Saturday, 25 March 2017

২০ নম্বর পটলডাঙা স্ট্রিট (Narayan Gangopadhyay)

২০ নম্বর পটলডাঙা স্ট্রিট

এককালে যা ছিল সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আস্তানা। এ পাড়াই টেনিদা আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গর দুর্ধর্ষ সব কর্মকাণ্ডের আঁতুড় ঘর। ঘুরে এসে লিখছেন বিনোদ ঘোষাল

২৯ অক্টোবর, ২০১৬, ০০:০০:০৫
narayan gangapadhay

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছবি: পরিমল গোস্বামী

সুনন্দর জার্নাল তখন হই হই করে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
বাঙালি পাঠক প্রতি সংখ্যার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন কলামটি পড়বেন বলে।
প্রতিটি কিস্তিই যেন নলেন গুড়ের রসে ডোবানো এক-একটি তীক্ষ্ণ তির।
তেমনই একটি সংখ্যায় পাড়ার কালীপুজো নিয়ে অসুস্থ শরীরে সুনন্দ লিখেছেন, ‘‘এই এক ঘণ্টার মধ্যে বার আষ্টেক শুনেছি, ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’। অকালমৃত পান্নালাল ভট্টাচার্যের দুর্ভাগ্য (না না আমারই), এমন দরদ দিয়ে গাওয়া গানটিও আমার যমযন্ত্রণা হয়ে উঠেছে। যত দূর খবর পেয়েছি শ্যামাপুজোয় পরম উৎসাহী যুবকবৃন্দের দু’দিনে আনন্দের বন্যার সাধও মেটেনি, আশাও পোরেনি। তারা আরও দিন তিনেক প্রতিমা প্যান্ডেলে রেখে দেবেন এবং এই সঙ্গীতের মহোৎসব সমানে চালিয়ে যাবেন।’’
ব্যঙ্গরসের লেখাটির শেষ লাইন পড়ে একটু চমকেই উঠেছিলেন পাঠক।
নারায়ণ লিখছেন, ‘‘সুতরাং অসুস্থ শরীরে জার্নাল লিখতে লিখতে ভাবছি পরের সংখ্যায় ‘দেশ’-এ সুনন্দর জার্নালের পাতাটি যদি অদৃশ্য হয় আশা করি তাহলে আপনারা কেউই বিস্মিত হবেন না। জানবেন আরেকটি কমনম্যান বাঙালীর অবলুপ্তি বা আত্মবিসর্জন ঘটল।’’ 
সেদিন অবশ্য সকলেই মুচকি হেসে ভেবেছিলেন, ধুস তাই আবার হয় নাকি! এও নিশ্চয়ই এক নারায়ণী রস।
কিন্তু তারপর যখন আর সত্যিই প্রকাশ পেল না সুনন্দ, তত দিনে গোটা বাংলার মানুষ জেনে গিয়েছেন তাদের প্রিয় জার্নাল আর সত্যিই কোনও দিন প্রকাশ পাবে না। আজন্ম রসিক নারায়ণ এবার বড় বাস্তব রসিকতা করেছেন তার নিজের জীবনের সঙ্গেই!
কী করে যে আগাম জেনে গিয়েছিলেন নিজের চলে যাওয়া!

•••••
বাবা প্রমথনাথ ছিলেন দুঁদে দারোগা। আরবি ঘোড়ায় চেপে তিরিশ মাইল দূরে ডাকাত ধরতে যেতেন।
ডাকাত ধরে বাড়ি ফিরেই ছোট তারকনাথকে (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আসল নাম) প্রথম প্রশ্ন, যে বইগুলো ভিপিতে আসার ছিল এসেছে?
এমনই ছিল তাঁর বইয়ের নেশা। সময় পেলেই ডুবে যেতেন দেশ বিদেশের নানা বইয়ে।
ওই সময়ে পুলিশে বই পড়ছে সেটাকে পুলিশমহলে ভারী অন্যায় এবং লজ্জাজনক ব্যাপার বলে ধরা হতো, কিন্তু বাবা ছিলেন পুরো উল্টো। বই-অন্ত প্রাণ। বাড়িতে বিশাল লাইব্রেরি, সেখানে শেলি মিলটন শেক্সপিয়র এর পাশাপাশি থাকে বাংলাদেশের প্রায় সব সাহিত্যপত্রিকা।
নিজে যেমন গোগ্রাসে পড়তেন ছেলের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পড়ার নেশা।
ফলে যে বয়েসে খোকাখুকুর গল্প পড়ে মন ভরার কথা, সেই বয়েসেই ছেলে পড়ে ফেলল ভারতবর্ষর পাতা থেকে ‘শ্রীকান্তর ভ্রমণ কাহিনী’, দেশবন্ধু দাশের ‘স্বামী’র মতো প্রাপ্তমনস্ক লেখা।
সব যে বুঝত তা নয়, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত দোলা লাগত।

•••••
পড়তে পড়তে ইস্কুল জীবনেই একদিন শুরু হয়ে গেল কবিতা লেখা।
নিভৃতে কবিতা চর্চার জায়গা হল বাড়ির বারান্দার এক কোণে ভাঙাচোরা জিনিসে ভর্তি এক কাঠের স্তুপ।
সেই স্তূপের ওপরেই বসে চলতে লাগল অবিরাম কবিতাচর্চা। নীরব সাক্ষী শুধু অজস্র ইঁদুর। লেখে, ছিঁড়ে ফেলে আবার লেখে।
এর মধ্যেই আনন্দলহরী সিরিজের বেশ কিছু ক্রাইম থ্রিলার পরে বালকের মনে হল এইরকম গল্প লিখলে কেমন হয়?
ভাবা মাত্র কাজ শুরু।
কাব্যচর্চা বন্ধ করে আপাদমস্তক একটি সাহিত্য পত্রিকা করে ফেললেন। সে পত্রিকার তিনিই সম্পাদক, লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রক এবং পাঠক।
নিজের পত্রিকাতেই প্রকাশ পেল নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের প্রথম উপন্যাস।
সেও এক মজার কাহিনি। আসছি সেই গল্পে।

•••••
সিটি কলেজে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসব হবে। ছাত্ররা নাটকের মহলা দিচ্ছে।
নারায়ণ তখন ওই কলেজেরই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। ওঁর লেখা ‘রামমোহন’ নাটকটি মঞ্চস্থ হবে।
নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেদের মহলা দেখছেন নারায়ণ, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন সকলকে।
রামমোহনের চরিত্র করছে যে ছেলেটি, সে তখন বি এ-র থার্ড ইয়ারের ছাত্র। চুটিয়ে ছাত্র ফেডারেশন করা ছেলে। বামপন্থী রাজনীতি করে বলে নারায়ণের একটু বেশিই প্রিয়।
নাটক মঞ্চস্থ হল। সকলেই রামমোহনের অভিনয়ে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু তাও যেন ছেলেটির মন ভরে না। পরের দিন সটান গিয়ে হাজির তার প্রিয় মাস্টারশমাইয়ের বাড়িতে।
‘‘কাল আমার অভিনয় কেমন হয়েছে স্যার?’’
শিক্ষক নারায়ণ তার ছাত্রের দুই হাত নিজের মুঠোয় ধরে বললেন, দেখবে, ‘‘একদিন তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। অনেক বড়। আর তখন আমি বসে বসে তোমার জীবনী লিখব।’’
বুকভর্তি আনন্দ নিয়ে সেদিন পটলডাঙার বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল সেই ছাত্র।
মাস্টারমশায়ের সেই ভবিষ্যদ্বাবাণী ব্যর্থ হয়নি। সেদিনের ওই সদ্য তরুণটির নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

•••••
কার্টুন: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য 
ছাত্রদের যে কোনও ভাল কাজ মানেই শিক্ষক নারায়ণের বিপুল উৎসাহ। শিক্ষকমশাইকে নিয়েও ছাত্রদের একই রকম টান।
কেউ কবিতা লিখেছে, সটান চলে গেল স্যারকে শোনাতে, কেউ গল্প লিখেও তাই। স্যারকে না পড়ালেই নয়।
স্যারের পটলডাঙার বাড়িতে যখন তখন ছাত্রদের আসা-যাওয়া। হই হই আড্ডা। সে-আড্ডায় ছাত্রদের মধ্যে রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, নির্মাল্য আচার্য্যর মতো তরুণ লেখক।  আবার ম্যাট্রিকে প্রথম হওয়া গৌরমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যেতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও।
অতি ব্যস্ততাতেও নারায়ণের সবসময় হাসিমুখ। ছাত্রদের লেখা পড়েন। মতামত দেন। কোনও ছাত্র বেশ কিছু দিন লেখা না দেখালে নিজেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘লেখা হচ্ছে তো ঠিকঠাক? কী লিখছ দেখিয়ো।’’
কলেজের ছাত্ররা ছিল নারায়ণের প্রাণ। আর সেই ভালবাসা যে শুধু ছেলেদের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ কিংবা ক্লাসে সুন্দর করে পড়ানোর মধ্যেই আটকে ছিল, তা নয়।
এক বারের কথা যেমন। সিটি কলেজে সেদিন নাইট শিফট চলছে। আকাশ মেঘে লালচে। হঠাৎই কলেজের মেন ইলেকট্রিক সুইচে আগুন লেগে গেল।
সবাই আতঙ্কে ছুটোছুটি করে কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছে। এ দিকে নারায়ণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। দেখে সহকর্মী অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বললেন, ‘‘আরে শিগগির চলুন নেমে যাই।’’
শুনে স্বভাবমিষ্ট নারায়ণ বেশ রেগে গিয়েই ধমক দিলেন জাহ্নবীকে, ‘‘ছেলেগুলোকে ফেলে আমরা নামব আগে,’’ বলে পাঞ্জাবির পকেটে হাত পুরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো উপরের সিড়ির মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ভিড় হালকা হল। সব ছেলে নেমে গেল। তারপর তিনি নামলেন।

