে যেতেন। এ রকমই এক আসরে পাহাড়ী সান্যাল গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলেন ‘ভবানী দয়ানী।’ ভৈরবী রাগে এই গানের চলনে তিনি ঘোরাফেরা করছেন। এমন সময় সেই আসরে উপস্থিত কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়। ওই গানের আদলেই অতুলপ্রসাদ-সৃষ্ট গান ‘সে ডাকে আমারে বিনা সে সখারে’ গেয়ে উঠলেন। পাহাড়ী সান্যাল তো মুগ্ধ। তাঁর কণ্ঠে গানটি শুনে থেকে থেকেই ‘আহা আহা’ করতে লাগলেন।
পিতা হরেন্দ্রনাথের উৎসাহেই ১৯৫৭ সালে গ্রামোফোন ডিস্কে প্রকাশিত হয় কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম রেকর্ড। যার এক পিঠে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সে কেন দেখা দিল রে’, অন্য পিঠে ‘মলয় আসিয়া কয়ে গেছে কানে’। দ্বিজেন্দ্রগীতির শিক্ষা কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলালের পুত্র তথা তাঁর পিতৃবন্ধু দিলীপকুমার রায়ের কাছে। দ্বিজেন্দ্রলালের গানে পরিশীলিত মাত্রা ও গাম্ভীর্য বিশ শতকের যে দু’জন শিল্পীর গায়নে ধরা পড়েছিল, তাঁরা ছিলেন মঞ্জু গুপ্ত ও কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়। কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে দ্বিজেন্দ্রলালের খেয়ালাঙ্গ ও কীর্তনাঙ্গ দু’ধরনের গানই নবতর সৌন্দর্যে সঞ্জীবিত হয়েছিল। দিদি সব সময় বলতেন, স্বরলিপির চেয়ে তিনি গুরুমুখী বিদ্যার উপরে বেশি নির্ভর করতেন। গান নিয়ে বিশেষ বাড়াবাড়ি করা বা গানের প্রচার এ সবের তীব্র বিরোধী ছিলেন দিদি। সলিল চৌধুরীর অনুরোধে একটি আধুনিক গানের রেকর্ড করলেও অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত বা দ্বিজেন্দ্রলালের বাইরে অন্য গান গাইতে একেবারেই চাইতেন না তিনি। এই প্রসঙ্গেও একটা ঘটনা বলি। যা আমি দিদির কাছ থেকে শুনেছি।
কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের নীরব ভক্ত ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ও রকম মিহি সূক্ষ্ম কাজের গলা হেমন্তবাবু ওঁর ছবিতে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। শুনে, দিদি যদিও সোজাসুজি হেমন্তবাবুকে বললেন, ‘আপনি যদি ছবিতে অতুলপ্রসাদের গান ব্যবহার করেন, তবেই আমি গাইব, নয়তো নয়।’ নিজেকে প্রকাশ করার কোনও ইচ্ছাই দিদির মধ্যে দেখিনি। সব রকম গান শুনতে ভালবাসতেন। কিন্তু নিজের শিক্ষার বাইরে গিয়ে হঠাৎ করে নতুন গান তুলে দিলেন, এমনটা কখনও করেননি। আমাদের গান শেখানোর সময় বলতেন, সব ধারার গান গাইলে নিজস্ব গায়কির মৌলিকত্ব নষ্ট হয়ে যাবে। সে সময় বাড়িতে বাড়িতে অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলালের গানের রেকর্ড মানেই সুন্দর একটি মুখ। বাঁ দিকে ঠোটের উপর কালো একটি আঁচিল। নামটা না দেখেই মানুষ বলতে পারত, এটা কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের গান। ধমকে বকে রেগে আমাদের গান শেখাতেন। মনে আছে, একবার ‘পাগলা মনটারে তুই’ শিখতে চাওয়ার আবদার করেছিলাম। ধমক দিয়ে বললেন, ‘আগে জীবনে ঝড় ঝাপটা আসুক, দগ্ধ হও। তবেই ওই গান গাইতে পারবে।’ একটা গান অন্তত একশোবার গাওয়াতেন। আর থেকে থেকেই বলতেন, ‘নড়বড়ে অবস্থায় বাইরে গাইতে যাবে না। আগে নিজেকে তৈরি করো।’ 
নিজগুণে বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন দিদি। আমাদের গানের ক্লাসের পর মার্লিন পার্কের বাড়ির বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে টুকটাক গল্প করতেন। তখনই শুনেছি সেই সব সোনা ঝরা দিনের কাহিনি।
বিমান ঘোষ তখন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টরের পদ ছেড়ে এইচএমভি-তে যোগ দিয়েছেন। অভিন্নহৃদয় বন্ধু রবিশঙ্করজি তখন মাঝে মাঝেই কলকাতায় আসছেন। আর কলকাতায় এলেই বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে ‘প্রেসিডেন্সি কোর্ট’-এ বিমান ঘোষের বাড়িতে তিনি আসবেনই। তেমনই এক শীতের সকাল। কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ও এসেছেন মার্লিন পার্কের বাড়ি থেকে বিমান ঘোষের জন্যে রান্না করে নিয়ে। বিমান ঘোষ খুবই স্নেহ করতেন কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়কে। ওঁর উদ্যোগেই এইচএমভি থেকে অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানের রেকর্ডিং করছেন দিদি। গান নিয়ে তিনজনের আড্ডা শুরু হতেই কোন এক খেয়ালে হাতের কাছে রাখা সেতারটি তুলে ভৈরবী সুর ভাঁজতে থাকলেন পণ্ডিতজি। অমন সেতারের ডাকে কি আর নিজেকে বন্দি রাখা যায়! দিদিও চোখ বুজে হাঁটলেন সকালবেলার ভৈরবীতে— ‘কী আর চাইব বলো।’ সুরের মোড় ঘোরালেন পণ্ডিতজি, পিলুর আমেজ আনতেই দিদি ধরলেন, ‘শ্রাবণ ঝুলাতে বাদল রাতে।’ সেতার খাম্বাজে প্রশ্ন করলে কণ্ঠে উত্তর এসেছে ‘কে যেন আমারে বারে বারে চায়।’ সুরলোকের এই রূপকথায় সে দিনের সকাল রাগ-রাগিণীর মজলিসে ভেঙেচুরে গিয়েছিল।
আমার গানপাগল দিদি শুধুই যে গান গেয়েছেন, তা-ই নয়। বড় পরিবারের দায়িত্বও সামলেছেন অনায়াসে। দুই ছেলে মানিক আর তানিককে বড় করা, অসুস্থ শাশুড়ির সেবা—কোথাও কোনও খামতি ছিল না। একবার অনুষ্ঠান করতে যাবেন তবলিয়া প্রভাতবাবু, এসরাজ বাদক শঙ্করনাথ সাহা, মন্দিরাবাদক পঞ্চাননবাবু এসে গেছেন। বেরোতে যাবেন, ঠিক তখনই ছোট ছেলে তানিক পড়ে গিয়ে মাথা ফাটাল। ও রকম সাজগোজ করা অবস্থাতেই উনি গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ছেলেকে স্টিচ করিয়ে বাড়িতে রেখে সোজা গেলেন অনুষ্ঠানে। সব সময়ই কথা দিয়ে কথা রেখেছেন।   জীবনের কাছে কোনও অভিযোগও করেননি কখনও। যেটুকু অভিমান ক্ষোভ একাকিত্ব— সবটাই গানের মধ্যে বলেছেন।
শান্তিনিকেতনে যেতে খুব ভালবাসতেন দিদি। তার সবচেয়ে বড় কারণ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিলেন মোহরদি’র কাছে। আবার অন্য দিকে মোহরদি অতুলপ্রসাদের গান শিখেছেন হরেন্দ্রনাথের কাছে। একবার মাঘী পূর্ণিমায় দিদি শান্তিনিকেতনে। চাঁদভাঙা আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। দু’জনে গল্প করতে করতে মোহরদি গেয়ে উঠলেন, ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে। উছলে পড়ে আলো’। চরাচর চাঁদে ভাসা।
মোহরদির গানের রেশ নিয়ে দিদি ধরলেন, ‘চাঁদনি রাতে কে গো আসিলে।’ নিশীথ রাতের হাওয়ায় তখন আর কথা নেই। কেবলই সুরে চলা। মোহরদি আবার ‘ওগো নদী আপন বেগে পাগলপারা’ আর দিদি ‘কে গো তুমি নদীকূলে বসি একেলা।’ বারবার যেন ভিতর তোলপাড় করে দেওয়া একাকিত্বের গান! গানের জোয়ারে ভাসছে দুই পূর্ণিমা-কণ্ঠ। মোহরদি ‘হৃদয়ের একূল ওকূল’, দিদি দ্বিজেন্দ্রলালের কথায় উত্তর দিচ্ছেন ‘হৃদয় আমার গোপন করে।’ এই সুরের কথোপকথনে নাকি রাত ছেড়ে চলে গিয়েছিল ওঁদের। কিন্তু দুই হৃদয়ের প্রাণের বন্ধ কথা গান দিয়ে খুলে দিয়েছিলেন ওঁরা।
আসলে কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের নামের মধ্যেই ম্যাজিক ছিল। আগে বাংলা অ্যাকাডেমিতে এখনকার মতো গানের অনুষ্ঠান হত না। আমরা ছাত্রছাত্রীরা মিলে দিদিকে সংবর্ধনা জানাব, অনেক সাহস নিয়ে সে কথা বললাম অ্যাকাডেমির দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্নদাশঙ্কর রায়কে। কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনেই উনি রাজি হয়ে গেলেন।
আজও মনে পড়ে মার্লিন পার্কের সেই প্রাসাদের মতো বাড়ির কথা। সামনে পিছনে বিরাট বাগান। বারান্দায় বড় বড় আলো। সেই আলোর তলায় জড়োয়ার দুল, ঢাকাই শাড়ি, কপালে টিপ। আরাম কেদারায় রাজরানির মতো বসে আছেন তিনি। গাইছেন ‘বধূয়া নিদ্ নাহি আঁখি পাতে।’ মেঘ ঢেকে দিচ্ছে সেই চাতকিনীকে...
ভিড়ের কলকাতায় আজও সেই দৃশ্য আমায় পথ ভোলায়, সারা রাত কাঁদিয়ে ফেরে। আজ মনে হয়, উনি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্মৃতির নীচে চাপা পড়ে গেল গান।
‘আমিও একাকী তুমিও একাকী আজি এ বাদল রাতে...’

