Sunday, 11 June 2017

আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি… (On Manabendra Mukherjee)

$image.name

আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি…

এ ছিল তাঁর ভূতে পাওয়া গান। কাজী নজরুলকে তিনি ফিরিয়েছিলেন বাঙালির ঘরে। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মঙ্গলবার তিনি পঁচাশি। লিখছেন দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়

৮ অগস্ট, ২০১৫, ০০:০৩:০০

1

ছবি: সমর দাস

‘‘আপনাকে একটু খারাপ করে গাইতে হবে।’’

স্বয়ং ছবির পরিচালকের এমন কথায় আকাশ থেকে পড়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
‘দেয়া নেয়া’ ছবির গান। ‘দোলে দো দুল দোলে ঝুলনা’। তারই রেকর্ডিং-এর আগে রিহার্সাল।
সঙ্গীত পরিচালক শ্যামল মিত্র আছেন। ইউনিটের অন্যরাও উপস্থিত। তারই ফাঁকে অমন বজ্রপাত।
‘‘মানে! কেন? কী বলছেন আপনি!’’
পরিচালকের যুক্তি, ‘‘আসলে ছবিতে নায়ক (উত্তমকুমার) গান জানেন। তাঁর বন্ধু (তরুণকুমার) গাইতে পারেন না। গল্পে এমনই বলা আছে। নায়কের গানটা শ্যামলবাবুর (মিত্র)। আপনি গাইছেন বন্ধুর লিপে।’’
‘‘তা বলে খারাপ করে গাইতে হবে! তা হলে আমাকে ডেকেছেন কেন? আমায় বরং ছেড়ে দিন।’’
গম্ভীর হয়ে উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন মানবেন্দ্র। তখনই নায়ক উত্তমকুমারের প্রবেশ। কনট্রোল রুমে বসেছিলেন এতক্ষণ। এ ঘরের সব কথাই তাঁর কানে গেছে। ঢুকেই বললেন, ‘‘মানব, তুই উঠিস না।’’
মানবেন্দ্রর মনের অবস্থাটা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন তিনি। আলাপ তো আর এক দিনের নয়। যখন তিনি চলচ্চিত্রেরই ধারেকাছে নেই, তখন থেকেই। টালিগঞ্জের বাঙাল পাড়ায় মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে তবলা শিখতে যেতেন সে দিনের অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। সে কত কাল আগে! সেই আলাপ আরওই জমে গিয়েছিল ‘সাড়ে ৭৪’-এ একসঙ্গে  অভিনয় করায়।
ইউনিটের লোকজনের দিকে তাকিয়ে উত্তম বললেন, ‘‘দেখুন, গল্পটা তো রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের নয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরও নয়। একটু বদলে নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। নায়কের বন্ধুকে গায়ক করতে দোষ কী! মানবকে আপনারা ডেকেছেন, ও তো চাইবে ওর একশো ভাগ দিতে। যেমন আমার কাছ থেকেও আপনারা আশা করেন। ওর মতো এক জন গায়ক খারাপ করে কী করে গাইবে?’’
এই কথায় কাজ হল। ভাগ্যিস! নইলে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা দ্বৈত সঙ্গীতের যে কী হত, কে জানে!
সে-যাত্রায় বন্ধু উত্তম পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আবার সেই বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েও এক বার সঙ্গীত পরিচালনার কাজ থেকে সরে আসেন মানবেন্দ্র।
‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবি করবেন উত্তমকুমার। সঙ্গীত পরিচালনার জন্য ডাকলেন তাঁর ‘মানব’কে। প্রথম সিটিঙে গিয়ে মানবেন্দ্র দেখেন, তিনি একা নন। শ্যামল মিত্র সহ আরও জনা তিন-চার সঙ্গীতকার রয়েছেন।
পাশে স্ত্রী বেলাদেবী।

সবাই মিলেই একই ছবিতে একসঙ্গে সঙ্গীত পরিচালনা করবেন। ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি মানবেন্দ্রর। সরে দাঁড়ান।  —‘‘এত অ্যামেচারিশ ব্যাপার আমার পোষাবে না।’’
অ্যামেচারিজম পছন্দ নয়। গানের সঙ্গে তাঁর জড়িয়ে পড়ার মধ্যে অদ্ভুত সব কাতরতা। আর তার জন্যই বোধ হয় অমন বিচিত্র ভাবে প্রথম বার সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
‘চাপাডাঙার বউ’। কাহিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। চিত্রপরিচালক নির্মল দে নিজেই বললেন, ‘‘ছবিতে কাজ হতে পারে। কিন্তু তার আগে পরীক্ষা দিতে হবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।’’
তত দিনে প্লে-ব্যাকে অল্পবিস্তর নামধাম হয়েছে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ ছোট্ট একটু আহির ভৈরো আলাপ গেয়ে পরিচালক নির্মলবাবুর মন ছুঁয়েছেন। তাতেই ওই প্রস্তাব।
যাওয়া হল তারাশঙ্করের টালা পার্কের বাড়ি। ব্যাঘ্রচর্মের ওপর বসে লাল ধুতি পরে লিখছেন তারাশঙ্কর। গলায় উপবীত। রুদ্রাক্ষ। আলাপ করিয়ে কথা পাড়তে মাথা না তুলেই নির্মলবাবুকে বলে দিলেন, ‘‘না, না হবে না। গল্পটা আমার খুব শক্ত। স্ক্রিপ্ট আমিই লিখছি। তুমি কোনও পাকা সঙ্গীত পরিচালককে আনো।’’
এর পর আর কোনও কথা নেই। কিছুক্ষণ বাদে নিজে থেকেই তারাশঙ্কর বললেন, ‘‘আচ্ছা, দু’কলম লিখে দিচ্ছি। সুর করো তো।’’
‘‘কিন্তু সিচ্যুয়েশনটা কী?’’
যুবক-সঙ্গীতকারের এ-কথায় সেই প্রথম বোধ হয় থমকেছিলেন কাহিনিকার। মুখে শুধু বললেন, ‘‘মহাতাপ (উত্তমকুমার) গাজনে শিব সেজে নৃত্য করছে।’’
গানের কথা হাতে নিলেন মানবেন্দ্র। — ‘শিব হে/অশিব শঙ্কর…।’
এর পরই ঢাকের তাল মাথায় রেখে কীর্তনের ঢঙে সুর বেঁধে গাইতে লাগলেন। একেবারে দাঁড়িয়ে উঠে।
কিছুক্ষণ বাদে দেখেন তারাশঙ্করও উঠে পড়েছেন। মুখে তাঁর তৃপ্তির হাসি। গান থামলে নির্মল দে-কে বললেন, ‘‘একদম ঠিক জনকেই এনেছ। এই-ই পারবে। আর কারও খোঁজ লাগবে না।’’
গানের জন্য এক দিকে আবেগী। অন্য দিকে বেপরোয়া। নাছোড়। সে একেবারে ছোট থেকেই।
ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশন। সেখানে কীর্তন, টপ্পা, ঠুংরির সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইতে হবে। বাকিগুলো নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত?
বাড়ির পরিবেশ  ভরপুর গানের, কিন্তু কোনও দিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা তেমন করা হয়নি। কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়। দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞ। বললেন, ‘‘জর্জ বিশ্বাসের (দেবব্রত বিশ্বাস) কাছে যা। পারলে ওই তোকে গাইড করতে পারবে।’’
ভোরে লেকে জগিং করার অভ্যাস ছিল মানবেন্দ্রর। জর্জ বিশ্বাস তখন থাকতেন সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এ। দিনভর তাঁর বাড়ির দরজা খোলা। জগিং সেরে ঢুকে গেলেন দরজা ঠেলে। এলোমেলো ঘর। মশারি টাঙানো। ঘুমিয়ে আছেন দেবব্রত বিশ্বাস। সটান মশারি তুলে হাত দিয়ে তাঁকে ঠেলাঠেলি করতেই উনি ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বললেন, ‘‘আপনি ভারী অসভ্য ইতর লোক তো! না বলে কয়ে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত লোককে তুলে দিচ্ছেন!’’
ভয়ে দু’পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মানবেন্দ্র। বাড়ির কর্তা বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ ধুয়ে জাঁতি হাতে সুপারি কাটতে কাটতে আড়চোখে খানিক চেয়ে দেখতে দেখতে বললেন, ‘‘মশায়ের কী করা হয়?’’
‘‘ছাত্র।’’
‘‘দেখে তো মনে হয় না ভাল কিছু কাজ করেন। তা আগমনের হেতু?’’
‘‘ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে হবে। আপনার কাছে শিখব।’’
‘‘প্রতিযোগিতা কবে?’’
‘‘আজ বিকেলে।’’
জর্জ বিশ্বাস শুনে বাক্যহারা। এ-ছেলে বলে কী!
‘‘আমার কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়। উনিই আপনার কাছে পাঠালেন।’’
এর পর সদয় হলেন জর্জ বিশ্বাস। গান শেখাতে বসলেন— ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশেরও পাখি’। কিছুক্ষণ বাদে জর্জ অফিসে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর বোনকে বলে গেলেন, ‘‘যতক্ষণ না ওঁর গানটা ঠিক হচ্ছে, ছাড়বি না।’’
সে আর আটকানো যায়নি। একটু বাদেই বোনের নিষেধ সত্ত্বেও চলে এসেছিলেন। কিন্তু বিকেলবেলা প্রতিযোগিতায় গিয়ে চমকে গেলেন। বিচারকদের চেয়ারে শৈলজারঞ্জন মজুমদার, অনাদি দস্তিদারের পাশে স্বয়ং দেবব্রত বিশ্বাস! মানবেন্দ্রকে দেখে উনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। প্রতিযোগিতায় তাঁকে তিনি কোনও নম্বরও দেননি। কিন্তু সবার বিচারে প্রথম হলেন মানবেন্দ্রই।
এর পর আবার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে দেখা করতে যেতেই জর্জ বললেন, ‘‘শুনুন, আপনাকে একটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এই আপনার প্রথম আর শেষ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া। এ লাইন আপনার নয়।’’
সেই থেকে পারতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের গানের ধার মাড়াননি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণনের সামনে।

গান নিয়ে ওঁর প্যাশনটা যে কী পর্যায়ের ছিল!  কত বার হয়েছে, রেকর্ডিং করতে বসে কখনও সুরের গমকে কেঁদে ফেলেছেন। আবার সুর আসছে না, কথা ভাল লাগছে না বলে উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন, এমনও হয়েছে।
এক বার এমনই এক কারণে সুরকার নচিকেতা ঘোষের সঙ্গে বড়সড় ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যাচ্ছিল প্রায়।
সে বছর পুজোয় বিখ্যাত এক গানের মহলা। ‘বনে নয় মনে মোর’। রেকর্ডিং হবে একটু পরেই। অথচ নচিকেতার তৈরি মুখড়টা কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না।
শেষে তবলিয়া রাধাকান্ত নন্দীকে মানবেন্দ্র বললেন, ‘‘তুই একটা টুকরো বাজা তো।’’ বাজালেন রাধাকান্ত। সেটাই গানের মুখে লাগালেন।
এ বার মানবেন্দ্র-রাধাকান্ত দু’জনেরই খুব পছন্দ হল। নচিকেতা গেলেন রেগে। তক্কাতক্কি করে উঠেই গেলেন মহলা ছেড়ে।
মহলা কিন্তু থামল না। রেকর্ডিংও হল। এই পুরো সময়টা বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার অলক্ষ্যে গান শুনেছিলেন নচিকেতা। ধীরে ধীরে গানটা ওঁর মনে ধরে গেল। শেষে এসে জড়িয়ে ধরলেন মানবেন্দ্রকে।

