Monday, 7 March 2016

শবাধারের ভিতরে রেখেছেন কবরের টাকাও (On Ashok Ghosh)

শবাধারের ভিতরে রেখেছেন কবরের টাকাও

সন্দীপন চক্রবর্তী

কলকাতা, ৬ মার্চ , ২০১৬, ০৩:০৪:০৩
ashok ghosh

বিদায়। শনিবার কলকাতায় ফব-র দফতরে প্রয়াত বাম নেতা অশোক ঘোষকে কুর্নিশ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী।

নিজের কবরটা শুধু নিজে খুঁড়ে যাননি!
কলকাতা থেকে পুরুলিয়া পর্যন্ত শেষ যাত্রার পথে শনিবার আগে আগে থাকল প্রবীণ বাম নেতা অশোক ঘোষের ছবি সংবলিত একটি মিনি ভ্যান। তাতে বসানো সাত ফুট বাই তিন ফুটের একটা কাঠের বাক্স। চকচকে নয় একেবারেই! বেশ পুরনো। পিছনে শববাহী শকটে অশোকবাবু। ওই কাঠের বাক্স আসলে যাঁর শেষ আধার হবে!
প্রবীণতম বাম নেতাকে চির বিদায় জানাতে আয়োজনের কোনও ক্রটি রাখেনি ফরওয়ার্ড ব্লক এবং বামফ্রন্ট। কিন্তু এই শব-বাক্স (ইংরেজিতে যাকে বলে ক্যাসকেট। ভ্যাম্পায়ারের সিনেমায় দেখা মাথা চওড়া, পায়ের দিকে সরু কফিন নয়) তাদের জোগাড় করতে হয়নি। ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন স্বয়ং অশোকবাবু! কাঠের মিস্ত্রীকে বরাত দিয়ে বাক্স তৈরি করিয়ে দলের রাজ্য দফতরে রাখা ছিল নির্দিষ্ট জায়গায়। ছিল একটি চিঠিও। যেখানে ব্যাখ্যা করা আছে, হিন্দু ঘরের সন্তান হয়েও দেহান্তে তাঁর এই মাটিতে মিশে যাওয়ার আর্জির কথা। এবং তাতেও শেষ নয়! ওই কাঠের বাক্সের ডালা খুলে ফব নেতারা আবিষ্কার করেছেন কিছু টাকা। যা কাজে লাগাতে হবে অশোকবাবুর দেহ সমাহিত করার পরে প্রথা মেনে শেষকৃত্যের খরচ মিটিয়ে দেওয়ার জন্য। আগাম এমন ব্যবস্থাপনার কথা অশোকবাবুর মৃত্যুর পরে জানতে পেরেছেন ফব নেতারা এবং জেনে কপালে হাত ঠেকাচ্ছেন!
শেষকৃত্যের আগে শেষ পর্বটা অবশ্য একেবারে টানাপড়েন-মুক্ত যায়নি ফব-র অন্দরে। অশোকবাবুকে খামোখা পুরুলিয়া টেনে নিয়ে গিয়ে সমাহিত না করে নিমতলা মহাশ্মশানে সৎকার করানোর জন্য দাবি তুলেছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর দুই সদস্য। এর আগে হেমন্ত বসু, নলিনী গুহ বা চিত্ত বসু— ফব-র কোনও নেতাকেই প্রয়াণের পরে সমাহিত করা হয়নি। ওই দুই নেতার দাবি ছিল, অশোকবাবুর শেষ ইচ্ছার নামে নির্ঘাত কিছু ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে! শেষ পর্যন্ত বাক্স এবং টাকা আবিষ্কার টানাপড়েনে ইতি টানতে সহায়ক হয়েছে। শেষে ফব নেতারাও বলার সুযোগ পেয়েছেন, মৃত্যুতেও দুই ধর্মকে মিলিয়ে দেওয়ার অনন্য নজির রেখে গেলেন তাঁদের রেকর্ড সময়ের রাজ্য সম্পাদক।
পুরুলিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়ে যাওয়ার আগে অশোকবাবুকে নিয়ে শোকমিছিল এ দিন হেমন্ত বসু ভবন থেকে শুরু হয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরে শ্যামবাজারের নেতাজি মূর্তিতে শেষ হয়। সেখানেই সাময়িক বিরতির সময়ে ফব-র সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত বিশ্বাস বলছিলেন, ‘‘বাক্সের মধ্যে কত টাকা আছে, সেটা আমরা পুরুলিয়ায় শেষ কাজের আগে গুনে দেখব ঠিক করেছি। অশোকদা কী কী কাজ যে করে রেখে যেতে পারেন, এত দিনেও সবটা ধারণা আমাদের ছিল না দেখলাম!’’
শববাহী শকটে বসে চোখের জলে গাল ভিজে যাচ্ছিল কানাই শী-র। অশোকবাবুর আশ্রয়েই ফব-র রাজ্য দফতরে থাকতেন, তাঁকে ‘বাবু’ বলে ডাকতেন। আদতে পিংলার বাসিন্দা কানাইবাবুর কথায়, ‘‘বাবুর কাছে আছি ১৯৬৯ সাল থেকে। সব দিকে নজর ছিল ওঁর। সব গুছিয়ে রাখা চাই! এমন মানুষ আর হবে না।’’ গাড়ির মধ্যে বসেই সম্মতির ঘাড় নাড়েন জগন্নাথ পাত্র। অশোকবাবুর সর্বক্ষণের আর এক সঙ্গী। দলীয় দফতর তথা নিবাস থেকে শেষ বার অশোকবাবুকে বার করার সময় মরদেহে কাঁধ দিতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল এই দু’জনকেই।
ব্যবস্থা যা হয়েছে, পুরুলিয়ার ফব দফতরে রাতে থাকছে মরদেহ। সেখান থেকে সুইসার আশ্রমে নিয়ে গিয়ে আজ, রবিবার সকালে মরদেহ ভরা হবে ওই কাঠের বাক্সে। প্রথা মেনে সেই সময়েই গান স্যালুট দেবে পুলিশ বাহিনী। শেষ লগ্নের মিছিলে থাকার কথা বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। আর আগে এ দিন কলকাতায় ফব দফতরে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে গিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। খাতায় লিখে কুর্নিশ জানিয়েছেন ‘অশোকদার অম্লান স্মৃতি’র উদ্দেশে। এসেছেন কংগ্রেসের প্রদীপ ভট্টাচার্য, বিজেপির শমীক ভট্টাচার্যও। শ্যামবাজার পর্যন্ত মিছিলে হেঁটেছেন সূর্যকান্ত মিশ্র, দেবব্রতবাবু, মনোজ ভট্টাচার্য, নরেন চট্টোপাধ্যায়েরা। ফব-র ৯৪টি অর্ধনমিত পতাকার সঙ্গে মিছিলে থেকেছে সিপিএমের ৯৪টি পতাকাও। অশোকবাবুর জন্যই যে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল সিপিএম।
অশোকবাবুর নিজস্ব ব্যবস্থা অবশ্য আরও আগে প্রস্তুত ছিল। জায়গা বাছা ছিল, বাক্স ছিল, টাকা ছিল। আর একটু সুযোগ পেলে নিজের কবর নিজে খোঁড়ার প্রবাদও কি সত্যি করে যেতেন না তাঁদের অভিভাবক, ভাবছেন দলেরই কেউ কেউ!

http://www.anandabazar.com/state/veteran-forward-bloc-leader-ashok-ghosh-funeral-1.325590