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/some-unknown-facts-about-renowned-singer-krishna-chattopadhyay-1.649390?ref=strydtl-rltd-patrika

স্বপ্নেও বিপ্লবেরই রং দেখতেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়

স্বপ্নেও বিপ্লবেরই রং দেখতেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়

বাংলা গানের ধারা বদলে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁরা। মহীনের ঘোড়াগুলি কেবল একটি দল ছিল না, ছিল বিপ্লব। জীবনে, কাজে, এমনকী স্বপ্নেও সেই বিপ্লবেরই রং দেখতেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। লিখছেন স্যমন্তক ঘোষ

 
Gautam Chattopadhyay
আস্তাবল
‘আস্তাবল’। সদ্য রং হওয়া বাড়ির পাঁচিলে কোনও এক ‘সুহৃদ’ আলকাতরা দিয়ে লিখে রেখে গিয়েছেন কথাটা। উপায়ই বা কী! রাতবিরেতে কত আর ক্যাকফোনির অত্যাচার সহ্য করা যায়! অগত্যা...
সত্তর দশকের গোড়ার দিক। গিটার, ড্রামসের সঙ্গে তখনও বিশেষ পরিচয় হয়নি মধ্যবিত্ত বাঙালির। গান বলতে তখন হেমন্ত-মান্না। আর সংস্কৃতির নাম রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা। এমনই এক সাংস্কৃতিক আবহে প্রতি রাতে ড্রামস-গিটারের দাপাদাপি শুরু হয়েছিল নাকতলা অঞ্চলের এক বাড়িতে। তাও তথাকথিত ভদ্দরলোকের সময়ে নয়। মধ্যরাতে। এক দিন নয়, দিনের পর দিন। ওটাই নাকি সঙ্গীতচর্চার আদর্শ সময়। ফলে ‘বাধ্য’ হয়েই প্রতিবেশী সেই বাড়ির পাঁচিলে লিখে রেখে গিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’। অন্তত এটুকু দেখে যাতে স‌ংবিৎ ফেরে উঠতি রকস্টারদের। মধ্যরাতের দাপাদাপি বন্ধ হয়।
বন্ধ তো হলই না, বরং বাড়ল চর্চা। মণিদা ওই ‘আস্তাবল’ লেখাটা কোনও দিন মুছতে দেননি। ব্যাপারটাকে ‘কমপ্লিমেন্ট’ হিসেবেই নিয়েছিলেন। দলের বাকি সদস্যদেরও নাকি বলেছিলেন, বিষয়টিকে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে। এর কিছু দিন পরে ওই আস্তাবল থেকেই জন্ম হবে একটা মস্ত বিপ্লবের। বাংলা আধুনিক গানের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার স্বপ্নের বীজ রোপণ হবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র হাত ধরে। আর গৌতম চট্টোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন আস্ত একটা প্রজন্মের ‘মণিদা’। নতুন বাংলা গানের নতুন ‘আইকন’।

তবলিয়া
রক্তে সঙ্গীত নিয়েই বড় হয়েছেন গৌতম। তাঁর বাবা পেশায় বিজ্ঞানী হলেও বরাবরই ছিলেন সঙ্গীতরসিক। বেহালার বাড়িতে চিরকালই গানবাজনার চর্চা ছিল। শোনা হত নানা ধরনের গান। যার বেশির ভাগটাই ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। ছিল নানাবিধ যন্ত্রও। সেতার, অর্গান, এস্রাজ, হারমোনিয়াম, ব্যাঞ্জো, ভায়োলিন, তবলা। গৌতমরা ছিলেন পাঁচ ভাই। ছোটবেলা থেকে তাঁরাও বিভিন্ন যন্ত্রের তালিম নিতেন। গৌতম বাজাতেন তবলা। তবে তাঁর ভাই এবং মহীনের ঘোড়ার অন্যতম অশ্ব প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘মণিদা সবই বাজাতে পারত। যে কোনও ইনস্ট্রুমেন্টই খুব সহজে বাজিয়ে ফেলত। তালিম ছাড়াই। নিজে নিজেই শিখে ফেলত বাজানোর আদবকায়দা।’’ তবে তবলায় বিশেষ ভাবে হাত পাকিয়েছিলেন গৌতম। পাড়ার অনুষ্ঠান মানেই তবলায় সঙ্গত করবেন মণিদা। কিন্তু খুব বেশি দিন ‘তবলচি’ পরিচয় পছন্দ হল না স্বভাববিদ্রোহী গৌতমের। ভাই এবং বন্ধুদের কাছে বেশ ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছিলেন, ‘সঙ্গত’ শব্দটায় তাঁর আপত্তি আছে। কেমন যেন ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজ়েন’-এর মতো শোনায়। সঙ্গীতে প্রত্যেকের গুরুত্ব সমান। গায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বের দাবি রাখেন যন্ত্রীরা। অথচ বাস্তবে সেই সম্মানটা তাঁদের দেওয়া হয় না। ব্যান্ড তৈরির ভাবনাও সম্ভবত সেই প্রথম মাথায় ঢুকে যায় গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের। ভাই এবং বন্ধুদের নিয়ে গৌতম তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায়। দেখছেন, বেদের খেলা। তুলে নিচ্ছেন তাঁদের খেলা দেখানোর গান। বৃহন্নলাদের পাড়ায় গিয়ে শুনছেন তাঁদের গান। তুলে নিচ্ছেন গলায়। ট্রেনের হকারদের, ভিখারিদের গাওয়া গানও তখন আকর্ষণ করছে তাঁদের। শুনছেন, বাউল-ফকিরদের গান। এর বহু বছর পর ওই বাউলসঙ্গ অবশ্য জীবনের অন্যতম চর্যা হয়ে উঠবে গৌতমের। শুধু সঙ্গ করা নয়, তাঁদের নিয়ে নানাবিধ কাজও করবেন তিনি।