*****

‘মায়ামৃগ’র গান বাঁধা হচ্ছে। গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। মানবেন্দ্রর বহুকালের বন্ধু। যখন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শ্যামলের বিয়ে হয়নি, তখন থেকেই তাঁরা হরিহর আত্মা।
এই বন্ধুতা শুধু দু’জনের নয়, সম্পর্ক ছিল পরিবারে-পরিবারে। তা যে কতটা ঘন, বোঝাতে দুই বাড়ির একটা রীতির কথা বলা যেতে পারে।— প্রত্যেক বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নর্থ রোডে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে যেতেন। এক কুঁজো জল, এক থালা ফল আর মিষ্টি নিয়ে। এ প্রথা কবে শুরু হয়েছিল বলা মুশকিল, কিন্তু চলেছিল মানবেন্দ্রর জীবনের একেবারে প্রান্তবেলা অবধি।
মায়ামৃগ-র সময় শ্যামল গুপ্তকে মানবেন্দ্র বললেন, ‘‘নায়ক বিশ্বজিৎ নায়িকা সন্ধ্যা রায়ের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু নায়কের সব কথাতেই ডাক্তারির প্রসঙ্গ এসে পড়ে। এমনকী প্রেম নিবেদনের সময়ও তাই। এটাকে মাথায় রেখে একটা গান লেখ।’’
মানবেন্দ্র তখন ফার্ন রোডে ‘গীতবীথিকা’ নামে একটি স্কুলে গান শেখান। ক্লাসের পর সেখানে বন্ধু শ্যামলের সঙ্গে গান-আড্ডাও হয়।
তেমনই এক রবিবারের বিকেলে শ্যামল গুপ্ত হাজির হলেন ফার্ন রোডে। সঙ্গে গান— ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’। দেখে বললেন, ‘‘ছ্যা, এ কী লিখেছিস! এ একেবারে চলবে না। গান লেখা টুকরো কাগজটা হাতে নিয়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন জানলা দিয়ে। বন্ধু আর কী করেন! মুষড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়লেন।
ঘণ্টা দুই গড়াল। গানের ক্লাস শেষ। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মানবেন্দ্র দেখলেন বন্ধু পাংশুমুখে বসে। বললেন, ‘‘নারে, গানটা তুই মন্দ লিখিসনি। দেখি এক বার!’’
এ বার রাগে-অভিমানে শ্যামল বললেন, ‘‘তুই তো ফেলে দিলি রাস্তায়। আমার কাছে কোনও কপিও নেই। ট্রামে আসতে আসতে হাতে যা ছিল, তার ওপরে লিখেছিলাম…।’’ 
তা হলে?
তখন সন্ধে নেমে গেছে। রাস্তায় আলো প্রায় নেই। টর্চ হাতে তোলপাড় খোঁজ চলল তার মধ্যেই। শেষে দলা পাকানো টুকরো কাগজটার খোঁজ মিলল নর্দমার পাশে। এর পর ‘মেটেরিয়া মেডিকার’ জনপ্রিয়তা তো আকাশ ছুঁয়ে যায়। যেখানে অনুষ্ঠানে যেতেন, ‘মেটেরিয়া’ না শুনিয়ে রেহাই নেই। গানের লিপ দিতে মঞ্চে ডাক পড়ত বিশ্বজিতের।
এই শ্যামল গুপ্তরই লেখা ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’। মানবেন্দ্র বলতেন, ‘‘ও আমার ভূতে পাওয়া গান।’’
তখন রেডিয়োয় লাইভ ব্রডকাস্টের যুগ। ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেস থেকে ইডেনে আসেনি আকাশবাণী। এক অনুষ্ঠান শেষে পরের অনুষ্ঠানের মাঝে অনেকটা ফাঁকা সময় থাকলে অফিসেই কাটিয়ে দিতেন অনেকেই।
তেমনই এক দিনে ছাদে পায়চারি করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। নিঝুম সন্ধেবেলা। ঠিক নীচে কবরখানার দিকটা জমাট কালো। ও-বাড়ির সাহেব-ভূতের গল্প বহুশ্রুত। তাতে ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাঁর।
হঠাৎ কেউ যেন ডেকে উঠল, ‘‘মানব, মানব।’’ চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখেন দুটো চোখ। জ্বলছে।— ‘‘কে?’’
‘‘আমি শ্যামল। একটা গান লিখে ফেলেছি। শুনবি?’’
একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘‘বল।’’
অন্ধকারে দাঁড়িয়েই শুনতে লাগলেন গানের কলি— ‘‘…তোমার কাজল চোখে যে গভীর ছায়া কেঁপে ওঠে ওই/তোমার অধরে ওগো যে হাসির মধু মায়া ফোটে ওই/তারা এই অভিমান বোঝে না আমার…।’’
সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। শেষ হতেই এক হাতে বন্ধুকে পাকড়ে ধরে সোজা পাঁচ নম্বর স্টুডিয়ো। ওখানে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো রাখা। সন্ধে পাঁচটার পর সে-ঘরের দরজা তালাবন্ধ থাকে। পিয়ানোর ডালায় চাবি দেওয়া। কিন্তু সে দিন যে কী হল!
দরজার ‘ল্যাচ’ ঘোরাতেই খুলে গেল! ডালায় হাত দিয়ে ওঠাতে উঠে গেল! তাতে বসেই গানের মুখড়াটা করে ফেলেছিলেন মানবেন্দ্র।
পুরো ব্যাপারটা নিয়ে বিস্ময়ের ঘোর জীবনের শেষ দিন অবধি তাঁর কাটেনি। কেবলই বলতেন, ‘‘ও আমার ভূতে পাওয়া গান।’’
মেহদি হাসানের সঙ্গে।

মেহদি হাসানের গজলের পাগল-ভক্ত ছিলেন। উল্টো দিকে মেহদি হাসান?
রবীন্দ্রসদনে গাইতে এসেছেন। তার আগে শুনেছেন কলকাতায় আরেকজন ‘মেহদি হাসান’ আছেন। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে আলাপ করার খুব শখ। সংগঠকরা সে কথা জানতেন।
দর্শকাসনে মানবেন্দ্রকে বসতে দেখে তাঁরা মেহদিকে জানাতেই মঞ্চ থেকে উনি বলে উঠলেন, ‘‘মানবেন্দ্রজি, আপনি একবার উঠে দাঁড়ান। আমি একবার অন্তত আপনাকে দেখতে চাই।’’
প্রায় একই রকম ছিল লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ওঁর পরিচয়-পর্ব। কলকাতায় ‘হোপ এইট্টিসিক্স’। সারা ভারতের বহু নামী শিল্পীদের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরও এসেছেন। গ্রিনরুমে তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে গেলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। হাতজোড় করে প্রণাম করে নাম বলতেই, লতাজি ভ্রু তুলে চমকে উঠে বললেন, ‘‘মানবেন্দ্রজি, আপ উও গানা গায়ে থে! হাম তো কুচভি নেহি গা পায়ে।’’
কী ব্যাপার?
এর আগে সলিল চৌধুরীর সুরে অসম্ভব শক্ত তাল-লয়-সুরের দুটি গানের রেকর্ড করেন মানবেন্দ্র। যার এক পিঠে ‘যদি জানতে গো’। অন্য পিঠে ‘আমি পারিনি বুঝিতে পারিনি’। এর যখন হিন্দি ভার্সান করতে যাবেন, লতা মঙ্গেশকরের কাছে গিয়েছিলেন সলিল। গান শুনে লতাজি বলেছিলেন, ‘‘সলিলদা, এ অসম্ভব। এ কেউ গাইতে পারবে না।’’ উত্তরে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘এ গান অলরেডি বাংলায় রেকর্ডেড। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের।’’
সেই বাংলা গান শুনে লতা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন, প্রথম আলাপে তাই ওঁর ওই কথাটাই মনে পড়ে যায়।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুর মানেই জটিল। অথচ তিনি নিজে যখন সেই একই গান গেয়ে ওঠেন মনে হয়, এর চেয়ে সহজ কাজ পৃথিবীতে আর হয় না।
এ কথা স্বীকার করতেন মান্না দেও। ‘ইন্দিরা’ ছায়াছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লিপে গাইবেন তিনি।  দুটি গানের সুর করলেন মানবেন্দ্র। ‘ঝর ঝর বৃষ্টিতে’ আর ‘আজি মলয় মন্দ বহিয়া’।
মানবেন্দ্রর যাদবপুরের নর্থ রোডের বাড়িতে এলেন মান্না দে। গানের মহলা। শুনলেন গান। এর পর যত বারই গাইতে যাচ্ছেন, তত বারই বলছেন, ‘‘মানববাবু, এ আপনার মতো হচ্ছে না।’’
প্রতি বারই আশ্বাস, ‘‘কী বলছেন মান্নাদা! এ গান আপনি অন্য মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছেন।’’— তবু মান্না দে’র কুণ্ঠাবোধ শেষ অবধি যায়নি।

*****

ছোট থেকে এত রকমের গানের মধ্যে দিয়ে গেছেন যে, পরে সেই ভিন্নতার রেশ পড়েছে তাঁর সুরের গড়নেও।
ঠাকুর্দা গজেন্দ্রনাথ ছিলেন অসম্ভব সঙ্গীতরসিক মানুষ। রজনীকান্ত সেনের সঙ্গে একই মেসে থাকতেন। নিজে ভক্তিগীতি, হরিনামের গান গাইতেন। রজনীকান্ত গান লিখে গজেন্দ্রনাথকে দেখাতেন।
বরিশালের উজিরপুরে ওঁদের যে দেশের বাড়ি, তার চণ্ডীমণ্ডপে গান লেগেই থাকত। রাধাকৃষ্ণের লীলাকীর্তন, রয়ানী গান, মনসামঙ্গলের আসর…। মাঝিমাল্লারাও গান গাইত। সারিন্দা বাজিয়ে। সারিজারি ভাটিয়ালি।— ‘আর কত দিন রইব দয়াল/নেবানি আমায়’। নমঃশুদ্র মাঝিরা গাইত হরে নামসংকীর্তন।
বাবা অতুলচন্দ্র গানবাজনা না করলেও, তাঁরই উৎসাহে দুই কাকা রত্নেশ্বর আর সিদ্ধেশ্বর গানচর্চা করতেন। ওঁরাই ছিলেন ‘মুখুজ্জে পরিবার’-এ কীর্তন, ধ্রুপদী গানের বাহক। কাকাদের সঙ্গে হরির লুঠের আসরে রূপানুরাগ, মান, মাথুর গাইতে যেতেন ও-বাড়ির পল্টন (মানবেন্দ্রর ডাক নাম)। 
কালীঘাটে জন্মেছেন, কিন্তু দেশের টান, তার সুর আমৃত্যু ভোলেননি। বলতেন, ‘‘একটু যখন বড় হইলাম, দ্যাশের জন্য মন ক্যামন করলেই তখনকার বরিশাল এক্সপ্রেসে চাইপ্যা খুলনা হইয়া স্টিমারে ঝালকাঠি দিয়া দ্যাশের বাড়ি যাইতাম।’’
এক দিকে এই মায়াটান, অন্য দিকে বাড়িতে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, বড়ে গোলাম আলিদের আনাগোনা। জ্ঞানপ্রকাশের ডিক্সন লেনের বাড়িতে যাতায়াত, বেগম আখতার কলকাতায় এলেই হত্যে দেওয়া, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলি আকবর  খান, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর সংস্পর্শে আসা, সেতারবাদক নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুতা— সব মিলিয়ে সুরের রামধনুতে যাঁর চলাচল, তাঁর রঙের খেলা যে বহুগামী হবে এ আর বিচিত্র কী!
কাকা রত্নেশ্বরের ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু। কিশোর মানবেন্দ্রর কীর্তনে মুগ্ধ হয়ে নজরুল নিজে দু’টি গান শিখিয়ে দিয়েছিলেন— ‘সখী সাজায়ে রাখ লো পুষ্পবাসর’ আর ‘হে মাধব হে মাধব’।
সেই নজরুলকে এক সময় বাঙালি যেন ভুলতে বসল! এই বিস্মরণ ক্রমে অসহ্য হয়ে উঠছিল মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। ঠিক করেছিলেন যেখানেই অনুষ্ঠানে যাবেন, নজরুলের গান গাইবেন।
এ দিকে সবাই তখন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ফিল্মি গান, আধুনিক গান শুনতে চায়। পরের পর অনুষ্ঠানে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়েছেন। উঠে চলেও এসেছেন। তবু ছাড়েননি নজরুলের গান!
গ্রামাফোন কোম্পানিতে রেকর্ডিং অফিসার হয়ে এলেন সন্তোষকুমার সেনগুপ্ত। ডেকে পাঠালেন মানবেন্দ্রকে। নজরুলের প্রতি অবজ্ঞা তাঁকেও বিঁধছিল। ‘বেস্ট লভ সঙ্গস অব নজরুল’ এলপি করবেন তিনি। তাতে দুটি গান গাইলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়— ‘এত জল ও কাজল চোখে’ আর ‘বউ কথা কও’। এত বিক্রি হল যে কোম্পানি স্পেশাল ইপি করতে ডাকলেন। লেবেলে লেখা হল ‘নজরুল গীতি’। সেই প্রথম বার। আগে লেখা থাকত ‘সঙ্গস অব কাজী নজরুল’।
এর পর আবার ডাক। অত গান কোথায় পাবেন নজরুলের! বিস্তর গান লিখেছেন কবি, কিন্তু তার হদিশ কোথায়?
শেষ জীবনে নজরুল তখন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে মানবেন্দ্র এক জায়গায় বলেছিলেন, ‘‘৭১ সালে বঙ্গবন্ধু (মুজিবর রহমান) এলেন বাংলায়। সে বার ক্রিস্টোফার রোডে গাইতে গেলাম কবির জন্মদিনে। রাধাকান্ত নন্দীকে নিয়ে। সেজেগুজে বসে আছেন নীরব কবি। কী ট্র্যাজিক সেই নীরবতা! ‘কুহু কুহু কুহু কোয়েলিয়া’ দিয়ে শুরু করে কত গান গেয়েছিলাম। কবির দু’চোখে জলের ধারা। কোনও কথা নেই মুখে।’’
শেষমেশ ঈশ্বরের পাঠানো দূতের মতো মানবেন্দ্রর গানজীবনে এলেন বিমান মুখোপাধ্যায়। অসংখ্য নজরুলের গানের ভাঁড়ার নিয়ে। নজরুল ভুলে যাওয়া বাঙালিকে ধাক্কা দিয়ে হুঁশে ফেরালেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।