দুই নেতার জটিল সম্পর্কের সূক্ষ্ম ইতিহাস

পুস্তক পরিচয়

logo

দুই নেতার জটিল সম্পর্কের সূক্ষ্ম ইতিহাস

সুরঞ্জন দাস

২৩ জানুয়ারি, ২০১৬, ০০:০১:০০
1-1

নেহরু অ্যান্ড বোস/ প্যারালাল লাইভস। রুদ্রাংশু মুখার্জি। পেঙ্গুইন ভাইকিং, ৫৯৯.০০

ইতিহাসবিদ হিসেবে রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায়ের দক্ষতার অভ্রান্ত পরিচয় এই বই। আগেকার প্রধানত রাজনৈতিক ইতিহাস গবেষণার বিষয় থেকে সরে এসে এখন ‘হিস্টরি অব আইডিয়াজ’-এর প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে এই বইয়ে। বইটি একটি ইনটেলেকচুয়াল বায়োগ্রাফি, যাতে জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর লেখা ও বক্তৃতার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের রূপরেখাটি জানতে পারি। এঁরা দুই জনেই রাজনৈতিক জীবনে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তবু, তাঁদের বন্ধুত্বের মধ্যে নিহিত সম্ভাবনাটি শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ১৯৩৯-এর এপ্রিলে সুভাষ দুঃখ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত ভাবে আমার নিজের, এবং বর্তমান সংকটের সময় আমাদের অবস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছেন পণ্ডিত নেহরু, আর কেউ না,’ (পৃ ২০৩)। আর, ১৯৪২-এর এপ্রিলে অক্ষশক্তির সাহায্য নিয়ে সুভাষ যখন ভারতকে স্বাধীন করতে চাইছেন, জওহরলাল বলেন, ‘একেবারে ভুল পথ, … আমাকে এর বিরোধিতা করতেই হবে,’ (পৃ ২৪৪)। ঘনিষ্ঠতার কিছু মুহূর্ত সত্ত্বেও তাঁদের দু’জনের জীবন ছিল ‘সমান্তরাল’। সাতটি অধ্যায়ে  সময়ানুক্রমিক ভাবে ও বর্ণনাত্মক স্টাইলে বিন্যস্ত এই বই তাঁদের সেই সমান্তরাল জীবনের ছবি তুলে ধরে।
তাঁরা দুই জনেই এলিট-বৃত্তের মানুষ। দু’জনেই কেমব্রিজে পড়েছেন। দু’জনেই পেশাজীবন ছেড়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য। দু’ জনেই কংগ্রেসের বাম শিবিরের প্রতিনিধি ছিলেন। ইলাহাবাদ ও কলকাতায় দু’জনে দুটি মিউনিসিপ্যালিটি-র প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন প্রায় একই সময়ে। গাঁধীর অসহযোগ আন্দোলন হঠাৎ স্থগিত হওয়ায় দু’জনেই হতাশ বোধ করেছিলেন। একই সময়ে তাঁরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ দুটি বই লিখেছিলেন। ১৯৩৫-এর জানুয়ারিতে সুভাষ ইউরোপে নির্বাসনে থাকাকালীন তাঁর দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল প্রকাশিত হয়। আর বন্দি দশায় জওহরলালের অ্যান অটোবায়োগ্রাফি লেখা শেষ হয় ১৯৩৫-এর ফেব্রুয়ারিতে। দুই জনেই তখন পারিবারিক শোকের মধ্যে:  সুভাষ হারান পিতাকে, আর নেহরু, তাঁর স্ত্রী কমলাকে। সুভাষ কমলাকে প্রাগ-এ পৌঁছে দেন, সেখান থেকে লসান-এ জওহরলালের কাছে যান। লসান-এই কমলার মৃত্যু। প্রবাসী দুই বন্ধুর গভীর সংযোগের কথা আছে সংবেদনাময় অধ্যায় ‘টু উইমেন অ্যান্ড টু বুকস’-এ। 
তবু যেন মানসিকতার দিক দিয়ে দু’জন অনেকটাই দূরবর্তী: তাঁদের দুটি বই আলোচনার মাধ্যমে খুলে দেখান রুদ্রাংশু। দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল অনেক ‘দৃঢ়, স্পষ্ট ভাবে রাজনৈতিক।’ তুলনায় অ্যান অটোবায়োগ্রাফি অনেক ‘অন্তর্মুখী, রাজনীতি বিষয়ে খানিক অনিশ্চিত।’ সুভাষের কাছে রাজনীতির স্থান সর্বদাই ব্যক্তিজীবনের উপর, তাই তিনি গোপনে-বিবাহিত স্ত্রী ও দুই মাসের শিশুকন্যাকে ছেড়ে দেশের ডাকে বেরিয়ে পড়তে পারেন। গাঁধীজির প্রতি সুভাষের মনোভাবেও আবেগ কম। গাঁধীর সঙ্গে প্রথম দেখায় তাঁর মনে হয়, ‘গাঁধীর দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নেই।’ পরে কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী অংশের সঙ্গে গাঁধীর নৈকট্য, প্রত্যক্ষ আন্দোলনের বিরোধিতা, আলোচনা-অহিংসা-সমাজগঠন বিষয়ে গাঁধীর জেদ সুভাষকে বিরক্ত করে তোলে। জওহরলালেরও গাঁধীর সঙ্গে দ্বিমত ছিল। তিনিও প্রথমে তাঁকে ‘দূরবর্তী’, ‘অরাজনৈতিক’ বলে মনে করেছিলেন, ‘হিন্দ্ স্বরাজ’ বিষয়ে তাঁর সমালোচনা ছিল। তবু জওহরলাল আবেগগত ভাবে গাঁধীর উপর নির্ভর করতেন, যে নির্ভরতা তাঁর বাবা মতিলাল ও স্ত্রী কমলার মৃত্যুর পর বা়ড়তে থাকে। ‘বাপু’ ডাকটির মধ্যে এই ব্যক্তিগত আবেগের ছোঁওয়া। সুভাষ কিন্তু গাঁধীকে ‘মহাত্মাজী’ বলেই ডাকতেন। জওহরলাল মনে করতেন গাঁধীর মতো কেউ ভারতীয় সমাজের নাড়িটি বুঝতে পারে না। সুভাষ ভাবতেন, গাঁধীর ‘জাদুস্পর্শ’ নিয়ে বাড়াবাড়িটাকে চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার।
সমান্তরাল। এআইসিসি-তে (১৯৩৯) জওহরলাল ও সুভাষচন্দ্র। বাঁ দিকে খান আবদুল গফফর খান ও রাজেন্দ্রপ্রসাদ।
একই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলাদা ধরনের প্রতিক্রিয়া হত তাঁদের। গাঁধীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে কংগ্রেসের ‘ওল্ড গার্ড’ নেহরু ও সুভাষ, দুই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টেরই বিরোধিতা করে। কিন্তু জওহরলাল পদত্যাগ করে বেরিয়ে আসেননি। তার একটা কারণ গাঁধীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তিনি এও মনে করেছিলেন যে, জাতীয়তাবাদের লড়াই এতে ব্যাহত হবে। এ দিকে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার মুখে পুনর্নির্বাচিত কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ কিন্তু দল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করেন, যাকে নেহরু একটা ‘নেতিবাচক পদক্ষেপ’ ছাড়া কিছু মনে করতেন না।
গাঁধীর ‘ছায়া’র জন্যই তাঁদের বন্ধুত্ব পূর্ণ ভাবে বিকশিত হতে পারেনি: রুদ্রাংশু বলেন। সুভাষ গাঁধীকে গুরু মানেননি, কিন্তু জওহরলালের কাছে গাঁধী ছিলেন ‘emotional anchor, a father figure.’ গাঁধীর বিরুদ্ধতা করার সময়ও নেহরু যেন ‘truant son’, অবাধ্য সন্তান। জওহরলালের দুর্বলতা সুভাষ বুঝতেন, তাই মন্তব্য করেন ‘জওহরলালের মাথা তাঁকে এক দিকে টানে, আর হৃদয় টানে গাঁধীর দিকে।’ (পৃ ২০৫)
রুদ্রাংশুর মতে, গাঁধীর সবচেয়ে খারাপ দিকটি উন্মোচিত হয় ত্রিপুরী কাণ্ডে, ‘সংকীর্ণ দলবাজির পাকে’ পড়েন তিনি। ঠিকই, এই সময়ে গাঁধীর দ্বিচারিতা অনস্বীকার্য। প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচনের বিষয়ে নেহরুর আবেদন গ্রাহ্য করেন গাঁধী। কিন্তু সুভাষের ক্ষেত্রে একই কাজ করতে তাঁর ছিল তীব্র অনীহা। সুভাষের বিষয়ে এতটা অনীহার কোনও কারণ ছিল কি? ত্রিশের দশকের মধ্যভাগেই সুভাষ গাঁধীর থেকে ভাবাদর্শগত ভাবে দূরে চলে যান, গাঁধীবাদী জাতীয়তাবাদের পর্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে ‘ব্রিটিশ রাজ’-এর বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আন্দোলনের কথাও ভাবেন। সুভাষের এই ‘ভিন্ নৌকায় সওয়ারি’ হওয়ার ইচ্ছেটা গাঁধীর অজানা ছিল না (পৃ ২৪৭)।
এই বই স্বভাবতই একটা প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়। গাঁধীর ‘ছায়া’ না থাকলেও কি তাঁদের জীবন এমন ‘সমান্তরাল’ হত? মনে হয় তাই। সুভাষ কংগ্রেস না ছাড়লেও দুই জনের রাজনৈতিক আদর্শ হয়তো ক্রমে আলাদা হয়ে যেত। জওহরলাল সারা জীবন ফ্যাসিজম ও নাৎসিজম-এর দৃঢ় সমালোচক ছিলেন, সুভাষ কিন্তু ফ্যাসিস্ট বা নাৎসি বা জাপানি বাহিনীর কোনও সমালোচনাই করেছেন বলে জানা নেই। মুসোলিনির মধ্যে ‘রাজনৈতিক উচ্চাশার প্রতিফলন’ দেখেছিলেন তিনি, হিটলারকে ‘পুরোনো ধাঁচের বিপ্লবী’ মনে করেছিলেন। ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য ফ্যাসিজম ও কমিউনিজম-এর যে মিশ্র ভাবাদর্শের কথা ভাবতেন সুভাষ, জওহরলাল তার প্রবল বিরোধী ছিলেন। ‘বাইরের শক্তি’ দিয়ে ভারতকে স্বাধীন করার স্বপ্নও নেহরু কোনও কালে পছন্দ করেননি। জওহরলালের মনে হয়েছিল, ‘জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য এক ধরনের পথে’ তাঁরা বিশ্বাস রাখেন না। রুদ্রাংশুর ভাষায়, তাঁদের ‘জীবন কোনও সন্ধির সূত্র দিতে পারেনি।’
দুই নেতার এই সম্পর্কের মধ্যে একটা সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতাও পাওয়া সম্ভব। শেষ অধ্যায় ‘ফ্রেন্ডশিপ রিগেনড্’-এ পড়ি, আইএনএ-র প্রতি জওহরলাল কতটা সম্ভ্রম বোধ করতেন, এবং ‘জাপানি আগ্রাসনের পথটি দৃঢ় ভাবে আটকানোর জন্য’ নেতাজির প্রতিও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর খবর আসায় নেহরু কেঁদেছিলেন। আইএনএ বন্দিদের হয়ে মামলা লড়তে নেহরু বিনা দ্বিধায় গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলেন আইনজীবীর পোশাক। ১৯৪৬ সালের ২ জানুয়ারি সুভাষকে তিনি নিজের ‘ছোট ভাই’ বলে উল্লেখ করেন, দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে ‘সাহসী সৈনিক’ বলেন। জওহরলালের সঙ্গে একত্র উদ্যমে ইতিহাস রচনা করতে পারেননি বলে সুভাষ স্বভাবতই হতাশ বোধ করতেন, তবু সুভাষ জওহরলালকে তাঁর ‘রাজনৈতিক জীবনের বড় ভাই’ বলে স্বীকার করেছেন চিরকাল। ত্রিপুরীর ঘটনার পরেও তাঁর কাছে পরামর্শ চেয়েছেন। আইএনএ-র একটি বাহিনীর নাম রেখেছিলেন ‘জওহরলাল’। আজকের ভারতে রাজনৈতিক অসহনশীলতার দাপটে গণতন্ত্রের পরিবেশের যে করুণ হাল, তার প্রেক্ষিতে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে একটা বিকল্প মডেলের সন্ধান দেয় এই বই।
নেতাজি বিষয়ক সম্প্রতি প্রকাশিত ও এখনও-অপ্রকাশিত তথ্য থেকে সুভাষ-নেহরু সম্পর্ক বিষয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসতেও পারে। তবু আধুনিক ভারতের ইতিহাস-রচনায় এই বই একটি দুর্লভ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দু’জন রাজনৈতিক নেতার সম্পর্ক, যেখানে রাজনৈতিক দূরত্বের ফাঁক দিয়ে ব্যক্তিগত মালিন্য কখনও প্রবেশ করেনি— সেই সম্পর্কের সূক্ষ্ম বুননের ভারসাম্যময় ইতিহাস কী ভাবে লিখতে হয়, এই বই তা দেখিয়ে দেয়।