প্রেসিডেন্সি এবং স্প্যানিশ
ইতিমধ্যেই প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজ়িওলজি নিয়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছেন গৌতম। একই সঙ্গে পড়তে শুরু করেছেন সমাজ বদলের দেওয়াল লিখন। প্রেসিডেন্সিতে পড়তে পড়তেই প্রথম স্প্যানিশ গিটার হাতে এল মণিদার। সেই গিটারের পিছনেও অবশ্য গল্প রয়েছে ভরপুর। তাঁদের বাড়িতে ছিল একটি পুরনো হাওয়াইয়ান ক্লাসিক্যাল গিটার। স্থানীয় দোকানে নিয়ে গিয়ে সেই গিটারটিকেই স্প্যানিশ গিটারে রূপান্তরিত করা হয়। কলেজে পড়তে পড়তে এক দিকে গিটারে হাত পাকাচ্ছেন গৌতম, অন্য দিকে নকশাল রাজনীতিতে হাত সেঁকছেন। আরও একটা কাজ করছেন একইসঙ্গে। শুনছেন সমকালীন বিশ্বসঙ্গীত। রকসঙ্গীতের কান তৈরি হচ্ছে। প্রাক ইন্টারনেট যুগের সেই কলকাতায় তখন মধ্যবিত্ত বাড়ির কোনও ছাত্রের পক্ষে ‘বিটলস’ শোনা মোটেই সহজ কথা ছিল না। সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন ব্যান্ডের অ্যালবাম জোগাড় করাটা রীতিমতো একটা যুদ্ধ ছিল। গৌতম কেবল সে সব গান শুনছেন না, আত্মস্থও করছেন। শোনাচ্ছেন, ভাই এবং বন্ধুদের।
১৯৮২ সালে গৌতম
আর্জ
এ ভাবে চলতে চলতেই গৌতমরা তৈরি করে ফেলছেন ‘আর্জ’ নামের একটি ব্যান্ড। মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বন্ধুদের নিয়ে। ইংরিজি গানের সেই ব্যান্ড কিছু দিনের মধ্যেই বেশ নাম করল। কলেজে তো বটেই, কলেজের বাইরেও। গৌতমরা তখন নিয়মিত পারফর্ম করছেন ট্রিংকাস, মুলারুজ়ের মতো রেস্তরাঁয়। 
মধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবারের ছেলে হোটেলে গান গায়? ষাট-সত্তরের কলকাতায় ব্যাপরটা মোটেই ভাল চোখে দেখা হত না। তার উপর রক গান! গৌতমের চেহারাপত্তরেও তখন রীতিমতো ছাপ ফেলেছে রক আদপ। লম্বা লম্বা চুল, রংচঙে পোশাক, পিঠে গিটার, চোখে নেশা— বাড়িতে একটু সমস্যাই শুরু হল। গৌতমও আর্জ ছাড়লেন। বাড়ির চাপে নয়, মনের খেয়ালে। নকশাল রাজনীতি তত দিনে বদলে দিয়েছে গৌতমের সঙ্গীত দর্শন। রাজনীতির পাঠ গৌতমকে বুঝিয়ে দিয়েছে, রেস্তরাঁর এলিট গ্রাহকদের সামনে ইংরিজি গান গেয়ে বিপ্লব তৈরি হবে না। তার জন্য বাংলায় গান বাঁধতে হবে। বলতে হবে মানুষের কথা। রক্ত-মাংস-ঘামের কথা উঠে আসবে গানের শরীরে।

নকশাল জীবন
বিএসসি শেষ করে গৌতম ঠিক করেছিলেন পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে গিয়ে ছবি তৈরির কলাকৌশল শিখবেন। কিন্তু ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে কলকাতার তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ তখন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার স্বপ্ন দেখছেন। শহর ছেড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিপ্লবের নিশান তৈরি করতে চাইছেন তাঁরা। গৌতমও ব্যতিক্রম নন। নেমে পড়লেন সরাসরি রাজনীতিতে। সারা ক্ষণ সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন রেডবুক। ক্রমশ বাড়ি ফেরা কমতে শুরু করল। ঘুরে বেড়াচ্ছেন গ্রামে গ্রামে। এবং এই পর্যায়েই হাইকম্যান্ডের নির্দেশে যোগ দিচ্ছেন নকশাল কৃষক ফ্রন্টে। এবং আরও অনেকের মতোই চলে যাচ্ছেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। বাড়ি ফেরা একেবারে বন্ধ হল। অনেক পড়ে ভাইদের কাছে গৌতম গল্প করেছিলেন কৃষক ফ্রন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিখেছিলেন ধান বোনা, মারাই করা, চাষবাসের আরও নানাবিধ কাজ। আর তারই সঙ্গে শিখে নিয়েছিলেন কৃষকের গান। নবান্নের গান। এর বহু দিন পর মহীনের গানে ঢুকে পড়বে সেই সব অভিজ্ঞতা। গানের প্রিলিউড-ইন্টারলিউডে শোনা যাবে গরুকে ঘরে ফেরানোর বিশেষ আওয়াজ। যে আওয়াজ মিশে যাবে অ্যাফ্রো-আমেরিকান ব্লুজ়ের আবহে।
‘নাগমতী’ ছবির শুটিংয়ে
গ্রেফতার
আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা অবস্থায় বহু বার বেহালার বাড়িতে পুলিশ এসেছে, গৌতমের খোঁজে। বাড়ির লোকের উপরে চাপ তৈরি করা হয়েছে, খবর দেওয়ার জন্য।
গৌতম ফিরলেন। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। আর সে দিনই ফেরার পথে তাঁকে এবং আরও দুই ‘কমরেড’কে গ্রেফতার করল পুলিশ। শোনা যায়, এক বন্ধুকে তাঁদের সামনেই ভুয়ো এনকাউন্টারে মেরে ফেলা হয়েছিল। জীবনের থ্রেট ছিল গৌতমেরও।
দীর্ঘ দেড় বছর জেলে থাকার পর গৌতম মুক্তি পেয়েছিলেন একটাই শর্তে, পশ্চিমবঙ্গের ধারেকাছে থাকা যাবে না। আশ্চর্যের বিষয় হল, জেলজীবনে অসংখ্য গান লিখলেও, একটিও রাজনৈতিক গান লেখেননি গৌতম। অন্তত প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের সন্ধানে তেমন কোনও গান নেই। যা আছে, তার সবই রোম্যান্টিক। তেমনই একটি গান ‘নীল সাগরের অতল গভীরে’। অ্যালবামে না থাকলেও, বহু পরে দু’-একটি অনুষ্ঠানে গানটি গাওয়া হয়েছে।