*****

কলেজবেলায় আদর্শ ছিলেন গায়ক-অভিনেতা রবীন মজুমদার। মজা করে কবুলও করতেন, ‘‘ওঁর দেখাদেখিই সরু গোঁফ রাখতে শুরু করি। পঞ্চাশের দশকে যখন রবীন মজুমদার পড়তির দিকে, কারা যেন বলেছিল, মানব, জায়গাটা খালি হলে কিন্তু তোর একটা চান্স হবে। সেই আশাতেই সাড়ে ৭৪-এ নামলাম। সেই প্রথম, সেই শেষ।’’
সিনেমায় আর অভিনয় করেননি। কিন্তু খুব শখ ছিল মিউজিক্যাল বায়োস্কোপে। সেই জন্যই বন্ধু শ্যামল গুপ্তকে নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ‘জলসাঘর’ কাহিনিটি কিনেছিলেন পাঁচশো টাকা দিয়ে। ছবি করবেন। সন্ধ্যা-বেলা প্রোডাকসন্স-এর ব্যানারে (বেলা ওঁর স্ত্রীর নাম)। সে আর কিছুতেই হয় না! হঠাৎ তারাশঙ্করের সঙ্গে কোনও এক অনুষ্ঠানে দেখা।
‘‘ছবির কী হল তোমার?’’
‘‘এখনও স্ক্রিপ্টই লেখা হয়নি। আমরা তো ও-লাইনের নই…।’’
‘‘আসলে মানিক কাহিনিটা চাইছিল। তো আমি তখন তোমাদের কথা বললাম।’’
মানিক, সত্যজিৎ রায় তখন ‘জলসাঘর’-এর জন্য ঝুঁকেছেন। এ কথা জানতে পেরে সাততাড়াতাড়ি বলে উঠেছিলেন, ‘‘না না না, এ তো অতি উত্তম কথা। আপনি ওঁকেই দিন।’’
জলসাঘর স্বপ্নই থেকে গেল।
৯২-এর জানুয়ারির ১৯-এ আচম্বিতে বাংলার জলসাঘরের ঝলমলে মানব-বাতিটা ঝুপ করে নিভে গেল।
তখন তিনি সবে একষট্টি!

ঋণ: মানসী মুখোপাধ্যায় (কন্যা)
ছবি: পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/special-write-up-about-veteran-singer-manabendra-mukhopadhyay-on-his-85th-birth-anniversary-1.188468?ref=archive-new-stry

গণনাট্য গাঁয়ের বধূ এবং (On Salil Chowdhury)

$image.name

গণনাট্য গাঁয়ের বধূ এবং

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:০০
2

মৃণাল সেন ও বাসু চট্টোপাধ্যায়ের মাঝে সলিল চৌধুরী

যাদবপুরে একটা কলেজের অনুষ্ঠানে বহু নামী শিল্পী এসেছেন। হাজির সলিলের গানের দলও। জলসায় শেষ শিল্পী হিসেবে গান গাওয়ার কথা ছিল পঙ্কজ মল্লিকের। তাঁর আগেই গাইবে সলিলের দল।
তত দিনে গড়চা রোডে গায়িকা গীতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে ‘গণনাট্য সংঘ’-র শাখা তৈরি হয়েছে। সেখানে তখন নক্ষত্র সমাবেশ। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবীর মজুমদার, অনল চট্টোপাধ্যায়…।
ওঁদের যেখানেই ডাক পড়ছে, গাইতে হচ্ছে, ‘মানব না বন্ধনে’, ‘ও মোদের দেশবাসী’…। লোকজন হইহই করে সে-গান শুনছেন। যাদবপুরে তেমনই এক অনুষ্ঠান।
পঙ্কজদা ডেকে পাঠালেন সলিলকে। অনুরোধ করলেন, ‘‘সলিল, আমি আগে মঞ্চে উঠব, তার পর তোমরা যদি গাও তো ভাল হয়। তোমাদের ওই সব হইচই গানের আগেই আমি গাইতে চাই।’’ সলিল এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।
কিন্তু তখনও সলিল খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁর সেই অধরা গান, যা তাঁকে রাতারাতি পৌঁছে দেবে শ্রোতাদের বসার ঘরে। এই খোঁজই ওঁকে এক দিন পৌঁছে দিল হেমন্তদার বাড়ি।
১৯৪৯ সালের পুজোয় এইচএমভি-র হয়ে ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ রেকর্ড করলেন হেমন্তদা। রেকর্ডিংয়ের দিনে সলিল স্টুডিয়োয় হাজির হতে পারেননি। তিনি তখন আন্ডারগ্রাউন্ড।
এর পর থেকে পুজো মানেই সলিল-হেমন্ত জুটির একের পর এক কালজয়ী গান।
সলিলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কবি সুকান্ত। দু’জনে হরিহর আত্মা। আমাদের প্রথম সন্তানের নামও রেখেছিলেন প্রয়াত বন্ধুর নামে। সুকান্তের কবিতায় সুর করার আগে কবিতাগুলো যে কত বার পড়তেন! বলতেন, ‘‘কবিতাকে যদি সুরে ছাপিয়ে যেতে না পারি, তা হলে আমার কৃতিত্বটা কোথায়?’’
কলকাতা থেকে মুম্বই যাওয়ার পথে একবার আমাদের প্লেন ঝড়ের মুখে পড়েছিল। টালমাটাল অবস্থা। ভয়ে বুক কাঁপছে ‘কী হবে, কী হবে’ ভেবে। পরে ঝড়ের সেই ভয়ঙ্কর অভি়জ্ঞতা থেকেই লিখেছিলেন, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পুজোর গানে সলিলই সুর করতেন। হেমন্তদার অ্যালবামের জন্য ও-সবই ছিল ‘ডিজাইনার’ গান। এইচএমভি-র নির্দেশে সলিলকে তাঁর সেরাটা সরিয়ে রাখতে হত হেমন্তদা বা লতাদির জন্য।
হেমন্তদার সঙ্গে ওঁর রসায়ন ছিল দেখবার মতো। যত গান তিনি হেমন্তদার জন্য তৈরি করেছেন—শ্যামলদা, দ্বিজেনদা বা মানবেন্দ্রর জন্য তাঁর অর্ধেকও নয়। কিন্তু ১৯৬৩ সালে সলিলের কথায়-সুরে বাঙালি শ্রোতারা পেয়েছিলেন দুটি অনবদ্য গান। একটি ‘দূর নয় বেশি দূর ওই সাজানো সাজানো বকুলবনের ধারে’। গেয়েছিলেন শ্যামলদা। আর দ্বিজেনদা গেয়েছিলেন ‘পল্লবিনী গো সঞ্চারিণী, মন না দিয়ে আর পারিনি’। দুটি গানই ফিরত শ্রোতাদের মুখে মুখে।
আর লতা মঙ্গেশকর? উনি বলতেন, ‘আমার সরস্বতী’। লতাদি একদিন বাংলা গান গাইতে চাইলেন। ১৯৫৯-এ লতাদির জন্য দুটি গান বাঁধলেন—‘না যেও না, রজনী এখনও বাকি’ আর ‘বাঁশি কেন গায়’। রেকর্ডের দু’পিঠে দুটি গান।
বাংলা আধুনিক গানে ওটাই ছিল লতাদির প্রথম রেকর্ড। এর পরে ২৪টি গান লতাদি গেয়েছেন ওঁর সুরে। গানে অসম্ভব সব কঠিন সুর বসালেও সে-গান তুলে নিতেন লতাদি। তবে যতক্ষণ না গানটি পুরোপুরি তুলে নিতে পারছেন, বাংলা উচ্চারণ প্রায় নির্ভুল ভাবে না করতে পারছেন, ততক্ষণ তিনি মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়াতেন না।
লতাদির মতোই খুঁতখুঁতে ছিলেন মান্নাদাও। গান নিয়ে তিনি কোনও  কম্প্রোমাইজ করতেন না। বলতেন, ‘‘দাঁড়ান সলিলবাবু, আর একটু বাকি আছে। যাবেন না।’’ গান শেষ হলে সলিলকে নিয়ে মান্নাদা ঢুকে পড়তেন কোনও একটি ঘরে। সলিলের ‘জোকস’-এর ভাঁড়ার ছিল অফুরন্ত। শুনতেন সে সব। আর ফেটে পড়তেন হাসিতে।
‘উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’র মতো গান সলিল তুলে রেখেছিলেন সন্ধ্যাদির জন্যই। সুরের ওঠাপড়ায় এমন গান বাংলায় খুব কমই হয়েছে। সন্ধ্যাদি মনে করতেন, তাঁর বাড়িতে সলিলকে ডেকে যদি কোনও ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া যায়, তবেই সলিল পারবে সেরা কোনও সুর সৃষ্টি করতে।  আমি বারবার বলতাম, ‘‘সন্ধ্যাদি, এমন করার কোনও কারণ নেই। সুর ওর মনে এসে গেলে দরজা খোলা বা বন্ধে কিছু এসে-যাবে না।’’ হয়েছিলও তাই।
‘উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’ সুপারডুপার হিট হয়ে যাওয়ার পরে দেখা হতেই বললাম, ‘‘কী, বলেছিলাম না, দরজা খোলা রাখলেও সলিল পারে।’’ সন্ধ্যাদি হেসে কুটিপাটি।
খুব হিট করেছিল বাংলায় আমার গাওয়া ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে’। মনে আছে, সে বার কলকাতায় পা দিয়েই সরাসরি চলে গিয়েছিলাম রেডিয়ো স্টেশনে। তখনও জানি না কার গান, কী গান। সলিল আমাকে চমকে দেবেন বলে আগে থেকে আমায় কিছু জানাননি।
রেডিয়োর ‘রম্যগীতি’ অনুষ্ঠানে গানটি গেয়েছিলাম। অনেক গান গেয়েছি রেডিয়োর জন্য। পরে সব রেকর্ড হয়। ‘সুরের এই ঝরঝর ঝরনা’—থ্রি পার্ট হারমনির ব্যবহারে দুরন্ত এই গানটিকে উনি এমন এক সুরে বাঁধলেন, যা আধুনিক বাংলা গানে এক কথায় অভূতপূর্ব। আর একটি কঠিন গান ছিল ‘কিনু গোয়ালার গলি’ ছবিতে। গোরখ কল্যাণ রাগে সুর আর তান। ‘দখিনা বাতাসে মন কেন কাঁদে’।
আজও জলসায় গেলে আমাকে সে-গান গাইতে হয়। 

