Tuesday, 2 August 2016

নিজের শোকসভাতে হাজির হবেন প্রয়াত বিভূতিভূষণ (On Shibram and Bibhutibhushan)

$image.name

নিজের শোকসভাতে হাজির হবেন প্রয়াত বিভূতিভূষণ

সভার আমন্ত্রণ পত্র দিতে এসে উদ্যোক্তারা তেমনই জানিয়েছিলেন শিবরাম চক্রবর্তীকে। তার পর...

৯ জুলাই, ২০১৬, ০০:০৩:৫৩
শিবরাম চক্রবর্তী
সেবারও বেজায় টাকার টানটানি। শেষে কাবুলিওলার থেকে ধার করবেন কি না ভাবছেন। খবর পেলেন বিভূতিভূষণ।
তখনও দুইজনের মধ্যে তেমন ভাল পরিচয়ও নেই। তবু বিভূতি নিজেই সেধে বললেন, ‘‘কেন ভাই কাবুলির থেকে ধার করবেন? কত টাকা চাই আপনার?’’
শিবরাম অম্লানবদনে বললেন, ‘‘এই ধরুন টাকা পঞ্চাশেক পেলেই আপাতত চলে যাবে।’’
‘‘এই নিন টাকা, ওসব কাবুলির থেকে নিতে হবে না। ওদের বড্ড চড়া সুদ,’’ বলে বিভূতিভূষণ পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বার করে দিয়ে দিলেন।
সলজ্জ শিবরাম বললেন, ‘‘আপনার এই ঋণ আমি জীবনে শুধতে পারব না।’’
যথারীতি শুধতে পারেনওনি। মানে কখনও ইচ্ছে থাকলেও উপায় আর উপায় থাকলেও ইচ্ছে হয়নি আর কি! দু’জনে দেখা হলে বিভূতিভূষণ তার প্রাপ্য টাকার কথা তো কখনই তুলতেন না। শিবরাম যদিও বা কখনও বলতেন, ‘‘দাদা আপনার ওই টাকাটা এখনও বাকি...।’’
বিভূতি বলে দিতেন, ‘‘আরে থাক থাক সেসব কথা। পরে দেবেন।’’
‘‘বেশ তাহলে সুদটাই নিন। বলে টাকার বদলে দু’চার পয়সার তেলে ভাজা কিংবা চিনেবাদাম তুলে দিতেন বিভূতিভূষণের হাতে।’’ বিভূতি তাতেই খুশি।
আসলে টাকা পয়সার ব্যাপারে চিরকালই বিভূতিভূষণ ছিলেন বেজায় উদাসীন। খানিকটা শিবরাম গোছের, আবার খানিকটা একেবারেই অন্য ধারার।
টাকা হাতে পাওয়ার আগ্রহ যথেষ্ট, কিন্তু সে-টাকা একবার হাতে এসে গেলে সেগুলো যে খরচও করতে হয় কিংবা সঠিকভাবে জমানো, তার ব্যাপারে কোনই আগ্রহ ছিল না বিভূতিভূষণের। আর এখানেই শিবরামের সঙ্গে তাঁর চূড়ান্ত অমিল। 
আধ্যাত্মিকতা, পরলোকচর্চায় খুবই আগ্রহ ছিল বিভূতিভুষণের। ‘দেবযান’ উপন্যাস নিয়েও তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল শিবরামের। পুনর্জন্মে খুব বিশ্বাস করতেন।
শিবরামকে বলেছিলেন, ‘‘তুমি তো আর বিয়েথা করলে না। তোমার ছেলে মেয়ে নেই। আর সেই জন্যই তোমার পূর্বপুরুষরাও পূনর্জন্ম নিতে পারছেন না। আর তাদের পূনর্জন্ম না হলে তোমারও নতুন জন্ম নেওয়ার সুযোগ নেই। সবাই পর পর লাইনে আছেন কিনা। তাই তুমি বে থা না করে নিজে তো বটেই, তোমার আগের সাতপুরুষও বায়ূভূত হয়ে ঘুরবে। আমি বিয়ে করব এবার। ফিরতি বার্থ রিজার্ভেশন করে রাখা চাই বুঝলে ভায়া।’’
‘‘সে কি দাদা আপনি এই বয়েসে বিয়ে!’’
‘‘কেন সামান্য চল্লিশ বছর তো বয়স আমার।’’
শিব্রাম কিন্তু বিলক্ষণ জানতেন তখন বিভূতিভূষণের বয়স চল্লিশের অনেক বেশি।
বিয়ে করলেন বিভূতিভুষণ। তারপর অনেক দিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই শিবরামের। একবার দুর্গাপুজোর সময় শিবরাম গেলেন বিভূতিভুষণের ঘাটশিলার বাড়ি। পুজোর ছুটি ওখানেই কাটাবেন এমন ইচ্ছে।
গিয়ে দেখেন বেশ স্বাস্থ্যবান একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বিভূতিভুষণ বাগানে ঘুরছেন। শিবরাম বুঝলেন, শিশুটি বিভূতিরই। জিজ্ঞসা করলেন, ‘‘তা আপনার ঘাড়ে কি সেই ফেরবার টিকিট?’’
‘‘একদম ঠিক ধরেছ। ওর নাম দিয়েছি কাজল। ওর মাধ্যমেই তো আবার আমাকে ফিরতে হবে।’’
বিভূতিভুষণের সেই পারলৌকিক বিশ্বাস যে কতটা তীব্র ছিল, বারেবারে টের পেয়েছেন শিবরাম নিজে। মৃত্যুর কিছু দিন আগে এক শ্মশানে নিজের মৃতদেহকে নাকি নিজের চোখে দেখতে পেয়েছিলেন বিভূতিভুষণ। সে-ঘটনাও জানতেন শিবরাম। আর মৃত্যুর পর? সে এক অদ্ভুত ব্যাপার! 
একদিন রিপন কলেজের বেশ কিছু ছেলে এসে শিবরামকে জানালেন, ‘‘আমরা এই বছর বিভূতিভূষণের জন্মদিন পালন করব, আপনাকে সভাপতি হতে হবে।’’
‘‘বেশ হব। কিন্তু অতিথি সৎকারের ব্যবস্থা থাকবে তো? মানে একটু ভাল মন্দ।’’
‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। স্বয়ং বিভূতিবাবুও আসবেন ওইদিন।’’
‘‘মানে? উনি আবার কী করে আসবেন? উনি তো পরপারে।’’ শিবরাম অবাক!
‘‘আজ্ঞে উনি আমাদের ত্রিকোণ চক্রে মাঝেমাঝেই আসেন। আমরা প্ল্যানচেট করে ডেকে আনি তাঁকে। কথাবার্তাও হয়।’’
‘‘বলো কি! তা জীবিত আর কাকে কাকে ডাকছ ওইদিন?’’
ছেলেরা বলল, ‘‘ভেবেছিলাম অনেককেই ডাকব, কিন্তু শেষ প্ল্যানচেটে বিভূতিবাবুই বললেন যাকেই ডাকো, কেউই আসবেন না।’’
‘‘তার মানে পরলোকে গিয়ে উনি তাঁর লেখকবন্ধুদের ভালমতই চিনেছেন। বেশ বেশ।’’
‘‘সেইজন্যই আমরা আপনার কাছে এলাম। আপনি অন্তত যাবেন আশা করি।’’
‘‘হ্যাঁ যাব বইকী। খাবার দাবারের ব্যবস্থা রাখবে বলছ যখন!’’
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওইদিন সেখানে গিয়েও যাননি শিবরাম। বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে ফিরে এসেছিলেন। এই বিষয়ে শিবরামের যুক্তি ছিল, বিভূতিবাবু যখন ভেবেই নিয়েছেন তাঁর জন্মদিনে কোনও বন্ধু আসবেন না, তখন তাঁর সেই বিশ্বাসে আঘাত করা ঠিক নয়। আর দ্বিতীয়ত সেই যে পঞ্চাশ টাকা ধার রয়ে গিয়েছিল সেটা এখন যদি তার অনুগত ভক্তদের মধ্যে বলে ফেলেন, সে ভারী লজ্জার ব্যাপার হবে।
তাই বিদেহী বিভূতিবাবুর সঙ্গে দেখা করার চেয়ে স্বদেহে ফিরে আসাটাই ঢের ভাল বলে মনে করলেন শিবরাম!

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/story-on-shibram-chakraborty-and-bibhutibhushan-bandyopadhyay-1.430395

জ্যোতির্বলয় (On Jyotirindra Nandi)

$image.name

জ্যোতির্বলয়

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। তাঁর ছেলেবেলা, ঘর সংসার, সাহিত্যের প্রেম-অপ্রেম আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর সঙ্গে এক সন্ধের আড্ডা। স্মৃতিতে ফিরলেন প্রশান্ত মাজী

