Sunday, 31 July 2016

উত্তমকুমারের সঙ্গে মন কষাকষি হয়ে যায় বাঞ্ছারাম করতে গিয়ে ( Interview of Dipankar Dey)

$image.name

উত্তমকুমারের সঙ্গে মন কষাকষি হয়ে যায় বাঞ্ছারাম করতে গিয়ে

গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সুপ্রিয়া চৌধুরীর সঙ্গে। এক সন্ধের বিবাদে ভেঙ্গে যায় অপর্ণা সেনের সঙ্গে দীর্ঘ বন্ধুতা। আড্ডায় ক্ষোভ, অভিমান, হতাশার কথায় বিস্ফোরক দীপঙ্কর দে। সামনে শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

১২ মার্চ , ২০১৬, ০০:০০:০০
dipankar dey

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।

শহরের ঘ্যাম গল্ফ ক্লাবের অনেক দিনের সদস্য।
অথচ হালফিল মাসে এক-আধবার গিয়ে সকাল-দুপুরে বসা হয়। সামনে বিয়ার, স্যান্ডুইচ আর ঠোঁটে শত চেষ্টাতেও ছাড়তে না-পারা সিগারেট নিয়ে।
বয়-বেয়ারা ছুটে আসতেই থাকে, ‘বলুন স্যার, বলুন স্যার’ করে। তবে তাতে ওঁর একলার মেজাজ ‘ছুট’ হয় না।
দিনের পর দিন টানা শ্যুটিঙের পর এটা ওঁর কষ্টার্জিত একলা-সময়।
নিঃসঙ্গ মানুষেরও কি খুব একলা হওয়ার সময় আছে আজকাল? জীবনটা কী ভাবে উঠল, পড়ল, কাটল, ভাবার? একটু মৃত্যুভাবনা করার?
কিংবা যাকে বলে নিজেকে দেখার?
টিটো, মানে দীপঙ্কর দে-কে একটা মেদুর দুপুরে এমনই এক আনমনে গল্ফ-দেখা মেজাজে পেয়ে প্রশ্নটা এসেই গেল, ‘‘অ্যাদ্দুর এসে কী মনে হয়— সিনেমায় ঢোকাটা ভুল হয়েছিল?’’
কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন, তার পর বললেন, ‘‘একেক সময় মনে হয়, হ্যাঁ।’’
কেন হ্যাঁ, এটা বোঝাতে হলে ওঁকে একটু জীবনের কথাও বলতে হয়। বললেন, ‘‘ভাল ছাত্র ছিলাম কিন্তু। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল আর প্রেসিডেন্সির ছাত্র। অনার্স ছিল ইকনমিক্স-এ। এমএ পড়েও পরীক্ষায় বসতে পারলাম না, রুজির খোঁজে বেরোতে হল বলে।’’
যে-মানুষটা একটু আগেই বলছিলেন, ‘ইস্কুলের জীবনটাই সেরা সময় গেছে আমার’, তিনিই আবার বললেন, ‘‘অভাবের মধ্যে জীবনটা কাটছিল মামাবাড়িতে। বড় হচ্ছিলাম অঢেল আদরে। কিন্তু অভাব তো লেগেই ছিল সংসারে। আরসিপিআই, পাল্লালাল দাশগুপ্ত, এ সব নিয়ে রাজনীতি করা পরিবার, রাজনীতির কোর্টকাছারিতেই বয়ে যাচ্ছে সব টাকা।’’
দোলনের পাশে
অতএব ইস্কুলে থাকতে দুটো শার্ট, দুটো প্যান্টেই বছর কেটেছে। বিকেলে জলখাবার জুটেছে দুটো বিস্কুট। তাতেও মুখের হাসি, মনের খুশিতে টান পড়েনি।
কেবল ভেতরে ভেতরে একটাই হাহাকার। বাবার সঙ্গে দেখা নেই; তিনি ইঞ্জিনিয়ার, কর্মরত জামশেদপুরে। আর মা? তিনি তো আরও দূরে, কর্মরতা ইংলন্ডে।
মা দেশে ফিরলেন যখন টিটোর বয়স তখন দশ, আর তার মাত্র আট বছর পর সংসারেরও মায়া ছেড়ে চলে গেলেন।
বহু দিন পর ‘আত্মীয়স্বজন’ ছবিতে পরিণত বয়েসের দীপঙ্কর এই ব্যাখ্যাটাকে তুলে এনেছেন একটা মর্মান্তিক দৃশ্যে। ছবির সেই চরিত্র সদ্য মা’কে দাহ করে এসে ধড়া পরে মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে।
শিল্প তখন নকল করছে জীবনকে!
পড়া ছেড়ে কাজ ধরতে আক্ষরিক অর্থে হিল্লিদিল্লি করতে হয়েছে দীপঙ্করকে। কাজ বলতে রানিগঞ্জ থেকে ট্রাকে চড়িয়ে কয়লা আনার ব্যবসা। বলা বাহুল্য, বেশি দিন পারা যায়নি।
তখন ধরতে হল, লরিওয়ালাদের ‘তেরপল’ বেচার ব্যবসা। সেও টানা যায়নি বেশি দূরে। শেষে সেলসম্যানের চাকরি নিয়ে দিল্লি পাড়ি দিতে হল। প্রথমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিংক, পরে ওভালটিন-এ।
সেখানেই আলাপ বান্টির সঙ্গে, যে-খ্রিস্টান বান্ধবীকে কলকাতায় এনে বিয়েও করা হল, ১৯৬৯-এ। দিল্লিতে চাকরি করতে গিয়ে উপার্জন বলতে ওই বিয়েটাই।
ফের কলকাতা, ফের চাকরির খোঁজ। কিন্তু কোথায় চাকরি?
উগ্র আন্দোলন আর খাড়াখাড়িতে ধুঁকছে শহর, ধুঁকছে গ্রাম। তখন মুশকিল আসান হয়ে দেখা দিলেন এমন এক জন, যিনি সচরাচর ত্রাণকর্তা হতেন পণ্ডিত, গবেষক, লেখককুলের। যার যেখানে তথ্য বা তত্ত্ব নিয়ে আটকাচ্ছে ফোন যাচ্ছে ওই রক্তমাংসের সিধুজ্যাঠার কাছে। দ্য ওয়ান অ্যান্ড ওনলি শাঁটুলবাবু, মানে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত।
শাঁটুলবাবুর কথায় আর নিজের হাজিরায় চাকরি হয়ে গেল নামজাদা গ্রান্ট অ্যাডভার্টাইজিং-এ।
আর দেখতে দেখতে সিনেমায় আসার বেগ, নাকি উদ্বেগও তৈরি হল। পড়াশুনো করা ছিমছাম, সুদর্শন ছোকরা সে-সময় শহরজীবন ও শহুরে সমস্যা নিয়ে পর-পর ছবি-করা সত্যজিৎ রায়ের নজরে না পড়ে পারে? পড়লও।
‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে রোল পেলেন দীপঙ্কর। পরে ‘জনঅরণ্য’-য়। আড়ে থেকেই অভিনয়। তবু সত্যজিৎ রায়ের ছবি। কেন্দ্রের কাছাকাছি আসতে সময় লেগেছে লম্বা। মানিকবাবুর জীবনে শেষ ছবি ‘শাখাপ্রশাখা’।
সে অন্য গল্প।
আবহমান
দুপুরে বিয়ার নিয়ে গল্ফের লিংক ঘেঁষে বসা বাহাত্তর বছরের দীপঙ্করকে নিয়ে জেন-এক্স বা জেন ওয়াই পাঠক সম্প্রদায়ের কৌতূহল কি হতে পারে?
এমনিতে তো পেজ থ্রি বা পেজ সিক্স-এ খবর বা ছবি ওঠানোর কোনওই বাসনা নেই ওঁর। অথচ ‘নিয়তিই আমাকে নিয়ে গেছে সিনেমায়’ বলেন যিনি, তিনিই এক কালে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তুখড় ‘লেডিজ ম্যান’ বলে চিহ্নিত ছিলেন।
হুড়ুমদুড়ুম  অ্যাফেয়ার চ়ড়ানো নয়। রীতিমতো স্টেডি রিলেশনশিপেই অভ্যস্ত ছিলেন।
বললেন, ‘‘অসম্ভব ভালবাসা পেয়েছি, জানেন। ভালবাসা দিয়েছি বলেই, হয়তো। বলুন, কী জানতে চান বলুন?’’
—বান্টির সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হল কেন?
—এক কথায় বলি? ইনকম্প্যাটিবিলিটি। মনের মিল ছিল না।
—সেটা কি সিনেমায় খ্যাতি হওয়ার দরুন, নাকি অন্য সম্পর্কে জড়ানো?
—আমরা কিন্তু এখনও অফিসিয়ালি ডিভোর্সড নই। ছাড়াছাড়ি হয়েই আছি। কোনও সম্পর্ক নেই কুড়ি বছর। আজও নিয়ম করে ওর খোরপোশ ফেলে দিই ব্যাঙ্কে।
তা হলে ফিল্ম মহলে মহিলাদের নেকনজরে আসাটাই দাম্পত্যের অবনতির কারণ নয়? এ প্রশ্ন তখনও মনে ঘুরছে, কিন্তু নতুন করে জিজ্ঞেস করা গেল না। এমনিতেই টিটোর ছেলেবেলার নষ্ট হয়ে যাওয়া ডান চোখটায় অনেক কষ্টের ছায়া আছে। তার ওপর হঠাৎ মনে হল, ওঁর দু’চোখেই একটা আহত ভাব ফুটছে। মহিলাদের থেকে সরাব না, কিন্তু ব্যথা এড়াব বলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘উত্তমবাবু চলে যাবার পর বেণুদির (সুপ্রিয়া চৌধুরী) প্রেমে পড়লেন কেন?’’
যা চেয়েছিলাম তাই হল, দীপঙ্কর হেসে আগের মতোই ‘কুল’ হয়ে গেলেন।
বললেন, ‘‘বেণুদি আমার চমৎকার বয়স্কা বান্ধবী হয়ে গেলেন। যদিও এটা হওয়া খুব সহজ ছিল না, কারণ উত্তমদার সঙ্গে আমার একটা ঝগড়াই হয়ে গিয়েছিল। এক দিন তো স্টুডিয়োয় উত্তমদা, বেণুদি বসে আছেন, আমি ওঁকে উইশ-টুইশ না করে হন হন করে সোজা চলে গিয়েছিলাম। উত্তমদা বেণুদিকে বলেছিলেন, দেখলে বেণু, টিটো আমায় দেখেও দেখল না। বেণুদিও বেশ চটেছিলেন আমার ওপর। যা হোক, ব্যাপারটা বুঝে আমি দাদার পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছিলাম।’’
—উত্তমবাবুর কথায় পরে আসছি। আপাতত সুপ্রিয়াতেই থাকি। বেণুদির সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল?
দীপঙ্কর বললেন, ‘‘তা হলে একটা ঘটনা বলি?’’
—বলুন।
—একটা শ্যুটিঙে গেছি দার্জিলিঙে। প্যাক আপের পর উদোম মদ্যপান চলছে। আমরা সবাই বেবাক হাই। বেণুদি তো একেবারে নেশায় এভারেস্টে। কেমন একটা চাড় হল ওঁকে পাওয়ার। এনিথিংস কুড হ্যাভ হ্যাপেন্ড। কিন্তু নিজেকে সামলালাম। বোঝালাম, না এ সম্পর্কটা এই অবধিই থাক। এই থমকে যাওয়ার মধ্যেই তো ভাল লাগাটা থেকে যায়।
—অপর্ণা সেনের সঙ্গে কি ভাল লাগাটা এক জায়গায় থমকে গেল?
—অস্বীকার করব না, ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কাজ করে সুখী হয়েইছি; কারণ ওর সঙ্গে তুলনায় আমার বাকি সব নায়িকাকে গ্রাম্য মনে হয়েছে। সন্ধ্যা রায়, সুমিত্রা… সেখানে ওর অ্যাক্টিঙে একটা শহুরে ছাপ, মেজাজ। কিন্তু সম্পর্কটা একটা বিশ্রী ঝগড়া দিয়ে সুর কেটে গেল। আমরা আমেরিকায় নাটক নিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ এক শহরে নাটক নিয়ে গিয়ে দেখি, অপর্ণা মিসিং। সে তখন অন্য শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে নতুন বন্ধু কল্যাণকে নিয়ে। পরে যাকে বিয়েও করল। শেষ রক্ষা অবশ্য হল, ওরা এসে পৌঁছল শেষে। আমি সে দিন মেজাজ হারিয়ে বেদম চেঁচিয়েছিলাম। বলতে গেলে ওখানেই সম্পর্কের ইতি। এখন অবশ্য একটা পোশাকি সৌজন্য, কেমন আছ-ভাল-আছর সম্পর্ক। ঠিক আছে, যে যার মতো ভাল থাকলেই ভাল।’’
—দোলনের সঙ্গে ঘর করে আপনি অন্তত খুব ভাল আছেন।
সোৎসাহে দীপঙ্কর বলে উঠলেন, ‘‘এক্কেবারে। আদরে-রাগে-অভিমানে আমার জন্য কী যে যত্ন করে যাচ্ছে মেয়েটা! আমার শরীর, আমার স্বাস্থ্য, আমার মন, আমার মেজাজ, আমার ভাল, আমার মন্দের ওপর প্রতিক্ষণের মেজাজ। আমায় তুলোয় করে রেখেছে। সব মিলিয়ে কেমন একটা আবেশের মধ্যে আছি। আর…।’’
—আর?
—একটা ভয় আসে ভেতরে ভেতরে। এত বয়েসের তফাত দু’জনের। কী হবে মেয়েটার আমি চলে গেলে। আমি ছাড়া ওরও তো কেউ নেই। ও আমার সমান স্ত্রী, সমান কন্যা। আর...
—আর?
—সে জন্যই তো নির্মম এই ইন্ডাস্ট্রিতে আজও লেগে আছি। কাজ করে যাচ্ছি। যতটুকু পারি গুছিয়ে রেখে যাই।
—না’হলে?
অপর্ণা সেনের বিপরীতে ‘মোহনার দিকে’-তে
—মনের সুখে বই পড়ে আর কোনও ব্রাইন্ড স্কুলে শিক্ষকতা করে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দিতাম।
দীপঙ্কর কিন্তু বরাবরই মস্ত পড়ুয়া। বলেন, ‘সিনেমাটা নেশা নয়, পেশা।’ আসল নেশা ওঁর বই পড়া, গান শোনা। ওঁর মোবাইলের রিংটোনে বাজে ভীমসেন যোশীর ভজন, ‘যো ভজে হরিকো সদা’।
সিনেমা আর টিভি-র কাজের ফাঁকে সময় বার করে ওঁর বই পড়া চাই হিন্দু ধর্ম এবং পদার্থ বিজ্ঞানের কোয়ান্টাম থিয়োরি নিয়ে। সবে শেষ করেছেন ব্রায়ান গ্রিন-এর ‘ফ্যাব্রিক অফ দ্য ইউনিভার্স’ বইটা। ভাল লাগে মিচিও কাকু-র লেখা। সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী মনে করেন আলবার্ট আইনস্টাইনকে।
তো এই বিজ্ঞানমনস্ক লোকটি এক সময় ফলিত জ্যোতিষ নিয়ে মেতেছিলেন কেন?
—কেন আর কী, কলেজ স্ট্রিটে জ্যোতিষের এক বই পেয়ে ভিড়ে গিয়েছিলাম। কিছু দিন চর্চা, হইহই, লেখালেখি করে কেটে গেল। তার পর মিটেও গেছে, ফলিত জ্যোতিষে আর বিশ্বাস নেই।
জ্যোতিষচর্চা বিদেয় হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ভেতরে একটা ব্যথা চরে অন্য একটা চর্চা ছাড়তে হয়েছে বলে। সেতার।
দুনিয়ার ক’টা লোক জানে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’, ‘আবহমান’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘গণশত্রু’র মতো ছবির অভিনেতা সেতারে গান্ডাবাঁধা শিষ্য উস্তাদ মুস্তাক আলি খানের? বেশ কিছু দিন বাজিয়েও ছাড়তে হল, বলা বাহুল্য সিনেমার কারণে।
কিন্তু সেই সিনেমা থেকেই বা কী পেলেন শেষ অবধি?
বললেন, ‘‘জীবিকা নির্বাহ তো বটেই। কিছু পরিচিতি, খ্যাতি, এবং অনেকখানি মুগ্ধতা— উত্তমদার সঙ্গে কাজ করে। সৌমিত্র, রবি ঘোষ, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
—নিজে যতখানি উঠতে চেয়েছেন, যেখানে পৌঁছতে চেয়েছেন তা কি পেরেছেন?
—তা হলে একটা কথা বলি? আই থিংক আই অ্যাম আন্ডাররেটেড।
—সে তো অনেকেই ভাবেন।
—তপন সিংহের ওঁর ‘চলচ্চিত্র আজীবন’ বইয়ে লিখেইছেন, উত্তম, সৌমিত্রর পর সব চেয়ে বড় অ্যাক্টর দীপঙ্কর। অথচ উৎপলদা চলে যাবার পর আমাকে ধরেবেঁধে ভিলেন বানিয়ে দিল। তাই এখন থেকে থেকে মনেও হয়, সিনেমায় এসে ভুল করেছি। অনেক কষ্ট পেলাম। লোক হেয় করেছে। অথচ এ তো পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। ফিরব কী করে? কোথায়ই বা? তাই বইয়ে আশ্রয় নিই।
—বন্ধুবান্ধব নেই?
—ফিল্ম সার্কেলে থাকি যখন দলে ভিড়ে হা হা হু হু করি ঠিকই, কিন্তু ওই! হাসিঠাট্টা করি, অন্যদেরটা শুনি, কিন্তু ওই। সিনিয়র বলে সবাই সমীহটমীহও করে। এরই মধ্যে যখন সৌমিত্রদার সঙ্গে কথাটথা হয়, বড় সুন্দর সময় কাটে, ঋদ্ধ হই। খুব অবাক লাগে ওঁকে দেখে। সব কিছুর মধ্যেও থেকেও যেন নেই। এক বিবিক্ত সন্ন্যাসী।
সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি
জিজ্ঞেস করতেই হল, সিনেমায় তা হলে আকাঙ্ক্ষা কী রইল?
—গিরিশচন্দ্রকে নিয়ে কোনও ছবিতে ওঁর চরিত্রে অভিনয়। অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা বলতে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ না পাওয়া। আর ঋত্বিকবাবুর ‘সুবর্ণরেখা’য় অভি ভট্টাচার্যর মতো একটা রোল করে উঠতে না পারা।
—তবুও তো ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এর রোলটা পেয়েছিলেন।
—আরে, তাই নিয়েই তো উত্তমদার সঙ্গে মন কষাকষি, দূরত্ব।
—আপনার রোলটা তো ওঁর করার কথা ছিল!
—ঠিক।
—তার পর?
—উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অথচ ছবির সব প্রস্তুতি শেষ। শুধু ওঁর জন্য কাজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছোনোয় প্রশ্ন উঠল।
—তো?
—সেটাই করতে চাইলেন না তপনদা (সিংহ)। সবাই যখন ভেবে অস্থির উত্তম ছা়ড়া কে করবে ওই রোল, উনি বললেন, একটা ছেলে আমার মাথায় আছে। কে? না, দীপঙ্কর। সব্বাই তাজ্জব। উত্তমের জায়গায় দীপঙ্কর! যাই হোক, সে কাজটা তো করলাম। সব্বাই নিলও সেই আমাকে। আমার কাজের জীবনের একটা মাইলফলক হয়ে রইল।
—আর উত্তমবাবুর সঙ্গে বিবাদে জড়ালেন?
—তাই-ই তো! উনি ধরেই নিলেন আমি কলকাঠি নেড়েছি। অথচ আমি জানিও না তপনদা আমাকে কাজটার জন্য ভেবেছেন।
—উত্তমবাবু ছবিটা দেখেছিলেন?
—অনেক পরে।
—কিছু বলেছিলেন?
—না।
—তা হলে ওঁর প্রশংসা আপনার শোনা হয়নি?
—সেটা হয়েছে। এক বার ওঁর সঙ্গে একটা অভিনয়ের পর আমার কাঁধটা জোরে চেপে ধরেছিলেন। খুব জোর ছিল গায়ে। আর বলেছিলেন, আমি ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়ে বলছি, সিনেমাটা ছাড়িস না।
কে জানে, দীপঙ্কর দে’র সিনেমা না-ছাড়ার সব চেয়ে জোরালো কারণই হয়তো উত্তমকুমারের এই সংরক্ত উপদেশ!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/in-ashoot-of-bancharam-a-grudge-arises-against-uttam-kumar-1.330311