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য

http://www.anandabazar.com/netaji/a-book-review-by-suranjan-das-on-netaji-dgtl-1.291421

Sunday, 6 March 2016

পাথর চাপা কান্না (On Charlie Chaplin)

পাথর চাপা কান্না

৫ মার্চ , ২০১৬, ০০:০০:০৫
e e print
 
chaplin
হাসবেন না, হাসবেন না। আমারও একটা চার্লি চ্যাপলিন গল্প আছে। আপনাদের শুনতেই হবে। তার পর ঠিক করবেন হাসবেন, না কাঁদবেন।
১৯৭৭-এ একটি কাজে যখন লন্ডনে, তখন দক্ষিণ পল্লিতে কখনও সখনও থেকেছি নিশীথ গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক বিশিষ্ট ভদ্রলোকের বাড়িতে। যিনি আবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু ও ম্যানেজার ছিলেন।
তো এই নিশীথবাবু যৌবনে নামী ভারত্তোলক ছিলেন এবং ষাটের দশকের গোড়ায় দেশের প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডন গিয়েছিলেন, আর ফেরেননি। পেট চালাতে খুচরো খুচরো যা কাজ পেয়েছেন লুফে নিয়েছেন।
এ রকম এক অস্থায়ী কাজ ছিল লন্ডনের সেকালের সেরার সেরা স্যাভয়-এর ব্যাকরুমে। কিচেনের খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা, খরচপাতির হিসেব রাখার। সকালে গিয়ে সারা দিন কাটিয়ে রাতে ফিরতেন ব্রেকফাস্ট থেকে রাতের ডিনার সব অন দ্য হাউজ সারার জন্য।
যা দেখেশুনে ম্যানেজারের ধারণা হয়েছিল এর আনুগত্যের তুলনা হয় না। তাই এক দিন ডেকে এক নতুন কাজে বহাল করলেন। এক মহাবিশিষ্ট অতিথি আসছেন তিন দিনের জন্য। সর্বান্তঃকরণে তাঁর জি-হুজুর হয়ে থাকতে হবে। তাঁর স্যুইটের এক কোণে পোস্টিং।
নিশীথবাবুর কথায়, ‘‘জীবনে কারও এমন সেবায় লাগিনি। মুখ ফস্কে কিছু বেরনোর আগেই কাজ শেষ।’’
শেষ দিন ঘটা করে সাহেবের একটা বই লঞ্চ হল স্যাভয়ের বিখ্যাত বলরুমে। যেখানে অবিশ্যি নিশীথের যাওয়ার অনুমতি ছিল না। মাঝরাত অবধি পার্টি চলল। সাতসকালে সাহেব রওনা দেবার জন্য তৈরি।
নিশীথ সাহেবের জিনিসপত্তর গুছিয়ে পোর্টার ডাকার জন্য তৈরি। সাহেব একটা প্যাকেট ওঁর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘‘নাও, এটা তোমার।’’ ভীষণ আগ্রহ সত্ত্বেও নিশীথ জিজ্ঞেস করে উঠতে পারেননি, ‘‘মহাশয়ের নাম?’’ কারণ অতিথি সংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন করা নিষেধ ছিল ম্যানেজারের।
রাতে বাড়ি ফিরে দুরু দুরু বক্ষে প্যাকেটটা খুলে নিশীথ দেখলেন একটা বই। প্রচ্ছদে লেখা, ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’। লেখক চার্লস চ্যাপলিন। তখনও ব্যাপারটা মাথায় খোলেনি নিশীথের। তিনি আনমনে মলাট উল্টে টাইটেল পেজে যেতে তো চক্ষু চড়কগাছ। সাহেব লিখেছেন দুটো কথা ‘হ্যাভ ফান’। নীচে সই— চার্লস চ্যাপলিন!
এক রাতে ডিনারের পর গল্পটা শুনিয়ে সেই স্বাক্ষরিত হার্ডব্যাক কপিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে নিশীথদা বললেন, ‘‘নাও পড়ো আর মজা করো। তা বলে রাত পোহালে ওটা নিজের মনে করে নিয়ে হাঁটা দিয়ো না।’’ বিছানায় শুয়ে কতক্ষণ বইটার গায়ে হাত বুলিয়ে গন্ধ শুঁকেছিলাম মনে নেই। তার পর বইয়ের প্রিলিউড বা আলাপ পড়তে পড়তে এক অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হল। প্রথমে গায়ে কাঁটা দেওয়া, ক্রমে ক্রমাগত চোখ দিয়ে জল ঝরা।
গোটা পাঁচেক পরিচ্ছেদ পড়তে না পড়তে টের পেলাম যে এত করুণ আত্মজীবনী আমি জীবনে পড়িনি।
তার পরেও অ্যাদ্দিনে না।
আর সমানে ভাবছিলাম, যে মানুষটির নামটা হাসি, স্ফূর্তি, কমেডি, লাফ্টার ইত্যাদি শব্দের সমার্থক ভাবে সারা বিশ্ব, তিনি জীবনকথা শুরুই করলেন চোখের জলে ভেসে! আর যে-কান্না কিছুতেই থামেও না। শুধু নিজেকে বাঁচাতে হাসির পিছনে লুকিয়ে।
যে-পরিচ্ছেদে চ্যাপলিন ভাগ্যের সন্ধানে মার্কিন দেশ পাড়ি দিচ্ছেন সেই পর্যন্ত পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সকাল হতে নিশীথদার গাড়িতে করে বেরিয়ে শুধু চ্যাপলিনের সেই কেনিংটন রোড খুঁজছি মনে মনে। জানি না, সে-তল্লাট কোথায়, তবু খুঁজছি। নিশীথদা থেকে থেকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘‘কী হল! কী ভাবছ?’’
কিছু বলছি না, কারণ রঙিন, উজ্জ্বল লন্ডনের বদলে একটা পুরনো, সাদা-কালো শহর চোখের সামনে খেলছে। সদ্য পড়া চ্যাপলিনের স্মৃতি এখন সিনেমা হয়ে চোখের সামনে…
• ​• ​•
একটা বারো বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে কেনিংটন রোডের উপর দ্য ট্যাঙ্কার্ড নামে এক পানশালার সামনে।
দেখছে ঘ্যামা ঘ্যামা ভদ্রলোকরা সব ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে টুক টুক করে ঢুকে যাচ্ছে লাউঞ্জ বার-এ। নকশা, যাত্রাগানের ডাকসাইটেরা শনিবারের রাত নেচেগেয়ে, পানেভোজে কাটিয়ে রোববার সকালে জড়ো হচ্ছেন ট্যাঙ্কার্ডে। এখানেই শেষ পাত্তরটি গলায় ঢেলে বাড়ি ফিরবেন দুপুরের খাওয়ার জন্য।
লন্ডনের ভোদাভিল বা যাত্রাগানের এই রঙিন পুরুষদের অবাক বিস্ময়ে দেখে বালকটি। ওঁদের চেককাটা স্যুট, ছাই-ছাই বোলার টুপি, আংটি আর টাইপিনের ঝিলিক দেওয়া হিরে! ওঁরা যখন বার ছেড়ে বাড়ির পথে একে অন্যকে বাই-বাই করছে, ছেলেটা তখন ঠায় দাঁড়িয়ে।
শেষের জনও যখন চলে গেছে, ওর ধারণা হল সূর্য মেঘে লুকিয়েছে। আর তখন ওকে ভারী মন নিয়ে গুটি গুটি ফিরতে হচ্ছে কেনিংটন রোডের পিছনের দিকটায় ৩নং পাউনাল টেরেসে।
রোগা, লিকলিকে সিঁড়ি ডিঙিয়ে টঙের চিলেকোঠায়।
বাড়িটায় ঢুকলেই মন ভেঙে যায় বাসি আর পুরনো জামাকাপড়ের ভ্যাপসা গন্ধে।
আর বিশেষ করে ওই রোববারটায় মনটা এক দম খাদে আছড়ে পড়ল। দেখল মা জানলায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দূরে কোথায়।
ছেলেকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে একটা দুর্বল হাসি হাসল। ঘরে মা ছাড়া কেউ নেই। চার বছরের বড় দাদা সিডনি জাহাজের চাকরি নিয়ে সাগরে। গত তিন দিন ধরেই মা এ ভাবে জানলার পাশে। কী একটা ভেবেই চলেছে। কূল-কিনারা পাচ্ছে না। দু’মাস হল সিডনি সমুদ্রে। কোনও খবর নেই। যে-সেলাই মেশিনে কাজ করে টাকা জোগাড় করছিল মা সেটিরও কিস্তি না মেটানোয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