১৬ জুলাই, ২০১৬, ০০:০০:০০
writer
বেলেঘাটার বারোয়ারিতলায় একটা বস্তি দেখে এসে আমাকে বললেন, ‘ওই বস্তিতে থাকতে হবে।’ আমি সম্মতি জানালাম। লেখার তাগিদে ওই বেলেঘাটার তেরো ঘর বস্তির মধ্যে আমরা ছিলাম। উনি তেরো ঘর নাম না দিয়ে উপন্যাসের নাম রাখলেন ‘বারো ঘর এক উঠোন’।’’
সাহিত্যিক স্বামী জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে নিয়ে বলতে গিয়ে এক জায়গায় এমনই কথা লিখেছিলেন স্ত্রী পারুলদেবী।
ওঁদের আলাপেরও সূত্রপাত জ্যোতিরিন্দ্রর লেখালেখির সূত্রেই।
সময়কাল ১৯৪৫। দাদা-বৌদি-বোনেদের সঙ্গে তখন ময়মনসিংহ থেকে কলকাতায় চলে আসেন পারুল। ওঠেন ৮০/১ হ্যারিসন রোডে।
এক দিন তাঁর চোখে পড়ল বাড়িতে রাখা বাঁধানো ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার একটি গল্প। ‘শশাঙ্ক মল্লিকের নতুন বাড়ি’। লেখক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।
জ্যোতিরিন্দ্রর সঙ্গে পারুলের আলাপ এর পরেই। ব্রাহ্মণবেড়িয়ার শিক্ষক ও পরে আইনজীবী অপূর্বচন্দ্র নন্দীর ছেলে জ্যোতিরিন্দ্র তখন সবে ঢুকেছেন কলকাতার জে ওয়াল্টার কোম্পানিতে। বিজ্ঞাপনের সামান্য কর্মী। গল্প লিখছেন দু’বেলা, দু’হাত খুলে।
তাঁর গল্প পড়েই বৌদির জ্যাঠতুতো ভাইয়ের মাধ্যমে পারুলের আলাপ হল জ্যোতিরিন্দ্রর সঙ্গে। তখনই রীতিমতো লেখক হয়ে উঠেছেন তিনি।
জ্যোতিরিন্দ্রর কৃশ চেহারা। পরনে ময়লা ধুতি। পাঞ্জাবি। প্রথম দেখে পারুলের মনে ধরেনি। ধীরে ধীরে বোধহয় তাঁর লেখক-সত্তাটিকে ভালবেসে ফেলেন। পরে মানুষটিকেও।
পারুল-জ্যোতিরিন্দ্রের বিয়ে হয়ে যায় ১৯৪৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। বিয়ের দিনেও যে সেজেগুজে ‘বর’ সেজে এসেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র, তা’ও নয়। একরাশ ঝাঁকড়া চুল। লন্ড্রি থেকে কাচানো ধুতি। ব্যস।
আজীবন অর্থের মুখ দেখেননি। জীবনে ‘জনপ্রিয়তা’ পাননি। তবু স্বামীকে নিয়ে পারুলদেবীর গর্বের সীমা ছিল না।
পারুল লিখেছিলেন, ‘‘মানুষটার মন কিন্তু কখনও অর্থহীনের মতো হয়ে পড়েনি।... মনের ছাপ একমাত্র ধরা পড়ত চোখ দুটিতে। চোখ দুটি দেখলেই বোঝা যেত মানুষটি কৃশ হয়েও কত শক্ত।’’
জ্যোতিরিন্দ্রর প্রিয় বিষয় ছিল একা-একা চারপাশকে শুধুই দেখে চলা। আর কল্পনার মিশেলে তাকে তাতিয়ে কাগজে কলমে ফোটানো। এবং সেই ফুটিয়ে তোলা যে কত সূক্ষ্ম, অনুপুঙ্ক্ষ! ...এ নিয়ে অদ্ভুত একটি গল্প আছে।
তখন ওঁর ‘ঝড়’ উপন্যাস সবে বেরিয়েছে একটি সাপ্তাহিকে। উপন্যাসের পটভূমি উত্তরবঙ্গ। চা-বাগান।
উপন্যাস প্রকাশের পর এক দিন এক যুবক সুদূর সেই চা-বাগান অঞ্চল থেকে খুঁজে খুঁজে কলকাতায় এসে হাজির। উদ্দেশ্য, লেখকের সঙ্গে একবারটি দেখা করা।
লেখা পড়ে যুবক আপ্লুত। বিস্মিত। স্থান-কাল-পাত্র সব যে তার দেখা শোনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে! লেখক নির্ঘাত এক সময় ওখানে বাস করেছেন! 
যুবকের সঙ্গে দেখা হল জ্যোতিরিন্দ্রের। কিন্তু তাঁর উত্তর শুনে যুবকের বিস্ময় যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। জ্যোতিরিন্দ্র বললেন, ‘‘চা-বাগান তো দূরের কথা। আমি উত্তরবঙ্গের ধারেকাছে যাইনি।’’
তাঁর কল্পনার ধার ছিল এতটাই প্রবল! তা যে শুধু পরিণত বয়সে তা নয়, শৈশব থেকেই এমন। চারপাশের রূপ-রস-গন্ধে বরাবরই মজে যেতেন জ্যোতিরিন্দ্র। এবং তা যখন লেখায় এসে ছবি আঁকত, কেমন করে যে রং ছড়াত, নিজেও বুঝে পেতেন না!
এক জায়গায় জ্যোতিরিন্দ্র লিখছেন, ‘‘পূর্ব বাংলার ছেলে। প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ। দু’পা বাড়ালেই নদী। ধূ ধূ গ্রাম। গাছপালা, ক্ষেতখামার, ধানক্ষেত, পাটক্ষেত। ড্যাবড্যাব করে পুকুরঘাটের দিকে তাকিয়ে থাকতুম। খেজুর আর ডালপালা ছড়ানো একটা ঝুপসি শেওড়া গাছের পিছনে লাল দগদগে আকাশ। ঝাঁক বেঁধে লাল ফড়িং উড়ছে। দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। মা জিজ্ঞেস করত, ‘অত কি ভাবিস রে তুই?’ ছোটকা বলত, ‘ধনু আকাশ দেখছে।’ বড় পিসি বলল হয়তো, ‘না, না ও ফড়িং দেখছে।’ ঠানদি বলল, ‘না, না ওর ঘুম পেয়েছে।’ আমার কিন্তু ভ্রুক্ষেপ নেই। একেবারে তখন থেকেই নাক আর চোখ ছিল সজাগ। তিতাসের বুকে নৌকা দৌড় বা দুর্গাপ্রতিমার ভাসান বা ভাদ্রের পচা পাটের গন্ধ, অঘ্রাণের ঘ্রাণ, বর্ষার মৌরলা খলসের আঁশটে গন্ধ... কেমন যেন হয়ে যেতুম এবং তা থেকেই...। লেখা ব্যাপারটা তো বড় রহস্যময়। কোথা থেকে কী এসে যায়!’’
জ্যোতিরিন্দ্রের ভারী পছন্দের ছিল নিঃসঙ্গতা, নির্জনতা, আত্মমগ্নতা।
সারা দিন শুধু চুপ করে বসে থাকতেন। বাদবাকি সময়টুকু শুধু লেখা আর পড়া।
মাঝে মাঝে আড্ডায় যাওয়া, বাড়ির এ দিক ও দিক হাঁটা।
দূরে বেশি কোথাও যাননি কখনও। বড়জোর পুরীর সমুদ্র কী শিমুলতলা, বেনারস, ঘাটশিলা।
একবার পুরী গিয়েছিলেন স্ত্রীকে নিয়ে। সে এক কাহিনি! প্রথম রাতে একা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লেন। বসলেন গিয়ে সাগরের পারে।
পরের বর্ণনা ওঁর মুখেই, ‘‘হঠাৎ কী বলব, ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো সারা শরীরে একটা স্পার্ক খেলে গেল, শরীরটা শিউরে উঠল। আমার মনে হল, সামনে এক অসীম শূন্যতা ধূ ধূ করছে। এর যে শেষ কোথায়, বুঝে উঠতে পারিনি। তার পর থেকে যে ক’দিন পুরীতে ছিলুম প্রায় ছটফট করে কাটিয়েছি। কলকাতায় ফিরেই ‘সমুদ্র’ গল্পটা লিখি। তা লিখে বেশ ভাল লেগেছিল। ‘দেশ’ পত্রিকায় দিলাম। মনে আছে, সাগরবাবু (সাগরময় ঘোষ) উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘‘বুঝলে জ্যোতিরিন্দ্র, অফিসের টেবিলে বসে আমি পুরোপুরি সমুদ্রের ঝাঁঝ পেয়েছি।’’


‘দেশ’ সাহিত্য পত্রিকা, ১৩৭৬।
অগ্রজ প্রিয় লেখকদের নিয়ে লিখলেন অনুজ সাহিত্যিকেরা।
তাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীকে নিয়ে। ‘নীল রাত্রি ও বনের রাজা’।
জ্যোতিরিন্দ্র তখন জীবিত।
থাকতেন পিকনিক গার্ডেন্স হাউসিং এস্টেট-এ।
‘মীরার দুপুর’, ‘সূর্যমুখী’, ‘বারো ঘর এক উঠোন’ বা ‘প্রেমের চেয়ে বড়’ — এ রকম অনেক উপন্যাস লেখা হয়ে গেছে।
তাঁর ‘গিরগিটি’, ‘খালপোল ও টিনের ঘরের চিত্র’, ‘বনের রাজা’, ‘নীল রাত্রি’র মতো কালজয়ী গল্প পড়ে পাঠক মুগ্ধ।
তেমনই এক সময় এক সন্ধেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও এক কবি বন্ধুকে সঙ্গে করে হাজির হয়েছিলাম ওঁর হাউজিং-এর ফ্ল্যাটে। ঠিক সাক্ষাৎকার নয়, দুই সাহিত্যিকের আড্ডা হবে।
আমরা হব দোসর।
এমনই এক আব্দার করতে সুনীলদা বলেছিলেন , ‘‘আমি তো ঠিক স্মার্ট কথা বলতে পারি না, আর টেপরেকর্ডার থাকলে তো কথাই নেই। তা ছাড়া জ্যোতিদার সঙ্গে লেখাটেখা নিয়ে কী কথা বলব? ওই একটু গল্পগুজব করা যাবে।’’
আর এমনটা হতে পারে জানতে পেরে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বলেছিলেন, ‘‘আমার সাক্ষাৎকার? সুনীল আসবে এত দূরে আমার বাড়িতে কথা বলতে? বিশ্বাস করতে পারছি না বাবা!’’
তার পরেই দীর্ঘশ্বাস!
‘‘কী হবে আমার কথা শুনে? আমার লেখা কেউ পড়ে নাকি? আমার পাঠক কোথায়?’’
পিকনিক গার্ডেন্সের গোটা এলাকা সে দিন অন্ধকার। দু’ধারের দোকান থেকে মোমবাতি-লণ্ঠনের আলো এবড়োখেবড়ো রাস্তায় এসে পড়েছে।
পথ হাতড়ে হাতড়ে অনেকগুলো ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা তিনজন।
‘‘জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী কোন বাড়িতে থাকেন? ব্লক এল-এ, ফ্ল্যাট ৪ কোনটি?’’
গ্রীষ্মের বিকেল গড়িয়ে সবে সন্ধে হয়েছে। হাওয়া নেই। আলো নেই।
ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের অনেকেই বাড়ি ছেড়ে রাস্তায়।
সামনেই এক ভদ্রমহিলা।
প্রায় অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে না পেরে তাঁকেই জিজ্ঞেস করে বসলাম। এক লহমা তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘‘আরে আরে আসুন। আপনারাই তো সে দিন এসেছিলেন ওঁর কাছে। ... আর আপনি তো সুনীল গাঙ্গুলি। ... আসুন, সাবধানে পা দেবেন সিঁড়িতে। অন্ধকার তো।’’
অন্ধকার চোখে সয়ে যেতে আমরাও চিনে গেছি তাঁকে। 
শ্রীমতী পারুল নন্দী।
দোতলায় ফ্ল্যাট। দরজা খোলাই ছিল। কথাবার্তা, জুতোর শব্দে অভিপ্রেত মানুষটি আগেভাগেই আন্দাজ করে বাতি হাতে দোরগড়ায় চলে এসেছেন।
পরনে লুঙ্গি। গায়ে মোটা খদ্দরের পাঞ্জাবি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। কোঁকড়ানো চুল।
‘‘এসে এসো সুনীল। কদ্দিন পরে দেখা। অ্যাঁ!’’
এক্কেবারে নিরাভরণ একটি ঘর। বুকসেলফ। ছোট্ট একটা চেয়ার। টেবিল। ইতস্তত ছড়ানো কিছু পত্রপত্রিকা। আর কিচ্ছুটি নেই।
একটু বাদে পারুলদেবী চা আনতে গেলেন। ওঁর যাওয়ার পথে নজর রাখতেই পাশের ঘরের আলোছায়ায় চোখে পড়ল একটা সেতার।
জিজ্ঞাসু চোখে চাইতেই পাশেই বসা ওঁদের ছেলে তীর্থঙ্কর বললেন, ‘‘মা বাজান।’’
শুরু হল আড্ডা।
সপরিবার