তুমি আমাকে বাঙ্গালি কথা শিক্ষা করাও

$image.name

তুমি আমাকে বাঙ্গালি কথা শিক্ষা করাও

রীতিমতো মাস্টারমশাই রেখে এ ভাবেই কাকুতিমিনতি করতেন সাহেবসুবোরা! কলকাতা থেকে লন্ডন ভরে গিয়েছিল গুচ্ছ গুচ্ছ কোচিং ক্লাসে। সেই সব অবাক-সময়ের গল্পে বিশ্বজিৎ রায়

৫ মার্চ , ২০১৬, ০০:০০:০০
bengali
বাবু মস্ত হাতি আর বাবু দানা দু’জনের বাংলা-ইংরেজি নিয়ে কথা হচ্ছে।
মস্ত হাতি বললেন, ইংরেজির থেকে বাংলা ভাষা ঢের ভালো, বাংলা সুপিরিয়ার ইংরেজি ইনফিরিয়ার। ইংরেজি হল হাফ ডজন ভাষা থেকে তৈরি। আর বাংলা হল সংস্কৃতের বাচ্চা। সোজা সংস্কৃত থেকে তার জন্ম।
পাঁচমিশেলি হ-য-ব-র-ল  ইংরেজির সঙ্গে কুলীন বাংলার তুলনাই চলে না ।
তাছাড়া ইংরেজ এই ভারতে আর ক’জন? গুটিকয় মাত্র। তাঁরা বাংলাটা শিখে নিলেই পারেন।
শুনে আংরেজ বাবু দানা কী আর করেন! ইংরেজিতে ‘ও রাম রাম’ বলতে লাগলেন।
রামনামে যদি বাংলার ভূতের হাত থেকে কোনওক্রমে বাঁচা যায়!
এই মস্ত হাতি আর বাবু দানার স্রষ্টা রাজা রামমোহন রায়। হাতি-দানা এই দু’জন রামমোহনের ইংরেজিতে লেখা কৌতুক নাটিকার চরিত্র, লেখার নাম ‘দ্য ইংলিশ ইন ইন্ডিয়া শ্যুড অ্যাডপ্ট বেঙ্গলি অ্যাজ দেয়ার ল্যাঙ্গুয়েজ’।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পরে ‘মডার্ন রিভিউ’-তে রামমোহনের এই পুরনো লেখাটি খুঁজে-পেতে ছেপেছিলেন।  
রামমোহন নিজে বহুভাষী, আরবি-ফারসি-উর্দু-সংস্কৃত-বাংলায়  চোস্ত। ইংরেজি রপ্ত করেছিলেন পরে।
জন ডিগবির দেওয়ান হিসেবে কাজ করার জন্য তাঁর ইংরেজি শেখা। ক্ষমতা, টাকা-পয়সা ক্রমে ক্রমে ইংরেজদের হাতে চলে গেছে। ভারতীয়রা বুঝতে পেরেছে ইংরেজি না শিখে উপায় নেই। রামমোহনও এই দলেই। দেশজ দর্শন আধ্যাত্মিকতার চেয়ে পশ্চিমি জ্ঞান-বিজ্ঞান যে ঢের কাজের সে কথাও মানেন রামমোহন। তবে মনের ভেতর কোথাও থেকে যায় উলটপুরাণের বাসনা। রাম রাম বলতে বলতে ইংরেজরা বাংলা শিখছে, এ ছবি আঁকেন।
• • •
রামমোহন যে সময়ের লোক সে সময় এ কাণ্ড যে একেবারে হত না, তা কিন্তু নয়।
রামমোহন তো পুরোপুরি উনিশ  শতকের নন, তাঁর জীবনযাপনের অনেকটাই অষ্টাদশ শতকের।
অষ্টাদশ শতক। পলাশি-বক্সারের পর কোম্পানির দেওয়ানি লাভ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিকল্পনা ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিচ্ছে ।   
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন ভারতবর্ষের নানা মুলুকে ধীরে ধীরে রয়ে-সয়ে কৌশলে বাণিজ্যবিস্তার করছে।
খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য নানা মাপের ধর্ম-যাজকদের যাতায়াত শুরু হয়েছে। কোম্পানির কর্তাদের আর  ধর্ম-যাজকদের কনফিডেন্স  তখন বেশ কম। নেটিভ ভারতীয়দের কাছে ‘সাহেবরা’ তখন সবাই তেমন কেউ-কেটা  নন।
ভারতীয় অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাতেও কোম্পানির প্রভাব তেমন পড়তে শুরু করেনি। ফলে নেটিভরা সাহেবি ইংরেজি ভাষা শিখতে যাবে কোন দুঃখে! বরং সাহেবরাই একটু লো-প্রোফাইল।   
স্থানীয় লোকেদের মন না পেলে ব্যবসা মার খাবে। তাঁদের চটিয়ে তো আর ব্যবসা করা যায় না।
তার থেকে দেশজ ভাষা শিখে স্থানীয় লোকদের মন রাখলে শ্যাম-কুল দুই বজায় থাকবে।
এই প্রয়োজন থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে কিংবা স্বাধীন ভাবে ভাগ্যান্বেষণে আসা সাহেবরা ভারতীয় ভাষা শিখতে শুরু করেন।
• • •
এমনিতে ভারত তো নানা ভাষার দেশ। সব ক’টা ভারতীয় ভাষা সাহেবদের পক্ষে রপ্ত করা শক্ত। 
ভারতীয় ভাষার মধ্যে যে ভাষাগুলো বেশি লোকে  বলে, যে সমস্ত ভাষার প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি সেই ভাষাগুলোই শেখার চেষ্টা করলেন তাঁরা।
রীতিমতো মাস্টার রেখে কলেজ তৈরি করে সাহেবদের ভারতীয় ভাষা শিখতে হত।
আরবি, ফারসি, হিন্দুস্থানি, সংস্কৃত আর বাংলা— এই কয়েকটি ভাষা সাহেবদের ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনের তালিকায় বিশেষ ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ।