রোববার-রোববার সকালে বিছানাতেই ছেলেকে ব্রেকফাস্ট দেয় মা। আজ বাড়িতে কোনও খাবার নেই। তাতে ছেলের কিছু এসে যায় না। কোনও সমস্যাই ওকে ছোঁয় না। নিতান্ত বালক, সব অশান্তিই ও কাটিয়ে ফেলে সহৃদয় বিস্মৃতি দিয়ে।
বাড়িতে খাবার নেই, কিন্তু মা’র পাশ থেকে নড়ার ইচ্ছে নেই ছেলের। মা কী ভীষণ রোগা হয়ে গেছে এই ক’দিনে! চোখ বসেছে, সুন্দর মুখটা বসেছে, ব্যথায় মুড়েছে চাউনি। আজ কিছুতেই মাকে ছেড়ে যাবার নেই। পাশে থাকলেই শান্তি।
অথচ মা কেবলই বলছে, ‘‘কেন তুই ম্যাকার্থিদের বাড়ি যাচ্ছিস না?’’
বলার কারণ, ম্যাকার্থিদের বাড়ি গেলে ছেলেটা চাট্টি খেতে পাবে। ওদের সঙ্গে মা’র খুব ভাব। ওদের ছেলে ওয়ালির সঙ্গে ওর খেলতে গেলেই কিছু না কিছু খেয়ে আসা হয়। তাও যাবার ইচ্ছে নেই ছেলের। মা শোনে না।
ছেলের চোখ দিয়ে জল ছোটে। বলে, ‘‘আমি তো তোমার সঙ্গে থাকতে চাই, মা।’’
মা চোখ ঘুরিয়ে জানলার বাইরে ফের শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘‘যা যা, ম্যাকার্থিদের ওখানে। ডিনারটা তো পাবি। বাড়িতে কিচ্ছুটি নেই।’’
এ বার মা’র গলায় যেন বকুনির সুর পেল ছেলে। ভাঙা গলায় বলল, ‘‘তাই যদি বলো তা হলে যাই।’’
ম্লান হেসে ছেলের মাথায় আদর করে দিল মা। বলল, ‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। দৌড়ো, দৌড়ো।’’
একটা পাপবোধ নিয়ে মাকে চিলেকোঠায় একলা রেখে গেল ছেলে। ওর ধারণাই নেই মাত্র ক’দিনের মধ্যে কী ভয়ঙ্কর দুর্দিন ঘনাচ্ছে মা’র জীবনে।
• ​• ​•
নিশীথদা’র গাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে বালক চ্যাপলিনের বাড়িটা সে দিন ধরতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এক সময় ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ রোডে এসে পড়েছিলাম। গত রাতে পড়া থেকে তখনও রাস্তাটার নাম মাথায় ঘুরছে। চ্যাপলিনের মা’র অবস্থা যখন ভাল তখন ওদের বাসা ছিল এই রাস্তার ওপর। ওর চোখে পড়ত এবং মজা লাগত ব্রিজ ধরে চলা ঘোড়ায়-টানা ট্রাম দেখতে। তল্লাটটা চেকনাই দোকানপাট, রেস্তোরাঁ আর মিউজিক হলে ঢালা স্ফূর্তির আড়ত।
মা নিজে তখন বিশের কোঠায়। বেগুনি-নীল চোখ, ধবধবে ফর্সা, লম্বা চুল, সুগন্ধি উদ্যানবৃক্ষে যেন! রঙ্গমঞ্চে রসিকা চরিত্রে নিয়মিত ডাক। ছেলের চোখে মা’র রূপটাকে খুব পবিত্র ঠেকে। চ্যাপলিনের বাল্যস্মৃতি ঘিরে শুধুই এই মা। বাবাকে ওঁর কখনও দেখাই হয়নি। বয়সকালে বন্ধুদের কাছে মাঝে-সাঝেই কবুল করেছেন উনি নিশ্চিত নন ওঁর সত্যিকার বাবা-কে। আত্মজীবনীতে লিখছেন—
‘‘আমার যে একটা বাবা আছে সেটাই বুঝিনি। আর তাকে কখনও আমাদের সঙ্গে থাকতে দেখিনি। বাবাও ভোদাভিলে ছিল; কালো চোখের চুপচাপ ভাবুক মানুষ। মা বলত, বাবাকে নাকি নেপোলিয়ানের মতো দেখতে ছিল। একটা হাল্কা ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর ছিল আর সবার চোখেই ছিল বড় ভাল শিল্পী। সে যুগেও হপ্তায় চল্লিশ পাউন্ড আয় ছিল। মুশকিলের যেটা তা হল মানুষটার বেহদ্দ পানদোষ, যে জন্য— মা বলত— আর সঙ্গে থাকা গেল না।’’
ছাড়াছাড়ি তো হলই, তার ওপর বাবা মারাও গেল বড় তাড়াতাড়ি। মাত্র সাঁইত্রিশে। মা এই বাবার গল্প শোনাত ছেলেকে হাসি আর কান্না মিশিয়ে। মাল টানলেই মেজাজ চড়ত বাবার। তিরিক্ষি চেঁচামেচি। এরকম এক কাণ্ডের দিন মা কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দৌড় লাগাল ব্রাইটন সাগরতীর। তখন বাবা মুহুর্মুহু টেলিগ্রাম ছাড়তে লাগল, ‘‘কোথায় তুমি? কী করছ? এক্ষুনি জানাও!’’
মা তার করে জানিয়ে দিল: ‘‘বলডান্স, পার্টি আর পিকনিক, লক্ষ্মীটি!’’
এই বিয়ের আগে সুন্দরী অষ্টাদশী মা এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোকের সঙ্গে পালিয়ে আফ্রিকা চলে গিয়েছিল। সেখানকার খেতখামারে দাসদাসী আর জিন পরানো ঘোড়ায় চাপার বিলাসী জীবন ছিল। সেখানেই সেই লর্ড পরিবারের কর্তার ঔরসে জন্ম হল বড় ছেলে সিডনির।
কিন্তু মা ইংল্যান্ড ফিরে এল সিডনিকে নিয়ে এবং বিয়ে করল বাবাকে। পরে দুঃসহ অভাবের দিনে চ্যাপলিন গজগজ করত মা’র ওপর, ‘‘কেন ওই সুখের জীবন ছেড়ে চলে এলে?’’ মা হেসে বলত, ‘‘অত শত কী আর বুঝেছি তখন? কী আর বুদ্ধি? কী আর বয়েস?’’
চ্যাপলিনের জন্মের এক বছরের মধ্যে বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মা খোরপোশ চায়নি। তখন তো মা নিজেই তারকা। হপ্তায় পঁচিশ পাউন্ড রোজগার। দুই বাচ্চা আর নিজেকে নিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে। গান গেয়েই দিন কাটছে।
চার্লি চ্যাপলিন একবার ওঁর সহকারী এডি সাদারল্যান্ডকে বলেছিলেন, ‘‘কে যা আমার বাবা সেটাই জানি না।’’ খুব সম্ভবত চ্যাপলিন ছিলেন, সেকালের বুলি ধার করে বলতে, এক লভ্ চাইল্ড। প্রণয়ের সন্তান।
চার্লির মা’র কুমারী নাম হানা ছিল। স্টেজে নামলে নাম হত লিলি হার্লি। ১৮৮৪ সালে (চার্লির জন্মের পাঁচ বছর আগে) নাটকের বোর্ডে নাম লেখা হয়েছিল গায়িকা বলে। শুরুর থেকেই মা সাফল্য দেখেছে। চার্লির বাবা ওঁর মাকে বিয়ে করেন ১৮৮৫-র জুনে এবং চার্লির জন্মের (১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯) এক বছর পর যখন ছেড়ে চলে যান, ওঁর ঘোর সন্দেহ ছেলেটি ওঁর নয়। তবে ছেলেটিকে তিনি ওঁর নাম ও পদবি (বাবার নামও চার্লস চ্যাপলিন) এবং ওঁর দাদা সিডনিকে ওঁর পদবিটুকু দিয়ে যান।
বাবা চার্লস চ্যাপলিনের এত সন্দেহের কারণ স্ত্রীর অসতীপনা। চার্লি চ্যাপলিন নিজেও স্বীকার করেছেন ওঁর মা’র প্রচুর প্রেম-ভালবাসা ছিল। চরম অভাবে রাস্তা থেকেও লোক ধরতে হয়েছে। এ নিয়ে অসম্ভব তীব্রতার সঙ্গে তিনি আত্মজীবনীতে লিখেওছেন: ‘‘সাধারণ নৈতিক মান দিয়ে আমাদের পরিবারের চরিত্র বিচার করা হবে ফুটন্ত জলে থার্মোমিটার চুবনোর মতো ভুল কাজ।’’