সুনীল: নস্যি নেন না আর?
জ্যোতিরিন্দ্র: না। বিড়িটা খাই।
সুনীল: শরীর তো বেশ খারাপ যাচ্ছে?
জ্যোতিরিন্দ্র: গ্যাসট্রিক। বুঝলে কি না.. টেবিল ওয়ার্ক একটুআধটু করতে পারি। কিন্তু...
সুনীল: লিখতে কী অসুবিধে হচ্ছে?
জ্যোতিরিন্দ্র: ভাবনাগুলো ঠিক মাথার মধ্যে খেলাতে পারছি না। আর কী হবে বলো..চার দিকে দুঃসংবাদ। বনফুল চলে গেলেন। কমলবাবু (কমলকুমার মজুমদার), দীপেন (বন্দ্যোপাধ্যায়)...। দীপেনের জন্য এক দিন বিকেলে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বয়স তো কিছুই হয়নি। কমলবাবুর কী অসুখ করেছিল?
সুনীল: শুনলুম কার্ডিয়াক-অ্যাজমা জাতীয়... আচ্ছা, জ্যোতিদা, সেই অষ্টমীর দিনের আড্ডাটা মনে প়ড়ে? কমলদা, সাগরদা (সাগরময় ঘোষ), আপনি, আমরাও কয়েক বার...
জ্যোতিরিন্দ্র: ভালই মনে আছে। শরীরের ওপর অত্যাচার তো হয়েইছে। নইলে... আচ্ছা, তোমাকে সব সময়ই সুস্থ দেখি। এত হুল্লোড়ে আছ, অথচ শরীরটা ঠিক রেখেছ...
সুনীল: একটুআধটু কী হয় না! আমার অ্যাসিডের ধাত। পাত্তা দিই না। জেলুসিল খেয়ে বেরিয়ে পড়ি।
(পারুলদেবী চা-মিষ্টি নিয়ে এলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে জ্যোতিরিন্দ্র বলে উঠলেন, ‘‘আমাদের আড্ডা তো দেখছি জেলুসিল আর নস্যি-বিড়ির দিকে চলে যাচ্ছে! তোমরা তো আবার সাহিত্যও চাও। তা বলো, সাহিত্যের কী জানতে চাও?)
সুনীল: আপনার প্রথম লেখা বোধ হয় ঢাকার কাগজেই?
জ্যোতিরিন্দ্র: হ্যাঁ। কলেজে ঢুকেই ঢাকায় সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’-তে একটা অনুবাদ গল্প পাঠাই। ছাপা হয়। তার পর থেকেই বুঝলে কিনা, একের পর এক গল্প লিখতে থাকি। ছাপা হতে থাকে। কলকাতার ‘নবশক্তি’-তে তখন সম্পাদক প্রেমেন মিত্র। সেখানেও...
সুনীল: কলকাতায় কখন আসেন?
জ্যোতিরিন্দ্র: সেটা বোধ হয় ১৯৩৭-৩৮। ’৩৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘রাইচরণের বাবরি’ নামে আমার একটা গল্প বেরয়। তার পরই চলে আসি। চাকরিবাকরি তো দরকার।
সুনীল: আচ্ছা, একজন লেখকের জীবিকা কী রকম হওয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?
জ্যোতিরিন্দ্র: কোনও চাকরিই ভাল লাগেনি। তুমি কী বলো?
সুনীল: লেখকদের জন্য জীবনানন্দই (দাশ) তো বলেছেন, পৃথিবীতে নেই কোনও বিশুদ্ধ চাকরি।
জ্যোতিরিন্দ্র: তাই তো। গোটা দুই টিউশনি করতাম। আর সাহিত্য। সিনেমা, খেলাধুলো কিচ্ছু না। তবে এখন ভাবলে...বুঝলে ... খারাপই লাগে... কী ছেলেমানুষিই না করেছি! তার ঠেলা এখন সামলাতে হচ্ছে।
সুনীল: কখনও প্রচুর লিখতে ইচ্ছে করেছে?
জ্যোতিরিন্দ্র: না। একদম না। একটা গল্পও কয়েক মাস ধরে লিখেছি।
সুনীল: এখনকার লেখালেখি পড়েন?
জ্যোতিরিন্দ্র: পড়ি। ভাল অনেকেরই লাগে। কিন্তু ভাল হলেই তো আর সব হয়ে গেল না। স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো লেখা কই! আমাদের লেখা শুরুর সময় সে সব কী গল্প পড়তুম! বিভূতিবাবুর ‘পুঁইমাচা’, বুঝলে, হঠাৎ এক দিন একটা কাগজে গল্পটা পড়ে ফেলি। তার পর কী করি জানো? ব্লেড দিয়ে গল্পটা কাগজ থেকে কেটে নিয়ে মাথার বালিশের নীচে রাখি। মানে, প্রায়ই পড়ব আর কী! কই সেই উত্তেজনা তো এখন পাই না! ... আসলে কী জানো? আরও নিষ্ঠা চাই। আরে বাবা! তুমি এক জন লেখক। তা তোমার কাছে প্রেমিকা ছাড়া আর কিছু নেই? তোমার মা আছে, ভাই, বোন সব আছে। অথচ লিখতে গিয়ে শুধু প্রেমিকা আসছে কেন? মাকে নিয়েও তো লিখতে পারো। বুড়ো বাবা, ছোকরা বাবা... প্রেম তো তাদের সঙ্গেও হয়।
আমরা: আপনার লেখা শুরু করার সময় কাদের লেখা ভাল লাগত?
জ্যোতিরিন্দ্র: ‘কল্লোল’-এর লেখকদের। প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু...
আমরা: মানিকবাবুর (বন্দ্যোপাধ্যায়) লেখা সম্পর্কে কি কিছু বলবেন?
জ্যোতিরিন্দ্র: ওঁর বেশির ভাগ লেখাই ভাল লাগে না। ‘হলুদপোড়া’, ‘সরীসৃপ’ নিয়ে খুব হইচই হয়েছে, আমার তো তেমন ভাল লাগেনি বাপু! ‘প্রাগৈতিহাসিক’ কিন্তু ভাল লেগেছিল। স্তব্ধ হয়ে যাই।
সুনীল: শরৎচন্দ্র?
জ্যোতিরিন্দ্র: একদম ভাল লাগে না। প্রথম দিকে ‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’ ভাল লেগেছিল। এখন তো পড়ি না। তবে আমার ধারণা, এখন ভাল লাগবে না। তোমার?
সুনীল: আমি তো প্রায় পড়তেই পারি না। কিন্তু ভাবুন, রবীন্দ্রনাথের লেখা! কী প্রবন্ধ, কী উপন্যাস, গান...
জ্যোতিরিন্দ্র: তা বটে! ‘চতুরঙ্গ’, ‘চার অধ্যায়’ এখনও আমার ভাল লাগে। আচ্ছা, তুমি কমলকুমারের লেখা পছন্দ করো দেখেছি। কেন বলো তো? আমার তো ভাল লাগে না। বুঝতে পারি না। অত জটিল করে লেখেন!
সুনীল: আসলে কমলবাবুর ব্যাপারটা একটু আলাদা ভাবে ভেবে দেখা দরকার। একটা দেশে এ রকম লেখক এক-আধজনই থাকেন, যাঁরা খ্যাতি চান না। পাঠক নিয়ে ভাবেন না। পাঠকরা পরিশ্রমী না হলে এ সব লেখা নিতে পারা একটু কঠিন...
আমরা: আপনি তো একেবারে প্রথম দিকে কবিতা লিখতেন?
জ্যোতিরিন্দ্র: সে খুবই ছোটবেলায়। সেভেন-এইটে পড়ার সময়। আঁকতুমও। এক বার একটা হাতের লেখা কাগজ বার করেছিলাম। তাতে আঁকা, কবিতা দুই-ই ছিল। এখন ভাবলে হাসি পায়।
সুনীল: আপনার ‘প্রেমের চেয়ে বড়’-তে তো অনেক কবিতা ছিল। তা এখন কবিতা পড়েন?
জ্যোতিরিন্দ্র: মাঝে মাঝে। নীরেনবাবু (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী) আর তোমার কবিতা বেশ ভাল লাগে। আর শক্তির (চট্টোপাধ্যায়) কবিতা... মনে হয়... বেশ ভাল হচ্ছে... কিন্তু ঠিক বুঝতে পারি না। এ রকম কেন হয় বলো তো?
সুনীল: আসলে আমার কবিতা তো প্রায়ই স্বগতোক্তি। তাতে একটা কাহিনি বা দৃশ্য বা বর্ণনামূলক ব্যাপার থাকে। আর শক্তির কবিতা হল শব্দনির্ভর। তাই বোধ হয়...
আমরা: আপনার পরবর্তী কালের গদ্যলেখকদের সম্পর্কে...
জ্যোতিরিন্দ্র: সুনীলের লেখা তো ভাল লাগে, বলেছি। সমরেশ (বসু) একজন বড় লেখক। ওর ‘সুচাঁদের স্বদেশযাত্রা’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই। এ ছাড়া মতি (নন্দী), শীর্ষেন্দু (মুখোপাধ্যায়), দিব্যেন্দু. (পালিত).. আর সন্দীপনের (চট্টোপাধ্যায়) গদ্য ভাল লাগে।
আমরা: আপনার লেখকজীবনের দুটো একটা স্মৃতি বা ঘটনার কথা বলবেন?
জ্যোতিরিন্দ্র: স্মৃতি... ঘটনা... কী বলব ঠিক?...কী বলব সুনীল?
সুনীল: না মানে এত দিন ধরে লিখছেন। কত ব্যাপারই তো ঘটে।
জ্যোতিরিন্দ্র: আমার বাবার কথা মনে পড়ে। খুব ছোট থেকেই আমি মায়ের চেয়ে বাবার বেশি ভক্ত। বাবা চিরকালই আমাকে খুব প্রশ্রয় দিতেন। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা প্রত্যেকটা ব্যাপারে এত উৎসাহ দিতেন...একটা ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। শহরের নানা কাগজে তখন আমার লেখা বেরচ্ছে, এ দিকে বাবা এই ব্যাপারটা কেমন ভাবে নিচ্ছেন, ঠিক বুঝতে পারতুম না। বাবা কাছারি যাবার সময় আমার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখতেন আমি কেমন মনমরা হয়ে টেবিলে ঝুম মেরে বসে থাকতুম। কাছারি থেকে বাড়ি ফিরেও সেই একই ভাবে আমাকে বসে থাকতে দেখতেন। তা এক দিন কী হল, বাবা কাছারি থেকে ফিরে নিজের ঘরে ঢোকার আগে আমার ঘরে ঢুকে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, ওই যে তুই লিখতিস-টিখতিস, তা এখন লিখিস তো? ওটা ছাড়িস না। লিখবি... লিখে যা। তোমাদের কী বলব সুনীল, বাবার ওই ডায়লগ আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। এর পর বললে বিশ্বাস করবে না, যত দিন গল্প লিখেছি, কেবলই মনে হয়েছে, টেবিলের পিছনে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। আর কেবলই বলছেন, ‘অ্যাই ওটা ঠিক হল না। কেটে দে। আবার লেখ।’ কেটেছি। আবার লিখেছি। ফাঁকি দিইনি একটুও।... কিন্তু কী হল বলো?
সুনীল: কী যে বলেন! আপনি বাংলা ভাষায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক...
জ্যোতিরিন্দ্র: আর বড় লেখক... এখন তো আমরা বুড়ো ঘোড়া। এই দেখো না, এখন তো আমার ছেলেই বলে, আমার লেখাতে নাকি বড় বেশি ডিটেল। আধুনিক নয়।
সুনীল: এ বার উঠব জ্যোতিদা, অনেক রাত হল। শেষে একটা অনুরোধ জানাচ্ছি, এ বার আত্মজীবনীমূলক একটা বড় লেখায় হাত দিন। আমার মনে হয়, এটা আপনার কাছ থেকে আমাদের পাওয়া দরকার।


এর মধ্যে আলো কখন এসে গেছে, খেয়ালই ছিল না! পারুলদেবী চা নিয়ে ঢুকলেন।
আমরা তাড়াতাড়ি চা খেয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম।
রাত তখন দশটা।

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/an-write-up-on-jyotirindro-nandi-1.435661