• • •
বিদেশের মাটিতে বহু ভারতীয় অষ্টাদশ শতকে ভারতে আসতে চাওয়া সাহেবদের ভারতীয় ভাষা শিখিয়েছেন।
এঁদের কীর্তি-কলাপ নিয়ে চমৎকার বই লিখেছিলেন মাইকেল ফিশার— কাউন্টার ফ্লোস টু কলোনিয়ালিজম।
মুনশি মাহমেত লন্ডনের খবরের কাগজে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিতেন— ফারসি ও আরবি শেখান তিনি। সে বিজ্ঞাপনের টানে ভারতমুখী সাহেবরা লন্ডনে তাঁর কাছে লাইন দিতেন।
আবু তালিব ফারসি গৃহশিক্ষক হিসেবে লন্ডনে ছিলেন। ভারতে এশিয়াটিক সোসাইটির কর্ণধার উইলিয়াম জোন্সের ওপর তখন তিনি বেশ বিরক্ত।
জোন্সের লেখা ফারসি ব্যাকরণ বই পড়ে তাঁর কাছে যে সাহেবরা আসতেন, তাঁদেরকে তাঁর পক্ষে ফারসি শেখানো মুশকিল হত।
জোন্সের ব্যাকরণ নানা ভুলে ভরা। ফলে ভুলগুলোকে প্রথমে শুধরে তারপর ফের নতুন করে শেখানো। তার থেকে যাঁরা কিছুই পড়েননি তাঁদের প্রথম থেকেই ঠিক মতো ভাষা শেখানো যায়।
জোন্সের ভাষাবিদ হিসেবে যতই নাম-ডাক থাকুক না কেন, আবু তালিবের মতো তো আর জোন্স নেটিভ স্পিকার নন।
• • •
আবু তালিব আর মুনশি মাহমেত বঙ্গবাসী। লখনউ থেকে সেকালে বিলেতে গিয়েছিলেন মির্জা মহম্মদ।  তিনিও বিলেতে ভাষা শিক্ষকের কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলেন।
সুসংস্কৃত ব্রিটিশরা ভারতে যাওয়ার আগে চাইলেই লখনউয়ের মির্জা মহম্মদের কাছে আরবি-ফারসি-হিন্দুস্থানি শিখে নিতে পারেন এই মর্মে কাগুজে বিজ্ঞাপন।
বিলেতের এই ভারতীয় ভাষা শিক্ষকেরা ভারতীয় ভাষা শেখাবেন বলেই কিন্তু বিলেতে আসতেন না। তাঁরা   ভারত থেকে দেশে ফেরা কোনও না কোনও সাহেবের সঙ্গ নিতেন— সাহসী ভাগ্যান্বেষী সেই ভারতীয়রা  তারপর বিলেতে পেট চালাতে ভাষা শিক্ষক হয়ে উঠতেন।
মির্জা মহম্মদ জন মারির সঙ্গে ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বিলেতে আসেন।

• • •
ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক কখনও কখনও খুবই গভীর। কর্নেল গ্রাহামের কাছে ফারসি ভাষার অনুবাদক হিসেবে কাজ করতেন হিন্দু বাঙালি ঘনশ্যাম দাস। ইসলামি ও হিন্দু আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি বিলেতে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। স্যার এলিজা ইম্পের খুবই আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন ঘনশ্যাম।
মহারাজ নন্দকুমারকে অন্যায় ভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে বলে যখন  বিচারক এলিজা ইম্পে অভিযুক্ত, তখন ঘনশ্যাম ইম্পের পক্ষ নিয়েছিলেন।
হিন্দুধর্ম ছেড়ে পরে তিনি খ্রিস্টান, নাম বদলে হন রবার্ট ঘনশ্যাম দাস। কৃতজ্ঞ ইম্পে রবার্ট ঘনশ্যামের পেনশনের ব্যবস্থাও করেছিলেন।
• • •
বিলেতেই যে সাহেবরা সব সময় ভারতীয় ভাষা শিখতেন তা নয়। ভারতে গিয়েও ভারতীয় ভাষা শিখতে হত।
ভাষা শেখার জন্য সাহেবদের ব্যাকরণ বই ভরসা। সে ব্যাকরণ বই লেখা হত ইংরেজি ভাষায়। সঙ্গে থাকত বাংলা ভাষার নানা উদাহরণ। সেই উদাহরণ বাংলা হরফে লেখাই দস্তুর ।
ইংরেজিতে লেখা ভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ নেটিভদের সব সময় পছন্দ হত না— আবু তালিব জোন্সের লেখা ফারসি ব্যাকরণের ওপর খাপ্পা। তবু ব্যাকরণের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই।
১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হ্যালহেড লিখলেন তাঁর ‘আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’।
সেই ব্যাকরণ বইয়ের আখ্যাপত্রে বাংলা হরফে লেখা ছিল ‘বোধপ্রকাশং শব্দশাস্ত্রং ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থং ক্রিয়তে’। ফিরিঙ্গি অর্থাৎ সাহেবদের উপকারের কথা ভেবেই এই শব্দশাস্ত্রের বোধপ্রকাশকারী বইটি লেখা।
বলে নেওয়া দরকার, এই বইয়ের জন্যই কিন্তু প্রথম বাংলা সচল টাইপের সৃষ্টি। পঞ্চানন কর্মকার ছাপার জন্য বাংলা হরফের সাঁট বানিয়ে দিয়েছিলেন।

• • •
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিলিয়ানদের ভারতীয় ভাষা শেখানোর জন্য ওয়েলেসলির উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
সেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের দায়িত্ব নিলেন উইলিয়াম কেরি।
১৮০১-এর ৪ মে কেরি কলেজে যোগ দিলেন। কেরি ধর্মপ্রচারক। শ্রীরামপুর মিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
১৮০১-এ শ্রীরামপুর মিশন থেকে বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হল।
ওয়েলেসলি বুঝলেন এই কেরিকে তাঁর দরকার।
কেরি খুবই কাজের মানুষ, বাংলা ছাড়াও মরাঠি ভাষা জানতেন তিনি। ১৮০৪-এ কেরির বেতন সাতশো টাকা। তখনকার দিনে সে অনেক অনেক টাকা।
উইলিয়াম জোন্স অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট। বহুভাষাবিদ। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রাচ্যবিদ্যাচর্চার জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি গড়ে তুললেন।
জোন্স তো সংস্কৃত ভাষার মহিমায় মুগ্ধ। এ ভাষা ইউরোপের লাটিন গ্রিকের থেকেও নাকি ভালো, অনুকরণযোগ্য।
সংস্কৃত ভাষাকে পছন্দ করলেও জোন্স বাংলা ভাষাকে মোটেই পছন্দ করে না। সে ভাষা নাকি ভুলে ভরা, পাতে দেওয়ার যোগ্যই নয়। রামমোহনের মস্ত হাতি ইংরেজি সম্বন্ধে দানাকে যে কথা বলেছে সে কথাই জোন্স বাংলা সম্বন্ধে বলেছেন। তবে কেরি বুঝে ফেললেন মুখের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে ‘ওয়াক থু’ করলে মোটেই চলবে না।
বাণিজ্য ও প্রশাসন চালাতে গেলে বাঙালির মুখের ভাষা তা ভুলে ভরা হোক আর যাই হোক, সাহেবদের শিখতে বুঝতে হবে বইকী!
লেখার ভাষা আর মুখের ভাষার চরিত্র আলাদা। তবে মুখের বাংলা ভাষাও রপ্ত করা চাই। মুখের ভাষা রপ্ত না করলে নেটিভদের সঙ্গে যোগাযোগই তো করা যাবে না।  কেরি ‘কথোপকথন’ নামে চমৎকার একটি গ্রন্থ সংকলন করলেন।
বঙ্গভাষীদের নানা জনের মুখের ভাষার নমুনার সংকলন সে বই। জমিদার-রাইয়ত, মাইয়া কন্দল, ভিক্ষুকের কথা, ঘটকালি, মজুরের কথাবার্তা, ভোজনের কথা —স্পোকেন বাংলা শেখার নানা আয়োজনের সে বই।
সাহেবরা কেমন বাংলা বলত?
‘বেহারা চৌকি মেজ মার্জ্জন কর।’
‘মসারিটা চিরিয়াছে।’ ‘কল্য সরকারকে হুকুম দেহ আর একটার কারণ।’
‘তুমি আমাকে প্রথমে বাঙ্গালি কথা ও কায কামের লেখা পড়া শিক্ষা করাও।’ 
‘আমার পরিতোষ হইয়াছে।’
সাহেবের মুখের বাংলা একটু সংস্কৃত ছোঁয়া— মার্জ্জন, কল্য, শিক্ষা করাও, পরিতোষ, এসব সাধু বাংলা।
কেরির বইয়ের দেশজদের বাংলা কিন্তু অনেক সময়েই সংস্কৃতের ধারপাশ দিয়ে যায়নি।
মেয়েদের কোন্দল কান পেতে শোনার মতো।
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে একজন বাড়ি ফিরেছে, বাড়ির অন্য বৌটিকে কাজ করতে হয়েছে বলে সে বেজায় খাপ্পা। ‘পাড়াবেড়ানি’ মেয়েটি ঘরের মেয়েটিকে বলেছে, ‘তোর যে বড় ঠেকারা হইয়াছে এক দিন কায করিয়া এত কইস। আমি তোর সকল জানি।’ 
আর যায় কোথায়। ঘরের মেয়েটি গলা তুলেছে।— ‘পুতখাকী তুই আমার কি জানিস। তোর মত পাড়া২  মরদের কাছে আমি যাই না।’  কেরির ‘কথোপকথন’ ১৮০১-এর বই থেকে পাওয়া।
জোন্সের মতো সংস্কৃতের শুচিবায়ুগ্রস্ততা কেরির নেই। তবে সাহেবদের মুখের ভাষাকে তিনি ভদ্র-সভ্য সংস্কৃত মাখা করে তুলতে চান, দেশজদের জন্য সে বালাই নেই । তারা যেমন-তেমন বলুক।  পাড়ায় পাড়ায় মরদের কাছে ঘোরার মতো কুঁদুলে মেয়েলি কথা তিনি সংকলন করেছিলেন, যে কোনও ভাষার জ্যান্ত চেহারা তো মুখের ভাষাতেই ধরা পড়ে।
শাশুড়ি কেরির বইতে মুখ শানিয়েছিলেন।— ‘সকল কাজি বড় বৌ করে ছোট বৌডা বড় হিজল দাগুড়া অঙ্গ লাড়ে না’।
বাঙালির ঘর-সংসারের ছবি উঠে আসছে এই সাহেবি সংকলনে।
 