মেডিক্যাল রিপ্রেজ়েন্টেটিভ
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মূলস্রোতের রাজনীতির সঙ্গে খানিকটা নিরাপদ দূরত্ব তৈরি হয় গৌতমের। অন্তত প্রকাশ্যে। কাঁধে স্প্যানিশ ঝুলিয়ে চলে গেলেন ভোপাল। পেয়েও গেলেন একটা মেডিক্যাল রিপ্রেজ়েন্টেটিভের কাজ। এর কিছু দিন পরে গেলেন জব্বলপুর। চাকরি নেহাতই গৌণ। আড্ডাই মুখ্য। চুটিয়ে গান লিখছেন। গাইছেনও। বলা যায় মহীনের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রবাসে বসেই। কিন্তু এই সময়েও বাড়ির সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ রাখতে পারতেন না মণিদা। প্রায় কোনও যোগাযোগ ছিল না ভাই প্রদীপের সঙ্গেও। প্রদীপও তখন নকশাল রাজনীতিতে ডুবে। গৌতম গ্রেফতার হওয়ার কিছু কাল আগে তিনিও গ্রেফতার হয়েছিলেন বিই কলেজ থেকে। শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বামপন্থীদের সঙ্গে অন্যান্য দলের মারপিট তখন নিত্যদিনের ঘটনা। দেড় মাস জেলে থেকে প্রদীপ ছাড়া পেলেও নিয়মিত বেহালা থানায় হাজিরা দিতে যেতে হত। পুলিশের জুলুমের কারণেই দাদা-ভাইয়ের যোগাযোগ সম্ভব ছিল না। ভোপাল থেকে কলকাতায় ফিরে এলেও, পিছুটান থেকে গিয়েছিল গৌতমের। সেই পিছুটানের মোহেই ১৯৮১ সালে তাঁকে ফিরতে হয় মিনতির কাছে। বিয়ে করে কলকাতায় নিয়ে আসার জন্য। ভোপাল-পর্বেই মিনতি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।
বরযাত্রী পৌঁছল স্টেশনে। ভোপালের ট্রেন আসতে তখনও খানিক বাকি। হঠাৎই আবিষ্কার হল, টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। সকলে যখন তা নিয়ে হইচই জুড়ে দিয়েছেন, বেপাত্তা হলেন গৌতম। বেশ খানিক পর কেউ এক জন দেখলেন, স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়ে গল্প জুড়েছেন মণিদা। মিনিট কয়েকের সেই গল্পে স্টেশন মাস্টার কাত। ব্যবস্থা হয়ে গেল টিকিটেরও।
স্বভাব বাউন্ডুলে গৌতম এর এক বছর পরই বাবা হবেন। ছেলের নাম রাখবেন গাবু। বাংলা ব্যান্ডের বর্তমান চিত্রে যে গাবু একটা নাম। স্মৃতিচারণে গাবু বলছেন, ‘‘ড্রামের স্টিক থেকে গিটারের কর্ড, সব কিছুরই হাতেখড়ি বাবার কাছে। ছোটবেলা থেকে বাবার দুটো দিক দেখেছি। এক দিকে বাউন্ডুলেপনা, গান-সিনেমা নিয়ে মজে আছে। আবার অন্য দিকে আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে খেয়াল, আর পাঁচ জন বাবার মতোই। আজ আমি যেটুকু শিখেছি, যতটুকু শিখেছি, তার প্রায় সবটাই বাবার জন্য।’’
গাবুর জন্মের প্রায় সাত বছর পর জন্ম হবে গৌতমের মেয়ের। চিকিতার। গাবুর ভাল নাম যেমন প্রায় কেউ জানেন না। চিকিতাও তেমন বাবার দেওয়া ডাকনামেই পরিচিত হয়েছেন পরবর্তী কালে।
রেকর্ডিংয়ে সলিল চৌধুরীর ছেলের সঙ্গে, ১৯৮৭ সালে
বেকার বিল্ডিংয়ের গান
প্রবাস জীবন পোষাল না মণিদার। চাকরিবাকরি ছেড়ে কলকাতায়। সেটা ’৭৪ সাল। নকশাল রাজনীতিতে ক্রমশ ভাঁটা পড়েছে। কমেছে পুলিশের আনাগোনাও। শুরু হল নতুন উদ্যমে গান বাজনা। বস্তুত, এই সময়ে গৌতমরা বাড়িতে যে কয় ভাই ছিলেন, কেউই সে ভাবে কাজ করছেন না। ফলে গৌতমও সেই সুযোগে বাড়ির নাম রাখলেন ‘বেকার হাউস’। প্রেসিডেন্সির ‘বেকার ল্যাবরেটরি’র অনুকরণে। বেকার হাউস তখন নতুন গানের আখড়া।
শুরু হল রাতদিন গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট। আর তারই মধ্যে পা ভাঙল মণিদার। প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘মণিদার পা ভেঙেছিল বলেই আমাদের ব্যান্ডটা তৈরি হয়েছিল। কারণ ও গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিল। সারা দিন বাড়িতে পাওয়া যেত।’’ শোনা যায়, গৌতমের পায়ের প্লাস্টারে সকলে এসে সই করতেন। ওটাই ছিল ব্যান্ড মেম্বারদের হাজিরার খাতা। এই সময় পর্বেই রঞ্জন ঘোষাল লিখছেন ‘রানওয়ে’। সবাই মিলে তৈরি হচ্ছে ‘কলকাতা’ গানটি। দলে তখন সাত জন। মণিদা, বুলা ওরফে প্রদীপ, ভানু, রঞ্জন, বাপি, এব্রাহাম, বিশু। এ রকমই কোনও এক মহড়ার পর কেউ এসে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’ কথাটা। কেমন হত সেই মহড়া? রঞ্জন ঘোষাল স্মৃতিচারণে বলছেন, ‘‘রাজাদের খিদিরপুরের বাড়িতে মহড়া বসেছে। শুক্কুরবার। পরের দিন স্টার থিয়েটারে শো। যন্ত্রগুলোর সঙ্গে সড়গড় হয়ে নেওয়া জরুরি। পিয়ানো আছে রাজাদের বাড়ি... আমি আর বুলাদা পৌঁছেছি দেরিতে। দেরির কারণ, দু’জনেরই এক। বুলাদার ছিল শর্মিষ্ঠা (অধুনা বুলাদার পত্নী), অপেক্ষায় থিয়েটার রোডের অরবিন্দ ভবনে। আর রিঙ্কুর। মানে সঙ্গীতার (অধুনা আমার দুই সন্তানের জননী)। রাজাদের বাড়িটা বড়। কিন্তু বাইরে থেকে কান পাততে হচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে কণ্ঠে-যন্ত্রে জমকালো মহড়ার বজ্রনির্ঘোষ। আমরাই শুধু নেই। চেলো শুনছি, বিশুর ঢাউস কন্ট্রাবেসের গুরুগম্ভীর আওয়াজ পাচ্ছি। মণিদার ইলেকট্রিক গিটার। বাপি, ভানু আর মণিদার গলা... রাজাদের বাড়ির সদর দরজাটা খোলাই ছিল। বিহারী দরোয়ান বারবার বলছে, চলিয়ে যান না! উপরে উঠিয়ে যান! কিন্তু আমাদের কি প্রাণের ভয় নেই? এমন সময়ে হঠাৎ এক জন ঢাকী একখানা বিশাল ঢাক কাঁধে এসে আমাদেরই জিগ্যেস করে বসল, ব্যানার্জিদের বাড়িটা কোনটা বলতে পারেন? আমি ওকে আর বাক্য সমাপ্ত করতে দিলাম না। ঢাকখানা ওর কাঁধ থেকে খুলে নিজের কাঁধে নিলাম। তার পর ভারিক্কি চালে উপরে উঠে গেলাম। আমাকে ঢাক কাঁধে ঢুকতে দেখে থেমে গেল গান। আমার পিছনে বুলাদা। হাতে বাঁশি। যেন এত ক্ষণ রেওয়াজে মত্ত থাকার জন্যই সময় বেভুল হয়ে গিয়েছে... মণিদার ছুড়ে মারা দেশলাই বাক্সটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। না হলেও ক্ষতি ছিল না। তত ক্ষণে আসল ঢাকীর আপ্যায়নে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।’’ 

মহীনের ঘোড়াগুলি
শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে তখন চুটিয়ে অনুষ্ঠান করছে সাত তরুণ। কিন্তু অনুষ্ঠান করলে তো নাম দিতে হয় নিজেদের! সাত জনের দলের নাম হয়ে গেল ‘সপ্তর্ষি’। যদিও স্টেজে উঠে অনেক সময়েই মণিদা ভুলভাল নাম বলে দিতেন। তেমনই একটি নাম ‘গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়’।
ঠাট্টা-ইয়ার্কি মেরে এ ভাবেই দিব্যি চলছিল গানবাজনা। রঞ্জন ঘোষাল সিরিয়াস করে দিলেন আবহ। জমাটি এক আড্ডার বিকেলে হঠাৎ প্রস্তাব করলেন দলের নতুন নাম— ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। এর পর আর কখনও নাম বদলায়নি দলের। শো খুব বেশি আসত না। তবে সেই আমলেও ঘোড়ার দল সাড়া ফেলে দিয়েছিল রবীন্দ্রসদনে মস্ত একটা শো করে।
তিন ভাগে অনুষ্ঠান। প্রথম ভাগে ছিল অ্যাকোয়াস্টিক ইনস্ট্রুমেন্ট। তার সঙ্গে বাউল-সুফি-ভাটিয়ালির মেডলি। দ্বিতীয় ভাগে ছিল পুরনো বাংলা গান। অখিলবন্ধু ঘোষের গান থেকে শুরু করে শচীন দেববর্মণ... সকলের গানই গাওয়া হয়েছিল সেই পর্বে। আর তৃতীয় পর্বে ইলেকট্রিক রক। সঙ্গে কিছু বাউল এবং জ্যাজ়। দড়ি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল স্টেজ ক্রাফট। ওই সময়ে ওই ধরনের স্টেজ ক্রাফট কলকাতা দেখেনি। ছোটবেলা থেকে জড়ো করা বেদের গান, বাউলসঙ্গ, মাঠের গান ঢুকে পড়েছিল আর্বান আধুনিক গান এবং তার পরিবেশনায়।