লেখকের বন্ধু লেখক

$image.name

লেখকের বন্ধু লেখক

এক টেবিলের দু’ধারে দুজন বসে লিখছেন। প্রেমে, ডিভোর্সেও, এগিয়ে দিচ্ছেন আশ্রয়ের কাঁধ। প্রকাশক খুঁজে দিচ্ছেন, আমৃত্যু আগলে রাখছেন বন্ধুর লেখা। কলমের বন্ধুতা চারিয়ে যাচ্ছে জীবনে।

শিশির রায়

৩১ জুলাই, ২০১৬, ০০:০০:০০
pic

কলকাতার রাস্তায় পথ হাঁটছেন কার্ল মার্ক্স আর ফ্রিডরিখ এঙ্গেল্‌স। যে বন্ধুতা না হলে হয়তো ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ লেখা হত না। ছবি: রণজিৎ নন্দী

বড় বড় লেখকদের নিয়ে প্রচুর জনশ্রুতি জমা থাকে ইতিহাসে। বেশির ভাগই অনিবার্য রোম্যান্টিক। যেমন ছিল ইংরেজি সাহিত্যের দুই কবি— উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর স্যামুয়েল টেলর কোলরিজকে ঘিরে। ১৭৯৭-এর ইংলিশ সামারের এক দিন কোলরিজ নাকি চল্লিশ মাইল পথ উজিয়ে হাজির হয়েছিলেন এক বাগানবাড়িতে, যেখানে দুই ভাইবোন— উইলিয়াম আর ডরোথি— থাকছিলেন, লিখছিলেন। উইলিয়াম তখন সাতাশ বছরের তরুণ, ডরোথি ছাব্বিশ, কোলরিজ পঁচিশ। কোলরিজের দিন তিনেকের ‘দেখা করতে আসা’ সে যাত্রা গড়িয়েছিল তিন হপ্তায়। দিনে ছবির মতো সুন্দর ইংল্যান্ডের কান্ট্রিসাইডে ঘুরে বেড়ানো, আর রাত জেগে দুই বন্ধুর কথা। কী দেখলাম, কবিতা লেখা হবে তাই নিয়ে। ভাবনার বিনিময়: কেমন হবে কবিতার ভাব, ভাষা। খুব জ্বরে পড়লে যেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে মানুষ, তেমনই আচ্ছন্ন হয়ে কবিতা লিখতেন একই টেবিলের দু’ধারে দুজন। এ জুগিয়ে দিচ্ছেন এক-একটা ইমেজ, ও বলে দিচ্ছেন: আরে, সেই ভেবে-রাখা দুর্দান্ত স্তবকটা বাদ দিয়ে দিলে দেখছি, ঢোকাও ওটা! এমনই কবিতাতুতো বন্ধুতা, সে বার ফিরে এসে কোলরিজের সমারসেটের বাড়ির খুব কাছেই ডেরা বেঁধেছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ। কাছাকাছি না থাকলে, পাশাপাশি না লিখলে, কী করে তৈরি হবে রোম্যান্টিক মুভমেন্টের কাব্যভাষা, লেখা হবে যুগান্তকারী কবিতার বই ‘লিরিকাল ব্যালাড্‌স’! কী করে হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটবে ‘টিনটার্ন অ্যাবি’ আর ‘দ্য রাইম অব দি এনশেন্ট মেরিনার’!
১৮৫০-এ ওয়ার্ডসওয়ার্থ মারা যাচ্ছেন, আর তার ঠিক বছরখানেকের মাথায় চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা হচ্ছে উইল্কি কলিন্স-এর। চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই ডিকেন্স তখন ইংল্যান্ডে সেনসেশন, খোদ মহারানি ভিক্টোরিয়া তাঁর নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’ আর ‘দ্য পিকউইক পেপার্স’ পড়ে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেলেব্রিটি লেখকের দিকে যেমন তাকিয়ে থাকে স্বপ্নালু উঠতি-লিখিয়েরা, এক আড্ডায় ডিকেন্সকেও সে ভাবেই দেখছিলেন বছর সাতাশের কলিন্স। তিনি তখন স্রেফ খানকয়েক গল্প, একটা উপন্যাস লিখে প্রকাশকের দুয়ো-কুড়োনো যুবক। কিন্তু, বন্ধুতার ঈশ্বর যে কার জন্য কোথায় কুটোবাঁধা করে রাখেন কাউকে! সে দিনের সেই বন্ধুত্ব চলল সারা জীবন। চার্লস ডিকেন্স আর উইল্কি কলিন্স— দুজনে একসঙ্গে নাটকে অভিনয় করেছেন। কলিন্সের ছোটগল্প ডিকেন্স বের করেছেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘হাউসহোল্ড ওয়ার্ডস’-এ, পরে সেখানেই দুজনে একসঙ্গে কলাম লিখেছেন। একসঙ্গে ডিনার, মদ খাওয়া, নাটক দেখা। দাড়ি রাখবেন তো দুজনেই রাখবেন। লন্ডন বা প্যারিসের রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটবেন। আর এ সবেরই মধ্য দিয়ে কবে যেন ডিকেন্সের চিঠির সম্বোধন বদলে গেল ‘মাই ডিয়ার কলিন্স’ থেকে ‘মাই ডিয়ার উইল্কি’তে, চিঠি-শেষের পোশাকি ‘এভার ফেথফুলি’ হল ‘এভার অ্যাফেকশনেটলি’। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-শাসিত ভারতে যখন সিপাহি বিদ্রোহের মেঘ, তখন লন্ডনে কলিন্সের লেখা নাটক স্টেজে নামাচ্ছেন ডিকেন্স। সেই নাটকের সুবাদেই ডিকেন্সের সঙ্গে পরিচয় অষ্টাদশী সুন্দরী তরুণী এলেন টার্নান-এর, যাঁর প্রেমে মজে ক’মাস পরেই নিজের বৈঠকখানা আর শোবার ঘরের মধ্যে পার্টিশন বসাবেন ডিকেন্স, অচিরে বিয়েও ভাঙবে মধ্যবয়সি লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকের। টালমাটাল দাম্পত্যের ঘায়ে ক্লান্ত, ধ্বস্ত ডিকেন্সের কাছে আশ্রয়ের কাঁধ তখন বন্ধু কলিন্সই। কলিন্সকে ডিকেন্স লিখছেন: ‘আমরা দুজনে চলো কোথাও যাই, ঘুরে-দেখে আসি কিছু, যা নিয়ে দুজনে লিখতেও পারি। কোনও জায়গা জানা আছে তোমার? আমাদের পত্রিকার জন্য লেখা দরকার, আর আমার আরও বেশি দরকার নিজের কাছ থেকে পালানো।’ অগ্রজপ্রতিম বন্ধুর বিয়ে ভাঙার ঘটনায় কলিন্স ডিকেন্সের পাশেই ছিলেন সব সময়, আবার ওঁদের ডিভোর্সের পরেও বরাবর সহৃদয় যোগাযোগ রেখেছেন বন্ধুপত্নী ক্যাথরিনের সঙ্গে, নিজের উপন্যাস-আধারিত নাটক ‘দি উওম্যান ইন হোয়াইট’-এর বক্স-টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছেন নেমন্তন্ন-চিঠি সহ। কত কাজই যে করতে হয় বন্ধুদের!
‘প্রিয়তম ম্যাক্স, আমার শেষ ইচ্ছা: যা কিছু আমি রেখে যাচ্ছি— ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, নিজের আর অন্যের চিঠিপত্র, আঁকিবুঁকি (আমার বইয়ের তাকে, আলমারিতে, বাড়ি বা অফিসের লেখার টেবিলে, বা তুমি খুঁজে পাও এমন অন্য যে কোনও জায়গাতেই)— না-পড়া অবস্থাতেই সব একেবারে পুড়িয়ে ফেলা হোক। তোমার কাছে আমার লেখা বা আঁকা যা কিছু আছে, সেগুলোও। অন্যের কাছে আমার যা কিছু আছে (আমার হয়ে ওদের বোলো), তাও। চিঠিগুলো কেউ যদি তোমাকে ফেরত দিতে না চায়, অন্তত ওদের দিয়ে শপথ করিয়ে নিও, যেন ওরা নিজেরাই সেগুলো পুড়িয়ে ফেলে।’ বিশ শতকের সাহিত্য যাঁর কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে, সেই ফ্রান্‌ৎজ কাফকা মৃত্যুর আগে লিখে গিয়েছিলেন এই শব্দগুলো, বন্ধু ম্যাক্স ব্রড-কে। ১৯২৪-এ কাফকা যখন মারা যাচ্ছেন দুরারোগ্য যক্ষ্মায়, বার্লিন বা প্রাগের সাহিত্যবৃত্তে তখন তিনি আদৌ পরিচিত কোনও লেখক নন। সেই তাঁকেই অমর করে তুললেন বন্ধু সাংবাদিক-লেখক ম্যাক্স, মৃত্যুর পর কাফকার সব লেখা, গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করে। প্রিয় বন্ধুর উইলকেও আমল দেননি। সেই যেমন জেলে চল্লিশ দিন অনশনরত কাজী নজরুল ইসলামকে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: অনশন ভাঙো, our literature claims you, তেমনই যেন জেনে গিয়েছিলেন বন্ধু ম্যাক্স ব্রডও— বিশ্বসাহিত্য দাবি করে কাফকাকে। ম্যাক্সেরই একক প্রচেষ্টায় ১৯২৫-এ কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’, তার পরের বছর ‘দ্য কাস্‌ল’ প্রকাশের পর যখন আবিশ্ব তোলপাড়, ম্যাক্স বলেছিলেন, আমি তো ফ্রান্‌ৎজকে অনেক আগেই বলেছিলাম, তুমি এই সময়ের সবচেয়ে বড় ‘কবি’! ১৯৩৯-এ নাৎসি সেনারা প্রাগে ঢুকে পড়েছে, ইহুদি ম্যাক্স পালিয়ে এলেন ইজরায়েলে। প্রাণ হাতে করে ট্রেনে চড়েছেন, কিন্তু সঙ্গের সুটকেসে বন্ধুর যাবতীয় লেখা ভরে আনতে ভোলেননি! আরও যে তিরিশ বছর বেঁচে ছিলেন, বেঁচে ছিলেন প্রিয় বন্ধুর লেখা সমস্ত অক্ষরকে মায়ের ভালবাসায় আগলে। ম্যাক্স ব্রডদের জন্যই পৃথিবী পেয়েছে ফ্রান্‌ৎজ কাফকাদের।
খুব কাছের মানুষকে চিনতে পারা কঠিন— একমাত্র বন্ধুরাই বোধহয় এ কথা মানবে না। নিজের পরিবারের সামনেও যে মানুষটা ডালাবন্ধ সিন্দুক, বন্ধুর সামনে সে-ই খোলা বইয়ের পাতা। আমার হাত একদম খালি, আমার ঘরে খাবার নেই, আমার একটা গোপন রোগ হয়েছে, আমার কিস্যু লেখা আসছে না— বন্ধুকে সব বলা চলে। আর সেই সব আক্রান্ত সময়ে, বন্ধু নামের মানুষটারও যেন একটা মেটামরফোসিস ঘটে চোখের সামনে। সে হয়ে ওঠে ছায়া-দেওয়া একটা মহাগাছ, বিরাট ডানা মেলা পাখি, চওড়া বুক-কাঁধওয়ালা মহামানুষ। ফ্রিডরিখ এঙ্গেল্‌স ম্যাঞ্চেস্টারে ফার্ম দেখাশোনার কাজ ছেড়ে চলে এলেন, কার্ল মার্ক্স নামের এক বন্ধুর তাঁকে ‘খুব দরকার’ বলে। জানতেন বন্ধুটির সামনে জরুরি খুব জরুরি একটা বই লেখার কাজ পড়ে, সাংগঠনিক আর আন্দোলনের হাতভর্তি কাজও, আর সে দিন কাটাচ্ছে কপর্দকহীন অবস্থায়। এঙ্গেল্‌স এমন বন্দোবস্ত করে এলেন, যাতে ফার্ম থেকে নিয়মিত টাকা আসার একটা হিল্লে হয়, সেই দিয়ে বন্ধু আর তার পরিবারের খাবার জুটবে। এসে দেখলেন, নানান দেশের কমিউনিস্ট বন্ধু-নেতারা রোজ আসছেন, মার্ক্সের সময় নেই, শারীরিক শক্তিও নেই সব সামলানোর। নিজের কাঁধে তুলে নিলেন সেই মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ। ১৮৭০-এর পর, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসে মার্ক্সের শরীর যখন ভেঙে পড়েছে, এঙ্গেল্‌সই তখন দু’হাতে সব সামলাচ্ছেন। ১৮৮৩-তে মার্ক্সের মৃত্যুর পর, এগারো বছর ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন, সম্পাদনা করেছেন বন্ধুর লেখা। হিজিবিজি দুর্বোধ্য ছিল মার্ক্সের হাতের লেখা, জায়গায় জায়গায় স্বরচিত স্টেনোগ্রাফিক সিম্বলে ভরা। সব সামলে, প্রকাশ করেছেন ‘দাস কাপিটাল’-এর দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড। এঙ্গেল্‌স খান বারো ভাষা জানতেন, দু’হাত ভরে লিখেছেন জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্সের বন্ধুদের জন্য, পোলিশ ভাষায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর ভূমিকা। কিন্তু বিপুল কীর্তির কণামাত্র নিজে নেননি, এগিয়ে দিতেন কার্ল মার্ক্সকে: ‘What I contributed, Marx could have easily filled in without my aid, ... But what Marx did, I could have never done.’ ‘Marx was a genius, we were at most talents.’