• • •
তবে কেরি লেখার বাংলার শরীরে শিষ্টতা বজায় রেখেছিলেন। ১৮১২-য় কেরির ‘ইতিহাসমালা’ প্রকাশিত হল।
ইতিহাসমালার গল্পগুলো মোটেই মুখের ভাষায় লেখা নয়। আর কেরি তার বাংলা ব্যাকরণের গোড়ায় চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকায় স্বীকারই করে নিলেন বাংলা অন্যান্য ভারতীয় ভাষার থেকে সংস্কৃত ভাষার অনেক কাছাকাছি।
এটা বলে দিলে বাংলা ভাষার মান-মর্যাদা ফুলে ফেঁপে ওঠে। জোন্স সংস্কৃতকে লাটিন গ্রিকের থেকেও উত্তম বলেছেন। সুতরাং সংস্কৃতের কাছ-ছোঁয়া বাংলাও কুলীন না হয়ে যায় না।
বাংলাকে সংস্কৃতের কাছাকাছি ভাষা প্রমাণ করলে সাহেবদের আরেকটা উদ্দেশ্যও সফল হয়। মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে সাহেবরা ক্ষমতা দখল করেছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বঙ্গদেশে সাহেবদের কাছাকাছি যাদের বেশি ঘোরাফেরা তাদের মধ্যে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। মুসলমানরা সাহেবি শিক্ষা ও সাহেবি ব্যবস্থাপনা থেকে তখন একটু দূরেই ছিলেন। এই সুযোগে হিন্দু বাঙালিরা কেউ কেউ বাংলা ভাষাকে ‘সংস্কৃতায়িত’ করে তুলতে চাইলেন। সাহেবদের কাছে চাকরি-বাকরি তাঁরাই পাচ্ছেন ।
কেরির বইতে সাহেব একটা মোক্ষম কথা বলেছিলেন, ‘তুমি আমার চাকর থাকিয়া শিক্ষা করাইবা আমাকে।’
মুনসি চাকর কাম শিক্ষক কিংবা শিক্ষক কাম চাকর। বাঙালি মুনসি আর পরবর্তী ভদ্রলোকেরা অনেকেই এই চাকরত্ব মেনে নিয়ে সাহেবি মতলবে তাল মিলিয়েছিলেন ।
জয়গোপাল তর্কালঙ্কার ছিলেন বিদ্যাসাগরের মাস্টারমশাই। সংস্কৃত কলেজে ষাট টাকা বেতনের চাকুরে। তিনি মনে করতেন মুসলমান শাসনের থেকে সাহেবদের শাসন ভাল।
সাহেবদের আমলে বাংলা ভাষা থেকে তাই যতটা সম্ভব ‘যবন’ শব্দ বাদ দেওয়া চাই। এতেই সাহেবদের মন পাওয়া যাবে। ১৮৩৮-এ লিখলেন ‘পারসীক অভিধান’।
দাওয়াই দিলেন ‘খরচ’ লেখা  চলবে না, ‘ব্যয়’ লিখতে হবে। ‘কম’-এর বদলে লিখতে হবে ন্যূন। সে বিধান অবশ্য চলেনি। সাধারণ বাঙালি জয়গোপালি দাওয়াই মানেনি । 
এমনিতে ব্যবসা প্রশাসন চালানোর জন্য, ধর্ম প্রচারের জন্য সাহেবদের নিজের স্বার্থেই এই বাংলা চর্চা।
আইনের অনুবাদ করে, দলিল দস্তাবেজ ধর্মগ্রন্থ পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের বই বাংলায় লিখে অনেক দিনই বাংলা চর্চায় মনোযোগী হয়েছিলেন তাঁরা। 
তারপর রাজনীতির গতিতে ঘটনাক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে রানির হাতে ক্ষমতা চলে গেল।
বাঙালি হিন্দুরা কোম্পানির শাসনের শেষের দিকে ও রানির শাসনের গোড়া থেকে চাকরির জন্য সাহেবদের ভাষা শিখে নিল। ফলে সাহেবদের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলা শেখার তত দায় আর রইল না।  
বাঙালি নেটিভরা গদ্যচর্চায় হাত দিলেন।  সাহেবদের থেকে তাঁদের বাংলা চর্চার উদ্দেশ্য বিধেয় আলাদা। তবে সাহেবরাই তো নেটিভদেরকে শিখিয়েছিলেন নিজেদের ভাষা শিক্ষার পদ্ধতি স্থির করতে হবে, নানা কাজের জন্য গদ্য চর্চা করতে হবে।
সংস্কৃত ভাষার মতো বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার  বাংলা-হিন্দি-অসমিয়া-ওড়িয়ার মতো নব্যভারতীয় ভাষাগুলির ছিল না । সাহেবদের দেশি ভাষা চর্চার প্রকার-পদ্ধতি তাদেরকে পরবর্তী কালে সাহায্য করেছিল সন্দেহ নেই। তবে যে কোনও পদ্ধতিরই তো সীমাবদ্ধতা থাকে, সাহেবি ভাষাচর্চার পদ্ধতি যেমন বাংলাকে সাহায্য করেছে, তেমনই কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার চরিত্র সাহেবরা ধরতে পারেননি। গণ্ডগোল পাকিয়েছেন।
আবার তাঁরা সাদামানুষ বলে, যত দিন গেছে, এদেশের কালোমানুষেরা তাঁদের সিদ্ধান্তকেই শিরোধার্য করেছেন।
সবাই তো আর রবি ঠাকুর নন যে সোজা সাপটা বলবেন, ‘‘বাঙালির ইংরেজি-ভুলে ইংরেজরা সাধারণত দেবত্ব প্রকাশ করেন না।’’
সুতরাং যে ইংরেজরা বাংলা শেখার সুযোগ পেয়েও বাংলা ভুল করেন ‘‘তাঁহাদের প্রতি হাস্যরস বর্ষণ করিয়া পালটা জবাবে গায়ের ঝাল মিটাই।’’
পুনশ্চ: রবীন্দ্রনাথের থেকে এখনকার সময় অবশ্য আলাদা। ইংরেজ উপনিবেশ আর অবশিষ্ট নেই। রানির ইংরেজির দেমাক গিয়েছে। ইংরেজি এখন নানারকম। আর আমরাও নানারকম বাংলা মেনে নিয়েছি। শুদ্ধ ‘একরকম’ বাংলা আর কতজনই বা বলেন। এমন করেই চলছে।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/hilarious-stories-of-bengali-community-in-british-era-1.323903

তিন পয়েন্ট ছাড়ার জন্য চাপ দিতে আমার মেয়েকে অপহরণ করা হয় (PK)

$image.name

তিন পয়েন্ট ছাড়ার জন্য চাপ দিতে আমার মেয়েকে অপহরণ করা হয়

মহাকাব্যিক পঁচিশ বছর! কখনও লাল-হলুদ, কখনও সবুজ-মেরুন। কখনও নীল জার্সির ভারত। পুরনো সেই সাম্রাজ্য বিস্তার আর তার ভাঙাগড়ার রুদ্ধশ্বাস কাহিনি নিয়ে দীর্ঘ এত বছর বাদে অকপট স্বয়ং প্রদীপকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ দ্বাদশ কিস্তি। সমর্থকদের হিংসাত্মক আচরণ, ক্লাব কর্তাদের চরম দুর্ব্যবহার, মিডিয়ার সীমাহীন ঔদ্ধত্য সামলানোর কঠিনতম দিনের ঘটনাবহুল বর্ণনা।