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/gananatya-sangha-salil-chowdhury-pankaj-mullick-hmv-and-contemporary-kolkata-1.202761?ref=archive-new-stry

উজ্জ্বল এক ঝাঁক সলিল (On Salil Chowdhury)

উজ্জ্বল এক ঝাঁক সলিল

আজই তাঁর চলে যাওয়ার কুড়ি বছর। দুর্ভাগ্যের যে এখনও একাই রয়ে গেলেন! এক ঝাঁক আর হয়ে উঠলেন না সলিল চৌধুরী! দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে বসে তাঁর কথা বললেন স্ত্রী সবিতা চৌধুরী। শুনলেন কৃশানু ভট্টাচার্য

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:৪২

1

ছবি: তপন দাস

চোখ বন্ধ করলে এখনও যেন  সেই সুবাস ভেসে আসে!
বিয়ের পরে পরেই। বম্বেতে আমাদের পালি হিলের বাড়ি। প্রায়ই মাংস রাঁধতেন সলিল। চারপাশ ম ম করত সুগন্ধে।
গানবাজনার মতোই গুলে খেয়েছিলেন রান্নবান্নাও। উনি রাঁধছেন। আমি পাশে দাঁড়িয়ে। মুচকি হাসি তাঁর মুখে।
আর তখনই বলতেন, ‘‘ভাল রাঁধতে না-জানলে, ভাল সুরকার, ভাল গায়িকা হবে কী করে, ছুটি?’’ আমাকে ও-নামেই ডাকতেন। আর রান্না জানতাম না বলে প্রায়ই বলতেন এ কথা।
আমি কপট রাগ দেখিয়ে বলতাম, ‘‘জানি, জানি, আমাকে রান্নাঘরে ঢোকানোর এ তোমার ফন্দি। ঠিক আছে, আমিও রান্না শিখে দেখিয়ে দেব।’’
হাতে ধরে আমাকে যেমন গান শিখিয়েছেন, তেমন যত্ন নিয়েই শিখিয়েছিলেন রান্নাও। আমি ওঁর কাছে কী না শিখেছি!
রাঁধতে রাঁধতেই সুর ভাজতেন। সুর মাথায় এলে ঢ়ুকে পড়তেন বাথরুমে। সে অনেক ক্ষণ! আর তখনই জানতাম, বেরিয়েই  পিয়ানোর সামনে বসে পড়বেন। সুরটা এসে গিয়েছে মনে। ‘জিনিয়াস’ নয়, আমার স্বামী ছিলেন তারও বেশি কিছু। কেন সে কথায় আসছি।
এত বছর পরেও স্পষ্ট মনে আছে কিশোরদার সেই অবাক করা মুখ।
আমরা তখন বাসা বদল করে চলে এসেছি পেডার রোডে। সাজানো ফ্ল্যাট। সে-ফ্ল্যাটেই সক্কালবেলা এসে হাজির কিশোরকুমার। আমার কিশোরদা। সলিলই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ‘অন্নদাতা’ ছবির গান বেঁধেছেন। শোনাবেন বলে।
মুখ গম্ভীর করে সলিলের পাশের সোফায় বসলেন কিশোরদা। খুব মন দিয়ে সুর শুনতেন উনি।
সোফায় বসে সলিল হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শোনাচ্ছেন, ‘গুজর গয়ে দিন দিন দিন কি/ হর পল গিন গিন গিন/ কিসিকি হায় ইয়াদোঁ মে’।
শেষ লাইনটি শুনেই ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লেন কিশোরদা।।
‘‘কী হল, কী হল?’’ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন সলিল। তখনও মাটিতে থেবড়ে বসে কিশোরদা। মুখ নিচু। মাথা তুলে হাত জোড় করে বললেন, ‘‘আমাকে মাফ করুন সলিলদা, আপনার সমান উচ্চতায় বসে আমি এ গান শিখতে পারব না। কী সুর করেছেন!’’
এর পর বাকি সময়টা মাটিতে বসেই গান শিখেছিলেন কিশোরদা!

•••

শচীনকর্তার খুব আফসোস ছিল পঞ্চমকে নিয়ে। তার কারণটাও আবার সলিল।
পঞ্চম তখন কিশোর। অথচ সলিলের চলে যাওয়ার এত বছর পরেও একা বাড়িতে বসে যখন ভাবি, মনে হয় এই তো সে দিনের ঘটনা।
জোর কদমে চলছে ‘দো বিঘা জমিন’-এর গানের রেকর্ডিং। স্টুডিয়োয় এসেছেন শচীনকর্তা। তাঁকে দেখে সলিল তো বেজায় খুশি।
হঠাৎ বিমলদার সামনেই দুম করে একটি মন্তব্য করে বসলেন কর্তা। সলিলকে বললেন, ‘‘জানস, আমার সুর মনে ধরে না আমার পোলাডার। ও পাগল তর সুরে। বার বার শুইনতে থাকে তর গান। আমারে ও মানে না। পারিস তো এট্টু বোঝাস পঞ্চমরে।’’
ক্ষোভ ছিল কর্তার। কিন্তু ছে্লে পঞ্চম ছিল যাকে বলে সলিলের অন্ধ ভক্ত।
রেকর্ডিংয়ের সময়ে চলে আসত স্টুডিয়োয়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। রেকর্ডিংয়ের পরও ছাড় নেই। প্রশ্নের পর প্রশ্ন।  এমনই সলিল-জাদুতে মজে থাকত ও।
মনে পড়ে কত গল্প, কত কাহিনি। কত মানুষের ভালবাসার কথা। তাঁরা শুধু সলিলকে ভালবাসতেন তাঁর সুরের মায়াজালের জন্য।
সি রামচন্দ্রন। বিখ্যাত সুরকার। গাড়ি চালাতে চালাতে এক বার শুনতে পেলেন কোথায় যেন বাজছে ‘আজা রে পরদেশি’। অভিভূত তিনি!
অনেক খোঁজাখুঁজি করে সটান চলে গেলেন স্টুডিয়োয়। সলিলের সঙ্গে দেখা করতে। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‘দাদা, লতাকে এমন ভাবে ব্যবহার করেছেন, মনে হচ্ছে যেন ষোলো বছরের কোনও মেয়ের গলায় গান শুনছি।’’ 
সলিলকে ঘিরে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান সাহেবের ঘটনাটিও প্রায় একই রকম। এক সময় হাতের কাছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যাঁকেই দেখতেন উস্তাদজি, তাঁকেই অনুরোধ করতেন, ‘‘লেড়কা কো এক বার মেরে পাশ লা সকতে হো?’’
তখন ‘পরখ’ ছবির ‘ও সাজনা বরখা বহার আয়ি’ গানের সঙ্গে সেতার জুড়ে এমন এক সুর বেঁধেছিলেন সলিল, খুব মনে ধরেছিল উস্তাদজির। বারবার শুনবেন বলে রেকর্ডও কিনে ফেলেছিলেন।
তার পরই সেই খোঁজ। খান সাহেব তাঁকে খুঁজছেন শুনে সলিল নিজেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চলে যান।
সে ’৬০ সালের কথা। তার আগে, পঞ্চাশের দশক? বাঙালি শ্রোতা তত দিনে মন দিয়ে ফেলেছে সলিলে। এ দিকে সলিল চান মুম্বই যেতে।
এমনই এক সকালে বহু আকাঙ্খিত সেই টেলিফোন। ওপারে থাকা মানুষটি বললেন, ‘‘ঠিক আছে, চলে আসুন।’’ সেই মানুষটি আর কেউ নন, স্বয়ং বিমল রায়! বিমলদা।
ট্রেনে করে সোজা বম্বে। তার পর তো ইতিহাস। বিমলদার বাড়ি পৌছে গেলেন সলিল। কিন্তু সুরকার হিসেবে নয়। কলকাতায় এসে সলিলের লেখা  ‘রিক্সাওলা’ গল্পটি পড়ে খুব পছন্দ হয়েছিল বিমলদার। হিন্দিতে সেই কাহিনি নিয়ে হইহই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সলিলের সঙ্গে কথা বলে বিমলদা ঠিক করেন ছবির নাম হবে ‘দো বিঘা জমিন’। চিত্রনাট্যও লিখবেন সলিল। কিন্তু ওই ছবির সুরকার হিসেবে তখনও সলিলের কথা ভাবেননি তিনি। ভেবেছিলেন অনিল বিশ্বাসকে।
মাঝখান থেকে বাদ সেধে বসলেন সহকারী পরিচালক হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়। তিনি সলিলের অনেক দিনের বন্ধু। বললেন, ‘‘বিমলদা, এ ছবির কাহিনি, চিত্রনাট্য যখন সলিলের, তখন সুর করার দায়িত্ব ওকেই দিন না কেন?’’
এ কথা-সে কথার পর রাজি হয়ে গেলেন বিমলদা। সেই সুযোগ  পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিলেন সলিলও। সেই কাজের সূত্রেই মোহন স্টুডিয়োতে তাঁর সঙ্গে আলাপ হল মান্নাদা’র। তখনই মান্নাদার মনে হয়েছিল, এ ছেলে অনেক দূর যাবে!
কথা লিখলেন শৈলেন্দ্র। সুর সলিলের। হিট হয়ে গেল ‘দো বিঘা জমিন’-এর গান— ‘ধরতি কহে পুকার কে, বীজ বিছা লে প্যার কে, মৌসম বিতা যায়’ আর ‘হরিয়ালা সাবন ঢোল বজাতা আয়া’।
‘দো বিঘা জমিন’-এর সুর ভাসিয়ে দিল বম্বেকে। লোকের মুখে মুখে তখন ‘মৌসম বিতা যায় মৌসম বিতা যায়’। অলটাইম হিটের তালিকায় চলে গেল ‘দো বিঘা জমিন’। বদলে গেল হিন্দি ছবির গোটা আবহাওয়াটা।
এর পরে বিমলদা হাত দিলেন ‘মধুমতী’-তে। নায়ক দিলীপকুমার। তখন দিলীপসাবের যে-কোনও ছবির সুরকার-গীতিকার জুটি হিসেবে  কাজ করতেন নৌশাদ-শাকিল।
‘মধুমতী’র জন্যও এই জুটিকেই বেছে নিয়ে ছিলেন দিলীপকুমার। মুম্বইয়ে তখন নায়ক হিসেবে দিলীপকুমারই শেষ কথা। তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা মেনে চলতে হত পরিচালকদের।
কিন্তু বম্বে টকিজের কর্ণধার বিমলদার তখন যুক্তি, ‘‘আমার মনে হয়, ‘দো বিঘা জমিন’-এর সাফল্যের পরে আর একটি সুযোগ পাওয়া উচিত সলিল-শৈলেন্দ্র জুটির। আর ওদের কাজ যদি আমাদের পছন্দ না-হয়, তখন তো অল্টারনেট রইলই।’’
দিলীপকুমারকে দু’বার ভাবার সময় দেননি সলিল-শৈলেন্দ্র জুটি। তবে শুরুতে ‘আজা রে পরদেশি’র সুরটা বদলে দিতে বলেছিলেন।
সলিল  গিয়ে সে-কথা লতা মঙ্গেশকরকে জানালেন, ‘‘বিমলদা বলছেন সিচুয়েশন অনুযায়ী গানটা ঠিক যাচ্ছে না। কী করি?’’
শুনে রেগে আগুন লতাদি। বলে ওঠেন, ‘‘বিমলদা যদি এই গান নিয়ে অন্য কিছু করেন, তা হলে আমি আর এই প্রোডাকশনের জন্য গানই গাইব না।’’ এর পর মুচকি হেসে বিমল রায় বলেছিলেন, ‘‘চলো ঠিক আছে, লতা যখন বলছে, রেখেই দাও।’’
এর পরে আর থামানো যায়নি সলিলকে। ছবি রিলিজের সঙ্গে সঙ্গে গোটা ভারত মজে গিয়েছিল তাঁর সুরবাহারে।—  ‘আজা রে পরদেশি’, ‘চড় গয়ি পাপী বিছুয়া’, ‘দিল তড়প তড়প কে কহ রহা হ্যায় আ ভি জা’,  ঘড়ি ঘড়ি মেরা দিল ধড়কে, সুহানা সফর ঔর ইয়ে মৌসম হসিন’, ‘টুটে হুয়ে খয়াবোঁ নে’…।
রেডিয়ো সিলোনে আমিন সায়ানি তখন একটা অনুষ্ঠান করতেন। ‘বিনাকা গীতমালা’। সেখানেও ইতিহাস গড়ল ‘মধুমতী’। ওই জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে কখনও কোনও ছবির সব গান বাজানো হত না। সেই প্রথম বার শ্রোতাদের  দাবির কাছে হার মেনে পর পর সাত দিনই ‘মধুমতী’র সাতটি গান বাজল।
‘মধুমতী’র পরেই দিলীপসাবের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল সলিলের। বিমল রায়ের ‘মুসাফির’ ছবিতে দিলীপসাবকে দিয়ে গানও গাইয়েছিলেন তিনি।— ‘লাগি নাহি ছুঁতে রামা, চাহে জিয়া জায়ে’।