এই সব স্মৃতি ও অনুভূতি পরে চ্যাপলিনের ছবিতে ক্রমাগত ডেকে এনেছে একের পর এক বেশ্যা চরিত্র। চ্যাপলিন জীবনীকার পিটার অ্যাকরয়েড লিখছেন যে, নিতান্ত বাল্যে চ্যাপলিনের মা’র রক্ষক ও ত্রাতা হয়ে ওঠার স্মৃতিই কাজে এসেছে ওঁর ট্র্যাম্প বা ভবঘুরে নায়কের তরুণী, অবলা নারীদের অভিভাবক হয়ে ওঠায়।
বালক চ্যাপলিনের মা’র রক্ষক হয়ে ওঠার এক অপরূপ বৃত্তান্ত আছে ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’-তে। চ্যাপলিন লিখছেন—
‘‘গলা নিয়ে মা’র সমস্যা হচ্ছিল। গলাটা কখনওই খুব শক্তপোক্ত ছিল না। সামান্য ঠান্ডা লাগলেই ল্যারিঞ্জাইটিস ধরত। আর ধরলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ জ্বালাত; অথচ মা’কে গলা খাটাতেই হত, যাতে স্বরের দশা খারাপ থেকে খারাপ হত। তাতে ভরসা রাখার উপায় ছিল না। গানের মধ্যেই ভেঙে যেত হঠাৎ, আর হারিয়ে যেত ফিসফিস আওয়াজে। শ্রোতাদের মধ্যে তখন হাসাহাসি, টিটকিরি শুরু হয়ে যেত। আর সেই চাপ ওর শরীরে পড়ে পড়ে স্নায়ুর দোষ ধরিয়ে দিল, এই হতে হতে ওর নাটকের কাজ তলানিতে ঠেকল এবং এক সময় উঠেই গেল। মা’র এই গলার অবস্থার জন্যই পাঁচ বছর বয়েসে আমার মঞ্চাবতরণ ঘটল। মা সন্ধেবেলায় আমায় সঙ্গে করে থিয়েটারে আনতেন ভাড়ার ঘরে একলা রাখবেন না বলে। সে দিন মিউজিক হল অল্ডারশটে অভিনয় ছিল। খাবারের গন্ধে ম’ ম’ করত থিয়েটারটা। ভিড় করত সৈন্যরা। এমনিতেই হুজ্জুতে সে-সব দর্শকরা তাল খুঁজত গাল পাড়ার, হই হট্টগোল বাধানোর। অভিনেতাদের কাছে অল্ডারশট মানেই আতঙ্কের সপ্তাহ।
বাড়িতে ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীর মাঝে।
আমার মনে পড়ে মা’র গলা ভেঙে ফিসফিসে নেমে গেলে, অডিয়েন্স হাসাহাসি করতে করতে বেসুরো গান আর আওয়াজ দেওয়া শুরু করল। সবটাই আমার কাছে অদ্ভুত, বুঝতেই পারছি না কী ঘটছে। দেখতে দেখতে হল্লা বাড়ল আর মা’কে স্টেজ ছেড়ে বেরোতে হল।
মা খুব ভেঙে পড়ে উইংসের পাশে ম্যানেজারের সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু করল। যিনি আবার মা’র বন্ধুদের সামনে আমাকে গাইতে দেখেছিলেন। তর্কটা ছিল মা’র জায়গায় আমাকে স্টেজে গাইতে পাঠানো নিয়ে।
ওই ঝঞ্ঝাটের মধ্যেই ম্যানেজার আমাকে স্টেজে নিয়ে ক’টা কথা বলে একলা ছেড়ে দিলেন। পাদপ্রদীপের ওই চড়া আলোয় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এক রাশ মুখের সামনে আমি অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গান ধরে ফেললাম। একটু চেষ্টায় ওরা আমার স্কেলটাও পেয়ে গেল। আর গান একটু চলতেই বৃষ্টির মতো পয়সা ঝরতে লাগল মঞ্চে।
আমি তখনই ঘোষণা করলাম পয়সা কুড়িয়ে ফের গানে আসব। তাতেও হাসির রোল পড়ল। ম্যানেজার একটা রুমাল এনে আমার পয়সা কুড়নোয় হাত লাগালেন। তাতে আমার ভয় হল পয়সাগুলো কি উনিই গাপ করবেন? এটা অডিয়েন্সের সামনে বলে ফেলতে আবার হাসির বান ডাকল। বিশেষ করে ম্যানেজার টাকা নিয়ে স্টেজের বাইরে হাঁটা দিতে আমিও তখন ওঁর পিছু নিলাম। আর যতক্ষণ না তিনি টাকা আমার মা’র হাতে গচ্ছিত করছেন আমি মঞ্চে ফিরিনি।
কথা বলে, গান গেয়ে, এমনকী মা’র গলা নকল করে গেয়ে প্রচুর পয়সা ছোড়়াছুড়ি, হাততালি আর হাসিতে যখন শেষ করলাম, মা ফের স্টেজে এল আমায় নিয়ে যেতে। ওর উপস্থিতিতে ফের শুরু হল হর্ষধ্বনি। সে-রাতেই মঞ্চে আমার প্রথম আবির্ভাব আর মা’র গান ও অভিনয়ের ইতি।’’
যদ্দিন মা গাইতে পারছিলেন চ্যাপলিনদের ভালই চলছিল, গলার গান চলে যেতে ওদের বাসা বদল আরম্ভ হল। তিন ঘরের আস্তানা থেকে প্রথমে দু’ঘরের, পরে এক ঘরের। ঝকঝকে পাড়া থেকে ক্রমশ ঝঝ্ঝড়ে, বেহাল পরিবেশে। যত ঠাঁইনাড়া দশা, ততই বেচাবেচি চলে বাড়ির জিনিসপত্তরের।
বেচাবেচির পালায় মা’র শেষ হাত পড়ল ওর নাটকের পোশাক-আশাকের তোরঙ্গে। এই জিনিসগুলো প্রাণে ধরে ছাড়তে পারেনি পাছে একদিন গলা ফেরে!
সমাজের নিচু স্তরে বাস করলে খুব সহজেই মানুষ তার ভাষার চেহারা, উচ্চারণের বিশিষ্টতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু মা সারাক্ষণ পরিবেশের আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল ওর কাজ, এবং নজর রেখেছিল ছেলেদের কথাবার্তা, বাচন ভঙ্গি, বুলির ব্যাকরণের ওপর। যাতে ছেলেদের কথাতেই ওদের শ্রেণির কেতা ধরা দেয়।
এই বিষণ্ণ দিনগুলোতেই মা’র মাইগ্রেনের ব্যথা হতে লাগল। ফলে ছুঁচ-সুতোর কাজ তাকে তুলে দিনের পর দিন ভেজা চা পাতা চোখের ওপর রেখে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে হচ্ছিল। সময়টার অপূর্ব একটা বর্ণনা দিয়েছেন চ্যাপলিন ওঁর জীবনস্মৃতিতে। লিখছেন: ‘‘পিকাসোর ছিল একটা ব্লু পিরিয়ড। নীলের পর্ব। আমাদের ছিল একটা ধূসর পর্ব, যখন স্থানীয়দের দয়া-দাক্ষিণ্য, বিনামূল্যে স্যুপ খাওয়ার জন্য সরকারি কুপন আর ত্রাণসামগ্রীর ওপর দিন চলেছে।’’
এক বার মাইগ্রেনের ধাক্কা সামলে খাড়া হয়ে মা ছেলেদের বেড়াতে নিয়ে গেল সাগরতীরে। সাউথেন্ড-অন-সি। চ্যাপলিন লিখছেন: ‘‘সমুদ্রের প্রথম দর্শনই আমায় মায়াজালে বশ করে ফেলল।’’
কে জানে, সে কি প্রথম হাতছানিও জল পেরিয়ে মার্কিন দেশে ভাগ্যান্বেষণে যাবার! চ্যাপলিন তেমন কিছু লেখেননি, তবে ঘটনা এই যে ১৯৫৭-য় বিশ্ববিখ্যাত চ্যাপলিন একবার মাতৃভূমিতে ফিরে (তখন তিনি মার্কিন দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করছেন) সাউথেন্ড-অন-সি’র ঠিক সেই গেরুয়া তট দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যে-সরু, আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে পাহাড়ের মাথায় চড়ে প্রথম সমুদ্র দেখেছিলেন সেটি আর খুঁজে পাননি।