সাচ্চা বন্ধু খুঁজতে বিলেত যেতে হবে না। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ছবি তৈরির নেপথ্য-স্ট্রাগ্‌ল সর্বজনবিদিত, কিন্তু ক’জন জানেন, ‘পথের পাঁচালী’ ছাপতে বিভূতিভূষণের কী হাল হয়েছিল! ১৯২৯-এ বিভূতিভূষণ ভাগলপুর এস্টেটের কাজ ছেড়ে কলকাতায় মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। আর ধেয়ে আসছে উপেক্ষা— ও তো ‘বটানির বই’! নর-নারীর প্রেমকাহিনি নেই, গা-শিউরোনো খুন-কেচ্ছা না, ও আবার প্লট! বিখ্যাত এক প্রকাশক বলেছিলেন, পঞ্চাশ টাকা দিতে পারি, কপিরাইট দেবেন? আর এক জন: বই ছাপার পর আদৌ বিক্রিবাটা হলে, খানিকটা রয়্যালটি দেওয়ার কথা ভাবতে পারি। বিভূতিভূষণ যখন ভাবছেন আর কিছু হল না, ফের ভাগলপুরেই ফিরে যাবেন, তখনই আবির্ভাব বন্ধু নীরদের। নীরদ সি চৌধুরী, রিপন কলেজে তাঁর সহপাঠী, মির্জাপুর স্ট্রিটের মেস-মেট। ‘বিচিত্রা’য় পথের পাঁচালী ধারাবাহিক ভাবে বেরনো ইস্তক নীরদবাবু বলে আসছেন, এ উপন্যাস অসামান্য, যুগান্তকারী, এ বইয়ের ‘ভদ্র প্রকাশক’ না জুটলে তা নিতান্তই দুর্ভাগ্যের। ভেঙে-পড়া বিভূতিভূষণকে টেনে তুলে নীরদ সি চৌধুরী যদি সে দিন ‘প্রবাসী’র আড্ডায় সজনীকান্ত দাসের কাছে নিয়ে না ফেলতেন, বাংলা সাহিত্য বিভূতিভূষণকে (আর এই পৃথিবী সত্যজিৎ রায়কে) পেত কি না সন্দেহ। সজনীকান্তও তখন প্রকাশনার কারবারে নিতান্ত অনভিজ্ঞ। এ বই বার করতে গিয়ে লোন করতে হয়েছিল তাঁকেও। তবু, নীরদ সি চৌধুরীর কথা শুনে, ‘পথের পাঁচালী’ পুরোটা পড়ে, আর সুলেখককে রক্ষা করার প্রেরণায় প্রকাশক হওয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র ভাবেননি!
ভক্ত-গুণমুগ্ধ-স্তাবক পরিবৃত রবীন্দ্রনাথের কি কোনও বন্ধু ছিল? যার কাছে মন খুলতেন, এমন কথা বলতেন যা কেউ শোনেনি? বনফুল, ডা. বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওঁর যে ক’টা সাক্ষাৎ, পড়ে মনে হয় যেন দুই বন্ধুর মোলাকাত। শুরুটা হয়েছিল দ্বন্দ্ব দিয়ে, রবীন্দ্রনাথের কিছু কথা আর কাজ ভাল না লাগায় ব্যঙ্গ শানিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় একখানা কবিতা-চিঠি লিখেছিলেন বনফুল। কিন্তু, ‘দ্বন্দ্ব’ মানে তো মিলনও! এর পরেই রবীন্দ্রনাথের চিঠি বনফুলকে, শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়ে। ১৯৩৭-’৩৮ সালের ওই বারকয়েকের দেখায়, অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে চিনেছিলেন বনফুল। যে রবীন্দ্রনাথ বলাইয়ের জন্য ঘুগনি রাঁধতে বলেন— ‘বড় বড় কাবলে মটরের ঘুগনি, মাঝখানে একটা লাল লঙ্কা গোঁজা থাকবে’! এই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুর মতো তর্ক জোড়া যায়: ‘আপনার বিরাট অস্তিত্ব এখানে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে তার কাছাকাছি থেকে পরীক্ষা-পাশের জন্য পড়া মুখস্থ করা শক্ত’, ‘... এটা মেয়েদের ইউনিভার্সিটি হলে ভাল হয়।’ রবীন্দ্রনাথও ঠিক বন্ধুর মতোই চ্যালেঞ্জ ছোড়েন: ‘তুমি যা বলছ তা হাতেকলমে করে দেখিয়ে দাও।... যদি করতে পার তাহলে আমিও এখান থেকে চলে যাব, আমাকে যেখানে যেতে বলবে সেইখানে যাব।’ প্রিয় বন্ধু দুর্দান্ত ভাল কিছু করলে যেমন তাকে সর্বস্ব দিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়, ঠিক তেমনই, বনফুলের একটা গল্প খুব ভাল লেগেছে বলে তাঁকে বলছেন, অনেকগুলো কলম রয়েছে, যদি কোনওটা পছন্দ হয় নাও। নয়তো ওই রেডিয়োটা নাও। এই রবীন্দ্রনাথই চিঠিতে গল্পের প্লট পাঠাচ্ছেন বনফুলকে: ‘তুমিই ঠিক পারবে’; বনফুলের নাটকের স্বপ্নদৃশ্য পালটানোর সাজেশন দিয়ে বলছেন, নিবেদিতার অনুরোধে কেমন তিনি নিজেও ‘গোরা’র শেষটা পালটে দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে পড়ুয়াদের সাহিত্যসভায় বনফুলকে প্রধান অতিথি করে পাঠিয়ে পরে লোক পাঠাচ্ছেন এ কথা বলে দিতে যে, ওদের লেখা পছন্দ না হলেও, বনফুল ‘ছেলেমেয়েদের যেন বেশি না বকে’! রাতে শুয়ে পড়ার পরও লোক দিয়ে বনফুলকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়ে বলছেন ‘গান শুনবে?’, তার পরেই গেয়ে উঠছেন ‘সার্থক জনম আমার’। সভায় ‘বসন্ত’ কবিতা পড়ছেন বেমালুম দুটো স্তবক বাদ দিয়ে, পরে বনফুল সে কথা তুলতে বলছেন, ‘এখানে কেউ ধরতে পারে না। প্রায়ই আমি বাদ দি’।’ আবার সুবন্ধুর মতো বাতলে দিচ্ছেন পরামর্শ— রোজ নিয়ম করে নির্দিষ্ট একটা সময়ে লিখতে বসতে হবে, লেখালিখির পাশাপাশি বেশি পড়তে হবে ইতিহাস-দর্শন-বিজ্ঞান (‘উপন্যাস না পড়লেও চলবে’), লেখার সময় কী কী মনে রাখতে হবে, সব। এই বন্ধুতা পেয়েই বনফুল লেখেন: ‘...সঙ্কোচের কোন অবসরই ছিল না, যেন অকপটে তাঁর সঙ্গে আলাপ না করলেই অশোভন হবে এই রকম একটা আবহাওয়া গড়ে উঠেছিল...’
এ ভাবেই দুটো কলমের একসঙ্গে বা খানিক আগে-পরে লিখে চলা, নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে দেয় চরাচরকে। একটা কলমের কালি শেষ হয়ে এলে অন্যটা নিজের থেকেই ধার দেয় কিছুটা জীবনীশক্তি। আবার একটা কলম একেবারে ফুরিয়ে গেলে, অন্যটা চলতে থাকে। তাই কিট্‌স-এর মৃত্যুতে পৃথিবী পায় শেলির লেখা কবিতা ‘অ্যাডোনিস’। নজরুলের স্মৃতিতে বাল্যবন্ধু, সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় লেখেন ‘আমার বন্ধু নজরুল’, নিজের বইয়ের নাম দেন বন্ধুর লেখা গানের লাইন থেকেই, ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’। জেমস বল্ডউইনের মৃত্যুতে টোনি মরিসন লেখেন: ‘Like many of us left here I thought I knew you. Now I discover that in your company it is myself I know.’ শুধু লেখাতুতো বন্ধুতাই না, জীবনতুতো ইয়ারানা। প্যারিসের রাস্তায় মদে চুর জেমস জয়েস অন্য মদাড়ুর সঙ্গে হাতাহাতি বাঁধিয়ে দৌড়ে এসে লুকিয়ে পড়ছেন বিশালদেহী আর্নেস্ট ‘পাপা’ হেমিংওয়ের পেছনে, বন্ধুকে তাতাতে বলছেন, ‘ডিল উইথ হিম, হেমিংওয়ে, ডিল উইথ হিম!’ ১৮৬৬-’৭৬, দশ বছর ধরে একে অন্যকে চিঠি লিখে গেছেন পারফেকশনিস্ট গুস্তাভ ফ্লব্যের আর জীবনোচ্ছল জর্জ সাঁদ। সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ, মানবতা নিয়ে দুজন বেশির ভাগ সময়েই দুই অবস্থানে, তা বলে সংলাপ থামেনি, সখ্যও না। ১৯৩৬-এর মাদ্রিদে পাবলো নেরুদা দাঁড়িয়ে আছেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার অপেক্ষায়, বক্সিং ম্যাচ দেখতে যাবেন দুজনে। লোরকাকে হত্যা করতে তখন বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর সেনারা। সেই লোরকাকে নিয়ে কবিতা লিখছেন কলকাতার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বন্ধু-কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় যাঁকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘দশকের আততায়ী কবি’! জাঁ পল সার্ত্রের নাটকের অভিনয় শেষ হতে যেচে এসে আলাপ করছেন আলব্যের কামু নামের এক তরুণ, ক’দিন পরেই প্যারিসের বিখ্যাত ‘কাফে দ্য ফ্লোর’-এ সঙ্গে চুটিয়ে লেখালিখি শুরু সার্ত্র, সিমোন দা বুভোয়া আর কামু, তিন জনের! গ্যোয়টে-র ‘দ্য সাফারিংস অব ইয়াং ওয়্যারথার’ পড়ে ‘সুখদুঃখের সঙ্গী’ সুব্রত, কবি সুব্রত চক্রবর্তীর উদ্দেশে গোটা একটা বই লিখে ফেলছেন ভাস্কর চক্রবর্তী, আর সেই বইয়ের প্রচ্ছদলিপি আদরে এঁকে-লিখে দিচ্ছেন কমলকুমার মজুমদার। ‘সঙ্গে থাকো। সঙ্গে থাকো। সারাক্ষণ/ সঙ্গে সঙ্গে থাকো।’
iwritemyright@gmail.com



http://www.anandabazar.com/supplementary/rabibashoriyo/writer-s-friend-is-always-a-writer-1.445857