•••

‘দো বিঘা জমিন’-এর পরের কথা মনে পড়ছে। ‘নৌকরি’ ছবির জন্য সলিল ফোন করেছিলেন কিশোরদাকে। তিনিই ছিলেন এই ছবির নায়ক।
সলিল বলছিলেন, ‘‘সুর করেছি। তুই চলে আয় আমার বাড়ি।’’
শুনে কিশোরদা সলিলকে যা বলেছিলেন, আজও ভুলিনি।— ‘‘রাতে স্বপ্ন দেখলাম, তুমি আমাকে দিয়ে গান গাওয়াবে বলে ধরতে আসছ। আর আমি ছুটে পালাচ্ছি। পিছন পিছন তুমিও। আমি বলছি, আমাকে ছেড়ে দাও, তোমার ওই শক্ত সুরে আমি পারব না গান গাইতে। তুমি চিৎকার করে বলছ, পালাস না, সহজ করে সুর করেছি।’’ কথাটা শেষ করেই কিশোরদার সেই বিখ্যাত হাসি।
‘নৌকরি’ ছবির ‘ছোটা সা ঘর হোগা বাদলোঁ কি ছাও মে’ দারুণ হিট করল। আর ওখান থেকেই প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে বাড়ল কিশোরদার চাহিদা।
‘আনন্দ’ ছবি হবে। রাজেশ খন্নার লিপে ছবিতে ‘কহিঁ দূর জব দিন’ এবং ‘মৈনে তেরে লিয়ে হি সাত রং কে সপনে চুনে’— দু’টিই গেয়েছিলেন মুকেশজি।
‘ব্যাকগ্রাউন্ড সং’ হিসেবে সলিল প্রথমে রেখেছিলেন মান্নাদার গাওয়া ‘জিন্দেগি কৈসি হ্যায় পহেলি’-র গানটি।
এ দিকে এ গান শুনে রাজেশ খন্না  বলে উঠলেন, ‘‘এ কী! এমন অপূর্ব একটা গান ব্যাকগ্রাউন্ডে?’’
আবদার করে বসলেন, ‘‘আমি ছাড়ব না। এই গানটার লিপ আমিই দেব। সুরটা খুব টাচি।’’ তাই-ই হল।
এই গানের সঙ্গে  সলিল ব্যবহার করেছিলেন মিউটেড ট্রাম্পেট। এর আগে হিন্দি ছবির মিউজিকে আগে কোনও সুরকার এ ভাবে লো-টোনে ট্রাম্পেট ব্যবহার করেননি। এই ব্যবহারটাই গানটাকে অন্য একটা মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।
বহু কাল পরে কলকাতায় রাজেশ খন্নার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অনেক কথা হয়েছিল সে দিন। তার মাঝে উনি তুললেন ‘আনন্দ’-এর সেই পুরনো গল্পটা! আমি অবাক না হয়ে পারিনি। 

•••

সব গায়ককে সম্মান করতেন সলিল। সকলের প্রতি ছিল তাঁর  সমান মমতা। কিন্তু এক বার মুম্বইয়ের একটি ম্যাগাজিনে সলিলের মুখে এমন একটি কথা বসিয়ে দেওয়া হল, যাতে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি হতে পারত।
ওঁর চলে যাওয়ার ঠিক এক বছর আগের কথা।  ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ ছবির জন্য মুম্বই গিয়েছিলেন সলিল। তখনই ওই সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন এক বিখ্যাত সাংবাদিককে।
গায়ক হিসেবে ‘মধুমতী’ ছবির ‘টুটে হুয়ে খয়াবোঁ নে’ গানটি সম্পর্কে সলিল নাকি মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘ইটস নট মাই প্রাইড।’’ সাক্ষাৎকারে সলিলের বয়ানে এও রাখা হয় যে, রফিসাবের তুলনায় গায়ক হিসেবে তিনি নাকি এগিয়ে রাখেন মুকেশজি, মান্না দে-কে।— ডাহা মিথ্যা কথা। সলিল এ সব বলতেই পারেন না।
‘মায়া’ এবং ‘ছায়া’ ছবির গল্প এখনও আমার মধ্যে প্রবল। রফিসাবকে দিয়ে গান গাওয়ানো নিয়ে সলিলের ইনভলভমেন্ট কিছুতেই ভোলার নয়। চমৎকার দু’টি গান রেখেছিলেন সলিল ওঁর জন্য। কী অসাধারণ গেয়েওছিলেন রফিসাব!
আসলে কোন গান কাকে দিয়ে  গাওয়াবেন, কোন গায়কের কী রেঞ্জ, এ সব ছিল সলিলের নখদর্পণে। ‘টুটে হুয়ে খয়াবোঁ নে’ গজল টাইপের গান। যেমন ভাবে, যে-সুরে সলিল ওই গানটি রফিসাবকে গাইতে বলেছিলেন, তিনি ঠিক সেই ভাবেই গেয়েছিলেন।
এ গান তিনি কখনওই  মুকেশজি, কিশোরদা বা মান্নাদাকে দিয়ে গাওয়াতেন না। সলিলের সুরে বেশির ভাগ হিট গান গেয়েছেন মুকেশজি। কিন্তু তাঁরও সীমাবদ্ধতা ছিল। যেশুদাসেরও তাই। এই দুই গায়কের জন্য সলিল বি ফ্ল্যাট রেঞ্জ বেঁধে দিতেন। যাতে ওঁদের গায়কীতে কোনও অসুবিধে না হয়। এ সব ঘটনা না বুঝে, না জেনে দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে সলিলের মুখে যা-ইচ্ছে তাই কথা বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল! খুব অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন সলিল। কষ্টও পেয়েছিলেন খুব।

•••

‘অর্কেস্ট্রাইজেশন’ কথাটা বিদেশে খুব চালু। আমাদের এখানে তার প্রথম শুরু সলিলের হাতে। তার গোড়ার গল্পটা বলি।
‘দো বিঘা জমিন’ নিয়ে বিমলদা গিয়েছিলেন মস্কো ফিল্মোৎসবে। ডেলিগেট হিসেবে সলিলও তাঁর সঙ্গে।  রাজ কপূর গিয়েছিলেন ‘আওয়ারা’ ছবি নিয়ে।
সেখানে রাশিয়ার ‘কয়্যার’ দেখে তাক লেগে গিয়েছিল সলিলের। একশো, দু’শো শিল্পীর কোরাস!
ওখান থেকে ফিরে এসেই সলিল ‘বম্বে ইয়ুথ কয়্যার’ তৈরি করেন। তা নিয়ে হইচই পড়ে গেল বম্বেতে। উত্তেজনার পারদে ফুটতে থাকল শিল্পী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রোতারাও। সলিলের কয়্যারে হারমোনিয়াম বাজাতেন সুরকার অনিল বিশ্বাস। তবলায় রোশনজি। গানে লতা-মান্নাদা-মুকেশজি। সঙ্গে আমিও।
কয়্যারে গান গাওয়ার জন্য আমাকে ওঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের পারিবারিক বন্ধু অভিনেতা অসীমকুমার।
আমি তখন গান শিখি পণ্ডিত লক্ষ্ণণ প্রসাদ জয়পুরিয়ার কাছে। আমাদের বাড়িতে উনি এলেন আলাপ হওয়ার পরে। কয়্যারে আসতে বললেন। সেই শুরু হল সলিলের সুরে সুরে আমার গলা মেলানো।
‘৫৮ সালে কলকাতায় চারটি অনুষ্ঠান করেছিল ‘বম্বে ইয়ুথ কয়্যার’।  ঘোষণায় ছিলেন দিলীপকুমার। পরে সলিল তৈরি করলেন কলকাতা কয়্যার। সে’ও তো অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে গেল।

•••

সঙ্গীতের ব্যাকরণ গুলে খেয়েছিলেন সলিল। কেবলই বলতেন, ‘‘গ্রামার না-জানলে ভাল মিউজিক কম্পোজ করা যায় না।’’ গানের এই দখলদারির কারণেই সলিল গড়ে নিতে পেরেছিলেন নিজস্ব ঘরানা।
‘অ্যায় মেরে প্যায়ারে ওয়াতন’ গানটার কথা মনে পড়ছে। নিচু স্কেলে শুরু হওয়া মান্নাদার গাওয়া এই গান কখনই কি ভোলার? অথচ গানটা কী করে যে একজন কাবুলিওয়ালার লিপে বসিয়েছিলেন সলিল, আজও অবাক লাগে ভাবতে!
পর্দায় ছবিটি দেখলে কোত্থাও মনে হয় না, এ গান মানাচ্ছে না! বরং কাবুলিওয়ালার বেদনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি আমরা।
এক সময় রটে গিয়েছিল, এ গানের জন্য নাকি সলিল কাবুলিওয়ালার ডেরায় গিয়ে সুর খুঁজে বেড়াতেন। কোনও কোনও সাংবাদিকও  তাঁদের লেখা বইয়ে এমন কথা লিখেছেন। গল্পটা পুরো বানানো।
বাড়িতে মেয়ে অন্তরাকে গান শেখাচ্ছেন
সলিল বলতেন, ‘‘সঙ্গীতের ব্যাকরণ যে জানে, সেই পারে  ভাঙতে-গড়তে।’’ এ-গানও তারই ফসল।
‘ছায়া’ ছবিতে ‘ইতনা না মুঝসে তু প্যার বড়া’ গানটির কথাই ধরা যাক। সুরটি নেওয়া মোৎজার্টের সিম্ফনি থেকে। কিন্তু তাতেও ছিল সলিল-ঘরানার ছোঁয়া। নিজের মতো করে মোৎজার্টকে ভেঙে ভৈরবী ধাঁচের সুরে তালাত-লতার ডুয়েটে মাত হয়ে গিয়েছিলেন শ্রোতারা।
হিন্দি-বাংলা-সহ ভারতের চোদ্দোটি ভাষায় গান বেঁধেছিলেন  সলিল। দক্ষিণ ভারতে তাঁকে সবাই বলত ‘মিউজিক গড’।
এক বার হয়েছে কী, আমরা একটি মন্দির দর্শনে গিয়েছি। সেখানে আমাদের দু’জনের নামের আদ্যক্ষর ‘স’ শুনে স্থানীয় মানুষরা লাফিয়ে উঠলেন।
পুরাকালে নাকি ওখানে এমন দু’জন স্বামী-স্ত্রী গান গাইতেন, যাঁদের নামের আদ্যক্ষরও ছিল একই। ওদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, আমরাই সেই দম্পতি! 