কাজ যখন করা যাচ্ছেই না তখন আর কী করা! স্বামী চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র ছেড়ে চলে গিয়ে বিয়ে করলেও একটা সময় ছেলেদের জন্য হপ্তায় আধ পাউন্ড করে পাঠাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে সেটাও বন্ধ করে দিলেন। চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে যখন প্রাণে বাঁচতে ছেলেদের হাত ধরে ল্যামবেথ ওয়র্কহাউজে মা-র প্রবেশ। ওয়র্কহাউজ হল সাধ্যমতো হাতের কাজ জুগিয়ে যৎসামান্য খাওয়াদাওয়া পরার সংস্থান হয় এমন দরিদ্রাশ্রম।
সেখানে ঢুকতে মা’কে মহিলাদের আবাসের দিকে আর ছেলেদের শিশু-কিশোর শাখায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে এক সময় ভিজিটিং রুমে মা’র সঙ্গে দেখা করতে এসে দুই ছেলে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। এ কী হাল হয়েছে মা’র! এক সপ্তাহেই কী রোগা হয়ে গেছে, আর কত বয়েস ধরে গেছে!
ছেলেদের দেখামাত্র তার মুখ আলোয় ঝলমল করে উঠল, কিন্তু ছেলেদের কাঁদতে দেখে আর কান্না চাপতে পারল না। তার পর কান্না থামিয়ে ওদের আদর করতে লাগল। সৌভাগ্যবশত তিন সপ্তাহের মধ্যে অনাথ ও গরিব শিশুদের বিদ্যালয় হ্যানওয়েল স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা হল সিডনি ও চার্লিকে। ইস্কুলের আশপাশ-ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে ওয়র্কহাউজের সেই তীব্র বিষাদ অনেকটা কাটল, কিন্তু তবু একটা ব্যথা। মা’র থেকে দূরে হয়ে গেল জীবন কিছুটা।
এই সময়ই সিডনির মওকা এল স্কুল ছেড়ে নৌবাহিনীতে যাবার। ওয়র্কহাউজে থাকা ছেলেদের এগারো বছর বয়েস হলে আর্মি বা নেভিতে ক্যাডেট হয়ে যোগ দেবার সুযোগ ছিল। সিডনি প্রথম সুযোগেই সমুদ্রে পাড়ি দিল। যেতে পারত চার্লিও, কিন্তু ও গেল না মা’র কাছাকাছি থাকবে বলে, মা’ও ছেলেকে সঙ্গে রাখবে বলে ওয়র্কহাউজ ছেড়ে কেনিংটন পার্কের পিছনে একটা ডেরা খুঁজে নিল। আর কিছু দিন পর সিডনিও নেভির পাঠ ছেড়ে মা-ভাইয়ের কাছে ফিরে এল।
যে-বিষণ্ণ সকালের ছবি দিয়ে চ্যাপলিন ওঁর আত্মজীবনীর আলাপ পর্ব শুরু করেছেন সে-দিনটি দাদা সিডনির সমুদ্র থেকে ফিরে আসার আগে। যখন একটা দুশ্চিন্তায় খান খান হয়ে যাচ্ছে মা।
• ​• ​•
দুশ্চিন্তাটা একটা মামলায় হেরে যাওয়ার। বাবা তত দিনে ছেলেদের খোরপোশ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। গান, অভিনয়, সেলাইকাজ সব চুকেবুকে গেছে।
ছেলেদের নিয়ে একটু সম্মানের সঙ্গে বাঁচবে বলে ওয়র্কহাউজ ছেড়ে নতুন করে বাসা বেঁধেছে। অথচ ছেলেদের জন্য সাহায্যের হাতটাও স্বামী গুটিয়ে নিয়েছে। কেস করা ছাড়া উপায় কী? এবং সেখানেও হার।
বাবার হয়ে মামলা লড়ে যে-উকিল খোরপোশ বাতিল করল তার নাম আর্মস্ট্রং। কেঁদে কেঁদে মুখে গালাগালি সব ঝাড়ছে মা আর্মস্ট্রংকে। কিন্তু বাবাকে নিয়ে কিছু বলছে না। আসলে চোখের সামনে ভাসছে কেনিংটন পার্কের পিছনের আস্তানা ছেড়ে দরিদ্রাশ্রমের জীবনে ফেরা। যা তাকে যেতেও হল এর পর ঘন ঘন এবং এ ভাবেই এক দিন, সম্পূর্ণ উন্মাদিনী হয়ে গেল।
এক দিন সিডনি যখন মাঠে ফুটবল খেলছে দু’জন নার্স ছুটে এসে খবর দিল মা পাগল হয়ে গেছে। ওকে কেন হিল পাগলাগারদে পাঠানো হয়েছে। খবরটা শুনে সিডনি কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাল না, ফুটবল খেলে গেল। খেলা শেষে নির্জন এক কো‌ণে গিয়ে শুধু কেঁদেই গেল।
আর চার্লি? আত্মজীবনীতে লিখছেন—
‘‘ও যখন বলল কথাটা আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। আমি কাঁদলাম না, কিন্তু একটা অবুঝ নিরাশা ছেয়ে ফেলল আমাকে। কেন এটা করতে গেল মা? এত স্ফূর্তি আর আনন্দ তাকেই শেষে পাগল হতে হল? কেমন যেন মনে হল দুঃখের তাড়নায় মা হয়তো নিজের মন থেকেই পালিয়ে গেল। আমাদের ঝেড়ে ফেলেই। সেই হতাশার অন্ধকারে আমি ভেতরে ভেতরে দেখতাম মা যেন করুণ চোখে আমায় দেখে যাচ্ছে, আর একটু একটু করে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।’’
মা’র মাথা ঠিক নেই সেটা সরকারি ভাবে জানানো হল এক সপ্তাহ পর। এর মধ্যে কোর্টেরও নির্দেশ এল তার প্রাক্তন স্বামীকে ভার নিতে হবে দুই ছেলের।
বাবার সঙ্গে থাকা যাবে এই ভাবনাটাই বেশ চঞ্চল করে দিল চার্লিকে। যে বাবাকে মাত্র দু’বার দেখেছে জীবনে!
এক বার যখন মঞ্চে গান গাইছে বাবা। আরেক বার একটা বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে। এক মহিলার সঙ্গে বাগান দিয়ে হেঁটে আসছিলেন চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র। দেখামাত্র একটু থেমে ভাল করে নজর করেছিল চার্লি এবং ভেতরে ভেতরে জেনে গিয়েছিল এ-ই বাবা।
ভদ্রলোক ওকে ডেকে নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। পরিস্থিতির নাটকীয়তা আঁচ করে চার্লি কিছু না বোঝার ভান করে বলেছিল, ‘‘চার্লি চ্যাপলিন।’’
ভদ্রলোক তখন পাশের মহিলার দিকে এক বার চোখ ফেলে পকেট থেকে একটা হাফ ক্রাউন বার করে দিয়েছিলেন। চার্লিও সেটা নিয়ে দৌড়ে বাড়ি এসে মা’র সামনে ঘোষণা করেছিল, ‘‘বাবার সঙ্গে দেখা হল।’’
মা উন্মাদ আশ্রমে, আর এই বাবার সঙ্গে থাকতে যাওয়াটা অবশ্য এক অন্য গল্প চার্লি চ্যাপলিনের জীবনে। কান্না-হাসির দোলদোলানির মধ্যেই একটু একটু করে ওঁর বড় হয়ে ওঠা। তার পর এক সময় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমেরিকা…
• ​• ​•
নিশীথবাবুর বাড়িতে আরও দু’দিন গিয়েছিলাম অন্য অজুহাতে। আসলে ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’ পড়ে শেষ করব বলে। বিশেষ করে সেই বইটাতে যে হাতের স্পর্শ আছে পৃথিবীর সর্বকালের এক শ্রেষ্ঠ শিল্পীর! কমেডি সৃষ্টির প্রতিভা হিসেবে যাঁর নাম বসবে শেক্সপিয়র, মলিয়ের, অস্কার ওয়াইল্ড-এর পাশে।
এবং সেই থেকে চার্লি চ্যাপলিনের বৃহৎ সিনেমাকীর্তির একটা বড় অংশ দেখতে বাধ্য হই ওর শৈশব, বাল্য, কৈশোর ও প্রথম যৌবনের চলচ্চিত্ররূপ হিসেবে।
আর দেখতে দেখতে, হাসতে হাসতে কান্না পায়। যে-কান্না থেকে একটু একটু করে উঠে এসেছে ওই সব অমর হাসি।
কবি এলিয়টের লাইন ধার করে বললে বলতে হল— আফটার সো মাচ নলেজ হোয়াট ফরগিভনেস?