•••••
যে সৌমিত্রকে একদিন তিনি অনেক বড় অভিনেতা হবে বলে আশীর্বাদ করেছিলেন, সৌমিত্রর জীবনের প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিই।
সেও এক ঘটনা।
গল্পটি শোনানো যাক। একদিন মাস্টারমশায়ের বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন ছাত্র সৌমিত্র।
সে দিনের আড্ডায় রয়েছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের এক প্রিয় বন্ধু চিত্র সাংবাদিক খগেন রায়। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ছবিরও পরিচালক ছিলেন তিনি।
কথায় কথায় তরুণ সৌমিত্রকে তিনি প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন, ‘‘তুমি অভিনয় করবে? যদি চাও তো ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’’
উত্তরে সৌমিত্র কিছু বলার আগেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন নারায়ণ—
‘‘না না খগেন, এ কী বলছ তুমি! ওর এখনও সিনেমায় নামার সময় হয়নি। আগে লেখাপড়া শেষ করুক, তার পরে না হয় ও সব হবে। পড়াশোনা থামিয়ে সিনেমায় যাওয়াটা ঠিক হবে না।’’
মাস্টারমশাইয়ের কথা একবাক্যে মেনে নিয়েছিল ছাত্রটিও। সুযোগ পেয়েও সিনেমায় অভিনয়ের ধারেকাছে ঘেঁষেনি।
তার অনেক পর, ছাত্রজীবন শেষ। যখন পাকাপাকি ভাবে সিনেমায় নামবেন স্থির করলেন, প্রথমেই গেলেন মাস্টারমশায়ের কাছে।
প্রিয় ছাত্রকে জড়িয়ে ধরে নারায়ণ বললেন, ‘‘আমি তো বলেইছি তুমি অনেক বড় অভিনেতা হবে। আসলে কী জানো, সিনেমার অভিনয়কে বোঝার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। যখন যে চরিত্রেই অভিনয় করবে যত্ন নিয়ে, প্রাণ দিয়ে অভিনয় করবে।’’
স্যরের আশীর্বাদ নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলেন তাঁর ছাত্র।
পটলডাঙা স্ট্রিট ছবি: পীষূষরঞ্জন ঘোষ

•••••
প্রথম সাহিত্যচর্চার প্রথম পাঠক হয়েছিল এক বাল্যবন্ধু।
ইস্কুল জীবনেই দিনাজপুরের বাড়িতে আট পাতার ফুলস্কেপ কাগজে প্রকাশ করলেন পত্রিকা। নাম চিত্র-বৈচিত্র।
নিজেই গল্প, কবিতা লিখে, ছবি এঁকে পত্রিকা তৈরি। শুধু তাই নয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের দরও ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতা তো দূরের কথা, পত্রিকার পাঠক কই?
অথচ প্রকাশক কাম লেখক এতই লাজুক স্বভাবের যে কাউকেই নিজের এই কীর্তির কথা জানাতে পারছে না।
এ দিকে বারান্দার কোনে প্যাকিং বাক্সের ওপর বসে রোমহর্ষক সব কাহিনি নিয়ে হাতে গড়া পত্রিকার ওপর ইঁদূর আরশোলারা আক্রমণ চালাচ্ছে। শেষে একদিন ধরাই পড়ে গেলেন।
বাল্যবন্ধু বেস্ত (সুধীন ঘোষ) এসে ডাকল মার্বেল খেলার জন্য।

•••••
নারায়ণ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘এখন যেতে পারব না গল্প লিখছি।’’
বন্ধু অবাক।— ‘‘কী গল্প? দেখি, পড় তো!’’
হত্যা, ডাকাতি, গুলি-গোলায় ভরা ধুন্ধুমার উপন্যাসের প্রথম কিস্তি শুনে বন্ধু বেস্তর চোখ ছানা বড়া। মার্বেল খেলা ভুলেটুলে তার চোখমুখ তখন উত্তেজনায় জ্বলছে। তারপর...তারপর কী হল?
নারায়ণ আবার সম্পাদকীয়-গাম্ভীর্য নিয়ে উত্তর দিল, বাকিটা পরের সংখ্যায়। চাঁদা দিলে পরেরটা পাওয়া যাবে।
‘‘তোর পত্রিকার বার্ষিক চাঁদা কত?’’
নারায়ণ বলল, ‘‘নিয়মাবলি কাগজের পাতাতেই দেওয়া রয়েছে। বিজ্ঞাপন এক পৃষ্ঠা দু আনা, আধ পৃষ্ঠা এক আনা আর বার্ষিক গ্রাহকমূল্য সডাক চার পয়সা।’’
বেস্ত সঙ্গে সঙ্গে প্যান্টের পকেট থেকে হান্ডিভাজা খাওয়ার জন্য জমানো পয়সা বার করে বলল, ‘‘আমি গ্রাহক হব।’’
তারপর থেকেই পুরো দুই কপি কাগজ বেরোনো শুরু। এদিকে কাগজের একমাত্র গ্রাহকের কৌতূহলে পাগল-পাগল অবস্থা। তিনদিন পরেই সে এসে বলল,বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে। তোর কাগজকে সাপ্তাহিক করে দে।
একমাত্র পাঠক বলে কথা! তার আবদার কি অমান্য করা যায়? কাগজ হয়ে গেল সাপ্তাহিক। কিন্তু কিছু দিন পরেই সুধীন পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে যাওয়ায় সেই উপন্যাসও আর শেষ হল না, কাগজও গেল বন্ধ হয়ে।
চারমূর্তি
টেনিদা
ভাল নাম ভজহরি মুখার্জি। পটলডাঙার চাটুজ্জেদের রোয়াকের আড্ডার মধ্যমণি। পুরো ছ’হাত লম্বা। গন্ডারের খাঁড়ার মতো লম্বা নাক। খটখটে জোয়ান। গড়ের মাঠে গোরা ঠেঙিয়ে স্বনামধন্য। পাকস্থলীতে একটি বিয়ে বাড়ির সব খাবার ভরে ফেলতে পারে।
কিন্তু পড়াশোনার ব্যাপারে স্কুলে ক্লাস টেনে একেবারে মনুমেন্ট হয়ে বসে আছে। সেখান থেকে তাকে নড়ায় কার সাধ্য!
টেনিদার মতে ‘পাশ তো যে কেউই করতে পারে, কিন্তু পরীক্ষায় সব উত্তর লিখেও পাশ না করতে পারাই নাকি সব থেকে কঠিন।’
কান ছিঁড়ে কানপুরে পাঠানো কিংবা নাক মুলে নাসিকে পাঠিয়ে দেওয়া অথবা দাঁত পাঠানো দাঁতনে টেনিদার বাঁ হাতের খেল। টেনিদার প্রিয় ধমক হল ‘কুরুবকের মতো বকবক করিসনি’।
হাবুল
ভাল নাম স্বর্ণেন্দু সেন। কাঠ ঢাকাই বাঙাল যাকে বলে, হাবুল ঠিক তাই। তবে পড়াশোনায় মন্দ নয়।
ক্যাবলা
ভাল নাম কুশলকুমার মিত্র। চারজনের মধ্যে পড়াশোনায় খুব ভাল। প্রতিবছর পরীক্ষায় ভাল ফল করে। এই জন্য টেনিদা মাঝেমাঝেই ক্যাবলার ওপর বেজায় খেপে যায়।

প্যালারাম
ভাল নাম কমলেশ ব্যানার্জি। পড়াশোনায় চলে যায় আর কী! দু’পা হাঁটলেই তার পিলে খটখট করে জানান দেয়। পটল দিয়ে পাতলা শিঙ্গি মাছের ঝোল আর ভাত, এই হল তার দুই বেলার আহার।

•••••
পত্রিকা বন্ধ হলেও কাব্যচর্চা থামল না। ইস্কুলে অঙ্ক ক্লাসে বসে অঙ্কখাতাতেও চলতে থাকল নিরন্তর কাব্যচর্চা।
‘মাস পয়লা’ কাগজে ছোটদের বিভাগে কবিতা পাঠিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। বুক আরও ফুলে গেল।
ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে সরাসরি দেশ পত্রিকায় কবিতা পাঠানো শুরু। সেখানেও পর পর ছাপা হতে লাগল কবিতা।
হঠাৎই একদিন দেশ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি। গল্প দেবার আর্জি।
গল্প! মাথায় হাত নারায়ণের। গল্প লিখব কী করে? কিন্তু ‘না’ বলার উপায় নেই। লিখলেন ‘নিশীথের মায়া’। তখন বয়স মাত্র সতেরো, কী আঠেরো।
প্রবল সুখ্যাতি। তারপরেই ‘বিচিত্রা’, ‘শনিবারের চিঠি’...একের পর এক পত্রিকা থেকে ডাক আসা শুরু। আর পিছন ফিরতে হল না।