•••

গান আর জীবন— সলিলের মধ্যে কোথায় যে মিলেমিশে ছিল, আজও বুঝে উঠতে পারিনি।
একটা ঘটনা বলি।
বম্বেতে স্টুডিয়ো যাওয়ার পথে এক জায়গায় জুতো পালিশ করাতেন সলিল। পালিশওলার ছেলে বসে থাকত তাঁর বাবার পাশে। তাঁর নাম ছিল পান্ডুরং।
একটা ভাঙা ম্যান্ডোলিন বাজাত পান্ডুরং। সলিল তার আগ্রহ দেখে তাকে নতুন একটা ম্যান্ডোলিন কিনে দিলেন। যত্ন করে তাকে শিখিয়েওছিলেন। শেষে তাকে  নিজের মিউজিক ইউনিটের সদস্যও করে নেন।
‘পরখ’ ছবিতে লতাদির  ‘মিলা হ্যায় কিসিকা ঝুমকা’ গানের সঙ্গে ওই পান্ডুরংই ম্যান্ডোলিন বাজিয়েছিল। ছেলেটি অকালে মারা যায়।
মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্টের প্রতি কারও কোনও আগ্রহ দেখলে যেন কেমন পাগল-পাগল হয়ে যেতেন উনি। মনে আছে, রাশিয়া থেকে ফেরার সময় এক বার সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের জন্য একটা অ্যাকোর্ডিয়ান কিনে নিয়ে এসেছিল।
মিউজিশিয়ানদের জন্য ওঁর যে কী দরদ ছিল, না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার নয়। বম্বেতে সুরকারদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘মিউজিক ডিরেক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন’। কোনও দিন নিজের জন্য তেমন করে ভাবেননি, কিন্তু অন্য সুরকারদের সঙ্গে প্রযোজকরা বেচাল কিছু করলে কিছুতেই ছাড়তেন না। 
এখন কলকাতায় যেখানে থাকি সেই ফ্ল্যাটের বুকিং ওঁরই করা। কিন্তু এক দিনের জন্যও এখানে তাঁর আসা হল না। বড় অকালে চলে গেল যে!
আজকাল ওঁর গান, ওঁর সুর, কম্পোজিশনই আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে। ছেলে সুকান্ত আর মেয়ে সঞ্চারী এ দেশে থাকে না। ছোট ছেলে সঞ্জয় মুম্বইতে। কাছে আছে শুধু অন্তরা। কিন্তু সেও তো ব্যস্ত।
আমি নিরালায় বসে বসে যখন সলিলের সুর করা গান শুনি, তখন কেবলই মনে হয়, আরেকটা সলিল চৌধুরী আর যেন কিছুতেই হওয়ার নয়! ওঁর চলে যাওয়ার পর নৌশাদসাব একটা কথা বলেছিলেন, জীবনের শেষ দিনেও সে কথা আমি ভুলব না। নৌশাদসাব বলেছিলেন ‘‘ফ্রম আওয়ার সেভেন নোটস, ওয়ান ইজ  নো মোর।’’
আমার জীবনে এর চেয়ে সত্যি কথা আর হয় না!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/special-write-up-and-memorabilia-on-salil-chowdhury-on-his-death-anniversary-1.202766?ref=archive-new-stry

Saturday, 10 June 2017

পায়রাটুঙ্গি বারেন্দ্রপাড়া কলেজ স্ট্রিট (On Dhananjay Bhattacharjee)

$image.name

পায়রাটুঙ্গি বারেন্দ্রপাড়া কলেজ স্ট্রিট

এক ভিক্ষুককে মানতেন প্রথম শিক্ষাগুরু! কেমন ছিল ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর শৈশব-কৈশোরের সেই সব দিন?

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:০০
3

ঠাকুর ঘরে

মা অন্নপূর্ণার কোলে সদ্যোজাত ধনঞ্জয়কে দেখে দাদামশাই বলেছিলেন, ‘‘জাতকের মুখাবয়বে অনেক সুলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। যদি বাঁচে, একদিন স্বনামধন্য কৃতী পুরুষ হবে।’’
১৯২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, রবিবার। হাওড়ার বারেন্দ্রপাড়ায় জন্ম ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের।
ভট্টাচার্য পরিবারের আদিবাস ছিল হাওড়ায়। ওঁরা ছিলেন পায়রাটুঙ্গির জমিদার। পূর্বপুরুষের প্রচুর সম্পত্তি বংশানুক্রমে পান ধনঞ্জয়ের বাবা সুরেন্দ্রনাথ। সম্পত্তি নিয়ে শুরু হয় জ্ঞাতি-কুটুম্বদের সঙ্গে অশান্তি। তাতে সুরেন্দ্রনাথ ওখানকার পাট গুটিয়ে চলে যান হাওড়ার আমতায়। ওঠেন ভাড়াবাড়িতে। বালির বাগানতলার বারেন্দ্রপাড়ায় জমি কেনেন।
সুরেন্দ্রনাথ চাকরি করতেন বিএনআর-এ। বড় ছেলে লক্ষ্মীকান্তও তাই। দু’জনেই এস্রাজ বাজাতেন। তাঁদের চোখ এড়িয়ে দুপুরবেলা এস্রাজে হাত পাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে যান ধনঞ্জয়। তখন বয়স কতই’বা, সবে পাঁচ। এস্রাজ গেল। কিন্তু গলা থাকতে গান নেবে কে? মাঝিমাল্লার গান, বাউল-বোষ্টমের গান, কীর্তন, পালার গান, তরজা, পাঁচালি যখন যা পেয়েছেন গলায় ধরেছেন। আর ছিল মা অন্নপূর্ণার মিঠে গলার ঘুমপাড়ানি, ছেলেভুলানো যত গান।
মাত্র চার মাসের তফাতে সুরেন্দ্রনাথ-লক্ষীকান্ত দু’জনেরই অকালমৃত্যু হয়।
অন্নপূর্ণার তখন জেরবার দশা। এগারোটি সন্তান। সম্বল বলতে বালির জমি। ধনঞ্জয় তখন সাত বছর। পান্নালাল সাত মাসের মাতৃগর্ভে। এক-এক দিন এমনও গেছে, ঘরে খাবার-আনাজপাতি বলতে কিছু নেই। মাঠঘাট থেকে গাছগাছালি কুড়িয়ে অন্নপূর্ণা ফুটিয়ে খেতে দিয়েছেন ছেলেমেয়েদের। নিজে সেই ফোটানো জলটুকু মুখে দিয়েছেন।
ধনঞ্জয় ছিলেন মা বলতে অজ্ঞান। মা একাদশী করবেন, উপোসি থাকবেন, তা’ও তার সয় না। ওই সাত বছর থেকে মায়ের সঙ্গে ছেলেরও একাদশী শুরু হল।
পড়াশুনো করতেন রিভার্স টমসন স্কুলে। পরে যার নাম হয় শান্তিরাম স্কুল।
মেধাবী। পরীক্ষায় বরাবর ফার্স্ট, না হয় সেকেন্ড। কিন্তু টাকাপয়সার তখন এমন টানাটানি, পড়া বন্ধ হয়ে যায় আরকী! মাস্টারমশাইদের মধ্যে খুব ভালবাসতেন সুধাংশু স্যার। তাঁর চেষ্টায় স্কুলের মাইনে মকুব হল। ম্যাট্রিক পরীক্ষা। তখন আবার ফি দেওয়ার পয়সা নেই। শিক্ষকরাই চাঁদা তুলে ধনঞ্জয়ের ফি দিয়ে দিলেন।
সুধাংশু স্যারেরই উদ্যোগে প্রথম গান শিখতে যাওয়া। স্যার সাইকেলে চাপিয়ে ছাত্রকে নিয়ে গান শেখাতে যেতেন উত্তরপাড়ায়।
এর পর একে একে ধনঞ্জয়ের গানজীবনে শিক্ষক হয়ে আসেন অনেকে।
কিন্তু গানের প্রথম গুরু কে, বললেই বলতেন, ‘‘বাড়ির সামনে গান গেয়ে ভিক্ষা করছিল এক ভিক্ষুক। ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। ওই আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। অনেক পরে ‘ক্ষুদিরাম’ ছবিতে গেয়েছিলাম ওই গান। অনেক প্রশংসা পেয়েছি। অর্থ পেয়েছি। কিন্তু গুরুকে আমার কিছুই দেওয়া হয়নি।’’
’৪৫ সালে ধনঞ্জয় বিয়ে করেন রেখাদেবীকে। শ্বশুরমশাইয়ের হোটেলের ব্যবসা। কলেজ স্ট্রিটের কাছে সেই হোটেল। এক সময় তারই দেখাশোনা করতে রেখাদেবীকে চলে আসতে হয় কলকাতা। সঙ্গে ধনঞ্জয়কেও।
’৪৮ থেকেই শুরু হয় ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর কলকাতা-জীবন।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/%E0%A6%AA-%E0%A7%9F%E0%A6%B0-%E0%A6%9F-%E0%A6%99-%E0%A6%97-%E0%A6%AC-%E0%A6%B0-%E0%A6%A8-%E0%A6%A6-%E0%A6%B0%E0%A6%AA-%E0%A6%A1-%E0%A6%95%E0%A6%B2-%E0%A6%9C-%E0%A6%B8-%E0%A6%9F-%E0%A6%B0-%E0%A6%9F-1.206095?ref=archive-new-stry

যদি ভুলে যাও মোরে… (On Dhananjay Bhattacharjee)

$image.name

যদি ভুলে যাও মোরে…

এত অভিমান যাঁর কণ্ঠে, তাঁর গান শুনে থমকে গিয়েছিল বনের হরিণও! বৃহস্পতিবার ছিল ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের জন্মদিন। লিখছেন দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ০০:০৩:০০
1
‘‘প্রধানমন্ত্রীর চিঠি না পেলে আমি গাইতে যাব না।’’
উদ্যোক্তাদের সটান বলে দিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের জন্য বিরাট অনুষ্ঠান। কলকাতায়।
বাংলার প্রায় সব নামী শিল্পী থাকবেন। সেখানে যেতে অমনই এক শর্ত দিয়ে বসলেন তিনি।
অনুষ্ঠান যখন প্রধানমন্ত্রীর নামে, তাঁকেই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠাতে হবে।
উদ্যোক্তাদের মাথায় হাত।
তখন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বলতে গেলে বাংলা গানের জগতে উল্কা। তাঁকে ছাড়া কোনও অনুষ্ঠান ভাবা যায় না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চিঠি? সেটা পাওয়াও তো দুঃসাধ্য ব্যাপার! উপায়?
খবর গেল মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। ধনঞ্জয়ের গানের ভক্ত তিনিও। দেখা হলেই বলতেন, ‘‘তোমার গয়াগঙ্গা প্রভাসাদি গানটা গাও তো।’’ শেষ জীবনে এক বার গাইতে ডেকে ছিলেন বাড়িতে। ছেলের অসুখের জন্য যেতে পারেননি ধনঞ্জয়। আর অদ্ভুত  ব্যাপার, সে দিনই খবর পান, ডা. বিধানচন্দ্র রায় আর নেই! এই আফশোস শেষ দিন পর্যন্ত ওঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
ধনঞ্জয় প্রধানমন্ত্রীর চিঠি চেয়েছেন শুনে বিধান রায় বললেন, ‘‘এ ছেলের গাট্স আছে! বাঙালির এই চরিত্রটারই বড় অভাব। ওকে বলো গান গাইতে। আমি জওহরলালের চিঠি আনিয়ে দেব।’’
তাই হয়েছিল। কথা রেখেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। গানও গেয়েছিলেন ধনঞ্জয়।