অনুলিখন: সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়।

৬ ডিসেম্বর, ২০১৪, ০১:০০:২৮
দর্শক-সমর্থকদের অশ্রাব্য গালিগালাজ। ক্লাবকর্তাদের রক্তচক্ষু। মিডিয়ার তীব্র সমালোচনা। নিন্দেমন্দ-কটাক্ষ। এসবই যে কোনও কোচের কপালেই লেখা থাকে। রেহাই পাওয়ার কোনও উপায় নেই।
কিন্তু নিজের দলের রেকর্ড ছোঁয়ার বছরে কোনও বিশেষ ম্যাচের আগে কোচের সন্তান কিডন্যাপ্‌ড হচ্ছে!
কোচের বৌ ম্যাচ দেখতে গেলে মাঠে স্বামীর দলের সমর্থকদের ছোড়া ঢিলে মাথা ফাটিয়ে রক্তারক্তি ঘটছে!
ক্লাস থ্রি-তে পড়া নিজের মেয়ে দুরারোগ্য রোগে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও কোচকে খেলার দিন মাঠে সামান্য দেরিতে আসার অপরাধে ক্লাবকর্তার ধ্যাতানি খেতে হচ্ছে!
কোচকে টাইট দিতে তার নামে ঐতিহ্যশালী ইংরেজি দৈনিকের ক্রিকেট-খেলোয়াড়-টার্নড্-ফুটবল রিপোর্টারের ভিজিল্যান্স পর্যন্ত করে দেওয়া!
এ সব শুধু এ দেশে নয়, বোধহয় ফুটবলবিশ্বেই একমাত্র আমার কোচিং কেরিয়ারে ঘটেছে!
অথচ সেই বাহাত্তরে আমার প্রথম বড় ক্লাবের কোচ হয়ে ইস্টবেঙ্গল মাঠে প্র্যাকটিস শুরুর দিন গোটা গ্যালারি দর্শকে ঠাসা! আজকাল ইস্টবেঙ্গল অথবা মোহনবাগানের ম্যাচেও অত দর্শক মাঠে আসে না!
৭৭-এর বড় ম্যাচে উত্তেজনায় ঠাসা গ্যালারি।
সে দিন সাড়ে সাত আনা থেকে শুরু করে দশ আনা-র গ্যালারির চেয়েও বেশি ভিড় মেম্বারশিপ স্ট্যান্ডে। অত সকালেও হাজার হাজার ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার পিকে-র ট্রেনিং করানো দেখতে মাঠে হাজির! আবার পাক্কা তিন মাস টানা প্র্যাকটিসের পর লিগের প্রথম ম্যাচের হাফটাইমেই ইস্টবেঙ্গল মাঠে আমার বাপ-মা উদ্ধার হয়েছে!
আসলে ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নিয়ে আমি একটা কথা সাফ অফিশিয়ালদের বলে দিয়েছিলাম। লিগের আগে আমার দল একটাও প্রদর্শনী ম্যাচ খেলবে না। নো ভাড়া ম্যাচ...নো ভাড়াটে টুর্নামেন্ট! ব্যাস, এই যেই বলা, হা হা করে তেড়ে এলেন কয়েকজন ক্লাবকর্তা।
“ভাড়া ম্যাচ কারে কইসেন! ভাড়াটে টুর্নামেন্টের আপনি কী বোজেন? ক্লাবে কোথ্বিকা টাকা আসব তার কী জানেন মশাই আপনি?” গনগনে মেজাজে বলেছিলেন ডাক্তার দাসের কয়েক জন সঙ্গী। কিন্তু আমি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। তবে সেবার লিগের প্রথম ম্যাচেই যখন ভ্রাতৃ সঙ্ঘের গোলে বল ঢোকাতে আমার ছেলেদের পাগল হওয়ার জোগাড়, তখন আমিও মনে মনে প্রমাদ গুনছি।
রেফারির হাফটাইমের বাঁশি বেজে গেল। তবু গোল নেই। টিম নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরছি। এক ক্লাব সদস্য গ্যালারির ওপর থেকে আমাকে চেঁচিয়ে বললেন, “ওই যে যাচ্ছে বরাহনন্দন!” নোংরা গালাগালও কী ভদ্র ভাষায় দেওয়া যায়, সেই প্রথম জেনেছিলাম আমি।
তার পর তো ড্রেসিংরুমে ফুটবল সেক্রেটারি অজয় শ্রীমানির কাঁদো-কাঁদো অবস্থা! “প্রদীপদা, যে ভাবে হোক গোলের রাস্তা বাতলান ছেলেদের। নয়তো ম্যাচের শেষে মেম্বার-সাপোর্টারদের হাতে ঠ্যাঙানি খেয়ে মরে যাব। সিজনের প্রথম ম্যাচেই আটকে গেলে আর দেখতে হবে না...’ বলেই চলেছে ঘটির ছেলে শ্রীমানি।
সেবার ইস্টবেঙ্গলে এমনই তাত্‌পর্যের ব্যাপার যে, কোচ ঘটি, ফুটবল সেক্রেটারিও ঘটি। তাই হাফটাইমের পর যখন টিম নিয়ে মাঠে আবার ঢুকছি, গ্যালারি থেকে “গোল আসব কোথ্বিকা? আমাগো হতচ্ছাড়া কোচটা ঘটি, ফুটবল সেক্রেটারিও ঘটি!” টিটকিরি শুনে অত চাপের মুখেও মনে মনে মজা পেয়েছিলাম। প্রিয় ক্লাবের জয় দেখতে কী প্রচণ্ড কুসংস্কারাচ্ছন্ন হন সমর্থকেরা!
সারা বিশ্ব জুড়েই এই ট্রেন্ড। অত শিক্ষিত ব্রিটিশরা পর্যন্ত ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাচে সারাক্ষণ প্রার্থনা সঙ্গীত গায় গ্যালারিতে। গুরুত্বপূর্ণ সব ম্যাচের আগে ওদের মতো করে পুজোআচ্চা করে। বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের এল ক্লাসিকো যুদ্ধে নাকি স্প্যানিশরা নিজের নিজের প্রিয় ক্লাবের ওপর থেকে সব অশুভ তাড়াতে ভূতপ্রেতের পুজোটুজোও করে থাকে!
যা হোক, ইস্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে প্রথম ম্যাচটাই কোনও ক্রমে উতরেছিলাম একেবারে শেষ দিকে মোহন সিংহের একটা দুর্দান্ত গোলে।
তার অনেক পরে সে দিনের ‘বরাহনন্দন’ বলা সেই ইস্টবেঙ্গল সদস্যকে চিনেছিলাম। ভদ্রলোক শিয়ালদায় নামী রেস্টুরেন্টের মালিক। ইস্টবেঙ্গলে তাঁর মেম্বারশিপ কার্ড নম্বর ২৫। বুঝুন, কত দিনের পুরনো মেম্বার। অথচ তাঁর মুখে অমন ‘অমৃতবচন’!
মজার ব্যাপার, পরের দিকে বছরের পর বছর আমার কোচিংয়ে ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যে সেই বুড়ো ভদ্রলোক আমার বিরাট ফ্যান হয়ে উঠেছিলেন। এতটাই যে, ওঁর রেস্টুরেন্টের যেটা স্পেশাল আইটেম, সেই ডিমের ডেভিলের নাম দিয়েছিলেন ‘পিকে’জ ডেভিল’! যার জন্যই কি না জানি না, সত্তরের দশকের প্রথম হাফে ইস্টবেঙ্গলকে কলকাতার বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকে বারকয়েক ‘পিকে’জ ডেভিলস’ লেখা হয়েছে।
আবার সেই কাগজেরই বিখ্যাত ফুটবল সাংবাদিক পরের দিকে উঠতে-বসতে আমার সমালোচনা করেছেন। বিদ্রুপ করেছেন প্রায় সব ম্যাচের পর। একমাত্র বোধহয় বড় ম্যাচ পাঁচ গোলে জেতার পরের দিনের কাগজে ছাড়া!
কী ইস্টবেঙ্গল আর কী মোহনবাগান, আমার কোচিংয়ে টিম জিতুক বা হারুক, ওই রিপোর্টারের যেন কাজই ছিল, তাঁর কাগজের অফিসে বিদেশি ফুটবলের বইপত্তর ঘেঁটেঘুঁটে নিজের রিপোর্টে প্রমাণের চেষ্টা করা, সে দিনের ম্যাচে আমার স্ট্র্যাটেজি কোনও মৌলিক ব্যাপার নয়। অমুক সালে, তমুক কোচ, অমুক খেলায় এই ফর্মেশনে খেলিয়েছিলেন। আমি নাকি সেখান থেকে টুকেছি। এখন অবসরোত্তর সেই প্রৌঢ় সাংবাদিককে কে বোঝাবে, শুধু ফুটবল নয়, গান-বাজনা, সিনেমা-থিয়েটার, উপন্যাস-কবিতা, চিত্রকলা... মনুষ্য জীবনের প্রায় সব পারফমির্ং আর্টেই এক জনের সৃষ্টিতে কোনও কোনও সময় তাঁর পেশার কোনও পূর্বসূরির কীর্তির ছাপ জান্তে বা অজান্তে পড়ে। সেটাই স্বাভাবিক। তাতে সেই সৃষ্টিরই স্ট্যান্ডার্ড বাড়ে।
আসলে ইংরেজিতে যাঁরাই যে বিষয়েই লেখেন, আমাদের পোড়া দেশের মানুষ বোধহয় ভাবে, ওই রে! ইংরেজিতে লিখছে, মানে লোকটা সব জানে! শেষমেশ ওই ইংরেজিতে লেখা সাংবাদিক আমাকে বাগে আনতে না পেরে আমার নামে ভিজিল্যান্স পর্যন্ত করেছিলেন! যদিও তাতে আমার জনপ্রিয়তা বেড়েছিল বই কমেনি!
মিডিয়ার সমালোচনার কথা যখন বলছি, তখন দুই জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের দুই অভিজ্ঞ ফুটবল সাংবাদিকের কথাও বলতে হয়। তাঁদের এক জন আমাকে যত না গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন, তার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন বেশি।
এক বার তিনি লিখলেন, আমি নাকি রেলওয়ে বোর্ডের অন্যতম শীর্ষকর্তা ফাল্গুনী মতিলালকে তেল দিয়ে ইস্টার্ন রেলের ডেপুটি সেক্রেটারি হয়েছি। তর্কের খাতিরে যদি সেটাকে সত্যিও ধরে নিই, তা হলেও ওই ঘটনার সঙ্গে কোচ পিকে-র পারফরম্যান্সের সামান্যতমও সম্পর্ক কোথায়?
’৭৭-এ লিগ ফুটবলে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ শুরুর মুহূর্তে।
অন্য বাংলা কাগজের নামী ফুটবল রিপোর্টার আবার অনেক বার চেষ্টা করেছেন কোনও না কোনও ফুটবলারের সঙ্গে আমার ঝামেলা লাগানোর। আশির দশকের মাঝামাঝি ইস্টবেঙ্গলের শ্রীলঙ্কা ট্যুরে মনোরঞ্জন কোনও ন্যায্য কারণ ছাড়া যেতে চাইল না। আমি বাধ্য হয়ে স্টপারে আনকোরা প্লেয়ার খেলিয়েও চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরলাম।
তার পর ময়দানে ইস্টবেঙ্গলের একটা ম্যাচে কোনও কারণে মনোরঞ্জনকে বাদ দিয়েছি বোধহয়। ব্যস, সেই সাংবাদিক পরের দিনের কাগজে লিখে দিলেন, মনোরঞ্জনের ওপর পুরনো আক্রোশ মেটাতে পিকে ওকে বাদ দিয়েছে। মনাও তাতে তার পর দিনকয়েক প্র্যাকটিসে মুখ হাঁড়ি করে থাকল। যার কোনও ভিত্তি বা কারণ, কোনওটাই ছিল না।
এগুলোকে সামলানোর সেরা উপায় হল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। তুমি একটুও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছ কী পরের দিন রিপোর্টারের লেখায় তোমার নামে নিন্দেমন্দ আগের চেয়েও শত গুণ বেড়ে যাবে। তার চেয়ে চুপ থাকো। মিডিয়া নিজেরাই লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে একটা সময় থেমে যাবে।
যেমন ক্রিকেটে প্রাক্তন পাকিস্তান অধিনায়ক ইমরান খান করেছে। বর্তমান ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনি করে। কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনাল ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার করে থাকে। এই যে এত বছর ধরে আর্সেনাল কোনও বড় ট্রফি জিততে পারছে না, ওয়েঙ্গারকে কেউ হটাতে পেরেছে?