•••••
দিব্যি বড়দের গল্প লিখছেন।
নামও ছড়িয়েছে বেশ।
হঠাৎই একদিন বাড়িতে এলেন বন্ধু বিশু মুখোপাধ্যায়। এসেই ফরমাশ। অনেক বড়দের জন্য লেখা হয়েছে, এ বার ছোটদের জন্য লিখতে হবে। মৌচাক-এর জন্য লেখো।
ছোটদের জন্য গল্প!
সেই কবে শৈশব পেরিয়ে এসেছি, আর কি তেমন মন আছে? ছেলেবেলার সেই খুশির জগৎকে আর কোথায় পাব?
‘‘আরে ঠিক পারবে, লেখোই না,’’ উৎসাহ দিলেন বিশুদা।
বিশুদার কথায় লিখলেন বটে। গম্ভীর-গম্ভীর গল্পই। ছাপাও হল কিন্তু নিজেরই মন ভরল না।
এর পর বিশুদার আবার ফরমাশ, ‘‘এবার তোমাকে বার্ষিক সংখ্যার জন্য একটা হাসির গল্প লিখতে হবে।
হাসির গল্প? আমি! ক্লাসে ছাত্রদের হাসি বন্ধ করাই আমার একমাত্র কাজ, সেই আমি লিখব হাসির গল্প!
তারপর যা হল, শোনা যাক নারায়ণের নিজের কথা থেকেই, ‘‘তখন নিজের ছোটবেলায় ফিরে এলাম। স্মৃতির ভেতর থেকে খুঁজে আনতে লাগলাম সেইসব ঘটনাকে— যাদের কথা ভাবলে এখনও তরল হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোনায়। এমন একটি গল্প দিলাম বিশুদাকে। সেই যে মনের ভেতর হাসির স্রোত বইল আজও তা আর থামল না।’’
আর বাংলা কিশোর সাহিত্যে জন্ম নিল এক অদ্বিতীয় চরিত্র— টেনিদা।

•••••
চিরকালের স্বভাব লাজুক এবং আদন্ত্য বিনয়ী নারায়ণ।
বাংলা সাহিত্যে এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন, সে-কথাও যেমন তিনি মুখফুটে কাউকে বলতেন না, তেমনই ক’জনই বা জানে, তিনি ডক্টরেট হয়েও জীবনে কখনও নিজের নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি বসাননি।
এমনকী লেখক-জীবন শুরুর সময়েও নিজের নাম প্রকাশেও ছিল সংকোচ। যে তারকনাথ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পেলেন, লেখা ছাপাতে দেওয়ার সময় নিজের নামটিও বদলে দিয়ে লিখেছিলেন— নারায়ণ।
ঠিক একই ভাবে টেনিদা যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, ঘনাদার প্রসঙ্গে ঠিক তিনি টেনির মুখ দিয়ে বলিয়ে ছেড়েছেন, ‘কী বললি প্রেমেন মিত্তিরের ঘনাদা! কী যে বলিস! তাঁর পায়ের একটু ধুলো মাথায় দিতে পারলে বর্তে যেতুম রে।’
শুধু তাই নয়, লেখক-পুত্র অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানা যায়, একবার তাঁকে একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার কথাও উঠেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতবাদ ভিন্ন হওয়ার জন্য পুরস্কার কমিটিতে থাকা  এক স্বনামধন্য সাহিত্যিক একপ্রকার জোর করেই নারায়ণের নাম খারিজ করে দিলেন।
পুরো বিষয়টাই পরে জানতে পেরেছিলেন নারায়ণ কিন্তু জীবনে একবারের জন্যও সেই সাহিত্যিকের প্রতি কারও কাছে উষ্মা প্রকাশ করেননি।
আজীবন নিজেকে যেমন ‘কমনম্যান’ বলতেন, বিশ্বাসও করতেন তেমনই।
১৯৬৫ সালে আকাশবাণীতে স্বরচিত কবিতা পাঠে তিনি পড়লেন— ‘আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস/নিয়ত তরঙ্গাঘাতে দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি/ ...এ বিশ্বেরে ভালবাসিয়াছি এ ভালোবাসাই সত্য এ জন্মের দান।’

•••••
ছাত্ররা যেমন মাস্টারমশাই বলতে অজ্ঞান। ছাত্রদেরও যে কোনও সমস্যায় তাদের স্যার সবার আগে। সে কেমন?
একবার ছাত্র রাজনীতি করা এক গরিব ঘরের ছেলের কলেজে ‘ফিজ’ বাকি পড়ল অনেক টাকা। সে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার।
ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে জানাতে ইউনিয়ন সেক্রেটারি জানাল, তারা মেরেকেটে সতেরো টাকা দিতে পারবে, তার বেশি সামর্থ্য নেই। ওতে কিছুই হবে না। শেষ উপায় নারায়ণ স্যার। তাঁর কাছে গিয়েই পুরো ঘটনা জানাল ছাত্রটি।
শোনামাত্র আর এতটুকু সময় নষ্ট না করে নারায়ণ ছেলেটিকে সঙ্গে করে সটান নিয়ে গেলেন কলেজ রেজিস্ট্রারের কাছে।
তাঁর অনুরোধে বকেয়া ‘ফিজ’ দুশো আটাত্তর থেকে নেমে এল সোজা আঠাশ টাকায়। ওই টাকা দেওয়ারও ক্ষমতা নেই জানতেন নারায়ণ। সুতরাং সে-টাকা নিজেই মিটিয়ে দিলেন।
ছাত্রটি পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেল। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে এমন সমস্যায় আবার না পড়ে তার জন্য একটি প্রাইভেট টিউশনও জুটিয়ে দিলেন তিনি।
ওই ছাত্র আর কেউ নয়, পরবর্তী কালে যাঁকে বাংলা সাহিত্যজগৎ চিনবে কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত নামে।
ছাত্রদের সঙ্গে একেবারে বন্ধুদের মতো মিশতেন নারায়ণ। অমিতাভর স্মৃতিচারণ থেকে এমনই আরেকটি ঘটনার কথা বলি।
এক বর্ষার দুপুরে অনার্স ক্লাসের ছেলেরা মিলে দরজা বন্ধ করে ‘আজি বরষণ মুখরিত’ গাইছে। সবার ওপরে চড়া গলায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গান তো চলছেই, সঙ্গে কাঠের বেঞ্চে উদ্দাম তবলার ঠেকা। দরজা খুলে ক্লাসে ঢুকলেন মাস্টারমশাই নারায়ণ। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ক্লাস পাথর। সব চুপ।
নারায়ণ বললেন, ‘‘কী হল? গান থামল কেন? চলুক।’’
ছাত্ররা তাতেও চুপ।
নারায়ণ তখন সাফ জানালেন, গান শেষ না হলে তিনি কিছুতেই ক্লাস নেবেন না। অমিতাভ লিখছেন, ‘‘তাঁর নাছোড়বান্দা মেজাজ দেখে বহুকষ্টে ঠেলেঠুলে সৌমিত্রকে তুলে দিলাম। অমন স্মার্ট ছোকরা; প্রায় কনডেমড সেলের আসামির মতো কাঁপা গলায় শেষ করল গানটি।’’
তারপর রক্তকরবী-র বিশুপাগলকে নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন নারায়ণ।

•••••
পটলডাঙার বাড়িতে তখন সকলের অবাধ যাওয়া-আসা। সকলেই স্বাগতম। দেদার মজাদার আড্ডা, সঙ্গে চা, মুড়ি-ডালমুট।
ছাত্ররা তো বটেই, অনেক নামী অনামী লেখকও চলে আসতেন আচমকা। এমনই একদিন মলিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এসে হাজির হলেন নারায়ণের বাড়িতে।
ঘড়িতে বেলা এগারোটা কী বারোটা।
তাকে দেখে বেজায় আনন্দিত নারায়ণ, ‘‘দাদা এসেছেন! আসুন আসুন কী সৌভাগ্য আমার!’’
ভদ্রলোক বললেন, ‘‘এই তো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। বেশিক্ষণ বসব না। এই আধঘণ্টার মতো বসে একটু গল্প করেই চলে যাব।’’

•••••
টেনিদার জনক
ভদ্রলোকের গলা শুনে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নারায়ণ ঘরণি আশাদেবী। দাদা এসেছেন যখন দুপুরে চাট্টি ভাত খেয়ে যাবেন।
‘‘ভাত? আচ্ছা আপনি বলছেন যখন দুটি খেয়েই যাই। জমিয়ে রান্না করুন দেখি।’’
নারায়ণ ওই বেলায় ছুটলেন বাজারে। ইলিশ মাছ দিয়ে জমিয়ে ভাত খেয়ে তারপর শুরু হল মজলিশি আড্ডা। পাশের ঘর থেকে কান খাড়া করে সেই গল্প শুনছে নারায়ণ-পুত্র অরিজিৎ। সেই ভদ্রলোক এমনভাবে ঘন বন-জঙ্গল, জোৎস্না রাতের পাহাড়, নির্জন টিলার বর্ণনা দিচ্ছেন যে চোখের সামনে সব যেন ছবি হয়ে ধরা পড়ছে। বক্তা শ্রোতা সকলেই মোহিত।
গল্পে গল্পে সেই বরাদ্দ আধঘণ্টা গড়িয়ে বিকেল। হঠাৎই হুঁশ ফিরল ভদ্রলোকের।— ‘‘সর্বনাশ! চারটে বেজে গেছে! আমি যে আধঘণ্টা থাকব ভেবেছিলাম। আমি বেরোলাম।’’
‘‘একটু চা খেয়ে যান।’’
‘‘না না আর চা নয়। আর দেরি হলে ফিরতে পারব না,’’ বলে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।
নারায়ণ দেখলেন। তাড়াহুড়োয় যে দিকে যাবার কথা ঠিক তার উল্টো দিকের বাসে চড়ে বসলেন ভদ্রলোক।
পরে অরিজিৎ জানতে পেরেছিলেন অমন সাধারণ দেখতে কিন্তু অলৌকিক প্রকৃতির বর্ণনা করতে পারা অন্যমনস্ক মানুষটির নাম ছিল বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