http://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/overview-of-charlie-chaplin-s-life-in-his-125th-year-1.323916




Meet the Roma: 2,000 years ago, the first ‘Indians’ to go to Europe

Meet the Roma: 2,000 years ago, the first ‘Indians’ to go to Europe
Written by Pooja Khati
New Delhi Published:Feb 23, 2016, 1:00 

Who are the Roma?
The Roma or Romani are a travelling people who live mostly in Europe and America, and whose origins are widely accepted by anthropologists, historians and geneticists as lying in northern India. The Roma are known by different names in different countries — Zigeuner in Germany, Tsiganes or Manus in France, Tatara in Sweden, Gitano in Spain, Tshingan in Turkey and Greece, Gypsy in the UK, etc. Some of these names have clear derogatory connotations and are considered racial slurs by the Romani people. In her speech to the International Roma Conference and Cultural Festival in New Delhi on February 12, External Affairs Minister Sushma Swaraj counted painter Pablo Picasso, actor-filmmaker Charlie Chaplin, entertainer Elvis Presley, Hollywood icon Michael Caine, tennis star Ilie Nastase, and actor Yul Brynner among prominent Roma.
What is the world’s Roma population? Where do they live?
The precise number is unknown, in part because of the reluctance of many Roma to disclose their ethnicities in official national censuses for fear of attracting harassment or persecution. Minister Swaraj told the Roma conference that as of 2016, the global population of the community is estimated to be around 20 million. Roma peoples live in some 30 countries across West Asia, Europe, America and Australia. The largest Roma community is in Turkey — around 2.75 million. Some 1 million are estimated to live in the US, and around 800,000 in Brazil. Romania, Bulgaria, Russia, Slovakia, Hungary, Serbia, Spain and France all have sizeable Roma populations.
So, what is the Indian connection of the Romani people?
The Romani language has obvious similarities with languages spoken in northern India, and many of the commonest Romani words, including the numerals, are near identical to their modern Hindi names. Examples: the Romani yek (Hindi ek); dui (do); trin (teen); shtaar (chaar); panchi (paanch); sho (chhe); desh (dus); bish (bees); manush (manushya, or man); baal, kaan and naak, which are the same as the Hindi words for hair, ear and nose; kalo (kaala, or black), etc.
The first wave of the Roma are thought to have left India probably with the armies of Alexander of Macedon around 326 BC, who, Swaraj said at the conference, took them along as “they were iron smelters and experts in making war weapons”. The word Roma itself is believed to have come from the Sanskrit domba, or the modern dom or its variations, found in several Indian languages, referring to lower castes engaged in a range of menial works and, at places, in itinerant singing and dancing professions.
The cultural similarities between the Roma and Indian communities include an association of the colour white with mourning, applying of mehndi on palms by Roma brides, and laws of ritual purity and taboos of birth and death. A woman in childbirth is considered impure, and must have her baby outside her caravan home or tent lest it be polluted. The high incidence of child marriages, and belief in gods similar to Shiva, Kali and Agni too are considered evidence of their links to Hindu culture.
The authors of a 2012 study analysed some 800,000 genetic variants in 152 Romani people from 13 Romani communities across Europe and concluded that the Roma people left northern India about 1,500 years ago; and those Roma who now live in Europe migrated through the Balkans beginning about 900 years ago.
Why are the Roma regarded with fear by some people and persecuted by some governments?
Popular narratives in film and literature represent the Roma as people of unpredictable temper and mystical or occult powers, including fortune-telling. They are also often represented as thieves or law-breakers, adding to the general negative perceptions about them.
The prejudice has translated into persecution by governments almost since the beginning of their migration to Europe. They were enslaved or killed in Germany, Italy and Portugal, faced discrimination because of the colour of their skin, and were accused of bringing the great plague to Europe.
The Nazis sent the Roma to labour camps. In 1934, Turkey passed a law allowing the government to deny the Roma citizenship. In the 1980s in Czechoslovakia, Roma women were forced to undergo sterilisation. Even now, there are incidents of Roma children being taken away from their parents, and women having their ears chopped. In 2010, 51 illegal Roma camps were removed by the French authorities, triggering an uproar and threats of action from the EU.
So where is the ‘Roma question’ headed?
The main aim of the Delhi conference was to bring to the attention of governments the issues being faced by the community. It was proposed to study the political, social, and economic challenges it faced, and to examine the constitutional safeguards available to them. A 2011 survey in 11 European countries had found that only one out of two children from the community went to school on average, and only one out of three adult Roma was in a paid job. Almost 90% of Roma in these countries lived below the poverty line, and almost half of them had faced discrimination because of their ethnic background.