সমর বৃত্তান্ত (On Samar Sen)

সমর বৃত্তান্ত

তাঁর স্পষ্ট কথায় ছাড় পাননি রবীন্দ্রনাথও। আবার নিজের পরিবার নিয়ে হালকা রসিকতাতেও ছিলেন অনায়াস। শতবর্ষে সেই সমর সেন। লিখছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্য

৩০ জুলাই, ২০১৬, ০১:১২:২১
samar

ছবি: অলক মিত্র

এক সময় কথায় কথায় তাঁর মুখে শোনা যেত  রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ। অথচ কবি সম্পর্কে তাঁর অভিমানের বোধ হয় অন্ত ছিল না। বলতেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ হল মহাসমস্যার বিষয়।’’

পাশের বাড়িতেই থাকতেন কবি বিষ্ণু দে। যাতায়াত, সম্পর্ক ছিলই। নিজের কবিতার বই তাঁকে দিতে তিনি বইটি স্ত্রীর হাতে দেন,পায়ের দু’আঙুলের ফাঁকে গুঁজে। বয়োজ্যেষ্ঠ কবির আচরণে সে দিন কিছু বলেননি বটে, কিন্তু পরে স্মরণ করেছেন লেখাতে।

‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি নিয়ে বলতেন, বিদেশে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ দেশে ছবিটির কদর বলে যে-প্রচার, তা অনেকটাই বানানো।

তিনি মানেই স্পষ্টকথার ঝড়।
তিনি মানেই ঋজু হেঁটে চলা।

তিনি সমর সেন।
সমর সেনের সঙ্গে যখন আলাপ হয় তখন, এমার্জেন্সিতে, ওঁর ‘ফ্রন্টিয়ার’ পত্রিকা দু’মাস হল বন্ধ হয়ে আছে।
আনন্দবাজার ঘরের নতুন ‘সানডে’ পত্রিকা বার হতে চলেছে। তাতে কিছু বিশিষ্ট জনের কলমে ‘নোটস’ বলে একটি মতামতের পাতা চালু করার কথা হয়েছে।
তার লেখক হিসেবে ভাবা হয়েছে সমর সেন, এম কৃষ্ণন, হামদি বে এবং অমিতা মলিককে।
সম্পাদক এম জে আকবর আমাকে নিয়ে এক সন্ধেয় রামের বোতল সঙ্গে করে ওঁর বাড়িতে হাজির হল।
গাড়িতে যেতে যেতে বলল, ‘‘টেলিফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা, ফ্রন্টিয়ার তো বন্ধ, তা আমাদের কাগজে একটা কলম লিখুন না।’ তাতে উনি আমাকে দারুণ লজ্জায় ফেলে দিয়ে আমাদের অফিসে চলে এলেন। বলতে বাধ্য হলাম, ‘আপনি কেন এলেন? আমরাই আপনার কাছে যেতাম।’’
প্রথম দিনের যাওয়াটা সেই যাওয়া।
আলাপ করতে করতে দিব্যি সেই মানুষটাই ঠিকরে রেরোচ্ছে যাঁকে তত দিন ওঁর ইংরেজি গদ্য আর বহুকাল আগে শেষ করে দেওয়া বাংলা কবিতা দিয়েই মনে মনে গড়ে নিয়েছিলাম। ঝাঁ চকচকে, আপসহীন, সরস এবং জগতের তাড়নায় কিছুটা হলেও দুঃখী মানুষ।
কী লিখবেন, না লিখবেন এই সব কথার প্রসঙ্গে হঠাৎই জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম, ‘‘দাদা, কবিতাটা ছেড়ে দিলেন কেন?’’
উনি রামের গেলাসটা ঠোঁটের কাছে ধরে রেখেই বললেন, ‘‘এ বার র‌্যাঁবোর উদাহরণটা তুলে আনবে তো?’’
বললাম, ‘‘না, আনব না।’’
সমরদা বললেন, ‘‘ঠিক। মোটে উনিশ বছরে যা করে ফেলেছে, তার তুলনা নেই। ও হয় না।’’
‘‘কিন্তু আপনি বন্ধ করলেন কেন?’’
‘‘এখন তো আড্ডা, এখানে এ ভাবেই বলি: ভেবেছিলাম ঢের হয়েছে। এ বার থাক। পরেও দু’চারটে যে লিখিনি তা নয়। কিন্তু ওই আর কি!’’
কবিতার কথায় এসে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। এবং সেই সূত্রে নীরদ সি-র ‘দুই রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটিও।
বললেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ, ওঁর ইংরেজি অনুবাদ, ভক্তকুল ইত্যাদি নিয়ে আমারও মতামত আছে। দেখি...।’’
আড্ডা এর পর নানা দিকে চলে গেল এবং রাত বাড়তে এক সময় শেষও হল।
যাবার সময় বললেন, ‘‘আমার মত-মন্তব্য নিয়ে তোমাদের আবার সমস্যা হবে না তো?’’
আকবর ওঁকে সত্বর আশ্বস্ত করল, ‘‘কোনও সমস্যাই নেই, দাদা।’’
সমস্যাটা হয়েছিল সমরদার। ওঁর লেখা বেরোবার পর চেক নিয়ে সমস্যা, পরের বার ওঁর বাড়ি যেতে প্রথম প্রশ্নই করলেন, ‘‘এ কী আকবর, একটা লেখার জন্য এত টাকা কেন?’’
আকবর বলল, ‘কেন, কত টাকা স্যার?’’
বিস্ময়ের ভাব মুখে এনে সমরদা বললেন, ‘‘পাঁ-চ শো!’’
আকবর বলল, ‘‘না, না, দাদা আমরা আপনাকে কিছু বেশি দিইনি। সব নোট-লিখিয়েই ওটা পাবেন।’’
সমরদা বললেন, ‘‘বাঁচালে! আমি কোনও স্পেশাল ট্রিটমেন্ট আশা করি না।’’
তার পর আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘বিশেষ করে আমার কাগজের ছেলেদের এখন যা দশা।’’
সমরদার কথাটা ফের মনে এসেছিল বছর দুই পর সমরদা’র ‘বাবুবৃত্তান্ত’ প্রকাশ পেতে।
যার শুরুতেই উনি বেশ সরস করেই ওঁর নির্লোভ অর্থনীতির অহমিকার কথাটা শুনিয়ে দিয়েছেন। সে-বৃত্তান্ত ওঁর মুখেই শুনুন...
‘‘একটু বড়ো হয়ে পড়াশুনোর দিকে আমার ঝোঁক ছিল বলে ঠাকুর্দা (দীনেশচন্দ্র সেন) আমাকে স্নেহ করতেন। তিরিশের দশকে অবশ্য আমার সাহিত্যচর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা উঠলে বলতেন, ‘তুই একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।’ আমাদের আলাপ-আলোচনা সরস ছিল। বিএ-তে ভালো করলে বিলেত পাঠাবার প্রতিশ্রুতি মনে করিয়ে দেওয়াতে বললেন যে অর্ধেক খরচ দেবেন, বাকিটা বিয়ে করে জোগাড় করতে। বললাম, ‘দাদু, পুরষাঙ্গ বাঁধা দিয়ে বিলেত যাব না।’ উত্তরে অট্টহাসি হেসেছিলেন।’’
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রথম দিনের সেই আলাপের কারণেই কিনা জানি না, জুন মাসে ‘সানডে’ শুরুর ক’দিন বাদেই (অগস্টে ২২শে শ্রাবণ মনে রেখেই কি?) সমরবাবু কবির ভক্তদলকে এক হাত নিলেন কলামে।
যার একটি বাক্য ভয়ঙ্কর ভাবে মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল নীরদ সি-র ‘দুই রবীন্দ্রনাথ’ রচনাটির একটি এক্সপ্রেশন।
যেখানে বলা হচ্ছে যে, ভক্তদের ভক্তি এতই যে ‘ইভন ইফ দ্য পোয়েট ফার্টেড দে উড স্মেল দ্য সেন্ট অব রোজ’। অর্থাৎ, কবির বায়ু নিষ্ক্রমণেও তাঁরা গোলাপের গন্ধ পেতেন।
এই ধরনের সব উক্তি এবং অভিব্যক্তি সত্ত্বেও ওই কিছুকালের সম্পর্কেই টের পেয়েছিলাম যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অদ্ভুত একটা দূরত্ব ও সমীহের টানাপড়েনে থাকতে ভালবাসতেন তিনি। পরে ভেবেছি, ওঁর এই ভাললাগা-সরে থাকা কার সঙ্গেই বা না?