•••••
স্মৃতিশক্তি ছিল ঈর্ষা করার মতো। এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে বলে যেতে পারতেন লম্বা লম্বা কবিতা, এমনকী গল্পও। শেক্সপিয়র, মপাঁসা, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ একেবারে কন্ঠস্থ।
একবারের ঘটনা বলি।
ক্লাস ভর্তি ছেলে। নারায়ণ তারাশঙ্করের ‘অগ্রদানী’ গল্পটি পড়াবেন। কিন্তু সে দিনই ক্লাসে কারও কাছে টেক্সট বই নেই।
কী উপায়?
নারায়ণ বললেন, দেখি একবার স্মৃতি থেকে চেষ্টা করে। বলতে শুরু করলেন। পুরো গল্পটার প্রথম লাইন থেকে শুরু করে একেবারে কমা সেমিকোলন পর্যন্ত উল্লেখ করে থামলেন ‘খাও হে চক্রবর্তী’তে। গোটা ক্লাস অভিভূত।
নারায়ণের স্মৃতিশক্তি নিয়ে এমন অনেক মজার ঘটনা রয়েছে। আরেকটি গল্প শোনানো যাক।
নারায়ণ তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তেতলার ঘরে বসে কয়েকজন সহকর্মী মিলে চা সহযোগে আড্ডা চলছে।
সেই আড্ডায় অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও রয়েছেন। আড্ডা চরমে। তখনই ঘরে ঢুকলেন প্রধান শিক্ষক প্রমথনাথ বিশী। আজ নারায়ণ প্র.না.বি-কে চা খাওয়াবেন এই ঘোষণা হওয়ার পর প্র.না.বি কথায় কথায় জানালেন, তিনি খুবই চিন্তিত। কারণ তাঁর নতুন কবিতার বই প্রকাশ হতে চলেছে। কিন্তু বঙ্গশ্রী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রিয় কবিতা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ সেই কবিতাটি সংকলনে রাখার খুবই ইচ্ছে।
শুনে নারায়ণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কবিতাটির নাম জানতে পারি?
প্রমথনাথের কাছে নাম শুনে লাজুকভাবেই নারায়ণ বললেন, ‘‘আমার পুরো কবিতাটিই মনে রয়েছে। প্রয়োজনে আপনি লিখে নিতে পারেন।’’
শুনে প্রমথবাবু পুরো হতভম্ব। তারপর মজার আড়ালে বেশ গম্ভীর হয়েই বলে উঠলেন, ‘‘দেখুন এত স্মৃতি ভালো নয়, ভালমন্দ সবই আপনি মনে রাখতে পারেন দেখছি।’’
হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই।

•••••
শরীর ঠিক যাচ্ছিল না সেবার। কিন্তু বাইরে সে অসুস্থতার কোনও প্রকাশ নেই।
সকলের সঙ্গে একরকম সুন্দর ব্যবহার আর হাসিমুখ। এক সময়ের ছাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাড়িতে এক কবিতা পাঠের আসরে যাবেন। তখন খ্যাতি গগনচুম্বী, তবু কুণ্ঠা।
সুনীলকে বললেন, ‘‘আমার কবিতা বড্ড সেকেলে। তোমাদের মতো আধুনিক ভাষা আমার কই? পড়তে লজ্জা লাগে!’’
কথায় কথায় স্যারের শরীরের খবর নিলেন সুনীল। জানতেন অসুস্থ, ‘‘এখন কেমন আছেন স্যার?’’
‘‘হ্যাঁ ভালো আছি।’’
চোখের নীচে ক্লান্তি থাকলেও মুখের হাসিটি একইরকম। অনুষ্ঠান শেষে সুনীলকে বলেন, ‘‘একদিন আমার বাড়িতে এসো না, কাছেই তো থাকি।’’
‘‘হ্যাঁ স্যার, এর মধ্যেই একদিন যাব।’’
সে যাওয়া আর হয়ে উঠল না সুনীলের। ঠিক তার পরের দিনই শ’য়ে শ’য়ে মানুষের ভিড় শ্মশানে। হয়তো সেদিন সেই ভিড়ের মধ্যে ক্যাবলা হাবুল, প্যালারামও ছিল। কিশোর অবুঝ মন নিয়ে ভাবছিল এই এক্ষুনি বুঝি ‘ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক’ বলে একমুখ হাসি নিয়ে পালঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়াবে তাদের বন্ধু। অপেক্ষা করছিল...
‘শিলালিপি’-র নায়কের শেষ চিহ্নটুকু যখন ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গার বুকে, সুচিত্রা মিত্র ভিজে গলায় গাইছেন— ‘তবু মনে রেখো...’।
ঋণ: টেনিদা সমগ্র, সাহিত্য ও সংস্কৃতি: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, কোরক-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা, শঙ্কর দাশ, উজাগর (নায়ায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা)
সংশোধন: ২২ অক্টোবর ২০১৬-র ‘পত্রিকা’য় প্রকাশিত ‘মৃণালিনী’ শীর্ষক লেখাটিতে কয়েকটি তথ্যের ভুল রয়ে গিয়েছে। সঠিক তথ্য এই রকম: প্রথমত, প্রিয়নাথ সেন বিলেতে রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, ‘আশার ছলনে ভুলি’ মাইকেল মধুসূদনের ‘আত্মবিলাপ’-এর অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত, বিহারীলাল চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর যেহেতু তাঁর ছেলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়ের বিয়ে হয়, বিহারীলাল নিজে পণ নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন তা বলা চলে না। চতুর্থত, শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনার সাল ১৯০১। 

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/the-lane-which-created-history-1.503555#


Raasleela

What Is Raas Lila

Raas is divine pleasure and Lila (as per Sanskrit) is play or sport.
According to Vaishnavas, Lila means activities of God and Devotees.
According to Shrimad Bhagwat Puran, Maha Raas was performed by Lord Krishna for his devotees when he was just six years old kid.
Lord Krishna performed Raas Lila. According to Shrimad Bhagwat Puran, Lila means Lord Krishna’s playful dance with his devotees (gopis). Gopis were same saints and sages who performed Tapasya* for Yugas** to become devotee of Lord Krishna in their Dwaparyuga reincarnation. These were saints and sages who met Lord Rama in his exile(when he had to undergo 14 years Sanyasa*** Dharm to fulfill his father’s wishes). Lord Rama interacted with many sages in his way to Sri Lanka, He was unable to spend ample time with them. Most of them got saddened. Then all these sages requested Lord Rama (Lord Vishnu) to being reborn as Gopis in their next birth to become  devotees of Lord Krishna. These Gopis dance with joy when they see playful Lord Krishna, a divine kid of six year old and dance with him.

The rasa lila takes place one night when the Gopis of Vrindavana, upon hearing the sound of Krishna's flute, sneak away from their households and families to the forest to dance with Krishna throughout the night, which Krishna supernaturally stretches to the length of one Night of Brahma, a Hindu unit of time lasting approximately 4.32 billion years. In the Krishna Bhakti traditions, the rasa-lila is considered to be one of the highest and most esoteric of Krishna's pastimes. In these traditions, romantic love between human beings in the material world is seen as merely a diminished, illusionary reflection of the soul’s original, ecstatic spiritual love for Krishna, God, in the spiritual world.

Myths related to Holi

Bhakt Prahlad & Holika

There was a mighty demon king named Hirnakashyipu who had won all the three worlds of heaven, earth and hell and had thus, become very proud. He assumed that he could defeat even Lord Vishnu with his valor. He went to the extent that he had enforced a law that everybody would worship him instead of gods and deities. However, his little son Prahlad refused to accept his commands and continued to worship Lord Vishnu with complete devotion. Infuriated by this defiance of his son, he ordered his soldiers to throw him down a hill. Praying fervently and having full faith in Lord Vishnu, Prahlad did not retract from his word. True to his faith, Lord Vishnu rescued him at the last moment.

Flustered by this news, Hirnakashyipu invoked the help of his sister Holika, who had a boon that she could walk through the fire unharmed to do away with his son. The wicked aunt agreed to the evil desires of his brother and entered the fire with her nephew Prahlad. However, the brother and sister had forgot that Holika could only enter the fire alone or she would perish. Thus, blessed by Lord Vishnu, the child Prahlad remained unharmed but Holika got burnt and died instantly. Holi is thus celebrated to commemorate the death of the evil aunt, after whom the festival is named, and the new life granted to Prahlad for his devotion and faith. To this day, cow dung is hurled into the fire and obscenities are shouted at the Holi fire at some places to insult Holika.