•••

জেদ। শক্তপোক্ত শিরদাঁড়া। সম্মানবোধ। জীবন জুড়ে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁর গানের মতোই এ সব যত্নে বয়ে বেড়িয়েছেন।
ওঁর সঙ্গে শচীনদেব বর্মনের হৃদ্যতার শুরু অনেকটা এই স্বভাবের কারণেই।
‘‘বাংলা গান গাইতাছ, দরদ নাই ক্যান? বাংলা গান গাইবার কায়দাই শিখো নাই।’’
প্রথম সাক্ষাতে শচীনকর্তার মুখে এমন কথা শুনে খুব ভেঙে পড়েছিলেন সদ্য যুবক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। ছোটবেলা থেকে তাঁকেই যে ধ্রুবতারা মানেন!
ডাক পেয়েছিলেন ‘জীবনসঙ্গিনী’ ছবির প্লে-ব্যাকের জন্য। সঙ্গীত পরিচালক হিমাংশু দত্ত।
টাইটেল মিউজিকে থাকবেন তিন জন— শচীনদেব বর্মন, সুপ্রভা সরকার (তখন ঘোষ)। সঙ্গে সতেরো বছরের তরুণ ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। শচীনদেব সে সময় খ্যাতির শীর্ষে। সুপ্রভাকে ডাকা হয় বাংলার ‘আশা ভোঁসলে’। 
তরুণ ছেলেটির গান পছন্দ হয়নি কর্তার। মুখের ওপর জানিয়ে দিয়েছিলেন। কষ্ট পেয়েছিলেন খুব।
এর আগে হিন্দুস্থান কোম্পানির অডিশন দিতে গিয়েছিলেন ধনঞ্জয়। কুন্দনলাল সায়গল আর কমল দাশগুপ্ত তাঁকে খারিজ করে দেন। কষ্ট তখনও পেয়েছিলেন। কিন্তু এ বারেরটা যেন পুরনো সব ক্ষতকে ছাপিয়ে গেল।
মনে মনে ঠিক করে নিলেন, এক দিন না এক দিন কর্তাকে মুগ্ধ করবেনই তিনি।
বছর কয়েক বাদের ঘটনা।
তত দিনে প্রথম বেসিক গানের রেকর্ড বেরিয়ে গেছে।— ‘‘যদি ভুলে যাও মোরে জানাবো না অভিমান।’’ সারা বাংলা ধন্য-ধন্য করছে।
সে সময়ই ইউনিভার্সিটি হলে গানের আসর। গাইবেন কর্তা। শিল্পী হিসেবে ধনঞ্জয়ও আছেন। তখনও তিনি কলকাতার বাসিন্দা নন। আসতেন বালি থেকে। কর্মকর্তারা বার বার অনুরোধ জানাচ্ছেন মঞ্চে উঠতে। তিনি কিছুতেই উঠবেন না। শচীনকর্তা না এলে গাইতেই বসবেন না। তাঁকে শোনানোর জন্যই তো ছুটে আসা।
রাত বাড়ছে। তাও কর্তার দেখা নেই। ফিরতে হবে বালিতে। বাড়িতে মা না খেয়েদেয়ে ছেলের অপেক্ষায় বসে থাকেন রোজ। ফলে আর দেরি করা চলে না। শেষে মঞ্চে উঠতেই হল।
চোখ বুজে সেই অতিপরিচিত ভঙ্গিতে গাইতে গাইতে এক সময় তন্ময় হয়ে পড়লেন।
হঠাৎ শোরগোল। একটু চাইতেই দেখেন দলবল নিয়ে কর্তা ঢুকছেন। সে দিন যে কী ভর করেছিল গলায়! রত্নভাঁড়ারের সব ক’টি দরজা খুলে যেন গাইতে বসেছিলেন ধনঞ্জয়।
মঞ্চের পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে গ্রিনরুমে যেতে গিয়ে শচীনদেব থমকে গেলেন।
পর পর ছ’টি গান গাইলেন ধনঞ্জয়। আর এই সময়টাতে সিঁড়ির কাঠের রেলিঙে হাত রেখে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কর্তা।
গান থামলে জড়িয়ে ধরলেন ধনঞ্জয়কে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘‘গলাডারে রাইখ্যো ধনঞ্জয়, গলাটারে রাইখ্যো।’’
এর পর শচীনকর্তার সঙ্গে এতটাই ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল যে, মুম্বই থেকে কলকাতায় এলে ধনঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা না করলে কর্তার চলত না।  
দু’জনেরই মাছ ধরার শখ। তার জন্য কোথায় না কোথায় চলে যেতেন ওঁরা। আর মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘‘বোম্বে চইল্যা আয় ধনা। পকেট ভইরা টাকা দিমু। অগো দ্যাখাইতে লাগে ভার্সেটাইল ভয়েস কারে কয়!’’ প্রতিবারই এক উত্তর, ‘‘বাংলা মায়ের আঁচল ছেড়ে পাদমেকং ন গচ্ছামি।’’

•••

একবারই যেতে হয়েছিল মুম্বই। তা’ও পাকেচক্রে। গাইতেও হয়েছিল। সে ’৫২ সালের কথা।
সুরকার রাইচাঁদ বড়াল তখন প্রকাশ পিকচার্সের হিন্দি ছবি ‘মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’র সুর করছেন। তখনই হঠাৎ তাঁর টেলিগ্রাম এল কলেজ স্ট্রিটে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সিসিল হোটেলের বাড়িতে।— ‘‘ধনু প্লিজ কাম।’’
প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়লেন। রাইচাঁদকে পিতৃবৎ শ্রদ্ধা করতেন। ভাবলেন, ‘‘নিশ্চয়ই কোনও বিপদ রাইদার।’’
সে দিনই রওনা দিলেন ট্রেনে।
গিয়ে শুনলেন আসল ব্যাপারটা! ছবিতে দুটি কীর্তনাঙ্গের গান আছে। ও দুটি গাইতে হবে। একটা একক। অন্যটা তিনজনে— মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে।
এ দিকে যে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বসে আছেন, ওখানে তিনি গাইবেন না! কিন্তু ‘রাইদা’-কে সে কথা বলবেন কী করে! শেষে অনেক কুণ্ঠা, দ্বিধা নিয়ে বলেই ফেললেন, ‘‘আমি গাইতে পারব না, রাইদা। আমায় ফিরিয়ে দিন কলকাতা।’’
‘ছোট্ট জি়জ্ঞাসা’র সময় স্টুডিয়োয় বিশ্বজিতের সঙ্গে
প্রাণপ্রিয় ধনঞ্জয়ের কাছ থেকে এমন প্রত্যাখ্যান স্বপ্নেও কল্পনা করেননি রাইচাঁদ।
রাগে, অভিমানে, কষ্টে বললেন, ‘‘বেশ, তাই হোক।’’ কিন্তু রাইচাঁদের চোখমুখের তখন যা অবস্থা হল!
দেখে নরম হলেন ধনঞ্জয়। বললেন, ‘‘ঠিক আছে, গাইছি। কিন্তু এই প্রথম, এই শেষ বার।’’
গেয়েছিলেন। গান তোলাতেও হয়েছিল লতা, আশা, মুকেশ, রফি, তালাত মামুদ আর গীতা দত্তকে। দু’মাস থাকতে হয়েছিল শুধু ওই কাজের জন্য।
সেই প্রথম, সেই শেষ।
এই সময় বালির বাড়ি থেকে স্ত্রী চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘ওঁরা যখন এত করে চাইছেন, তখন তো থেকে যেতে পারো বোম্বেতে।’’
উত্তর এসেছিল, ‘‘হ্যাঁ, থাকতেই পারি। অনেক টাকা পাব। অঢেল স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগ, বিলাস। রোজ গভীর রাতে বাড়ি ফিরব। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করব। এমন কি তুমি চাও? হ্যাঁ, কি না জানাও।’’
এর পর স্ত্রী পুরো পাতা জুড়ে বড় বড় অক্ষরে একটা শব্দই লিখে পাঠিয়েছিলেন—‘‘না।’’

•••

চল্লিশের দশকে মুম্বই যাওয়ার প্রথম অফার ছিল তখনকার বিখ্যাত প্রযোজক ‘কারদার প্রোডাকশন’ থেকে।
পাঁচশো টাকা মাসোহারা। সঙ্গে গাড়ি, বাড়ি সব কিছু। নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
এর পর একে একে কারা বলেননি যেতে! মহম্মদ রফি বলেছেন। সলিল চৌধুরীকে দিয়ে লতা মঙ্গেশকর অনুরোধ পাঠিয়েছেন, ‘‘উনকো লে আইয়ে না দাদা।’ সামনাসামনি দেখা হলেও বলেছেন বারবার।
কারও কথায় কর্ণপাত করেননি।
সলিল নিজে বহুবার বলেছেন। তাতেও না। সলিল চৌধুরী এক জায়গায় লিখছেন, ‘‘তিন দশক ধরে বোম্বাই প্রবাসী থেকে তখন যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন। এক দিন ধনাদা বললেন, আমাকে দু’খানা গান করে দিতে হবে। আমি ধন্য হলাম। দু’খানা গান দু’জাতের করব, তখন থেকেই মাথায় ছিল। একটা হবে রাগাশ্রয়ী। অন্যটা কাব্যগীতি। তাঁর অসাধারণ কণ্ঠগুণে এবং রসবোধে গান দুটি যেন নতুন জন্ম পেল— ‘ঝনন ঝনন বাজে’, ‘অন্তবিহীন এই অন্ধরাতের শেষ’।’’
সলিল বলতেন, ‘‘ধনুদা মহম্মদ রফি, তালাত মামুদের সমান, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বড়। তা সত্ত্বেও মানুষটা নিজেকে নির্বাসিত করে রাখলেন বাংলায়। আর বাংলা ওঁকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারল না।’’
যাটের দশকে হঠাৎ এক দিন বম্বে থেকে রাহুলদেব ফোন করে বসলেন, ‘‘বাবার চারটে গান পুজোয় করব। তুমি কিন্তু না করতে পারবে না।’’
রাহুলকে তিনি সে দিন চিনলেন, এমন নয়। ছোট্ট পঞ্চম এক গাদা মাদুলি পরে বাবার হাত ধরে যখন বাড়িতে আসত, তখন থেকে তিনি তাঁর বড় সোহাগের। সম্পর্কটা এত দিনের! এত নৈকট্যের!
তবু সেই পঞ্চমের আব্দারেও একই কথা।— ‘‘বম্বে যেতে পারব না কিন্তু। এইচএমভি স্টুডিয়োতে কর। আমি আছি।’’
‘‘আচ্ছা, ঠিক আছে। ভালই হবে। যে ক’দিন রেকর্ডিং চলবে, তোমার হাতের রান্না খেতে পারব।’’
জবরদস্ত রান্না করতেন ধনঞ্জয়। মটন কষা, সরষে ইলিশ, পুঁই শাক-কাঁকড়া থেকে চিঁড়ের পোলাও, চিতল মাছ।
সে কালে সঙ্গীত মহলের প্রায় সব্বাই সে সবের স্বাদ পেয়েছেন। 
ব্যস্ততার দরুন সে বার আর কলকাতায় আসা হয়নি রাহুলদেবের। ফলে রেকর্ডিংও হয়নি। রাহুলদেব-ধনঞ্জয় যুগলবন্দি অধরা স্বপ্ন হয়েই থেকে গেছে।