সে-সব গল্পে অবশ্যই যাব, কিন্তু আগে রবীন্দ্রনাথ।
সমরবাবুর বাবা অরুণচন্দ্র সেন ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক, তিনি ছিলেন আদি শান্তিনিকেতনের ছাত্র। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওঁর এবং ওঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ও পত্রালাপ ছিল।
‘‘কিন্তু শ্রীনিকেতনের কোনও ব্যাপার নিয়ে শুনেছি,’’ সমর সেন লিখছেন, ‘‘বাবার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের মতভেদ হওয়াতে রবীন্দ্রনাথ পুত্রের পক্ষ নেন, ফলে বাবা বিশেষ সম্পর্ক রাখেননি। শুনতাম, বিশ্বভারতীর আর একটা নাম বিশ্ব-বা-রথী, রবীন্দ্রনাথের অনেক চিঠিপত্র, স্বাক্ষরিত বই, দু-একটা পাণ্ডুলিপি মা’র মৃত্যুর পর বাবা একে-ওকে দিয়ে দেন।’’
খুবই স্টাইলিশ এবং প্রায় এক টেলিগ্র্যাফিক ক্ষিপ্রতায় লেখা স্মৃতিকথা ‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় খুব একটা বিশদ করেননি সমর সেন কবির প্রতি ওঁর পরিবারের অভিমান।
আর এর থেকেই কি কবির প্রসঙ্গে সমরের ওই দোটানার সূচনা? জানি না। তবে এটা ঠিক, কী কথায় কী লেখায়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটু রসিক চালে কথা বলার সুযোগ কখনও ছাড়েননি।
তার একটা নমুনা তুলে দিচ্ছি।
‘‘রবীন্দ্রনাথ একবার দুপুরের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন বিশ্বকোষ লেনে (সমরবাবুদের পারিবারিক নিবাস)। ঘরদোর সাফ করার ভার ছিল ছোটদের ওপর। সকাল থেকে বালতি-বালতি জল খরচ হয়। কবি এসে ষোড়শ ব্যঞ্জনের কয়েকটা স্পর্শ করলেন— তখনো মনে হয়েছিল আমরা বাঙালিরা কতো অপচয় করি। আহারের পর চীনফেরৎ কবিকে দীনেশচন্দ্র কথাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করেন—‘‘চীনেরা কি আরশোলা খায়?’ কবি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘Dineshbabu, you lack a sense of perspective.’ মন্তব্যটি ছোটকাকার কাছে শোনা।’’
সমরবাবু অল্প বয়স থেকেই মস্ত ধূমপায়ী, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলেই ওঁকে সিগারেট লুকোতে হত।
এই জ্বলন্ত সিগারেট সামলানোর বিবরণও উনি লিখতে গিয়ে সামলে নেননি। বলতে নেই, প্রায় এক শিশুর মতো মিষ্টি ক্ষোভ তিনি পোষণ করে গেছেন ছেলেবেলা থেকে।
লিখছেন: ‘‘ছোটবেলায় দু’একবার জোড়াসাঁকোয় গিয়েছি। তখন চেহারাটা গোলগাল ফর্সা ছিল বলে সবাই আমাকে আদর করতেন। কবি কখনও না।’’
এটুকুই। কবি কখনও না। এ কি কষ্ট, দুঃখ, রাগ?  নাকি... ভেবেও পাচ্ছি না আর কী হতে পারে। কারণ এর পরের বাক্যেই সমর সেন চলে যাচ্ছেন ঠাকুরবাড়িতে শেষ যাওয়ায়...
‘‘জোড়াসাঁকোয় শেষ বার যাই বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে। ছোট একটা ঘরে বসে ধূমপান করছি, অকস্মাৎ রবীন্দ্রনাথের নাটকীয় আবির্ভাব, সিগারেট নিয়ে মহামুস্কিলে পড়েছিলাম। শিশির ভাদুড়ীর ‘তপতী’ বুদ্ধদেববাবুর ভালো লাগেনি শুনে মৃদু হেসে রবীন্দ্রনাথ বললেন, বোধহয় শিশির সে দিন একটু ‘বিচলিত ছিল’।
শিশিরবাবুর ‘বিচলিত’ থাকার মানেটা কাউকে বোঝানোর দরকার নেই আশা করি, কিন্তু স্বভাবত সংযত কবির এই Risque humour, বিপজ্জনক রসিকতা সমর শেষ বয়স অবধি ভুলতে পারেননি।
কেবল রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে’র ধারালো রসিকতাই নয়, সমরবাবুর স্মৃতিরোমন্থনে রেহাই পায়নি ওঁর পরিবার-পরিজনের আলগা মজামিরিও। তেমন একটা নমুনা...
‘‘জ্যেঠা-কাকাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গুরুগম্ভীর ছিল না, হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি চলতো। বারবার ছেলের আশায় একটির পর একটি মেয়ে হবার ব্যাপার তোলাতে এক কাকা বলেন, ‘ওটা ভগবানের হাত।’ আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘ভগবানের হাত এতো ছোট?’’’
সমর সেন স্বীকারই করে নিয়েছেন যে, ‘‘রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মহাসমস্যার ব্যাপার।’’
কারণ তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তিরিশের দশকে ঘোরতর ভাবে ওঁর ভক্ত হচ্ছেন। এক দিকে ‘রাশিয়ার চিঠি’ ও পরে ‘সভ্যতার সঙ্কট’ বামপন্থীদের মধ্যে আলোড়ন তোলে। আধুনিকদের ‘শেষের কবিতা’ ও ‘চার অধ্যায়’ প্রবল ভাবে মাতায়। যদিও এই শেষের দুটির কোনওটিই সমরের পছন্দের নয়।
তিনি মজেছিলেন আরও পরে, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বলে যাওয়া ‘শেষ লেখা’-য়। বলেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতাগুলি অন্য জগতের লেখা।’’
‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় সমরবাবু রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ শেষও করেছেন হয়তো কিছুটা অভিমানেই।
কারণ? ওঁর মুখেই শুনুন....
‘‘অনেকে হয়তো জানেন না যে তিরিশের দশকের শেষাশেষি রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার একটি সংকলন বের করেন (জোর গুজব সজনীকান্ত দাসের সহযোগিতায় ও পরামর্শে)। তিন জন ‘আধুনিক’ কবি বইটিতে স্থান পায়নি— বিষ্ণু দে, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও আমি। শেষ পর্যন্ত সংকলনটির কী হয়? এ বিষয়ে বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ আলোকপাত করতে পারে। প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনে অশোক মিত্র (পরে আইসিএস) একটি তীব্র তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন সংকলনটির; অন্য দু-একটি পত্রপত্রিকায় বিরূপ মন্তব্য বেরোয়।’’
সমরবাবু শান্তিনিকেতনে কবির সঙ্গে শেষ দেখার যে-বিবরণটি দিয়েছেন তাতে কি অস্পষ্ট আভাস কেন তিনি সংকলনে বাদ? সেই সব সাক্ষাতে বুদ্ধদেব বসুর তো কবিকে দেখে শেষ বয়েসের টলস্টয়ের কথা মনে হয়েছিল, কিন্তু সমরবাবু লিখছেন:
‘‘কবির দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা আন্দাজ করে একটা দূরত্বে সিগারেট ফেলে দিয়ে প্রণাম সেরে বসতাম গাছতলার নিচে মোড়ায়।... কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর শুনলাম ‘রবিবাবু’ বলাতে এবং প্রায়ই তাঁকে বিরক্ত করাতে দুর্নাম হয়েছে। শান্তিনিকেতনের পরচর্চার আবহাওয়া দেখে বলতাম ব্রাহ্ম-পল্লীসমাজ (বুদ্ধদেববাবুর ‘সব পেয়েছির দেশে’ অন্য সুরে লেখা)।’’
একটু বেশি রবীন্দ্র-কথা এসে গেল? উপায় নেই, যেটুকু যা পেয়েছি সমরদা’কে (ফ্রন্টিয়ার শুরু হতে তিনি ফের তাতে মগ্ন হন) ঘুরে-ফিরে কথায় চলে আসতেন রবীন্দ্রনাথ।
‘নাও’ এবং ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর আমল থেকেই সমর সেন বেশ একটা কিংবদন্তি-কিংবদন্তি ভাবমূর্তি পেয়ে গিয়েছিলেন। এমার্জেন্সি আমলে যখন কাগজ বন্ধ,  অপিস-কাছারি নেই, উনি সময়টাকে কাজে লাগাচ্ছিলেন ঋত্বিকের না-দেখা ছবিগুলো দেখে। দেখে ভাল লেগেছিল এবং আফশোস হয়েছিল বেচারি বেঁচে থাকতে ছবিগুলো দেখে মত প্রকাশ করা হয়নি ভেবে।
তবে যে-ভাষায় কথাগুলো বলেছিলেন, তা লক্ষ্যণীয়।—‘‘ঋত্বিকের বিষয়ে আমার বিবেক দংশন হয়। তাঁর জীবদ্দশায় যখন দেখা হত, মাঝে মাঝে, তখন তাঁর প্রতিভা সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম না, একটা নাক-উঁচু ভাব ছিল। গত বছর তিনি মারা যাবার পর তিন চারটি ছবি দেখে বিস্মিত বোধ করি। বেশ কয়েকজন শিল্পী প্রগতি ভাঙিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ঋত্বিক, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও, ভেজাল ছিলেন না।’’
এখন হিসেব করে দেখছি, সানডে-র সঙ্গে যোগাযোগ যখন, তখনই উনি ঋত্বিকের ছবিগুলো দেখেছেন। অথচ সে-কথা আলাপে উচ্চারণ করছেন না। শুধু একবার কথায় কথায় সত্যজিৎ প্রসঙ্গে বলছেন (যা পরে ‘বাবুবৃত্তান্ত’-য় লিখেওছেন), বিদেশে খ্যাতির পরেই যে ‘পথের পাঁচালী’-র কদর বাড়ে দেশে সে-কথাটা অনেকটাই গ়ড়ে তোলা।
তাতে আমি বলেছিলাম, ‘‘‘দেশ’ পত্রিকায় পঙ্কজ দত্ত-র রিভিউটাই তো তার প্রমাণ।’’
তখন বললেন, ‘‘তোমরা জানো কিনা জানি না, ছবিটা দেখার পর আমরা কয়েকজন বন্ধু চাঁদা তুলে বিশপ লেফ্রয় রোডে আইসিএস অশোক মিত্রর বাড়িতে সত্যজিৎকে সংবর্ধনা জানাই।’’
এর পরেই আলোচনাটা অবলীলায় চলে যায় শিল্পকলায় অনুভূতি ও শৈলীর ভারসাম্যের কথায়। ক্রমে ওঁর প্রিয় কবি এলিয়ট-এ। পরে ওঁর লেখা পড়েই জেনেছিলাম, ‘‘‘শুদ্ধ’ কবি হিসেবে ইয়েটসকে খাতির করতেন সুধীনবাবু (দত্ত)। আমার বেশি অনুরাগ ছিল এলিয়টের প্রতি। ‘Poetry is not a turning loose of emotion’ কথাটি এখনও মনে পড়ে বাংলা কবিতা পড়লে।’’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমর সেন (ছবির একদম বাঁ দিকে), বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, কামাক্ষী প্রসাদ, (সামনে) শিশু মীনাক্ষী
 