Invincible Dhundhi

During the reign of Prithu, there was a terrible ogress called Dhundhi, who loved to devour innocent children. She had performed severe penances and had won several boons from the deities that made her almost invincible. However, due to a curse of Lord Shiva, she was not so immune to the pranks and abuses of young boys as she was to weapons and arrows. One day, the courageous boys of the village decided to get rid of her forever and chase her away from the village forever. They got intoxicated on bhaang and drunk and then followed Dhundi to the limits of the village, beating drums, making loud noise, shouting obscenities and hurling insults at her and continued doing this until she left the village for good. This is the reason that even today young boys are allowed to indulge themselves in rowdiness, using rude words and intoxication on Holi.


Love Play of Radha & Krishna

Lord Krishna has often been portrayed as a naughty prankster in his childhood and a lover-boy in his youth. His beloved Radha and the cowherd girls 'Gopis' in general loved him even more for his pranks and eve teasing. The Holi of Braj is famous all over India for its intimate connection with the divine deities and their love plays. It is said that when Krishna was a young boy, he asked the reason for his dark color while Radha was so fair. His mother Yashoda playfully suggested that he should smear color on Radha's face too and change her complexion to any color he wanted. Captivated by the idea, Krishna proceeded to do so and thus, introduced the play of colors on Holi.

Even today, Holi is one of the most important festival of Braj, where the men of Nandgaon and women of Barsana play 'latthmar Holi' in the remembrance of the playful throw of colors by Krishna on 'Gopis' and their resistance. The trace of eroticism and romance pervades Holi as depicted in the love plays of Krishna and Radha. In Mathura, Vrindavan, Gokul and Barsana, Holi is a two-week long festival featuring play of colors, folk songs called 'Hori', folk dances such as Raas-Lila, staging the various aspects of Radha and Krishna's love



Sacrifice of Kamadeva

According to Hindu mythology, the world is looked after the Trinity of Gods - Lord Brahma, the creator; Lord Vishnu, the nurturer; and Lord Shiva, the destroyer. According to a legend, Goddess Sati, the daughter of Daksha Prajapati, one of the first sons of Lord Brahma, married Lord Shiva against the wishes of her father. Thus, Daksha did not invite her and her husband to a grand yagya arranged by him. When Sati came to know about the event in her father's house, she thought it to be a slip of mind and proceeded to participate in the event despite the warnings of her husband. But once she reached there, she realized her fault and was infuriated by the insult of her husband. As a penance for her disobedience, she entered the fire. When Lord Shiva came to know of her sudden demise, he was furious. Even after he controlled his anger, he started a severe meditation and renounced all work.

The world's balance soon crumbled in his absence and Sati took rebirth as Goddess Parvati to try and win Lord Shiva's heart and wake him up from his trance. She tried all ways to get the attention of Shiva. When she had exhausted all her feminine ways, she invoked the help of Kamadava, the Indian cupid-god, who agreed to help her in the cause of the world despite the risks involved. He shot his love-arrow on Shiva's heart. Disturbed in his trance, Lord Shiva opened his third eye that fired anger and instantly incinerated Kamadeva. It is said that it was on the day of Holi that Kamadeva had sacrificed himself for the good of all beings. Later, when Lord Shiva realized his mistake, he granted Kamadeva immortality in invisible form. To this day, people offer sandalwood paste to Kamadeva to relieve from his stinging burns and mango blossoms that he loved on Holi


Source : http://www.thecolorsofindia.com/holi-legends/index.html





Sunday, 12 February 2017

আড্ডাপ্রিয় বাঙালির অজানা গল্প

আড্ডাপ্রিয় বাঙালির অজানা গল্প

তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সত্যজিৎ রায়-উত্তমকুমার। জহর রায়-ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে কমলকুমার-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাঙালি আড্ডার গল্প পাড়লেন অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

১৫ অক্টোবর, ২০১৬, ০০:০০:০০
  
 