ব্যান্ড ভাঙার অধ্যায়
এত কিছু নিতে পারেননি মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক। বছর বিশেক বাদে যে মহীন ‘প্রজন্মের গান’ হয়ে উঠবে, সত্তর-আশির দশকে সেই মহীনকে সমালোচনাই শুনতে হয়েছে বেশি। আকাশবাণীতে তাঁদের বলা হয়েছে, ‘এ সব কোনও গানই নয়।’ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে গান লেখা পাতা, তাঁদেরই চোখের সামনে। আনন্দবাজার পত্রিকায় অবশ্য প্রশংসাসূচক কড়চা লিখেছিলেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। বস্তুত সেই কড়চার পরেই রেডিয়োয় গান গাওয়ার সুযোগ পায় মহীন।
তবে নিজেদের সমালোচনাও রসিকতা হিসেবেই দেখতেন গৌতম এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। নিজেদের অ্যালবামের কভার তৈরি করতেন তাঁদের নামে বেরোনো নানা সমালোচনার ক্লিপিং দিয়ে। কিন্তু অ্যালবাম সে ভাবে বিক্রি হল না। শিলাজিৎ তাঁর এক স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, ‘‘পূজা স্টুডিয়োতে মণিদাকে জিগ্যেস করেছিলাম, অত দিন আগে এ ধরনের গান রেকর্ড করার জন্য তোমাদের টাকা দিত কে? খুব গম্ভীর মুখে মণিদা বলেছিল, ‘কেন ফরেন মানি!’ ফরেন মানি? মণিদা আরও গম্ভীর মুখ করে বলেছিল, ‘হ্যাঁ, কাবুলিওয়ালা’।’’
মহীনের ঘোড়াগুলির অ্যালবামের কভার
নাগমতী
এক দিকে শো আসছে না, অন্য দিকে দলের সদস্যরা আস্তে আস্তে কাজের খোঁজ শুরু করছে। বন্ধ হয়ে গেল মহীনের ঘোড়া। আশির গোড়ায় ভেঙে গেল ব্যান্ড। দলের সদস্যরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে চলে গেলেন কাজের সূত্রে। গৌতম পড়ে থাকলেন মাটি কামড়ে। একাই তখন একলা ব্যান্ড। সঙ্গে মজলেন ছবিতে। একটার পর একটা ডকুমেন্টারি শুট করছেন। বানিয়ে ফেলছেন ইংরেজি ফিল্ম ‘লেটার টু মম’। বাউল সঙ্গ করছেন। ফিল্মের জন্য গান লিখছেন।
এরই মধ্যে বানিয়ে ফেললেন প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘নাগমতী’। পেলেন জাতীয় পুরস্কার। ‘নাগমতী’র শুটিংয়ের বর্ণনা করতে গিয়ে শ্রীলা মজুমদার বলেছিলেন, ‘‘এ রকম পরিচালক আগে কখনও দেখিনি। টাকিতে হয়েছিল শুটিং। ২৬টা নৌকো পরপর সাজিয়ে আমায় বলা হয়েছিল ওগুলোর উপর দিয়ে ফুলের মতো হাঁটতে হবে।’’ অভিনয়ের অনুপুঙ্খ দেখিয়ে দিতেন গৌতম।
‘নাগমতী’র পর আরও একটা ফিচার ছবিতে হাত দিয়েছিলেন গৌতম। ছবি শেষ হয়েছিল, কিন্তু মুক্তি পায়নি— ‘সময়’।
অন্য দিকে চলছে চুটিয়ে তথ্যচিত্র তৈরির কাজ। এক দিকে কাজ করছেন বাউলদের নিয়ে, অন্য দিকে ফ্রেমবন্দি করছেন ঢাকিদের জীবন। কোনার্ক থেকে হাবিব তনভির— সকলের কাছেই পৌঁছে যাচ্ছেন ক্যামেরা নিয়ে। ইতিমধ্যেই ’৯৫ সাল নাগাদ গৌতমের কাছে এলেন কলেজ পড়ুয়া কিছু ছেলেপুলে। দাবি, নতুন করে মহীনের ঘোড়া শুরু করতে হবে। ব্যান্ড তৈরির স্বপ্ন ছড়াল আবার। গৌতমরা সম্পাদনা করলেন ৪টি অ্যালবাম। যেখানে বহু গান গাইল কলেজ পড়ুয়া নতুন ছেলেরা। ‘আবার বছর কুড়ি পর’, ‘ক্ষ্যাপার গান’, ‘ঝরা সময়ের গান’, ‘মায়া’ নতুন করে মহীন ব্র্যান্ড তৈরি হল। 
ইতিমধ্যেই গৌতম মজে গিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জনজাতি নিয়ে। তাদের সংস্কৃতি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করছে তখন। এতটাই যে, অসমের কার্বি আংলঙে পৌঁছে গিয়েছিলেন কার্বি মানুষদের গান শিখতে। তাঁদের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন একটি অপেরা— ‘হাই মু’। প্রায় ৩০০ কার্বি উপজাতির মানুষ অংশ নিয়েছিলেন সেই অপেরায়। এর কিছু দিনের মধ্যেই কার্বিদের নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করতে শুরু করেছিলেন গৌতম। যার নাম ছিল ‘রং দিন’। বাংলা তর্জমা করলে ‘রং দিনে’র অর্থ দাঁড়ায় ‘চক্রব্যূহ’। যেখানে এক বার ঢুকলে আর বেরোনো যায় না। বেরোতে পারেননি গৌতমও। শুটিং শেষ করে শহরে ফিরেছিলেন পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য। আচমকাই মৃত্যু হয়।
তাঁর অনুরাগীরা অনেকেই বলেন, যে সময়ে মানুষ গৌতমকে চিনলেন, সে সময়টাই ঠিক মতো দেখতে পেলেন না গৌতম। সম সময়ে থাকলে হয়তো গান এবং ছবির জগতে আরও বড় বিপ্লব ঘটাতে পারতেন ওই স্বভাববিপ্লবী।
বিপ্লবই বটে! জীবনের নানা পর্বে রাজনৈতিক দর্শনে উত্থানপতন ঘটলেও, বরাবরই একদম নতুন কিছু করার কথা ভেবেছেন গৌতম। দেখেছেন পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন।

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/gautam-chattopadhyay-had-revolutionized-bengali-band-music-with-socially-relevant-lyrics-and-tunes-1.820642?ref=patrika-new-stry

পিঠে হাত রেখে কবি বললেন... (On Sahana Devi)

পিঠে হাত রেখে কবি বললেন...

রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান নিজের মতো করে গাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পুদুচেরির আশ্রমে শ্রীঅরবিন্দকে গান শোনাতেন তিনি। প্রথম সুযোগেই অতুলপ্রসাদের কাছে শিখে নিয়েছিলেন তিনটি গান। এমনই এক বর্ণময় রমণী সাহানা দেবী। লিখছেন দেবাশিস ভট্টাচার্য 

 
Sahana Devi

সাহানা দেবী

‘‘তুমি যখন আমার গান করো, শুনলে মনে হয় আমার গান রচনা সার্থক হয়েছে— সে গানে যতখানি আমি আছি ততখানি ঝুনুও আছে— এই মিলনের দ্বারা যে পূর্ণতা ঘটে সেটার জন্য রচয়িতার সাগ্রহ প্রতীক্ষা আছে। আমি যদি সেকালের সম্রাট হতুম তাহলে তোমাকে বন্দিনী করে আনতুম লড়াই করে। কেননা তোমার কণ্ঠের জন্য আমার গানের একান্ত প্রয়োজন আছে।’’
একটি দীর্ঘ চিঠির অংশবিশেষ। নীচে পত্রলেখকের স্বাক্ষর: ‘স্নেহাসক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। চিঠির তারিখ ১৯৩৮ সালের ৪ অগস্ট। যাঁকে ‘কল্যাণীয়াসু’ সম্বোধনে এই চিঠি লেখা, সেই ‘ঝুনু’ তার দশ বছর আগে থেকেই পণ্ডিচেরিতে শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন।
রবীন্দ্র-গানে যাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেয়েছে, চিঠির সেই ঝুনুকে জগৎ চেনে সাহানা দেবী নামে। ১৮৯৭ সালে ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম তাঁর। খ্যাতি ও গরিমায় তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুল দুই-ই সমান উজ্জ্বল।
বাবা প্যারিমোহন গুপ্ত ছিলেন নামজাদা চিকিৎসক। ডিস্ট্রিক্ট সিভিল সার্জেন। পিতামহ জমিদার কালীনারায়ণ ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। জ্যাঠামশাই কে জি গুপ্ত দুঁদে আইসিএস। বড়মামা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। মাসি অমলা দাশ এইচএমভি-র প্রথম মহিলা সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর আগে গৃহস্থ পরিবারের কোনও মহিলা গানের রেকর্ড করেননি। পিসতুতো দাদা অতুলপ্রসাদ সেন। পিসতুতো ভগ্নীপতি সুকুমার রায়। পরিবারের গণ্ডিতে এমন নক্ষত্রসারি শেষ হওয়ার নয়!
জীবনপথে প্রধানত যে তিন জনের প্রভাব সাহানাকে নানা ভাবে এগিয়ে দিয়েছে, বিভিন্ন ওঠা-পড়ায় তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা জুগিয়েছে, তাঁদের প্রথম জন অবশ্যই তাঁর ‘মামাবাবু’ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন। তার পরে রবীন্দ্রনাথ এবং সর্বশেষ শ্রী অরবিন্দ। ৯৩ বছরের জীবনে সিংহভাগ তাঁর কেটেছে পণ্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমে। বাষট্টি বছর ধরে সেটিই ছিল তাঁর ঠিকানা। ১৯৯০ সালে সেখানেই তাঁর জীবনাবসান হয়।
চিত্তরঞ্জনের কাছে বরাবর স্নেহ ও প্রশ্রয় পেয়েছেন সাহানা। ছোটবেলাতেই তাঁর বাবা মারা যান। সন্তানদের নিয়ে মা চলে আসেন দক্ষিণ কলকাতায় বাপের বাড়ি। আত্মজীবনীতে সাহানা দেবী লিখেছেন, ‘‘মামাবাবু যখন আইন ব্যবসা শুরু করেন তখন মামাবাড়ির অবস্থা সচ্ছল ছিল না, দাদামশাইয়ের ঋণের জন্য... এই অবস্থা জেনেও পিতৃদেব মামার হাতেই আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন। মামার উপর তাঁর এমন বিশ্বাস ছিল, এতটা নির্ভরযোগ্য তাঁকে বুঝেছিলেন।’’
মামাবাড়ির আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠা সাহানার জীবনবোধ, আদর্শ সব কিছুতেই তাই মাতৃকুলের, বিশেষ করে মামা চিত্তরঞ্জনের প্রভাব ছিল খুব বেশি। স্বাজাত্যবোধ, উদার মানসিকতা, দানশীলতা ইত্যাদি সেখান থেকেই শেখা। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘মামাবাবুকে দেখতাম চাইলে শুধু যে তিনি খুশি হতেন বা পছন্দ করতেন তাই নয়, চাইতেন যে আমরা তাঁর কাছে চাই, আবদার করি, দাবি করি।’’ মামিমা বাসন্তী দেবীর কাছেও একই রকম ভালবাসা পেয়েছেন তিনি।
চিত্তরঞ্জনের লেখা ‘কেন ডাকো অমন করে, ওগো আমার প্রাণের হরি’ গানটিতে সুর দিয়ে গেয়ে শুনিয়ে তাঁর কাছে পছন্দসই হিরের দুল এবং কণ্ঠহার পুরস্কার পেয়েছিলেন তরুণী সাহানা।
খুব অল্প বয়স থেকেই গান করতেন তিনি। সাত-আট বছরের মেয়ে রেকর্ড থেকে লালচাঁদ বড়ালের গান তুলে ওই রকম গায়কি অনুকরণ করে শোনাতেন। শুনে চিত্তরঞ্জন মজা করে বলতেন, ‘‘ইমিটেশন অফ বড়াল বলে তুই গ্রামোফোনে গান দে!’’ 
সাহানার বয়স যখন আরও কম, তখন থেকেই শুনে শুনে গান গলায় তুলে নেওয়ার প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর মাসিমা, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী অমলা দাশ এক বার সাহানার অন্য দিদিদের একটি টপ্পা শেখাচ্ছিলেন। আড়াল থেকে সেই গান শুনে দিদিদের আগেই মাসিমাকে সেই গান শুনিয়ে অবাক করে দিয়েছিলেন তিনি। তার পর থেকে বারবার বিভিন্ন পারিবারিক আসরে তাঁকে গানটি শোনাতে হত।
সাহানা দেবীর প্রথাগত সঙ্গীতশিক্ষার গুরু বিষ্ণুপুর ঘরানার পণ্ডিত গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। প্রথাগত অর্থে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক তিনি ছিলেন না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান ‘নিজের মতো করে’ গাইবার স্বাধীনতা যে দু’-এক জনকে দিয়েছিলেন, সাহানা তাঁদের অন্যতম। ‘নৃত্যের তালে তালে’ গানটিতে চারটি স্তবক ভিন্ন ভিন্ন তালে বাঁধার ভাবনা সাহানার। কবি তা গ্রহণ করেছিলেন। এমন দৃষ্টান্ত আরও কয়েকটি আছে। হয়তো তাই সাহানাকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, তাঁর কণ্ঠের রবীন্দ্রসঙ্গীতে যতটা স্রষ্টা আছেন, ততটাই আছেন এই গায়িকা। 
সাহানাকে গান শেখানোর জন্য সুরেন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন তিনি বছর বারোর কিশোরী। সাহানাকে অবশ্য কোনও দিন তান সাধতে বলেননি তাঁর সঙ্গীতগুরু। বরং প্রথম দিনেই তাঁর গান শুনে তাঁকে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভৈরবী টপ্পা— ‘পিপাসা হায়, নাহি মিটিল’।
গান গাইতে এতই ভালবাসতেন সাহানা যে, একবার গান গাওয়া আরম্ভ করলে একটানা একশো-দেড়শো গান গেয়ে যেতেন। এমনও হয়েছে, অনেক বার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-কন্যা মীরাদেবীর ঘরে বসে সারা রাত গান গেয়েছেন। চোখের সামনে ভোর হয়ে গিয়েছে।
অনর্গল গান শোনানোর এমন তৃপ্তি তিনি পেয়েছেন অতুলপ্রসাদ সেনের সান্নিধ্যেও। পিসতুতো দাদা অতুলপ্রসাদকে তাঁরা ডাকতেন ‘ভাইদা’ বলে। সাহানা লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের মতো ইনিও গান শুধু শুনতেই ভালবাসতেন না, শেখাতেও সমান ভালবাসতেন।’’ অতুলপ্রসাদের আগ্রহে তাঁর লখনউয়ের বাড়িতে ঘরোয়া আসরে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেকেও গান শোনানোর সুযোগ হয়েছিল সাহানার।