এলিয়টের কথায় অবধারিত ভাবে এসে পড়েছিল ওঁর প্রিয়, বয়োজ্যেষ্ঠ কবি এবং একটা সময়ে ওঁর প্রতিবেশী বিষ্ণু দে’র কথা। যাঁকে নিয়ে এত অপূর্ব সব অ্যানেকডোট রেখে গেছেন সমরদা, যা ওঁর ভাষায় না শুনিয়ে পারা যায় না। শুরু করছি...
‘‘বিষ্ণুবাবুর পাশের বাড়িতে থাকতাম বলে দু-একটা ঘটনা ঘটতো। আমার দ্বিতীয় কবিতার বই ওঁকে দিলাম। কিছু দূরে বসা ওঁর স্ত্রী দেখতে চাওয়াতে বিষ্ণুবাবু বইটা পায়ের দুটো আঙুলের মধ্যে গুঁজে ওঁকে এগিয়ে দিলেন। ওঁর স্ত্রী বিস্মিত হয়ে প্রতিবাদ করাতে বিষ্ণুবাবু বললেন, পা দুটো নানা ভাবে ব্যবহার করতে পারি বলেই আমরা বাঁদর হয়ে থাকিনি।...
বিষ্ণুবাবুর বুদ্ধি ও জিহ্বা প্রখর, অবশ্য বেশি কথা বলতেন না। একবার আমরা তিন বন্ধু (অশোক মিত্র—অর্থমন্ত্রী নন— চঞ্চল চট্টোপাধ্যায় ও আমি) ঠিক করলাম বিষ্ণুবাবুর স্নায়বিক বৈকল্য ঘটাতে হবে; তাতে যদি উনি কৈবল্য সন্ধান থেকে বিরত হন। প্রতিদিন বেলা দুটো নাগাদ ওঁর বাড়িতে গিয়ে রাত আটটার আগে উঠতাম না। কারণ পশ্চিমি ধ্রুপদী সঙ্গীত সম্বন্ধে আমাদের অত্যন্ত আগ্রহ এবং বিষ্ণুবাবুর লম্বা-চোঙা ইএমজি গ্রামাফোন ও রেকর্ড সংগ্রহ তো প্রায় বিশ্ববিখ্যাত।
প্রথম দিনসাতেক জলযোগ ও সিগারেট মনের মতো ছিল। তার পর জলযোগের পরিমাণ ক্রমশ কমে শুধু চায়ে দাঁড়ালো, সিগারেটে স্বাবলম্বী হতে হল। মাসখানেক পরে দেখলাম বিষ্ণুবাবু অবিচলিত, কিন্তু আমাদের তিনজনের মধ্যে তুচ্ছ কারণে খিটিমিটি লেগে যাচ্ছে, এ-ওকে দেখলে চটে উঠতাম। নিজেদের মধ্যে স্নায়বিক বৈকল্যের লক্ষণ দেখে রণে ভঙ্গ দিলাম।’’... একবার অবশ্য বিষ্ণুবাবু অল্প বিচলিত হয়েছিলেন। বিয়ে করে প্রথম ওঁর বাড়িতে গেলে আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন, কমবয়েসী মেয়ে বিয়ে করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য কী?
আমার স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘ও, আপনি সেই বিষ্ণুবাবু যিনি ঝড়ে জলে ছাতা মাথায় দিয়ে অন্যদের নিন্দে করতে বেরিয়ে পড়েন!’ বিষ্ণুবাবু আমার দিকে তাকালেন, আমি অন্য দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম।’’
সমরদা কিন্তু বিয়ের আগে এই বিষ্ণু দে’কেই দুটো চিঠিতে (৫.৪.৪১ এবং ২৮.৪.৪১) বউ ও বিয়ে নিয়ে বিশদে লিখেছিলেন।
প্রথমটিতে লিখেছেন—
‘‘...আপনি বোধহয় শুনেছেন যে দিল্লিতে বিয়ে করছি। বিয়ে এখানে ২৮ শে এপ্রিল তারিখে হবে। মেয়েটির নাম সুলেখা, বয়স কম, আমাদের সামনের বাড়িতেই থাকে। গত ডিসেম্বর মাসে আলাপ হয়েছিল, সম্পর্কে আত্মীয়া হয়। চেহারা ভালো নয়, তবে আমার বেড়ে লাগে।...’’
দ্বিতীয় চিঠিটা একেবারে বিয়ের দিনে লেখা। লিখেছেন, ‘‘... বিয়েটা খুব মজার হচ্ছে। বাড়ির পাশেই আমার ভাবী স্ত্রী থাকেন; বিয়ের সমস্ত অনুষ্ঠান ওদের বাড়ির মেয়েরা জোগাড় যন্তর করে সম্পন্ন করছেন।
এমন কি যে জামাকাপড় পরে বিয়ে করতে যাবো, সেটাও বাগিয়েছি, আমার হাতে মাত্র পাঁচ টাকা আছে। এর কাছে কাপড়, ওর কাছে রুমাল, রাধারমণ বাবুর কাছে টাকা, কোনোরকমে manage করেছি। বাবা শুনলাম মেয়েকে আশীর্বাদ করার সময় শ্বশুর মশায়ের কাছ থেকে গিনি নিয়ে সেটাই দিয়েছেন।’’
১৯৭৬-এ যখন সমরদার বাড়িতে যাচ্ছি, তখন ওঁর বয়স ঠিক ষাট। বৌদি বয়েসে বেশ ছোট এবং কালো ফ্রেমের চশমা ও সবুজ পাড় দেওয়া খয়েরি তাঁতের শাড়িতে প্লেটে কাটলেট সাজিয়ে দিতে এলেন যখন, তখন তিনি রীতিমতো একটা প্রেজেন্স। বিখ্যাত বরকে বেশি পান না করার চেতাবনি দিলেন।
আকবর আর আমাকে বললেন, ‘‘আপনাদের সানডে তো বেশ ভাল হচ্ছে। সে দিন তো উনি খুব মজা করছিলেন রবিঠাকুরকে নিয়ে শক্তির লেখাটা নিয়ে।’’
শক্তির (চট্টোপাধ্যায়) লেখা মানে যে-লেখায় কবি রবিঠাকুর নিয়ে বেশ মজা করে বলেছিলেন। হেডিং করা হয়েছিল ‘টেগোর? দ্য গড?’ তাতে দেদার চাঞ্চল্যও হয়েছিল সে-সময়।
সমরদার তো ভাল লাগারই কথা, কারণ শক্তিদার রচনার ধরনটা প্রায় ওঁর মতোই হয়েছিল। ওঁর স্বভাবভঙ্গিতে একটা ওয়ানলাইনারে বললেন, ‘‘দিব্যি তো এ-ঠাকুর ও-ঠাকুর মিলিয়ে দিল।’’
কথাটা শক্তিদাকে বলতে খুব হেসেছিলেন। একটু হাই-ও ছিলেন, পিরিতির ভাষায় বললেন, ‘‘তা আছেন কেমন বুড়ো? অনেক দিন দেখা হয়নি। দাঁড়াও, একদিন একটা রামের বোতল নিয়ে গিয়ে হামলা করব।’’
তার পর একটু থেমে, মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘সত্যি, মানুষটার জবাব নেই।’’
পরে গিয়েছিলেন কি না সেটা জানি না।
যাক, এ বার বিষ্ণুবাবু সম্পর্কে সমরদার এক চুম্বক বৃত্তান্ত দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাব।
বিষ্ণুবাবু একবার প্রয়োজন পড়ায় সমরবাবুর থেকে কুড়ি টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেবার নাম করেন না।
এক দিন বাড়ি ফিরে সমরবাবু দেখলেন যে বিষ্ণুবাবু ওঁর ঘরে একটা যামিনী রায়ের ছবি ঝুলিয়ে দিয়ে গেছেন। বেশ তো, যামিনী রায়ের ছবি। কিন্তু মাঝে মধ্যে ছবিটা ওঁকে ধারের টাকাটা মনে পড়িয়ে দেয় আর ভেতরটা খচখচ করে।
তখন সমরবাবু ছবিটাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেন। আর বিষ্ণুবাবু বাড়ি এলে ওটাকে ফের সোজা করে দেন।
বৃত্তান্তটা লিখছেন যখন সমরবাবু তখন কুড়ি টাকা শুধতে যে-যামিনী রায় ঝুলিয়েছিলেন বিষ্ণুবাবু, বাজারে তার দাম চড়েছে দুশো টাকা।
একটা জিনিস মনে আছে সমরদার বাড়ির আলাপের— উনি রাজনীতির কথার মধ্যে যেতে চাইতেন না। তার একটা কারণ অবশ্যই সে-সময়ের রাজনীতির কদর্য চেহারা।
দ্বিতীয় কারণ— সারাটা সময় ওই সব নিয়েই তো মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। তার অনুপ্রবেশে সন্ধের আলাপটা ভাঙচুর হবে।
তবে আরও পরে জেনেছি— সমরদার ছোট বোন কমলা রায়ের স্মৃতিচারণা থেকে— এক ছাদের নীচে নানা মতের রাজনীতির কোন্দল নিয়ে ছোট থেকে বড় হয়েছেন মানুষটা। কমলা লিখেছেন...
‘‘...আমাদের বাড়িতে তখন দু’রকম মতবাদ চলছে। নীচে বাবা তখন ভীষণ হিটলার ভক্ত, ওপরে স্ট্যালিন ভক্ত।... বাবা ভেবেই নিয়েছিলেন, ইংরেজ হারবে। ... বলতেন, ইংরেজি আর পড়তে হবে না, এখন থেকে জার্মান ভাষা পড়তে হবে।...’’
বিষ্ণু দে ও বুদ্ধদেব বসুকে কয়েকটি চিঠিতেও এই ‘মতান্তর’-এর সকৌতুক উল্লেখ করেছেন সমররবাবু।
বিষ্ণু দে’কে লিখছেন: ‘‘বাবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়? নিশ্চয়ই খুব উল্লসিত। সুভাষবাবু এলেন বলে।’’
২০.৯.৪১-এর এই চিঠির সুভাষবাবু হলেন নেতাজি। জার্মানরা জিতলে এই সুভাষবাবুই জার্মান বাহিনী নিয়ে ভারতে ফিরবেন বলে স্ট্যালিনবাদীদের ধারণা তখন। এই ধারণায় সমরবাবু যে খুব পীড়িত ছিলেন, তা বিষ্ণু দে’কে লেখা পরের চিঠিতে আরওই ঝলকে ওঠে।
চিঠির তারিখ ৫.১১.৪১, লিখছেন:
‘‘আমাদের বাড়িতে শুনলাম খুব খানাপিনা চলছে, জার্মানরা রুশ দেশকে প্রায় খেয়ে ফেলছে বলে। বেশি খেলে বমনের সম্ভাবনা বাড়ে, সে কথা পিতৃদেব বোধহয় ভুলে গিয়েছেন।’’
রুশ-জার্মান যুদ্ধে সেন পরিবারের সঙ্কট কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল তার এক চরম ছবি বুদ্ধদেব বসুকে লেখা সমরবাবুর ৭.২.৪২-এর চিঠিতে।...
‘‘...বাবা কেষ্ট এবং আমার সেজভাই-এর সঙ্গে বাক্যালাপ করেন না, (ওরা) হিটলার বিরুদ্ধ বলে...।’’
এখন ফিরে তাকালে মনে হয় এমার্জেন্সির ওই রুদ্ধসঙ্গীতের আবহেই সমরদা ওঁর জীবনবৃত্তান্ত লিখবেন বলে মনস্থির করেন।
নিশ্চিত জানি না, শুধু একটি ধারণা। ধারণা গড়ার স্ফুলিঙ্গ হঠাৎ একদিন বরিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে শোনানো ওঁর একটা চুটকি। পরে ‘বাবুবৃত্তান্ত’ প্রকাশ পেলে দেখা গেল সেখানেও গল্পটা আছে, এবং অনেকের মুখে মুখে ঘুরেছে তখন। তাতে মনে হয় বইয়ে ব্যবহৃত নানা অ্যানেকডোট ওঁর মগজে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন।
ওঁর লিখিত বয়ানে গল্পটা দিয়ে আজকের বৃত্তান্ত শেষ করতে হবে।
‘‘আমাদের বেহালার বাড়িতে রাধারামণবাবু (মিত্র) ও বঙ্কিমবাবু খুব সম্ভব ১৯৩২ নাগাদ আসেন। বঙ্কিমবাবু ছিলেন অত্যন্ত মন্থরগতি, দীর্ঘ ভারিক্কি চেহারা, কথাবার্তা বলতেন ধীরেসুস্থে, আত্মপ্রত্যয় ছিল প্রখর। বাগানে খাটা পায়খানায় গেলে ঘণ্টা দেড়েকের আগে বেরোতেন না, সঙ্গে যে বই নিয়ে যেতেন পরে প্রায়ই পাওয়া যেত না। আমরা বলতাম বিপ্লব আপনার জন্য পিছিয়ে যাবে, ক্রান্তি মুহূর্তে হয় পায়খানা কিংবা জর্দা পানের জন্য বসে থাকবেন।’’

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/story-on-the-poet-samar-sen-1.445266