actors

ছবি: কল্যাণ চক্রবর্তী, সমর দাস, আনন্দবাজার আর্কাইভ

মৃণাল সেন তখন সিনেমায় আসেননি। চুটিয়ে পড়াশোনা করছেন। সঙ্গে ভরপুর রাজনীতি আর মারকাটারি আড্ডা। যার মূল ঠেকটা ১১৩/২ হাজরা রোডের ধারে ‘প্যারাডাইস ক্যাফে’।
বাজারে সবে এক ধরনের ঠান্ডা পানীয় এসেছে। কিন্তু মৃণালবাবু আর তাঁর সঙ্গীদের ধারণা, সেই পানীয় খাওয়ার অর্থ, ‘আমেরিকানাইজড্’ হয়ে যাওয়া।
অগত্যা বর্জন।
এক দিন মৃণালবাবু একটা কাগজ হাতে নিয়ে ঢুকলেন আড্ডায়। কাগজটিতে একটি কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পাবলো নেরুদার।
সিগারেটে সংক্ষিপ্ত একটা টান দিয়ে ‘ফিউরিটি’ নামে সেই কবিতাটি বন্ধুদের পড়ে শোনাতে শুরু করলেন মৃণালবাবু।
আচমকা হোঁচট।
সেই ‘আমেরিকানাইজড্’ পানীয়টি নেরুদাও খেয়েছেন বলে কবিতায় জানিয়েছেন।
ধুস! তা হলে সেই পানীয়টি খেতে আর বাধা কোথায়!
তরুণ-হেমন্ত বৈঠক
তখনকার বাজারে সদ্য ঢোকা সেই ঠান্ডা পানীয়টি কিছু দিন বাজার থেকে বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার পরে আজও দিব্যি চলে।
এই আড্ডার আসরের কাছেই রয়েছে একটি পান-বিড়ির দোকান। সেখান থেকেই না কি বিড়ি কিনতেন আরও এক বিখ্যাত পরিচালক। আর তা করতে গিয়ে সেই দোকানে বিড়ির ধার হয় প্রায় ৮০ টাকা! ধারের অঙ্কটি আজকে বসে ধরতে পারা মুশকিল, কিন্তু আন্দাজ দিতে একটা হিসেব দেওয়া যায়।
মৃণালবাবু যে সময়ের কথা বলেছেন, সেই সময় ১০ পয়সায় মিলত ২৫ বান্ডিল বিড়ি। ৮০ টাকা ধার করা সেই পরিচালকটি আর কেউ নন, স্বয়ং ঋত্বিক কুমার ঘটক।
দেশবন্ধু পার্কের একটি চায়ের দোকান। সেখানে এক সময় নিয়মিত আড্ডা দিতে বসতেন তরুণ মজুমদার।
এক দিনের কথা। সে দিন কোথাও যেন আড্ডার তাল কাটছে। কারণ আড্ডার এক স্যাঙাতের আসতে বড় দেরি হচ্ছে। মোবাইল তখন দূর-অস্ত। অগত্যা লা-পাতা বন্ধুটির জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা ছাড়া উপায় কি!
খানিক বাদে মূর্তিমান দেখা দিলেন।
‘‘কী ব্যাপার হে, এত দেরি?’’ খানিক চুপ সক্কলে।
যুবক-বন্ধু বললেন, ‘‘আর বলিস না, একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছে।’’
কী এমন সিনেমা, যার জন্য আড্ডায় আসতে দেরি হয়! ফলে সে দিনের আড্ডা জুড়ে বসল সেই সিনেমার গপ্পো।
আর তাতে সবাই এতটাই মজে গেলেন, ঠিক হল শুভস্য শীঘ্রম।   ঠেক থেকেই সদলবল সিনেমা দেখতে ছুটলেন তরুণবাবু ও তাঁর বন্ধুরা।
ছবি দেখে তো সকলেই স্তম্ভিত। কিন্তু তার পরেও সবারই মনে হল, বাংলাতে এ সিনেমা তেমন চলবে না! কিন্তু সিনেমাটি ‘না চললে’ বাঙালির যে বড় ক্ষতি!
তাই ঠিক হল, শোভাযাত্রা বের করা হবে, সিনেমার সমর্থনে!
তার জন্যও ‘আড্ডা’ চাই। তবে সেদিনের আড্ডার ছবিটা অন্য রকম। রাতভর। কথায় কথায় সিনেমার গল্প তো চললই, সমান তালে তৈরি হতে থাকল প্ল্যাকার্ড।
পরের দিন সকালে শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা খানিক দূর যেতেই এ কী! ওরা কারা? কারা যেন পাশের গলিপথ দিয়ে এগিয়ে এল সিনেমাটির সমর্থনে।
শোভাযাত্রা চলছে। তাতে যোগ দিচ্ছেন আরও কত... কত...জন!
অনেকের হাতেই পোস্টার, প্ল্যাকার্ড— ‘পথের পাঁচালী দেখুন’, ‘পথের পাঁচালী দেখা আমাদের কর্তব্য’।
রবি ঘোষের বাড়িতে এক সময় নিয়ম করে আড্ডা দিতে যেতেন সদ্য যুবতী শর্মিলা ঠাকুর। শর্মিলার অভিনয়-জীবনের এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে ওই আড্ডার সূত্রেই।
রবি ঘোষ এক জায়গায় তার বর্ণনা দিচ্ছেন এ ভাবে— ‘‘সর্বস্তরের লোকই আসত আড্ডা দিতে— শুধু অরসিকরা ছাড়া। স্বভাবতই অভিনয় ইত্যাদি নিয়েই আলোচনা হত। সেখানে অনবরতই কমলদার (কমলকুমার মজুমদার), রেফারেন্স আসত।
এক দিন রিঙ্কু (শর্মিলা ঠাকুর) বলল,  সে অভিনয় শিখতে চায়। আমি বা আমরা খুব আড্ডা দিতে পারি, কিন্তু অভিনয় শেখাবার ক্ষমতা কোথায় আমাদের!
নিয়ে গেলাম রিঙ্কুকে সোজা কমলদার কাছে। গোড়ায় কমলদা একটু গররাজি হলেও অবশেষে আমাদের বি‌শেষ অনুরোধে রাজি হলেন। শুরু হল রিঙ্কুর অনুশীলন— ‘আলমগীর’-এ উদিপুরির ভূমিকায়। প্রতিদিন রিহার্সাল শুরু হত বেলা তিনটে নাগাদ, এবং শেষ হত রাত আটটায় রিহার্সাল হত শুধু হাঁটার!
সম্রা়জ্ঞী কী ভাবে হাঁটবেন, এটা দেখাতে গিয়ে কমলদা সব ধরনের নারী জাতির হাঁটার অনুশীলন করাতে শুরু করলেন রিঙ্কুকে দিয়ে। ...কমলদা অবশ্য একদিন বলেছিলেন, ‘নাঃ, মেয়েটার নিষ্ঠা আছে।’ সে নাটকটি মঞ্চস্থ হল না, কিন্তু রিঙ্কুর লাভ হল অনেক।’’
বাঙালির আড্ডা এমনই। কী নেই তাতে। সাধে কী, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির আরেক নাম দিয়েছিলেন ‘গল্পপোষ্য জীব’?
আড্ডায় গল্পের মৌতাত জমে ওঠে। আর সেই মৌতাতের নেশা কী ভয়ঙ্কর রকমের, একবার তার একটি মারাত্মক নমুনা পেয়েছিলেন বলিউডি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র।
তখন সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বসতভিটে ‘লালবাড়ি’-র আড্ডা রীতিমতো বিখ্যাত। প্রায়ই এসে পড়তেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সঙ্গে গান-জগতের মহাতারকাদের কেউ না কেউ। তখন অবশ্য বসত গান-আড্ডা।
বহু কাল পর্যন্ত রবিবার-এ কিন্তু গান নয়, তাস-আড্ডা ছিল ও বাড়ির রেওয়াজ। ঠায় বসে তাস-এ জমত ‘কনট্র্যাক্ট ব্রিজ’ আর মুখে মুখে গল্প আর গল্প। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বিকেলবেলায়।
সে রকমই এক রবিবারের বিকেল।
পরের চাল কী হবে, তা নিয়ে চিন্তায় সক্কলে। সঙ্গে চলছে এটা-সেটা খাওয়া-দাওয়া।
এমন সময় বাড়ির ফোনটা বেজে উঠল। ওপারে ধর্মেন্দ্র। কলকাতায় এসেছেন তিনি। আশুতোষকে তিনি বললেন, ‘‘আপনার একটা গল্প নিয়ে সিনেমা করার কথা ভাবছি। এক্ষুনি চলে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি।’’
বাড়ির মেঝেতে তখন গুছিয়ে শতরঞ্চি বিছিয়ে জোর তাস-আড্ডা জমে উঠেছে। ফোনের কথা বুঝতে পেরে আড্ডায় ‘দ’ পড়ল। বন্ধুদের মুখ পানশে।— ‘‘আশুবাবু তা হলে কী চলে যাবেন?’’
ধর্মেন্দ্রর ডাক বলে কথা!
কিন্তু তা’হলে ও দিনের মতো আড্ডার গোটা আনন্দর অর্ধেকটাই তো মাটি। একটু পরে সকলকে ‘হাঁ’ করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিনীত ভাবে ধর্মেন্দ্রকে জানিয়ে দিলেন, ‘‘আজ রবিবার। আমার বন্ধুদের সঙ্গে এই একটা দিনই আড্ডা দিই। ফলে আজ যেতে পারছি না!’’
আশুবাবুর যেমন রবিবারের বিকেল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে তেমন রবিবার সকাল।
রবিবার, বেলা ১১টা। মধ্যমণি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সামনের টেবিলে লাল-চা। হাতে সিগারেট।
চারপাশে ভিড় করে রয়েছেন নবীন কবির দল। তেড়ে আড্ডা চলছে। 
হঠাৎ কলেজ-পড়ুয়া দুই সুন্দরীর আবির্ভাব। খুবই সঙ্কুচিত তাঁদের হাবভাব। কী ব্যাপার? সামনের মাসে ওঁদের কলেজে কোনও এক কনভোকেশন, সেখানে ওঁরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে যাবেন।
ডায়েরি দেখে খালি আছেন কিনা বুঝে নিয়ে সুনীল সায় দিলেন।
‘‘ঠিক আছে, যাব।’’
দুটি মেয়ে এতক্ষণে বোধ হয় খানিক স্বস্তি পেয়ে হাসিমুখে বিদায় নিতে গিয়েও থেমে গেলেন। সুনীলের দিকে চেয়ে ওঁদের একজন বললেন, ‘‘আপনাকে কিন্তু গাড়িতে আমরাই নিতে আসব, ফেরতও আমরাই দিয়ে যাব।’’
উত্তর দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করলেন না স্বভাবরসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বললেন, ‘‘ফেরত না দিলেও চলবে।’’
এ বার এক্সপ্রেস-গতিতে প্রস্থান লজ্জারাঙা দুই সুন্দরীর! এর পর ‘নীললোহিত’-এর আড্ডা-ঘরের অবস্থাটি সহজেই অনুমেয়।