মাঠের যাবতীয় দিকের সব সমালোচনা ম্যানেজ করার ব্যাপারে আমার আর একটা বিরাট শক্তি ছিল আমার স্ত্রী আরতি। যে কোনও ম্যাচে, বিশেষ করে বড় ম্যাচের দিন আর খেলার পরের দিন একটাও কাগজ আমাকে পড়তে দিত না ও।
দু’তিন দিন পরে, যখন মানসিক ভাবে সেই বড় ম্য্যাচের ব্যাপারে আমার পুরোপুরি কুলিং ডাউন হয়ে গিয়েছে, তখন আরতিই প্রতিটা কাগজে বেরনো সেই ম্যাচের সব রিপোর্ট আমাকে পড়িয়ে শোনাত। যাতে আমি আবার আপ-টু-ডেটও থাকতে পারি।
এই আরতিই মোহনবাগান মাঠে সমর্থকদের হাতে কী ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটার থেকে রক্ষা পেয়েছিল! তাতেও অবশ্য মাথা ফাটিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল ওকে।
সাতাত্তরে লিগের বড় ম্যাচে মোহনবাগান হটফেভারিট হওয়া সত্ত্বেও ইস্টবেঙ্গলের কাছে দু’গোলে হেরেছিল। আমার তো তখন মোহনবাগান মাঠে টেকাই দায়! আরতি বলল, চলো তো, পরের ম্যাচটায় গিয়ে দেখি, সমর্থকরা তোমায় কী ‘অভ্যর্থনা’ দেয়!
কিন্তু আরতিকে মেম্বারশিপ গ্যালারিতে চিনে ফেলতেই কয়েকশো মোহনবাগান সমর্থক ঢিল মারতে শুরু করে দেয়। এখনও মনে আছে, সে দিন আমার স্ত্রীর সঙ্গে ওর এক খুব ভাল বন্ধু শেফালিও গিয়েছিলেন মাঠে। তাঁর তো বুকে ইটের আঘাতে প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আর আরতির মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। আমি শেষমেশ পুলিশ কমিশনারকে মোহনবাগান ড্রেসিংরুম থেকেই ফোন করে স্পেশ্যাল পুলিশ জিপ আনিয়ে আরতিদের বাড়ি পাঠালাম। কিন্তু আরতি প্রতিবাদসূচক একটি শব্দ মোহনবাগানকে বলেনি বা লেখেনি। বরং আমাকে বলেছে, আমি তো নিজের থেকে মাঠে গিয়েছিলাম। মোহনবাগান তো আমাকে যেতে বলেনি!
ও বলেছিল, সমর্থকেরা এ রকমই। জিতলে কাঁধে তুলে নাচবে। হারলে পায়ের তলায় পিষবে। ওতে কোচ বা কোচের পরিবারের উত্তেজিত হলে চলে না। তবে দেখতে হবে, কারও প্রাণহানির মতো গুরুতর কিছু না ঘটে যেন।
সেই সময় আবার আমার বড় মেয়ে পলার ডিপথেরিয়া ধরা পড়েছে। সাত বছরের বাচ্চা একটা মেয়ের গলা এত সাংঘাতিক ফুলে গিয়েছিল যে, যন্ত্রণায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ, কথা বন্ধ। বেলেঘাটার হাসপাতালে ভর্তি। ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের দিনও আমাকে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। কারণ, সে দিনই দুপুরে পলাকে ডাক্তার সেরাম দেবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ, অত কমবয়সি রোগীকে ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় তার গার্জেনকে থাকতেই হবে সামনে।
তাতেই আমার মাঠে ঢুকতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ম্যাচে তার পরেই হাবিবের সেই সিটার মিস। যার কাউন্টার অ্যাটাক থেকেই ইস্টবেঙ্গলের প্রথম গোল। ব্যস, আর যায় কোথায়! মোহনবাগান সমর্থক গ্যালারি তো বটেই, কয়েক জন মাঝারি মাপের ক্লাবকর্তাও আমাকে বলতে শুরু করে দিলেন, আপনি দেরি করে আসাতেই হাবিবের সিটার মিস। ওদের কাউন্টার অ্যাটাকে আমাদের ডিফেন্সের নড়বড়ে থাকা। ছেলেদের নাকি মনঃসংযোগে সমস্যা হচ্ছিল ততক্ষণ। এক বারও কেউ জানতে চাইলেন না, দুরারোগ্য রোগে ভোগা আমার বাচ্চা মেয়েটার অবস্থা কেমন? বাঁচবে তো?
তাতেও আমি ওই অপ্রত্যাশিত হারের পর দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিজের দু’ঠোঁট বন্ধ রেখে প্র্যাকটিস করিয়ে গিয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, যে দিন ধূর্জটির মতো জাগবে আমার টিম, সব তছনছ করে দেবে।
আর সত্যিই তা-ই হয়েছিল সাতাত্তরে। শিবের মতোই ভারতীয় ফুটবলে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে মোহনবাগান দেশের প্রথম একক ক্লাব হিসেবে একই মরসুমে শিল্ড-রোভার্স-ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়ে ত্রিমুকুট জেতার নজির গড়েছিল।
পঁচাত্তরে আবার আরেক কাণ্ড! সে বার আমার ইস্টবেঙ্গলের সামনে টানা পাঁচ বার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ময়দানের একটা বিরল রেকর্ডকে স্পর্শ করার সোনার সুযোগ। তার মধ্যেই একটা বিশেষ ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে আমার মেয়ে পলা স্কুল থেকে কিডন্যাপ্‌ড হয়ে গেল!
একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়েকে কী ভাবে নাকি বেহুঁস করে দিয়েছিল অপহরণকারীরা। তখনকার দিনে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইলটোবাইল বলে কিস্যু নেই। তাও লালবাজার প্রায় অসাধ্যসাধন করে শেষমেশ হাওড়া স্টেশনের একটা ফাঁকা লোকাল ট্রেনের কামরা থেকে পলাকে উদ্ধার করেছিল।
আরতি তখন অন্তঃস্বত্ত্বা। সে বছরই ছোট মেয়ে পিক্সির জন্ম। ওই অবস্থায় স্কুলে মেয়ের কোনও খোঁজ না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে আরতি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। জ্ঞান ফিরতে ওই শারীরিক অবস্থাতেও গোটা শহর ছুটে বেড়িয়েছে আমার স্ত্রী। কারণ পরের দিন আমার টিমের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। আমি সব জায়গায় আমার হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে খুঁজতে যেতে পারছি না। যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না পেশাদারি তাড়নায়! অনেকেই সে দিন আমাকে বলেছিল, চাপ দিয়ে তিন পয়েন্ট ছাড়তে বাধ্য করতেই নাকি খেলার আগের দিন আমার পরিবারে ও রকম ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটানো হয়েছিল! যাতে আমি বাধ্য হই আপস করতে।
কিন্তু আমি বরাবরের ঈশ্বরভক্ত মানুষ। সে জন্যই বোধহয় পরমশক্তিমান ঈশ্বর আর ফুটবলদেবতা দু’জনেরই আশীর্বাদ সে দিন আমার ওপর শেষমেশ ঝরে পড়েছিল। পলাকেও উদ্ধার করে দিয়েছিল পুলিশ। আর ম্যাচটাও সহজে জিতেছিলাম।
ফুটবলারদের কম গালমন্দ আমাকে সামলাতে হয়েছে?
বাহাত্তরে ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব আমি নেওয়ায় টিমেরই এক নামী সিনিয়র ফুটবলার নাকি বেজায় চটেছিল। তার পর গোটা মরসুম আমার নামে তার নানা কুত্‌সা রটানো, প্র্যাকটিসে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা, কোনও কোনও ম্যাচে নিজের পুরো একশো ভাগ না দেওয়া লক্ষ করে আমার মনে হয়েছিল, ওই সিনিয়র ডিফেন্ডার সম্পর্কে আমার কানে আসা কথাগুলো বোধহয় ঠিক।
এ রকম বেয়াড়া ফুটবলারকেও সামলানোর রাস্তা আমার জানা ছিল। বিশেষ করে, ম্যাচে ও রকম দেখলে কী করতাম, ওর পজিশনের অন্য ফুটবলারকে বেঞ্চ থেকে তুলে মাঠের ধারে ওয়ার্ম-আপ করাতাম। ওই বেয়াড়া ফুটবলার মাঠের যে সাইডে খেলছে ঠিক তার সামনের সাইডলাইনে চলত বিকল্প ফুটবলারের ওয়ার্ম-আপ নাটক! আর সেটা দেখলেই সেই সিনিয়র ফুটবলারের চালাকি বন্ধ হয়ে যেত। নিজের পুরো একশোভাগ দিয়ে তখন খেলত সে! যাতে তাকে আমি বসাতে না পারি। তবে এক তারকা ফরোয়ার্ডের অবিশ্বাস্য অভিমান নিয়ে আমি সত্যিই সমস্যায় পড়েছিলাম। কী জবাব দেব আমার সেই প্রিয় ফুটবলারের অভাবিত অভিযোগের!
সেই ফরোয়ার্ড এক দিন সস্ত্রীক আমার কাছে এসে অভিযোগ করে বসল, প্রদীপদা আমার বাড়ির লেটার বক্সে প্রায় রোজ কোনও নামধাম ছাড়া একটা-দুটো চিঠি আসছে যে, আমার বৌয়ের সঙ্গে আপনার নাকি অ্যাফেয়ার আছে! আমি কী করব প্রদীপদা!
প্রথমে কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব থেকে, তার পর সেই ফরোয়ার্ডকে বলেছিলাম, কথাটা তো ঠিকই। কারণ, তোমার বৌ আমার কন্যাসম। আর অ্যাফেয়ার মানে তো সম্পর্ক। তা বাপ-মেয়েও তো একটা সম্পর্ক, না কি? শুনে সেই ফুটবলার আর তার বৌ দু’জনেই হো হো করে হাসতে লাগল। আমিও একটা বিচ্ছিরি অবস্থা থেকে রেহাই পেয়েছিলাম যেন সে দিন।
আসলে সেই ফরোয়ার্ড তখন ইস্টবেঙ্গলে আমার কোচিংয়ে নতুন ফুটবলজীবন ফিরে পেয়েছে। ওর বিয়েও বলতে গেলে আমিই দাঁড়িয়ে দিয়েছি। ফলে এখনও মাঝেমধ্যে মনে হয়, হতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের ওটা একটা নোংরা গেমপ্ল্যান ছিল মাঠে পারছি না তো, দেখি যদি অন্য ভাবে কোচ পিকে-কে মারা যায়!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/%E0%A6%A4-%E0%A6%A8-%E0%A6%AA%E0%A7%9F-%E0%A6%A8-%E0%A6%9F-%E0%A6%9B-%E0%A7%9C-%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%AF-%E0%A6%9A-%E0%A6%AA-%E0%A6%A6-%E0%A6%A4-%E0%A6%86%E0%A6%AE-%E0%A6%B0-%E0%A6%AE-%E0%A7%9F-%E0%A6%95-%E0%A6%85%E0%A6%AA%E0%A6%B9%E0%A6%B0%E0%A6%A3-%E0%A6%95%E0%A6%B0-%E0%A6%B9%E0%A7%9F-1.92929