অতুলপ্রসাদের কাছে প্রথম বারেই তিনটি গান শিখেছিলেন তিনি। তখন দার্জিলিংয়ে বড় মেসোমশাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন সাহানা। অতুলপ্রসাদও সেই সময়ে ওই বাড়িতে উঠেছিলেন। সাহানা তাঁর কাছে প্রথমে শেখেন ‘তব পারে কেমনে যাব হরি’। তার পরে ‘বঁধু ধর ধর মালা ধর’ এবং ‘এ মধুর রাতে বল কে বীণা বাজায়’।
 সে বারেই ঘটেছিল এক মজার ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ একই সময়ে দার্জিলিংয়ে ছিলেন। অতুলপ্রসাদের সঙ্গে সাহানা দেবী এক দিন যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। কথাবার্তার ফাঁকে সাহানাকে ইঙ্গিত করে অতুলপ্রসাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ জানতে চান, ‘‘গানে অনুরাগ কী বলে? গাইছে আজকাল?’’ অতুলপ্রসাদ জবাব দেন, ‘‘গানে অনুরাগ তো খুবই দেখছি। উৎসাহের শেষ নেই।’’ রসিক রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, ‘‘ওহে, রোস, রোস। এখনও তো বিয়ে হয়নি। মেয়েদের হয় বিয়ে, নয় গান। দুটোর মাঝামাঝি কিছু নেই।’’
গান শোনাচ্ছেন সাহানা দেবী, পাশে দিলীপকুমার রায়
সাহানা দেবী নিজে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে তিনি যে গভীর তৃপ্তি পেতেন, তা আর কোথাও পাননি। কবির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের রসায়নটাও ছিল বড় গভীর। স্নেহ, প্রীতি, অধিকারবোধ সব কিছুর এক অদ্ভুত মিশেল ছড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরতে পরতে। একবার রবীন্দ্রনাথকে সাহানা বললেন, ‘‘আমার গানের প্রতি আপনার বেশ পক্ষপাতিত্ব আছে।’’ কবির বিস্মিত জবাব, ‘‘ঝুনু, তুমি আমায় একথা বলছ!’’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাহানার প্রথম দেখা মামা চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে। তিনি তখন নিতান্ত বালিকা। কেমন ছিল সেই দর্শনের অভিজ্ঞতা? সাহানা লিখেছেন, ‘‘কি সুন্দর চেহারা, কোথায় যেন  যিশুখৃষ্টের আদল আসে— গৌরবর্ণ, লম্বা, দোহারা, চোখ নাক মুখ সব যেন দেখবার মতো। দেখলে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।’’ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে ওই বাড়িতে প্রায়ই যেতেন রবি ঠাকুর। নিজের লেখা পড়তেন। গান হত।
মাসি অমলা দাশ এক বার সাহানাকে কবির কাছে নিয়ে গিয়ে গান গাইতে বলেন। সেই প্রথম তাঁকে গান শোনানো। সাহানা গেয়েছিলেন মাসির কাছে শেখা ‘ঘুরে ফিরে এমনি করে ছড়িয়ে দে রে ফাগের রাশি’। সেই থেকে ওখানে গেলেই রবীন্দ্রনাথ সাহানার খোঁজ করতেন। আদর করতেন বালিকাকে।
যখন পঞ্চদশী, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মাঘোৎসবের সম্মিলনে সাহানা গাইলেন ‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে’ এবং ‘লুকিয়ে আস আঁধার রাতে’। সে দিনের প্রার্থনায় আচার্য ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
ওই রকম বয়সেই সাহানার প্রথম শান্তিনিকেতনে যাওয়া। উপলক্ষ, রবীন্দ্র-জন্মোৎসব। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোতে বা কলকাতার অন্য কোথাও এলেও বারবার ডাক পড়ত সাহানার। কখনও কবি নিজে, কখনও দিনেন্দ্রনাথ গান শেখাতেন তাঁকে। এক বার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে টেলিফোনে দিনুবাবু সাহানাকে একসঙ্গে চোদ্দোটি গান শিখিয়েছিলেন। সাহানা ছিলেন তাঁর মামার বাড়ি রসা রোডে অর্থাৎ দেশবন্ধুর বাড়িতে।
১৯১৬ সালে চিকিৎসক বিজয় বসুর সঙ্গে বিয়ে হয় সাহানার। বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অনেক টালমাটাল সময়ের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাঁকে। সেই সব সময়েও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পরম নির্ভরতার আশ্রয়।
১৯২৬-এ অসুস্থ হয়ে পড়েন সাহানা দেবী। শান্তিনিকেতনে থাকতে চেয়ে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথকে। ব্যবস্থা হয়ে যায়। সাহানা বলেছেন, ‘‘তাঁর মধুর সুকোমল স্পর্শ তখন আমাকে নবজীবন দান করেছিল।’’ এক দিন বিকেলের পরে কবি এলেন সাহানার ঘরে। কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপলেন। তার পরে অনেক ক্ষণ সাহানার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পাশে বসলেন এবং পিঠে হাত রাখলেন। কিছু আন্তরিক কথাও হল দু’জনের।
আত্মজীবনীতে সাহানা দেবী সবিস্তার জানিয়েছেন সেই সন্ধ্যার কথা। সে দিন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘যে অভিজ্ঞতা তোমার হল এ-অভিজ্ঞতা জীবনে কম আসে। বিশেষভাবে তোমাদের জীবনে সেটার সুযোগ খুব কমই আসে। তোমাদের চারিদিকে এত বাঁধাবাঁধি যে, সে সুযোগ যদি কখনও আসেও তো ঝড়ের মতো সব যেন ভেঙে দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়।’’ সায় দিয়ে সাহানার জবাব ছিল, ‘‘আমারই তো তাই, দেখুন না যেন সব ভেঙে, যেখানে যা ছিল খসিয়ে তবে ঠাণ্ডা হল।’’
সাহানা দেবীর অসুস্থতা ক্রমশ টিবি রোগের আকার নেয়। তখনও, ১৯২৭ সালের গোড়ার দিকে, মাস তিনেক তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন। পরে সেখান থেকেই নৈনিতালের কাছে এক স্যানেটোরিয়মে চলে যান। ট্রেনে কাশী পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁর যাত্রাসঙ্গী ছিলেন। সাহানা লখনউতে দাদা অতুলপ্রসাদের বাড়িতে ওঠেন এবং সেখান থেকে পরদিন স্যানেটোরিয়মে। শুরু হয় একাকী জীবনের আর এক অধ্যায়।
অধ্যায় এই কারণে যে, জীবনের এই পর্বেই তিনি আধ্যাত্মিকতায় অনুরক্ত হন। এর পরে কলকাতায় তিনি খুবই কম এসেছেন। শান্তিনিকেতনেও নয়। বরং উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় একা একা ঘুরে অবশেষে ১৯২৮-এর নভেম্বরে পৌঁছন পুদুচেরিতে, শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে। সেখানে শ্রী অরবিন্দের দর্শন ও আশীর্বাদ পান। মাদারের স্নেহ পান। আশ্রমের সেলাই বিভাগে কাজের দায়িত্বও দেওয়া হয় তাঁকে। সেই থেকে আমৃত্যু আর অন্য কোথাও ফিরে যাননি।
অরবিন্দকে সাহানা দেবী প্রথম দেখেছিলেন তাঁর মামা চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে। ১৯০৮। আলিপুর বোমার মামলায় জেল থেকে ছাড়া পেয়ে অরবিন্দ দেখা করতে গিয়েছিলেন সেখানে। চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন সেই ঐতিহাসিক মামলার আইনজীবী।
স্মৃতিকথায় সাহানা দেবী লিখেছেন: ‘‘তখন তাঁকে অল্পক্ষণের জন্য দেখেছিলাম, কিন্তু সে চেহারা খুব স্পষ্ট মনে নেই, শুধু একটু একটু মনে আছে— রোগা শ্যামবর্ণ আবছা একটি সৌম্যমূর্তি।’’