বাঙালির আড্ডায় অদ্ভুত ভাবে জড়িয়ে থেকেছেন ভিনরাজ্যের  মানুষেরাও। তেমনই এক জন ‘মহেন্দ্রদা’। শ্যামপুকুর থানার পাশে তাঁর চায়ের দোকান। জন্মসূত্রে বিহারি। সেই চায়ের দোকানেই মহলার ফাঁকে খানিক রসদ খুঁজে নেন ‘নান্দীকার’-এর অভিনেতারা। তেমনই একদিন। বেশ কয়েক জন নাট্যকর্মী মহলার পোশাক পরেই ভিড় জমিয়েছেন সেখানে। নাটকেরই চর্চা চলছে। একটি দৃশ্য। কেমন হবে?  ছেলের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকবেন বাবা। তা সেই ‘চোখের চাওয়া’ কেমন হওয়া উচিত, সে নিয়ে একে অন্যকে মতামত জানাচ্ছেন অভিনেতারা। হঠাৎ কেটলি থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতে সেই বিহারি ‘মহেন্দ্রদা’র পরামর্শ, ‘‘ওই সময়ে আমি হলে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মারতাম।’’
মহেন্দ্রদার এমন মোক্ষম ‘উপদেশ’ কী যে মনোরম ছিল!
‘নান্দীকার’-এর আড্ডার কথা বললে নাটক-অন্ত প্রাণ যে মানুষটির কথা অনিবার্য ভাবে উঠে আসে, তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।
৪৭/১ শ্যামবজার স্ট্রিট। দলের ঘর। আড্ডার আসর বসেছে সেখানেই। রয়েছেন নাট্যকর্মী, অধ্যাপক পবিত্র সরকার এবং আরও অনেকে।
দরজাটা ঠেলে ঢুকলেন অজিতেশ। ‘‘কী খবর সব?’’ এটা-সেটা কথার পরে স্বভাবসিদ্ধ উঁচু গলায় অজিতেশ একটা গল্প পাড়লেন।
এক জমিদারের ছেলে সে বার এমএ পরীক্ষা দেবেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তা
তাঁর প্রস্তুতিতে যাতে কোনও খামতি না থাকে, সে জন্য জমিদার মহাশয় রীতিমতো ঘরভাড়া করে পরিচারক-পরিচারিকা রেখেছেন।
দেখতে দেখতে এমএ পরীক্ষার দিন চলে এল! নায়েব মশাই পরীক্ষা হলের বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছেন!
জমিদারপুত্র খাতা খুললেন। পেনের নিপ খাতায় ছোঁয়াতেই নায়েব কাদের দিকে যেন ইশারা করলেন! মুহূর্তের মধ্যে বেজে উঠল বিভিন্ন বাজনা, ব্যান্ড পার্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, উপাচার্য সব হুড়মুড়িয়ে চলে এলেন। ততক্ষণে অবশ্য ব্যান্ড পার্টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজনা শুনিয়ে কলেজ স্কোয়ার পরিক্রমা শুরু করে দিয়েছে।
অজিতেশ অনেক দিনই এ রকম অদ্ভুতুড়ে সব গল্প বলে বলে আড্ডা জমিয়ে রাখতেন।
আড্ডাবাজ বাঙালিদের এগারো জনের দল গড়া হলে যাঁদের অনায়াসে দলপতি করে দেওয়া যায়, তাঁদের একজন অবশ্যই দাদাঠাকুর। অর্থাৎ শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। তখন দাদাঠাকুরের জীবনী ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘যুগান্তর’ পত্রিকায়।
বাইরে ঘোর বর্ষা।
দাদাঠাকুর নিজে রয়েছেন পত্রিকার অফিসে। তাঁকে ঘিরে অন্যান্যরা বসে। আড্ডাধারী এক জন প্রস্তাব দিলেন, ‘‘আজ খিচুড়ি হলে জমে যেত!’’
সঙ্গে সঙ্গে দাদাঠাকুর হঠাৎ বলে বসলেন, ‘‘খিচুড়ি শব্দটা কোত্থেকে এসেছে জানো?’’
সকলেই জানতেন, দাঠাকুরের এমন সব প্রশ্নের উত্তরে ‘টুঁ’ শব্দটি করতে নেই। বোমাটা ফাটাবেন শরৎপণ্ডিত নিজেই। যথারীতি তাই।
দাদাঠাকুর বললেন, ‘‘খিচুড়ি এসেছে খচ্চর থেকে।’’
মানে? এ কেমন কথা!
দাদাঠাকুর যুক্তি দিলেন, ‘‘ঘোড়াও নয়, গাধাও নয়, দু’য়ের মিশ্রণে খচ্চর। তেমনই চালও নয়, ডালও নয়, দু’য়ের মিশ্রণে খিচুড়ি।’’
হাসির রেশ শেষ হতে না হতেই আচমকা এক জন জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘‘আচ্ছা, আপনি খালি পায়ে চলেন কেন দাদা?’’
এ বার উত্তরে যা বললেন, তা এই রকম—
ছেলেবেলা কেটেছে কাকার অভিভাবকত্বে। কাকার শাসনে দাদাঠাকুরকে খালি পায়েই খাকতে হতো। অথচ অবাক চোখে চেয়ে দেখতেন, কাকার ছেলেরা দিব্যি জুতো পায়ে মচমচ শব্দ তুলে স্কুলে যাচ্ছে।
কাকাকে সে কথা বলতেই দাদাঠাকুরকে তিনি না কি বলেন, ‘‘পাড়ার স্যাকরার একটা পা নেই, তাই নিয়ে সব কাজ করছে। আর তোর দু’টো পা থাকতেও জুতো ছাড়া স্কুলে যেতে কষ্ট হয়!’’
কাকার মুখে এমন কথা শুনে আর কোনও দিন জুতো পায়ে দেওয়ার ইচ্ছে করেনি দাদাঠাকুরের।
মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল হাসির ধারা।  
আড্ডা দিতে দিতেই এমন ‘বিষাদ -সিন্ধু’র ঢেউ এক এক সময় কাতর করে দিয়েছে অনেক রথীমহাথীকেও। তেমনই দুটি গল্প।
প্রথমটি বিমল মিত্রের।
জায়গাটা কালীঘাট ট্রাম ডিপোর উল্টো দিক। একটি চায়ের দোকান। সেখানে নিয়মিত আড্ডায় বসেন সাহিত্যিক বিমলবাবু।
এক দিন সকলে অপেক্ষা করছেন। বিমল মিত্র তখনও পৌঁছননি।
বেশ কিছু পরে এলেন তিনি।
তবে কী কারণে যেন তাঁর মুখ ভার-ভার! সঙ্গী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় আর শচীন বন্দ্যোপাধ্যায়দের চোখেমুখে অবশ্য খানিক কৌতুক।
হেতুটি কী?
প্রেমেন্দ্র মিত্র সবে ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন। তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন বিমল মিত্র এবং তাঁর দুই সঙ্গী। প্রেমেন্দ্র মিত্র রীতিমতো খাতির করে বসালেন তিন জনকে।
শুরু হল আড্ডা।
কথা প্রসঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্র জানান, বিমলবাবুর ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’-এর প্রথম খণ্ড বই হিসেবে বের হবে, এ খবর তিনি বিজ্ঞাপন থেকে জেনেছেন।
পরক্ষণেই প্রেমেন্দ্র জিজ্ঞেস করেন, ‘‘বই করতে দেওয়ার আগে ভাল ভাবে এডিট করেছ তো?’’ বিমলবাবু খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জানান, ‘‘না, তা তো করা হয়নি।’’
কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও যেন একটা খচখচানি।
প্রেমেন মিত্তিরের মতো লেখক বলছেন ‘এডিট’ করার কথা। তবে কি কোথাও ভুল হয়ে গিয়েছে! সে কথা জিজ্ঞেস করতেই এ বার উল্টো ফ্যাসাদ।
প্রেমেন্দ্র মিত্র জানান, ‘‘লেখাটা তাঁর এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি।’’
তবে?
বিমলবাবুরই এক অন্ধ ভক্ত না কি ‘এডিট’ করার কথাটা বলেছেন। — আর এ কথা শুনেই বিমলবাবুর সটান জবাব, ‘‘ওটা যখন আপনার কথা নয় তখন আমি মানতে রাজি নই।’’
কিন্তু প্রেমেনবাবুর অমন কথার ‘ঝাঁঝ’ কিছুতেই যেন সহ্য করতে পারেননি বিমল মিত্র। সাততাড়াতাড়িই চলে এসেছিলেন। এ কথায় সে কথায় সঙ্গীরা তাঁকে হালকা করতে চেয়েছিলেন বারবার। লাভ হয়নি কিছুতেই। সেই দমচাপা মন নিয়ে আড্ডায় গিয়েছিলেন ঠিক। তবে সে দিন যেন কিছুতেই ‘তাল’-এ ছিলেন না ঘোর আড্ডাবাজ বিমল মিত্র।
এ বার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
টালা পার্ক। তারাশঙ্করের বাড়ি। কলেজ স্ট্রিটে এক বিখ্যাত প্রকাশকের আড্ডার ঠেকে তারাশঙ্করকে পাকড়াও করেছেন বিভূতিভূষণ। দুপুরের খাওয়াটা তারাশঙ্করের টালা পার্কের বাড়িতেই সারবেন তিনি।
ভূরিভোজটা ভালই হল খাদ্যরসিক বিভূতিভূষণের। এ বার খানিক ‘ভাত-ঘুম’ দিতেই হয়।
কিন্তু তারাশঙ্কর শুনলে তো! তাঁর মন তো এখন আড্ডা-আড্ডা করে।
অগত্যা শুরু হল গপ্পো। এটা-সেটা কথার পরে আড্ডার মেজাজ যখন তুঙ্গে, তারাশঙ্করের কথায় হঠাৎ আচমকা বিস্ফোরণ!
দিব্যি প্রশংসাই করছিলেন। তার পর হঠাৎই বলে বসলেন, ‘‘দেখো বিভূতি, তুমি কিন্তু একটা ভুল করছ। তুমি তোমার গণ্ডি ছেড়ে বেরচ্ছ না, এখনও সেই গ্রাম আর নদী, সাঁই-বাবলাক জঙ্গল আর অরণ্য এই নিয়েই পড়ে আছ। দাঙ্গা, মন্বন্তর, অত বড় যুদ্ধের আঁচ আমাদের গায়েও তো কম লাগেনি!’’
কী বলেন তারাশঙ্কর!
মহা ধাক্কা খেলেন বিভূতিভূষণ! মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল আড্ডার হালকা রসের চল।
তা হলে কি এত দিন বিভূতি যা লিখেছেন, সব ভুল?
চুলোয় গেল ঘুম।
আড্ডা দূর-অস্ত।
টালা থেকে সোজা টালিগঞ্জ। চারু অ্যাভিনিউতে তখন থাকতেন কালিদাস রায়। যাঁর সাহিত্য-বিচারবোধের ওপর বিভূতিভূষণের অগাধ শ্রদ্ধা।
সব শুনে তিনি বললেন, ‘‘শোনো বিভূতিভূষণ, দেবী সরস্বতীকে তারাশঙ্কর গা-ভরা সোনার গয়না দিয়ে যতই সাজাক, তুমি দেবীর নাকছাবিতে যে হিরে বসিয়েছ, তা দেবীর সারা অঙ্গের গয়নার জৌলুসকে ছাপিয়ে চিরকাল  উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।’’
এ কথায় এত ক্ষণ পরে যেন শান্তি পেলেন বিভূতিভূষণ।
বাঙালির আড্ডায় খানার সঙ্গে ‘পিনা’র রেওয়াজ বহুকালের।