•••

মুম্বই যেতে চাননি।
কিন্তু বাংলায়?
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গানের মালঞ্চে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুল ফুটেছে। তার মোহে কে না কে মুগ্ধ হয়েছেন!
তা’ও সে কোন কাল থেকে!
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দিয়ে শুরু।
স্কুলবেলার ঘটনা।
পড়তেন বালির রিভার্স টমসন স্কুলে। ক্লাসে টিফিনের সময় বন্ধুদের চাপাচাপিতে গান করতে হত।
এক দিন গাইছেন কৃষ্ণচন্দ্র দে’র বিখ্যাত গান ‘স্বপন যদি মধুর এমন’। সেই গানের রেশ পৌঁছল মাস্টারমশাইদের কানে। এর পর থেকে তাঁরাই উদ্যোগ নিয়ে এক-দু’ জায়গায় ধনঞ্জয়কে গাইবার ব্যবস্থা করে দিতে থাকলেন।
দেখতে দেখতে স্কুলেরই বার্ষিক অনুষ্ঠান। একক গাইলেন ছোট্ট ধনঞ্জয়— ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’ আর ‘ভাইয়ের দোরে ভাই কেঁদে যায়’। দর্শকের আসনে বসে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র উচ্ছ্বসিত। গান শেষে আসন ছেড়ে উঠে এসে আশীর্বাদ করলেন গায়ক-বালককে। হাতে দিলেন পাঁচ টাকার একখানি নোট।
এর পরে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু এই আশীর্বাদকে আমৃত্যু জীবনের শ্রেষ্ঠ বলে মেনেছেন।
মধ্য কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে বিলায়েৎ খানের মুখোমুখি
পঙ্কজ মল্লিক। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ছবির কাজ চলছে। সুরকার তিনিই। নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার বিএন সরকারের ডাক পেলেন ধনঞ্জয়। গান তুলে দিচ্ছিলেন সহকারী সঙ্গীত পরিচালক বীরেন বল। ধনঞ্জয়ের অনুরোধে গানটি বার কয়েক গেয়ে শোনালেন পঙ্কজকুমার মল্লিক স্বয়ং।
রেকর্ডিং হল। পূর্ণ সিনেমা হলে কোম্পানির কর্তাদের উপস্থিতিতে সেই রেকর্ড বাজানোও হল। গান শুনে স্তম্ভিত পঙ্কজ মল্লিক—‘‘এ কী! এ যে হুবহু আমারই গলা!’’
দিলীপকুমার রায়েরও ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। ‘মাথুর’ ছবির রেকর্ডিং। এমপি স্টুডিয়োয়। সঙ্গীত পরিচালক দিলীপকুমার রায় তখন কলকাতায় ছিলেন না। পণ্ডিচেরি গিয়েছিলেন। তাঁর সহকারী গান তুলিয়ে দিলেন। সেই রেকর্ড শুনে চমকে উঠেছিলেন সঙ্গীতসাধক দিলীপকুমার। এ যে একেবারে তাঁর নিজস্ব গায়কি!
কাননদেবী। তাঁরই নিজস্ব কোম্পানি ‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এর প্রায় সব ছবিতেই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গান। সে বার ‘মেজদিদি’ ছবির গানের রেকর্ডিং। ‘জনম মরণ পা ফেলা আর’।
ফ্লোরে ঢুকলেন কাননদেবী। কালীপদ সেন সঙ্গীত পরিচালক। রেকর্ডিং হল। কালীপদবাবু বললেন, ‘‘সব ঠিক আছে তো দিদি?’’
কাননদেবী কিছু বলছেন না। স্কোরিং-এ বসে থেকে থেকে ধনঞ্জয়ও উঠে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কোনও অসুবিধে হল কি?’’
জীবনে এই মানুষটিকে রি-টেক দিতে হয়নি। যাঁর গান শুনে একবার সুরকার সুবল দাশগুপ্ত বলেছিলেন, ‘‘যে দিন তোমাকে একটা গান রেকর্ডিং করতে দ্বিতীয় বার গাইতে হচ্ছে দেখবে, জানবে শেষ হয়ে গেছো।’’ সেই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে সে দিন কাননদেবী বললেন, ‘‘আরেক বার যদি গাওয়া যেত…।’’
কোনও কথা না বলে দ্বিতীয় বার গাইলেন তিনি। শুনে কাননদেবী যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
বললেন, ‘‘আগের বারও ভাল হয়েছিল। ভাবলাম, যদি দ্বিতীয় বারে উনিশ-বিশ আরও ভাল হয়। কোথায় কী! এ বারেও এক্কেবারে এক।’’
 শুধু আধুনিক জগতের মানুষজন নন, ধ্রুপদী শিল্পীরাও একসময় ছিলেন ধনঞ্জয়ের একনিষ্ঠ ভক্ত।
পণ্ডিত রবিশঙ্কর একবার কলকাতায় এলেন। খিদিরপুরের সন্ধের জলসা। উনি আছেন। উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি আছেন। উস্তাদ আল্লারাখাও।
অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে রবিশঙ্করের সঙ্গে দেখা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর। পণ্ডিতজি বলেছিলেন, ‘‘আমি আপনার গানের খুব ভক্ত, জানেন!’’
ওঁর গায়কি, ওঁর মার্গ সঙ্গীতের অনায়াস যাতায়াতে মুগ্ধ ছিলেন অনেকেই। চিন্ময় লাহিড়ী, এ কানন দেখা হলেই বলতেন, ‘‘তোমাকে দেখে আমাদের খুব রাগ হয়। কেন যে তুমি আমাদের ছেড়ে আধুনিকে গেলে!’’
উস্তাদ বিলায়েৎ খানের সঙ্গে তো সেই কত কালের বন্ধুত্ব। বিলায়েতকে যখন ওঁর বাবা কলকাতায় রেখে গেলেন, তখন থেকেই ওঁর কাছে যাতায়াত। কলকাতার জলসায় বিলায়েৎ খান বাজাচ্ছেন, আর দর্শক-আসনে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য নেই, এ ছিল বড়ই বিরল দৃশ্য। 
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর ধ্রুপদের ওপর দখল যে কী প্রচণ্ড অনায়াস ছিল!
‘তানসেন’ ছবি তৈরির সময়কার গল্প। সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়। ধামারে একটি গান বাঁধলেন তিনি।
পণ্ডিত ভীমসেন যোশীকে ডেকেও গাওয়ানো হল। পছন্দ হল না রবীনবাবুর। বিষ্ণুপুর ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী রমেশ বন্দ্যোপাধ্যায় গাইলেন। তাতেও হল না।
এ বার ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর ডাক। দিন কয়েকের অনুশীলন। তার পর রেকর্ডিং। গান শুনে ধনঞ্জয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন সুরকার।
রাগরাগিণীর মধ্যে কোনটি প্রিয়, জানতে চাইলে বলতেন, ‘‘ভৈরবী।’’
নিজের ধ্রুপদ গান নিয়ে একটি অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছিলেন এক বার। — ‘‘সুন্দরবনে শিকারি বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছি। জ্যোৎস্না রাতে দরবারী কানাড়ায় গান ধরেছি। নৌকোর সামনে হরিণের দল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা জানে এটা শিকারিদের নৌকো। এখনই গুলি আসতে পারে। তবু তারা গান শুনে দাঁড়িয়েছিল, না দাঁড়িয়ে পারেনি বলে। আমি বন্ধুদের অনুরোধ করলাম অন্তত সে রাতে যেন কোনও পশু বধ না করা হয়। মনটা এমনই অভিভূত হয়েছিল।’’

•••

এক সময় বাংলা গানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর বলা হত জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যকে।
তিন জনের বন্ধুত্বও ছিল দেখার মতো। একসঙ্গে ওঁরা জলসায় গেলে এতই গল্পে মশগুল থাকতেন, স্টেজে তোলাই তখন দায়।
এমনই এক বার কর্তাব্যক্তিরা বেশি জোরাজুরি করাতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলে দিয়েছিলেন, ‘‘শুনুন, আপনাদের কোনও চিন্তা করতে হবে না। যাঁরা গান শুনতে এসেছেন, তাঁরা আমাদের গান না শুনে যাবেন না। আমাদের আরেকটু না হয় আড্ডা দিতে দিন।’’
নাতনির জন্মদিনে তাকে গান শেখাতে বসে
বন্ধুত্ব ওঁদের যাই-ই থাক, ভক্তদের মধ্যে ভাগাভাগি ছিল। কিন্তু ঘুণাক্ষরে তার রেশ কোনও দিন তাঁদের সম্পর্কে আঁচড়টুকুও ফেলতে পারেনি।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখেছেন, ‘‘যদি কেউ চাটুকারি প্রবৃত্তি নিয়ে ওঁকে (ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য) বলতেন, আপনার ‘যদি ভুলে যাও মোরে’ কিংবা ‘রাধে ভুল করে তুই’ গানটা কি হেমন্ত গাইতে পারতেন? ভীষণ রেগে চেঁচিয়ে বলতেন, ‘কথা কয়ো নাকো শুধু শোনো’ কিংবা ‘কিৎনা দুখ ভুলায়ে’ও আমি গাইতে পারব না। হেমন্তবাবু হেমন্তবাবুই।’’
এত শ্রদ্ধা! এতটাই মুগ্ধতা!
বারবার বলতেন, গানের জন্য জীবনে দু’জনকে ঈর্ষা করে থাকেন, তাঁদের একজন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। দ্বিতীয় জন তাঁর ছোট ভাই পান্নালাল।
ভাই ছিল যেন বুকের পাঁজর! পান্নালাল যখন সাত মাসের মাতৃগর্ভে, তখন ওঁদের বাবা সুরেন্দ্রনাথ মারা যান। আজন্ম ভাইকে আগলে বেড়িয়েছেন তাঁর মেজদা ধনঞ্জয়। তাঁকে এইচএমভি-তে নিয়ে যাওয়া, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম দেওয়ানো, বড় ভাই প্রফুল্ল ভট্টাচার্যকে দিয়ে মেগাফোনের জেএন ঘোযের কাছে পাঠানো…।
ধনঞ্জয় বুঝেছিলেন, পঞ্চাশের দশকে কে মল্লিক, ভবানী দাস কী মৃণালকান্তি ঘোযের পর ভক্তিগীতিতে একটা ভাটা এসেছে। সেখানেই তাঁর ভাই পানু কিছু করতে পারবে। যে জন্য নিজে পরের পর ছবিতে অসংখ্য হিট গান গাওয়ার পর, হাজার অনুরোধেও ভক্তিগীতি গাইতে চাইতেন না। —‘‘ওটা পানুর জায়গা। আমার নয়।’’ যা কিছু ভক্তিগীতি গেয়েছেন, সব ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর।
উল্টো দিকে ভাই?
দাদা বলতে অজ্ঞান। তার প্রকাশ যে কী তীব্র ছিল, তা নিয়ে বড়সড় উপন্যাস লেখা যায়। এক টুকরো বলা যেতে পারে।
’৬৬ সাল। পান্নালাল রেকর্ড করলেন ‘অপার সংসার, নাহি পারাপার’।
বাড়িতে ফিরলে স্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘‘কেমন গাইল পানু?’’
বললেন, ‘‘বাঁদরটার কাছে যা চেয়েছিলাম, তার ষাট ভাগ পেলাম।’’
শুনে পান্নালাল বলেছিলেন, ‘‘শোনো মেজদা, তুমি যেটা চেয়েছিলে, সেটা যদি পেতে, তা হলে আমি হতাম ধনঞ্জয়, তুমি হতে পান্না।’’
সেই পান্না এক দিন বুক খালি করে চলে গেল চিরদিনের জন্য। সন্তানহারা পিতার মতো দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল জীবনটা। আস্ত একটা মহীরুহ প্রলয় ঝড়ে নুয়ে পড়ল যেন!
তাও ঘুরে দাঁড়লেন। ’৮৭-র জানুয়ারিতে আবার ধাক্কা। স্ত্রী রেখাদেবী চলে গেলেন। এ বার শুধু অবসাদ আর অবসাদ। হারমোনিয়াম একলা পড়ে থাকে। তানপুরায় ধুলো জমে। কেবল ছাত্রছাত্রী এলে গান। আর ক্কচিৎকদাচিৎ জলসায় যান। বাকি সময়ের বেশিটাই কাটে ঠাকুরঘরে।— ‘‘এ মাটি ছিনিয়ে নিতে কত বার ঝড় এসেছে/ এ মাটি ভাসিয়ে দিতে কত বার বান ডেকেছে…।’’
তিন ছেলে, পুত্রবধূ কঙ্কনা, নাতনি দীপাঙ্কনাকে নিয়ে ভরাট সংসার। তবু ভিড়ের মধ্যেও তিনি যেন একা। নিঃসঙ্গ। খাঁ খাঁ করা প্রান্তরে একমাত্র মরূদ্যান পেতেন ওই নাতনিকে কাছে পেলে। এক এক সময় বিছানা নিতেন। শিয়রে বসে সেবা করতেন পুত্রবধূ। অস্ফুটে বলতেন, ‘‘আর জন্মে তুমি বোধ হয় আমার মা ছিলে গো!’’ 
’৯২-এর মার্চে শ্রীরামপুর গেলেন এক ভক্তিমূলক গানের আসরে। সেই শেষ বার। ডায়াবেটিক নেপ্রোপ্যাথি ওঁকে কুরে কুরে খেয়ে নিচ্ছিল।
১৮ ডিসেম্বর শেষ বারের মতো কলেজ স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে ভর্তি হলেন উত্তর কলকাতার এক নার্সিংহোমে।
আর ফেরা হল না। ডিসেম্বরের ২৭ নিভে গেল বাংলা গানের ধনঞ্জয়-শিখা!
মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে/ এ মাটির গান গেয়ে ভাই জীবন কেটেছে/আকাশের অঝোর ধারে বনানীর শ্যামল ভারে/ অরুণের সোনার রঙে আমার মাটি আজ সেজেছে…
নিথর কলকাতা নতজানু হল ওঁর শেষযাত্রায়!

ঋণ: দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, অনন্য ধনঞ্জয় (নিতাই মুখোপাধ্যায়)

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/a-memorabilia-on-veteran-singer-dhanajoy-bhattacharya-on-his-birth-anniversary-1.206104?ref=archive-new-stry