আরও কুড়ি কুড়ি বছরের পার, ১৯২৮-এ তিনি যখন পুদুচেরির অরবিন্দ আশ্রমে মুক্তির আশ্রয় খুঁজে পান, তার প্রথম অভিজ্ঞতাও বেশ চমকপ্রদ। যক্ষ্মায় আক্রান্ত সাহানা দেবী উত্তর ভারতে স্যানেটোরিয়মে যাওয়ার পর থেকে পুদুচেরিতে স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত এক প্রকার পরিব্রাজকের মতো জীবন কাটিয়েছেন। এখানে, ওখানে ঘুরেছেন। কখনও অল্প দিন কোনও আত্মীয় বা বন্ধুর আতিথ্য নিয়েছেন। আবার দিন কয়েক পরেই বেরিয়ে পড়েছেন নতুন যাত্রায়।
কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায় শ্রী অরবিন্দ আশ্রমেরই বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাহানার ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। যার সূচনা হয় ১৯২২ সালে গয়ার কংগ্রেস অধিবেশনে। মামা চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন সাহানা। দিলীপ রায় আবার ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর বন্ধু। ফলে আলাপ জমতেও দেরি হয়নি। মুগ্ধ বিস্ময়ে সাহানা শুনেছিলেন দিলীপ রায়ের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’। সম্পর্কের উষ্ণতায় পরবর্তী কালে দিলীপবাবুকে সাহানা দেবী ডাকতেন ‘মন্টু’ বলে। সেটি দিলীপবাবুর ডাকনাম।
দিলীপ রায়ের কাছেই প্রথম  শ্রী অরবিন্দের পূর্ণযোগের বিষয়টি জানতে পারেন সাহানা। এর পরে তাঁর লেখা পড়ে আরও অনুরক্ত হয়ে পড়েন। অন্তরে অনুভব করতে থাকেন তীব্র, অমোঘ আকর্ষণ। তিনি স্থির করেন, পুদুচেরিতে শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে যাবেন। অন্য সব কিছুতে বিরাগ তখন। গানেও রুচি নেই। আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁকে বিশেষ সহায়তা করেছিলেন দিলীপ রায়েরই বন্ধু নলিনীকান্ত গুপ্ত। তাঁর সঙ্গে বারবার এ বিষয়ে পত্রালাপ চলত সাহানা দেবীর।
কলকাতা থেকে জাহাজে তৎকালীন মাদ্রাজ বন্দর। সেখান থেকে বেঙ্গালুরুতে কিছু দিন কাটিয়ে অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে পুদুচেরি। তার আগে ঘটল সেই চমকপ্রদ ঘটনাটি। আশ্রমে যাওয়ার দিন তখন এগিয়ে আসছে। এক রাতে সাহানা দেবী স্বপ্নে দেখলেন শ্রী অরবিন্দকে।
কেমন ছিল সেই দর্শন? আত্মকথায় বর্ণনা দিয়েছেন তিনি নিজেই। আশ্রমে যাওয়ার জন্য তাঁর অন্তরে যে ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, সেই কথা জানিয়ে নলিনীবাবুকে চিঠি লিখেছিলেন সাহানা দেবী। বলেছিলেন মাদারকে সব জানাতে। তার দু’দিন পরেই স্বপ্নে সাহানার মনে হল, শ্রী অরবিন্দ এক বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের জমি পেরিয়ে হেঁটে আসছেন। সাহানা ছুটে গেলেন তাঁর দিকে। প্রণাম করে জানতে চাইলেন, ‘আমার পণ্ডিচেরী থাকার কী হল?’’ সাহানা স্বপ্নে দেখলেন, শ্রী অরবিন্দ তাঁর দিকে কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলছেন: ‘পণ্ডিচেরী? পণ্ডিচেরী এখনই কেন? আরও কিছুকাল গানটান করো না!’
সাহানা লিখেছেন, ‘‘উত্তর শুনে আমার মনে হল আমি যেন একেবারে ভেঙে পড়লাম। কাতরকণ্ঠে বললাম— গান? গান তো আর আমি করতে পারব না!’—তিনি সস্নেহে আমার পিঠে হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন— পণ্ডিচেরী তোর হয়ে গেছে, কাল চিঠি পাবি।’’
স্বপ্ন দেখার তারিখ ১৪ নভেম্বর। পরদিনই নলিনীবাবুর চিঠি পৌঁছয় সাহানা দেবীর হাতে। তিনি জানান, আশ্রমে যাওয়ার বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ। পুদুচেরিতে ১৯২৮-এর ২৪ নভেম্বর শ্রী অরবিন্দের দর্শন পান সাহানা।
সোফায় বসে ছিলেন গৌরবর্ণ, উজ্জ্বলকান্তি সেই পুরুষ। পরনে গরদের ধুতি-চাদর। প্রণাম করতেই সামনের দিকে ঝুঁকে মাথায় হাত রাখলেন। ‘‘আহা! কী যে নরম সেই হাতের স্পর্শ... যা পাচ্ছিলাম তা আর কোথাও কখনও পাইনি’’—লিখেছেন সাহানা।
গান অবশ্য শেষ পর্যন্ত সাহানা দেবীকে ছাড়েনি। পাশাপাশি সেটাও বজায় থেকেছে। মৃত্যুর আগেও তিনি বলতেন, ‘‘যাঁরা আমার এই ৯২ বছরের কণ্ঠের গান শোনেন তাঁরা অবাক হয়ে এই কথাই বলেন যে— আজও কেমন করে আমার এই কণ্ঠ রয়েছে?’’
তাঁর সঙ্গীতচর্চা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আশ্রম-পর্বে দিলীপ রায়ের ভূমিকাও বড় কম ছিল না। একসঙ্গে গান গাওয়া তো ছিলই। সাহানা দেবী গাইছেন, দিলীপ রায় হারমোনিয়মে সঙ্গত করছেন— এমনও ঘটেছে বারবার। অরবিন্দ আশ্রমের অন্যতম ভক্ত ও ধর্মবিষয়ক শিক্ষক শ্রী চিন্ময় বলেছেন, এক বার দিলীপ রায়ের কাছে একটি বাংলা গান শেখেন সাহানা দেবী। পরে তিনি যখন গানটি গেয়ে শোনান, দিলীপবাবু শুনে বলেছিলেন, ওই গানটি তিনি নিজে আর গাইবেন না। কারণ সাহানা গানটিতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
আশ্রম-জীবনে সাহানা দেবী রবীন্দ্রসঙ্গীত একেবারে গাইতেন না, তা নয়। কিন্তু বেশি গাইতেন ভজন, ভক্তিমূলক গান ইত্যাদি। নিজে কিছু গান লিখেওছিলেন। শ্রী চিন্ময় জানাচ্ছেন, সাহানা দেবী কিছু দিন নিয়ম করে শ্রী অরবিন্দকেও গান শুনিয়েছেন। প্রথমে সপ্তাহে এক বার, পরে মাসে দু’বার বা মাসে এক বার করে তাঁর গান শুনতেন
শ্রী অরবিন্দ।
তাঁর আশ্রমবাসের কথা লিখতে গিয়ে সাহানা দেবী শুনিয়েছেন এক অদ্ভুত ঘটনার কথা। সেখানে প্রতি শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় গাড়িতে মাদার বেড়াতে বেরোতেন। সঙ্গে যেতেন তাঁরা কয়েক জন। শ্রী অরবিন্দ মাদারের বেরোনো এবং ফেরার সময় গাড়ির হর্ন শুনে দোতলার ঘরের জানলায় এসে দাঁড়াতেন। কিন্তু সে দিকে অন্য কারও তাকানোর অধিকার ছিল না। একবার সাহানা দেবী তাকিয়ে ফেলেন এবং দেখেন, ‘‘শ্রীঅরবিন্দ খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর দেহের খানিকটা দেখা যাচ্ছে।’’ সাহানা লিখছেন, ‘‘শ্রীঅরবিন্দ আমায় দেখা মাত্র চট্ করে সরে গেলেন জানালার আড়ালে। পাশে লুকিয়ে অদৃশ্য হলেন!’’
দীর্ঘ জীবনপথে এমন বহু বিচিত্র এবং বহুমূল্য অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারী এই অভিজাত রমণী বাঙালির স্মৃতিতে আজ হয়তো অনেকটাই ধূসর। কিন্তু গত শতাব্দীর প্রায় সবটা জুড়ে এমন এক বর্ণময় প্রতিভা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে যে ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, তা ভোলার নয়। সাহানা দেবীর কণ্ঠের গান, বিশেষত রবীন্দ্রসঙ্গীত, স্মৃতির সম্পদ হয়ে রয়ে যাবে চিরকাল।
ঋণ: ‘স্মৃতির খেয়া’: সাহানা দেবী

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/sahana-devi-was-allowed-by-rabindranath-tagore-to-improvise-his-songs-1.816830?ref=patrika-new-stry