তেমনই ‘পিনা’ পার্টি ঘিরে মহানায়ক উত্তমকুমারের অনেক গল্পই বেশ মিষ্টিমধুর।
এক রাত-পার্টি।
মহনায়কের বাড়িতেই।
হই-হুল্লোড় চলছে। সঙ্গে স্ক্রিপ্ট লেখা, সিনেমার খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডাও।
রাত গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কেউ খানিক মাত্রা ছাড়াচ্ছেন। সেখানেই রয়েছেন সাহিত্যিক আশুতোষবাবুর সদ্য কিশোরী-কন্যা বুলবুলও। কিন্তু পার্টির অমন চড়া সুরে একটু যেন থতমত কিশোরী। ঘুমও আসছিল তার চোখ জুড়ে।
লক্ষ করলেন স্বয়ং উত্তম।
এগিয়ে এলেন। বুলবুলের হাত ধরলেন পিতৃতুল্য উত্তম। যাওয়ার আগে উপস্থিত সকলকে লক্ষ করে বলে উঠলেন, ‘মেরা বুলবুল শো রাহা হ্যায়/শোর অউর গুল না মাচাও’।
এই গানে সকলের না হোক, এক-আধজনের হুঁশ তো ফিরল! 
‘পিনা’র কথা উঠলই যখন, খালাসিটোলার গল্পে না গেলেই নয়। আর সেখানে এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের অদ্ভুতুড়ে স্বভাব অনেককেই অবাক করে দিত প্রায়ই।
নব্য সাহিত্যিকদের আড্ডা-গোষ্ঠী। সেই গোষ্ঠীর উজ্জ্বল মুখ তরুণ বয়সের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-শক্তি চট্টোপাধ্যায়েরা। আড্ডার মূল আকর্ষণ ছিলেন ওঁদের ‘কুলগুরু’ কমলকুমার মজুমদার।
খালাসিটোলার সেই ‘বাংলা-আসরে’ গ্লাস হাতে গপ্পো জমাতেন কমলকুমার। তাঁর কথাতে তখন বাংলার বাউল, গিরিশ ঘোষ, ডোকরা শিল্প থেকে ফরাসি সাহিত্য— বাদ যেত না কিছুই।  হাঁ করে গিলতেন অন্যরা। কিন্তু অদ্ভুত হল, এ হেন আড্ডা-চর্চায় কমলকুমার না কি কখনও বসে কথা বলতেন না। চেয়ার ফাঁকা থাকলেও না। এই গোটা দৃশ্যটাকে সুনীল তুলনা করেছিলেন ‘সক্রেটিসের আড্ডা’র সঙ্গে।
‘পিনা’র আড্ডায় যেমন রস আছে, তেমন আছে রসভঙ্গও।
কফি হাউস।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে আড্ডায় মশগুল শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। খানিক বাদে সেখানে এক বিখ্যাত অধ্যাপক ও সাহিত্যিকের প্রবেশ। শিল্পীর সঙ্গে অধ্যাপক মশায়ের আলাপ দেখে ছাত্রদল খানিক অবাক!
হলটা কী, দু’জনের এমন ভাবের কথা তো জানা ছিল না।
ছেলের দলের অবস্থা আন্দাজ করে শিল্পী তখন বলেন, ‘‘...আমরা যে এক গ্লাসের ইয়ার।’’
অধ্যাপক ভাবলেন, গেল গেল। ছাত্রদের কাছে মাথা কাটা গেল!
তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘‘এক্ষুনি ওদের বোঝাও, আমরা গ্লাসের না, এক কাপের ইয়ার।’’
হঠাৎ পরিবেশ উত্তপ্ত। তর্কাতর্কি। কথা কাটাকাটি। অধ্যাপক  না বোঝালে ছাড়বেন না। শিল্পীও গোঁ ধরে বসে। শেষ পর্যন্ত শান্ত হল কফির পেয়ালা। তবে অবশ্যই তুফান উঠিয়েই। সাহিত্যিক মানুষটি আর কেউ নন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়।
‘বসুশ্রী’ সিনেমা হলের আড্ডার কথা না বললে বোধহয় বাঙালি-আড্ডার নটে শাক কিছুতেই মুড়বে না।
বসুশ্রীতে ঢুকতেই বাঁ দিকের ছোট্ট একটা ঘর। সেখানেই একটা লম্বা টেবিলের ওপারে বসে সিনেমা হলের কর্ণধার মন্টু বসু। সামনে বেশ কয়েকটি হাতলওয়ালা চেয়ার।
সেখানে বসে রয়েছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, শ্যামল মিত্র প্রমুখ। হঠাৎ হলের সামনে থামল একটা ফিয়েট গাড়ি।
নেমে এলেন ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা উত্তমকুমার। হাতে কিং সাইজ সিগারেট। ঘরে ঢুকেই দেখেন, ভানুবাবু সবে একটা বিড়িতে সুখটান দিচ্ছেন।
উত্তম বলেন, ‘‘ভানুদা, বিড়ি কেন খাও! খেলে সিগারেট খাও।’ শোনামাত্র ‘ছাইড়্যা দিলুম’ বলে বিড়িটা পা দিয়ে দলে দিলেন রসরাজ।
এই আড্ডাতেই অন্য এক দিন—
আড্ডার পাত্ররা সকলেই আছেন। হঠাৎ জহর রায় উঠে পড়লেন— ‘‘বাথরুম যাব।’’
ভানু: আমিও যামু।
জহর: কেন?
ভানু: শিস দিমু! না হলে তো তর হইব না।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন নানা কাহিনি এক সময়ের আড্ডায় ছিল ভীষণ ‘হটকেক’।
তারই একটি বলা যাক। এন্টালিতে অনুষ্ঠান। ষাটের দশক। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বভাব ছিল, যে কোনও অনুষ্ঠান রাত ১২টার মধ্যে শেষ করে বাড়ি ফেরা।
সে বার এক জন বড় গাইয়ে গান করছেন। ওদিকে স্টেজের পিছনে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। রাত ১১টা বেজে গিয়েছে। গায়ক মঞ্চ ছাড়েন না। তিনি গান করছেন, ‘বালা নাচো তো দেখি’। ভানু আর থাকতে না পেরে সোজা স্টেজে চলে এলেন। লাউড স্পিকার টেনে বললেন, ‘‘শুধু বালায় হইব না। মধুবালা লাগব।’’
এর পর আর দর্শক ছাড়ে ওঁকে!
মহা আড্ডাবাজ ছিলেন বাংলা থিয়েটার-সিনেমার আরেক রসরাজ অনুপকুমার। শুধু নির্দিষ্ট ‘ঠেক’ নয়, যেখানে সেখানে আড্ডা বসিয়ে দেওয়া যেন ছিল তাঁর ‘বাঁ হাতের খেল’। এমনকী তার জন্য গুরুগম্ভীর পরিবেশেরও তোয়াক্কা করতেন না।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ।
অস্ত্রোপচার হচ্ছে অনুপকুমারের স্ত্রী’র। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অনুপকুমার। পাশে এক বিখ্যাত পরিচালক এবং আরও কয়েক জন থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে। সেখানেই গোল-আড্ডার মধ্যমণি অনুপকুমার।
ডাক্তার ওটি’তে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় অনুপকুমার তাঁকে পাকড়াও করলেন। বললেন, ‘‘আমি ভাগ্যবান হতে চাই।’’
ডাক্তারবাবু তো হাঁ। হকচকিয়ে বললেন, ‘‘মানে?’’
অনুপবাবু: মানে একটু যদি এ দিক, ও দিক করে দেওয়া যায়... আমি আপনাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিকও দেব।
ডাক্তার: মানে? কী বলছেন?
অনুপবাবু: না, মানে কথায় আছে ভাগ্যবানের বউ মরে। আমার ভাগ্যবান হওয়া এখন আপনার হাতে..!’
এ কথা শুনে কেউ গুম মেরে থাকতে পারে? পরিবেশ যাই-ই হোক!
কথার পিঠে কথা দিয়ে ‘কাবু’ করাও আড্ডার এক মস্ত আর্ট। বাঙালি আড্ডায় তেমন গল্পও নেহাত কম নয়।
ছোট্ট একটা নমুনা দেওয়া যাক—
প্রথম জন: আচ্ছা, আপনি শান্তিনিকেতনে কদ্দিন ছিলেন?
দ্বিতীয় জন: উনিশ বছর..
প্রথম জন: গান শিখেছেন?
দ্বিতীয় জন: না, ওই গানটাই শেখা হয়নি।
প্রথম জন: সেকি! উনিশ বছর ছিলেন অথচ গান শেখেননি?
দ্বিতীয় জন: আপনার বাড়ি কোথায়?
প্রথম জন: দমদমে। তিন পুরুষের বাস।
দ্বিতীয় জন: তা আপনি এরোপ্লেন চালাতে পারেন?
দ্বিতীয় জনের নাম প্রমথনাথ বিশী। প্রথম জন তাঁর জনৈক বন্ধু।
আড্ডার আসরে এমন কথার পিঠে কথা সাজাতে রাজশেখর বসুরও জুড়ি মেলা ভার।
অথচ এই রাজশেখরই কিনা অভিধানে আড্ডার মানে লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘কু-লোকের মিলন-স্থান’!
রাজশেখর বিজ্ঞান-সচেতন। সকলেই জানতেন।
এক আড্ডায় তাঁর এক বন্ধু জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘‘দাড়ি কাটা হয়ে গেলে পুরনো ব্লেডগুলো ফেলে দিই আমরা। এগুলো দিয়ে কোনও কাজ হতে পারে না?’’
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাজশেখরবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘‘মাটিতে পুঁতে দিয়ে দেখতে পারেন, যদি গোলাপ গাছ হয়!’’
পরশুরাম ছাড়া এমন উত্তর আর কে দেবেন!
ঋণ: কলকাতার আড্ডা: (সম্পাদনা: সমরেন্দ্র দাস), ‘হীরের নাকছাবি’ ও ‘সম্পাদকের বৈঠকে’ (সাগরময় ঘোষ), আড্ডা (গোপাল হালদার), সবুজপাতার ডাক (হারীৎকৃষ্ণ দেব), প্রভিনসিয়ালাইজিং ইউরোপ (দীপেশ চক্রবর্তী), সর্বাণী মুখোপাধ্যায়, পিনাকী ঠাকুর, দেবশঙ্কর হালদার, পবিত্র সরকার, দেবজীবন বসু, শ্রীজাত, পঙ্কজ সাহা, রামকুমার মুখোপাধ্যায়, জয়ন্ত চক্রবর্তী, সুব্রত ভট্টাচার্য, দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ও রোটেনস্টাইন (অশ্রুকুমার সিকদার), বাঙালির আড্ডা (সম্পাদনা: লীনা চাকী), গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, অলকা গঙ্গোপাধ্যায়

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/the-gossipers-1.495148