Friday, 29 July 2016

সে দিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা (On Shyamal Mitra)

সে দিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা

নির্ভার সেই ধ্বনিতরঙ্গে এ গান ভাসলে আজও মন উদ্বেল হয়। কিন্তু বাঙালি যে কেন তাঁকে শুধুই প্রেমিক-গায়ক ছাপ্পা দিয়ে এল, বোঝা গেল না! শ্যামল মিত্র। লিখছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৪, ০০:০৫:০০
1
শ্যামল মিত্রের মৃত্যুর পর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটা ভাববার মতো কথা বলেছিলেন, “আমার পরে বাংলা রোম্যান্টিক গানে তো ও-ই ছিল।”
কথাটার সত্যতা নিয়ে খুব যে ভাবার আছে তা নয়, কারণ ১৯৫৫-৫৬ থেকে ১৯৬৫-৬৬ অবধি বাংলা রোম্যান্টিক গানে শ্যামলের জনপ্রিয়তা ছিল হেমন্তর প্রায় সমতুল্য।
তখন বাংলা সিনেমায় হেমন্ত একের পর এক রোম্যান্টিক গান দিয়ে যাচ্ছেন, আর নন-ফিল্মিকে রোম্যান্সের জোয়ার ডেকে দিচ্ছেন শ্যামল। কী রকম জোয়ার তাতে পরে আসছি, তার আগে বলি ভাবার বিষয়টা কী?
ভাবার হল, কী ভাবে হেমন্ত ও শ্যামল বাংলা রোম্যান্টিক গানকে নিজেদের মতো করে দুটো আকার-প্রকার গোত্রে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
এক হল, প্রেমের গান, লাভ সং, যেখানে হেমন্তর বিচরণ।
দুই, যাকে বলা হয় লাভার বয় সং, তরুণ উচ্ছল প্রেমিকের গান, উষ্ণ প্রেমের মিঠে-নোনতা যে গান কখনও প্রিয়ার কণ্ঠ জড়িয়ে, কখনও প্রিয়াকে বিব্রত, রক্তিমাভা করার জন্য দুনিয়াকে শুনিয়ে গাওয়া হয়।
এই দ্বিতীয় ধারার পত্তনই বলা যায় শ্যামলের গায়কিতে। এবং এ গানে ওঁর কোনও চ্যালেঞ্জার কখনও তৈরি হয়নি।
এই লাভার বয় সঙের পাশাপাশি সে সময় তিনি কিন্তু ‘এমন দিন আসতে পারে’, ‘আমি তোমার পাশে যেমন আছি’, ‘যদি ডাকো এপার হতে’-র মতো গভীর অনুরণন ও চোখের জলের প্রেমের গানও রেকর্ড করে গেছেন। কাউকে ভুলতে দেননি যে, ওঁর হিট গানের জয়যাত্রা ১৯৫২-য় সুধীরলাল চক্রবর্তীর মৃত্যুতে ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’ গুরুপ্রণাম দিয়ে।
লাভ সং ও লাভার বয় সঙের বিলিতি চেহারাটার দিকে একটু চোখ ফেললে হয়।
ন্যাটকিং কোল, ফ্র্যাঙ্ক সিনাট্রা, জিম রিভজ-রা যে প্রেমের গান গাইতেন তা লাভ সং, আবার এলভিস প্রেসলির একেবারে প্রথম দিকের ‘লাভিং ইউ’, প্যাট বুন-এর ‘ও, ও, বার্নাডিন!’ ও হরেক এ রকম, টোনি ব্রেন্ট-এর ‘সামওয়ান এলস্ ইজ ইন ইওর আর্মজ টুনাইট’, ক্লিফ রিচার্ড-এর প্রায় সবই, অ্যান্ডি উইলিয়ামজ-এর কত কিছু কিংবা এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্ক-এর ‘প্লিজ রিলিজ মি লেট মি গো’-কে নমুনা করা হত লাভার বয় সঙের।
তবে শ্যামল যে প্রেমিকের গানের ধারার সূচনা করলেন তার কোথাও কোনও বিলিতি ছাপ নেই, পুরোটাই ওঁর নিজস্ব ধরন, বলন, গায়ন ও গঠনে ধরা। যা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাঙালিকে বিলকুল পাগল করে ছেড়েছিল।
পঞ্চাশের দশকে শ্যামল যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন জলসা আলো করার মতো এক রম্য, রোম্যান্টিক উপস্থিতিও ছিল ওঁর।
টিকোলো নাক, কোঁকড়া চুল, ভাসা-ভাসা আয়ত চোখ ও আকর্ষক মাজা গায়ের রঙের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্মোহনে কাজ করত একটা গম্ভীর আনুনাসিক কণ্ঠধ্বনি। শচীনদেবের মতো ওঁরও ন্যাজাল টোনের একটা জাদু ছিল আজকালকার বাগবুলিতে ইউএসপি।
হেমন্তর মতো শ্যামলেরও বিপুল সাফল্যের হেতু ওঁর সহজ ও সরল অ্যাপ্রোচ। সুর নিয়ে অনাবশ্যক প্যাঁচ পয়জারে বিশ্বাস ছিল না, রোম্যান্টিক কণ্ঠের রোম্যান্টিকতা যতখানি সম্ভব বাঁচিয়ে রেখে আলতো করে সুর দিয়ে বাণীকে স্পর্শ করতেন। কিন্তু ওঁর গলা ছিল খোলা— যেটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও উল্লেখ করেছেন— এবং ক্লিফ রিচার্ড, টোনি ব্রেন্ট জাতীয় লাভার বয় সংস্টারদের মতো ক্রুনিং বা শিল্পিত চাপা ধ্বনির চর্চা করতেন না। বড় অনায়াসে লম্বা লম্বা সুরের টান দিতেন এবং ধ্বনির রেশ ধরে রাখতেন, ওঁর গলার মধ্যে কোথাও যেন একটা ভায়োলিন টাচ আসত।
ওঁর খাদের আওয়াজটা ছিল চমৎকার, ওপরের সপ্তকে প্রবেশ ঘটত আনুনাসিক ধ্বনির, এবং দুইয়ে মিলে প্যাথস বা বিষাদ সৃষ্টির সুন্দর ব্যবস্থা হত। প্রেমিকের গানকে এত সরল ভাবে বরাবর গেয়ে গেছেন যে ওঁর চলে যাওয়াকে সে সময় উল্লেখ করা হয়েছিল ‘এক প্রেমিকের প্রস্থান’ বলে।
বাঙালির কাছে এই প্রেমিকটি কেমন ছিলেন তার কয়েকটা ছবি দিই। মধ্য কলকাতার ক্রিক রো পাড়ার বিখ্যাত ভানু বোসের জলসায় শ্যামল ছিলেন স্টার অ্যাট্র্যাকশন নাম্বার ওয়ান। অত্যন্ত রক্ষণশীল বাড়ির সুন্দরী মেয়েরা সারা রাত শাল মুড়ি দিয়ে জলসা শুনত শ্যামলকে শুনবে ও দেখবে বলে। ওঁর কালো হিন্দুস্তান ফোর্টিনটা ঘেরাও হয়ে যেত ফ্যানদের দ্বারা।
একবার প্যান্ডেলে ঢুকেছেন, বালিকা-যুবতী-মহিলারা গিয়ে ছেঁকে ধরলেন অটোগ্রাফের জন্য। সাফারি টাইপের জোড়া বুকপকেটের ছাই ছাই গ্যাবার্ডিনের শার্ট পরনে ছিল ওঁর সেদিন। শ্যামল পকেট থেকে ফাউন্টেন পেন বার করে সই করবেন, হঠাৎ কলমটা ছিটকে পড়ল মাটিতে। সেই কলম কুড়োতে তখন পাঁচ যুবতীর মধ্যে ঠেলাঠেলি। ততক্ষণে এক মহিলা নিজের কলমটা ওঁকে দিয়ে বললেন, “আপনি আমারটা দিয়ে সই করুন আর কলমটা রেখে দিন।” শ্যামল লাজুক হেসে বললেন, “আপনারটা দিয়েই লিখছি, কিন্তু রাখছি না। ওটা হয় নাকি?” যা শুনে পাড়ার এক দাদা মন্তব্য করলেন অদূর থেকে, “এই হল কলির কৃষ্ণ।”
শ্যামল মিত্রের মধ্যে সত্যিই একটা কৃষ্ণ-কৃষ্ণ ব্যাপার ছিল। স্টেজে বসলে উনি জানতেন অডিয়েন্স ওঁকে তারিয়ে তারিয়ে দেখছে ও গিলে খাচ্ছে। ওঁর সুরে গান করা ও অনুরাগিণী বনশ্রী সেনগুপ্ত যেমন বললেন, “অঙ্গভঙ্গিটঙ্গি কিছু ছিল না। কী সুন্দর মুখ নিচু করে শুধু গানটায় ডুবে থাকতেন স্টেজে বসলে। ওঁর রোম্যান্টিক স্টাইলেরই অঙ্গ ওই ভঙ্গিটা।”
আর অডিয়েন্সকে হাতে নেওয়ার আয়োজনে এক বড় ব্যাপার ছিল গানের সিলেকশন। লম্বা টানের গান দিয়ে আসরের মুখপাত করতেন। আজও ভুলতে পারিনি ভানু বোসের জলসায় ওঁর মঞ্চে বসে গেয়ে ওঠা ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা’, আরেকবার (গানটা কী করুণ তা মাথায় রেখেও) ‘যদি ডাকো এপার হতে’ এবং একবার ছন্দে আর গা-শিরশিরে রোম্যান্সে ‘সারাবেলা আজি কে ডাকে’। বালক ছিলাম বলে মেয়েদের ভিড়ে বসতে পেতাম, তাই শুনতে পেতাম ‘চমকে ঠমকে গরবী গরবে’ কথাগুলোর সঙ্গে ওদের বড় বড় নিশ্বাস পড়া।
সঙ্গতে মহানায়ক
জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় শ্যামল মিত্রকে নিয়ে বলতে গিয়ে ব্যবহার করলেন ‘প্যাকেজ’ শব্দটা। বললেন, “শ্যামলবাবুর আওয়াজ খুব বড় নয়, কিন্তু খুব সুরেলা। সুর করতেনও খুব ভাল। ওঁর অনেক হিট গানেরই তো সুর ওঁর নিজের। খুব কাজে লাগিয়েছেন ওঁর কণ্ঠের আনুনাসিক ধ্বনি। আর গাইতেনও রোম্যান্টিকালি। ফলে সব মিলিয়ে একটা চমৎকার প্যাকেজ। যা ওঁকে দারুণ সাফল্য দিয়েছে।”
এই প্যাকেজিং ছাড়াও শ্যামল মিত্রের সাফল্যে আরও যে দুটি ব্যাপারের প্রবল প্রভাব— ওঁর অপূর্ব জিনিয়াস ও এলিগ্যান্স— সেই প্রতিভা ও চারুতা নিয়ে ওঁর ভক্তরা ভাবার সুযোগই পাননি ১৯৮৭-তে মাত্র আটান্ন (মতান্তরে উনষট্টি) বছরে ওঁর অকালমৃত্যুর আগে।  কী অবলীলায় যে কত লোকাশ্রয়ী, রাগাশ্রয়ী গান গেয়েছেন ও সুর করেছেন, কিন্তু এতটাই নির্দর্প, নির্ভার স্বাক্ষরে যে সে গানের পিছনের তালিম নিয়ে কেউ ভাবার কথাও ভাবেনি।
সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে বছর পাঁচেকের তালিম, চিন্ময় লাহিড়ির রচনা গাওয়া বা সলিল চৌধুরীর অবিশ্বাস্য সব কম্পোজিশন (‘আহা, ওই আঁকাবাঁকা যে পথ’, ‘যা যা রে যা, যা পাখি’, ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’ বা কলাবতী রাগিণীতে ‘লাল পাথর’ ছবির ‘ডেকো না মোরে ডেকো না গো আর’) অমর করে যাওয়া কোন স্তরের শিক্ষা, মেধা ও ক্রিয়ার ছবি তুলে ধরে তা ওঁর অবর্তমানেই শ্রোতার খেয়ালে আসছে।
ওঁর সেরা সময়ে শ্যামলের গাওয়া বা সুর করা গান রেকর্ড হবে আর বাজার ধরে নেবে এটাই নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। এত ঘন ঘন এটা ঘটত যে একটা সময় শ্যামল মিত্র বলতে এক স্বপ্নের ব্যাপারি বোঝাত। নিজেকে নিয়ে মানুষের জাদুচিত্র বয়নে আবার ইন্ধন জুগিয়েছে ওঁর অতীব সফল চলচ্চিত্র প্রযোজনার উদ্যোগ। ১৯৬৩-তে উত্তমকুমার ও তনুজাকে নিয়ে প্রযোজিত ও সুরারোপিত ‘দেয়া নেয়া’ ছবি যে কী তোলপাড় ফেলেছিল বাঙালিজীবনে, তা আজ বললে গল্পকথার মতো শোনাবে। পর পর তিন বারের চেষ্টায় এক বন্ধুকে নিয়ে পাঁচ সিকির টিকিটে হলে গলতে পেরেছিলাম। শো চলাকালীনই বন্ধুটি তনুজার প্রেমে পড়ে যায় এবং শো থেকে বার হয় উত্তমের লিপে শ্যামলের গান গুনগুন করতে করতে। কিন্তু তখন ক’জন বালক, কিশোর, যুবক বা আরও বড়রা ধারণা করতে পেরেছিল যে ছবির গল্পটা আসলে শ্যামল মিত্রেরই জীবনের বৃত্তান্তের আদলে গড়া!
নৈহাটির প্রসিদ্ধ ডাক্তার বাবা সাধনবাবুর বাসনা যে ছেলে তাঁর মতোই ডাক্তারিতে আসবে, আর শ্যামলের আকাঙ্ক্ষা সে গায়ক হবে। এক সময় সান্নিধ্যে আসা হল সলিল চৌধুরীর গণনাট্য সঙ্ঘের। মিছিলে গলা মেলানো হল ‘ও আলোর পথযাত্রী’তে এবং ১৯৪৬-এ বাড়ি ছেড়ে ওঠা হল কলকাতার মেসবাড়িতে। আর যাওয়া শুরু হল গুরু সুধীরলালের কাছে।
কিছু দিন আগে অবধি গল্পের পিছনের এই গল্প জানা ছিল না আমারও। ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’-র গায়কও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের গানপাগলদের কাছে খুব একটা রক্তমাংসের মানুষ নন, যতটা কল্পনা ও কিছুটা স্বপ্নে ধরা। যে স্বপ্নটায় রক্তের ছোপ এসে পড়ল ১৯৬৯-এর ২১ মে তারিখে ওঁর মোটর গাড়ির অ্যাক্সিডেন্টে।