C.V. Vishveshwara: the black hole man of India

Updated: March 5, 2016 21:17 IST
C.V. Vishveshwara: the black hole man of India

·        
The Hindu
Prof. C.V. Vishveshwara is not only among the first in India to study black holes, but also the one who made a very important calculation that was used in this discovery. Photo: Bhagya Prakash K.
·        
A humorous take on the No-hair theorem where Occam's razor chops the hair off a black hole.
The discovery of gravitational waves has shaken the world – literally, when the wave was detected, on September 14, 2015 and figuratively, when it was announced in February. One of the people at the heart of this discovery is a 77-year-old Bangaluru-based Professor Vishweshwara who is not only among the first in India to study black holes, but who has also made a very important calculation that was used in this discovery.
To recap briefly, about 1.3 billion years back, two black holes, of masses 36 and 29 times that of the sun, merged to form a unit. This cataclysmic event shook the fabric of space-time and emanated a characteristic disturbance, which our scientists have detected using the advanced LIGO (Laser Interferometer Gravitational Wave Observatory) detectors. The black holes first came close to each other, then locked in circular orbits and then abruptly merged. The corresponding signal would also have three parts, the inspiral, merger and ringdown. The beauty is that this waveform was recorded and the last part is akin to a bell, ringing and fading away.
It is for this portion of the calculation that we have to thank Professor Vishveshwara. The “ringdown” signal, arising out of a black hole merger, originally called the “quasinormal modes” was first predicted by him in a paper that he published in Nature in 1970. Not just that, earlier he had worked out two important papers on the theory of black holes, with famous general theory of relativity specialist, Charles Misner, as his thesis adviser. At the time, the term “black holes” had not been coined and the event horizon went by the name “Schwarzchild surface”.
“It was a natural question then to ask: how does one see a black hole? So, using a computer, I scattered packets of gravitational waves from a black hole and the quasinormal modes emerged carrying the signatures of the black hole… this was theoretical. I had never dreamed that this would take on an aspect of reality some day,” says Prof. Vishveshwara, who is now the Emeritus Director of Jawaharlal Nehru Planetarium which he founded.
As described earlier, the initial signal, the “chirp”, the steadily increasing frequency and amplitude of the gravitational waves indicates the inspiralling of two black holes and the ring down ( or the quasi-normal mode, QNM) indicates the newly created black hole after the merger.
“When I saw at IUCAA [Inter University Centre for Astronomy and Astrophysics] the QNM recorded by LIGO, I felt the same kind of euphoria that I had experienced 45 years earlier when they emerged out of a computer — it was like time travel back into the past,” he says.
Prof. Vishveshwara is far from being a bookish nerd. Among other things, he is interested in cartooning too. He says: “I dreamt of becoming an artist… while working on the QNM in New York, I studied painting at the Art Students’ League, which was reputed to be a favourite haunt of many artists including Salvador Dali… Only after returning to India did I start cartooning for conference proceedings, my own books etc.” He laughingly adds that in 2005, Spektrum der Wissenschaft, a German science magazine had published his Einstein cartoons — and paid for it too!
Scientists are many times given to whimsy and there is one cartoon of his which combines the philosophical “law of parsimony”, the Occam’s Razor with black hole physics. Occam’s Razor prescribes simplicity and the shearing of all redundant complexity, made popular in The Name of The Rose, by Umberto Eco; it states that among competing theses, the one with the fewest assumptions must be selected.
When the discussion of whether there were “hairy” fields coming out of a black hole (which resulted in the famous no-hair theorem) came up, Prof. Vishveshwara presented an appropriate Occam cartoon (shown here).
With his father, Padmashri C.K. Venkata Ramayya, being a celebrated man of letters, Prof. Vishveshwara’s childhood, filled with music, literature and banter, has endowed him with a ready wit. His books “Einstein’s Enigma or Black Holes in My Bubble Bath,” and “Universe Unveiled or the Cosmos in my Bubble Bath,” are hugely popular.
“The most unexpected finding I have seen is that the universe is accelerating. We now have dark matter, dark energy, all mysterious…is this the dark age of cosmology?” he quips. Winding up with a few words about the latest LIGO discovery, he says,
“Gravitational waves had been predicted by Einstein a hundred years ago and LIGO’s finding is a major event expected for nearly thirty years. The wait is over and the future is bright.


http://www.thehindu.com/sci-tech/science/cv-vishveshwara-the-black-hole-man-of-india/article8318058.ece

Sunderbans study: For widows of tiger victims, scars and stigma linger, study finds

Sunderbans study: For widows of tiger victims, scars and stigma linger, study finds
The research was funded by the World Bank through the West Bengal government's State Health System Development Project.

Written by Aniruddha Ghosal 
Kolkata Published:Feb 24, 2016, 2:17 

Forced into a life of unending social stigma, frequently the victims of physical and sexual abuse and living a life of abject penury, nearly half of Sunderban’s “tiger widows” were found suffering from a designated mental illness in a recent study.
In a study of 65 women whose husbands had been killed by tigers — government estimates put the total number at 1,000 both sides of the border — the study, funded by the World Bank, found 44% of the 65 women suffering “from a designated mental illnesses, of which most were major depressive disorders (MDD) including recurrent MDD (14.8%), dysthymic disorder (11.1%), and Post-traumatic Stress Disorder (PTSD) (5.5%)”.
And there is the stigma.
“I took so much hardship to raise my only son… starved, earn by hard toll of meen (tiger prawn seed) collection from river under sun, rain and storm, cattle grazing in fields… But when he got a job in the town and married a girl there, he said that they couldn’t take me with them because I am the evil person who devoured her husband (pause and profuse crying) and may caste evil on his family too. So he disconnected from me completely,” the study quoted one of the widows as saying.
The study, titled ‘Ecopsychosocial Aspects of Human–Tiger Conflict: An Ethnographic Study of Tiger Widows of Sundarban Delta, India’ was published in the journal Environ Health Insights last month and was authored by A N Chowdhury of the Cambridgeshire and Peterborough NHS Foundation Trust in the UK and Ranajit Mondal Arabinda Brahma and Mrinal K Biswas of the Institute of Psychiatry in Kolkata.
The research was funded by the World Bank through the West Bengal government’s State Health System Development Project.
Human-tiger conflict remains a major public health issue in the Sunderban Reserve in Bengal and this study investigates a hitherto unexplored aspect of the conflict — the aftermath of the incident and the lives of the widows who have to not only deal with the bereavement of the sudden and violent loss, but also the cultural stigma associated with being killed by a tiger and social rejection.
At the heart of this cultural stigma lies the belief of the population in the area that the mangrove forest is a sacred entity — the abode of Goddess Bonobibi — and the tiger is the guardian deity of the forest, under the name of Dakkhin Ray (Lord of the South). Tiger attacks, consequently, are perceived as a “divine curse” or “sign that the goddess is displeased, even enraged with the victim and denies protection from the tigers”. Widows suffer from a sense of “guilt and sinfulness” that impacts their “post-trauma psychology” while the community’s rejection of the widows as a “cursed family” further “acts as a magnifier for the compounded stigma burden when added to their already precarious status as widows”.
Further, the study adds, tiger widows are blamed for their husbands’ death by the family and community and that “90% of the widows had been accused of causing their husband’s death by their family in-laws, especially by the mothers-in-law” while being branded as “swami-khego or husband-eater”. Physical abuse by the in-laws is common, particularly by their mothers-in-law (17%–31.5%) and by neighbours (6%–11.1%), said the study. This abuse often enters the realm of sexual abuse and the study notes that a young widow, who participated in the study, said that she “was regularly sexually harassed by her brother-in-law, probably at the instigation of her mother in-law”.
For 86% of the widows, in-laws “denied any financial responsibility for the widow or their children”. “This so-called ‘human-wildlife conflict’ (HWC) needs to be addressed to ensure that local people do not unfairly bear the negative side-effects of conservation, becoming more opposed to it and further jeopardising the survival of high conservation value species,” adds the study.


http://indianexpress.com/article/india/india-news-india/sunderbans-study-for-widows-of-tiger-victims-scars-and-stigma-linger-study-finds/