সেটা টিভিতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর ছড়ানোর দিনকাল নয়, শিল্পীদের নিয়ে পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায় খবর আসার দিনও নয়। গেয়ে গেয়ে, লোকের মনে মনে দাগ কেটে সেলিব্রিটি হওয়ার যুগ তাঁদের। কাগজে কী এসেছিল জানি না, তবে শ্যামলবাবুর দুর্ঘটনার দুঃসংবাদ মুখে মুখেই চরে গিয়েছিল এবং পাড়ায় পাড়ায় লোকমুখে ঘুরতে শুরু করেছিল। অনেকটা উত্তমকুমারের হার্ট অ্যাটাকের খবরের মতো। ‘দেয়া- নেয়া’-র পর থেকেই যে উত্তম ও শ্যামল অত্যাগমন জুটি।
পাড়ার রকে রকে শ্যামলের খবর ভর করার আরেক কারণ, এই শ্যামলের গানই দেড় দশক ধরে মাত করে রেখেছিল  রকে রকে। আশেপাশে বাড়ির মেয়েদের লক্ষ্যে প্রেমপত্র পাঠানোর বিকল্প ছিল সুরেলা বন্ধু ধরে গাওয়ানো ‘নাম রেখেছি বনলতা’, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’, ‘কার মঞ্জির বাজে রিনি ঠিনি ঠিনি’, ‘তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর’ বা ‘ভালবাস তুমি শুনেছি অনেক বার’।
উত্তম-হেমন্তের মতো উত্তম-শ্যামল গোছের একটা সমীকরণ দীর্ঘদিন চালু চিল ফ্যানদের মধ্যে। সম্ভবত ‘সাগরিকা’ ছবিতে ওঁদের মেগাহিট নাম্বার ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ দিয়েই যার শুরু।
মৃত্যুর সঙ্গে লম্বা লড়াই করে শ্যামলের প্রাণে ও গানে ফিরে আসা এবং এঁর গান ও সুরের প্রসঙ্গে যাবার আগে আরেকটা ছোট্ট ছবি তুলে দেব ’৫৭-’৫৮ সালের এক পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যার। আমার প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটে বই কিনে ফিরছি, পূরবী সিনেমা পেরিয়ে একটা রেকর্ড রেডিয়োর শপ উইন্ডোর সামনে থ মেরে দাঁড়িয়ে গেলাম বড় ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবির সামনে। স্যুট পরা তরুণ শ্যামল মিত্র। আমার টিউটর মানবেন না ওটা শ্যামল। আমরা বাজি ধরে ভিতরে ঢুকে কাউন্টারে বসা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম। উনি হেসে বললেন ‘‘হ্যাঁ, ওটা শ্যামল মিত্র। ওই ছবি দেখেই তো বায়াররা ঢুকে আসে।” শ্যামলের অ্যাক্সিডেন্টে যে রক্তের ছোপের কথা বলেছিলাম সেই রক্ত এসে লেগেছিল মনের এই অমলিন ছবিটার উপর।
মনের সেই ছবির ছোপটা অ্যাদ্দিনে সরে গেছে, ছবিটা আরও ঝকঝকে হল আরতি মুখোপাধ্যায়ের কথায় সেদিন। বললেন, “‘হেমন্তদা’, ‘মান্নাদা’ তো বড় গায়ক, ওঁদের পাশাপাশি শ্যামলদাও যে কত বড় একজন তা তো নতুন করে বলতে হয় না। কী সুর গলায়, আর কী রোম্যান্টিসিজম! এত সুন্দর করে গানের কথাগুলো বলতেন যেন প্রেম ঝরে পড়ছে। যে মানুষটার মুখে কোনও দিনও কারও সমালোচনা বা নিন্দের একটা কথা শুনিনি সেই মনটারই একটা ছাপ ওঁর গানে।
কাজ তো প্রচুরই করেছেন। গাওয়া, সুর করা, ফিল্মে সুর দেওয়া ছাড়াও ছবির প্রোডাকশন। এই সমস্ত কাজের মধ্যেই কিন্তু ওঁর ওই রোম্যান্টিক মনটা ছড়ানো। গোছানো, নিপুণ, পার্ফেক্ট।”
আরতির এই উচ্ছ্বাস ও অনুরাগের যথেষ্ট কারণ আছে। বম্বে থেকে তনুজাকে নায়িকা করে এনে অত অপূর্ব অনুরাগে অনুলিপ্ত ছবিতে প্লেব্যাকের ব্রেক দিলেন আরতিকে এমন একটা গানে যা আজও বেজে উঠলে মনের অ্যালবামের পাতা ওল্টানোর কাজটা শুরু হয় মানুষের। কী গান? না, ‘মাধবী মধুপে হল মিতালি’।
আরতি মুখোপাধ্যায় ও কিশোরকুমারের মাঝে
কাজটায় সেই সময়ে আধুনিক সুরের রোম্যান্সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু গানটা হয়েছে বহুকালের জন্য। শ্যামলের ‘বয় মিটস গার্ল’ মেজাজের (প্রেমের প্রথম ঝলক ও শিহরনের) গানেও এমন একটা Wit বা চোখা রস ও melodic intuition বা সুরের স্বজ্ঞা, যে তারা অনায়াসেই বয়স ও সময় অতিক্রম করে। ওঁর লাভার বয় সং গোত্রের গানও সব মানুষের মন ভোলায় আজও। কেউ সে-সব গাইলেই মনটা দুলে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে একটা খোঁচও ধরে। কই, সে-সব নিখুঁত সুর লাগানো বলার মাধুরী ও এলিগ্যান্সটা তো এল না!
মে মাসের সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর গানে ফিরে শ্যামল গেয়েছিলেন বন্ধু-গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ‘তোমাদের ভালবাসা’ তাঁর অগণিত শ্রোতা-ভক্তকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন হিসেবে। চোখে জল আনা অসম্ভব সুগীত গানটা কিন্তু মানুষকে সেদিনও চমকে দিয়েছিল।  হয়তো সেই প্রথম সে ভাবে তাঁরা নজর করলেন যে তাঁদের প্রেমিক-গায়ক জীবনের প্রথম থেকেই বিদায়, বিচ্ছেদ ও হারিয়ে যাওয়ার বিষাদগীতি গেয়ে এসেছেন। ‘ও শিমুল বন দাও রাঙিয়ে মন’-এর মতো প্রাণোচ্ছল রচনার পাশাপাশি ‘এমন দিন আসতে পারে যখন তুমি দেখবে আমি নাই’ বা ‘যদি ডাকো ওপার হতে’-র মতো মন-মুচড়ানো এলিজি।
অনেকের হয়তো মনে পড়ল যে অ্যাক্সিডেন্টের বছর তিনেক আগেও তিনি গৌরীপ্রসন্নর লিরিকে রেকর্ড করেছেন, “এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মন মোর যেতে নাহি চায়/ না না না যাব না’। চমকের আরেকটা কারণও লোকে খেয়াল করল। নিজের সুরে গাওয়া শ্যামলের অধিকাংশ গানই বিরহবেদনার। শৃঙ্গার ও করুণ রসের মধ্যে ওঁর কান্না হাসির দোলদোলানি বরাবর জারি ছিল। আমরা দেখি বা না দেখি। ওঁর এই বিরহ সুরের প্রবণতার পেছনে কাজ করছে আমার আজ মনে হয়, ওঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি ভাললাগা-ভালবাসার টান।
আশ্রম-ইস্কুল-গুরু ধরে তো ওঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতে আসা নয়, কেবল ভাল লাগা আনুগত্য থেকে। তাতেও তো নিটোল সুরে অনুরাগের ছোঁয়া দিয়ে গেয়েছেন কত গান! ছেলেবেলার একটা বিশেষ স্মৃতি মনে আসছে যা আগেও বলেছি। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ বিদ্যালয়ে এক সন্ধ্যায় আমাদের জনাকয়েককে নিয়ে গানের ক্লাস নিচ্ছিলেন অন্ধশিক্ষক গোপীদা। কী একটা বোঝাচ্ছিলেন হারমোনিয়াম ধরে। পাশের ব্রেইল লাইব্রেরি থেকে কার ট্রানজিসটরে ভেসে এল শ্যামলের কণ্ঠে, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাহিরে’।
কোনও অন্ধ মানুষের কাছে বিশেষত গোপীদার কাছে এ গানের অন্য একটা তাৎপর্য আছে। কিন্তু সে  দিন তিনি এবং আমরা সবাই আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম শ্যামলবাবুর রেন্ডারিং-এ। অদ্ভুত একটা কথাও বললেন গোপীদা, “দেখো, কবির কথা ও সুরের সঙ্গে কী সুন্দর চলছে শ্যামল। গানের কান্নাটা ধরছে কীরকম!”
গানের মধ্যে কান্না ধরার একটা সহজাত ক্ষমতা গোড়ার থেকেই তৈরি ছিল শ্যামলের। দু’দশক ধরে তারই পরিশীলনে হয়তো ষাটের দশকের মাধ্যমে ডবল্ ভার্সান ছবির ‘অমানুষ’-এ ওঁর সুরে বেরিয়ে এল কিশোরকুমারের ওই চার্টবাস্টার নাম্বার, ‘কী আশায় বাঁধি খেলা ঘর বেদনার বালুচরে’। সর্বকালের বাংলা আধুনিকের সেরার কোটায় থেকে যাবে সে-গান।
সলিল চৌধুরী, রবীন চট্টোপাধ্যায়, সুধীন দাশগুপ্তর মতো সেরা কম্পোজার এবং গৌরীপ্রসন্ন, পবিত্র মিত্রের মতো বড় গীতিকারদের সঙ্গে যেমন দুরন্ত সব কাজ করেছেন শ্যামল, তেমনি অকাতরে সুর দিয়ে গেছেন অন্যের সেরা গানে। কখনও সেটা কিশোর, কখনও নিজের সঙ্গে ডুয়েটে হেমন্ত (‘ও বিধি রে’) বা মানবেন্দ্র (‘দোলে দোদুল দোলে’), কখনও আরতি (‘মাধবী মধুপে’), আশা (‘নেই সেই পূর্ণিমা রাত’) অথবা হৈমন্তী (‘এমন স্বপনও কখনও দেখিনি আগে’)।
তবে একটা গান শ্যামল গাইতেনই জলসায় এলে ষাটের দশক জুড়ে। ‘দ্বীপের নাম টিয়ারঙ’ ছবিতে রবীন চট্টেপাধ্যায় সুরে লোকাঙ্গিক ‘আমি চান্দেরি শাম্পান যদি পাই’। একটা লম্বা সময় ধরে লোকাশ্রিত সুরে অপূর্ব সব আধুনিক কম্পোজ করেছেন শ্যামল নিজেও। এত বিচিত্র অঞ্চলে যার চলাফেরা সেই শ্যামলকে কেন যে শুধু প্রেমের গানের শিল্পী করে ধরে রাখল বাঙালি, এটাই এখন বড় ভাবাচ্ছে।
অগুনতি স্মরণীয় বাংলা হিট উপহার দেওয়া, প্রায় একশো ছবির নেপথ্যে কণ্ঠ দেওয়া আর প্রায় পঞ্চাশ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করা শ্যামল মিত্রর শেষ ক’টা বছর খুব ভাল কেটেছে বলা যায় না। বাংলা আধুনিকের স্বর্ণযুগের অবসান লগ্ন সেটা। নতুন কাজ তেমন হচ্ছে না, সেরা শিল্পীদের কাজ হয়েছে, তাঁদের পুরনো গান নিয়ে জলসায় বসা।
এর মধ্যেও ছবিতে সুর করেছেন। গলা দিয়েছেন শ্যামল। কিন্তু হেমন্ত, সতীনাথ, মানবেন্দ্রর মতো তিনিও টের পাচ্ছিলেন যে বাংলা আধুনিক একই সঙ্গে দুই শিল্পেই (কলা অর্থে ও ব্যবসা অর্থে) মার খাচ্ছে।  হেমন্ত, সতীনাথ, মানবেন্দ্রর সঙ্গে কথাবার্তাতেই বুঝতে পারতাম ওঁদের আশঙ্কার কথা। শ্যামলের শেষ দিকের দুটি আসরে উপস্থিত থেকেও ওঁর বেদনার একটা আঁচ হয়তো পেয়েছিলাম।
প্রথমটা কলামন্দিরের একটা সান্ধ্য আসর, যেখানে ওঁর গানের আগে অনুষ্ঠান ছিল সংযুক্তা পানিগ্রাহীর ওড়িশি নৃত্য। আমার ধারণা, নাচের আগেই হওয়া উচিত ছিল শ্যামলের নির্ভার অন্তরঙ্গ গানগুলো। সংযুক্তা নেচেছিলেন অতি চমৎকার, কিন্তু নাচের আসরের ওই তুমুল ধ্বনি তরঙ্গের পর শ্যামল যখন নম্র আওয়াজের টানে বলছেন, ‘তরীখানি ভাসিয়েছিলেম ওই কূলে’ কিংবা ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে ভেবেছিল একটি পাখি’ বা ‘আমি তোমার কাছেই ফিরে আসব’, আমাদের অনেকেরই মনে হয়েছে, এ হেন গানের জন্য এক সন্ধ্যার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তত দিনে স্বর্ণযুগ ও বাংলাগানের রাশ তো ক্রমশই চলে যাচ্ছে ভিন্ন হাতে। ভিন্ন জমানায়...।  দ্বিতীয় আসর, গল্ফ গ্রিনের গায়ে বিজয়গড়ের কালীপুজোর জলসায়। সেই পুরনো শান্ত মেজাজে পুরনো হিটই গাইলেন। শ্রোতার বয়েস বিচার করে ছন্দ ও গতির গান। ‘ও শিমুল বন’, ‘মহুল ফুলে জমেছে মউ’। ‘চৈতালী চাঁদ যায় ডুবে’, ‘নীল আকাশের ওই কোলে’, ‘এই পথে যায় চলে’ এমনকী সলিলের সুরে ‘আহা আঁকাবাঁকা যে পথ যায় সুদূরে’।
বুঝলাম, অডিয়েন্স বিচার করেই যুগের সঙ্গে নিজেকে মানাতে হচ্ছে শ্যামল মিত্রকে। শরীরও খুব দুর্বল দেখালো, স্টেজে উঠতে-নামতে বেগ পেলেন। তবু একবারটি মনে হয়নি ‘ওই আঁকাবাঁকা পথে’র এত সুদূরে চলে যাবেন।
এই আসরের ঠিক কুড়ি দিন পর চলে গেলেন বাঙালির প্রিয় প্রেমিক গায়ক।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/%E0%A6%B8-%E0%A6%A6-%E0%A6%A8-%E0%A6%B0-%E0%A6%B8-%E0%A6%A8-%E0%A6%9D%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%A8-%E0%A6%A7-%E0%A6%AF-1.94705